বিনয় ঘোষ
বাঁকা শ্যামের মতো শ্রীবদন বেঁকিয়ে সেদিন এক ভদ্দরলোক পান চিবুতে চিবুতে বললেন: 'ও মহাশয়! স্যাম্যবাদ আইলে কি মাইয়া-মানসের আবুর থাকপে না? মোগো ইচ্ছা মতোন কি হ্যাগো পামু? হেয়া হেইলে অ্যান্নেগো লগে মোরা আছি।' শুনে আমার পিলে চমকে উঠল। ভদ্দরলোকের গালপাট্টা ও হাতের গুল দেখে ভড়কে গেলাম। বিতণ্ডা পাছে ষণ্ডের তাণ্ডবে পরিণত হয় সেই ভয়ে বললাম : 'আজ্ঞে হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, দেখছেন না, সাম্যবাদ দেশে আসার আগেই মেয়েরা কিরকম জোর সাম্যের আন্দোলন করছে? এলে কি আর রক্ষা আছে? একেবারে ন স রমণ ন হাম রমণী।' ভদ্দরলোক হাসলেন। দাঁতের ফাঁক দিয়ে দেখলাম মাংসার্ত ডালকুত্তার জিবের মতো তাঁর জিবটা লক লক করছে। মেয়েমানুষের নাম কি না? কনডিশন্ড রিফ্লেক্স! এ তো একজন সাধারণ ভদ্দরলোকের কথা। এইবার একজন অসাধারণ পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীর (ইনি অধ্যাপক দেবপ্রসাদ ঘোষ) গবেষণামূলক এক প্রবন্ধ থেকে এই বিষয়ে দুটি লাইন মাত্র উদ্ধৃত করছি : 'এখনকার সামগায়ী কামচারী অর্থাৎ Communist যুগের কি সিদ্ধান্ত জানেন— যৌন ব্যবস্থা সম্পর্কে? বিবাহ নয়, স্বেচ্ছাবিহার, marriage নয়— free love; সতী নয় স্বৈরিণীই হল এ যুগের অনুত্তমা নারী।' এই রকম আরও অনেক মতামত উদ্ধৃত করা যায়। সব মতামতের মধ্যে দুটি বক্তব্য প্রধান। কেউ ভাবেন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যেদিন ভেদাভেদ থাকবে না, সেইদিন সভ্যতা হবে আদর্শ সভ্যতা, সমাজ হবে আদর্শ সমাজ। আবার কেউ কেউ ভাবেন সাম্যবাদীরা যে আদর্শ সমাজের বড়াই করে সেই সমাজে সভ্যতার নামে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে এবং স্বেচ্ছাচারিতাই হবে তথাকথিত সাম্য ও স্বাধীনতার রূপ।
এই দুই দলের ধারণাই মারাত্মক ভুল। এরকম infantile ধারণা কোনো কোনো কম্যুনিস্টেরও (?) আছে, কিন্তু সংখ্যায় তারা কম এবং leftwing-এর অন্তর্ভুক্ত! রাজনীতির ক্ষেত্রে কাণ্ডজ্ঞানহীন sectarianism যেমন অমার্জনীয় অপরাধ, জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে রঙ্গচিঙা-সুলভ freedom-এর ধারণাও তেমনি নিন্দনীয় অপরাধ। শ্রেণি-সমস্যার পরই বোধহয় মানব-সভ্যতার সব চেয়ে নিগূঢ় সমস্যা হল নারী-পুরুষ-সম্পর্ক সমস্যা। অবশ্য নারী-পুরুষ-সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান শ্রেণি-সমস্যাকে এড়িয়ে নয়, এবং শ্রেণি-সমস্যার সমাধানের সঙ্গে নারী-দাসত্বের সমাধান অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এর সঙ্গেই জড়িত পরিবার (family), সুনীতি (morality), প্রেম (love)। এককথায়, যা-কিছু আমরা জীবনের সৌন্দর্য বলে গর্ব করি এবং জীবনের কদর্যতা বলে নাকসিটকোই, সব এই নারী-পুরুষ-সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই সভ্যতার গোড়া থেকে গড়ে উঠেছে। এত বড় সমস্যা সম্পর্কে অনেকেই দেখি উদাসীন। এই উদাসীনতা ও অর্ধজ্ঞানের ফলে অনেকেরই ভবিষ্যৎ সমাজের নারী পুরুষের সম্পর্ক, প্রেম, পরিবার, সুনীতি প্রভৃতি সম্বন্ধে ধারণাও বীভৎস। শুধু তাই নয়, সাহিত্য ও শিল্পকলার অন্যতম উৎস ও উপাদান হল এই নারী-পুরুষ-সম্পর্ক, এই প্রেম। যৌন-সম্বন্ধ ও যৌন-নীতির স্বাধীনতা সম্বন্ধে সাধারণের ভুল ধারণাকে exploit করে এই আমাদের দেশেই কত ধুরন্ধর, কত সাহিত্যিক ও কবির pornography বাজারে বেমালুম progressive বলে চালু হয়েছে এবং আজও হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই।
প্রথমে প্রেমের কথাই বলি। হেদুয়া ঢাকুরিয়া লেকের ধারে প্রেমের গরলে যখন আধুনিক শ্রীরাধার 'তনুমন বিবস খসএ নিবিবন্ধ' তখন আধুনিক শ্রীকৃষ্ণ একথা বলে না যে
মেঘ-মাল সয়ঁ তড়িত-লতা জনি
হিরদয়ে শেল দঈ গেল।
আধ আঁচর খসি আধ বদন হসি
আধহি নয়ন-তরঙ্গ।
আধ উরজ হেরি আধ আঁচর ভরি
তবধরি দগধে অনঙ্গ।।
সে কি বলে জানেন? আধুনিক প্রগতিমার্কা কবির কাতরানি শ্রবণ করুন মন দিয়ে:
মোরা কাছে এসে আজ যে-অঞ্চল
টানি দাও সুন্দর লজ্জায়,
জানি তাহা শ্লথ হবে কোনো এক রাতে
(তখন কোথায় আমি?)
যে শঙ্কার শিহরণ তব দেহ লাবণ্যেরে
মোর কাছে করেছে মধুর।
(ওগো কঙ্কাবতী মধুর! মধুর!)
জানি তাহা থেমে যাবে ধূসর প্রভাতে এক
যবে চক্ষু মেলি
পার্শ্বস্থ জানুর দৃঢ় আকুঞ্চন থেকে
আপনার কটিতট নেব মুক্ত করি।
মন একে আদিরস বলতে চায় না এবং একেবারে ডাকসাইটে প্রেমিকা ভিন্ন বোধহয় কোনো নারীর প্রাণে এ-কাব্যে প্রেমের ঝংকার তুলবে না। এ একেবারে কাঁচা তালের রস, পান করলে তেরিমেরি করা ভিন্ন উপায় নেই। অ্যান্টনি সাহেব, ভোলা ময়রা, রাম বসু প্রমুখ কবিয়ালদের চিতান-পরচিতান-ফুকা মহড়ার কবিগান আদি-রসাত্মক কাব্য হিসাবে এর চাইতে অনেক সার্থক। যেমন
চোরাবাগানের চাঁপার বেটী চোপরা-কাঁটা চাঁদী,
ছোলা-দাঁতী ছুকরি হেমা, পদ্ম ছুতরের বেটী,
গোঁদলপাড়ার গোদা কমলী গেঁদা গোলবদনী,
ঘুস্কিপাড়ার ঘুসখাকী ঘোষাল ঘোল বেচুনী,
প্রেমানন্দে যায় তীর্থে প্রেমার বেটী পদী
তরণী ভরা তরুণী লয়ে বেয়ে যায় নদী।।
অথবা এর চাইতেও সুন্দর
আমার বঁধুর সঙ্গে আমার পিরীত কেমন ছিল শুন—
যেমন মাটি আর পাটে, লোহা আর কাঠে।
দেবতা আর কুসুমে, জরি আর পশমে।
গুড়ে আর ছানায়, মুক্তা আর সোণায়।
সতী আর সুকান্তে, মিশী আর দন্তে।
মরিচ আর জিরে কাঁঠাল আর ক্ষীরে।
বাজানা আর গানে, চূণে আর পানে।
বাণে আর তূণে মাস্তুল আর গুণে।
দাতা আর দানে, জলে আর মীনে।
হাঁড়ি আর সরায়, গন্ধক আর পারায়।
নয়ন আর অঙ্কনে, অন্ন আর ব্যঞ্জনে।
আমাদের দেশের এই কবিয়ালদের সঙ্গে উপরোক্ত প্রগতিমার্কা কবির পার্থক্য কোথায়? বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ তখন বাংলাভাষাকে সুন্দর করে গড়ে তোলেননি, তাই কবিয়ালদের ভাষা অমার্জিত, কিন্তু তাদের কাব্যিক উপমা ও কল্পনা আমাদের এ-যুগের বিদ্রোহী প্রেমের কবিদের তুলনায় অনেক বেশি জীবন্ত ও সুন্দর। 'ওগো কঙ্কাবতী'-র প্রেম কবিয়ালদের প্রেমের চাইতে কোনদিক থেকে সুন্দরতম আমি অন্তত বুঝি না।
পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধাক্কায় আমাদের সামাজিক নীতির অচলায়তন ভাঙতে আরম্ভ করল গত শতাব্দী থেকে। যাজ্ঞবল্ক-মনুর নীতির উত্তাপে সমাজের ভিতর যে দগদগে ঘা হয়েছিল তা চোখে পড়ল বিদ্যাসাগরের বৈষ্ণব কবিদের পর সাহিত্যেও নারী-পুরুষ সম্পর্কের মাধুর্য রূপান্তরিত হয়নি। কবিয়ালদের অপরের বিকৃত বাসনা চরিতার্থ করতে হত এবং তাদের কোনো শিক্ষা-দীক্ষাও ছিল না, সুতরাং সুরুচিও আশা করা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্রও যৌননীতির শূন্যতা লক্ষ্য করলেও তাকে ভাঙতে পারেননি। বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথই বোধহয় নারীকে মর্যাদা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রেম আদর্শ ও ইউটোপিয়ান প্রেমের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ হয়েছিল সেটা কালাপাহাড়ের বিদ্রোহ, ব্যর্থতা-ক্লিষ্ট, অবদমিত মধ্যবিত্ত মনের বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহকেই একদিন আমরা প্রগতি বলে চেঁচামেচি করেছিলাম, কিন্তু তা আদৌ সুস্থ ও সুষ্ঠু নয়। আসলে সেটা কবিয়ালদের ভদ্রবেশী সংস্করণ। প্রেম ও নারী সম্পর্কে মনোভাব আমাদের দেশে বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথের পর এগোয়নি, বরং বেশ কয়েক পা পিছিয়ে প্রায় নবাবি আমলে পৌঁছেছে। সামাজিক ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর এবং সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ নারীর নারীত্ব ও প্রেম সম্বন্ধে আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রগতিশীল। কথাটা বেশ জোর দিয়েই আমি বলছি।
এখন কথা হচ্ছে, পূর্বোক্ত পণ্ডিত-মশাই, যিনি কম্যুনিস্টদের যৌন-ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বেচ্ছাবিহার ও free love-এর অভিযোগ করছিলেন, তিনি তাঁর নিজের সমাজ সম্বন্ধে কী বলবেন? যে সমাজের কর্ণধাররা পুরুষের বহুবিবাহ এবং নারীর কঠোর বৈধব্যকে শাস্ত্রবিধি দিয়ে সমর্থন করেন এবং তার ফলে সমাজের খিড়কি দিয়ে অনাচার, স্বৈরাচার ও ব্যভিচারের প্রশ্রয় দেন, অজস্র হাফ-গেরস্তর জন্ম দেন, সে-সমাজ, সে-বিবাহ, সে-প্রেম সম্বন্ধে আমাদের গুণনিধি কি সাফাই গাইবেন? সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে, নারী-পুরুষ সম্পর্কের ঐতিহাসিক বিকাশ সম্বন্ধে কোনো ধারণা থাকলে তিনি ওরকম কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য নিশ্চয়ই করতেন না। আর একা তাঁরই বা দোষ কি? নারী-পুরুষ সম্পর্কে আমরা কী এমন সম্মান দিয়েছি সমাজে এবং সাহিত্যে? পুরোনো যৌননীতির গণ্ডির মধ্যে হয় ঘুরপাক খাচ্ছি, তা না হলে রচনা করছি কবিয়ালদের ভাবচুরি করে করে মার্জিত ভাষায় কঙ্কাবতীর তরজাগান। পুরোনো ‘sex matrix’ যেখানে ভাঙতে গিয়েছি সেখানেই আর নতুন matrix গড়তে না পেরে উচ্ছৃঙ্খলতার জোয়ারে ভেসে গিয়েছি। তাকে তো আর প্রগতি বলা যায় না! যে-সমাজে
বেচে বাড়ির পাটা কত বেটা ফক্কি প্রণয় করে।
বেড়ায় খিচুড়ী মেরে দ্বারে দ্বারে জেতের দফা সারে।।
তাদের বাবুয়ানা, কি কারখানা, ধোপার কাপড় নিয়ে।
কেবল তিলকাঞ্চনে রাত্রি কাটান ছেড়া চেটায় শুয়ে।।
থাকে হাটে পোড়ে পত্নী ছেড়ে সদাই খুসী দিল।
জলপানের বরাদ্দ কেবল চৌকিদারের কিল।
—সে-সমাজে কঙ্কাবতীর কাব্যই প্রেমের কাব্য এবং উপরোক্ত নারী-পুরুষ-সাম্য- বিরোধী গোঁড়া বিদ্যানিধিরাই সভ্যতা ও প্রগতির এক একটি গথিক পিলার। ভবিষ্যৎ সমাজে এই স্বেচ্ছাচারিতা বা গোঁড়ামি কোনোটাই থাকবে না। যেদিন পুরুষ ও নারী উভয়েরই জীবন সত্যিই স্বচ্ছন্দ ও স্বাধীন হবে, কেউ কারও উপর কোনো কারণে নির্ভরশীল হবে না, নারী যেদিন জমিদারের খাসতালুক বা ব্যবসাদারের পণ্য থাকবে না, সেইদিনই তো প্রেমিক বলবে প্রেমিকাকে রবীন্দ্রনাথের 'মানস সুন্দরীর' সুরে
আমার নয়ন হতে লইয়া আলোক
আমার অন্তর হতে লইয়া বাসনা
আমার গোপন প্রেম করেছে রচনা ওই মুখখানি।
আমি যতদূর জানি, সাম্যবাদের প্রবর্তক যাঁরা সেই মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন যৌন-সম্পর্ক ও প্রেম সম্বন্ধে এই উক্তিই করেছেন। রুশ-বিপ্লবের পর হঠাৎ একটা পুরাতন গোঁড়া সমাজের কাঠামো ভেঙে পড়ল। একটা বিরাট আলোড়ন ও ওলটপালটের মধ্যে নীতির হাল ধরে রাখা কঠিন। রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেই কঠিন এবং তার চাইতে হাজার-গুণ বেশি কঠিন নৈতিক ও মানসিক ক্ষেত্রে, কারণ সেটা জীবনের গভীরতম ক্ষেত্র। তাই প্রথম ধাক্কায় স্বেচ্ছাচার খানিকটা মাথা চাড়া দিয়েছিল সোভিয়েট সমাজে, কিন্তু তাই বলে তাকে কোনোদিন সমর্থন করা বা আশকারা দেওয়া হয়নি। লেনিন যতদিন বেঁচে ছিলেন পদে পদে তার জন্যে তরুণ তরুণী, যুবক যুবতীদের তিরস্কার করেছেন, তীব্র সমালোচনা করেছেন, নির্মমভাবে কটূক্তি করেছেন। লেনিন বলতেন, বিবাহ ও প্রেম হল সভ্যতার সুন্দর ফুল, আর তার ফল নবজাত সন্তান, নতুন জেনারেশন। যৌন-সম্পর্ক নিয়ে ছেলেখেলা করা তাই ক্রাইম। এর মধ্যে যেমন বায়োলজি আছে, তেমনি আছে কালচার। যৌন-সম্পর্ক বিবাহ ও প্রেমের ইতিহাসের সার কথা। জৈবিক ক্রমবিকাশ ও সভ্যতার ইতিহাসের মর্মকথা। জীবনের শুরু থেকে, অ্যামিবা থেকে এই মানুষ পর্যন্ত সেক্সের বিকাশ হয়েছে এই দিকে। এই ঐতিহাসিক ধারণা থাকলে আমরা প্লেটোও হব না, কবিয়ালও হব না, সভ্য মানুষের মতো নর-নারীর জীবন, যৌন-সম্পর্ক বিচার করব। তাতে প্রেমে পড়ার অসুবিধা হবে না, প্রেমের কাব্য লেখারও বাধা থাকবে না। 'শেষের কবিতা'র নায়িকা ভাবি সমাজেই রক্ত মাংসের মূর্তি পাবে, তার আগে নয়, যে-সমাজে নারী স্থাবর সম্পত্তি না হয়ে হবে প্রাণদাত্রী নারী, হবে সবার উপরে মানুষ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন