ম্যামালের ও মানুষের প্রেম

বিনয় ঘোষ

বিবাহ প্রেম পরিবার সুনীতি— এককথায় নরনারীর জীবনের সম্বন্ধ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আগে বলেছি যে, স্বেচ্ছাচারিতা যেমন স্বাধীনতা নয়, অবাধগতি মাত্রই যেমন প্রগতি নয়, তেমনি যৌন-স্বাধীনতার অর্থও যৌন-উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। ফিউডাল যুগের অসূর্যম্পশ্যারা প্রাথমিক ক্যাপিটালিস্ট যুগে সূর্যের মুখ দেখল, ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের বাণী ধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও স্বাতন্ত্র্যের মন্ত্রে দীক্ষা নিল। কিন্তু এই বিদ্রোহটা প্রথমে চালিত হল পুরুষদের বিরুদ্ধে। পুরুষদের আধিপত্যের ঐতিহাসিক কারণ না সন্ধান করে নারীর বিদ্রোহ মূর্তি পেল পুরুষ-বিরোধী আন্দোলনে (anti-Man movement)। পুরুষদের হাবভাব, চালচলন, কাজকর্ম অনুকরণ করে সাম্যের জয়ডঙ্কা বাজানোই হল তার আদর্শ। তারপর ক্যাপিটালিস্ট সমাজব্যবস্থায় যখন চারিদিক থেকে ভাঁটা পড়তে আরম্ভ হল তখন আরও বিকট মূর্তি ধারণ করল এই 'যৌনসাম্য'। নারী ক্রমে পরিণত হল পণ্যে (commodity), এবং commodity fetishism-এর সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য সমাজে নরনারীর অবাধ মিলনের ও স্বাধীনতার অর্থ হল 'নারীকে ভোগের জন্যে ভোগ করা'। যেমন মুনাফার জন্যে আরও মুনাফা দরকার, তেমনি নারীকে ভোগের জন্যে তাকে স্বাধীনতা ও সাম্যের নামে আরও বেশি উচ্ছৃঙ্খলতা, আরও বেশি অবাধ-মিলনের সুযোগ দেওয়া দরকার। পশ্চিমের ক্যাপিটালিস্ট সমাজে যে স্ত্রী-স্বাধীনতা তার আসল রূপটা হল এই। প্রভুত্বের ও শোষণের যে-মন্ত্র, যে-ব্যবস্থা, তাকে কায়েম রেখে মানবজাতির এত বড় একটা অংশ 'নারী' কখনো সত্যিকার স্বাধীনতা পেতে পারে না, এ-কথাটা পশ্চিমের আধুনিকারা বোঝেনি। তাই আজ তাঁরা যতই স্কার্টের ছাঁট বদলে রাস্তায় ট্রট করুন না কেন, তাঁরা নিজেরাও মনে মনে বোঝেন এবং তাঁদের পুরুষবন্ধুরাও জানেন যে তাঁরা স্বাধীন নন। কথায় কথায় divorce করার ক্ষমতা পেলেই স্বাধীনতা পাওয়া হল না।

ও-দেশের মেয়েদের স্বাধীনতার বিচার করতে হয় আদালতে divorce-এর তালিকা দেখে। divorce-এর সংখ্যা যত বাড়বে বুঝতে হবে তত মেয়েরা স্বাধীন হচ্ছে। ঠিক তেমনি পারিবারিক বিশৃঙ্খলা যত চরমে পৌঁছবে, নীতিবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নামে দুর্নীতি ও কু-নীতি যত প্রশ্রয় পাবে তত বুঝতে হবে মেয়েরা সাম্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একে স্বাধীনতার আন্দোলন বলে না, বলে অরাজকতার হই-হল্লা, বলে ‘He-women’ আন্দোলন, যার অর্থ হল মানুষের পর্যায় থেকে মেয়েদের ক্রমে আরও ভোগের সামগ্রীর ও সম্পত্তির পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং দাসত্বের ডান্ডাবেড়ি আরও কড়া করে তাদের হাতে-পায়ে পরিয়ে দেওয়া।

নর-নারীর সম্পর্ক সভ্যতার একটা বড় মাপকাঠি। স্ত্রী-স্বাধীনতা আমাদের সভ্যতার আদর্শ। আমাদের সমাজ ও সভ্যতা ধীরে ধীরে সেই দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এগিয়ে যাবার সময় মেয়েদের সব সময় সচেতন থাকা উচিত তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্বন্ধে। নারীর মুক্তি-আন্দোলন কোন পথে চালিত হলে সত্যিকার মুক্তি আসবে সে সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে পথ ভুল হবার সম্ভাবনা এবং পদে পদে ব্যর্থতার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু আমার আলোচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছি আমি। কথাপ্রসঙ্গে অন্য কথা এসে যাচ্ছে। যাই হোক— কথা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যখন আমাদের সমাজ ও সভ্যতা আরও অনেক উন্নত হবে তখন কি পারিবারিক বন্ধন বলে কিছু থাকবে না? যৌন-স্বাধীনতা কি তখন অবাধ স্বেচ্ছাচারিতা ও ব্যভিচারের রূপ নেবে? নীতিবাদ না মানলেও সুনীতি বলে কি কোনো পদার্থ তখন থাকবে না? প্রশ্নগুলো আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে জটিল। কিন্তু সত্যই কি তাই? আদৌ তা নয়। সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাস সম্বন্ধে চলনসই জ্ঞান থাকলে এ-প্রশ্নের জবাব দেওয়া খুব সহজ বলেই মনে হয়। এসব প্রশ্নের জবাব হল, পারিবারিক বন্ধন থাকবে, কিন্তু সে-বন্ধন খাঁটি স্নেহ, ভালোবাসা, প্রেমের বন্ধন। যৌন-স্বাধীনতার চূড়ান্ত অর্থ হবে ‘monogamy’ বা এক-বিবাহ, আদালতে ‘divorce’-এর কোঠায় শূন্য নামবে উন্নততম সভ্য সমাজে। নীতিবাদের দাসত্ব ও গোঁড়ামি না থাকলেও সুনীতির স্বাভাবিক বাঁধুনি একশোবার থাকবে, কারণ ভবিষ্যতের সভ্য সমাজ নিশ্চয়ই জঙ্গল হবে না! কথাগুলো সোজাসুজি বলা হল, একটু তলিয়ে দেখা যাক, কারণ, ও-দেশের নামজাদা মনস্তত্ত্ববিদরা ধরে নিয়েছেন, পরিবার ও সুনীতি বলে আর কিছু থাকবে না। চোখের সামনে তাঁরা কেবল ‘ogre of sex’ দেখছেন। পারিপার্শ্বিক ব্যভিচার ও স্বৈরাচারে বিভ্রান্ত হয়ে তাঁরা দেখছেন পৃথিবীটা যেন একটা পাগলাগারদ অথবা শৌণ্ডিকালয়। সব ময়লা, সব আবর্জনা নিয়েও পৃথিবীটা বা সভ্যতা তো সত্যিই তা নয়। আসলে এই সব মনস্তত্ত্ববিদরা ‘hysteria’ দেখে তাকে ভুল করলেন ‘history’ বলে। কিন্তু 'হিস্ট্রি' তো হিস্টিরিয়া নয়। তবে হিস্ট্রি কী?

মানুষের দেহে অসংখ্য cell আছে, সেই সেল নিয়ে tissues, আবার তাই নিয়ে organs— তার উপর আছে brain, আর nerves হচ্ছে পাহারাওয়ালা। অ্যামিবার কিন্তু একটিমাত্র cell— সে তাই দিয়ে খায় দায়, সংসারধর্ম করে। এদিক থেকে অ্যামিবা হল সবচেয়ে স্বাধীন এবং উগ্র ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী। খেয়ে-দেয়ে ফুলেফেঁপে অ্যামিবার যখন প্রজননের (reproduction) সময় আসে তখন সে নিজে থেকেই দুভাগ হয়ে যায়। দুটো অ্যামিবা যখন জড়াজড়ি করে তখন দুটোকেই মনে হয় sexual organ— এবং তারপর তারা ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, আর মেলে না। অ্যামিবা থেকে সভ্য মানুষ হতে অনেক ধাপ, অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা পেরোতে হয়েছে নিশ্চয়ই। এই প্রগতির মধ্যে দুটো ধারা হচ্ছে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি হল জটিলতা অর্থাৎ দেখা গিয়েছে জীব-জগতের যতই বিকাশ হয়েছে ততই জীবন জটিলতর হয়েছে এবং সবচেয়ে জটিলতম জীবন বা জীব হচ্ছে মানুষ। আমরা যে পরিবার ও যৌন সম্বন্ধের কথা বলছিলাম তার বীজ দেখা গেল স্পঞ্জের মধ্যে, মৌমাছির মধ্যে, ব্যাঙের মধ্যে পাইথনের মধ্যে, পাখির মধ্যে। তারপর নানারকম ম্যামালের মধ্যে দেখা প্রধানত দুরকমের পারিবারিক সম্বন্ধ। একরকম হল বাঁদর (ape) এবং মানুষ, যাদের বলা হয় 'চির-প্রেমিক' (perennial lovers), আর একরকম হল অন্যান্য ম্যামালদের, যারা সাময়িক প্রেমিক (seasonal lovers)। আমরা জানি, পারিবারিক জীবনের ভিত্তি হল বাপমায়ের দায়িত্বজ্ঞান ও পারস্পরিক কর্তব্যবোধ। উপরোক্ত দুই শ্রেণির প্রেমিকের মধ্যে যারা সাময়িক প্রেমিক বা ‘seasonal lovers’ (জন্তু-জানোয়ারই বেশি) তাদের মধ্যে এই দায়িত্ববোধের ভয়ানক অভাব, নেই বললেই হয়। পিতৃত্বের দাবিকে বা দায়িত্বকে এই দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যামালরা একেবারেই স্বীকার করে না, মাতৃত্বের দায়িত্ব মায়েরা খুবই সামান্য স্বীকার করে। বিবাহ বা দাম্পত্য-জীবন বলে তাদের কোনো কিছুই নেই, উভয়ের মিলনের একমাত্র সম্বন্ধ হল সঙ্গমের সম্বন্ধ, সাময়িক যার উত্তেজনা অত্যন্ত উগ্রভাবে দেখা দেয়, আবার থিতিয়ে যায়। যৌনক্ষুধা না জাগলে কেউ কারও দিকে আকৃষ্ট হয় না। কিন্তু মানুষ হয়, তার কারণ মানুষ 'চির প্রেমিক', তার প্রেম অনন্ত চিরমধুর, সাময়িক নয়। 'কাম' কথার যে কদর্য অর্থ করা হয় সে অর্থ বাদ দিয়ে বলা যায় মানুষ 'চিরকামুক', এবং এই 'চিরকামুকতা'র (perennial eroticism) জন্যই মানুষের জীবনে অচ্ছেদ্য পারিবারিক সম্বন্ধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। একদল নীতিবাগীশ মানুষের এই ‘perennial eroticism’-এর বিরুদ্ধে নাকসিটকান, বিশেষ করে ভণ্ড ও গোঁড়া ব্রহ্মচর্যবাদীরা। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান : ‘...only among mates with a year-round sexual need for one another cloud the year-round partnership of the human family develop’.

এখন কথা হচ্ছে মানুষ যদি সমাজব্যবস্থার গুণে দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যামালের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন seasonal lovers হয়, তা হলে মানুষকে দোষ দেওয়া যায় না বা সমাজকে অভিশাপ দিয়েও লাভ নেই। বিষাক্ত সমাজব্যবস্থাকে বদলাতে হয় আগে, যে-ব্যবস্থায় পুরুষ নারীর সম্বন্ধ মানুষের সম্বন্ধ নয়, জানোয়ারের সম্বন্ধে পরিণত হয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%