ডাস্টবিন

বিনয় ঘোষ

কয়েকটি কুকুরের কর্কশ চিৎকারে সুরপতির ঘুম ভেঙে গেল। জানালার কাছে এসে সুরপতি চেয়ে দেখে নীচে রাস্তার ধারে ডাস্টবিনের পাশে উচ্ছিষ্ট পাতা নিয়ে এক পাল কুকুর কাড়াকাড়ি করছে। পাশের বাড়ির উৎসব-কোলাহল প্রায় নীরব হয়ে এসেছে। ডাস্টবিনের একটু দূরে জগা পাগলা কিছু খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে আপন মনে খাচ্ছে আর কুকুরগুলোর সঙ্গে অনর্গল কি আবোল-তাবোল বকছে। বকুনির বিরাম নেই।

'কালো! কালো! আয়, আয়—'

একটি কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে তার কাছে এসে নাকি সুরে কান্না শুরু করলে। 'চুপ কর, চুপ কর! কী হয়েছে'— গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে, 'বুড়ো হয়েছিস, কবে মরে যাবি—'

নাকি কান্না থামল।

আর একটি কুকুর বিকটভাবে ডাকতে লাগল বিনা কারণেই।

'চোপরাও পাজি— চোপ—'

জগা পাগলা কুকুরটিকে লক্ষ্য করে একটি মাটির গ্লাস ছুড়ে মারলে। সুরপতি উপর দিকে চেয়ে দেখল আকাশে তুলোর স্তূপের মতো সাদা সাদা খণ্ডমেঘ তীরবেগে দৃষ্টিসীমা পার হয়ে যাচ্ছে। সাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো, তারার ভিড়।

বিশ্বাসঘাতক!

সুরপতির গা ছম ছম করে ওঠে। সুব্রতার চিঠির কয়েকটি লাইন মনে পড়ে যায়।

'তুমি তো জানো আমার জীবনে দুঃখের শেষ নেই। কেন তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে, কেন?'

সুরপতি একবার চাইল আকাশের দিকে, একবার চাইল নীচে ডাস্টবিনের পাশে কুকুরগুলোর দিকে। জগা পাগলা তখনও খাচ্ছে। মনে পড়ে—

'মনে কর মাটির প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছ, তার জন্যে আবার দুঃখ কি?'

সুরপতির ঘরখানির এক কোণে একটি লম্বা টেবিলের উপর কতকগুলি শিশিতে নানারকম অ্যাসিড, কয়েকটি কাচের জার, বার্ণার, এবং আরও অনেকগুলি পরীক্ষা করবার যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জাম আছে। ঘরখানি ছোটোখাটো একটি ল্যাবরেটরি বললেও অত্যুক্তি হয় না। দিনের বেলা সে এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে থাকে, ঘরের ভিতর দুমদাম শব্দ, গ্যাস ও অ্যাসিডের ঝাঁঝাল গন্ধ। সুব্রতার গা ঘিন ঘিন করে, অস্বস্তি বোধ হয়। ঘরের আর একপাশে একটি পুরাতন বুককেসে খানকতক বই— দর্শন, বিজ্ঞান সবকিছুই আছে। সুরপতি হয় পড়ে, না হয় শিশি বোতল নিয়ে পরীক্ষা করে। কি যে করে আর কি যে হয় কাউকে জানায় না! জানাবার প্রয়োজন বোধ করে না।

জানালার ফাঁক দিয়ে শুক্লপক্ষের দ্বাদশীর চাঁদের কিরণ এসে ঘর আলোকিত করে দেয়। সুব্রতার ভালো লাগে না, বলে—

'ওই ছেঁড়া বইখানার মধ্যে কী রস পাও বলো তো?'

কুণ্ডলী পাকিয়ে একরাশ চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে সুরপতি সুব্রতার দিকে ফিরে হাসে; বলে—

'বোসো, বুঝিয়ে দিচ্ছি।'

'রক্ষা কর, আমার বুঝে দরকার নেই। তোমার থিসিস, অ্যান্টিথিসিস নিয়ে তুমিই থাকো—'

সুব্রতা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সুরপতি সেদিকে চেয়ে একটু হেসে আবার বইয়ে মনোনিবেশ করে।

ছোটো ছোটো স্মৃতির তরঙ্গ ধাক্কা দেয় মনে। মনে পড়ে চিঠির আরও কয়েকটি লাইন—

'রমেশবাবুকে সঙ্গে নিয়ে চললাম পশ্চিমের পথে। বাকি জীবন এঁর সঙ্গেই কাটিয়ে দেব।' মনে পড়ে—

'তোমার কাছে আমার মূল্য কতটুকু? ঝড়ে-উড়ে-আসা ছেঁড়া কাগজের টুকরো আমি—'

দিগন্ত রেখায় একটি তারা ধীরে ধীরে পাণ্ডুর হয়ে যাচ্ছে।

রামপ্রসাদী সুর ভাঁজতে ভাঁজতে চলেছে জগা পাগলা। অমন সে প্রত্যহই যায়। ভিক্ষার ঝুলিটি ঝুলছে কাঁধে, হাতে একখানি ভাঙা বেহালা, তারগুলি বাঁধা বেসুরে।

একদল মাড়োয়ারি গঙ্গাস্নান সেরে ফিরছে ভৈরবের স্তোত্র পাঠ করতে করতে। প্রত্যুষের স্তব্ধতায় মিলিত কণ্ঠের স্তোত্র-পাঠে শরীর শিউরে ওঠে।

দূর থেকে ধানকলের ভোঁ ভেসে আসে কানে। একতার নিষ্ঠুর আহ্বান।

কতকগুলি কাক বিশ্রীভাবে কলরব করে ওঠে।

মূল সুরটি ধরে পাশের বাড়িতে সানাই বেজে ওঠে। ভৈরবী রাগিণী। বাঁশির রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুর ফুলে ফুলে ফেনিয়ে ওঠে। ছোটো ছোটো সুরতরঙ্গের সৃষ্টি হয়। গত রাত্রির বাসর গেল ভেঙে।

একখণ্ড মেঘের আড়াল দিয়ে ভোরের সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। স্টিমারের সার্চলাইটের মতো।

মিউনিসিপ্যালিটির ময়লা-ফেলা গাড়িতে স্তূপীকৃত হল ডাস্টবিনের আবর্জনা। শীর্ণ, হাড়সার ঘোড়াটি পথের উপর খুর ঠুকতে ঠুকতে বেরিয়ে গেল। সুরপতি চেয়ে রইল সেদিকে।

অপরিসীম নিঃসঙ্গতা। যন্ত্রের একটানা ঘর্ঘরানির মতো স্ফূর্তিহীন, বৈচিত্র্যহীন জীবনের দিনগুলি কেটে যায়।

বড়ো পিতলের দাঁড়ে বসে কাকাতুয়াটি কথা কয় অস্পষ্ট, আধ-আধ। সুরপতি তার উত্তর দেয় মিষ্টি মিষ্টি! সুরপতির বর্তমান জীবনের একমাত্র সঙ্গী এই কাকাতুয়াটি। পাখিটিকে যত্ন করে খাওয়ায়, স্নান করায়, তার সঙ্গে নানারকম কথা বলে। অর্থহীন কথা। কাকাতুয়ার কিছুই হৃদয়ঙ্গম হয় না। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ঝুঁটি নেড়ে চেঁচিয়ে ওঠে—

'কিয়া—কিয়া—কা—কা—উ—ক—ক—কিয়া—'

সুরপতি খুব জোরে দাঁড়টি দুলিয়ে দিয়ে হতাশ হয়ে চেয়ারের হাতল ধরে বসে পড়ে। একটি চুরুট ধরায়। চুরুটের ধোঁয়ায় আবছা ভেসে ওঠে চোখের সামনে অসংখ্য অসংলগ্ন চিন্তার মিছিল। কতদিনের জীবনের কত তুচ্ছদিনের টুকরো টুকরো স্মৃতি সুরপতির চোখের সামনে দিয়ে ভেসে চলে যায় ছায়াছবির মতো। কাকাতুয়াটি সুরপতির দিকে চেয়ে ঝুঁটি নাড়তে থাকে। সুরপতিও চেয়ে থাকে তার দিকে। তপোবনের মতো স্নিগ্ধ নির্লিপ্ত দৃষ্টি। যেন প্রাচীন যুগের কত রহস্যময় ইতিহাস ধ্যানমগ্ন যোগীর মতো তার ভিতর স্তব্ধ হয়ে আছে।

নক্ষত্রের মতো ছোট্ট একটি মেয়ে। কোঁকড়া কোঁকড়া চুল হাওয়ায় উড়ছে। সাজি হাতে ফুল তুলছে বাগানে। পূজার ফুল। ন-বছরের সুব্রতা। সুরপতিকে পিছনে দেখে ছুটে গিয়ে লুকনো হাসনুহানার পাতার আড়ালে।

রাজবন্দি সুরপতি মুক্তি পেয়েছে চার বছর পর। হজরতগঞ্জ বোমার মামলার আসামির মধ্যে সেই ছিল সবচেয়ে তরুণ। জেলখানার গেটের সামনে ছোট্ট একটু জনতা। জনতার ভিতর থেকে একটি কিশোরী-বালিকা বেরিয়ে এসে তার পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে গলায় পরিয়ে দিল জুঁইফুলের মালা।

সুব্রতার সেই যুথিকাশুভ্র-মূর্তি এখন ধূসর স্বপ্নের মতো।

বিস্মৃতি যখন মানুষের কাম্য হয়, তখন স্মৃতি তাকে জড়িয়ে ধরে সাপের মতো। কাকাতুয়াটিকে নামিয়ে সুরপতি তাকে যত্ন করে খাওয়ায়, কথা বলে। বলে, 'বল— ক্রতো স্মর কৃতং স্মর—'

'ক—কিয়াশ—টাকিয়া কা—'

কিছুক্ষণ এমনিভাবে কাটে, তারপর সুরপতি বিছানার উপর ক্লান্ত শরীর দেয় এলিয়ে। ধীরে ধীরে চোখের পাতা দুটি বুজে আসে।

সেদিন মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে বাইরে। ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলক, মেঘ গর্জন। সুরপতির মন আজ অন্তর্মুখী। কাকাতুয়ার ডাক আজ আর ভালো লাগে না, তবু কাকাতুয়া ডাকছে, তার কণ্ঠস্বরে আজ তীক্ষ্নতা।

নিশুতি রাত্রি ঝিমঝিম করে দ্বিপ্রহরে শ্মশানের মতো।

মুখ থেকে সদ্যঃনিঃসৃত চুরুটের ধোঁয়ার দিকে চেয়ে সুরপতি দেখছিল তার ক্রমবিলীয়মান রূপ।

সবুজ রঙের শাড়ি পড়ে পা টিপে টিপে এসে কে যেন তার চেয়ারের পিছন থেকে বললে—

'ওগো ঘুমোও— ঘুমোও, আর রাত জেগো না— ঘুমও কি তোমায় বশ করতে পারল না—'

'না—না—না—'

সুরপতি চেয়ার ছেড়ে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে। কাকাতুয়ার ঝুঁটি ধরে খুব জোরে জোরে নাড়া দেয়, চুরুট টানে আর ঘন ঘন পায়চারি করে। তারপর চুপ করে চোখ বুজে চেয়ারে বসে থাকে কিছুক্ষণ।

কাকাতুয়াটি ঘন ঘন চিৎকার করতে থাকে।

সুরপতি আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে দাঁড় থেকে কাকাতুয়াটিকে মেঝের উপর নামায়। শৃঙ্খলমুক্ত কাকাতুয়া আনন্দে ককিয়ে ওঠে। ডেস্ক থেকে একখানি ছুরি বার করে সুরপতি কাকাতুয়ার কণ্ঠনালি চিরে ছেড়ে দেয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। মেঝের উপর ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এক কোণে গিয়ে কাকাতুয়াটি দুবার সমস্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে নিস্পন্দ হয়ে যায়।

নিশুতি রাতে মৃত কাকাতুয়াটিকে সুরপতি ফেলে দিয়ে আসে ডাস্টবিনের আবর্জনার মধ্যে। পরদিন ভোরে মিউনিসিপ্যালিটির ময়লাফেলা গাড়ি ডাস্টবিন উজাড় করে আবর্জনার সঙ্গে কাকাতুয়াটিকে নিয়ে চলে যায়।

ঝাড়ুদার রাস্তা ঝাঁট দিচ্ছে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভোরের অস্পষ্ট আলো। আজও ঠিক তেমনিভাবে গাড়িতে ডাস্টবিনের আর্বজনা ভরতি করে শীর্ণ ঘোড়াটি খুর ঠুকতে ঠুকতে বেরিয়ে গেল। সুরপতির প্রিয় 'পার্ল' রইল পড়ে। মুখ বিকৃত করে নিষ্পলক চোখ দুটি মেলে সে পড়ে রয়েছে ডাস্টবিনের মধ্যে।

কিছুক্ষণ পরে একটি ধাঙড় ঠেলাগাড়িতে করে তাকে তুলে নিয়ে চলে গেল। সুরপতি একদৃষ্টে চেয়ে রইল সেদিকে।

'পার্ল!'

পার্ল ছুটে এসে চেয়ারের হাতলের উপর ঠ্যাঙ দুটি তুলে দিয়ে দাঁড়ায়, ঘন ঘন লেজ নাড়তে থাকে। সুরপতি তাকে প্যাট করতে করতে বলে, 'ফ্রি উইল বুঝিস পার্ল?'

পার্ল গোঁ গোঁ করে।

কাকাতুয়াটিকে হত্যা করার পর ভীষণ নির্জনতার মাঝখানে সুরপতির বহুদিন কেটে গিয়েছে। তখন দিবারাত্রি সে দর্শনের মধ্যে ডুবে থাকত। একদিন বেরিয়ে ঘরে ফিরতে সে দেখে বহুদূর থেকে একটি কুকুর তার পিছন পিছন দৌড়ে আসছে। অনেকবার সে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু তবু সে তার পিছু ছাড়েনি। ঘরে ফিরে দেখে কুকুরটিও তার সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির হয়েছে।

সেদিনের মতো সে তাকে বাইরের বারান্দায় আশ্রয় দিয়েছিল, ভেবেছিল ভোর হলে বোধহয় সে স্বস্থানে প্রস্থান করবে। কিন্তু সে যায়নি। সুরপতিকে দেখে পরদিন ভোরে করুণভাবে চেয়ে রইল তার দিকে। সেদিন থেকে সে হল সুরপতির সাথি, নাম রইল তার 'পার্ল'। কিন্তু আগুনের বুকে খড়ের আয়ু কতক্ষণ।

পার্লকে সঙ্গে নিয়ে সুরপতি প্রায়ই বেড়াতে যেত। সেদিন পার্ল পথে ভীষণ বিরক্ত করছে। ছুটে গিয়ে অন্য কুকুরের সঙ্গে করছে ঝগড়া, কারও পিছন পিছন যাচ্ছে ছুটে— সারা পথ ঘাস আর কাঁকর শুঁকে শুঁকে দৌড়ে বেড়িয়েছে। সুরপতি তাকে শাসন করতে গিয়ে যৎপরোনাস্তি হয়রান হয়েছে। ঘরে ঢুকে দৌড়ে এক লাফে টেবিলের উপর উঠে পার্ল ভাঙল একটি কাচের জার। একখানি বই কামড়ে ধরে মেঝের উপর খেলা করতে লাগল। বইয়ের ছেঁড়া পাতাগুলি উড়ে উড়ে যায় আর পার্ল লাফ দিয়ে দিয়ে ধরে।

পার্ল-এর গলায় শিকল পরিয়ে সুরপতি ভীষণ চাবুক মারতে থাকে। শংকরমাছের চাবুক গায়ে কেটে কেটে বসে যায়। পার্ল বিকটভাবে গোঁঙায়, তাতেও হয় না। অসহ্য বিরক্তিতে সুরপতি বগলসটি চেপে ধরে আঁটতে থাকে। ধীরে ধীরে পার্ল-এর জড়িত গোঙানি ক্ষীণ হয়ে আসে। ঠ্যাঙ দুটি সটান করে পার্ল শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।

অন্ধকারের পটভূমিকায় অশরীরী স্মৃতির মূকাভিনয়।

ঘরের ভিতর পা দিলেই সুরপতি শুনতে পায় রমেশ ও সুব্রতার খিল খিল অট্টহাসি, কাকাতুয়ার ডানা ঝাপটানি, মুমূর্ষু পার্ল-এর গোঙানি। সুব্রতার একটি কথা শুধু মাঝে মাঝে মনে পড়ে।

'তোমার মতো স্বামী সত্যিই দেবতা, পূজার যোগ্য— আমাদের ঘর করতে হলে দরকার মানুষ—'

এখন সুরপতির জীবনের ধারা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। শহরের এক কোণে একটি নির্জন রেস্তোরাঁয় গ্লাসের পর গ্লাস মদ উজাড় করে টলতে টলতে ঘরে ফিরে সুরপতি শুয়ে পড়ে। জীবনের অতীত দিনগুলি দেওয়ালের গায়ে, সিলিঙের উপর প্রেতনৃত্য করে।

নির্জন অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে স্মৃতির সর্পিল পথের উপর দিয়ে বহুদূর সে চলে যায়— ফিরে আসার কথা স্মরণ থাকে না। ঘরের ঠিকানা যেন গরমিল হয়ে যায়।

দিন-রাত বুকের হাড়-পাঁজরকে যেন রোলার দিয়ে পিষছে। পৃথিবীর সে শ্যামলতা আর নেই, সেই সবুজ রঙের পৃথিবী, সেই প্রশ্নাতুর দৃষ্টি আর নেই পৃথিবীর চোখে, এখন সেখানে ঘন কালিমার প্রলেপ, নিষ্প্রভ ঘোলাটে তার দৃষ্টি।

হায় রে পৃথিবী!

চির-প্রবহমানা পৃথিবী! বিরামহীন গতিতে চলেছে, বিসর্পিল চক্রগতিতে পতন-অভ্যুদয়ের বন্ধুর পথ দিয়ে, বিবর্তন-আবর্তনের মধ্য দিয়ে। মিথ্যে, সব মিথ্যে! সুরপতির মনে হয় সব অর্থহীন। কোথায় সেই দ্বন্দ্ব, সেই বিরোধ, সেই সমন্বয়। শুধু সহজ সাবলীল একঘেয়েমি। যেন কোনো কারখানার কলের ভোঁ অনাদিকাল ধরে অহরহ বাজছে। বিরাম নেই।

সুরপতির অট্টহাসিতে কাচের শিশিবোতলগুলি জোরে ঝনঝন করে উঠল।

গাছের তামাটে পাতায়, চিলেকোঠার ছাদে, দূরে লৌহ-কারখানার ধূমায়িত চিমনির মাথায় ভোরের সোনালি সূর্যকিরণ ঘোলাটে দেখায়। কোনো সুদূর পল্লিতে নবজাত দোদুল্যমান ধানশিষের মাথার উপর হয়তো আলপনা আঁকছে এই সোনালি সূর্যকিরণ। তাতে তার কি?

সুরপতি ঘরের দরজা দিয়ে বাইরের বারান্দার উপর রেলিঙে কনুই ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। সামনে রায়বাহাদুরের বাড়ি। দোতলার বারান্দায় আরাম-কেদারায় হেলান দিয়ে বসে তিনি একখানি খবরের কাগজ পড়ছেন। সমস্ত বাড়িটি লাল-নীল আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। তেতালার ছাদে রঙিন শামিয়ানা টাঙানো, নীচে ব্যাগ-পাইপ পার্টির বাদকেরা সারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রায়বাহাদুরের স্ত্রী সোনালি কারুকাজ করা একখানি ভায়লেট রঙের শাড়ি পরে ছ-মাসের শিশুটিকে কোলে নিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে কী বললেন— রায়বাহাদুর মহাশয় স্ত্রীর দিকে ফিরে হেসে হাত দুটি বাড়িয়ে দিলেন। মায়ের গলা জড়িয়ে শিশু কেঁদে উঠল। বহু সাধ্যসাধনার পর বুড়ো বয়সে একটি পুত্রসন্তান হয়েছে, আজ তার অন্নপ্রাশন উৎসব অনুষ্ঠিত হবে মহা-সমারোহে।

সুরপতি রাস্তার ধারের জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।

ব্যস্তবাগীশ জনতা স্রোত। ট্রাফিকের শব্দ।

পাশের বাড়ির চাকর এক ঝুড়ি আবর্জনা ফেলে গেল ডাস্টবিনে।

কোনো বিস্ফোরণ নেই, কেন উল্লম্ফন নেই, পথ বন্ধুর নয়, বেশ মসৃণ। অপরিবর্তনশীল জগৎ।

সেদিন ঘরে ফিরতে সুরপতির অনেক রাত হয়েছিল।

গভীর রাত্রি। পথ জনমানবহীন। দু-একখানি ট্যাক্সি ও রিকশা মাঝে মাঝে চলাচল করছে। ফুটপাথের উপর মজুরের দল চিৎপাত হয়ে শুয়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ঘুমুচ্ছে।

সুরপতি ঘুরতে ঘুরতে বাসার কাছে সরু গলিটার ভিত ঢুকল। মিটমিট করে গ্যাসগুলি জ্বলছে। কার বাড়ির বাগান থেকে হাসনুহানার মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। অদূরে একটি বীভৎস মূর্তি দেখে সুরপতি হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।

ডাস্টবিন থেকে হাত পঁচিশ দূরে নর্দমার ধারে একটি মেয়েমানুষ উলঙ্গ হয়ে শুয়ে রয়েছে। চুলগুলি কাদামাটি-মাখা। পরণের শতছিন্ন ময়লা কাপড়খানি নর্দমার ধারে লুটোচ্ছে। একটি লোমহীন নেড়ি-কুকুর তার রুক্ষ্ম চুলের গোছা শুঁকছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

সুরপতি কিছুক্ষণ চেয়ে রইল তার দিকে। তারপর চুপ করে ফিরে গেল নিজের ঘরে। গ্যাসের অস্পষ্ট আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে সেই বীভৎস নগ্ন নারী-মূর্তি। কি কুৎসিত এই নগ্নতা!

হয়তো কোনো সুদূর প্রবাসে দ্বিতল বাড়ির এক অন্ধকার কক্ষে এখনও রমেশ ও সুব্রতা জেগে আছে— হয়তো—

সুরপতির হাত পা মাথা ঝিনঝিন করে ওঠে। বিছানায় শুয়ে সারারাত্রি ছটফট করে কেটে যায়। ঘুম আসে না।

ভোরের আলো টেবিলের উপর এসে পড়েছে। সুরপতি উঠে অভ্যাস মতো তাড়াতাড়ি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

ডাস্টবিনের পাশে হুলুস্থুলু পড়ে গিয়েছে। হু হু করে লোক জড় হচ্ছে কোত্থেকে, প্রভাতের জনবিরল পথটি মুহূর্তে সরগরম হয়ে উঠল। জনতার ভিতর তিন-চারটি পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। দূরে মিউনিসিপ্যালিটির ময়লা-ফেলা গাড়ির সেই শীর্ণ পাঁজরা-বার-করা ঘোড়াটি ধুঁকছে আর খুর ঠুকছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

সুরপতি নীচে নেমে এসে দেখল ডাস্টবিনের মধ্যে ছেঁড়া ন্যাকড়ায় জড়ানো ছোট্ট একটি রক্ত-মাংসের পুতুল। যেন এক চাঁই জমাট-বাঁধা তাজা রক্ত। জবাফুলের মতো লাল চকচক করছে। চোখদুটি অর্ধ-প্রস্ফুটিত, সরু সরু হাত-পাগুলি লিক লিক করছে কাঠির মতো। ভিড়ের ভিতর থেকে নানা মুনি নানা মত প্রকাশ করছেন।

সুরপতি সারাদিন অনুসন্ধান করেও গতরাত্রির সেই মেয়েমানুষটির কোনো খোঁজ পায়নি সেদিন।

এরপর প্রায় ছ-মাস সুরপতি ওই ঘরটিতেই ছিল। মাঝে মাঝে সে দেখত সেই মেয়েমানুষটিকে। কোমরে ছেঁড়া একফালি কাপড় জড়ানো, চুলগুলি আলুথালু উড়ছে। ডাস্টবিনের কাছে এসে সে মুঠো মুঠো ছাই তুলে নিয়ে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিত আর চিৎকার করে বলত—

'ধরে নিয়ে আয়— খুন করব— খুন করব— খুন করে ফেলব—', এর সঙ্গে আরও অশ্রাব্য অনেক কিছু কু-কথা।

কিন্তু এই সময়ের ভিতর সে জগা পাগলাকে কোনোদিন কোথাও দেখতে পায়নি। জগা পাগলা কোথায় অন্তর্ধান করেছে। কেউ তার কোনো খোঁজখবর রাখে না।

ঘরের মেঝেতে সুরপতি চুরুট টানে, আর জোরে জোরে পায়চারি করে। মনে পড়ে— জীবনের এক স্বপ্ন-রঙিন সন্ধ্যায় সুব্রতা এসে দাঁড়িয়েছিল তার সামনে, হাতে শুকনো কলার পাতায় মোড়া পিস্তল, ফ্যাকাশে মুখ— বন্দিনী মায়ের মুক্ত-মূর্তি— প্রিয়া নয়।

হেসে উঠল সুরপতি— জগা পাগলাও মানুষ! হাঃ, হাঃ! ল্যাবরেটরির শিশি বোতলগুলো খিল খিল করে হেসে উঠল—

১৯৩৬

পরিচয়

অধ্যায় ১ / ৩৯
সকল অধ্যায়
১.
ডাস্টবিন
২.
মা
৩.
কসাইখানা
৪.
সূর্যপ্রণাম
৫.
বিচার
৬.
সিলুয়েট
৭.
নগর-তীর্থ
৮.
ইয়াকুব
৯.
ভদ্রার বাঁধ
১০.
মা গো! বাঁচিয়ে দে—
১১.
লুলু
১২.
কোটালপুত্র
১৩.
নববাবুচরিত
১৪.
সূচিপত্র
১৫.
Page Break
১৬.
ভূমিকা
১৭.
কৃতজ্ঞতা
১৮.
ভূমিকা
১৯.
নববাবুচরিত
২০.
মধ্য-বিত্ত
২১.
মধ্য-চিত্ত
২২.
পাঁকাল-বন্দনা
২৩.
কলকেতা-কালচার
২৪.
কিউ
২৫.
প্রতিদিন
২৬.
কাক-কয়লা
২৭.
২হাস্যকৌতুক ও কিউ
২৮.
ক্রমবিকাশ ও কিউ
২৯.
প্রেম = বায়োলজি + কালচার
৩০.
ম্যামালের ও মানুষের প্রেম
৩১.
জীবন চাহি জৌবন বড় রঙ্গ
৩২.
সাম্যবাদ = বিদ্যুৎ + সোবিয়েত
৩৩.
দেশী বিজ্ঞান = চেতাবনী + রসায়ন
৩৪.
পুরাতন ও নূতন
৩৫.
সাংবাদিক সাহিত্য
৩৬.
জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক
৩৭.
অযান্ত্রিক
৩৮.
জীবন কী?
৩৯.
জীবন কী? (পুনরালোচনা)

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%