পুণ্যতীর্থের দুয়ারে

বিমল দে

আমারা আবার কী-চু নদীর ধারে এসে বড় রাস্তা ধরলাম। দূরের পাহাড়টা আস্তে আস্তে নদীর ধারে এসে পৌঁছেছে। কী-চু নদী এখন পাহাড়ী নদীতে পরিণত হয়েছে। বলাই বাহুল্য, তার গর্জন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী। নদীর ওপারের পাহাড়টা নদী পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়িয়েছে, আর সেই পাহাড় থেকে বড় বড় পাথর গড়িয়ে পড়েছে নদীটার ওপর। তারই বিরুদ্ধে নদীর হুংকার আর গর্জন, নদীর স্রোত আছড়ে পড়ছে সেই পাথরগুলোর উপর। আমরা এগুতে লাগলাম! আমরা নেথাং গ্রামের একটু আগে থেকেই পূর্বদিকে এগিয়ে চলেছি। তার আগের রাস্তাটা ছিল উত্তরমুখী। একটু বাঁক দিতেই আমাদের সামনে এক অভাবনীয় দৃশ্যপট উদ্ঘাটিত হল। হঠাৎ যেন আমাদের সামনের পর্দাটা উঠে গিয়ে দর্শকদের স্তব্ধ করে দিল এক নতুন মঞ্চসজ্জায় । কী-চু নদীর এই বিশাল উপত্যকাটা একটু আগেও এই পাহাড়ের দেয়াল দিয়ে ঢাকা ছিল। আমাদের চোখের সামনে অনেকগুলো দৃশ্য হঠাৎ এসে পড়ল। আমাদের বিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় নিল।

উপত্যকার দূর পাহাড়ের গায়ে ঝক্‌ক্ করছে কতগুলো মন্দিরের উজ্জ্বল রঙের ছাদ, প্রভাত সূর্যের আলো পড়ে সেগুলো শত সূর্য হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পাশে পাহাড়ের মসৃণ দেয়ালে আঁকা একটা বিরাট ছবি। চির আলোকের প্রকাশ স্বরূপ বুদ্ধাবতার ভগবান পদ্ম সম্ভবার এই বিরাট ছবিটার মধ্যে তাঁর প্রাণ যেন স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। চতুর্বাহু সেই মহান্ দেবের সামনে আমরা সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত জানালাম । আমরা সবাই রাস্তার উপর লুটিয়ে পড়লাম আমাদের অর্ঘ্য নিবেদন করার জন্য। তারপর বসলাম ধ্যানে পদ্ম-সম্ভবার আশীর্বাদের জন্য আমাদের মনকে শূন্য ও পবিত্র করা দরকার। তারপর শুরু হল আমাদের সমবেত প্রার্থনা।

যখন আমাদের কর্ম, ক্লেশ আর

ক্লেশের কারণ সব দূর হয় তখনই আসে মুক্তি ।

বিষয় বাসনা থেকে আসে বন্ধন

প্রকৃত তত্ত্ব জানলে সেই বাসনা থেকে

মুক্তি লাভ করা সম্ভব, মহাশূন্য

জ্ঞান থেকে আমাদের নির্বাণ-পথ দেখাও। হে তন্ত্রাচার্য পদ্ম সম্ভবা ! তোমার স্বরূপ আমাদের কাছে প্রকাশ কর। বুদ্ধ-পথই একমাত্র মুক্তির পথ নির্জনে থেকেই একমাত্র নির্বাণ সম্ভব, আমরা চলেছি তোমার পথে হে মহাযোগী ! হে তন্ত্রাচার্য পদ্ম সম্ভবা তোমার স্বরূপ আমাদের কাছে প্রকাশ কর !!

পাহাড়ের গায়ে নজরে পড়ল আরও অনেক ছবি, অসংখ্য দেব দেবীর মূর্তিতে পাহাড়ের মসৃণ দেয়ালটা ভর্তি হয়ে আছে, তারা সবাই মিলে আমাদের যেন আশীর্বাদ করার জন্য অপেক্ষা করছেন, সেই সুন্দর দৃশ্য দেখে আমাদের সর্ব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। দূরে লাসার মঠ ও মন্দিরগুলো মনে হচ্ছে যেন স্বর্গ থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে এসে পড়েছে। সেই দৃশ্য দেখেই বোঝা যায় যে এটা পৃথিবীর এক রহস্যময় দেশ।

নদীর ধার ধরে আরও কিছুদূর গিয়েই আমরা আবার থামতে বাধ্য হলাম। নদীটির মাঝখানে একটা বেদীর উপর দাঁড় কারানো হয়েছে বিরাট একটা বুদ্ধের প্রস্তর মুর্তি, দর্শন মাত্রেই আমরা আবার রাস্তার উপর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানালাম। উঠে প্রার্থনা করলাম। ভগবান বুদ্ধের পবিত্র ধ্যানমুর্তি দেখেই মনে হল আমাদের যাত্রা সার্থক, পাহাড়ের উপর থেকে অথবা নদীর স্রোতে অসংখ্য বিরাট বিরাট পাথরের চাঁই নদীর মধ্যে আটকে পড়েছে। নদীর শত আস্ফালন সত্ত্বেও তাদের এতটুকু নড়বার ইচ্ছা নেই । তারা যুগ-যুগান্ত ধারে সেখানেই তাদের ভিত গেঁথেছে। নদীর স্রোত আর পাথরের স্থায়িত্ব এই দুই শক্তির মধ্যে এখানে অনন্তকাল ধরে চলছে লড়াই। আমরা সেই কুরুক্ষেত্রের সাক্ষী হয়ে রইলাম। তারই মাঝখানে বিরাট গ্রানাইট পাথরের উপর এই শান্ত সুন্দর বৌদ্ধ মূর্তি সমগ্র বুদ্ধধর্ম ও দর্শনের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । এই সদা-চঞ্চল সংগ্রামমুখর জগতের মধ্যে স্থির ধীর হয়ে বসে আছেন জগৎপিতা মহামুনী ভগবান বুদ্ধ। শিল্পীর অপূর্ব সৃষ্টি শুধু কল্পনা নয় তাকে সাথে সাথে বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে আমরা থামলাম। মহাতীর্থের পথে তীর্থযাত্রীদের এখানেই দিতে হয় দ্বিতীয় অঞ্জলি । এখানে স্নান করে দিতে হবে পূজা ।

পৃথিবীর মধ্যে এ যেন এক সম্পূর্ণ আলাদা অধ্যাত্ম জগৎ। এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করলাম, এ পথে আসা এমন তো কঠিন নয়, অথচ ক'জনই বা আসে। মনের মধ্যে আমার অহংভাব প্রবল হয়ে উঠল মনে হল আমি সকলের মতো নয়। বাড়ী ছেড়েছিলাম বলেই তো আসা হল। মনের জোরে বেরিয়ে পড়েছিলাম বলেই তো আজ এই পুরস্কার মিলল। এ পুরস্কারের কোন জাগতিক মূল্য নেই—এ পুরস্কার আন্তরিকতা, পবিত্রতা আর আনন্দে ভরা। যারা পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ভাবে সব পেলাম, তাদের এখানে আসা উচিৎ এ আনন্দসাগরে না ডুবলে তাদের বোঝান মুশকিল যে এখানে কি পেলাম ।

নদীর সেই শত তরঙ্গ শব্দের মধ্যেও এসব নানা কথা ভাবছি, এমন সময় মনে হঠাৎ ধাক্কা খেলাম—নিজেকেই প্রশ্ন করে বসলাম—তুই কি অহংকার করছিস্ ? নিজেকে সংযত করে নিলাম, তাইতো এই আনন্দসাগরে ডুবেও আমার মনে আসছে অহংকার, এটা খুবই অন্যায়, শুধু অন্যায় নয় অবনতির কারণও বটে। অহংভাব থাকলে মুক্তি কোনদিনই আসবে না। আত্মভাব দূর করতে হবে, এই ভাব থাকলে অহংকার যায় না। অহং থেকেই আসে কামনা আর কামনাই আমাদের বন্ধনের কারণ। আমি বন্ধন চাই না মুক্তি চাই। বন্ধনই বা কি আর মুক্তিই বা কি ? আমি তো এখন মুক্ত, এই তীর্থযাত্রীদের সাথে সাথে হিমালয়ের দুর্গম পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি এটা কি মুক্তি নয়। মনের মুক্তি আর আত্মার মুক্তি এ কথাগুলো খুব জটিল কিছু বুঝি না তবুও জানতে ইচ্ছা হয়। পাথরের উপর বসে বসে ভাবছিলাম—হঠাৎ আমার সহতীর্থযাত্রী লামার কণ্ঠস্বর কানে এল—তিনি প্রার্থনা করছেন-

মহাজ্ঞানী সোং-কা-পা আমাদের পথ দেখাও, আমাদের বোধিসত্ব থেকে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পথ দেখাও, যে প্রাপ্তির সাথে সাথে আমাদের মনে আনবে মানবপ্রীতি সেবা একাত্মবোধ আর ঐক্য, বুদ্ধ তোমাকে অনুসরণ করি ; ধর্ম তোমাকে অনুসরণ করি, সংঘ তোমাকে অনুসরণ করি .... ।

আমাদের পূর্জাচনা সারতে সারতে দুপুর হয়ে গেল। কাছেই একটা সরাইখানা আছে কাজেই খাওয়ার কোনো অসুবিধাই হল না। জায়গাটাকে অনেকটা হৃষিকেশ ও লছমনঝোলার সাথে তুলনা করতে পারি। দৃশ্যটা অনেকটা সেরকম, নদীটা কিন্তু লছমনঝোলার কাছে গঙ্গার যে অবস্থা তার থেকে আরও ভয়ানক। লছমনঝোলার দৃশ্যের সাথে অলকানন্দাকে কল্পনা করলে যে রকম দাঁড়ায় অনেকটা সেরকম। আমাদের সামনেই এখন লাসা আর কোন বাধা নেই ।

আমাদের সামনের বিশাল মন্দিরটার দিকে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম । অনেকগুলো মন্দির নিয়ে একটা বিরাট মন্দিরময় শহর। তার গম্বুজের মতো মন্দিরচূড়া আর অসংখ্য প্যাগোডার মতো বাড়ীগুলো শুধু যে পথিকমাত্রেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাই নয় পথিক মাত্রেই থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। এটাই পৃথিবী বিখ্যাত দ্রেপুং গুম্ফা, দ্ৰেপুং মন্যাস্ট্রি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঠ ও বিহার। নালন্দা বা তক্ষশিলা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে কিন্তু তারই আদর্শ ও অনুকরণে গড়ে উঠেছে এই দ্ৰেপুং গুম্ফা। সন্ধ্যের দিকে আমরা সেখানে পৌঁছলাম। সেখানকার ধর্মশালায় ভারতীয়, নেপালী, সিকিম ও ভূটানী সাধু ও লামাদের অবারিত দ্বার। ধর্মশালায় উঠবার আগে আমরা প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে প্রার্থনা করলাম। আর একবার দণ্ডি কেটে সম্পূর্ণ মন্দিরটা প্রদক্ষিণ করে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালাম। এখান থেকে লাসা শহর মাত্র সাড়ে তিন মাইল। এতদিনকার পরিশ্রম আমাদের সার্থক হল। আমাদের আনন্দের যেন আর সীমা নেই। আজ সকাল থেকে পূজার্চনা নিয়ে কেটেছে, কাজেই আজ আমাদের মনে উত্তেজনার অন্ত নেই। সেই সাথে সাথে ক্লান্তিও বটে। এখন চাই বিশ্রাম ।

দ্রেপুং গুম্ফা

ধর্মশালায় আমাদের খুব ভাল ঘুম হল। আমরা শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছলাম কাজেই দুশ্চিন্তার আর কোন কারণই নেই। সকাল সাতটায় ভেরীর শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙ্গল । ধর্মশালার বারান্দা থেকেই শব্দটা আসছে তাড়াতাড়ি উঠে সেদিকে দৌড়ে গেলাম, সেখানেই দেখলাম দু'জন তিব্বতী লামা রঙচঙে পোশাক ও মাথায় মুকুট পরে বিরাট বিরাট লম্বা দুটো বাঁশীতে ফুঁ দিচ্ছে। গীয়াৎসের গুম্ফাতে এরকম বাঁশী দেখেছি। এ ধরনের তিব্বতী বাঁশী আমাদের দেশে দেখিনি। সানাই-এর বিশগুণ লম্বা, বাঁশীর শেষ অংশটা একটু দূরে মাটির উপর রাখা হয়েছে। প্রায় দশমিনিট ধরে সেই শঙ্খধ্বনি বিভিন্ন মন্দিরের ছাদে ছাদে ধ্বনিত হয়ে থামলো। বাঁশী থামলে পর লামা দু'জন আমাদের মাথা নীচু করে শুভেচ্ছা জানালো—আমিও তাদের সাথে হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। বারান্দা থেকেই দূরে দেখতে পেলাম লাসা শহরের দৃশ্য। সর্বচেয়ে আগে চোখে পড়ে মহামান্য দালাই লামার প্রাসাদ পোতালা। রঙ-বেরঙের ছাদ মন্দির ও দরজা জানালা নিয়ে পোতালা পৃথিবীর গর্ব হয়ে দাড়িয়ে আছে। এই দুর্গম দেশে পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে আছে এই আশ্চর্য যাদুপুরী।

সকালবেলাই আমরা দ্রেপুং গুম্ফায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। একজন সরকারী কর্মচারী এসে আমদের খোঁজ নিয়ে গেছেন, তিনি ছিলেন এখানকার বিদেশী নিবন্ধক দপ্তরের লোক। সেখানে লাসার প্রত্যেকটি বিদেশীদের নাম লেখাতে হবে। কতদিন থাকা হবে, কেন এসেছি, এরপর কোথায় যাবো এইসব কয়েকটা ছোটখাটো প্রশ্ন করে তিনি তার জবাব লিখে নিলেন, সেই সাথে সাথে তীর্থযাত্রীদের প্রত্যেকের নামও তিনি লিখে নিলেন, আমার নাম দেওয়া হল লামা মৌনীবাবা ।

এরপর দ্রেপুং গুম্ফার মুখ্য সচিবের কাছে আমাদের ডাক পড়ল। দ্রেপুং গুম্ফার মুখ্য সচিব থাকেন আমাদের ধর্মশালা হতে একটু দূরে। তাঁর বাড়ীটা খুব চমৎকার প্যাগোডা ধরনের একটা সাজানো বাংলো। ভারিক্কি ধরনের বিরাট মানুষ। তিনি আমাদের হাসিমুখে সম্বর্ধনা জানালেন। আমাদের প্রত্যেকের হাত ছুঁয়ে মাথা নত করে তিনি অভিবাদন জানিয়ে বললেন—দ্রেপুং গুম্ফার তরফ থেকে আপনাদের স্বাগতম জানাচ্ছি। বলাই বাহুল্য, মুখ্যসচিব মহাশয় খুব ব্যস্ত মানুষ তাঁর সহকর্মী আমাদের নাম লিখে নিলেন। তারপর আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন—আপনারা এক কাপ করে চা খাবেন কি ? —নিশ্চয়ই। আমরা এরই আশায় ছিলাম।কিছুক্ষণের মধ্যেই চা এল, দেখে অবাক হয়ে গেলাম ঠিক কলকাতার মতো চা আর চায়ের কাপ-প্লেটগুলোও খুব পাতলা, খুব সৌখিন ধরনের। দেখেই বুঝলাম যে আমরা লাসার অন্যতম একজন সম্মানীয় ব্যক্তির সাথে কথা বলছি। আরও অবাক হলাম চায়ের সাথে এল বিস্কুট। চা খেতে খেতেই তিনি আমাদের পথ ও শরীর সম্পর্কে খোঁজ নিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—তুমি এত কম বয়সে এখানে এসে পৌঁছেছো, নিশ্চয়ই তোমার পূর্বজন্মের কর্মফল। তিনি আমাদের সাথে আরও কিছুক্ষণ থেকে আমাদের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন তার সহকারীর উপর। সহকারীই আমাদের সম্পূর্ণ দ্রেপুং গুম্ফা ঘুরিয়ে দেখাবার দায়িত্ব নিলেন।

দ্রেপুং তিব্বতী শব্দ বাংলায় বলব ভাতের পাহাড়। দূর থেকে দেখলে সাদা রঙের এই গুম্ফাটাকে দেখায় ভাতের পাহাড়ের মতো, তাই এর নাম রাখা হয়েছে দ্রেপুং । আজকাল এর অনেক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু আসল মন্দির ও বাড়ীগুলো আগের মতোই আছে। আমরা একটা বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালাম। সহকারী ভদ্রলোক বললেন—

দ্রেপুং গুম্ফাতে শুধু তিব্বতী নয় বিদেশীরাও এখানে আসে পড়াশুনা করতে । প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের উড়িষ্যা প্রদেশে ‘শ্রীদংগ কতক’ নামে একটা বিরাট বৌদ্ধ বিহার ছিল আজকাল সেটার কোন চিহ্ন নেই, সেই বিহারের অনুকরণেই এই দ্রেপুং গুম্ফা তৈরী হয়। আমাদের সামনের এই বাড়ীতে নেপালী ছাত্রা থাকে, আসুন আমি তাদের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। আমরা আরও কাছে আসতেই ভেতর থেকে ভেসে আসা প্রার্থনা ও মন্ত্র-পাঠ আমাদের কানে এল। এ বাড়ীটা ঠিক দার্জিলিং-এর ঘুম গুম্ফার অতিথিশালার মতো। পরিচয় হতে কিছুক্ষণের মধ্যে ভেতর থেকে একে-একে সবাই এসে হাজির হল আমাদের প্রণাম করবার জন্য। অনেকদিন পর স্বজন পেয়ে আমরা খুবই খুশী হলাম। লামারা প্রত্যেকেই এই মঠ বিহার গ্রাম ও শহরের বিনিময় করে যে যার সংযোগ সূত্র বার করবার জন্য উৎসুক হয়ে উঠল। তুমি কোথাকার? ওঃ, অমুক মঠের হ্যাঁ আমি সেখানে কয়েক বছর ছিলাম—কি বললে, তোমাকে দীক্ষা দিয়েছেন অমুক লামা সে আমার গুরু ভাই, তোমার বিহারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি আমিই ... । তাদের এইসব কথাবার্তায় বুঝলাম যে আমাদের দলের প্রত্যেকটি লামাই বিশেষ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি। গুরুজী সকলকে পরিচয় দিয়ে বললেন যে, আমি এসেছি নেপাল ও ভারতের সীমান্তবর্তী রক্সৌল নামে এক শহর থেকে। মনে মনে ভাৰলাম যে, মৌনীবাবা থাকতে আমি রক্ষা পেয়েছি নয়তো এখানেই আমার আসল রূপ ধরা পড়ে যেতো। নেপালী ছাত্ররাই সহকারী লামাকে চলে যেতে বললো, ছাত্ররাই আমাদের পরিদর্শনের ভার নিয়ে নিল। তাদের সাথেই আবার বেরোলাম।

গুল্ফার মূলমন্দিরকে মাঝখানে রেখে তার চারদিকে চারটে মহাবিদ্যালয় রয়েছে। সাদা ও সোনালী রঙের দেওয়াল ও ছাদ, আর ব্যালকনি ও দরজা জানালার চারদিকে উজ্জ্বল লাল রঙের কাজ করা। প্রথম মহাবিদ্যালয়টির নাম লোসেলিং, খাম এবং তিব্বতের পূর্বাঞ্চলের লামারা সেখানে আসেন দর্শন ও তিব্বতী সাংস্কৃতির চর্চার জন্য । দ্বিতীয় মহাবিদ্যালয়টির নাম গোমাং। ত্রসং (Gomang Tratsang ), তৃতীয়টির নাম দেয়াং ত্রসং (Deyang Tratsang ), চতুর্থটির নাম ঙ্গাপা তত্সং ( Ngakpa Tratsang)। ত্রসং কথাটির অর্থ সম্ভবতঃ আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র। তিব্বতের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট করা থাকে ছাত্র সংখ্যা। এই ছাত্ররাই হচ্ছে তিব্বতের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এই লামারাই ভবিষ্যতে মন্ত্রী, সচিব, সৈনিক, রক্ষীবাহিনী, ইঞ্জিনীয়ার, স্থাপতি, ডাক্তার, ধর্মনেতা ইত্যাদি পদে অনুষ্ঠিত হন। বিদেশী ছাত্রদের জন্যও এখানে বন্দোবস্ত আছে। নেপাল, ভুটান ও সিকিম থেকে যে সব শিক্ষার্থী আসে তাদের জন্য রয়েছে বিদেশী বিভাগ, তিব্বতী ছাত্রদের থেকে তাদের আলাদা করে রাখা হয়েছে।

দ্রেপুং গুম্ফার ছাত্র সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। এই দশ হাজারের সকলেই এখানে থেকে পড়াশুনো করে। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না—বলতে গেলে লাসার মধ্যে এ এক বিরাট শান্তিনিকেতন। প্রত্যেকটি মহাবিদ্যালয়ের প্রধানকে বলা হয় খেম্পো (Khempo ), এরকম চারজন খেম্পোর মধ্যে যিনি বয়সে ও পাণ্ডিত্যে শ্রেষ্ঠ তিনিই দ্রেপুং-এর সর্বপ্রধান কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন ভাইস চ্যান্সেলর। ছাত্রদের মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য দু'জন শান্তি অধিকর্তা নিয়োজিত আছেন তাদের বলা হয় শালিংগো (Shalingo), বলা যায় তারাই দ্রেপুং-এর দারোগা । মহাবিদ্যালয়গুলো সবই প্যাগোডা ধরনের। বলাই বাহুল্য, তিব্বতের এই অঞ্চলটি

সমতল, চারদিকে গাছ-গাছড়ায় ভর্তি, এখন সবে শীত গিয়ে গরম শুরু হয়েছে খুব শীগগীরই এখানকার বাগানগুলো ভর্তি হয়ে যাবে ফুলের বাহারে।

তীর্থযাত্রী অর্থাৎ ধর্মশালায় যারা থাকেন প্রথম তিনদিন তাদের বিনা পয়সায় খাওয়ানো হয়, তিনদিন পর বিশেষ অনুমতি নিয়ে আরও চার দিন থাকা যায়, তারপরও থাকতে হলে এখানকার পুরোহিতদের সাথে থেকে ধর্মশিক্ষা নিতে হবে। সাধারণতঃ লোকেরা একদিন দু'দিনের বেশী থাকে না। ধর্মশালায় দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়া করে আবার বেরিয়ে পড়লাম বাকী অংশটা দেখবার জন্য ।

বিকেলের দিকে আমরা আবার প্রধান সচিবের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন এর কারণ কি কিছুই আমরা বুঝলাম না। অবশ্য বুঝবার প্রয়োজনও নেই। প্রধান সচিব অবশ্য আমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন--কিছু মনে করবেন না হানদের সাথে আমরা চুক্তিবদ্ধ নতুন কেউ এলেই তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। অবশ্য এখানকার হান্ কর্তৃপক্ষ আপনাদের বিষয় ভালোভাবেই অবগত আছেন। বিভিন্ন কারণে আজকাল বিদেশী তীর্থযাত্রীদের এখানে আসাও প্রায় বন্ধ হবার যোগাড়। যাই হোক সে বিষয়ে আর বেশী কিছু না বলাই ভালো। এই বলে তিনি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন তারপর বললেন—চলুন আপনাদের মূল মন্দিরের অবলোকিতশ্বরকে দর্শন করিয়ে আনি ৷

দ্রেপুং-এর মূল মন্দিরটি বিরাট, -- অসংখ্য স্ট্যাচু আর ফ্রেকোতে ভরা, তাদের বর্ণনা করার মতো জ্ঞান আমার নেই। মন্দিরে প্রবেশের আগেই আমরা সাতবার দণ্ডি কেটে মন্দির পরিক্রমা শেষ করলাম। তারপর মণিমন্ত্র জপতে জপতে আবার সাতবার প্রার্থনাচক্র ঘুরিয়ে মন্দিরের চারদিকে ঘুরলাম। শীতের দেশ না হলে গলদঘর্ম হয়ে যেতাম, তারপর ওম্—মানে—পাদমে-হুম জপতে জপতে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। চতুর্বাহু বোধিসত্ব অবলোকিতেশ্বর আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল—মহাধ্যানী চতুর্ভূজ সত্যস্রষ্টা কর্মফল নামক সেই দেবমূর্তির শ্রীচরণে আমরা সাষ্টাঙ্গে লুটিয়ে পড়লাম । তারপর প্রার্থনা শুরু করলাম- -

হে বিশ্ব কৰ্তা জগৎ পিতা তুমিই এই বরফের দেশের মালিক, তুমিই এই অসীম নীলাকাশের দেব মন্ত্রের রাজা, ছয় শব্দের মালিক পদ্মধারী, স্থাবর ও জঙ্গমের অধীশ্বর। হে অবলোকিতেশ্বর তুমিই আলোর স্রষ্টা, ত্রিলোধকর ত্রিতাপ দূর করে তুমিই আনো আলোক । দুঃখ দুর করে তুমিই আনো আলো, কর্ম ফল হরণ করে তুমিই দেখিয়েছো মুক্তির আলো, তুমিই সম্ভোগকায়া তুমিই হৃদয়ের আলোক স্বরূপ অধিষ্ঠাত্রী দেব তোমাকে বরণ করি । বিরাট সেই বুদ্ধ মূর্তিটা অসংখ্য তাংখা, ও কাপড়ে ঢাকা, তারই সামনে বেদীর উপর রয়েছে ছোট ছোট স্টাচু, আর পূজার বিভিন্ন সামগ্রী, ঘিয়ের প্রদীপের ঠিক সামনেই অনেকগুলো বাটিতে রয়েছে শান্তি জল আর একটা বিরাট পাত্রে রয়েছে নৈবেদ্য স্বরূপ চাল। আর অসংখ্য পুস্তক তো বটেই। মন্দিরের পূজো সেরে আমরা বাইরে এলাম। সঁচীব মশায় আমাদের সেখানে পৌঁছে দিয়ে চলে গেছেন। দ্রেপুং গুম্ফাতে গুরুজী এক বছর ছিলেন কাজেই এখানকার অন্যান্য বিষয়ে তিনিই বুঝিয়ে দিতে লাগলেন ৷

আমরা দ্রেপুং-এ তিনদিন থাকবো অর্থাৎ যতদিন বিনা অনুমতিতে থাকা যায়। তারপর সম্পূর্ণ সুস্থ দেহ ও মনে লাসায় ঢুকবো কাজেই এ ক'দিন দ্রেপুং গুম্ফার অন্যান্য বিষয় জানবার পক্ষে সুবিধাই হবে। আমি এখানকার অন্যান্য বিষয়ে যতটা সম্ভব জানতে লাগলাম ।

তিব্বতে প্রথম পা দিয়ে বুঝেছি যে এটি একটি পুরোহিত শাসিত রাজ্য৷ যে কোন সরকারী পদের কর্মচারী মাত্রেই পুরোহিত অর্থাৎ লামা। দ্রেপুং-এর পৌছবার পর সে বিষয়ে আরও বিশদ জানতে পারলাম।

তিব্বতের গুম্ফাগুলোই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান অধিকার করেছে। লাসার উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিমে তিনটি প্রধান গুম্ফা আছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্রেপুং, তারপর দক্ষিণের সেরা ও উত্তরের গান্‌দেন। সেরা লাসার দেড় মাইল উত্তরে আর গাদে লাসার পঁয়ত্রিশ মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। দ্রেপুং-এর শিক্ষার্থী ও লামারা ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত আর প্রত্যেক বাড়ীর আলাদা আলাদা মন্দির বাগান আর পাকশালা আছে। রোজ সকালে এবং দুপুরে খাবার পর তারা একসাথে জমায়েত হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করে কাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। খাওয়ার মধ্যে মাখন চা আর ঝোলই প্রধান। বিকেল বেলা শিক্ষার্থীরা এদিক ওদিক ঘোরবার সময় পায়, তা ছাড়া সব সময়ই পুঁথির মধ্যে তাদের সময় কাটে। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে এরা সম্পূর্ণ নিরামিশ নয়। প্রাণিহত্যা নিষেধ তাই মঠ ও বিহারবাসীরা কেউ স্বহস্তে প্রাণিহত্যা করে না, লাসায় নিম্নজাতের অনেক তিব্বতী আছে মুসলমানেরও অভাব নেই তারাই লামাদের হয়ে সে কাজটা করে, লামারা সেবা করেন মাত্র।

ছাত্রী কেউ নেই কিন্তু ছাত্রদের অধিকাংশই এসেছে গরীব ঘর থেকে—বলতে গেলে তিব্বতী ত্রাপারা সবাই বিনা বেতনে পড়াশুনো করে। অন্যান্যরা যাদের অভিভাবকরা একটু স্বচ্ছল তাঁরা মাঝে মাঝে মাখন, বার্লি বা ঐ ধরনের কিছু দিয়ে গুরু দক্ষিণা দেন। তিব্বতে সরকারই আসলে সব ব্যয়ভার বহন করেন। আমার ধারণা ছিল যে লামারা ধ্যান ধারণা নিয়েই সময় কাটান, কিন্তু এখানে এসে আমার সে ধারণা পাল্টে গেল।

লামাদের বলা হয় জীবন্ত বুদ্ধ তাদের কাজ দেখলেই সে বিষয় আর কোন সন্দেহ থাকে না। ছোট ত্রাপা বা সাধারণ লামাদের জীবন খুবই কষ্টদায়ক। বারো বছরের একটা ছোট লামা বা ত্রাপার কথা ধরা যাক। তাকে উঠতে হয় খুব ভোরে।এই শীত ছেড়ে উঠেই চোখ রগড়াতে রগড়াতে বিছানা গুছিয়ে আসতে হয় প্রার্থনা ঘরে। অধিকাংশ সময়েই সে ঘরগুলো খুব ঠান্ডা, তাদের পোশাকগুলো খুব গরম নয়, পায়ে অধিকাংশ সময়ে যে উলের জুতো থাকে তার থেকে আঙ্গুলগুলো বেরিয়ে গিয়ে ইঁদুরের মতো নড়াচড়া করে, প্রার্থনার পর তাদের পড়তে বসতে হয়। তাদের ঘরগুলো খুব ছোট ছোট কোনো রকমে একজনের শোওয়া চলে। যাদের ভাগ্য খুবই ভাল তাদের ঘরের জানালা আছে আর আধিকাশ ঘরগুলোই জানালা ছাড়া। প্রদীপের আলোতে কষ্ট করে পড়তে হয়। বছরখানেক হল দ্রেপুং গুফায় ইলেকট্রিসিটি এসেছে কিন্তু সব ঘরে আলো যেতে এখনো অনেক দেরী। পড়াশুনোর জন্য এদের যেসব বই ব্যবহার করতে হয় তার এক-একটির ওজন প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোগ্রাম পর্যন্ত। এ. টি. দেবের পুরু ডিক্সনারি সে তুলনায় আয়তনে কিছুই নয়। মই বেয়ে উপরে উঠে সেইসব বইগুলোকে নামাতে হয় একবার যদি ম‍ই উল্টে পড়ে তাহলে বইয়ের তলায় চাপা পড়েই তাদের ইহকালের লীলা শেষ হবে। সকাল সাতটায় পড়তে বসে বেলা দশটা পর্যন্ত এক নাগাড়ে পড়া চালিয়ে যেতে হয়, সেই সাথে সাথে ধ্যান ও পূজাপদ্ধতি তো আছেই। দুপুরবেলা বাগানের কাজ, মন্দির পরিষ্কার, বাড়ীঘর ঝাঁট দেওয়া, তারপর আবার পড়াশুনা। পড়াশুনা ঠিকমতো না করলে খেতে হয় কানমলা ও লামাদের গাট্টা। শীতের দিনে ছোটদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠে।

লামাদের মধ্যে অনেকের ডানায় ভলান্টিয়ারদের মতো লালা ফিতে বাঁধা। তারা হচ্ছে গুম্ফার আতঙ্ক। তাদের চলতি কথায় বলে ডব্-ব। কোন রকমে নিয়মের একটু এদিক-ওদিক হলেই মাথায় পড়বে তাদের ডাণ্ডা। দ্রেপুং এবং সেরা গুম্ফার আর একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানকার সেনাবাহিনী। তিব্বতের একমাত্র এই দুটো গুম্ফাতেই লামাদের সেনাবাহিনী আছে। সেনাবাহিনীর সেনারা সবাই লামা থেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। ছাত্রদের মধ্যে যাদের স্বাস্থ্য খুব ভাল আর দেখতেও খুব সু-পুরুষ অথচ লেখাপড়ায় যাদের মাথা নেই তাদেরই নেওয়া হয় এই সেনাবাহিনীতে। তাদের আর এক নাম ধর্ম-সেনা। প্রত্যেক বছর দ্রেপুং আর সেরা গুম্ফার সেনাবাহিনীদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের প্রতিযোগিতা হয়। দড়ি টানাটানি, কুস্তি, বালিতে পা দিয়ে গর্ত করা, দৌড় এগুলোই প্রধানতঃ প্রতিযোগিতার বিষয় ।

তিব্বতের রাজনীতির মূলেই রয়েছে দ্রেপুং, সেরা ও গাদেনের প্রভাব। সেরাতে আছে প্রায় পাঁচ হাজার লামা আর গাদেনে আছে প্রায় তিন হাজারের মতো লামা। তিব্বতের প্রধান শাসক হচ্ছেন দালাই লামা। তিনি এখন ছোট কিন্তু সেই নাবালক দালাই লামার প্রতিভূ হিসেবে রাজ্য শাসন করছেন তার চারপাশের ধর্মগুরুরা। তিনটি গুম্ফা তিব্বতের তিনটি ভিত্তিপ্রস্তর, মহামান্য দালাই লামার দরবারে আছেন আটজন মন্ত্রী, তিনটি গুম্ফার প্রধানরা থাকেন উপদেষ্টা হিসেবে, রাজ্যের সচিব আর কয়েকজন উচ্চ শ্রেণীর লামাকে নিয়ে তৈরী হয়েছে পরিষদ। পরিষদের যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে দ্রেপুং, সেরা ও গানদেন গুম্ফার প্রধান পুরোহিতদের মতামত ও পরামর্শের প্রয়োজন। প্রত্যেক বছর মহামান্য দালাই লামা তিব্বতের বাৎসরিক লামা-সম্মেলন আহ্বান করেন। এই সম্মেলনে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয় এবং সেই সাথে সাথে বিতর্ক হয় প্রচুর। সেই সময় দালাই লামা এই দ্রেপুং গুম্ফাতেই অবস্থান করেন। সেই সময়ই হয় ধর্মীয় সমাবর্তন উৎসব।

দ্রেপুং গুম্ফার লামারা সবাই খুব সিরিয়াস, একমাত্র খাবারের সময় ছাড়া আর কখনও মনে হয় এরা হাসে না। সাধারণ শিক্ষা ছাড়া দ্রেপুং গুম্ফায় কিছু কিছু কুটির শিল্পও শিক্ষা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে উল্লেযোগ্য পশমের কাজ, সেলাইয়ের কাজ, মাখন তৈরী ও তাঁতের কাজ। গুরুদের উপর এদের ভক্তিটা আন্তরিক বলে মনে হল না। সেটা ভয় মিশ্রিত সুর। হয়তো লামাদের জীবনটাই এরকম সুখ পেতে হলে দুঃখটা বরণ করতেই হবে। আমি মৌনী বটে কিন্তু আমার সব ইন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে জানতে লাগলাম এই পুরোহিত শাসকদের আভ্যন্তরিক রহস্য।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%