বিনয় ঘোষ
গ্রামের ছেলেমেয়ে বুড়ো সকলেই দুলালকে ডাকে 'চোর' বলে আর বনবালাকে বলে 'সর্দারণী'। অকারণে বলে না। পাঁচ থেকে দশ বছরের ছেলেমেয়েদের আর পঞ্চাশ বা তারও বেশি বছরের বুড়োদের এই সম্বোধনে দুলাল বা বনবালা কেউ বিরক্ত হয় না, গা-সহা হয়ে গিয়েছে। 'চোর' ডাক শুনলে দুলালের লজ্জাও হয় না, অহংকারও হয় না। কিন্তু 'সর্দারণী' ডাকে বনবালার বুক ফুলে ওঠে, চলতে চলতে তার সমস্ত শরীর যেন অজ্ঞাতেই দুলতে থাকে গ্রামের পথে, পথের ধুলোকে একটু জোর করে মাড়িয়ে যেতেও তার আনন্দ হয়। ঠিক যে দ্যামাক তা নয়, কতকটা গ্রাম্য বালিকাসুলভ গৌরববোধ। আম আর লিচু চুরি করে খাইয়ে ছেলেমেয়েদের পোষ মানিয়েছে বনবালা, সে এখন সকলের 'দিদি'। তার কথাতে সকলে ওঠে-বসে। গ্রীষ্মকালে বিকেলবেলা সকলকে ডেকে বনবালা বলে : 'চল, হেলতে যাই নদীতে'। ক্ষীণস্রোতা পাগলা নদীর ধারে সকলে জমা হয়। মহানন্দার একটা শাখা, গ্রামের ভিতর দিয়ে বেঁকে-চুরে গিয়েছে, গতির কোনো ঠিক নেই! বর্ষার সময় প্রায় একমাইল জমির উপর দিয়ে গ্রামের কোলে জল আসে, এপার থেকে ওপারের ক্ষীণ রেখা ভিন্ন কিছুই দেখা যায় না। গ্রীষ্মকালে সব শুকিয়ে যায়— সামান্য একটা সরু ফালির মতো জলস্রোত খুশিমতো হেলেদুলে বইতে থাকে। লোকে বলে 'পাগলা'।
পাগলার খরস্রোতে বালি কেটে পাড় ধরতে থাকে। তাই নিয়ে কিছুক্ষণ হুটোপাটি চলে। একখণ্ড চিড়-খাওয়া মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে বনবালা হাত মেলে, ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালির উপর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীর বুকে, স্রোতের মুখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে মড়ার মতো ভাসতে ভাসতে চলে যায় অনেক দূর। দূরে গিয়ে ডাক দেয় সঙ্গীদের। তারপর চলে নদীর মধ্যে হাত-পা ছোড়া। কারও পেটের তলায় হাত দিয়ে তুলে ধরে জলের উপর উপুড় করে ফেলে বনবালা বলে, 'হাত দিয়ে পানি টান, গোড় দিয়ে ঠ্যাল।'
সন্ধ্যা হয়। গ্রামের রাখালরা গোরুর পাল নিয়ে ঘরে ফেরে। শিস দেয়, গান গায় মেঠো সুরে। ঘাড় হেঁট করে কৃষাণরা ফেরে বলদ নিয়ে, কাঁধে হাল। বনবালা ফেরে একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে।
স্বভাব দেখে বোঝবার উপায় নেই বনবালার বয়স তেরো। চাষার মেয়ে, রং কালো, চোখ গোল গোল। সৌন্দর্যের মধ্যে মাথায় একরাশ চুল আর সবল, সুঠাম দেহ, পাগলা নদীর পাড়ের মতো যেন থাকে-থাকে কাটা। সুডৌল লম্বা-লম্বা হাত দুলিয়ে, চুলগুলো কাঁধের উপর গেট দিয়ে ফেলে, সোজা বনবালা ভিজে কাপড়ে আগে চলে, পিছনে চলে ছেলেমেয়ের দল।
দেহের সুস্পষ্ট কোণ ও রেখাগুলো দেখে মনে হয় বনবালা কোনো ধাতু দিয়ে ছাঁচে গড়া। তাই পিঠ, বুক, কোমর, হাঁটুর সূক্ষ্ম ভাঁজগুলোও এত স্পষ্ট।
আশপাশ থেকে কিশোর মাহিন্দাররা শিস দেয়, মাথল দিয়ে মুখ ঢেকে। 'সর্দারণী' বলে ডাকতে থাকে : রুক্ষভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ ভেঙচে জিভ দেখিয়ে বনবালা আবার পথ চলতে থাকে।
কিশোরী ঠাকুর দান-দক্ষিণার থলে কাঁধে করে দূর গ্রাম থেকে হাটে ফিরছিলেন, একহাতে একটা ছিন্নমস্তক পাঁঠা। বনবালাকে দেখে কাঁধ থেকে থলেটা নামিয়ে বললেন: 'কি গো সর্দারণী, গোছল হলো? পাঁঠাটা নিয়ে চল না হাট পর্যন্ত, খেয়ে ফিরবি। আঁধারে ফিরতে তোর তো ডর নেই—'
