বিনয় ঘোষ
সাহিত্যের শুভাকাঙ্ক্ষী আমরা সকলেই। আমাদের জাতীয় সাহিত্যের ক্রমোৎকর্ষের কথা আমরা সকলেই চিন্তা করি। বাংলাদেশের আজ সাহিত্যিকের সংখ্যা কম নয়, সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সংখ্যাও প্রায় সাহিত্যিকদের সমান। কোনো গোষ্ঠীর আদর্শ বা উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য না করেও একথা নিশ্চয়ই নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, সকল গোষ্ঠীরই উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের সেবা করা এবং বাংলা সাহিত্যকে ভারতীয় সাহিত্যের দরবারে সসম্মানে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। শুধু ভারতীয় সাহিত্যের আসরে কেন, বিশ্বসাহিত্য সভায় আজ বাংলা সাহিত্যের স্থান প্রায় নির্দিষ্ট। আদর্শ ও উদ্দেশ্য-নির্বিশেষে আমরা সকলেই বাংলা সাহিত্যের পূজারি। কিন্তু আফশোস হয় তখন যখন দেখি আমরা এই মহৎ উদ্দেশ্য বিসর্জন দিয়ে পারস্পরিক দলাদলিতে আত্মনিয়োগ করেছি এবং আত্মবিনাশের নিম্নগামী পথ সুগম করতে সকলেই প্রায় আস্তিন গুঁটিয়ে কোদাল ধরেছি।
কোদাল ধরা উচিত ছিল আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির ডাস্টবিনে বহুদিনের স্তূপীকৃত আবর্জনা সাফ করার জন্যে। তা না করে আমরা করেছি কি? অজীর্ণ বিদ্যার কোদাল দিয়ে এদেশ-ওদেশের চতুর্দিকের পুঞ্জীভূত আবর্জনা সযত্নে তুলে এনে ভরতি করেছি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির আবর্জনাকুণ্ডে। ঊনবিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক জাগৃতির (Renaissance) যুগে বাংলাদেশে রামমোহন, মাইকেল, দীনবন্ধু, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ যে-কাজ করেছিলেন সে-কাজে আমরা অগ্রসর হইনি কেউ। তাঁরা সে-যুগের ইউরোপীয় সংস্কৃতির শাঁসটুকু আত্মসাৎ করে আমাদের মুহ্যমান জাতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অপজাত (degenerate) অংশকে নির্মমভাবে বাতিল করতেও কুণ্ঠিত হননি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে প্রথম সমরোত্তর কাল থেকে আজ পর্যন্ত আমরা যা করেছি তার অধিকাংশই অপকর্ম অর্থাৎ ও-দেশের জরাগ্রস্ত স্থবির সাহিত্য ও সংস্কৃতির উচ্ছিষ্ট তুলে এনে জড়ো করেছি এ-দেশে। সমন্বয় ও প্রগতির চেকনাই বুলি আওড়ে ভেজাল দিয়েছি দেশীয় সংস্কৃতিতে ঝানু ব্যবসাদারের মতো। একদিকে সিগমুণ্ড ফ্রয়েড ও উদারপন্থী রাসেল, আরেকদিকে ব্যাধিত (morbid) লরেন্স-হাক্সলি, পাউন্ড প্রুস্তের সভ্যতার ও যৌনমুক্তির অতিকথা (myth)— এই ছিল আমাদের সম্বল। বিশ্ব-সংস্কৃতির মহাসভা থেকে সেদিন আমরা মণি-মুক্তা আহরণ করতে পারিনি, চেয়ে দেখিনি বিপ্লবমথিত, যুদ্ধপীড়িত ইউরোপের ফ্রাঁস, বার্বুসে, রোলাঁ, ৎসুইগ, ফয়েখৎভাঙ্গর, টলার, ব্রেখৎ প্রমুখ শিল্পীদের দিকে, চেয়ে দেখিনি বিপ্লবের রুধিরস্নাত রুশিয়ার নব-সংস্কৃতির বাহক গোর্কির দিকে। আমাদের অবদমিত আত্মা সেদিন গোগ্রাসে গিলেছে বিলেতের জরিষ্ণু সাহিত্য, আর প্রগতির জাগরস্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা তাই ঢেকুর তুলে উগরে দিয়েছি দেশবাসীর কাছে। হায় রে প্রগতি! সম্প্রতি সেই মারাত্মক ভুল শোধরাবার মনোভাব প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে সাহিত্যক্ষেত্রে একশ্রেণির নবাগতদের মধ্যে। সশ্রম প্রচেষ্টা চলেছে বিশ্বসংস্কৃতির প্রাণবন্ত আলোকধারার সঙ্গে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয় সাধনের। তাই বলছি, নবাগতরা যেন এক মুহূর্তও ভুলে না যান যে, তাঁরা দুর্গম পথের যাত্রী, তাঁদের সামনে কালসাপের বিষাক্ত ফণা, শ্রাবণরাত্রির বজ্রনাদ।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে যাঁরা বাংলাদেশে যুগান্তর এনেছিলেন সংস্কৃতিক্ষেত্রে, তাঁরা ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পণ্ডিত ছিলেন না, জাতীয় সংস্কৃতির ধারার সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা ছিল। বিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে আমরা জাতীয় সংস্কৃতির বংশধর না হয়ে তার সঙ্গে সম্বন্ধ পাতালাম সইয়ের-ননদের-বোনপো-বউয়ের-বকুলফুলের-বোনঝি জামাইয়ের। ফলে 'সত্য-শিব' গড়তে আমরা গড়লাম 'মিথ্যা' ও 'বাঁদর'। এ-ভুল যেন নবাগতরা আর না করেন। প্রগতিশীল সংস্কৃতিই হোক আর গণসংস্কৃতিই হোক, কোনো সংস্কৃতিই দেশের মাটিতে শিকড় গাড়তে পারে না যদি-না দেশীয় সংস্কৃতির সঞ্জীবনী স্রোতধারায় তা পরিপুষ্ট হয়। আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অতীত ইতিহাস আমাদের জানতে হবে, তার সুদীর্ঘ ক্রমবিকাশের প্রতিটি বাঁকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় নিবিড় করতে হবে। তার ভাববিকাশ (evolution of content) ও রূপবিকাশের (evolution of form) সঙ্গে আমাদের নাড়ির সম্বন্ধ থাকবে, তবেই আমরা সংস্কৃতির মহা-জাগৃতির পথে অগ্রসর হতে পারব, পা কাঁপবে না, মনও দুলবে না।
আমাদের দেশের কোনো সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান বা সাহিত্যিক সশ্রদ্ধভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার নেননি। মৌলিকতা জাহির করার দিকেই সকলের আগ্রহ বেশি, কারণ একদিন ভোরে উঠে হঠাৎ বাহবা তাতেই পাওয়া যায়। এই মহৎ কাজকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছে বাংলাদেশে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানই— 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ'। সাহিত্য পরিষৎ প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই অবশ্য দীনেশচন্দ্র সেন এই বিরাট কর্তব্য পালনে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাংলা সাহিত্যের বংশ-পরিচয় ও জীবনেতিহাস তিনি লিখে গিয়েছেন। সাহিত্যক্ষেত্রের প্রথম হালচাষি তিনি, তাই তাঁর তথ্য-সঞ্চয়ের ত্রুটি থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তাঁর ঋণ বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের সাহিত্যিক কোনোদিন শুধতে পারবে না। তারপরেই নাম করতে হয় ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাসের। ব্রজেন্দ্রবাবুর 'সংবাদপত্রে সেকালের কথা'র প্রতিটি খণ্ড এক-একটি তথ্যের স্তম্ভ। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির সমাজ, সাহিত্য, শিক্ষা, ধর্ম, আচার, ব্যবহার, রীতিনীতি সম্বন্ধে খাঁটি ইতিহাস জানতে হলে 'সংবাদপত্রে সেকালের কথা' অপরিহার্য ও অবশ্যপাঠ্য। ব্রজেন্দ্রবাবু একনিষ্ঠ গবেষক, নিদারুণ শ্রমসাপেক্ষ তথ্যসংগ্রহের মধ্যেই তাঁর অসাধারণ তথ্যনিষ্ঠার জ্বলন্ত স্বাক্ষর রয়েছে। বাংলা গদ্যের ইতিহাস সম্বন্ধে গবেষণায় সজনীবাবুর দানও অনস্বীকার্য। ব্রজেন্দ্রবাবুর সম্পাদনায় কালীপ্রসন্ন সিংহ, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামনারায়ণ তর্করত্ন, রামরাম বসু, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ বাংলা গদ্য ও বাংলা সাহিত্যের সাধকদের চরিতমালা যেমন একদিকে বাংলার সংস্কৃতির অতীত ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়ের পথ সুগম করেছে, তেমনি সজনীকান্ত দাস ও ব্রজেন্দ্রবাবুর যুগ্ম সম্পাদনায় বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, দীনবন্ধু, ভারতচন্দ্র প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন কর্ণধারদের রচনাবলি নির্ভুলভাবে প্রকাশ করে ও প্রকাশ করার ভার নিয়ে বাংলার ভবিষ্যৎ সাহিত্যিক কর্মীদের সংস্কৃতির ইতিহাস অধ্যয়ন ও আলোচনার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে 'বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ'।
জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির শ্রীবৃদ্ধি সাধনের জন্যে তার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তার জন্যে সবদেশেই আছে 'ন্যাশনাল একাডেমি অফ লিটারেচার' বা 'কালচার'। 'বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ' ভিন্ন অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আজ বাংলাদেশে অনুরূপ কাজের ভার নিয়েছে কি-না আমার জানা নেই। একদিন বাংলাদেশে 'বটতলা'র প্রকাশকেরা অজানতে এই মহত কাজ করেছিলেন, তা না হলে বাংলাদেশের কত পুঁথি, কত গ্রন্থ নষ্ট হত, কত সাহিত্যিক ও কবি বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন হয়ে যেতেন। আজ 'সাহিত্য-পরিষৎ' সেই কাজ আরও সুষ্ঠুভাবে করছে যোগ্যতর ব্যক্তিদের সহযোগিতায়। এর মূল্য কম নয়। জানি এবং মানি সাহিত্য-পরিষদের ইতিহাস-প্রণয়নের ত্রুটি আছে এবং সে-ত্রুটি হচ্ছে অবৈজ্ঞানিক আলোচনার ত্রুটি। কিন্তু প্রত্যক্ষ তথ্যনিষ্ঠা যদি বৈজ্ঞানিকের প্রথম কর্তব্য হয় তা হলে সে-কর্তব্য ব্রজেন্দ্রবাবু ও সজনীকান্ত দাস উভয়েই পালন করেছেন ও করছেন। কথা হচ্ছে, দৃষ্টিভঙ্গির। সমাজ-বিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের অভাব তাঁদের গ্রন্থের মধ্যে আছে, কিন্তু আগাগোড়া সমস্ত কাজই তাঁরা শুরু থেকে শেষ করবেন এমন শক্তির গর্ব নিশ্চয়ই তাঁরা করেন না। এমন আকাশের চাঁদ তাঁদের কাছ থেকে দাবি করারও কোনো যুক্তি নেই। আসল কথা, আজ আদর্শ সাহিত্যিক কর্মীর অভাব, একনিষ্ঠ সাধকের অভাব। 'চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য' হয়, এই অসত্য প্রমাণ করার জন্যে আমরা আজ সাহিত্যের পথে ভিড় ঠেলে গুঁতোগুঁতি করে চলেছি। কোথায়, জানিনে। কোথায় আজ সেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিসম্পন্ন সাহিত্যিক কর্মীরা যাঁরা সত্যিই সাহিত্য-পরিষদকে আদর্শ জাতীয় সংস্কৃতি-পরিষদে পরিণত করতে পারেন এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে পারেন? উপাদানের অভাব নেই, তথ্যের অভাব নেই, অভাব কর্মীর, অভাব সততার, অভাব নিষ্ঠার।
পরিশেষে, বাংলার তরুণ প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের একটি আবেদন জানিয়ে এই আলোচনার পূর্ণচ্ছেদ টানতে চাই। গোড়াতেই বলেছি, আবার বলছি, যে-কোনো সংস্কৃতিই হোক, বিপ্লবী সংস্কৃতিই হোক বা গণসংস্কৃতিই হোক, তার জন্যে সবার আগে প্রয়োজন, বিখ্যাত সোভিয়েট শিল্প-সমালোচক আরসেভের (Arosev) ভাষায় ‘critical assimilation of the art of past centuries.’ কথাটা আমি বিশেষভাবে বলতে চাইছি কম্যুনিস্ট শিল্পী ও সাহিত্যিকদের। লেনিন বলেছিলেন, ‘Without a clear understanding that only by an exact knowledge of the culture created by the entire evolution of man, that only by an analysis of it can a proletarian culture be created.’ জাতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। সাহিত্যক্ষেত্রে কিছুদিন আগে প্রগতির নামে যে যৌন-স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রাক্তন বরবাদের আন্দোলন চলেছিল তার কলঙ্কিত দায়িত্ব একশ্রেণির তথাকথিত সাহিত্য-প্রেমিক কম্যুনিস্টদের স্কন্ধেই চাপাতে চান। কম্যুনিস্ট ও সত্যিকারের প্রগতিশীল লেখকদের আজ প্রমাণ করতে হবে যে, এ-অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন অপবাদ এবং জাতীয় সংস্কৃতির মঙ্গলকামী সাধক যদি কেউ থাকে, তাহলে প্রগতিশীল ও কম্যুনিস্ট লেখকরাই আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন