বিনয় ঘোষ
'জীবন' কী?
মানুষ যন্ত্র, আবার মানুষ ব্যক্তিও।
প্রশ্ন হতে পার কতটা ব্যক্তি, কতটা যন্ত্র?
উত্তর খুব সহজ না হলেও খুব জটিল নয়। কারণ ব্যক্তির ও জাতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, প্রায় সবক্ষেত্রেই যান্ত্রিকতা (mechanism) থেকে ব্যক্তিত্বের (individuality) দিকে তার প্রগতি।
একটা গাছের ব্যক্তিত্ব অনেক কম, কারণ তাকে খণ্ড খণ্ড করে মাটিতে পুঁতে দিলেও আবার গাছ গজিয়ে ওঠে। তেমনি নিম্নতম শ্রেণির জীবের মধ্যেও দেখা যায় ব্যক্তিত্ব তাদের অনেক কম। একরকমের সামুদ্রিক জীব (Sea anemones) ও চ্যাপটা কৃমি জাতীয় পোকা (flatworm) আছে যাদের খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেললেও প্রত্যেকটি অংশ জীবিত থাকে। উচ্চশ্রেণির জীবদের এভাবে খণ্ডিত করলে তারা মরে যায়। যেমন একটা ব্যাঙ দুভাগে কেটে ফেললে দুটোই মরে যাবে, কিন্তু সেই ব্যাঙের ডিম যদি প্রথমাবস্থায় দুভাগে কেটে ফেলা হয় তা হলে দুটি ছোটো ছোটো ব্যাঙাচি জন্মাবে, মরবে না। তেমনি মানুষের ভ্রূণও (human embryo) যদি প্রথমাবস্থায় দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় তা হলে একইরকমের 'যমজ' সন্তান জন্মায় এবং বেঁচেও থাকে।
তা হলেই দেখা যাচ্ছে যে, জীবজগতের নিম্নতম শ্রেণির মধ্যে অথবা উচ্চশ্রেণির নিম্নতম অবস্থায় ব্যক্তিত্বের চাইতে যান্ত্রিকতাই হচ্ছে বেশি। কিন্তু জীবজগতের উচ্চশ্রেণির মধ্যে যান্ত্রিকতার চাইতে ব্যক্তিত্বই বেশি অর্থাৎ যান্ত্রিকতা থেকে ব্যক্তিত্ব, পূর্ণতর ব্যক্তিত্বের দিকেই জীবজগতের ক্রমবিকাশ। জীবনের যাত্রা পূর্ণতর ব্যক্তিত্বের পথেই।
জীবজগতের উচ্চতর শ্রেণির মধ্যে দেখা যায় জীবন দুটি স্তরে সংগঠিত। অণুবীক্ষণ দিয়ে জন্তু বা গাছপালা দেখলে দেখা যায় যে অসংখ্য চৌকো চৌকো বাক্স ইটের মতো সাজানো আছে। মানুষ বা জীবের দেহের মধ্যে এই যে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা ছোটো ছোটো কুঠুরি এরই নাম 'সেল' (cell)। এর খানিকটা জেলির মতো হড়হড়ে, যার নাম প্রোটোপ্ল্যাজম (protoplasm)। এরই মধ্যে আবার অণুবীক্ষণ দিয়ে দেখলে দেখা যায় স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলীয় অংশ রয়েছে যার নাম সাইটোপ্ল্যাজম (cytoplasm); তারই মধ্যে রয়েছে বিন্দুর মতো কোষকেন্দ্র (nucleus); তার পাশে আরও ছোটো তারার মতো বিন্দু সেনট্রোসোম (centrosome); কোষকেন্দ্রের মধ্যে ধূলিকণার মতো বা পাকানো দড়ির মতো কতকগুলি ছোটো ছোটো ক্রোমোসোম (chromosome); আর এসবের বাইরে রয়েছে খোলস বা প্রাচীর যার নাম সেল-ওয়াল (cell-wall)। সেল সাধারণত এত ছোটো যে তাদের ২৫০০ পর পর একলাইনে সাজালে তবে এক ইঞ্চি জায়গা লাগে। অথচ এইটুকু জায়গার মধ্যেও তাদের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার সব ব্যবস্থাই আছে। একটা বড় প্রাণী বা মানুষের মধ্যে কোটি কোটি করে সেল স্বাধীনভাবে বেঁচে আছে এবং সুশৃঙ্খলভাবে পরস্পর সহযোগিতা করে মানুষকে সজীব রেখেছে। এই স্বাধীনতা, শৃঙ্খলা ও সহযোগিতার কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। মনে হয়, গোটা পৃথিবীটা ছোটো ছোটো সোবিয়েতে বিভক্ত হলে সে সংযুক্ত সোভিয়েট মহারাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসংঘ গড়ে উঠবে তাকে পরিচালনা করাও সহজ, কিন্তু জীবন যে কোটি কোটি সেল দিয়ে গড়া তারা কেমন করে তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে এমন সুশৃঙ্খলভাবে সহযোগিতা করতে পারে যাতে জীবনের বৃদ্ধি ও প্রসার সম্ভব হয়!
প্রত্যেকটি সেলের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং কোটি কোটি সেলের সুশৃঙ্খল পারস্পরিক সহযোগিতা— এই হল জীবনের গোড়ার কথা।
ডিম, স্পার্মাটোজা, পরাগ (pollen), প্রত্যেকটি হল এক-একটি সেল। প্রজনন জীবধর্ম। এই জীবধর্মের বশেই স্ত্রী-পুরুষ মিলন হয়। মিলিত হয় কে? পুরুষের জননকোষ স্ত্রীর ডিম্বাকোষের সঙ্গে মিলিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর ডিম্বাকোষটি অ্যামিবার সেলের মতো বাড়তে থাকে। এইভাবে সৃষ্টি হয় নূতন একটি প্রাণী, নূতন একটি জীবন।
এ তো গেল জীব-বৈজ্ঞানিকের কথা। এবার রাসায়নিকের দু-একটা কথা শোনা যাক। কারণ জীবনের অনেকখানি রসায়ন।
জীবন্ত প্রাণী মাত্রেই নড়েচড়ে বেড়ায়। জীবন হচ্ছে গতি (motion)। এই গতি কখন অতিদ্রুত, কখন অতি মন্থর। পাখিও ওড়ে, আবার গাছও বাড়তে থাকে। এই নড়াচড়ার শক্তি জোগায় কে! বাইরের প্রাকৃতিক উপাদান কেমন করে জোগায়?
প্রত্যেক বস্তু অণুসমষ্টি। জীবমাত্রেরই অপঘটন (katabolism) ও উদঘটনের ক্ষমতা আছে। শরীরের মধ্যে অনবরত এই অপঘটন ও উদঘটন চলতে থাকে। যার সাহায্যে গড়ার কাজ চলে তাকে বলে উদঘটন (anabolism), আর যার সাহায্যে ভাঙা বা ক্ষয়েরকাজ চলে তাকে বলে অপঘটন (katabolism)। আমাদের শরীরের রক্তের মধ্যে গ্লুকোজ (Glucose) বলে একরকমের চিনি আছে, তার রাসায়নিক গঠন হচ্ছে C6H12O6— অর্থাৎ গ্লুকোজের একটি অণুর মধ্যে আছে ৬ ভাগ কার্বন ১২ ভাগ হাইড্রোজেন ও ৬ ভাগ অক্সিজেন। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে হাওয়া থেকে অক্সিজেন নিচ্ছি, সেই অক্সিজেন রক্তের ভিতরে যাচ্ছে। অক্সিজেনের কাজ হচ্ছে যে কোনো পদার্থের সঙ্গে মিশে তাকে ভাঙাগড়া। গ্লুকোজের ৬ ভাগ কার্বনকে অক্সিজেন ভেঙে নিয়ে কার্বনডাইঅক্সাইড (Co2) গ্যাস তৈরি করে। বাকি যা থাকে তা থেকে কয়েকটি জলের অণু তৈরি হয়। চিনির প্রত্যেক অণুকে এইভাবে ভাঙাগড়ার মধ্যে অনেকখানি শক্তি সঞ্চার হয়।
উদঘটন দুরকমের আছে। যেমন একরকমের উদ্ভিদ আছে যা মাটি থেকে শিকড় দিয়ে জল ও নাইট্রেট টেনে নেয় ও পাতা দিয়ে বাইরের হাওয়া থেকে নেয় কার্বনডাইঅক্সাইড, তারপর সূর্যের আলোর সাহায্যে তাকে ভেঙে চিনি ও অন্যান্য শক্তিসঞ্চারক পদার্থে পরিণত করে। আবার আরেকরকমের প্রাণী ও উদ্ভিদ আছে যারা সূর্যের তাপের সাহায্য না নিয়েই এই উদঘটনের কাজ করে। জন্তুরা সাধারণত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট প্রভৃতি কতকগুলি জৈব পদার্থ অক্সিজেন দিয়ে ভেঙে বা দহন (oxidise) করে শক্তি সঞ্চয় করে। আর উদ্ভিদরা খনিজ পদার্থ নিয়ে তাকে প্রথমত জৈব পদার্থে পরিণত করে, তারপর করে ভাঙাচোরা। অর্থাৎ কয়লা পুড়িয়ে (oxidising coal) বাষ্পীয় শক্তি সঞ্চয় করে যেমন স্টিম-ইঞ্জিন চলে, তেমনি খাদ্য পদার্থ অক্সিডাইজ করে তার থেকে শক্তি সঞ্চয় ও ব্যয় করে জন্তুরা বেঁচে থাকে। যে সব জীব বা উদ্ভিদ অক্সিজেন ব্যবহার করে বেঁচে থাকে তাদের বলে বায়ুজীবী বা aerobes, এবং যারা অক্সিজেন ব্যবহার করে না তাদের বলে অবায়ুজীবী বা anaerobes. এই শেষোক্ত অবায়ুজীবীর দলের মধ্যে পড়ে অধিকাংশ ব্যাধি ও অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধের ব্যাকটিরিয়া (bacteria)। ঈস্ট (yeast) যদি প্রচুর অক্সিজেন পায় তাহলে চিনি তৈরি করতে পারে, কিন্তু অক্সিজেন না পেলে ঈস্ট অ্যালকোহল (alcohol) ও কার্বনডাইঅক্সাইডে ভেঙে যায়।
তা হলে রাসায়নিকের দৃষ্টিতে জীবনকে কি দেখতে পাচ্ছি? প্রত্যেক জীবন্ত পদার্থই একটা বিশেষ ধরনের রাসায়নিক যৌগিক (a particular pattern of chemical compounds) এবং প্রত্যেক জীব বা জীবন হচ্ছে একটা বিশেষ ধরনের রাসায়নিক রূপান্তর (a particular pattern of chemical change)।
সবচেয়ে সরল রাসায়নিক রূপান্তরের দৃষ্টান্ত আমরা জানি অগ্নিশিখা (flame) । একটা মোমবাতির শিখার আকার প্রায় একইরকম থাকে। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে এর বিভিন্ন অংশে নানারকমের পরিবর্তন ও রূপান্তর হচ্ছে। এই শিখার সঙ্গে জীবনের মূলগত সাদৃশ্য আছে। কিন্তু শিখার রূপান্তর সরল, জীবনের রূপান্তর অনেক জটিল। একটা হুইসলের শব্দের সঙ্গে কোনো গ্র্যান্ড অপেরা বা সিমফনির শব্দবিরোধ, সমন্বয় ও স্বর-সংগতির পার্থক্য যতখানি, জীবনের সঙ্গে শিখার বিরামহীন রূপান্তরের পার্থক্যও ঠিক ততখানি।
একটা কথা আছে— উপমা দুর্বল যুক্তি। তা হলেও শিখার সঙ্গে জীবনের তুলনা যুক্তি হিসাবে সবল। কারণ শিখাকে যন্ত্রের মতো পৃথক পৃথক অংশে ভাগ করে বিচার করা যায় না, অথবা থামিয়ে বা নিভিয়ে দিয়ে আবার উস্কানো যায় না। পরিবর্তন ও রূপান্তরই শিখার অন্তর্নিহিত ধর্ম, জীবনেরও ধর্ম। তাই জীবন শুধু পরিবর্তন বা রূপান্তর নয়, অভিযোজনও (adaptation) বটে।
শুধু রাসায়নিক নয়, বৈদ্যুতিক পরিবর্তনও ঘটছে অহরহ আমাদের দেহের মধ্যে নার্ভগুলিতে। একগোছা ইলেকট্রিক কেবলের মধ্যে যেমন অনেক তার গোছা বাঁধা থাকে, মেরুদণ্ডের ভিতর তেমনি নার্ভসেলের মোটা গোছা আছে। পেটের কাছ থেকে বেরিয়ে এই নার্ভের গোছা মাথার মগজের মধ্যে চলে গিয়েছে। দেহের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সীমান্ত থেকে বার্তা বহন করে টেলিফোনের তারের তা নার্ভগুলো চলে গিয়েছে মগজের ভিতরে। মগজটা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, এবং সেখানে অপারেটাররাও আছে। তারা আবার যোগাযোগ ঘটিয়ে দিচ্ছে নার্ভের মারফত পেশির সঙ্গে। কিন্তু এটা শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়া নয়, রাসায়নিক প্রক্রিয়াও। যেমন : আমি হাত নাড়তে আরম্ভ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে হাতের পেশিগুলোতে নানারকম রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু হল। পেশিগুলো অক্সিজেন ব্যবহার করতে লাগল। যদি তখন বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহ করে এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ার তাগিদ মেটানো না হয় তা হলে অঘটন ঘটতে পারে, অর্থাৎ হাত অসাড় হয়ে যেতে পারে। তা যাতে না হয় সেইজন্যে তখন হাতে রক্ত সঞ্চালন বেশি করে আরম্ভ হল। হৃদযন্ত্রের স্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস একটু দ্রুত তালে বাড়ল। শুধু অক্সিজেন নয়, রক্ত থেকে পেশিগুলো চিনিও নিল। এই চিনি এল যকৃতের (liver) সঞ্চিত স্টক থেকে। এই যে সব এত কাণ্ড হল এ সবই কিন্তু মগজের তত্ত্বাবধানে।
এবারে দেখা যাক জীবনের অপূর্ণতা কী আছে, কারণ প্রতিবেশের সঙ্গে জীবনের অভিযোজন সবসময় সম্পূর্ণ নয়। দেহের এমন অনেক অঙ্গ (organ) আছে যাদের আজকাল কোনো কাজ নেই, একরকম বেকার বলা চলে। যেমন উদ্ভিদের মধ্যে ড্যান্ডেলিয়ন (dandelion)। ড্যান্ডেলিয়নের পরাগ হয়। অধিকাংশ উদ্ভিদের পরাগ-ডিম্বককে (ovule) উর্বর (fertilise) করে, যার ফলে বীজ হয়। ড্যান্ডেলিয়নের পূর্ব পুরুষদের পরাগ নিশ্চয়ই এই প্রজননের কাজে লাগত, কিন্তু এখন ড্যান্ডেলিয়ন যৌন-প্রজননক্রিয়া পরিত্যাগ করেছে। তাই তার পরাগ নষ্ট হয়ে যায়।
মানুষেরও এইরকম অনেক অঙ্গ আছে যা আজকাল আর কোনো কাজে বিশেষ লাগে না। যেমন পায়ের নখ। পায়ের নখের কোনো কাজ নেই, বরং সভ্য সমাজে অকাজ করার আছে অনেক কিছু। এ-ছাড়া ক্ষুদ্রান্ত্র (small intestine) ও বৃহদন্ত্রের (large intestine) সন্ধিস্থলে অ্যাপেন্ডিক্স (appendix) নামে একটি ছোট্ট আঙুলের মতো অংশ তার গা থেকে ঝুলে থাকে। বৈজ্ঞানিকেরা আজও এই অ্যাপেন্ডিক্সের কাজ কি জানেন না। অ্যাপেন্ডিক্স ফুলে উঠে মানুষের প্রাণ নিয়ে টানাটানি করে বলে ডাক্তাররা একে কেটে বাদও দেন।
এইরকম অনেক জন্তুর অনেক অঙ্গ আছে যাদের একদিন হয়তো কোনো-না-কোনো কাজ ছিল, কিন্তু আজ তারা বেকার। বেকার মাত্রই বিপজ্জনক, সুতরাং তাদের এমনি অলসভাবে থাকাটাও নিরাপদ নয়।
দেহের কোনো কোনো অঙ্গ যেমন আজ অকেজো তেমনি অনেক রাসায়নিক প্রক্রিয়াও আছে যার আজ কোনো বিশেষ কাজ নেই। তা ছাড়া, জীবনের অভিযোজনও (adaptation) অসম্পূর্ণ। যেমন চোখের বিভিন্ন অংশ ঠিক পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে সব সময় খাপ খাওয়াতে পারে না বলেই নকলচক্ষু বা চশমার প্রয়োজন হয়। অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যে অভিযোজন হয় তাও সাময়িক, চিরস্থায়ী নয়। তা না হলে গাছপালাই বা শুকিয়ে যাবে কেন, আর আমরাই বা বৃদ্ধ হব কেন এবং মরব কেন?
জীবনের এই অপূর্ণতা ব্যষ্টির দিক থেকে অনিষ্টকর, কিন্তু সমষ্টি বা সমগ্র জীবনের দিক থেকে একান্ত আবশ্যক। কারণ তা না হলে ক্রমবিবর্তনই সম্ভব হত না। এ সত্য প্রথম ডারউইন উদঘাটিত করেছিলেন।
বিজ্ঞানীদের মতে ক্রমবিবর্তনের প্রধানত তিনটি শর্ত আছে। প্রথমত, কোনো জাত কখন তার পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে পুরোপুরি অভিযোজিত হবে না, মোটামুটি আদর্শ অভিযোজিতের কাছাকাছি থাকবে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির বিনাশ প্রয়োজন প্রকৃতির নূতন পরীক্ষার জন্যে। তৃতীয়ত, ব্যক্তির অতি উৎপাদন অর্থাৎ লোকসংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন, কারণ তা না হলে যারা অপদার্থ তাদের প্রাকৃতিক নির্বাচনে (natural selection) উচ্ছেদ হবে না। এই শর্তের প্রত্যেকটি ঊর্ধ্বপথযাত্রী জাতির বা জীবশ্রেণির পক্ষে কল্যাণকর।
ক্রমবিবর্তনের ফলে প্রত্যেক জীবজন্তু ও উদ্ভিদ একএকটি মূর্তিমান ইতিহাস বিশেষ। একটা দেশ বা জাতির ইতিহাসের চাইতেও এ-ইতিহাস অনেক, অনেক বেশি সুদীর্ঘ। অতীতের অনেক স্বাক্ষর ও অবশেষ আজও প্রত্যেক জীবের মধ্যে রয়েছে যার কোনো ব্যবহার বা প্রয়োজনীয়তা নেই, আবার অনেক ধীর পরিবর্তনের (variations) ও আকস্মিক পরিবর্তনের (mutation) সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে যা এখনও পরীক্ষাসাপেক্ষ। পরীক্ষায় যা উত্তীর্ণ হলেও হতে পারে। তবে না-হবার সম্ভাবনাই বেশি। পৃথিবীর অন্যতম জীব-বৈজ্ঞানিক হ্যালডেনের ভাষায়, ‘It is at once an anachronism and an experiment’.
তাহলে শেষ পর্যন্ত জীবন কী? এ প্রশ্নের উত্তর কোথায়? গদাইয়ের উত্তরই প্রায় ঠিক দেখা যাচ্ছে। 'জীবন' বাস্তবিকই 'দিল্লিকা লাড্ডু'। গদাই ও কার্ল মার্কসের জীবন-দর্শন প্রায় একই। কথাটা শুনতে খারাপ, কিন্তু ভাবতে ভালো।
জীবন কী?
জীবন কতকগুলি বিরোধের বান্ডিল।
যান্ত্রিকতা ও ব্যক্তিত্ব, উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যহীনতা, স্থির ও শান্তিময় পূর্ণতা এবং অস্থির ও সংগ্রামশীল পরিবর্তনশীলতা ও অপূর্ণতার মাঝমাঝি কিছু একটা হচ্ছে জীবন।
অবিরাম পরিবর্তনশীলতা জীবনের ধর্ম, কিন্তু এর প্রত্যেকটি প্রকাশ অভিব্যক্তি ঐতিহাসিক, সুনির্দিষ্ট, খোদিত।
মৃত্যু ও বিনাশের বিরুদ্ধে সংগ্রামই জীবন, কিন্তু মৃত্যুই এর প্রগতির পাথেয়।
শান্তির মধ্যে অশান্তি, জড়তার মধ্যে জঙ্গমতা, অনৈক্যের মধ্যে ঐক্য ও সংগতি, বিরোধ ও বন্ধুরতার মধ্যে প্রগতি— এই হল জীবন।
সবার উপরে জীবন সর্বজয়ী জীবন। মৃত্যু স্বীকার করেও মৃত্যুঞ্জয়ী, জড়তা স্বীকার করেও জঙ্গম, বিরোধ আলিঙ্গন করেও বৈপ্লবিক অগ্রগতি— এই হল জীবন।
নিষ্কৃতি নেই জীবনের কবল থেকে। কার্ল মার্কস বলেছেন, আর গদাই বলেছে :
'জীবন কী? দিল্লীকা লাড্ডু'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন