লাসা ও মূল মন্দির জোখা

বিমল দে

দ্রেপুং গুম্ফায় আমরা তিনদিন ছিলাম, এখান থেকে লাসা মাত্র চার মাইলের পথ । এত কাছে এসে এখানে তিন দিন অপেক্ষা করার মত ধৈর্য আমার ছিল না কিন্তু আমি বাধ্য হয়েছি এখানে থাকতে। এখান থেকে দালাই লামার প্রাসাদ পোতালা স্বপ্নে দেখা রাজপুরীর মতই সুন্দর দেখায়। পৃথিবীর এক আশ্চর্য রূপে সেটা দাঁড়িয়ে আছে। তিনদিন যাবৎ সেটাকে দেখছি আর দেখছি। মনে হয় চিরজীবন ধরে দেখলেও তা একঘেয়ে লাগবে না। উন্নত স্থাপত্য নিদর্শনের এক প্রমাণ। দেখে মনে হয় না যে এই বিরাট অট্টালিকাটি মানুষের তৈরী। প্রাসাদটা ছোট্ট একটি পাহাড়ের উপর দাঁড় করানো আর তার পেছনে দূরে মেঘের সাথে মিলিয়ে আছে পাহাড়। পোতালা রাজপ্রাসাদের ঠিক নিচেই লাসা তিব্বতের রাজধানী। পোতালা রাজবাড়ী তিব্বতের গর্ব ।

দ্রেপুং গুম্ফায় তিনদিন থাকাকালীন আমাদের কাগজপত্র সব আরেকবার পরীক্ষা করা হয়েছে। দ্রেপুং-এ যে সব নেপালী বৌদ্ধ ছাত্ররা পড়াশুনা করছে তাদের সবাই প্রায় পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে। তারা এসেছে নেপালের তিনটি বড় মন্দির ও মঠ থেকে তাদের নাম যথাক্রমে স্বয়ম্ভূ, মহাবোধি আর নামবুদ্ধ। গুরুজীর উত্তর সত্ত্বেও আমি ঠিক কোন মঠের সাথে জড়িত সেটা জানবার জন্য তারা অস্থির হয়ে উঠেছিল। সেদিক থেকে আমি এখন মুক্ত আর কোনো বাধা নেই। দ্রেপুং-এ আমরা যাদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম তাদের সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমরা চারদিনের দিন সকাল বেলা বেরিয়ে পড়লাম রাজধানীর উদ্দেশ্যে। কী-চু নদী সব সময়ই আমাদের সাথে সাথে চলল।

রাস্তায় ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ী চোখে পড়তে লাগল। দুপাশ এখন ঘর বাড়ীতে ভর্তি। ইয়াটুং ও গীয়াৎসের পর এই প্রথম চোখে পড়ল পাবলিক লরি। রাস্তাঘাটে অনেক লোকজন চলাচল করছে, প্রায়ই চোখে পড়ছে দোকানপাট, রেঁস্তোরা আর গরীব যাযাবরদের তাঁবু। এই রাস্তাটাও মনে হচ্ছে হালে সারানো হয়েছে। বড় বড় পাথর দিয়ে ধার বাঁধানো শক্ত রাস্তা, দূরে শহরের ঘরবাড়ীগুলো দেখা যাচ্ছে। আগের মত নির্জন আর পাহাড়ি রাস্তা এটা নয়। এই রাস্তায় প্রাণ আছে। চলার পথেই সমাজ ও শহরের গন্ধ। লোকালয়ে ভর্তি। আমরা এখন পোতালার খুব কাছে। তিব্বতের মূলকেন্দ্র আর মাত্র দু' মাইল, আমরা দ্বিগুণ উৎসাহে চলতে লাগলাম। হঠাৎ নজরে পড়ল সারি সারি পতাকা আর কয়েকটি ছোট বড় চৈত্য। রাস্তাটা এবার একটু উপরের দিকে উঠে গেছে, একটু উপরে উঠতেই নজরে পড়ল একটা চৈত্য-চূড়া অনেকটা কাঠমাণ্ডুর স্বয়ম্ভূনাথ মন্দিরের মতো। রাস্তাটার সবচেয়ে উঁচুতে উঠতেই সামনেই দেখতে পেলাম বিরাট একটা চৈত্য। চৈত্যটাকে নানা রঙের প্রার্থনা পতাকা দিয়ে যেন ঢেকে রাখা হয়েছে। এখান থেকেই আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে পেলাম মহামান্য দালাই লামার পবিত্র প্রাসাদ পোতালা। একটা ছোট পাহাড়ের উপরে লাল রঙের অতি সুন্দর একটা বাড়ী। চৌদ্দতলার একটা বাড়ী তার হাজার কুঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিব্বতের এক আশ্চর্য স্থাপত্য নিদর্শন। সেই পাহাড়ের নীচেই হচ্ছে লাসার মূল শহর। সূর্যের আলো পড়ে পোতালার রাজবাড়ীটা তার উজ্জ্বল রঙের বাহার খুলে দিয়েছে। আমরা অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু আমাদের চারদিকে হঠাৎ যেন কারা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। গুরুজী তাদের উপেক্ষা করে বললেন—সামনের যে বিরাট চৈত্যটা দেখছো এটার নাম ফারগো-কালিং।

ফারগো-কালিং, নদীর ধারের এই বিরাট চৈত্যটিকে পথিকের চোখে পড়বেই। এখন আমরা লাসা শহরের মধ্যে। আমরা হঠাৎ চারদিকে গণ্ডির মত ভিখিরিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই গণ্ডিটা চারগুণ বেড়ে উঠল, আমরা আর এগুতে পারলাম না ; আমরা তিরিশজন মাত্র, আমাদের চারদিকে কম করেও শ'খানেক ভিখিরি আমাদের এগোবার পথ বন্ধ করে দিল, সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া মুশকিল। মনে হল হঠাৎ আমরা ঢুকে পড়েছি ভিখিরিদের রাজত্বে যেখানে রাজা প্রজা সবাই ভিখিরি, কাজেই কার বিরুদ্ধে নালিশ করবো কার কাছে। আমরা যদি সকলকে এক পয়সা করেও দিই তাহলে কম করেও প্রয়োজন শ'খানেক টাকার। চারদিকে সবাই চীৎকার করে বলছে——দাও-দাও, চাই-চাই, এটাই বোধ হয় এখানকার জাতীয় মন্ত্র। একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করলুম যে এরা আমাদের ঘেরাও করেছে বটে কিন্তু গায়ে বা জিনিসপত্রে কেউ হাত দেয়নি। শেষে মুক্তির উপায় না দেখে আমরা বসে পড়লুম রাস্তার উপরে, আমাদের চারদিকে পাঁচিলের মত ভিখিরিরা দাঁড়িয়ে রইল।

গুরুজী সবাইকে নিষেধ করে দিলেন আমরা যেন একটা পয়সাও না দিই, তারপর তিনি শুরু করলেন তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া। তিনি তাদের ভালভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে আমরা তীর্থযাত্রী নই, আমরা ওদেরই মতো ভিখিরি লামা মাত্র। কাজেই আমাদের যদি চিরদিন এভাবে ঘিরে বসে থাক তাহলেও কিছু বেরোবে না। প্রথম প্রথম ওরা অবিশ্বাস করলেও পরে তারা একে একে পথ ছাড়তে বাধ্য হল। ছাড়া পেয়ে আমরা আবার পথ ধরলাম। ফারগো-কালিং-এর চৈত্যটাকে আমরা সাতবার ঘুরে প্রার্থনা করে একটা চায়ের দোকানে এসে থামলাম। সেখানে আমরা চা ও ভারী রুটি খেয়ে শরীরটাকে চাঙ্গা করে নিলাম। ফারগো-কালিং জায়গাটার নাম আর সে কারণেই এখানকার চৈত্যটাকেও সেই নামেই অভিহিত করা হয়। স্থানটা মোটেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয় । রাস্তার দু'দিকে ভিখিরি যাযাবরদের তাঁবু আর চটিতে ভরা। আর তারই সাথে সাথে রয়েছে অসংখ্য প্যাগোডা ধরনের সম্ভ্রান্ত ঘরবাড়ী। পরে আমরা জানতে পারলাম যে, এই ফারগো-কালিং চৈত্যটাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে লাসার ভিখিরিদের আড্ডা। ভিখিরিদের এই আড্ডাখানাটা নতুন নয়, তবে গুরুজীর মতে তাদের সংখ্যাটা এখন প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ।

বেনারস, হৃষিকেশ ও কালীঘাটের মত এখানেও প্রচুর পেশাদার ভিখিরি রয়েছে। কাজ করার কথা বললে তারা সরাসরি উত্তর দেয়-কাজ করলে কত পয়সা দেবেন ? ভিক্ষে করা তার থেকে অনেক ভাল। লাসার লোকেরা খুব দয়ালু, তারা পয়সা দিতে দরাজ আর সেই সাথে আমরা স্বাধীন, কারও চাকর নই। এই যুক্তির বাইরে তাদের নিয়ে আসা মুশকিল। ফারগো-কালিং থেকেই বলতে গেলে শহরের আরম্ভ। এখানেই পেলাম তোরণ, লাসা সবাইকে স্বাগতম জানাচ্ছে। লাসাকে বলে হলা-সা (Hla-Sa) অর্থাৎ ঠাকুর বাড়ী, অনেকে বলে তিব্বতের স্বর্গ। মোঙ্গলীয়রা লাসার অর্থ করে অন্য রকম তারা বলে স্বর্গ-স্থান। ভারতীয় সাধুদের অনেকে বিশ্বাস করেন যে কৈলাসের ইন্দ্রপুরী আসলে এই লাসায়। হিমালয়ের সব রহস্যই লুকিয়ে আছে এই লাসায়। আমাদের স্বপ্ন এতদিনে সার্থক হল। গ্যাংটক ছাড়ার বত্রিশ দিনের দিন আমরা পেলাম লাসা। লাসার দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে প্রবেশ করলাম শহরে। রাস্তার উপরই সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত জানালাম প্রথমে শাক্য মুনির উদ্দেশ্যে, তারপর মহাকালীর উদ্দেশ্যে ও শেষে ধর্মরাজ চেন্-রে-জির (দালাই লামা) উদ্দেশ্যে। আমরা সমস্বরে চীৎকার করে উঠলাম—

জয় শাক্য মুনির জয়! জয় মহাকালীর জয়! জয় রাজাধিরাজ চেন্-রে-জির জয় ! বুদ্ধের জয়, ধর্মের জয়, সংঘের জয় !

ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্, জয় স্রোং-সান্-গাম্পোর জয়, জয় মহারাণীর জয়, জয় মহারাণীর জয় …….

তারপর পঁচিশবার বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে দণ্ডি কেটে আমরা উঠলাম। আমাদের দু'পাশে লাসার নাগরিকেরা এসে ভিড় করেছে। আমরা এগিয়ে চললাম তারই মাঝখান দিয়ে !

পোতালা রাজবাড়ী আমাদের খুবই কাছে, আধঘণ্টার পথ মাত্র। রাস্তার দু'দিকে হঠাৎ শুরু হয়েছে বনেদি ধরনের কাঠের বাড়ী। অনেক একতলা দোতলা সিমেন্টের বাড়ী—আর ছাদগুলো সবই প্যাগোডা ধরনের, অনেকটা কাঠমাণ্ডুর মত। আশপাশে কয়েকটা পুকুর নজরে পড়ল, এই অঞ্চলে গাছ-গাছড়ার অভাব নেই। কয়েকটা পার্কও দেখতে পেলাম। একমাত্র পোতালা ছাড়া রাস্তাঘাটের নমুনা দেখে মনে হয় না যে আমরা একটা দেশের রাজধানীতে এসে পৌঁছেছি। দার্জিলিং-এর তুলনায় অনেক উন্নত ৷ বড় রাস্তাটা আস্তে আস্তে শহরের মূলকেন্দ্রে এসে অনেকগুলো ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা ভিখিরি ও নাগরিকদের ভিড় কাটিয়ে শহরের মূল অংশে প্রবেশ করলাম। এখানকার সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর বাড়ীগুলোর প্রশংসা করতেই হবে। প্রত্যেকটা বাড়ীর রঙ কাঠের কাজ আর গঠন অদ্ভুত ধরনের সুন্দর।

লাসার গলিগুলো ঠিক বেনারসের মতো। আমরা অনেকগুলো গলি পার হয়ে

শেষে এসে পৌঁছলাম জোখাং মন্দিরের প্রাঙ্গণে। বিরাট এই মন্দিরটা লাসার বাড়ীগুলোর মধ্যে ঠাসাঠাসি করে কোন রকমে যেন নিজের অস্তিত্বটাকে বজায়

রেখেছে। বেনারসের বাবা বিশ্বনাথ মন্দিরের অবস্থাটাও ঠিক এ রকমের। বাইরে হতে কিছুতেই এই মন্দিরটাকে দেখা মূল মন্দির। জোখাং মন্দিরের পড়লাম তার উপর। ধর্ণা দেবার যায় না, লাসা ও তিব্বতের এটাই চত্তরটা পেয়েই আমরা হুমড়ি খেয়ে মত করে আমরা নিজেদের লুটিয়ে দিলাম ভগবান বুদ্ধের চরণে। সকলের মুখে ওই একই বীজমন্ত্র—ওম্-মা-নে প-দ্-মে-হু-ম্! এখানেই আমাদের সর্ব কর্মফল ভগবানের শ্রীচরণে সঁপে দিয়ে চেয়ে নিতে হবে তাঁর আশীর্বাদ, মুক্তি ও নির্বাণ লাভের উপায় ।

প্রায় আধঘণ্টা ধরে প্রণাম সেরে তারপর শুরু হল দণ্ডি কেটে মন্দির পরিক্রমা, ঘুরতে হবে সাতবার। তারপর আরও সাতবার প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে পূর্বজন্মের কর্মফল খণ্ডন করতে হবে, তারপর শুরু হবে মন্দির প্রবেশের দণ্ডি। তার মানে মন্দিরে ঢুকতে এখনও প্রায় ঘণ্টাখানেক বাকি। আমি লামাধর্মে দীক্ষিত কাজেই আমাকেও তাদের সাথে সাথে সব ক্রিয়া-কর্ম করতে হবে। এখন বুঝতে পারছি যে লাসায় ঢোকার আগে আমাদের বিশ্রামের কেন প্রয়োজন ছিল।

খৃষ্টপূর্ব প্রায় চারশ' শতকে রাজা শ্রোং-সান্-গাম্‌ম্পোর প্রতিষ্ঠিত এই লাসা শহর । পোতালা পাহাড়ের উপর তিনি তৈরী করেছিলেন তাঁর দুর্গ। সেই দুর্গটিই আজকাল পোতালা প্রাসাদ নামে পরিচিত, এই দুর্গটি অবশ্য তার আগেও ছোট আকারে ছিল। রাজার দুই রাণী। এক রাণী ছিলেন নেপালের, আর এক রাণী ছিলেন চীন দেশের। বিবাহের যৌতুক হিসাবে এই দুই রাণী তিব্বতে আনলেন বৌদ্ধধর্ম। নেপালের রাজকন্যা নিয়ে এলেন সোনা, রূপা, বুদ্ধ বাণী ও বৌদ্ধ পণ্ডিত। আর চীনের রাজকন্যা নিয়ে এলেন এক সুন্দর অমূল্য অতুলনীয় শাক্য মুনির এক মূর্তি। চীনের তাং দিনাস্তির রাজকন্যা বেন্-চেং'-এর আনীত সেই শাক্য মুনির মূর্তিটিই লাসার মূল মন্দির এই জোখাং এর পূজিত দেব। দৈনিক হাজার হাজার তীর্থযাত্রী ও ভক্ত লামারা এখানে আসছেন তাদের মুক্তির পথ সন্ধানে।

বৌদ্ধ-তান্ত্রিকদের মতে এই মন্দির-বিগ্রহ খুব জাগ্রত। মন্দির শুরু হয়েছে বিরাট একটা চত্বর পার হয়ে। জোখাং হচ্ছে মূল মন্দির আর তার চারদিকে আরও অসংখ্য ছোট ছোট মন্দিরে ভরা। ধ্যানী বুদ্ধ, ধ্যানী বোধিসত্ব ও মানসী বুদ্ধ, অবলোকিতেশ্বর ও আরও অন্যান্য অনেক স্ট্যাচু মন্দিরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে। আমি অবাক হয়ে সে সব দেখতে লাগলাম ৷

এই এত বড় মন্দির যার নাম ও খ্যাতির তুলনা নেই, অথচ একটা পাণ্ডাও এখানে নেই। বুদ্ধগয়া, পুরী, কাশী, হরিদ্বারে যে রকম পাণ্ডাদের অত্যাচার, এখানে সে সবের কোন বালাই নেই। চোখে পড়ে শুধু লামা আর ভিখিরি, অথবা ভিখিরি-লামা। আমি বহু তীর্থ ঘুরেছি কিন্তু একসঙ্গে এত ভিখিরি কোনদিনই দেখিনি। ভিখিরিদের মধ্যে আর একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, এদের মধ্যে হ্যাংলামো নেই। এই গরীব সর্বহারা লোকগুলোর মধ্যেও রয়েছে এক আভিজাত্যের ছাপ। কোন তীর্থযাত্রীকেই এরা ব্যতিব্যস্ত করে না, পেছনে পেছনেও দৌড়য় না। তিব্বতে প্রবেশের পর একমাত্র ফারগো-কালিং-এর ভিখিরিরাই আমাদের ঘেরাও করেছিল। ওদের দোষ নেই, আজকাল বাইরের তীর্থযাত্রীরা আর এদিকে আসতে চায় না, সে কারণে ভিখিরিদের আয়ও কমে গেছে। এ হেন অবস্থায় হঠাৎ আমাদের মতো বত্রিশজন বিদেশী তীর্থযাত্রী পেয়ে ওরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। রাজা স্রোং-সান্-গাম্পোর নেপালী রাণী তৈরী করেছিলেন লাসার দ্বিতীয় বৌদ্ধ মন্দির—নাম রামোস্ মন্দির। আর চীনা রাণী আনলেন তিব্বতের জাগ্রত দেবতা শাক্য মুনি। শাক্য মুনির মূর্তিটা সারনাথের অন্যান্য বৌদ্ধ মূর্তির মতো তবে মুখাবয়ব সম্পূর্ণ চীনা ধাঁচের। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এখানে বৌদ্ধমতে পূজা-পদ্ধতি না করে এখানে পূজা-পদ্ধতি হয় অনেকটা হিন্দু মতে। অবশ্য হবেই বা না কেন বুদ্ধদেব স্বয়ং ছিলেন বেদ পন্থার সংস্কারক মাত্র, তিনি বেদ বিরোধী ছিলেন না। যে সব সংস্কার মানুষকে অর্ন্তযামী থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিল তিনি তারই সংস্কার করেছেন মাত্র। জোখাং মন্দিরে কেউ প্রদক্ষিণ না করে প্রবেশ করে না তীর্থযাত্রী মাত্রেই দণ্ডি কাটতে হয়। ঠিক তারকেশ্বরের মন্দিরে যে ভাবে দণ্ডি কাটা হয় ঠিক তেমনি। এখানেই প্রমাণিত হয় যে মানুষের অন্তর্নিহিত ভক্তির প্রকাশ সব সময়ই এক । গঙ্গাসাগর গঙ্গোত্রী সিংহল অথবা লাসা মানুষ যেখানেই থাকুক না কেন সে যখন তার দেহ ও মন সম্পূর্ণরূপে পরমেশ্বরকে সঁপে দেয় তখন দণ্ডিই তার প্রকাশ। দাঁড়িয়ে বসে শুয়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করতে করতে আমরা ঘুরতে লাগলাম মন্দিরের চারপাশে।

দণ্ডির পর শুরু হল প্রার্থনা চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে হেঁটে আবার মন্দির পরিক্রমা। আমাদের দেশে ভোরবেলা উপবাস থেকে স্নান করার পর যে পূজা দিতে হয়, এখানে সে নিয়ম নেই, বস্তুতঃ এখানকার নদীতে এই শীতে স্নান করার প্রশ্নই আসে না। আর যদিও বা কেউ মনের অদম্য উৎসাহ ও সাহস নিয়ে এই নদীতে ভোরবেলা ডুব দিতে যায় তাহলে আমি জোর করে বলতে পারি যে সে কিছুতেই আর ডুব দেবার পর উঠবে না। ঠাণ্ডায় তার দেহ অসাড় হয়ে পড়বে। শীতের কারণেই তিব্বতের অন্যান্য মন্দিরের মতো জোখাং মন্দিরেও সকলে জুতো পরেই প্রবেশ করে।

শুধু লামা আর ভিখিরিই নয় তিব্বতের সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকেরাও এইখানে দণ্ডি-পরিক্রমা করে তারপর মন্দিরে প্রবেশ করে। তবে আজকাল লাসার লোকেরা দণ্ডি না কেটেই সরাসরি মন্দিরে প্রবেশ করছে, অনেকের মতে এটা চীনাদের প্রভাব ।

প্রায় দু'ঘণ্টা লাগল আমাদের পরিক্রমা সারতে। আমার সঙ্গী লামা ভক্তরা সবাই ভাবাবেগে আকুল, এত পরিশ্রম করে তারা শেষ পর্যন্ত এখানে এসে পৌঁছতে পেরেছে তাতেই তাদের পরমার্থ লাভ হয়েছে। সে সব পাপ ও সংস্কারের ফলে তাদের বার বার মানবজন্ম গ্রহণ করতে হচ্ছে এখানেই তার পরিসমাপ্তি। প্রাপ্তির ফলে তাদের এখন মুক্তির দরজা খোলা। তীর্থযাত্রীদের অনেকেই কাতর স্বরে নিবেদন করছে তাদের প্রার্থনা, আনন্দে অনেকেরই আনন্দাশ্রু ঝরছে। অনেক জন্মের সুকর্ম ও সাধনার ফলে এ জীবনে লাসায় পৌঁছানো গেছে। লামাদের জীবনে এটাই পরম শুভক্ষণ। ভগবান বুদ্ধ তাঁর মানবজীবন সাঙ্গ করে এখানেই অবস্থান করছেন তার চির জ্যোতি ও আনন্দের ছন্দ নিয়ে। তিব্বত ভগবান বুদ্ধের প্রিয় ভূমি। এখানকার প্রত্যেকটি নাগরিকের হৃদয়ে তিনি অবস্থান করছেন আর জোখাং মন্দির তার ইন্দ্রপুরী ।

মন্দিরের চত্বরে কানে আসছে অজস্র ভক্তের কাতর প্রার্থনা‘বাবা আমাকে উদ্ধার কর, ধর্মরাজ আমার ছেলেকে বাঁচাও, ধর্মরাজ আমার স্বামীকে সুস্থ করে দাও, মহাদেবরাজ আমার মেয়ের একটা সদ্‌গতি করে দাও, হে দেবাদিদেব আমাদের শান্তি

দাও, আমাদের জন্মজন্মান্তরের পাপ থেকে মুক্ত কর, ...ইত্যাদি। মন্দিরের সামনের দিকটা একটা বিরাট দালানের মত। লাইন করে না দাঁড়িয়ে একসাথে পাশাপাশি পঞ্চাশ-ষাটজন মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে। মন্দিরে মুখ্য দেবতা শাক্য মুনি, তাঁর উদ্দেশ্যে ভক্তেরা আনে সাদা বা হলুদ রঙের ছোট ছোট চাদর অনেকটা গামছার মতো। কেউ আনে প্রদীপ জ্বালাবার জন্য মাখন আর সম্ভ্রান্ত বা ধনীরা বিভিন্ন বস্তু ও চাল নিয়ে আসে অর্ঘ্য হিসেবে। আমরা প্রত্যেকেই এক-একটা করে চাদর নিয়েছি শাক্য মুনিকে নিবেদন করার জন্য। জোখাং মন্দিরের আর এক নাম সুক্‌-লা-খাং। আমরা এইবার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে মন্দিরে ঢুকলাম। মন্দিরে ঢোকার আগে পরিক্রমাদি সারতে আমাদের লাগল প্রায় দু'ঘণ্টা। বাইরে থেকে প্রথমে দালানের মধ্যে ঢুকতেই অন্ধকার লাগল, কিছুক্ষণ পরেই সেই অন্ধকারটা চোখে অভ্যস্ত হয়ে গেল তারপরেই নজরে পড়ল দেয়ালের গায়ে সারি সারি ঘিয়ের প্রদীপ। এই ঘিয়ের প্রদীপগুলোকে কোনদিন নেভানো হয় না। শাক্য মুনির অনন্ত আলোকের প্রতীক। আরও এগিয়ে যেতেই ঠিক বেদীর সামনে দু'পাশে ভাঁজ করা হয়েছে গ্রীলের দরজা। লোহার এই দরজাটা বন্ধ থাকলেও ভক্তদের বুদ্ধ দর্শনে কোনও অসুবিধা হয় না। সামনেই এবার দেখতে পেলাম বিরাট ভগবৎ মূর্তি, প্রশান্ত সোনালী উজ্জ্বল রঙের মুখ আর সাদার উপর নীল রঙের চক্ষুমণি। ভক্ত ও শরণার্থীদের রক্ষা করবার জন্য তিনি তাকিয়ে আছেন স্নেহশীল দৃষ্টিতে। একমাত্র মুখ ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না, তার শরীরটা সম্পূর্ণ চাদরে ঢাকা, শুধু চাদরে ঢাকা বললে ভুল হবে, শতাধিক চাদরের ভারে মনে হয় মূর্তিটার মেরুদণ্ড একটু কাহিল হয়ে পড়েছে। মূর্তির সামনে একটা বিরাট গামলার আকারে রয়েছে ঘিয়ের প্রদীপ। ভক্তরা সেই গামলার মধ্যে ঘি অর্পণ করছে। গামলা না বলে তাকে বিরাট একটা ড্রাম বলাই ভাল। আমি তার মধ্যে নামলে নিশ্চয়ই ডুবে যাবো। সেই তামার মহাপ্রদীপের চারদিকে ছোট ছোট সলতে উঠে গেছে সংলগ্ন প্রদীপগুলোর মধ্যে, এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছে সহস্র প্রদীপ শিখা। অতি চমৎকার দেখতে। দৈনিক প্রায় চারশ' কিলোগ্রাম ঘি লাগে এই প্রদীপশিখাগুলোকে জ্বালিয়ে রাখতে। লোহার দরজার দু'পাশে চারজন পূজারী-লামা। পূজার জিনিসপত্রগুলো সাজাচ্ছে, ভক্তদের কাছ থেকে চাদর নিয়ে ভগবান বুদ্ধের হাতে নিবেদন করছে। পূজার পবিত্র জল (চরণামৃত) সকলকে বিতরণ করছে, প্রদীপে ঘি ঢালছে, চাল বিতরণ করছে। ভক্তদের অনুরোধ অনুযায়ী বিভিন্ন মুদ্রাসহকারে আরতি করছে, মোটের উপর তারা খুবই ব্যস্ত। মন্দিরের প্রধান দরজাটা চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকে, কিন্তু ভেতরকার লোহার দরজাটা খোলা থাকে সকাল ন'টা থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত । এখানকার পূজা হয় বৌদ্ধ তান্ত্রিক মতে। প্রদীপের স্বপ্নালোকে মন্দিরের ভেতরে দেয়ালের গায়ে দেখলাম অজস্র তাংখা ঝোলানো রয়েছে। মন্দিরের মতোই সেগুলো পুরনো, আমার খুবই ইচ্ছা ছিল যে সেগুলোকে খুঁটিয়ে দেখি, কিন্তু এ যাত্রায় আর তা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না, কারণ আমি যাদের সাথে এসেছি তাদের শিল্প ও ভাস্কর্যের দিকে কোন রকম আকর্ষণ নেই। শাক্য মুনির স্ট্যাচুটা প্রায় দেড়মানুষ লম্বা আর তার বেদী নিয়ে উচ্চতায় তেরো ফুট ছাড়িয়ে গেছে। অভয় মুদ্রার একটা হাত ও মুখ ছাড়া আর কিছুই আমাদের চোখে ধরা পড়ল না। সবই অলংকার আর চাদরে ঢাকা। ভক্তদের চোখ অবশ্য এসব খোঁজে না তাদের হৃদয় উচ্ছ্বাসে ভরা। কেদারনাথ ও কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরেও ওই একই অবস্থা দেখেছি, ফুল বেলপাতা আর চন্দনের স্তূপে আসল দেবতা চাপা পড়ে আছে। মূল মূর্তি দেখতে হলে মন্দিরের বাইরে এসে ছবি কিনে দেখতে হয় তার প্রকৃত রূপ ।

লাসার এই শাক্য মুনি শুধু যে জাগ্রত দেবতা তাই নয় এই মন্দির ও স্টাচুটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে লাসার ট্রেজারী। পৃথিবীর অন্যতম সেরা দামী পাথরের তৈরী এই মূর্তি, আর তার উপর সোনার পাত মোড়া। শাক্য মুনির চূড়াতে কয়েকশ' মণি-মুক্তা ঝল্‌মল করছে। আর তার বেদীটা সম্পূর্ণ সোনার তৈরী। পরমার্থিক মূল্য ছাড়াও শাক্য মুনির আর্থিক মূল্যকে অগ্রাহ্য করা চলে না, লাসা তথা সমগ্র তিব্বতের সম্পদ। লোকে বলে যে, এই জোখাং মন্দিরের সোনাগুলোকে একত্র করলে তারা পৃথিবীকে কিনতে পারে । যদিও এটা প্রবচন তবুও এ কথাটাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেয়া যায় না। মূল বেদীর পূজা-সামগ্রীগুলো সবই সোনার। বেদীর সামনে একমাত্র পূজারী ছাড়া আর কারও বসবার উপায় নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভক্তদের ভিড় লেগেই আছে। ধ্যানের জন্য তাই যেতে হয় মণ্ডপে, সেখানে বসবার জন্য গদি পাতা আছে। গদি মানে চট, কোন এককালে হয়তো তার মধ্যে নারকোলের ছোবড়া ছিল, এখন তার চিহ্নমাত্র নেই। তাই ভক্তরা ধ্যানের জন্য কম্বল বা আসন নিয়ে আসে।

জোখাং মন্দিরটার ভেতরে ঢুকে তারপর মূল বেদীর জন্য নিচে নামতে হয়, রাস্তা থেকে মন্দিরের উঠোন বা চত্বর তারপর মন্দিরের ভেতর প্রথমে পড়ে মণ্ডপ। ধ্যান, দণ্ডি, প্রার্থনা, ভজন, পূজাপাঠ সেখানেই করা হয়। মণ্ডপের আর একদিকে আছে হাজার-বুদ্ধের মন্দির। আমরা এবারে সেখানে ঢুকলাম। অর্থাৎ মন্দিরের ভেতরে আরও একটি মন্দির। এই ছোট মন্দিরটাকে আমি বলবো একটি যাদুঘর। এই মন্দিরটা ছোট বড় বিভিন্ন মূর্তিতে ভরা। ভগবান বুদ্ধের যতরকম মূর্তি কল্পনা করা যেতে পারে তারই নমুনা এখানে পাওয়া যাবে। একটু ভালভাবে পরীক্ষা করলেই এই মূর্তিগুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে ভারতীয় বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব, হর-গৌরী, সরস্বতী, যমরাজ, রাম, হনুমান, যুধিষ্ঠির, কৃষ্ণ, কালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। এখানেই দেখলাম চীন ও ভারতবর্ষের এক মিলনকেন্দ্র। শিবের সাপ, দুর্গার সিংহ এখানে ড্রাগনের রূপ নিয়েছে। সেখানে আমরা সব ঘুরে ঘুরে সব দেখে এবারে উঠলাম, মন্দিরের দ্বিতীয় স্তরে অর্থাৎ মন্দিরের উপর তলায়। মন্দিরের নীচের তলায় মূল বেদী যেখানে রয়েছে শাক্য মুনির বিরাট মূর্তি, তারই পাশের দ্বিতীয় মন্দিরের রয়েছে হাজার-বুদ্ধের মূর্তি। আর এবারে উঠে এলাম মন্দিরের উচ্চাংশে। এই মন্দিরে ঢুকেই আমি অবাক হয়ে গেলাম এই বুদ্ধের মূল মন্দিরে স্বপ্নেও যা ভাবিনি। আমার সামনেই দেখতে পেলাম ভয়ংকর এক কালীমূর্তি, কালীমূর্তি অথাৎ মা-কালী লাসার রক্ষাকালী। ভয়ংকর করালীমূর্তি ধারণ করে যিনি রক্ষা করছেন পৃথিবীর এই পবিত্রভূমি তিব্বত সামনের এই বিগ্রহটি দেখে আমার সমস্ত লোমকুপগুলো খাড়া হয়ে উঠল। মনে হল অনেকদিন পর পেলাম আমার মাকে যার সঙ্গে রয়েছে আমার আত্মীক যোগাযোগ ৷

জোখাং মন্দিরটি সত্যই রহস্যজনক। এই মন্দিরে দেখতে পেলাম পুরুষ ও প্রকৃতির দুই রূপ। বুদ্ধের শান্ত শিব-রূপ, আর চির চঞ্চলা কালীর সংহার রূপ। চেতন ও অচেতনের সমন্বয় গড়ে উঠেছে এই জগৎ তারই শ্রেষ্ঠ প্রতীক এই জোখাং মন্দির। তিব্বতের ধর্মরাজ দালাই লামার ইষ্ট দেবতা এই মহাকালী ছিন্নমস্তা ।

দালাই লামা নিজে বৌদ্ধ অথচ তার ইষ্টদেবী মহাকালী। শুনতে অদ্ভুত শোনায় আর তার চেয়েও অবাক লাগে স্বচক্ষে দেখতে। এই মহাকালীর বিগ্রহটিও খুব জাগ্রত। প্রত্যেক দিন দু'বার করে তার পূজা হয়। মহাকালীর পূজা হয় তান্ত্রিক বৌদ্ধ মতে। তীর্থযাত্রী বা ভক্তেরা প্রথমে শাক্য মুনির দর্শন করে তারপর আসে মহামায়ার দর্শনে। সাধারণ মানুষের কাছে মহামায়া মহাকালীই সৃষ্টির মূল। সৃষ্ট জগতের তিনিই রক্ষাকর্ত্রী। সর্বপাপহারিনী বরাভয়দায়িনী ।

এখানকার মূল মূর্তিটা দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট ও তারাপীঠের মত নয়। এই মূর্তিটা আরও ভয়ংকর। দৈত্যদলনী, মহাকালের বিনাশ ও সংহার মূর্তি নিয়ে তিনি চর্মবস্তু পরিধান করে মানুষের মাথার খুলিতে করে মগজ ভক্ষণ করছেন। এই মন্দিরের গায়ে মায়ের আরও পূজিত মূর্তি রয়েছে। তিব্বতের পৌরাণিক কাহিনী মায়ের রূপ সম্পর্কে কি ব্যাখ্যা করেন জানি না। কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, ও কমলা মায়ের এই দশাবতারের বিভিন্ন চিত্র ও মূর্তিতে দেয়ালটা ভর্তি ।

বৌদ্ধ-তান্ত্রিকেরা বলেন যে তিব্বত থেকেই তন্ত্র-সাধনার মাধ্যমে মহাকালী মহামায়ার এই রূপগুলো ভারতবর্ষে প্রচারিত হয়েছে। তিব্বতের ধ্যানী বুদ্ধ সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্-এর প্রতীক। সেই ধ্যানী বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন ধ্যানী বুদ্ধের শক্তি সাধনার। লোচনা, যামকী, পাণ্ডারা, আর্যতারা ও বজ্রধাত্রীশ্বরী, বাণীপাণি, বজ্রপাণি এরাই আসলে তিব্বতের আদি শক্তি।

মহামায়া মহাকালীর সেই ভয়ংকর রূপের সামনে আমি আর বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না হঠাৎ যেন আমার পা দুটো অবশ হয়ে এল, ভক্তি থেকে উচ্ছ্বাসে আমার লোমকুপগুলো খাড়া হয়ে উঠল, মনে হল মা আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছেন। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার মন ও শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য। লামা পোশাকের ভেতর থেকে আমার মিথ্যা আমিটা হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। আমার দেহটা লুটিয়ে পড়ল মন্দিরের দরজার উপর। সেইক্ষণে আমার যেন মনে হল আমি সব পেয়েছি, আমি ধন্য'। আমার দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু এক অপূর্ব আনন্দ শিহরণে ভরে উঠল, সেই মহানন্দ সাগরে আমি নিজেকে সঁপে দিলাম ।

বেশ কিছুক্ষণ সেই আনন্দের লহরীতে ডুবেছিলাম। তারপর হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম। বসে আছি মণ্ডপ-দালানে, আমার চারদিকে অন্যান্য লামাদের ভিড় দেখে নিজেকে সংযত করে নিলাম। মন্দির থেকে এখানে কি করে এলাম, কে আমায় নিয়ে এল ইত্যাদি প্রশ্নে মন ভরে উঠল। একজন পূজারী লামা আমাকে একটা বাটিতে করে গরম চা এনে দিল, আমি তাতে চুমুক দিয়ে শরীর ও মনটাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনলাম। আমার পাশেই ছিলেন সাধুবাবা। তিনি পরম স্নেহে অমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন- –এ কিছুই না, ভাবাবেগে এরকম অনেকেরই হয়ে থাকে। মৌন থাকার ফলে মনের তেজ ও ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি এটা তারই ফল।

ভাবাবেগ বা উচ্ছ্বাস যাই হোক না কেন যুক্তি দিয়ে হয়তো তার একটা মনগড়া জবাব পাওয়া সম্ভব, কিন্তু আমার মনের মধ্যে যে একটা বিরাট আনন্দের পূর্ণতা জেগে উঠেছে তার ব্যাখ্যা মনে হয় কোনো ভাষাতেই ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে অনেক সময় তা ব্যক্ত করতে গিয়ে শুধু তার জড় মূর্তিটারই ব্যাখ্যা করেছি। সকলের চোখের সামনে যা ধরে পড়ে আছে সেটাকেই ব্যক্ত করতে পারি না, আর অব্যক্তটাকে ব্যক্ত করবো কি করে ?

কথায় বলে—মার থেকে মাসীর দরদ বেশী, আমার সম্পর্কে আমার থেকে লামাদের চিন্তা আরও বেশী। কারও মতে আমার খাওয়া দাওয়া ও বিশ্রাম ঠিক মতো হয়নি, কারও মতে আমার ঠাণ্ডা লেগেছে। কারও মতে আমার ভাব লেগেছে আবার কারও মতে আমার উপলব্ধি ঘটেছে, মোটের উপর যে কারণেই হোক না কেন মন্দিরের দরজায় আমি নাকি প্রায় ঘন্টাখানেক অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, সকাল থেকে আমাদের পেটে বিশেষ কিছু পড়েনি। দিনটা যেন দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছে। সন্ধ্যার দিকে আবার মন্দিরের বাকি অংশটা দেখতে আরম্ভ করলাম।

নীচের তলার একটা ঘরে আমরা বসে থাকলাম। সমস্ত মন্দিরটাই প্রায় অন্ধকারে ঢাকা তার মধ্যে নীচের তলাটা আরও বেশী। দিনের আলো এখানে কখনো প্রবেশ করেনি। আরেকটা পাতালপুরীর গল্পের মতো। অর্থাৎ আমরা এখন মাটির নীচের একটা ঘরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। এই ঘরটা ঠিক গৌহাটীর কাছে কামাখ্যার মূল মন্দিরের মতো। প্রদীপের অল্প আলোতে পাথরের ভিত্তির মধ্যে একটা ঘর, ঘরের দরজাটাও একটা বিরাট পাথরের তৈরী, দরজাটা বন্ধই থাকে। এই ঘরটা সম্পর্কে একটা চমৎকার গল্প আছে। সেটাই লিখছি :

জোখাং মন্দিরটি তৈরী করার পর সেখানে তিনটি ঘর তিন দেবতার উদ্দেশ্যে সমর্পণ করা হয়। প্রথম ঘরটি শাক্য মুনির জন্য, দ্বিতীয় ঘরটি বুদ্ধের অন্যান্য অবতারদের জন্য, আর উপরের ঘরটি রক্ষাকালীর জন্য। অন্যান্য মন্দিরের মতই এটি শক্ত পাথরের দেয়াল আর ভেতরে কাঠের উন্নত ধরনের কারুকার্যে ভরা। সেই সময়ের এটাই ছিল এক আশ্চর্য স্থাপত্য নিদর্শন।

মন্দিরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় মাতৃ-মণ্ডালর উপর, মাতৃমগুলা সেই সময়ে তন্ত্র-উপাসকদের এক প্রিয় ও শক্তিশালী আসন। তারপর যথাসময়ে মন্দিরের উপাস্য দেবতা ও দেবীকে যথাযোগ্য পূজা ও উৎসবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তারও বহুদিন পর হঠাৎ পুজারী ও লামারা মন্দিরের ভেতরে এক অদ্ভূত ধরনের নিষ্প্রাণতা অনুভব করেন। ঘিয়ের প্রদীপগুলো আপনার থেকেই যায় নিভে, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি যেন নিষ্প্রভ, ভক্তদের প্রার্থনা যেন ভগবানের কানে পৌঁছয় না। পূজারীরা পূজা করতে গিয়ে মন্ত্র ভুলে যায়। মন্দিরের ভেতরে যেন হিমশীতল এক দৈত্যের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এত খরচা করে এত ঘটা করে মন্দির স্থাপন করা হল, আর তারই এই ফল ! হাজার হাজার লোকের পরিশ্রম আর স্বপ্ন ব্যর্থ হতে দেখে রাজারও চোখে ঘুম নেই। রাজ্যের পণ্ডিত, পুরোহিত ও তান্ত্রিকদের ডাকা হল। তারা মন্দিরটিকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে বললেন-এ মন্দিরে দুষ্ট আত্মারা বাসা বেঁধেছে। যারা দুষ্ট আত্মা, প্রেত, মারণ উচাটন নিয়ে সাধন করে তারা এসে পরিষ্কারভাবে জানালো যে পাঁচটি দৈত্য এই মন্দিরটি অধিকার করে বসেছে। তাদের সে কথা শুনে রাজ্যের সবাই হায় হায় করে উঠল। পবিত্র পুণ্য তথাগতের মন্দিরে কি না ভূতের আডডা, এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কি হতে পারে ? রাজা চারদিকে খবর পাঠালেন, ওঝা যাদুকর তান্ত্রিক যে-ই এই দুষ্টাত্মাগুলো থেকে মন্দিরকে রক্ষা করতে পারবে তাকেই রাজভাণ্ডার উজাড় করে পুরস্কৃত করা হবে। রাজ্যের বহু তান্ত্রিকরা এল কৌমারী, বরাহী মহাশক্তির মন্ত্র নিয়ে, কিন্তু একে একে সবাই ব্যর্থ হল। শেষকালে সকলকে অভয় দিয়ে এগিয়ে এলেন পদ্ম সম্ভবা। অভূতপূর্ব সাধনমার্গের অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন তন্ত্রাচার্য ভূতসিদ্ধ পদ্ম সম্ভবার চরণে লুটিয়ে পড়ল পঞ্চ-দৈত্য। পদ্ম সম্ভবা তাদের পঞ্চ-পাশের মন্ত্রে বন্দী করলেন। নীচের এই ঘরটিতেই তিনি তাদের বন্দী করে রাখলেন ।

একদিন কোন এক কারণে পদ্ম সম্ভবা বাবা লাসার বাইরে যাবার প্রয়োজন বোধ করলেন। তিনি লাসা ছাড়ার আগে বার বার করে মন্দিরের লামাদের সাবধান করে দিলেন কিছুতেই যেন এই দুষ্ট আত্মাদের না ছাড়া হয়। কয়েকদিন পর একজন হৃদয়বান্ সৎ পূজারী নীচের ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে দেখেই সেই দৃষ্টাত্মাগুলো কেঁদে উঠল—‘আমাদের এই বন্দী জীবন থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল।' তাদের সেই কান্না শুনে পূজারীর অন্তর করুণায় ভরে উঠল, সে দরজার কাছে এসে তাদের বলল—বুঝতেই পারছি কিন্তু করার কিছুই নেই। পদ্ম সম্ভবা বাবা এখন এখানে নেই, তিনি এলেই তাঁর কাছেই তোমাদের যা বলার বলবে ।

পঞ্চ দৈত্যের কান্নায় পূজারীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে জেনে তারা আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল—বাবা আনেক দিন যাবৎ আমরা দিনরে আলো দেখিনি, এই অন্ধকার ঘরে থাকার মতো মহা যাতনা পৃথিবীতে আর নেই। আমাদের দয়া করে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিন, আমরা কথা দিচ্ছি বাইরের আলো দেখেই আমরা খুশী হব তারপর আবার আপনি আমাদের এখানে বন্দী করে রাখবেন । আপনার পায়ে পড়ি আমাদের একটু করুণা করুন। দৈত্যদের কান্নায় পূজারীর হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হল। তিনি তাদের কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি দিবার অভিপ্রায়ে দরজা খুলে দিলেন। পঞ্চদৈত্য ঘর থেকে বেরিয়েই অট্টহাস্যে ভেঙে পড়ল। হেসে গড়াগড়ি খেতে খেতে বলল--মুর্খ পূজারী তোমার মতো বোকা লোক আমরা কোনদিন দেখিনি—এই মন্দিরটা আমাদের, এটা আমাদের রাজত্ব। এই বলে তারা আবার আগের মতো ভূেেতর তাণ্ডব শুরু করে দিল। তাদের থামায় এমন সাধ্য কার। পূজারী বেচারা নিজের বোকামী বুঝতে পেরে আফসোস করতে লাগল।

কয়েকদিনের মধ্যেই লাসার বাইরে পদ্ম সম্ভবার কানে গিয়ে সেই সংবাদটা পৌঁছল। পদ্ম সম্ভবাজী সেই সময় তান্ত্রিকদের নিয়ে বিশেষ সাধনায় ব্যস্ত ছিলেন। দৈত্যদের মুক্তি পাওয়ার সংবাদ পেয়েই তিনি ফিরে এলেন লাসায়। পদ্ম সম্ভবাজী ছিলেন অতি বিনয়ী কিন্তু প্রয়োজনবোধে তিনি অসুরের রূপ নিতেও দ্বিধা করতেন না। জোখাং মন্দিরে ঢুকেই তিনি হুংকার দিয়ে উঠলেন। তাঁর উপস্থিতিতে দৈত্যদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। দৈত্যদের দেখেই পদ্ম সম্ভবাজী একটা বিরাট পাথর তুলে তাদের দিকে ছুঁড়ে মারলেন । সেই পাথরটা নাড়াতে সাধারণতঃ পঞ্চাশ জন লোকের দরকার হয়। তাই দেখে দৈত্যদের মধ্যে দু'জন ভয়ে মন্দির ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচল আর তিনজন আবার বন্দী হল পদ্ম সম্ভবার হতে। পদ্মসম্ভবা তাদের পঞ্চপাশে বেঁধে রাখলেন। যতদিন এই মন্দিরের দেবতারা জাগ্রত থাকবেন ততদিন পর্যন্ত তারা এখানেই বন্দী থাকবে। বহিঃশত্রুর আক্রমণে যদি কোনদিন ধ্বংস হয় তাহলেই তারা ছাড়া পাবে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি ঠিক তার সামনেই সেই বিরাট পাথরটা একটা থামের নীচে পড়ে আছে। এই পাথরটা দর্শন ও স্পর্শ করা একটি পুণ্যের কাজ ।

মন্দিরের ঘন্টা, তাংখা, উৎসবের বড় বড় হাঁড়ি এসবগুলো দেখে, আবার আমরা বাইরে এলাম। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা গড়িয়ে এল। আমরা মন্দিরের চারপাশে আরও তিনবার প্রার্থনাচক্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মণি মন্ত্র জপ করে পরিক্রমা করছি ঠিক এমন সময় মন্দিরের ভেরী বেজে উঠল, সেই সাথে সাথে ডমরু। সেই শব্দ হঠাৎ যেন মন্ত্রের মত কাজ করল। চারদিক থেকে দলে দলে লোকজন ছুটে আসতে লাগলো সন্ধ্যারতির জন্য। আমরা শেষবারের মতো মন্দির পরিক্রমা করছি, কাজেই তা সম্পূর্ণ না হলে যেতে পারি না। যাই হোক, শেষে মন্দির পরিক্রমা সেরে যখন ঠাকুর মণ্ডপে এলাম তখন মণ্ডপে লোকে লোকারণ্য, ভেতরে একটা ইঁদুরেরও ঢোকার সাধ্য নেই। জোখাং মন্দিরের প্রথম সন্ধ্যারতি বাইরে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করতে হল। লামা ও ভক্তদের সমবেত প্রার্থনা আর সেই সাথে সাথে পুরোহিতদের মুদ্রা আর শঙ্খধ্বনীর মত ভেরী সব মিলিয়ে আমরা সেদিন স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করলাম, সারা জীবনেও তা ভুলবো না। সন্ধ্যারতির পরই মূল মন্দিরের (গ্রীলের) দরজা বন্ধ হয়ে যায়। চরণামৃত নিয়ে আমরা সেদিনের মত তৃপ্ত হয়ে ক্লান্তি দূর করলাম । জোখাং মন্দিরটাতে বাইরের লোককে থাকতে দেয়া হয় না। মন্দিরের পাশে যে পুরোহিতের বাড়ীটা আছে সেখানে যারা মন্দিরের পূজারী ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন তারাই থাকেন। বাইরে থেকে আসা লামাদের কোনোরকম থাকার বন্দোবস্ত নেই । প্ৰায় শ'খানেক লামা সেখানে থাকেন তারা সবাই বেতনভোগী। কাজেই সেখানে আমাদের থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমাদের সে রাতের জন্য থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে অন্য একটা বাড়ীতে, সেটাকে একটা পুরানো ধর্মশালা বললে ভুল হবে না। শহরের যে অংশ দিয়ে সকালে প্রবেশ করেছি সেই অংশেই আবার ফিরে এলাম অর্থাৎ ফারগো-কালিং-এর দিকে। বাড়ীটা পুরানো কিন্তু ভেতরকার বন্দোবস্ত খুব ভাল অর্থাৎ তীর্থযাত্রীদের যা দরকার তার সবই এখানে আছে। রান্নাঘর ও আগুন পোহাবার জন্য কাঠ। পায়খানা নেই তার জন্য একটু হেঁটে নদীর ধারে যেতে হবে। আমরা অনেক হেঁটেছি কাজেই হাঁটতে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই।

ফারগো-কালিং’এর কাছেই আমাদের ধর্মশালাটি অবস্থিত। আমাদের ধর্মশালার কিছুদূরেই এখানকার কাশাক্ দপ্তর। কাশাক্ দপ্তরটা আমাদের রাইটার্স-বিল্ডিং এর মতো। এখান থেকে লাসা তথা সমস্ত তিব্বত শাসন করা হয়। প্রধান পুরোহিত ও মন্ত্রীরা এখানেই আসেন তাদের দৈনন্দিন হিসাব নিকাশের জন্য। সকাল থেকে এ পর্যন্ত মনে আনন্দে ও উচ্ছ্বাসের দরুন একটা জিনিস লক্ষ্য করিনি। সন্ধ্যে হতেই সেটা লামাদের চোখে পড়ল। সেটা হচ্ছে আলো। হ্যাঁ আমরা আশ্চর্য হয়ে গেলাম লাসায় ইলেট্রিক্ আছে। রাস্তায় তো বটেই সেই সাথে সাথে এখানকার বাড়ীঘরগুলোতেও বিজলী বাতি আছে। তবে সব বাড়ীতে নয়, একমাত্র বড়লোকেরাই ইলেক্‌ট্রকের সংযোজন নিতে পারে। ধর্মশালার জানালা দিয়ে পোতালা প্রাসাদটাকে স্বপ্নপুরীর মতো দেখাচ্ছে। পোতালার আলোগুলোর সাথে আকাশের তারার এক সুন্দর সমন্বয় ৷ মনে হচ্ছে আকাশের তারাগুলোই পৃথিবীতে এসে স্তব্ধ হয়ে গেছে ।

যদিও স্রোং-সান্-গাম্পো লাসা ও পোতালার শ্রীবৃদ্ধিসাধন করেছেন কিন্তু আসলে লাসার উন্নতি হয় তারও অনেক আগে। প্রায় চারশ খৃষ্টাব্দে বাণিজ্য ও যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্ররূপে লাসা শহরটির গোড়াপত্তন হয়। আর তারই পাশের পোতালা পাহাড়ে স্থাপিত হয় প্রথমে ছোট একটি দুর্গ। সেই দুর্গটিকেই পরবর্তীকালে

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%