জীবন কী?

বিনয় ঘোষ

'জীবন' কী? এ প্রশ্নটা বারবার আমার মনে জেগেছে। চিন্তাজগতে আমি একজন ভবঘুরে, তাই চারিদিকের কাণ্ডকারখানা দেখে এই ধরনের এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন আমার মনে জাগা খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম সেদিন গদাই চন্দরকে এই প্রশ্ন করতে দেখে। হালে গদাইয়েরও মনে হয়েছে, বাস্তবিক মানুষের জীবনটা কী? আমি বললাম, 'তোমার কী মনে হয়, গদাই?' গদাই বললে গম্ভীর চালে ঘাড় নেড়ে 'দিল্লীকা লাড্ডু, দাদাবাবু! যো খাতা হ্যায় উ পস্তাতা হ্যয় যো নেহি খাতা হ্যায় উভি পস্তাতা হ্যায়।' দেখলাম গদাইয়ের ডেফিনিশন প্রায় কানঘেঁষে গিয়েছে। অর্থাৎ 'জীবন' এমনই চিজ যাকে ফাঁকি দেবার ক্ষমতা নেই, অথচ যাকে আলিঙ্গন করে আনন্দ পেতে হলে অনেক অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের বাহুবল চাই। বাধ্য হয়ে তাই ভাবতে শুরু করলাম, সত্যি 'জীবন' কী? লক্ষ লক্ষ লোক রণদামামার তালে তালে চলেছে এই 'জীবন'কে বিসর্জন দিতে, দিচ্ছেও; ভ্রূক্ষেপ নেই, দিগ্বিদিক জ্ঞান নেই। আলোকশুভ্র শিশুর দেহে বেয়নেটে বিঁধে তুলে ধরছে তারা নির্বাক মায়ের নিষ্পলক চোখের সামনে, দাঁত কিড়মিড় করে বলছে, 'এই তো জীবন!' তালে তালে পা ফেলছে লক্ষ লক্ষ লোক, হাতে কামান-বন্দুক নিয়ে লক্ষ লোকের বুকের দিকে তুলে ধরে খিল খিল করে হাসছে, টোটা ফুটছে আর বলছে, 'এই তো জীবন!' লক্ষ লক্ষ লোক বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারিকেড গঠন করে, টোটা-বর্ষণ বুক পেতে নিচ্ছে আর বলছে, 'এই তো জীবন!' আর চেখভের ক্ষতবিক্ষত 'ডার্লিং'-এর দল উপদংশের জ্বালায় জ্বলেপুড়ে মরতে মরতে বলছে, 'তোমাদের সভ্যতার সমস্ত বিষ পান করছি আমরা নীলকণ্ঠের মতো, এই তো জীবন!' আমি ভাবছিলাম, খেয়ে-দেয়ে সাহিত্যিকদের গাজনে কাঁসি বাজিয়ে দিন কাটছিল বেশ, হঠাৎ এ প্রশ্ন মাথায় এল কেন? না খেয়ে খেয়ে মাথাটিও হয়েছে এমন নাছোড়বান্দা যে একবার কোনো প্রশ্ন পেলেই অমনি হন্যে কুকুরের মতো তার পিছু পিছু তাড়া করবে।

কাঠ, কয়লা, লোহা, আলু, পটল— এসব কি প্রশ্ন করলে সোজা উত্তর দেওয়া যায়, কারণ এদের নিরেট অস্তিত্ব রোজই চোখে পড়ছে। যদি বলা যায় 'ঢেউ' কী, তারও উত্তর দেওয়া যায় সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে, যদিও প্রতিটি ঢেউয়ের বারিবিন্দুর মধ্যে তফাত অনেক। 'সুর' কী, এ প্রশ্নের উত্তর রীতিমতো কঠিন হলেও, দেওয়া যায়। সুরের পরদার ওঠানামা, বা স্বরগ্রাম শুনে বলা যায় ভৈরবী, আশাবরী অথবা মূলতান। কিন্তু ঠিক 'সুর' কী ডিফাইন করা কঠিন। তার চেয়েও কঠিন যদি বলি 'সবুজ' কী, 'হলদে' কী। সবার চেয়ে কঠিন হল 'জীবন' কী? দার্শনিক নই, পণ্ডিতও নই, একেবারে সাদাসিধে মানুষ, আদার ব্যাপারী, দার্শনিক তত্ত্ববোঝাই জাহাজের খবর রাখি নে, রাখতে চাইনে। তাই আমার উত্তরঙ্গ হবে একেবারে সিদে বুনো বেদেদের তিরের মতো, যুক্তির যুযুৎসুর প্যাঁচ কষার ক্ষমতা নেই।

যতদিন 'যন্ত্র' আবিষ্কৃত হয়নি ততদিন যা নড়ে, যা চলে মানুষ তাকেই বলেছে 'জীবন' অর্থাৎ যা 'জঙ্গম' তাই 'জীবন'। যন্ত্রযুগের আগে জীবনের এর চাইতে আর ভালো ব্যাখ্যা কেউ করতে পারেনি। কিন্তু যখন যন্ত্র আবিষ্কৃত হল এবং দেখা গেল, মোটরও নিজে চলে, বাষ্পীয় পোতও নিজে চলে, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগল, 'জীবন কি তা হলে যন্ত্র?' দার্শনিক দেকর্তে (Descartes) বললেন, মানুষ, জীবজন্তু সবই যন্ত্র, তফাত শুধু এই যে, মানুষ-যন্ত্রের 'আত্মা' আছে, যে আত্মা মস্তিষ্কের একাংশে প্রভুত্ব করে এবং মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে। অনেকে বললেন, তাও নয়, জীবন একটা জটিল যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। বৈজ্ঞানিকেরাই তখন এই কথা বেশি করে বলেছিলেন, তাই দার্শনিকেরাও তাঁদের তত্ত্বকে দাঁড় করিয়েছিলেন এই যান্ত্রিকতার উপর।

আমরা অবশ্য এ যুক্তি বা এ ব্যাখ্যা মানি নে। না মানলেও একসময়ে কেন 'জীবন' সম্বন্ধে মানুষের এই ধারণা হয়েছিল তা ভেবে দেখা উচিত। ভেবে দেখলে দেখা যায় 'জীব' আর যন্ত্রের মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখে জীবনকে মনে হয়েছিল 'যন্ত্র'। সাদৃশ্যটা কী এবং কোথায়? ধরা যাক, একটা কুকুর। কুকুরের ব্রেনে প্রায় ৫ কোটি সেল (cell) আছে, প্রত্যেকটি সেলের সঙ্গে আরও অনেকগুলির যোগ আছে, আবার সবগুলোর সঙ্গে বাইরের জগতের যোগাযোগ আছে নার্ভের (nerve) মারফত। একটি কুকুরের চোখের নার্ভের মধ্যে প্রায় একলক্ষ তন্তু (fibres) জড়িয়ে আছে। প্রত্যেকটি তন্তুর আলাদা বাণী পাঠাবার ক্ষমতাও আছে। অনেকটা টেলিফোনের তারের মতো। তেমনি মানুষের হাড়গুলো (bones) লিভারের (lever) মতো। যেমন, যখন আমরা মুখ বন্ধ করি জোরে তখন বেশ বুঝতে পারি গালের তলায় পেশি সংকুচিত হচ্ছে, নীচের চোয়ালটা ঠেলে উঠছে। আরও একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, চোয়ালটা কানের কাছে স্কালের (skull) সঙ্গে যেন স্ক্রু দিয়ে আঁটা। হার্ট রক্ত পাম্প করছে, চোখ অনেকটা ক্যামেরার মতো কাজ করছে। এইরকম ঠিক যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের সাদৃশ্য আছে যথেষ্ট এবং সে সাদৃশ্য উপেক্ষণীয় নয়। তাহলে মানুষ কি যন্ত্র?

মানুষ নয়। কেন নয়? যন্ত্রের যেসব কলকবজা, নাটবলটু,— সব খণ্ড খণ্ড করে খুলে নেওয়া যায়, আবার জোড়া দিয়েও নেওয়া যায়। মোটরগাড়ি যখন বাইরে থেকে চালান আসে তখন যন্ত্রপাতি খোলা অবস্থায় আসে, এখানে ইঞ্জিনিয়াররা তাকে 'ফিট' করে নেন। মানুষের দেহের সব অংশ কি এইভাবে খুলে নিয়ে আবার 'ফিট' করা যায়? যায় না। মোটরের একটা বিশেষ কোনো কল বিকল হয়ে গেলে ইঞ্জিনিয়াররা তা বুঝতে পারেন এবং বদলে নতুন কল দেন। মানুষের দেহে এ রকম কোনো বদল চলে কি? খানিকটা চলে, যেমন— আজকাল আর্টিফিসিয়াল হার্ট বসিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে, জন্তুর ফুসফুসও ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু পুরো চলে না। যেমন একঠেঙে হরিকে শ্যামের একটা ঠ্যাঙ জুড়ে দু-ঠেঙে করা যায় না। মিথ্যে দাঁত বসিয়ে দাঁত বার করে হাসতে পারি, একজনের রক্ত আর একজনকে ধার দিতে পারি, কিন্তু বেশি দূর এগুতে পারি না। কেন পারি না? একটা উদ্ভিদকে (plant) খণ্ড খণ্ড করে কেটে পুঁতে দিলে আবার গজিয়ে উঠবে। কিন্তু এই উদ্ভিদ পর্যন্তই। উচ্চতর প্রাণীকে, (higher animal) যেমন মানুষকেও তেমনি খণ্ড খণ্ড করলে জীবনের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ মানুষের দেহযন্ত্রের প্রতিটি অংশ আর একটির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক অংশেরও নিজস্ব জীবনের ধারা আছে, ক্ষুদ্র কোষটির (cell) পর্যন্ত।

তা হলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মানুষ এমনই এক যন্ত্র যার খোয়াঘষা (wear and tear) সে নিজেই পুরিয়ে নেয়, যার আত্মনিয়ন্ত্রণের (self-regulation) এবং আত্ম সংস্কারের (self-repair) ক্ষমতা আছে। মানুষের দৈহিক তাপ-নিয়ন্ত্রণ আত্মনিয়ন্ত্রণের বড় দৃষ্টান্ত। যখন আমরা খুব গরমের মধ্যে থাকি তখন রক্ত প্রবাহের গতি বেড়ে যায় এবং গাড়ির রেডিয়েটারের মতো দেহও তাপ বার করে দেয়। তখন আমরা ঘামি। তাতেও যখন হয় না, তখন ঠান্ডা জায়গায় নেই। তেমনি আত্ম-সংস্কারের ভালো দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মানুষের দেহের চামড়া বা ক্ষতস্থান। ক্ষত ভালো হয়, নতুন চামড়া আবার তাকে ঢেকে দেয়। একটা যন্ত্রের আত্মনিয়ন্ত্রণের খানিকটা শক্তি থাকে, যেমন ঘোড়ার বেগ বা বাষ্পের চাপ (steam pressure), কিন্তু তার অন্যান্য যন্ত্রপাতি মোটামুটি অপরিবর্তনীয় এবং সলিড। মানুষের তা নয়। মানুষের হাড় পর্যন্ত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে। একটা বাড়ি বা একটা প্রস্তরমূর্তি যেরকম স্থির, মানুষের জীবন সেরকম স্থির নয়। মানুষের জীবনকে বরং তুলনা করা যায় অগ্নিশিখার সঙ্গে, জলপ্রপাতের সঙ্গে। যন্ত্র থেকে আমরা অনেক দূরে চলে আসিনি কি?

মানুষের মন (mind) যখন বিচার করি তখন মানুষকে একেবারেই যন্ত্র বলা যায় না। মনের নিজের একটা ধর্ম আছে। ভাব, চিন্তা, সংবেদন, অনুভূতি, ভালোবাসা, ঘৃণা এসবের মধ্যে মনের একটা নিজস্ব বৃত্তিগত ঐক্য আছে। কিন্তু এই নিজস্বতা, স্বকীয়তা থাকা সত্ত্বেও মন সম্পূর্ণ দেহের উপর নির্ভরশীল। ভাববাদী (idealist) বা মনোজগতের শ্রেষ্ঠতাবাদীরা নাক সিঁটকোবেন না। কথাটা দয়া করে শুনুন। ঠ্যালার নাম বাবাজি! মন যে কতটা দেহের উপর নির্ভরশীল তা বুঝতে একটুও কষ্ট হবে না। মস্তিষ্কের কোনো অংশ থেকে যদি রক্ত-প্রবাহের শিরা কেটে দেওয়া যায় তা হলে কী হয়? তা হলে বুদ্ধিমান মানুষ আপনি অল্পদিনের মধ্যেই একটি বোকাপাঁঠা বনে যাবেন এবং চারিদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখবেন। মাথার সামনে গোলাকার উন্নতাংশ (lobes) যদি বাদ দিতে হয় (অনেক সময় টিউমার হলে দেবার দরকার হয়) তা হলে সব থাকতেও আপনি উদ্যোগী হয়ে কিছু করবার শক্তি পাবেন না, অর্থাৎ initiative হারাবেন। তেমনি মস্তিষ্কের কোনো অংশ যদি জখম হয় একদিন ট্রাম থেকে পড়ে গিয়ে, দেখবেন স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে, কোনো কিছুই মনে করতে পারছেন না, এমনকী বাপের নাম পর্যন্ত। সুতরাং মন (mind) দেখা যাচ্ছে মস্তিষ্কের উপর নির্ভরশীল, আবার মস্তিষ্কের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে গোটা দেহযন্ত্রের। মনের যে স্বাধীনতা, যে স্বকীয়তা, যে ঐক্য আছে, যন্ত্রের কিন্তু একেবারেই তা নেই। যন্ত্র আজও দেহগত মনের ধার ঘেঁষে যেতে পারেনি।

তা হলে 'জীবনটা' শেষপর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে কী? যান্ত্রিকতা (meehanism) এবং ব্যক্তিত্ব (individuality)— এই দুই পরস্পর-বিরোধী শক্তির সমন্বয় (synthesis) হচ্ছে মানুষের 'জীবন'। মানুষ যন্ত্র আবার 'ব্যক্তি'ও। বিশ্ববিখ্যাত জীব-বৈজ্ঞানিক হ্যালডেন সাহেবও (J.B.S. Haldane) তাই বলেছেন :— ‘Life...seems to be a synthesis of two opposites–– mechanism and individuality. A man is a machine, and at the same time an individual.’ একজন বৈজ্ঞানিক ‘seems to be’ ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না, বিশেষ করে জীব-বৈজ্ঞানিক। কারণ জীব-বিজ্ঞানের সমস্ত গবেষণার প্রেরণা ও লক্ষ্য হল এই প্রশ্ন— 'জীবন কী?'

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%