বনবালার ইসারাতে ছেলেমেয়ের দল কিশোরী ঠাকুরকে ঘিরে চেঁচাতে লাগল : চুটকি মে বিসমিল্লা, হা আল্লা, হা আল্লা। ঠাকুর একবার বলির পাঁঠা, একবার প্রসাদের থলে সামলাতে সামলাতে 'ধ্যেৎ, ধ্যেৎ' করতে লাগলেন। বনবালার ডাকে ছেলেমেয়েরা দৌড় দিল।
দ্রুত লাফাতে লাফাতে চলেছে বনবালা। সমস্ত দেহ ঝাঁকুনি লেগে দুলে দুলে উঠছে। মাংস তো না দেহে, যেন জলের ঢেউ, তার উপর ঝড় লেগেছে।
কিশোরী ঠাকুরের দৃষ্টি শরের মতো বিদ্ধ হয়ে রইল ছুটন্ত বনবালার দেহের উপর, পা রইল মাটিতে আবদ্ধ। অন্ধকারে বনবালা অন্তর্ধান করল। ঠাকুরের ছিন্নমস্তক পাঁঠা অজান্তে খসে পড়ল মাটিতে।
নিশুতি রাত। অটল চৌকিদার এখনও হাঁক দিয়ে যায়নি।
জোরে একবার হই করে উঠে 'এ রাজু ভাই' বলে অটল সুর টানে। গ্রামের নাপিত রাজু। নাম ধরে ডাক দিতে দিতে গ্রামের পথ দিয়ে অটল চৌকিদার হেঁটে চলে যায়। আজ এখনও সে হাঁক দিয়ে যায়নি। অটল হাঁক দিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত দুলালের শান্তি নেই। খাটিয়াতে শুয়ে ছটফট করে। চৌকিদারের হাঁকে রোজ সাড়া দিতে হবে, দারোগার হুকুম। সাড়া না পেলে তার পরদিন থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে বেত মারবে। তাই একবার উঠছে, একবার বসছে দুলাল। দূর থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে, দুলাল ভাবছে অটলের হাঁক।
অটল হাঁক দিল 'এ দুলা'। দুলাল উত্তর দিয়ে তাকিয়ে রইল বেড়ার ফাঁক দিয়ে। দেখল নীল রঙের একটা কোট গায়ে দিয়ে হেঁটে চলেছে অটল, এক হাতে লাঠি, আর এক হাতে লণ্ঠন। হন হন করে সাহেবের কুঠির বাঁক পেরিয়ে গেল, তারপর দূর থেকে ভেসে-আসা অটলের হাঁক শুনে দুলাল বুঝল অটল গোরুর হাট পর্যন্ত পৌঁছেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে হাট পেরিয়ে, থানতলার পাশ দিয়ে, আম বাগানের ভিতর দিয়ে তাঁতিপাড়ায় পৌঁছবে।
চুপিসারে দুলাল ঢুকল হেঁশেল ঘরে। হাঁড়ি ঝুলছে বেড়ার গায়ে। ভাঙা সরাখানা তুলে উঁকি মারতেই ভিতর থেকে ছোট্ট একটা ইঁদুরের বাচ্চা ছুটে পালাল। পাশ ফিরে দেখল ভাঙা বেড়ার তলায় ঢ্যাঙা কুকুরটার চোখ জ্বলছে।
বাইরে এসে ছোট্ট উঠোনের মধ্যে দাঁড়াল দুলাল। পিঁড়ের উপর বুড়ো তারিণী ঘুমুচ্ছে। কঙ্কালসার বুকখানা উঠছে-নামছে শ্বাসপ্রশ্বাসে। দলাপাকানো পেশির উপর শিথিল চামড়া ভেদ করেও ঠেলে উঠেছে হাতের শিরাগুলো। একটা হাত মাটিতে, আর একটা মাথার পাশ দিয়ে গিয়ে জড়িয়ে রয়েছ বনবালার চুলের সঙ্গে। বনবালা ঘুমুচ্ছে। আলগোছা চুল ঝুলছে ছেঁচে পর্যন্ত। মোটা লাল কাচের চুড়ি পরা সুগোল দুখানা হাত, একখানা কোলের উপর, আর একখানা পিছনে বুড়ো বাপের হাড়সার বুকের উপর পড়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের তালে ওঠানামা করছে।
কোমরে থলেটা জড়িয়ে দুলাল বেরিয়ে পড়ল চৌধুরীদের আম বাগানের দিকে।
মালদহ জেলা। আমের জন্যে খ্যাত। আমের ঋতুতে গ্রামের চাষিরা কাঁচাপাকা আম-কাঁঠাল খেয়েই জীবনধারণ করে। চৌধুরীদের আমবাগান দৈর্ঘ্যে প্রায় এক মাইল। বাগানের ভিতর দিয়ে পথ, সারি সারি আমগাছ— দাদভোগ, কিষণভোগ, খিরসাপাত, গোপালভোগ, ফজলি। অন্ধকার পথ। মাঝে মাঝে বাঁশের মাচা তৈরি করা আছে বাগানের পাহারাদারদের জন্যে। প্রায় পঞ্চাশ গজ অন্তর এক-একটা গাছের মাথায় লণ্ঠন, তার পাশে ডালের সঙ্গে টিন বাঁধা, টিনের দড়ি মাচার সঙ্গে লাগানো। মাচায় শুয়ে পাহারাদাররা রাতে দড়ি টেনে টিন বাজিয়ে বাদুড় তাড়ায়।
হঠাৎ টিনের শব্দ হতে দুলাল চমকে উঠল। গুঁড়ি মেরে বসল গাছের পাশে। শব্দ থামতে অন্ধকারে ডাল বেয়ে গাছে চড়ল। শুকনো ডালের মটমট ভাঙার শব্দে পাহারাদার গলা খাকরি দেয়, দুলাল চুপটি করে ডালের ডগায় বসে থাকে, নড়ে না। তারপর আবার ওঠে, হাত দিয়ে আমের বোঁটা ধরে খসিয়ে থলিতে রাখে। এক ডাল থেকে আর এক ডালে ঝুঁকতে গিয়ে থলির আম মাটিতে পড়ে যায়। এক সঙ্গে আম পড়ার শব্দ শুনে পাহারাদার লণ্ঠন হাতে করে উঠে এসে গাছতলায় দাঁড়িয়ে হাঁক দেয়, 'গাছে কে?' অন্ধকারে কিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। কাঁপতে কাঁপতে দুলাল মাটিতে পড়ে বুকে পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বলে, 'হামি জী!'
দুলালের বুদ্ধি আশৈশব এইরকমই। দুলাল চোর, কিন্তু চুরি করবার কারসাজি জানে না। চুরি করে। ধরা পড়ে। মার খায়। স্বীকারও করে। কোনো কিছুতেই ভয় নেই। হাজত ঘর বাড়ি, আর মারের জন্য পিঠ বাড়িয়েই আছে। সুর করে কাঁদতেও দেরি হয় না। তার পরক্ষণেই হাসিও তার মুখে বেমানান নয়।
বেধড়ক পিটুনি খেয়ে গোটা দুই আম পেল দুলাল। তাই নিয়ে ঘরে ফিরল। পরদিন আবার চলল মিয়াদের বড়ো বাগানে। দুলালের এই নৈশ অভিযান বন্ধ থাকে শুধু তার কারাবাসের সময়। আমের সময় আম, তা না হলে ধান, গম, কলাই, মুগ যা পাবে রোজ কিছু কিছু দুলালের ঘরে আনতেই হবে। বৃদ্ধ তারিণী বহুবার তাকে ঘাড়-ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু দুলাল যেমন ঘর ছাড়েনি, তেমনি স্বভাবও ছাড়েনি।
ছোটো বোন বনবালার কিন্তু এই নিরেট দাদাটির ওপর অগাধ স্নেহ। সে মাঝে মাঝে তাকে চুরি করা ছেড়ে হাল চষার বুদ্ধি দেয়। খেতমজুর হলে একটা পেটের খোরাক তো মিলবে! দুলাল দিনের বেলা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়, কিন্তু রাতে তার আর হদিশ পাওয়া যায় না।
দুলালকে তাই সকলে বলে 'চোর'। তাতে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। দুদিন আগে হয়তো সে রাতে চৌধুরীবাড়ির গোলা থেকে ধান চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে মার খেয়েছে, তৃতীয়দিন সকাল চৌধুরীবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে চৌধুরী গিন্নিকে ডেকে বলে : 'দিদি, কাল রেতে কিছু খাইনি দুটো লাহারী দাও।' কোঁচড় ভরতি করে দুলাল মুড়ি নিয়ে ফিরে আসে।
বৃদ্ধ চাষির ছোটো পরিবারের কাহিনি এইখানেই শেষ হল। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। 'চোর ও সর্দারণী'।
গ্রামটির বিবরণ তেমন কিছু জাঁকাল নয়। নাম হরিশ্চন্দ্রপুর। বলাই চৌধুরীর বাড়ি গ্রামের ঠিক মধ্যে। বাইরে কাছারি বাড়ি, তারপর অন্দরমহল। খিড়কির দরজার সঙ্গে লাগানো একটা ছোটো আমবাগান। বাগানের পাশে ঘোড়ার আস্তাবল, ভেড়া ও গোরুর গোয়ালঘর। পাশ দিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পথ। চারিদিকে সব মুসলমান চাষাদের ঘর, প্রায় গোটা পঞ্চাশ ষাট হবে। পশ্চিমদিকে সাহেবের বাংলো, অনেকখানি জায়গা জুড়ে আম ও ফুলের বাগান। বাংলো বছরে একমাস ছাড়া সবসময়ই খালি থাকে। তারপর গরুর হাট পার হয়ে গ্রামের হাট। হাটের মাঝখানে লম্বা টিনের চালা, দুপাশে একতলা ছোটো ছোটো পাকা বাড়ি। একঘর ব্রাহ্মণ ভিন্ন বাকি সব ময়রা, বেনে, তাঁতিদের দোকান ও বাসঘর। হাটের শেষ প্রান্তে পশ্চিমদিকে যাত্রা ক্লাব, সামনে বিরাট একটা ঝুরিনামা বটগাছ, গ্রামের দেবতার আস্তানা, নাম থানতলা। বটের ঝুরিতে ইট বাঁধা, গ্রামের মেয়েদের, হিন্দু-মুসলমান সকলেরই পুত্র কামনার অনাড়ম্বর প্রতীক। বটের গুঁড়িতে বহুদিনের সঞ্চিত তেল-সিঁদুরের পুরু প্রলেপের মধ্যে গ্রামের দেবতা বাঁশরি ঠাকুর বিরাজ করছেন।
জেলার বড়ো বড়ো রাজা জমিদারদের জমিদারি তত্ত্বাবধানের ভার নয়নপুর জমিদারি কোম্পানি লিমিটেডের ওপর। পদ্মার ওপারে মুর্শিদাবাদ জেলায় ম্যানেজারের অফিস। কোনো কোনো জায়গায় ছোটো ছোটো কেন্দ্র আছে, সেখানে বাংলো আছে। বছরে ম্যানেজার সাহেব একবার যান খাজনা আদায়ের সময়। থাকেন এক সপ্তাহের বেশি নয়। তার মধ্যে তিনদিন যায় 'সেলামি' আর 'নজর' নিতে। সাহেব ও আমলাদের আহারও জোগাতে হয় গ্রামের চাষাদের। স্থানীয় পত্তনিদার বা গাঁথিদার একবার শুধু মোটা 'নজর' পৌঁছে দিয়েই খালাস। বাকি প্রত্যেকদিন মুরগি, পাঁঠা, মাছ, দুধ, দই সব সেরা সেরা খাবার বাছাই করে হাজির করতে হয় চাষাদের।
সাহেব আসার আগে বিরাট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় গ্রামে। বাংলো রং করা, স্প্রিং-এর খাট, গদি, অন্যান্য আসবাবপত্র ঝাড়পোছ, টানা পাখার ঝুলঝাড়া, দড়ি টাঙানো, সব ব্যস্তভাবে চলতে থাকে। বৃদ্ধ মালিরা খুরপা নিয়ে দিনরাত ঘাস নিড়োতে থাকে, ফুলগাছে জল ঢালে। বিশ্রাম নেই। সাহেব আসবে, খোঁড়া সাহেব, মেম নেই, মেজাজ খারাপ।
বলাই চৌধুরীর অবর্তমানে প্রৌঢ়া চৌধুরী গিন্নি এখন জমিদারি তদারক করেন। বহুদিনের পুরাতন নায়েব ও দফাদার আজও জীবিত, পরামর্শদাতা তারাই। এমনি চৌধুরী গিন্নি খুব বুদ্ধিমতী, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে নিয়ে বিধবা হয়েও তিনি গ্রাম ছেড়ে শহরে যান নি। জমিদারি দেখেছেন, রক্ষা করেছেন, ছেলেদের শহরে শিক্ষা দিয়েছেন, মেয়েদের জাঁক করে বিয়েও দিয়েছেন। একরকম প্রতিবেশীহীন অবস্থায় মুসলমান প্রজা পরিবেষ্টিত হয়ে থেকেও তিনি হিন্দু বলে ভয় পাননি। প্রজাদের তিনি প্রায় সকলকেই চেনেন। সকলেরই তিনি 'চাচি', এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় থানতলার বাঁশরি ঠাকুরের বেদিতে গোরুর হাড় পড়লেও, গ্রামের হাটের দোকান লুট হলেও, অসহায় রাজবংশীদের ওপর জুলুম হলেও, চৌধুরীবাড়ির চতুঃসীমানার মধ্যে একটা ঢিলও পড়ে নি।
কানাই চৌধুরী তিনবার বি এ ফেল করে গ্রামে জমিদারি দেখছে আজকাল। বড় ভাই নিমাই চৌধুরী উকিল, কলকাতায় থাকে। মাঝে মাঝে গ্রামে ফেরে স্টেশন থেকে সেলাম পাবার লোভে, আর কাছারি ঘরে বসে চাষাদের জুতোপেটা করে বকেয়া খাজনা আদায় করার পুলক উপভোগের জন্যে। সেই কয়েকদিনের নিমাই চৌধুরীর উগ্রমূর্তি কোম্পানির খোঁড়া ম্যানেজার সাহেবকেও হার মানায়। চৌধুরী গিন্নি আজকাল কিছুই বলেন না, চাষারা এসে নালিশ করলে বলেন 'এখন বাছা, ছেলেরা বড় হয়েছে, ওদের আমি কি কথা বলতে পারি?' ছেলেদের জন্যে তিনি গর্ব অনুভব করেন, ভাবেন দেশের ওপর তাদের টান আছে, কর্তার জমিদারি রক্ষা হলেও হতে পারে।
চৌধুরীবাড়ি কাজ করে বনবালা। কাজ তার সকাল-সন্ধ্যায় গোরু দোয়া, গোয়ালঘর পরিষ্কার করা আর গোরুদের খেতে দেওয়া। সকালে চৌধুরীবাড়ি কারও ঘুম ভাঙবার আগেই তার কাজ শেষ হয়ে যায়। দুপুরে মাঠে বুড়ো বাপের খাবার বয়ে নিয়ে যায়, সন্ধ্যার আগে ফিরে আসে ঘাসের বোঝা মাথায় করে, পিছনে আসে বৃদ্ধ তারিণী লাঙল কাঁধে নিয়ে। বনবালার 'দহরমা' (মাইনা) থেকে তাদের তিন বিঘে জমির বাৎসরিক খাজনার চার ভাগের এক ভাগ কাটা যায়, নগদ মেলে শুধু একখানা কাপড় আর গামছা, আর কোনো কোনো দিন চাল নুন ধার, এই পর্যন্ত।
বনবালার বয়স এখন পনেরো। কালো সবল দেহের ভাঁজগুলো স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ হয়েছে। দেহের ভার বেড়েছে। চলার মধ্যে পাঁচবছর আগেকার চাঞ্চল্য না থাকলেও কিসের এক অদ্ভুত সাবলীলতা সে অনুভব করে। গ্রামের মোড়ল খোসবর মিয়া 'বোহিন' বলে ডেকে আজকাল বেশিক্ষণ কথা বলতে চায়, হাটের মাঝখানেও বিনোদ তাঁতি একখানা করে শাড়ি 'পয়সা যবে হোক দিয়ে যাস' বলে তার হাতে গুঁজে দিতে দ্বিধা বোধ করে না, সত্যনারায়ণ ও লক্ষ্মী পুজোর প্রসাদ নেবার জন্যে কিশোরীঠাকুর তাকে প্রায়ই রাতে হাটে আসতে বলে, যাত্রাক্লাবের মাস্টার থানতলার হঠাৎ কোনোদিন দেখা হলেও বলতে ভোলে না, 'শহরে গেলে তোকে থিয়েটারে নিয়ে নেবে বনো, দহরমা পাবি', ধীরু ময়রা বাসি খাবারের ঠোঙা তার হাতেই ডেকে তুলে দিয়ে বলে 'পয়সা লাগবে না', বৃদ্ধ মালি ঝড়ু মিয়াও দাড়িতে হাত দিয়ে বিদ্রুপ করে বলে, 'হামাকে নিকা করবি সর্দারণী'—
চারিদিক থেকে করুণা ও বিদ্রুপের তীক্ষ্ন বাণে বিদ্ধ হয়ে বনবালা অস্বস্তি বোধ করে। দারিদ্র দেহ বেচতে হুকুম দেয়, বনবালা শিউরে ওঠে। অন্ধকারে পথ চলতে তার গা ছম ছম করে। একা মাঠের মধ্যে মানুষ দেখলে সে জড়সড় হয়ে যায়। এমন তার কখনো হয়নি।
পাগলা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তার মনে পড়ে দু-বছর আগেকার কথা। নদীর পাড়ে পিঁড়ির ওপর আছাড় দিয়ে বনবালা কাপড় কাচে, দূরে হাটের বাবুরা নেমে 'কেলি' আর 'হল্লা' করেন। ঢ্যাবা ঢ্যাবা আট দশ জোড়া চোখ বনবালার দেহের নিটোল ভারাক্রান্ত পেশির উপর নিবদ্ধ থাকে। শিকারের হরিণ যেন বনবালা। আড়চোখে ভ্রূ তুলে একবার চেয়ে দেখে, বুক থেকে কাপড় টেনে কোমরে জড়িয়ে আবার কাপড় কাচতে আরম্ভ করে। ডুব সাঁতার দিয়ে আধপোয়া প্যাঁড়ার বাজি রেখে ধীরু ময়রা বনবালার পা জড়িয়ে ধরে দাঁত বার করে হেসে ওঠে, দূরে থেকে হাসির ফোয়ারা ছোটে। গায়ে জল ছিটিয়ে গাল দিতে দিতে বনবালা কাপড়চোপড় নিয়ে পিড়ি মাথায় করে অন্য ঘাটের দিকে চলে যায়। পরদিন আর হাটের ঘাটমুখো হয় না।
পথচলা দায়। চারিদিকে সকলে যেন ওৎ পেতে বসে আছে। পথ চলতে শরীর টন টন করে, আর বনবালা ভাবে সেকি ময়রার দোকানের খাবার যে ছোঁ মারতে হবে— 'বেহুদ্দা সব'। তবু কেন যে শরীরের রক্ত এমন চঞ্চল হয়, হাঁটতে কেন যে গায়ে দোলা লাগে? ছন্দায়িত দেহে সোজা হেঁটে চলে বনবালা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গর্বিত আন্দোলনে মনে হয় সর্দারণীই তো! হাতে এখন তার একজোড়া মোটা রুপোর বালা। বালাদুটোর দিকে চেয়ে মনে পড়ে সেদিন রাতে কিশোরী ঠাকুরের কথা। হাট থেকে সে ফিরছিল ঠাকুরের বাড়ি থেকে প্রসাদ নিয়ে, সঙ্গে আসছিল কিশোরী ঠাকুর লণ্ঠন নিয়ে চৌধুরীদের বাড়ি। সাহেবের বাংলোর পাশে ছাতিমতলায় গাছ থেকে শুকনো একটা ঢ্যালা পড়তেই লণ্ঠন ফেলে কিশোরী ঠাকুর 'দুর্গা' নাম জপতে জপতে জাপটে ধরেছিল বনবালাকে। ভূতের ভয়ে 'দুর্গা' নাম ভুলে গিয়ে ঠাকুর কেবল ফিস ফিস করে বলেন 'বনো, বনো'— অন্ধকারে শুধু ফিস ফিস শব্দ হয়। বনবালা ঝাপটা দিয়ে বলে, 'লক করে থাক ঠাকুর'। ঠাকুর শুধু ফিস ফিস করে আর কাঁপে। ঠাকুরের ভূত বনবালার দেহের ওপর ভর করতে চায়। হাতের বালা ঘুরিয়ে বনবালা ঠাকুরের কপালে সজোরে একটা ঘা মারতেই, ঠাকুর 'উঃ' শব্দ করে এক-হাত কপালে দিয়ে আর একহাতে লণ্ঠন কুড়িয়ে নিয়ে হাটের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ফিরতে থাকে। বনবালা হাতের বালার দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবে, এতেই হবে, একটা কিশোরী ঠাকুর, একটা ধীরু-ময়রা, এতেই হবে।
তাঁতিপাড়ার পথে বিনোদ তাঁতি বনবালাকে একখানা গামছা দিয়ে একঘণ্টা ধরে ভাঙা নীলকুঠির পাশে দাঁড়িয়ে শহরের গল্প শুনিয়ে দেয়। অর্ধোদয় যোগে সে শহর দেখে ফিরেছে, খরচাও করেছে প্রায় চার কুড়ি টাকা। বিজলী বাতি, দোতলা মটরগাড়ি, হোটেল, থিয়েটার আর হরেকরকমের মানুষের বাস— বিনোদ তাঁতি চক্ষু বিস্ফারিত করে বলে যায়, বনবালা শোনে। শুধু তাই নয়, বড়ো বড়ো লোহালক্কড়ের, পাটের, কাপড়ের কলকারখানা— এক ঘণ্টার কত জিনিস তৈরি হচ্ছে— হাল চষে বা ঘরে হাতে যা দু-বছরেও হবে না।
তাজ্জব দেশ— বনবালা ভাবে। কালো কালো ভ্রূজোড়ার তলা দিয়ে চোখের নিবিড় কালো মণিদুটো পোড়ো নীলকুঠির গায়ে বট অশ্বত্থের ভিতর দিয়ে দূরে নীল আকাশের কোলে কোনো এক অজানা মানুষের স্বপ্নের দেশ খুঁজে বেড়ায়।—
যাত্রাক্লাবের মাস্টার থানতলায় তাকে রোজই একবার শুনিয়ে দেয়— 'শহরে তোকে থিয়েটারের দলে নিয়ে নেবে, বনো— মোটা মাইনে পাবি'—
ছোট বাবু রোজসন্ধ্যায় আমবাগানে পায়চারি করতে করতে শিস দেন, তারপর এগিয়ে আসেন গোয়ালঘরের দিকে। দুলতে দুলতে বলেন বনবালাকে সম্বোধন করে,'শহর দেখেছিস বনো, কলকাতা? শহর না দেখলে তো মায়ের গর্ভেই আছিস রে!' বনবালা ঘাড় নেড়ে জানায় যে সে মায়ের গর্ভেই আছে। মুখ তুলে চায় না। কানাই চৌধুরী একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গোরু-দোহনরতা বনবালার আন্দোলিত হাত পিঠের দিকে চেয়ে বলেন : 'দুলালকে হাল চষতে বলিস না কেন? চুরি করে কদ্দিন চলবে? বুড়ো বাপকে এমন করে খাটাতে তোদের সরম হয় না রে?' ভ্রূ তুলে বনবালা একবার ছোট বাবুর দিকে আড়চোখে চায়। ছোট বাবু বলেন : 'এক কাজ কর বনো। হাঁস আর ছাগল পোষ। হাঁসের ডিম বেচবি, আর একটা খাসিরও দাম কম নয়। দেখবি, তোদের দিন ফিরে যাবে— জমি কিনবি, ঘর তুলবি।'— গোরুর পায়ের দড়ি খুলে দিয়ে দুধের কেঁড়ে নিয়ে ভিতরে চলে যায় বনবালা।
এমনি রোজ নানারকম কথা শোনে বনবালা। ঘরে অন্ন নেই। মাঠে ফসল ফলে না। যা ফলে তা বাবুদের খামার থেকে বাবুদেরই গোলাতে ওঠে। তিনটে পেট— দুই ভাই বোন, বুড়ো বাপ— তার ওপর হাঁস আর পাঁঠা। এমন 'দিললাগি' না করলেই নয়!
ছোটোবাবুও অন্য কথা ছেড়ে আজকাল বলেন, 'বালা পরিস কেন? ছেঁড়াকাপড় পরিস কেন?' বেড়ার পাশে গিয়ে হাতে কটা টাকা গুঁজে দিয়ে বলেন, 'কাউকে বলিস না, সরু সরু চুড়ি গড়াবি, নোতুন কাপড় কিনবি হাট থেকে।'— টাকা ছুঁড়ে ফেলে দেয় না বনবালা, হাতে মোটা বালার দিকে চেয়ে চেয়ে ঘাড় নিচু করে থাকে। চোখে জল আসে। ভয় হয়। বুক দুরু দুরু করে। সাহস হয় না বালা দিয়ে কপালে ঘা মারতে। ছোটোবাবু ভালো লোক, বেহুদ্দা নয়। ভূতের ভয় নেই।
অন্ধকার গোয়াল ঘরে ঘাড়ে যদি ভূত চাপে? 'বনো, বনো'— ফিস ফিস শব্দ হয়? বড়লোকের কি ভয় আছে? ভয়ে যদি জাপটে ধরে? ফিস ফিস ফিস। গোয়ালঘরে ধুনো দিতে দিতে বনবালা বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাগানের দিকে চেয়ে দেখে ছোটোবাবু শিস দিতে দিতে এগিয়ে আসছে। আড়ষ্ট হয়ে গোয়ালঘরে সে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে।
'বন—বালা'— অন্ধকারে ফিস ফিস শব্দ। 'ব-নো'— সেই ফিস ফিস। মশার কামড়ে গোরু খুব ঠুকছে। অন্ধকারে গরুর চোনা আর ধুনোর গন্ধ গোয়ালে, আর ফিস ফিস শব্দ। ফিস ফিস ফিস—
রাতে পিঁড়েতে উপুড় হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে বনবালা। পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে বৃদ্ধ তারিণী নানা কথা জিজ্ঞাসা করে, বনবালা জবাব দেয় না, ফুঁপিয়ে ওঠে। হেঁসো হাতে করে দুলাল তেরিয়া হয়ে জিজ্ঞাসা করে কেউ বেহুদ্দাপনা করেছে কি না, তা হলে সে হেঁসো দিয়ে তার পেট ফাঁসিয়ে আজ রাতেই মুণ্ডু নিয়ে আসবে হাঁড়িতে করে। বনবালা জবাব দেয় না। ভাঙা চালাঘরের পিঁড়েতে শুয়ে শুয়ে কাঁদে। আলুথালু চুল আর চোখের জলে ফোলা-ফোলা মুখের দিকে চেয়ে বুড়ো তারিণীর চোখেও জল আসে।
বনবালা বলেছে কাজ সে করবে না চৌধুরীবাড়ি, গাঁয়ে থাকবে না, দুলালকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা শহরে যাবে। দুলাল বলেছে 'ডর কি বোন! শালার গাঁয়ে থাকলে চুরি করে হাজত যেতে হবে। শহরে কল চালিয়ে গাঁয়ে জমি কিনব, ঘর তুলব, খেতে মজুর লাগিয়ে চাষ করব— তবে ফিরব। 'চোর' দুলাল 'নবাব' হবার স্বপ্ন দেখে। বনবালা ভাবে কলে কাজ না জুটলে যাত্রার মাস্টার বলেছে থিয়েটার আছে।
তারিণীর মাত্র তিন বিঘে ভুঁই। তাও ভাগচাষের বন্দোবস্ত। যা ফসল ফলে চৌধুরীদের খামারে তুলে দিয়ে আসতে হয়। ঘরে যা আসে তাতে তাদের একবেলারও খোরাক হয় না। তবু বীজ ধান আর কলাই আনতে তারিণী রোজ ধন্না দেয় চৌধুরীবাড়িতে, নায়েবের পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে।
বনবালা বুড়ো বাপের বুকে হাত বুলোতে বুলোতে কত বোঝায়— কি হবে তিন বিঘে ভুঁই— বুড়ো বয়সে হালচাষ করে— গাঁ ছেড়ে শহরে গিয়ে তারা দুই ভাইবোন কলের মজুর হবে আর সে শুয়ে শুয়ে খাবে। বুড়ো বাপ কিন্তু বোঝে না, শহরে কিসের কাজ, কেন যাবে, কিসের কল, বনবালাকে কে খোঁজ দিয়েছে, কিছুই জানে না। বার বার বলে, 'দেশের ভিটে ছেড়ে মেলেচ্ছ শহরে কেন যাবি বেটি! বুড়ো বাপ, দেশের ভুঁই— ভুঁই ছাড়তে নেই, ভগবানের কীরে, ভুঁই ছেড়ে যাসনি বেটি!'
ভগবান? ভুঁই? ভিটে?
যে ভগবান মানুষের দুঃখে কাঁদে না তার শক্তিকে বনবালা ভয় করে, কিন্তু তাকে ভালোবাসে না। যে ভিটেতে সাহেবের লোকে বছরে দুবার করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, সে ভিটের ওপর তার মায়া নেই। যে ভুঁই তাদের পেট ভরাতে পারে না, সে ভুঁই ভুঁই না শ্মশান!
তারিণী বুড়োর ছোট্ট পরিবারে ভাঙন ধরল। ভুঁই রইল, ভাঙা কুঁড়ে রইল, ভাঙল শুধু বুড়ো তারিণীর মাটির স্বপ্ন-সৌধ— মাটির মায়াপুরী—
চৌধুরীদের গোয়ালঘরের দিকে বনবালা একবার ভয়ে ভয়ে চেয়ে দেখল অন্ধকার, ভিতরে এখনও ফিসফিস শব্দ হচ্ছে। রাঙীর বাছুরটা ডাকছে।
হাটের পথ— খোসবর মিয়া ডাকে 'বোহিন', ঝাড়ুমালি বলে 'সর্দারণী'। ওই কিশোরী ঠাকুরের ঘরে আলো জ্বলছে, ভোর রাতে পুজো করছে ঠাকুর। সেই স্নানের ঘাট। মনে পড়ে গাঁয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে 'হেলার' কথা। থানতলা, যাত্রাক্লাব— 'শহরে গেলে তোকে থিয়েটারে নিয়ে নেবে বনো'। চৌধুরীদের আমবাগান— দুলালের মনে পড়ে আম চুরি। ধানের খেত সারি সারি, জহর মিয়ার আল পার হয়ে, গফুর মিয়ার আল পার হয়ে তাদের সেই তিনবিঘে জমি, ধু ধু করছে। বনবালার বুক ফেটে চোখে জল আসে। ঝরঝর করে গাল বেয়ে জল পড়ে, খেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে বিহ্বল হয়ে।
চারিদিকে ধু ধু করছে মাঠ। শেষ রাত্রির ঝিরঝিরে হাওয়ায় বনবালার চুল উড়ছে। মনে পড়ছে বুড়ো বাপের কথা— দেশের ভুঁই, ভগবানের কীরে—
লালাপাড়ার সুদখোর লালারা ঘুমুচ্ছে। সুদের আমেজ এক প্রহর বেলায় কাটে। মিয়াপাড়ার মুরগি ডাকছে। তেঘরিয়ার বাজার— মহানন্দা নদী— খেয়াঘাট— ওপারে নবাবগঞ্জ স্টেশন।
হামার বেটিকে দেখেছ জি? ভোরবেলা গ্রামের পথে পথে লাঙল কাঁধে চাষাদের কাছে বৃদ্ধ তারিণী জিজ্ঞাসা করে। রাতে বনবালার অন্তর্ধানের কথা শুনে সকলে বলে, 'বদমাশ বেটি, পালালছে।' বেলা হতে কিশোরী ঠাকুর হাটময় ছোটলোকের কুৎসার কীর্তি প্রচার করেন। সকলে বলে, চাষার স্বভাবই ওই—
শ্লথ পা ফেলে মাঠের দিকে যেতে যেতে তারিণী বুড়ো বলে : বেইমান! বেইমান কুণ্ঠেকার! বুড়ো বাপ, সরম নেই, বেইমান!' তিন বিঘে ভুঁইয়ের আলের উপর বসে অবসন্ন শিথিল দেহ ভাঙা লাঙলের ওপর ভর দিয়ে বুড়ো তারিণী ডুকরে কেঁদে ওঠে— 'বেইমান বেটি'— আকাশের দিকে চেয়ে হাত তুলে কাঁপতে কাঁপতে অভিশাপ দেয়: 'ভগবান। কলঙ্কিনী বেইমান বেটি গাঁয়ে না ফেরে, মড়কে মরুক— মরুক—'
ডাকাত— ডাকাত—
ছুটন্ত ট্রেনের কামরায় বসে দুলাল ভাবছে সে আর ধান চুরি করবে না। শহরে কাজ না পেলে সে ডাকাতি করবে— টাকা, পয়সা, সোনা, হীরে। চলন্ত ট্রেনের চাকার শব্দ হচ্ছে 'ডাকাত— ডাকাত—'
বনবালার চোখে জল। ট্রেনের কামরায় শহরের হট্টগোল— কলের গোঙানি— আর বাইরে ধাবমান গাছপালার মধ্যে—
হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রাম— চৌধুরীবাড়ি— সাহেবের বাংলো— গোয়ালঘর— ছাতিমতলা— হাট— কিশোরী ঠাকুর— ছোটবাবু— খেতের মধ্যে সেই তিনবিঘে ভুঁইয়ের প্রান্তে লাঙ্গল কাঁধে বুড়ো বাপ তারিণী— সবকিছু—
—নীলাকাশ ও খররৌদ্রের পটভূমিতে চলন্ত ট্রেনে বনবালার চোখের সামনে দুফোঁটা অশ্রুর ভিতর দিয়ে ভেসে ওঠে সিলুয়েট ছবির মতো— কালো কালো অস্পষ্ট রেখাচিত্র— দিগন্তে ক্রমবিলীয়মান—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন