জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ

বিনয় ঘোষ

মানুষ মাত্রেই প্রেমিক। শিশুর প্রেম প্রথম সমুদ্রদর্শনের মতো। বালুতটের উপর দাঁড়িয়ে দেখছি ঢেউয়ের পর ঢেউ, কূলকিনারাহীন, দিগন্ত রেখায় বিলীন, সীমাহীন অস্পষ্টতায় ও বিস্ময়ে অপূর্ব সুন্দর। কানুর ভালো লাগে মিনুকে। দুজনে খেলা করে একসঙ্গে, একমনে বসে বসে বাঁধে খেলাঘর। পুতুলের বিয়েতে ঘরকন্না গুছাতে ব্যস্ত থাকে মিনু। ঝাঁকড়া চুল নেড়ে কানুকে ধমক দিয়ে শুনিয়ে দেয় : 'মেয়েটা কাল শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, বাজারহাট করবে কখন?' চারদিনের জমানো চারটে পয়সা দিয়ে এক ফিরিওয়ালার কাছ থেকে ছোট্ট এক শিশি স্নো কিনে আনে কানু। মিনু হয়তো আড়চোখে কানুর দিকে চাইতে চাইতে পিন্টুর সঙ্গে একদিন পার্কে গিয়ে দুজনে একসঙ্গে দোলনার দোল খেলে এল, এদিকে আষাঢ়ের মেঘ নামল কানুর মুখে। মার্বেল নিয়ে মারপিট হয়ে গেল হঠাৎ অকারণে কানু আর পিন্টুর মধ্যে। কানু লড়ছে পিন্টুর সঙ্গে, মিনু দেখছে। কানু আছাড় খায়, চোখমুখ লাল হয়, ধূলো ঝেড়ে ফেলে আবার সাপটে ধরে পিন্টুকে। বেকায়দায় পড়ে পিন্টু চিৎ হয়ে যায়। বীর ল্যান্সিলটের মতো কানু একবার চেয়ে দেখে মিনুর দিকে। মিনু হাসে আর বলে, 'ইঃ— ভারি তো, পারলে না।'...

কানু ঠাকুমার কাছে শুয়ে রূপকথার রাজকন্যার গল্প শোনে। আকাশে মেঘের কোঁকড়া চুল উড়িয়ে পক্ষীরাজের পিঠে চড়ে উড়ে চলেছে মিনু, পাশে রাজকুমার কানু, হাতে তলোয়ার। মেঘ-পুরীর দৈত্যদের কানু তলোয়ার ঘুরিয়ে টুকরো করে ফেলছে। শিশুর প্রেম। তারপর বয়ঃসন্ধি। যাদু ও বিস্ময়ে ভরা রাত্রি চুপিসাড়ে কখন ভোর হয়েছে। মিনুর অমন আড়াল দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মানে কি? যা কাছে ছিল, ক্রমে তা দূরে সরে যাচ্ছে, আর যত দূরে সরে যাচ্ছে ততই বাড়ছে কাছে পাবার ব্যাকুলতা।

খনে খনে দসন-ছটা ছুট হাস।

খনে খনে অধর আগে করু-বাস।।

হৃদয়ের মুকুল দেখে ক্ষণে ক্ষণে মিনু আঁচল টেনে দেয়, আবার ক্ষণে ক্ষণে ভুলে যায়। কানু অবাক হয়ে ভাবে।

বিদ্যাপতি কহ সুন বর কান।

তরুণিম সৈসব চিহ্নই ন জান।।

বিদ্যাপতি বলেছেন, সুন্দর কানু, শৈশব ও তারুণ্যের চিহ্নই তুমি জান না। কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সোনার টুকরো ছড়িয়ে সূর্য উঠল। খেলাঘর ফেলে রেখে মিনু একদিন সত্যিই চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। কানু বুঝল সেইদিন। পৃথিবীটা মরুভূমির মতো রিক্ততায় ধূ ধূ করছে।

কবি সেইজন্যেই বলেছেন : 'জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ।' জীবনের চাইতে যৌবনের রঙ্গ বেশি। 'সুপুরুষ প্রেম কবহু নহি ছাড়, দিনে দিনে চন্দ্রকলা সম বাড়।' সুপুরুষের প্রেম কখনো ছাড়তে নেই, কারণ সে প্রেম দিনে দিনে চন্দ্র-কলার মতো বাড়ে। আমাদের সুন্দর শ্রীকৃষ্ণের জীবনে যাই সত্য হোক-না কেন, অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত প্রেমিক ক্যাসানোভার (Casanova) জীবনে হয়তো এইটাই সত্য ছিল। ক্যাসানোভা তাঁর Memoirs-এর মধ্যে বলেছেন ‘I have always loved women and have done my best to make them love me.’ ক্যাসানোভার এই প্রেমের অ্যাডভেঞ্চার হ্যাভলক এলিস (Havelock Ellis) সমর্থন করেছেন, কারণ ক্যাসানোভা বিংশ শতাব্দীর মতো প্রেমের ফাটকা-বাজারে নিজের জীবন যৌবন ধনমান ক্ষয় করেন নি। প্রেমের বেচাকেনা করতেও তিনি জানতেন না। কবির কাছে কাব্য যেমন, শিল্পীর কাছে চিত্র যেমন, সুরকারের কাছে রাগরাগিণী যেমন, ক্যাসানোভার কাছে তেমনি ছিল প্রেম, তাঁর সৌন্দর্য ও সংগতি বোধের চরম ও পরম প্রকাশ। ছন্দে, বর্ণে, ভাস্কর্যে সুন্দরের অনুভূতিকে যেমন শিল্পী প্রকাশ করেন, ক্যাসানোভাও তেমনি তাঁর অনুভূতিকে প্রকাশ করতেন প্রেমে। প্রেম ছিল তাঁর সৃষ্ট আর্ট, তিনি ছিলেন প্রেমের আর্টিস্ট। ক্যাসানোভাকে যিনি লম্পট বলেন, তাঁকে এলিস সাহেব বেয়নেট-বিদ্ধ করতেও রাজি আছেন। এলিস বলেন : ‘Casanova loved many women, but broke few hearts... A man of finer moral fibre could scarcely have loved so many women, a man of coarser fibre could never have left so many women happy.’ তার কারণ কী? তার কারণ, ফ্রয়েড ও Underworld-এর যৌনবিজ্ঞান পড়ে ক্যাসানোভা মানসিক ডিসপেপসিয়ায় ভোগেননি। ক্যাসানোভা bank balance দেখিয়ে, চেকবই নাচিয়ে, মাস্টার ব্যুইক চালিয়ে প্রেমের ঢেউয়ে ওঠানামা করেননি, পাতালে তলিয়েও যাননি। প্রেম তাঁর কাছে মাংসাশী পশুর হিংস্রতা ছিল না, ছোবল মারা থাবা দিয়ে আঁচড়ে-নেওয়ার মধ্যে তার সার্থকতা ছিল না। পণ্য-পাগলামি ও মুনাফালোভের বিষে জর্জরিত সমাজে প্রেম বা প্রেমিকা যেমন ম্যানুফ্যাকচার্ড কমোডিটি, ক্যাসানোভার কাছে প্রেম সেরকম কমোডিটি ছিল না। ক্যাসানোভার জীবন মানুষের আদর্শ নয়, সমাজের আদর্শ নয়, একশোবার নয়, কিন্তু এ-যুগের পণ্যোন্মত্ত, মুনাফাকাঙাল, নগ্ন কাম-বীজাণু-সংক্রামিত সমাজের মূর্তিমান প্রতিবাদ ছিলেন ক্যাসানোভা। সুন্দর ও আদর্শ প্রেমের আজীবন পূজারি ছিলেন তিনি। তার কারণ, হ্যাভলক এলিস বলেছেন : ‘He had fully grasped what the latest writer on the scientific psychology of sex calls the second law of courting, namely, the development on the male of an imaginative attentiveness to the psychical and bodily states of the female, in place of an exclusive attentiveness to his own gratification. It is not impossible that in these matters Casanova could have given a lesson to many virtuous husbands of our own highly moral century. He never sank to the level of the vulgar maxim that ‘all’s fair in love and war’.....’

এ যুগের নীতিকথা হল War, Wine ও Woman এবং ‘All’s fair in love and war.’ ক্যাসানোভা ছিলেন এ-নীতির বিরোধী। তাই এলিস সাহেব বলেছেন যে, ক্যাসানোভার জীবনী থেকে আমাদের এই অতি-নৈতিক যুগের অনেক বকধার্মিক স্বামী অনেক শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারেন। আমার মিনু যখন পাঁচ বছর পরে ঘরে ফিরে এল, তখন সে তিন সন্তানের জননী বটে, কিন্তু 'নারী' নয়। রুগণ শীর্ণ, পাণ্ডুর মুখের উপর তার দুশ্চরিত্র, লম্পট স্বামীর গোপন অত্যাচারের বিভীষিকা। অথচ স্ত্রীর জীবন-নিয়ন্ত্রণ সম্বন্ধে এমন নীতিবাগীশ স্বামীর জোড়া মেলা ভার। কানু তখন তার মধ্যবিত্ত সমাজের বিষ আকণ্ঠ পান করে নীলকণ্ঠ হয়ে বসে আছে। তখন সে কালেজী শিক্ষা পেয়ে এলিয়টের কবিতা পড়ছে, ‘Birth and copulation and death.’ শুধু পড়ছে না, তার সঙ্গে জীবন যোগ এই মহাসত্য উপলব্ধি করছে মর্মে মর্মে। শিখবার মতো দু-চার কথা ক্যাসানোভাও এদের বলতে পারেন বইকি! আর সমাজের আর্থিক দুর্গতি ও নৈতিক অবনতির চাপে যাঁরা জপতপরত পূর্ণ-গেরস্ত থেকে হাফ-গেরস্ত ও সিকি-গেরস্তর পদে অনুন্নীত হয়েছেন তাঁদেরও ‘art of love-making’ গোড়া থেকে শেখা উচিত। জীবনে ধূসরতা ও ক্লীবত্বই যাঁদের চরম সত্য, কি কবি, কি গৃহস্থ, আমার অনুরোধ তাঁরা সকলেই প্রেমে পড়ুন, প্রেম করুন। বুবুল-কিকিরার প্রেম নয়, লেডি চ্যাটার্লির প্রেম নয়, মানুষের প্রেম, জৈবিক (biological) মানুষ ও সভ্য (cultured) মানুষের প্রেম।

এ যুগের মানুষের জীবনে সব চেয়ে বড় অভিশাপ হল এই যে, সে প্রেম করতে ভুলে গিয়েছে। মানুষ আজ ‘animal’, মানুষ আজ ‘Intelligent’, মানুষ আজ ‘hero’, কিন্তু মানুষের মধ্যে আজ আদর্শ ‘lover’ কোথায়? বিশ্ববিখ্যাত রুশ বৈজ্ঞানিক ভরোনফ (Voronoff) সারা জীবন মানুষকে পুনর্জীবিত (regenerate) করার স্বপ্ন দেখেছেন এবং সেই স্বপ্নকে তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ সত্যে রূপ দিতে চেয়েছেন। মুমূর্ষু গাছপালাকে পুনর্জীবিত করার জন্যে যেমন আমরা জোড়কলম বাঁধি, মুমূর্ষু ক্ষয়িষ্ণু ও অপরিণত মানুষকেও পূর্ণ জীবন্ত মানুষ করার জন্যে ভরোনফ তেমনি জীবজন্তুর গ্রন্থি-সন্নিবেশ (grafting of glands) সম্বন্ধে পরীক্ষা করেছেন এবং কৃতকার্যও হয়েছেন। এ-কাজে তাঁকে সাহায্য করেছে বাঁদরই বেশি, অর্থাৎ বাঁদরের গ্রন্থি নিয়েই তিনি পরীক্ষা করেছেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি ঋণ শোধ করার জন্যে জন্তুজানোয়ারের প্রেম ও চিন্তাধারা সম্বন্ধে একখানি বই লিখেছেন। এই বইতে তিনি বলেছেন যে, মানুষের প্রেমের চাইতে অপেক্ষাকৃত কম 'পাশবিক' (bestial) জন্তুজানোয়ারের প্রেম। অধিকাংশ পশুপক্ষী পূর্বোক্ত এলিস সাহেব সমর্থিত ‘Second Law of Courting’ সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন। মানুষ আজ এই প্রেমকে লোভ, হিংস্রতা, প্রতিযোগিতা ও জঘন্য ব্যবসাদারির পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। শুধু স্বর্গ থেকেই অ্যাডামের পতন হয়নি, মর্ত থেকে পাতালের সীমাহীন অন্ধকারে তার পতন হয়েছে।

কিন্তু প্রেম প্রতিভার অন্যতম প্রেরণা। আলো-জলবায়ুর মতো প্রেম প্রতিভার কুঁড়ি ফুটিয়ে তোলে। প্রেমের স্পর্শে পাঁপড়ি মেলে প্রতিভা। ভরোনফ বলেন, ‘Love stimulates Genius, Imagination driven by desire beautifies women, beautifies life.’ বড় বড় প্রতিভাবানের জীবনে একথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিখ্যাত সুরকার রিচার্ড ভাগনর মধ্য বয়সে প্রেমে পড়ে, Tristan and Isolde স্বরসংগীত রচনা করেন এবং চৌষট্টি বছর বয়সে যুডিথের সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় প্রেম হয় তারই অবদান হল তাঁর শ্রেষ্ঠ সংগীতরচনা ‘Parsifal’. জার্মান কবি গ্যেটে চুয়াত্তর বছর বয়সে সতেরো বছরের বালিকা লেভেটজোর প্রেমে পড়েন এবং একবারে বসে তাঁর বিখ্যাত এলিজি লেখেন। আশি বছর বয়সেও বৃদ্ধ ভিক্টর হিউগো প্রেমের ছলাকলা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন এবং তিনি তাঁর প্রিয় নাতিটিকে সব সময় বলতেন : ‘You must love my son, love well–– all your life.’ মহাকবি দান্তে দশ বছর বয়সে বিয়াত্রচ-এর প্রেমে পড়েছিলেন। পঁচিশ বছর বয়সে বিয়াত্রিচে মারা যায়, কিন্তু দান্তের ‘The Divine Comedy’ অমর হয়ে আছে। এরকম দৃষ্টান্ত খোঁজ করলে অনেক দেওয়া যেতে পারে।

সৃজনীপ্রতিভা ও কর্মশক্তির অফুরন্ত উৎস প্রেম। কিন্তু বৈজ্ঞানিকেরা বলেন, ‘When the genital glands wither, supply less of their precious fluid, the mind becomes dulled.’ যখন মানুষের যৌন-গ্রন্থি শুকিয়ে যায় তখন বুদ্ধির ধার থাকে না, মন নীরস হয়ে যায়, চোখের সামনে পৃথিবী জুড়ে সরষের ফুল ফুটে ওঠে, ন্যাবায় ভোগা রুগির মতো চারিদিকে কেবল ধূসরতা, হাহাকার ও হতাশাই নজরে পড়ে। (আর্থিক অবস্থাকে ধন্যবাদ) যাদের শিল্পকলা ও কাব্যসাহিত্যে এই হতাশা, হাহাকার, ক্লান্তি ও অবসাদের ছাপ স্পষ্ট তাঁরা একবার বৈজ্ঞানিকের উপদেশ মতো পরীক্ষা করতে পারেন।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%