বিনয় ঘোষ
পাঁকের মাঝে বসত, তবু
পাঁক লাগে না গায়ে তার
ধরতে গেলে পিছলে চলে,
ধন্য পাঁকাল নির্বিকার।
যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
ভগবান!
এবার আর তোমার দূতের প্রতীক্ষায় থাকিনি। তোমার কল্কি-অবতার হয়তো মধ্যপথে কল্কের টানে অচৈতন্য, কিন্তু আমরা কোনো অবতারের আবির্ভাবের অপেক্ষায় তোমার ক্ষমার বাণী, ভালোবাসার বাণী, বিদ্বেষ-বিষ বিসর্জনের বাণী ভুলিনি। আমরা ভারতবাসী, আমরা বাঙালি, ক্ষমা করেছি সকলকে, ভালোবেসেছি সকলকে। তার সাক্ষী, শকুনভরা বাংলার গ্রাম, আর রঙ্গভরা 'চৌরঙ্গী'। তার প্রমাণ মেদস্ফীত, স্বদেশের পণ্য ও খাদ্যব্যবসায়ীরা স্মিতমুখে লক্ষ লক্ষ নরকঙ্কালের পর্বতপ্রমাণ স্তূপের উপর আজও সগর্বে সমাসীন। তার প্রমাণ এই মহানগরীর ডানদিকের ফুটপাথের উপর দিয়ে আমরা হাসি, খেলি, গান গাই, শিস দিই, সিনেমায় যাই, বসুন্ধরার অপ্সরী-আলয়ে চোরাবাজারের খুনের টাকা খোলামকুচির মতো উড়িয়ে দিই, আর বাঁ-দিকের ফুটপাথ থেকে বাসি মৃতদেহের দুর্গন্ধ আসে নাকে, মুমূর্ষু নরনারী শিশুর আদিম বুভুক্ষার্তনাদ কানে পৌঁছয়। আমরা শিউরে উঠি না, থমকে দাঁড়াই না, জোরে জোরে পা ফেলি, নাকে রুমাল দিই। আমদের নার্ভের কাঁটাতার ভেদ করে ওরা কোনোদিন অন্তরের দুর্গদ্বারে পৌঁছতে পারেনি। তাই আমরা 'ফ্যান' দিয়ে মানবকল্যাণের গর্ব বোধ করেছি, ওরাও আমাদের ক্ষমা করে ধুঁকে ধুঁকে অদৃষ্টকে অভিশাপ দিয়ে মরে গিয়েছে। তাই আমরা হঠাৎ-মনুষ্যত্বের গলাধাক্কায় লঙ্গরখানা খুলেছি, লক্ষ লক্ষ মানুষকে সুনিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে গিয়েছি দানের অর্থ নিয়ে। ওরা নীরবে সেই দান গ্রহণ করেছে, তারপর পরম নিশ্চিন্তে সভ্য মহানগরীর ফুটপাথে ও হাসপাতালে দেহত্যাগ করেছে। তবু বাঁ-দিকের ফুটপাথ ছেড়ে মধ্যের রাজপথের ট্র্যাফিক ও জনস্রোত ঠেলে ওরা ডান দিকে এগিয়ে আসেনি। একবারও প্রশ্ন করেনি, মাঠের ধান তুলে দিলাম গোলায়, গোলা থেকে সে ধান গেল কোথায়? ওরা অশিক্ষিত, তাই দেশী পাঁকালের দালালেরা ওদের বুঝিয়েছে— এসব জ্যামিতি, অ্যালজাবরা, স্ট্যাটিস্টিকস আমদানি-রপ্তানি, ইনফ্লেশনের ভেলকিবাজি, লাঙলা চাষার মগজে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়। ধন্য পাঁকাল তুমি! সুদের পাঁকে, মুনাফার পাঁকে, চোরাবাজারের পাঁকে, গোপন মজুতের পাঁকে হাবুডুবু খেয়েও তুমি 'পঙ্কিল' নও, পাঁকাল, পাঁকমুক্ত তেলচুকচুকে পাঁকালটি!
হে অমৃতের পুত্ররা! পাঁকালের যুক্তি শোনো, আর পাঁকালের উমেদার মাকাল মধ্যবিত্তের যুক্তি। পাঁকাল আছে গা-ঢেকে পাঁকের মধ্যে, ব্ল্যাকআউট রাতে তাকে চেনাই যায় না। পাঁকালের দালালেরা আছে বাইরে, তাদের নাম 'মাকাল মধ্যবিত্ত'। বাইরে শুধু আজ এই দালালের দৌরাত্ম্য! রাস্তার মোড়ে, হোটেলে, সিনেমায়, ক্লাবে, আফিস আদালতে— সর্বত্রই আজ এই পাঁকালের দালালদের ভিড়। কথায় চোরাবাজার, চলায় চোরাবাজার, স্বপ্নে চোরাবাজার! বর্মার চাল নেই, গুর্খা চাল গিলছে, তাই তো তেতাল্লিশ সালের গোড়া থেকে সাত-আট মাসে চালের দর বাড়ল তিন-চার গুণ থেকে সাত-আট গুণ। পাঁকালের যুক্তি এই, আর মধ্যবিত্ত দালালেরও। ২৮ কোটি মণ চাল চাই আমাদের, শস্যশ্যামলা বঙ্গজননী ২৪ কোটি মণ ফলিয়ে দেন, কিন্তু হায়! বাকি ৪ কোটি মণ সারা ভারতবর্ষ তাকে ভিক্ষে দিতেও অসমর্থ হল, আর তারই অভাবে লক্ষ লক্ষ লোক সশরীরে স্বর্গে গেল। পাঁকালের মুনাফাবৃদ্ধির ছলাকলায় আকাল এল দেশে, পাঁকালের গায়ে কিন্তু ছিটেফোঁটা পাঁকও লাগল না। পাঁকালের জোর আছে, কারণ দেবতাদের সঙ্গে পাঁকালের সন্ধি! মর্তের অরাজকতায় দেবতারা ক্রুদ্ধ হয়ে যতই অর্ডিন্যান্স জারি করেন, পাকাল ততই পাঁক থেকে পিছলে যায়। দৈত্য দমনে ও নিধনে যে-দেবতাদের গৌরব আজও অম্লান, যে-দেবতাদের গুপ্তচরের দৃষ্টি নারীর বক্ষঃস্থল থেকে দৈত্যকুলের গোপন ষড়যন্ত্রের নথিপত্র আবিষ্কার করে, সেই দেবতারা অনুচরবর্গসহ ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরলেন। পাঁকাল পুষ্করিণীর গভীর পাঁকে অদৃশ্যই থেকে গেল। ধন্য পাঁকাল!
পঙ্ক-আহার, পঙ্ক-বিহার, চামড়া তবু চকচকে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশকে মহাশ্মশানে পরিণত করেছে কে? পাঁকাল তুমি, আর তোমার আশ্রয়দেবতা শাসক মহাপ্রভু। লক্ষ লক্ষ নরনারী শিশুকে নির্বিকার চিত্তে অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে কে? পাঁকমুক্ত পাঁকাল তুমি, আর তোমার ধর্মাবতার ধর্মরাজ। বিনা ওষুধে, বিনা চিকিৎসায় হাজার হাজার লোকের অকালমৃত্যুর জন্যে দায়ী কে? পঙ্কজীবী পাঁকাল তুমি। আমরা তোমায় ক্ষমা করিনি তো ক্ষমা করেছে কে? তুমি কি দেখনি পাঁকাল, আমরা ধুঁকে ধুঁকে, কাতরে কাতরে নিঃশব্দে মরেছি, অভিযোগ করিনি, প্রতিবাদ করিনি? তুমি কি দেখনি পাঁকাল, মহানগরীর একদিকে মহাদুর্ভিক্ষের মৃত্যু-বিভীষিকা, আর একদিকে গলাগলি, ঢলাঢলি, ঠাট্টা-তামাশা, রসিকতা, চোরা বাজারের লুটের পয়সায় রাসলীলার মহোৎসব। বাংলার এমন মূর্তি দেখিনি কোনোদিন। সে তো তোমারই কৃপায় পাঁকাল! একদিকে বাংলা মায়ের ধূমাবতী মূর্তি। ধূম্রবর্ণা, মলিনাম্বরা, বিমুক্তকুন্তলা, রুক্ষা, কাকধ্বজ রথারূঢ়া, বিলম্বিত পয়োধরা, সূর্পহস্তা, রক্তনয়না, লম্বনাসিকা, ক্ষুৎপিপাসার্দিতা বঙ্গমাতা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, মহানগরীর পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। আরেক দিকে মায়ের বাইজি-মূর্তি, নাচগান-নেশা-হল্লায় মশগুল। এ-সমাজে তাই তুমি দানবও নও, কুমিরও নও, তুমি কলিযুগের পাঁকাল-অবতার।
মাঠে মাঠে মানুষের মৃতদেহ মাটির সঙ্গে মিশে গেল। কঙ্কালের মজ্জার সারে বন্ধ্যা বাংলার মাটির ফলনশক্তি বাড়ল। তবু প্রমাণ হল না পাঁকাল যে দেশে মহামন্বন্তর এসেছে। কলকাতা থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে লন্ডন-ওয়াশিংটন, সর্বত্র তুমুল বাকবিতণ্ডার পর স্থির হল মোটর-দুর্ঘটনার মতো একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে মাত্র, দুর্ভিক্ষ হয়নি। সত্যিই তো দুর্ভিক্ষ হয়নি। তার কারণ বা যুক্তি একটা-আধটা নয়, অজস্র। যেমন
১। প্রজার দুর্ভিক্ষে রাজার ধর্ম নষ্ট হয়। রাজার ধর্ম নষ্ট হলে ধর্মযুদ্ধে জয় হয় না। ধর্মযুদ্ধে রাজার জয় অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং দুর্ভিক্ষ হয়নি।
২। সুসভ্যদের মহাসভায় সকল সভ্যই দিব্যচক্ষে দেখেছেন যে দুর্ভিক্ষ হয়নি। অসভ্যদের মধ্যে যদি হয়ে থাকে, তা হলে তা ধর্তব্যই নয়।
৩। সেরেস্তায়, আইন-কানুনে, দলিল-দস্তখতে দুর্ভিক্ষের উল্লেখ নেই। সুতরাং দুর্ভিক্ষ হয়নি।
৪। দুর্ভিক্ষ হলে কেউ রক্ষিতা রাখত না, মোকদ্দমা করত না, পিপে-পিপে মদ্যপান করত না, তাড়াতাড়া নোটের তুবড়িবাজি দেখাত না, সব অর্থ দান করত লঙ্গরখানায়। দেশের লোক খেয়ে বাঁচত। কিন্তু তা বাঁচছে না, যা বাঁচছে তা সামান্য। সুতরাং দুর্ভিক্ষ হয়নি।
৫। দুর্ভিক্ষ হলে কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হত, সকলে চিঁ চিঁ করত। কিন্তু হ্রেষারবে আকাশ বিদীর্ণ হচ্ছে, সভাসমিতি অবিরাম চলছে, বক্তার বিরাম নেই। সুতরাং দুর্ভিক্ষ হয়নি।
৬। সবার উপরে দুর্ভিক্ষ হলে 'মানুষ' মরত। কিন্তু মানুষের মতো মানুষ একটাও মরেনি, তারা সকলেই বাঁচার মতো বেঁচে আছে। আর যারা মরেছে তারা 'মানুষ' নয়। সুতরাং দুর্ভিক্ষ হয়নি।
পাঁকাল, তোমার ভয়ডর নেই। ব্ল্যাকআউট রাতে, ব্ল্যাক-মার্কেটের ডোবার পাঁকে গা ডুবিয়ে তুমি বসে থাক। তোমার মাথার উপর বটের ছায়ায় তোমার ডোবার অন্ধকার, পাঁকের অন্ধকার আরও গাঢ়তর হবে। তৃণদলের সাধ্য কি তোমায় স্পর্শ করে?
পাঁকাল! হাজারে হাজারে, লাখে লাখে আমরা মরেছি, তবু আমরা একেবারে মরিনি আজও। মহানগরীর আনাচেকানাচে, বিশাল সুরম্য হর্ম্যমালার ইটের পাঁজরে পাঁজরে, গ্রামে গ্রামে, মাঠেমাঠে আজও আমরা বেঁচে আছি। পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে তোমাদের সভ্য মহানগরীর মহানুভবতার মুখাপেক্ষী হয়ে এসেছিলাম। আগে জানিনি, আগে বুঝিনি, এত লোহা, এত ইস্পাত, এত মার্বেলপাথর এই মহানগরীতে। আগে বুঝিনি যে, মহানগরীর বিরাট অট্টালিকার মতো নির্জীব, নিঃস্পন্দ মহানগরীর মানুষগুলোও জঘন্য, ঘিঞ্জি বস্তির মতোই তাদের অন্তরের কদর্যতা। লোহা-ইস্পাতের হৃৎপিণ্ডে আমাদের গ্রাম্য নাকিকান্না তাই নিষ্ফল আঘাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। তাই ফিরে চললাম আমরা। লঙ্গরখানায় প্রাণশক্তি অপচয় করে তিলে তিলে নিঃশেষ না হয়ে ফিরে চললাম। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি বাংলার মাটি মহানগরীর ইস্পাতের মতো অসাড় কি না, আমাদের মৃত কঙ্কালের মতো হিম নিঃস্পন্দ কি না! আবার আমরা ফিরে আসব, এই মহানগরীতেই। স্বপ্ন দেখার শক্তি নেই আজ, তবু পাঁকাল, মনে রেখো এ কোনো ব্যাধির বিকার নয়। সেদিন মহানগরীর ইস্পাতও স্পন্দিত হবে, পাথরের বুকেও শিহরণ জাগবে। মুমূর্ষুর দুঃস্বপ্ন নয়, জীবনের স্বপ্ন। পাষাণ অহল্যা নবজীবন লাভ করবে।
ততদিন শুধু ক্ষমা নয় পাঁকাল, ততদিন শুধু ভালোবাসা নয়। ততদিন শুধু কঙ্কালের বেদিতে যোগাসনে বসে নরমুণ্ড-বেষ্টিত হয়ে প্রতিহিংসার পৈশাচিক সাধনা, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার তান্ত্রিক উপাসনা। কবিতা নয়, শ্বাশ্বত শিল্প-সৃষ্টি নয়, মুহূর্তের ও প্রত্যহের নিষ্ঠুর সংগ্রাম-সাধনা।
একা চাকাভাঙা কাককেতু রথে
ভ্রমে ধূমাবতী বুভুক্ষাপথে,
বুঝেছ?
গগনবিহারী সে কাককণ্ঠে
হে কবি, তোমার
কোকিল-কূজন কূজেছ?
কবিতার দিন আসবে, মহৎ শিল্প-সৃষ্টির দিন আজ নয়, আগামীকাল। আজ কাককণ্ঠে কোকিল-কূজন কি ভালো লাগে?
অতি ক্ষুণ্ময়ী ধূমাবতী ওই
রথ ছেড়ে চলে হাঁটিয়া
রূপে রসে ভরা বিচিত্র ধরা
মুছে ফেলে জিভে চাটিয়া।
আজ তাই 'রূপে রসে ভরা বিচিত্র ধরা'র রূপ-সাধনা নয়। বীভৎস নীরস পৃথিবীকে সুন্দর করা, পাষাণের বুকে প্রাণ-সঞ্চার করা। ততদিন শুধু, হে পাঁকাল, ক্ষমা নয়, ভালোবাসা নয়, কল্পনাও নয়। ততদিন শুধু মহাকবি হাইনের (Heine) স্বপ্ন ও বাসনা।
Mine is the most peaceable disposition. My wishes are a humble dwelling with a thached roof, but a good bed, good food, milk and butter of the freshest, flowers at my windows, some fine tall trees before my door; and if the good God wants to make me completely happy, he will grant me the joy of seeing some six or seven of my enemies hanging from these trees. With my heart full of deep emotions I shall forgive them before they die all the wrong they did me in their lifetime–– true, one must forgive one’s enemies, but not until they are broutht to execution.
ইতি— পাঁকাল-বন্দনা সমাপ্ত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন