বিমল দে
গুরুর পাল্লায় আমি পড়িনি, মনে হয় গুরুই আমার পাল্লায় পড়েছেন। ভদ্রলোক রাস্তার ধারে অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন, আমিই উপযাচক হয়ে তাঁর সেবায় লেগেছি ৷ এখনি তিনি সুস্থ, আর বার বারই আমাকে বলছেন—“বাড়ী ফিরে যা”। তাঁর কথায় আমি মোটেই কান দিই না শুধু মনে মনে হাসি আর বলি, বাড়ী ফিরে যাবার জন্যই কি আমি বাড়ী ছেড়েছি ?
আমি গয়াতে এসেছি বেড়াতে, কোন রকমে ইছাপুর থেকে গয়াতে এসে পৌঁছেছি, ট্রেনে—বিনা টিকিটে আর এখানে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি মনের আনন্দে । হাতে যা পয়সা ছিল তা ট্রেনেই ঝাল-মুড়ি খেয়ে ফুরিয়েছি। যখন আমার করার কিছুই ছিল না ঠিক সেই সময়ই পেলাম এই সাধুবাবাকে ।
গয়া, শহর হিসেবে খুব সুন্দর না হলেও এর একটি নিজস্ব আকর্ষণীয় ক্ষমতা আছে, ইহকালের পুণ্য আর পরলোকের প্রায়শ্চিত্ত এ-দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে গয়া। স্বৰ্গ আর নরকের সংগম। আমার খুব ভাল লাগছে এই জায়গাটায় থাকতে। কখনও বৌদ্ধ ও হিন্দু সাধুদের সাথে সৎসঙ্গে দিন কাটাই।
লোকে বলে সৎসঙ্গে মানসিক উন্নতি হয়, আমি বলবো শুধু মানসিক নয় শারীরিক উন্নতিও প্রচুর। আমার খোরাক যোগাচ্ছে এই সাধু-সঙ্গ ।
গয়ার আকর্ষণ অনেক। যাঁরা অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁরা আসেন আলোর সন্ধানে, আর অনেকে আসেন আত্মার মুক্তির আশায়। আমি কেন এসেছি? আমি জানি না, আমি না চাই আলো না চাই মুক্তি। আমি যা দেখছি যা পাচ্ছি তাতেই আমার আনন্দ, এখানকার ধূলোতে পাচ্ছি স্বাধীনতার গন্ধ ৷
গয়ার সাধুবাবা, আমাকে আজকাল খুব বেশী পাত্তা দিচ্ছেন না। তাঁর মতে আমার বয়স অল্প এখনো সতেরো বছর পুরো হয়নি, সামনে আমার বিরাট ভবিষ্যত, লেখাপড়া শিখে মানুষ হওয়া দরকার। ভণ্ডামী করে মানুষ হওয়া যায় না। কাজেই তিনি রোজই বলেন—বাড়ী ফিরে যা বেটা। কিন্তু আমি যা পেয়েছি তা কি করে ছাড়ব ? সাধুবাবাই আমার আকর্ষণ, কিন্তু মুখ ফুটে তাঁকে সে কথা বলিনি। সাধুবাবা কলকাতার মাড়োয়ারীদের মতো বাংলা বলেন, মনে হয় হিন্দীটাই তাঁর মাতৃভাষা, নেপালী ও ভূটিয়া ভাষাটাও তাঁর আয়ত্তে। পোশাকে তিনি তিব্বতী লামা, কথায় কথায় তিনি বেদ-বাক্য আওড়ান, গৌতমের হিতবাণী তাঁর কণ্ঠস্থ, হিন্দু ধর্মে তাঁর অগাধ জ্ঞান।
যতদূর জেনেছি, সারনাথের কোন এক মন্যাস্ট্রিতে তিনি অনেক বছর ছিলেন। তাঁর নিজের কোন আখড়া বা ডেরা নেই, বয়েস সত্তর বছরের কমতো নয়ই—এটা আমার আন্দাজ মাত্র। তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ধর্মশালায়, প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল রাস্তায়। আমার সম্পর্কে তাঁকে সব খুলেই বলেছি——অর্থাৎ বাপ-মা নেই, ছোট ভাই-বোন নেই। বাঁধন নেই, শিক্ষা দীক্ষা নেই, পকেটে পয়সা নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি ।
সাধুবাবাকে কখনো ডাকি বাবা বলে, কখনও ডাকি সাধুবাবা বলে, আর যদি মন মেজাজ খুব ভাল থাকে তাহলে গুরুজী বলে সম্বোধন করি। আমাদের কথাবার্তা চলে বাংলা ও হিন্দীর সংমিশ্রণে। সাধুবাবার সঙ্গে আমার আলোচনা খুব বেশী হয় না। ধর্মশালার একটা ঘরে তিনি থাকেন, রাস্তার ধারে তিন ইঁটের উনোনে তিনি শুধু সবজি সেদ্ধ খান, খরচ প্রায় নেইই বলতে হবে, শুধু লখড়ির বাণ্ডিলটাই কিনতে হয়। মাটির হাঁড়ি আর সরা তিনি পেয়েছিলেন বিনা পয়সায়। আমার প্রধান কাজ ছিল রোজ সকালবেলা বাজার করা ।
বিনা পয়সায় বাজার করা, বড় অদ্ভুত কাজ, সবজিওয়ালাদের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে নিতে হয়, সহজ কথায় যাকে বলে ভিক্ষে করা। কোন কোন সময় একটা করলা পাবার জন্য সম্পূর্ণ সকালটাই ঘুরতে হত। বাজারের মধ্যে আলু আর আটা পাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে সহজ, এই দায়িত্বটা আমি নিজের হাতেই নিয়েছিলাম। গুরুজীকে যদি বলতাম ভিক্ষে করতে যাচ্ছি তাহলেই তিনি ভয়ংকর ক্ষেপে যেতেন। তাঁর মতে এটা ভিক্ষে নয়, বিনয় ও নম্রতার অভ্যাস করা মাত্র। আমি মনে মনে বলতাম—যার নাম চালভাজা তাকেই বলে মুড়ি।
বাইশদিন পর, দুপুরবেলা বাজার করে গলদঘর্ম হয়ে ফিরেছি, ঘরে ঢুকতেই দেখি আরও তিনজন লামার সাথে সাধুবাবা খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মগ্ন। আমি তাঁকে কোন রকম বিরক্ত না করে রান্নার আয়োজন করতে লাগলাম আর বারবার ঘরের মধ্যে তাকাতে লাগলাম। লামা তিনজনকে দেখে মনে হয় তারা সবাই পাহাড়ি অর্থাৎ শেরপা বা নেপালীদের মতো হবে। অনেকটা সাধুবাবার মতোই দেখতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের রান্না হল। পাঁচটা রুটি, চারটে আলু সেদ্ধ, একটা ভুট্টা আর কিছু পালংপাতা সেদ্ধ হয়ে গেল। তার মানে বাজার থেকে যা এনেছিলাম তার সবটাই কাজে লাগানো হয়েছে। সাধুবাবা একাহারী। বাজার থেকে যা পাওয়া যায় তার সবটাই রান্না করতে হবে। এটাই ছিল তাঁর নির্দেশ। প্রয়োজনের বেশী থাকলে তিনি রাস্তায় কাউকে ডেকে দিয়ে দিতেন, পরের দিনের জন্য তিনি কোনদিনই কিছু রাখতেন না ।
লামা তিনজন আমাদের সাথেই খেলেন, এটা বলাই বাহুল্য গুরুজী বা আমার খাওয়া আর সেদিন হল না ।
খাওয়া দাওয়ার পরই গুরুজী তিনজন লামার সাথে উঠে পড়লেন। তারপর তাঁর কাঁধের ছোট্ট থলিটা নিয়ে আমার মাথায় ছুঁইয়ে বললেন—জিতে রহ বেটা ভগবান তেরা ভালা করে।
তাঁর এই হঠাৎ আশীর্বাদে আমি চমকে উঠলাম, বুকের ভেতরটা ধরাস করে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম—তার মানে? তিনি নির্লিপ্তভাবে জবাব দিলেন——তার মানে ‘বিদায়’।
আমি হতবাক হয়ে গেছি, হঠাৎ তিনি ঘোষণা করলেন ‘বিদায়’, দু'মিনিট আগে ও তিনি কিছু বলেননি। আমি এই সংবাদের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না । তাঁর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইলাম। তিনি আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বেরিয়ে গেলেন। আমার অবস্থা তখন খুবই সাংঘাতিক, রাগ আর অভিমানে আমার মেজাজ চরমে। রাগটাকে সামলাতে পারলাম না, দাঁতে দাঁত চেপে সাধুবাবাকে উদ্দেশ্য করে মাটির হাঁড়িটাকে তুলে আছড়ে ফেললাম রাস্তার ওপর, তারপর আশপাশের লোকেদের দিকে তাকিয়ে বললাম—ব্যাটা সাধুর নিকুচী করেচে। ভণ্ড নিমকহারাম, বেইমান, বাতে কষ্ট পাচ্ছিল সেবা দিয়ে সারিয়ে তুললাম, এখন দেখলেন তো নিজের দেশের লোক পেয়ে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে গেল ভুলে ৷ মায়া মমতা বলে ওঁর মধ্যে কিছু নেই। ভাঙা হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম আমার আনন্দের গয়া আজ চুরমার হয়ে গেল। আগের দিনও পেট ভরে খাওয়া হয়নি, আজকের রান্নাটাতো লামারাই খেয়ে গেলো, তার ওপর সাধুবাবার বিচ্ছেদ! আমার মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠল, পা দুটো অসাড় হয়ে এল। আমার এই ছোট্ট দেহটাকে নিয়ে বসে পড়লাম ভাঙা হাঁড়িটার পাশে, পিতৃহারা শ্মশানযাত্রীর মতো। সেবা করার কি এই ফল ? যাই হোক কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজেকে সংযত করে নিলাম, আমি জানি এখানে আমাকে সান্ত্বনা দেবার কেউ নেই, তাই ছুটে গেলাম সাধুবাবা যেই পথে গেছেন সেদিকেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই নজরে পড়ল চারজন লামাকে। সাধুবাবার পেছনে গিয়ে তাঁর ঝুলিটা টেনে ধরলাম। মনে হয় তিনি আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাঁর হাসিটা বড় চমৎকার, সহজ আর অভয় এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয়। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—আমি জানি তোর কষ্ট হবে, কিন্তু এ জগতের সবই মায়াময়, কাজেই এর মধ্যে জড়িয়ে পড়িসনি। আমি অনেক দূর যাচ্ছি, কাছে হলে তোকে সঙ্গে নিতাম।
আমি আমার অভিমান ভুলে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম—কোথায় সেই অনেক দূর ?
উত্তরে বললেন—গ্যাংটক।
আমি আপনাকে ভুল বুঝেছি, আমাকে ক্ষমা করুন। এই বলে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম, তারপর চেয়ে রইলাম তাঁর পথের দিকে। তিনি স্টেশনের দিকে গেলেন আর আমি ধরলাম ফল্গুর দিকের পথ ।
তারপর আরও দুদিন কেটে গেছে।
সাধুবাবা যাবার পর থেকেই বার বার মনে হচ্ছে একটা শব্দ ‘গ্যাংটক’। শিলিগুড়ি, দার্জিলিং আমি অনেকবার গিয়েছি, তাই আমি জানতাম যে শিলিগুড়ি হয়েই যেতে হয় সিকিমে, গ্যাংটক সিকিমের রাজধানী। রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ মনে হল,
তাইতো সেখানে গেলে কেমন হয় ? ব্যস্ যেমনি মনে হওয়া, তেমনি চলা। মনের সুপ্ত আনন্দটাকে হঠাৎ যেন খুঁজে পেলাম এইতো পেলাম পথ ।
তিনদিন পর আমি এসে গেলাম শিলিগুড়িতে, তারপর সেখান থেকে ট্রাকের মাথায় চড়ে এসে উপস্থিত হলাম ভারতের শেষ সীমানায় হিমালয়ের পাদদেশে, জায়গাটার নাম তিস্তা বাজার। মিলিটারী আর হাটবাজারের মালবাহী ট্রাকে বোঝাই একটা ছোট্ট কর্মব্যস্ত শহর। তারই পাশে গম্ভীরভাবে বয়ে চলেছে তিস্তা। সীমান্ত পার হতে মোটেই অসুবিধা হয়নি। মিলিটারী বা পুলিশ কেউ কিছুই জিজ্ঞাসা করল না। দেখে মনে হয় তাদের দৃষ্টি পণ্য আর বিদেশী নাগরিকদের ওপর। ভারতীয়রা তাদের মতে বিদেশী পর্যায়ভুক্ত নয়। হেঁটে সেতুর ওপর দিয়ে তিস্তা নদী পার হলাম। ওপারের মাটি ছুঁয়েই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম—আমি এখন বিদেশে, জয় মা কালী!
তিস্তার এদিকে অর্থাৎ সিকিমের দিকেও রাস্তার দু'পাশে রয়েছে প্রচুর ট্রাক, বাস, জীপ আর ল্যাণ্ডরোভার; তাদের মধ্যে কেউ যাচ্ছে ভারতের দিকে আর কেউ যাচ্ছে উপরের দিকে। দু'পাশে লেপচা, ভূটিয়া আর সিকিমি লোকজনে ভর্তি। আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানলাম যে এই রাস্তাটাই সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে—গ্যাংটকে যাবার এটাই প্রধান সড়ক; তবে ইচ্ছে করলে হেঁটেও যাওয়া যায়। হাঁটা পথে কারও মতে তিনদিন লাগে, কেউ বলল চারদিন লাগে, আবার কারও কারও মতে আরও বেশী। সঠিক করে কেউ কিছু বলতে পারে না, মাইলের হিসাব সাধারণ লোকেরা বোঝে না ।
গয়াতে শেষের কয়েকদিন একটা হোটেলে বাসন মাজা ও ঘরে ঘরে চা পৌঁছে দেবার কাজ পেয়েছিলাম, তার থেকেই হাতে এসেছিল তিন টাকার মতো। এ পর্যন্ত আমার গাড়ীভাড়া লাগেনি, শুধু খাওয়া খরচা লেগেছে; হাতে এখনও আছে তেরো আনা। একটা চায়ের দোকানে ঢুকে দুটো আটা-চাপাটি ও এক গ্লাস গরম চা খেয়ে ধরলাম গ্যাংটকের পথ।
আহা! কি চমৎকার রাস্তা, এখানকার পাহাড়ী গাছের গন্ধ, জঙ্গল, আর পাহাড়ের সৌন্দর্য—মনে হয় এমন রাস্তা দিয়ে অনন্তকাল ধরে চললেও দেহে ক্লান্তি আসবে না । বাঁ দিকেই তিস্তা, ঠিক পাহাড়ের নীচে। পাহাড়ের কোলে দেখা যাচ্ছে তার দিগন্ত, পাথর আর বালির ওপর দিয়ে যেন আনন্দে সে বয়ে যাচ্ছে নীচের দিকে। দেখে কিছুতেই যেন মনে হয় না যে এই তিস্তাই ভয়ংকরী হয়ে গ্রাস করে শহর-গ্রাম আর শত শত জীবন। শিবের এখানে যেন তাঁর শব মূর্তি, আর নীচে ধারণ করেন তাঁর তাণ্ডব মূর্তি ।
ইংরেজি এপ্রিল মাস। এখানে শীতটা এখন বেশ গায়ে লাগছে। আমার পোশাক বলতে হাফ প্যান্ট, গেঞ্জি ও সার্ট, এখানকার ঠাণ্ডা আটকাবার মতো মোটেই নয়। এদিকটা কিছুই ভাবিনি, তবুও ওপরের দিকে ওঠার জন্য শীতটা এখনও লাগছে না।
চলতে চলতে প্রায়ই লরি বা ট্রাক থেকে ড্রাইভাররা মুখ বের করে জিজ্ঞেস করছে আমি যাবো নাকি তাদের সাথে, বারবারই আমি হেসে জবাব দিচ্ছি—না। লরির ছাদে
চড়ে গেলে ভাড়াটা খুবই নামমাত্র লাগে সে কথা শুনেছি, কিন্তু সেই নামমাত্র পয়সাও যে আমার কাছে নেই, কাজেই ‘না' বলতে বাধ্য ।
হিমালয়ের আছে সৌন্দর্য আর রাস্তার আছে আকর্ষণ। ঘণ্টা চারেক চলার পরই বুঝতে পারলাম যে এ কাজ যতটা সহজ ভেবেছিলাম ততটা নয়। তবে ভাগ্য ভাল যে রাস্তায় জলের অভাব নেই, একটু খুঁজলেই পাওয়া যায় ঝিরঝিরে ঝরণা, পাহাড়ের বুক চিরে সে আত্মপ্রকাশ করেছে পথিকদের বাঁচাবার জন্য। এখন বুঝলাম যে রাস্তাটা সত্যিই কষ্টকর। চলছি, হাঁপাচ্ছি আর বসছি, এইভাবেই এগিয়ে চলেছি ; এমন সময় ভাগ্যলক্ষ্মী প্রসন্না হলেন—একটা লরি এসে দাঁড়ালো, ড্রাইভারকে দেখেই মনে হলো বিহারী । আমাকে দেখেই সে জিজ্ঞাসা করলো—কোথায় যাবে ? উত্তরে বললাম—গ্যাংটক। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল—উঠে পড়। আমি তাকে বললাম— পকেটে একদম পয়সা নেই; সে হেসে উত্তর দিল—সে তো দেখেই বুঝতে পারছি। বুঝলাম সে দয়াপরবশ হয়ে আমার উপকার করতে প্রস্তুত। সে বুঝিয়ে বললো লরির ভেতরে নয় ছাদে উঠতে হবে। ত্রিপলের দড়িটা একটু কাটা মতো আছে, যে কোন মুহূর্তে ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। আমার কাজ হল সেটার দিকে নজর রাখা। যদি দড়িটা ছিঁড়ে যায় তাহলে লরির ছাদে শব্দ করে তাকে জানাতে হবে। তাতে দু'পক্ষেরই লাভ, ড্রাইভার নিশ্চিন্ত মনে চালাতে পারবে আর আমার বিনা খরচায় গ্যাংটক যাওয়া হবে। লরিতে সাধারণতঃ একজন সহকারী থাকে এক বিশেষ কাজে এই লরির সহকারী তিস্তা পুলে আটকা পড়ে গেছে, তাই সে একজন সহকারীর প্রয়োজনেই আমাকে নিতে বাধ্য হল ।
লরি চলতে শুরু করলো, পাহাড়ী রাস্তা, কাজেই আস্তে আস্তে লরি চলতে লাগলো । কিন্তু রাস্তাটাকে যেখানে সোজা পেয়েছে সেখানেই সে গীয়ার চড়াচ্ছে, আর গাড়ীর ছাদে আমার অবস্থা কাহিল। কানের পাশ দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগলো । তারপর এমন অবস্থায় পৌছলাম যে গাড়ী আস্তে আস্তে গেলেও ঠাণ্ডা বাতাস আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটাবার পর আমি লরির ছাদে ঠক্ ঠক্ শব্দ করে গাড়ীটাকে থামাতে বাধ্য করলাম। লরিটা থামলে ড্রাইভারকে কাতর স্বরে বললাম যে আমি আর ওপরের ঠাণ্ডা বাতাস সহ্য করতে পারছি না, আমাকে নামিয়ে দাও, আমি হেঁটেই যাবো। ড্রাইভার বুঝতে পারলো, হেসে বললো—ঠিক আছে। তবে আমরা অর্ধেকের বেশী পথ চলে এসেছি, বাকি পথটা লরির ভেতরে বসেই যেতে পারবো। রাস্তার ধারে একটা ভুটিয়া চায়ের দোকানে ঢুকে আমরা এক গ্লাস গরম চা খেয়ে আবার রওনা দিলাম গ্যাংটকের দিকে। বিকেল চারটের সময় আমরা গ্যাংটকে এসে পৌঁছলাম। গাড়ীতে তিস্তা বাজার থেকে সাধারণতঃ তিন ঘণ্টার পথ। ড্রাইভারকে অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে আমি নামলাম গ্যাংটক বড় বাজারের কাছে।
মাসখানেক আগে যখন বাড়ী ছেড়েছিলাম তখন কিছুতেই ভাবিনি যে আমি গ্যাংটক আসবো। এটা একটা সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ। দোকান হাট মানুষ সব কিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আমি অনেক অ-নেক দূরে এসে পৌঁছেছি। হিন্দী আমার যতদূর আয়ত্তে আছে তাতে মনে হয় চলে যাবে, তবে আশপাশের সিকিমদের দেখে মনে হয় এরা হিন্দীর খুব একটা ধার ধারে না ।
আমার প্রথম কাজ হচ্ছে সাধুবাবাকে খুঁজে বার করা। কাজটা যতটা সোজা ভেবেছিলাম কার্যক্ষেত্রে দেখছি তার বিপরীত। গ্যাংটক শহরে কোন এক সাধুবাবাকে খুঁজে বার করা অনেকটা রাস্তার কাদায় ছুঁচ খুঁজে বের করার মতো অবস্থা। রাত ঘনিয়ে এল, পাহাড়ের গায়ে আস্তে আস্তে জোনাকির মতো জ্বলে উঠল আলো। ইতিমধ্যে বাজারে কম করেও পঞ্চাশ জনকে জিজ্ঞেস করেছি সাধুবাবার কথা, কিন্তু এ পর্যন্ত কোন খোঁজই পাইনি। সাধুবাবা তো আর নাম নয়, আসল নামটা জানা দরকার নইলে এই গ্যাংটক শহরে কয়েক শ' লামা থাকেন তাদের মধ্য থেকে সেই সাধুবাবাকে খুঁজে পাওয়া দুরূহ।
সিকিমের বাজার অনেকটা দার্জিলিং-এর বাজারের মতো। সবই পাহাড়িয়া লোক, এখানে বাঙালী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেদিন রাতে দেওয়ালি বাজারে ড্রাইভারদের আস্তানায় আগুনের পাশে রাত কাটালাম। ওখানকারই একজন লেপ্চা ভদ্রলোক আমাকে চা ও রুটি খাওয়ালেন।
পরের দিন ভোর বেলা আরম্ভ করলাম আবার সাধুবাবার খোঁজ। সিকিমে হিন্দু মন্দির কেউ চেনে না, বলাই বাহুল্য যে বৌদ্ধ ধর্মই এখানকার ধর্ম। চারদিকে ছোট বড় স্তূপ ও মন্যাট্রি অর্থাৎ বুদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ চৈত্যতে ভরা। সাধুবাবা না বলে এখানে সবাইকে বলতে লাগলাম যে, আমি আমার গুরু-লামাকে খুঁজছি।
সিকিমিরা হাসিখুশী ও সহজ সরল জাতি। সাধারণ সিকিমিরা আমাকে সবাই সাহায্য করতে প্রস্তুত, ওদের ভাষা আমি জানি না কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন অসুবিধা হচ্ছে না। কারণ হিন্দী বোঝে বা বলতে পারে এমন কাউকে সব সময়ই বাজারে খুঁজে পাওয়া যায়। পরিচিত হলাম আন্চুর সাথে, অতি সরল ও পরোপকারী আমারই বয়সের। সে বাজারেই থাকে। বাস বা লরির ও মুদিখানা দোকানের মালপত্র নামানো ওঠানো করে, আর কিছু করার না থাকলে বাজারের মোড়ের রেলিং-এর ওপর বসে বসে লোক দেখে। বাজারের সবাইকে ও চেনে। গ্যাংটকে কোন বিদেশী এলে আচুর নজর এড়ানো মুশকিল। কিছু কিছু হিন্দী শব্দের সাথে লেপ্চা ও নেপালী শব্দ মিশিয়ে ও আমার সাথে কথা বলে, ভারি মিষ্টি লাগে ওর কথাগুলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। আমি কলকাতার ছেলে সেটাই আমার বড় পরিচয় । আন্চু আমাকে সব রকমের সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিল। আচুর সাথেই চা ও রুটি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাজার থেকে। বাজারের ঠিক পেছনে একটা সরু পাহাড়ী রাস্তা ধরলাম, তারপর উঠতে লাগলাম উপরের দিকে।
বাজার থেকে বেশ কিছু উপরে উঠেই দেখলাম গ্যাংটক ও পাহাড়ের সুন্দর দৃশ্য। এই প্রথম নয়ন ভরে দেখছি পাহাড়ী সৌন্দর্য, পাহাড়ের দৃশ্যেশুধু যে নয়ন ভরে তা নয়, তা হৃদয়কেও ভরপূর করে। দার্জিলিং-এর ম্যাল থেকে হিমালয়ের এক রূপ আর গ্যাংটক থেকে হিমালয়ের রূপ অন্য। গ্যাংটক পাহাড়ের উপরে একটি শহর নয়, পাহাড়ের গায়েই তৈরী হয়েছে এই শহর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এগিয়ে গেছে এই শহরটা লম্বালম্বিভাবে। সমতল রাস্তা এখানে নেই ৷
গ্যাংটকের প্রধান আকর্ষণ কাঞ্চনজঙ্ঘা। কি অপরূপ সৌন্দর্য, মনে হচ্ছে একটা সবুজ পাহাড়ের সারির উপর সাদা তুলো দিয়ে তৈরী আর একটি পাহাড়। সবুজ পাহাড়ের সারিটার ঠিক পেছনেই তৃষার ধবল কাঞ্চনজঙ্ঘা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার পবিত্রতার স্পর্শ লেগেছে সিকিমবাসীদের অন্তরে। অভয় ও শান্তির এক চরম রূপ। নিরাকার, নির্বিকার, অব্যক্ত ব্রহ্ম হঠাৎ যেন তাঁর ব্যক্তরূপে আমাদের কাছে ধরা দিয়েছেন। মনে হচ্ছে এ এক নতুন রাজ্য
আমরা আস্তে আস্তে আরও উপরে উঠে এলাম। পাহাড়ের ঠিক উপরে, পাহাড়ের একটা চূড়ো কেটে তাকে সমতল করা হয়েছে। এখান থেকে সিকিমের রূপটা আরও সুন্দর, ঠিক চারিদিকের দৃশ্যটাই এখান থেকে দেখা যায়। আমরা এসে হাজির হলাম একটা সুন্দর কারুকার্য করা কাঠের বাড়ীর সামনে। বিভিন্ন ধরনের উজ্জ্বল রঙে রঞ্জিত, আর কাঠের খোদাই কাজগুলোও চোখের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, দেখেই মনে হয় রাজপ্রাসাদ। আন্চু আমাকে বলল—এটাই সিকিমের রাজবাড়ী। কাঠের এই প্রাসাদটা পাহাড়ের উপর সুন্দরভাবে তৈরী হয়েছে। উপরের মেঘলা আকাশ, দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা, মনে হচ্ছে যেন এটাই স্বর্গভূমি। আমি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম, মনে মনে ভাবলাম আমার গ্যাংটকে আসা সার্থক হয়েছে। আচু আমার হাত ধরে দূরের আর একটা সুন্দর কাঠের বাড়ীর দিকে নিয়ে গেল ৷
আন্চু এখানে পরিচিত, গেটের কাছে পাহারাদার ওকে দেখেই কিছু জিজ্ঞেস করল, আনচু হেসে তার কথায় জবাব দিল, তারপর আমরা ছোট মাঠটা পেরিয়ে এসে হাজির হলাম সরাসরি বাড়ীটার সামনে। দরজা দিয়ে ভেতরে তাকাতেই নজরে পড়ল বিরাট বুদ্ধ মূর্তি, বুঝলাম যে এটি একটি বুদ্ধ মন্দির। আচু মন্দিরে নমস্কার করে বলল—এই মন্দিরটার নাম সুলাখা, এটা রাজপ্রাসাদের মন্দির, রাজা এখানে আসেন প্রার্থনা করতে। আমরা ভেতরে ঢুকলাম, সরাসরি বুদ্ধদেবের মূর্তির কাছে গিয়ে প্রদীপ স্পর্শ করলাম। ভগবান বুদ্ধের মুখশ্রী থেকে প্রতিভাত হচ্ছে জগতের আলো। কাঠের ওপর লাল হলুদ ও সোণালী রঙের অতি সুন্দর কারুকার্য চোখকে সার্থক করে। মূর্তির দু'পাশে ছোট ছোট খোপে রাখা হয়েছে প্রচুর বৌদ্ধ লিপি, দেয়ালে টাঙানো তাংখা, প্রদীপের আলোগুলি মিটমিট করে জ্বলছে, মন্দিরে ঢুকতেই মনে হল—আমার সব পরিশ্রম যেন সার্থক হয়েছে। মনে কোন রকম ক্লান্তিই নেই, শরীর ও মন দুইই খুব হালকা মনে হচ্ছে।
আমরা মন্দির থেকে বেরিয়ে কয়েক পা এগিয়ে কাঠের একটা নাটমন্দিরে এসে হাজির হলাম। আচু সেদিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো—এই নাটমন্দিরে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক লামা আসেন ও যান, সম্ভবতঃ তোমার গুরুকে এখানে দেখতে পাবে। খুশীতে আমি আচুর হাতটা জড়িয়ে ধরলাম, বললাম—তুমি আমার সত্যিকারের বন্ধু। আচুর সাথে আমি নাটমন্দিরে ঢুকলাম। নাটমন্দিরটাকে দেখেই মনে হয় যে, এটা একটা ধর্মশালা, অন্ততঃ লামারা এটাকে সেভাবেই দখল করেছে। কেউ বসে জপের মালা জপছে, কেউ দণ্ডি ঘোরাচ্ছে, কেউ উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ছে, কেউ খাচ্ছে, কেউ তার থলির মালপত্র গোছাচ্ছে, আবার কোণের দিকে অনেকে বসে মাথার উকুন খুঁজছে—ছোটখাটো একটা লামার মেলা বলা যেতে পারে। আমি একে একে প্রত্যেকটি লামার মুখের দিকে তাকিয়ে ভালভাবে নজর দিয়ে খুঁজতে লাগলাম আমার প্রিয় লামাজীকে। একটা সুবিধা হচ্ছে যে তিব্বতী লামাদের দাড়ি, গোঁফ প্রায় নেই বললেই চলে। নেপালী, লেপচা, ভূটানী লামাদের দাড়ি গোঁফ হাল্কা, আবার থাকলেও গোষ্ঠী বিশেষে তা কামানো আর অধিকাংশ বৃদ্ধ লামাদের মস্তক মুণ্ডিত। কাজেই গয়ার সাধুদের মতো দাড়ি গোঁফের মধ্যে মুখ লুকোনো নেই ৷ এখানে কম করেও দেড়শ লামা আছে আর তারই মধ্যে চলতে লাগলো আমার অনুসন্ধান। তবে আমি জোর দিয়ে বলতে পারি যে, আমার গুরু যদি এর মধ্যে থেকে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনিও আমাকে দেখতে পাবেন। আনচুকে বললাম চলে যেতে, আমি ইতিমধ্যে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবো যদি না পাই তাহলে বিকেলে ওর সাথে বাজারের চৌরাস্তায় গিয়ে দেখা করবো, আর পেলেও তাকে জানাবো। আন্চু আমাকে থাকতে উপদেশ দিল, কারণ দুপুর বেলা রাজা এসব লামাদের তরকারী ও রুটি খাওয়ান আর সেই সাথে সাথে গরীব ভিখিরিরাও খেতে পারে। আনচুর পরামর্শে আমি রাজী হলাম । আমাকে রাজবাড়ীর মন্দির চত্বরে রেখে ও চলে গেল।
ভারতীয় তীর্থক্ষেত্রগুলোতে ইট-সিমেন্ট ও পাথরের মন্দির দেখে দেখে আমি অভ্যস্ত। রাজবাড়ীর এই বুদ্ধ মন্দিরটা তাই আমার চোখে খুব অদ্ভুত লাগছে। কাঠের তৈরী প্যাগোডা ধরনের। কলকাতার জৈন মন্দির অনেকটা এই ধরনের। এখানকার কাঠের সূক্ষ্ম কাজ ও রঙের বাহার প্রশংসার যোগ্য।
লামাদের মধ্যে দু'তিনজন হিন্দী জানা লোক পেলাম, তাদের কাছে আমি আমার সমস্যাটা জানালাম। তারা প্রত্যেকেই আমাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত, কিন্তু কি ভাবে ? লামাদের মধ্যে কথাটা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ল, কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই জেনে গেল যে আমি আমার গুরুকে খুঁজছি। আমার মনে হয় আধঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ নাটমন্দিরের প্রায় দু'শ লামা আমার সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত। চুপচাপ বসে বসে নাম জপ করা নিয়ে ব্যস্ত লামাদের দেখে আমি কিছুতেই ভাবতে পারিনি যে এরা আমার সমস্যাটাকে নিয়ে বিচলিত হয়ে পড়বে, ওদের আন্তরিকতা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম ৷ অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন—
তোমার গুরুজীর নাম কি? কোথায় থাকেন ? বয়স কত ? কোন্ ধর্ম ? বৌদ্ধ ধর্মের কোন্ শাখা? কোন্ গুম্ফাতে তিনি থাকতেন? তিনি কোন্ যানের পথিক ? তিনি কি লেপচা, না ভুটিয়া, না নেপালী ?—তাদের এসব প্রশ্নের কোনটারই আমি জবাব দিতে পারলাম না। গয়াতে তাকে সাধুবাবা বলে ডাকতাম অথবা গুরুজী বলে, পোশাকে তিনি ছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতো, দেখতে পাহাড়িয়াদের মতোই, গয়া যখন ছাড়েন তখন তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন লামা ছিলেন। ব্যস্ ! এর বেশী কিছু জানি না ।
অতএব হতাশ হতে হল তবুও সকলেই আমাকে আশ্বাস দিল যে এটা একটা সৎ ইচ্ছা, কাজেই পূরণ হবেই। হঠাৎ তিব্বতী চোঙা শঙ্খ বেজে উঠল, চমকে সেদিকে তাকালাম গম্ভীর আর ভীষণ তার শব্দে সবাই যেন কেঁপে উঠল। শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় আর হিমালয়ের গায়ে। একবার মাত্র বেজেই থেমে গেল কিন্তু তার রেশ ঢেউয়ের মতো পাহাড়ের গায়ে গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই শব্দ শুনে লামাদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল, সকলেই থালা বাটি প্রস্তুত করে মাঠের দিকে ছুটল, বুঝলাম এদের খাবার সাড়া পড়েছে। একজন লামা আমাকে জিজ্ঞাসা করল তুমি খাবে না নিশ্চয়ই। আর একজন লামা তাদের সাথে আমাকে ও মাঠের মধ্যে বসতে বলল, কিন্তু সমস্যা দেখা দিল থালা নিয়ে। খাবারের জন্য প্রত্যেকেই যে যার থালা নিয়ে আসে, এখান থেকে শালপাতা বা কলাপাতা কিছু দেওয়া হয় না।
একজন সাধু আমার হাতখানি দেখে বললেন- -তোমার কাছে কিছু নেই ?
—আজ্ঞে না আমার কাছে কিছু নেই ।
—কিছুই যদি না থাকে তাহলে নেবে কি করে? দিয়ে তারপর নিতে হয়, কিছু না দিলে তুমি নেবে কি করে ?
মনে হল তার কথায় এক গূঢ় সত্য লুকোনো আছে কিন্তু সেটাকে যাচাই করার ক্ষমতা আমার এখন নেই।
আমার অবস্থা দেখে ওদের মধ্য থেকে একজন একটা অ্যালুমিনিয়মের বাটি এগিয়ে দিল, ইসারায় বললে—কাজ চলবে। বাটিটার দিকে তাকালাম, হ্যাঁ, কাজ চলবে বটে কিন্তু বড্ড নোংরা। বাটিটার মধ্যে একবার আঙ্গুল বোলাতেই সম্পূর্ণ আঙ্গুলটা কালো হয়ে উঠল। স্বাভাবিক অবস্থায় হলে নিশ্চয়ই তাতে হাত দিতাম না, আস্তাকুঁড়ে যে সব ভাঙাবাসন পাওয়া যায় সেগুলোও মনে হয় এর থেকে অনেক পরিষ্কার। কিন্তু এই অবস্থায় আমার বিচার করা ঠিক নয়, আর বিশেষ করে খিদেয় আমার পেট জ্বলছে, কাজেই লামাকে ধন্যবাদ দিয়ে বসে পড়ালম তাদের সাথে। লামা বললেন বাটি পেতে দাও আর পেট ভরে খাও। লাবরা গোছের একটা তরকারী আর তার সাথে ভাত যা দিল তাতেই সবাই সন্তুষ্ট, বিনা পয়সার ভোজ এর বেশী কিছু আশা করাটাই অন্যায়, সবাই দেখলাম চেটে পুটে খেল—আরও অবাক হলাম যখন দেখলাম যে এরা খাওয়ার পর বাসন মাজার কোন প্রশ্নই তুলল না। খাওয়ার পর সেটাকে আবার তাদের ঝুলিতে ভরে রাখল। শুনেছি তিব্বতীরা খুব নোংরা, এখন স্বচক্ষেই তা দেখছি। সামনেই দৃশ্যমান তুষার শুভ্র পরিষ্কার হিমালয় আর আমার ঠিক পাশেই নোংরা অপরিচ্ছন্ন লামা। আমার কাছে এটা একটা বিরাট ছন্দপতন। নিজেকে আশ্বাস দিয়ে মনে মনে ভাবলাম এটাই জগৎ, ভাল, মন্দ নিয়েই তো এর সৃষ্টি! এই অপরিচ্ছন্ন লামাদের হৃদয়গুলো মনে হয় এই কাঞ্চনজঙ্ঘার মতোই সহজ ও সুন্দর।
বিকেলের দিকে মনটা অনেক হাল্কা হয়ে উঠল, নিজেকে আরও সংযত করে তুললাম। মনকে সান্ত্বনা দিলাম—নাইবা পেলাম সাধু বাবাকে, তাতে ক্ষতি কি ?
অন্ততঃ তাঁরই কারণে আমার গ্যাংটক দেখা হল। গয়া থেকে এই গ্যাংটকে আসার যে বিরাট অভিজ্ঞতা সেটা নেবে কে! এই যে সুন্দর হিমালয়, রঙচঙে সাজানো রাজবাড়ী, বুদ্ধ মন্দিরের পবিত্রভাব, সব কিছু মিলিয়ে মনে হয় আমার লাভ ছাড়া লোকসান হয়নি। হয়তো সাধুবাবা ইচ্ছে করেই আমাকে গ্যাংটকের কথা বলেছেন, তিনি আসলে হয়তো এখান থেকে অনেক দূরে। এখানে আমাকে আনাবার জন্যই হয়তো তিনি চালাকি করে বলেছেন যে তিনি গ্যাংটকে আসছেন। হয়তো তিনি গ্যাংটকে কোনদিনই আসবেন না।
যে কোন কারণেই হোক না কেন, আমি গ্যাংটকে এসেছি সেটাই আমার বিরাট লাভ। এবারের বাড়ী থেকে পালানোটা অন্যান্য বারের চেয়ে অ-নেক অ-নেক বেশী সার্থক হয়েছে।
বাড়ী থেকে না পালিয়ে উপায় ছিল না, প্রত্যেক দিন ছ’ঘন্টা ইস্কুলের গণ্ডীর মধ্যে আটকে থাকা আমার কাছে একটা অসহ্য ব্যাপার। বাড়ীতে দাদাদের বারবার জিজ্ঞেস করেছি লেখাপড়া শিখে কি হবে? উত্তরটাও পেয়েছি সেই একঘেয়েমি—মানুষ হতে হবে। মানুষ হওয়ার জন্য, এই উত্তরটা আমার কাছে শুধু যে একঘেয়েমি ছিল তাই নয় মনে হয় এটা একটা প্রাণহীন শব্দ। মানুষ হওয়ার জন্য কি চারটে দেওয়াল দরকার ? মাস্টারমশাইদের পারিবারিক আর মানসিক সমস্যার সমাধান করবার জন্যই যেন তৈরী করা হয়েছে আমাদের পিঠ। আমাদের কালীবাড়ীর ইতিহাস না শুনিয়ে তাঁরা শোনান ইংলণ্ডের ইতিহাস। বাড়ী আর ইস্কুলের এই সব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমার ছিল নীরব প্রতিবাদ। আমার প্রতিবাদের জবাবে পেয়েছি কানমলা আর বেত্রাঘাত। আমার সেই প্রতিবাদটা যখন আরও একরোখা হয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায়—তখনই আমি বাড়ী থেকে পালাই। বাড়ী থেকে পালানো, এটা আমার এক আনন্দের খেলা। এই সিকিমে এসে মনের সেই ছোট আনন্দটা মহানন্দে পরিণত হয়েছে। মানুষ গর্ব করে তার গুণ নিয়ে, আমার কোন গুণ নেই, কাজেই গর্ব করা আমার সাজে না। তবুও সিকিমের এই অবারিত আনন্দ আর উন্মুক্ত হিমালয়ের দৃশ্য দেখে বার বার যেন আমার বুক ফুলে উঠছে, চেঁচিয়ে সকলকে বলতে ইচ্ছে করছে, আমি দেখছি—আমি পাচ্ছি। এই দেখা আর পাওয়ায় আমার হৃদয়টা ভরপূর। তোমরা যারা দেখনি, যারা বইয়ের মধ্যে আর চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে পড়ে আছো, একবার কি আসতে পারো না? এই মহানন্দের সামান্যাংশও যদি তোমরা স্পর্শ করতে পারতে তাহলেই দেখতে এ জগৎ কি আনন্দময় ! বাতাসের সাথে মনের যোগাযোগটাইতো পরম যোগাযোগ !
মন্দিরের দালানে বসে আবোল তাবোল অনেক কিছুই ভাবতে লাগলাম ৷ কি অদ্ভুত আমার ভাগ্য! ঘরে বসে দিব্বি ভাল ছেলে হয়ে নির্বিঘ্নে থাকা যেত, কোথাকার ছেলে কোথায় এসে পড়েছি, ভদ্রলোকদের মতে আমার বর্তমান পরিবেশ অতি অভদ্র, কল্পনারও বাইরে। রাত্রিতে রাস্তায় শুয়ে আমার রাত কাটে, দিন কাটে ছন্নছাড়া গরীব কুলী আর ভিখিরীদের সাথে। খাওয়ার ঠিক নেই। খিদের জ্বালায় পেট জ্বলে, পাথর
আর ইট মাথায় দিয়ে শুতে শুতে মাথা শক্ত হয়ে গেছে, তবুও মনের আনন্দ আর উৎসাহ এতটুকু কমেনি ।
সন্ধ্যের পর আমি পাহাড় থেকে আস্তে আস্তে নীচে নেমে এলাম। আনচুকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। আমাকে দেখেই ও বুঝতে পারল যে আমার গুরু দর্শন হয়নি। আন্চুকে আমি বুঝিয়ে দিলাম যে সাধুবাবাকে না পেলেও আমার কোন অসুবিধে নেই, কারণ সিকিম আমার খুব ভাল লেগেছে। কোনো রকমে মাথা গোঁজার একটু জায়গা পেলে আমি সেখানে থেকে যেতে পারি। আচু আমার কথায় অবাক হয়ে গেলো—সেকি গ্যাংটক একটা বিরাট শহর, এত বাড়ী, বাজার, রাস্তা ; চেয়ে দেখো তারায় ভরা আকাশ, এত সব থাকতেও তুমি বলছো মাথা গোঁজার জায়গা নেই।—এ কথাটা ও ঠিক বুঝতে পারছে না। রাতের বেলা কম্বল লেপ না থাকলে যেটা একান্তই দরকার সেটা হচ্ছে আগুন, ওর মতে বাঁচবার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় হচ্ছে আগুন, আর খাদ্য। এই দুটো জিনিস থাকলে জীবনে আর অন্য কিছুর দরকার হয় না ।
ওর কথাটা খুবই সত্য, ভালভাবে ভেবে দেখলাম, আগুন আর খাদ্য এই দুটো জিনিস সত্যি দরকার। খাদ্যের জন্য আমরা বেঁচে আছি, আর আগুন আমাদের সেবা করছে। বর্তমান সভ্যতাটা সম্পূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে আগুনকে কেন্দ্র করে। আন্চুকে দেবার মতো আমার কিছু নেই, কিন্তু মনে হয় আচুই সব কিছু আমাকে উজার করে দিচ্ছে।
গ্যাংটক শহরের সাথে আস্তে আস্তে পরিচিত হতে লাগলাম, শহরে বৌদ্ধ ভিক্ষু বা লামাতে ছড়াছড়ি। গ্যাংটকের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে চৈত্য ও গুম্ফা বা বুদ্ধ মন্দির। গুম্ফাগুলোর একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলাম। এরা শুধু মন্দিরে পূজো করেই ক্ষান্ত হয় না, বুদ্ধ মন্দিরকে কেন্দ্র করে রয়েছে লামাদের থাকবার জন্য ব্যবস্থা, ধর্মশালা বা অতিথিশালা তারই সংলগ্ন। সিকিমে প্রায় ষাট-সত্তরটা এই ধরনের বুদ্ধ বিহার আছে আর তার অধিকাংশই গ্যাংটকের চল্লিশ পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে। সমতল ভূমি হলে চল্লিশ পঞ্চাশ মাইলের ব্যবধান খুব বেশী নয়, কিন্তু এই পাহাড়ী জঙ্গলাকীর্ণ পথে সেটা একটা বিরাট ব্যবধান। নেপালী, ভূটিয়া (স্থানীয় লোকেরা ভোটিয়া বলে), গুর্খা, লেপ্চা ও তিব্বতীরা সাধারণতঃ পায়ে হেঁটেই এই বিরাট দূরত্ব অতিক্রম করে। গ্যাংটক ছাড়া অন্যান্য শহর থেকে দূরবর্তী গ্রামগুলোতে হাঁটা পথই একমাত্র পথ। বুদ্ধধর্ম সিকিমের রাজ-ধর্ম। সাধারণ লোকেদের কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক পবিত্র শিখর কাঞ্চনজঙ্ঘা মনে হয় গরীবের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গ্যাংটকের আশপাশে যেখানেই যাওয়া হোক না কেন কাঞ্চনজঙ্ঘাকে চোখে পড়বেই, শ্রান্ত পথিকের তিনিই একমাত্র ভরসা, সর্বোচ্চে তিনি বসে আছেন সকলকে পথ দেখাবার জন্য।
তারপর আরও পাঁচদিন কেটে গেলো। এর মধ্যে আমি গ্যাংটকের রাস্তাঘাট মোটামুটি চিনে ফেলেছি। চলার পথে কয়েকজন বাঙালীরও দেখা পেয়েছি, অতি সাবধানে তাদের এড়িয়ে গেছি। আমি জানি যে তাদের সাথে আন্তরিকতা হলে আমাকে আবার বাড়ী ফিরতে হবে। শহরের আশপাশে যতগুলি গুম্ফা ও মন্দির আছে
সেগুলো সব তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি যদি তিনি থেকে থাকেন। আমার পরনের হাফ্ প্যান্ট ও সার্টটা এখন পাহারিয়া কুলিদের পোশাকের মতোই নোংরা হয়ে গেছে। তাতে আমার সুবিধাই হয়েছে, লোকে ভাবে যে আমিও তাদেরই একজন। আচুর সাথেই থাকি, খাওয়া দাওয়া করি। ওকে মালপত্র ওঠানামা করাতে সাহায্য করি, আর অবসর সময়ে ওকে কিছু কিছু ইংরেজি ও বাংলা শব্দ শেখাই। গ্যাংটকের ঠাণ্ডা এখন গা সহা হয়ে গেছে। কালিম্পং, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং থেকে গাড়ী এলে আচু তার পেছনে ছুটে যায় খদ্দের ধরবার জন্য। আমার বাসে ওঠবার বা খদ্দের ধরবার অধিকার নেই কারণ আমি সেখানকার লোক নই। ওদের দলে আমি পড়ি না, সর্দার আমাকে বার বার হুসিয়ার করে দিয়েছে, তবে আন্চুকে সাহায্য করতে কোন অসুবিধা নেই ।
তিস্তা বাজারে একটা বাস আসতেই যথারীতি আমরা ছুটে গেলাম তার পিছু, বাসটা গ্যারেজে ঢোকবার আগে মোড় ফেরাবার জন্য যেই স্পিডটা কমিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল শেরপার দল। আচু পেছনের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে পড়ল, আর আমি জানলার কাছে পজিসন নিয়ে নিলাম আনচুর মালগুলো ধরবার জন্য। বাসটা থামতেই যাত্রীরা আস্তে আস্তে নামতে শুরু করল, হঠাৎ একজন যাত্রীকে দেখে আমি চমকে উঠলাম! ভালভাবে দেখবার জন্য তাঁর দিকে এগিয়ে এলাম। যা ভেবেছি তাই, লাফিয়ে উঠলাম আনন্দে! ‘পেয়েছি’ বলে এগিয়ে গিয়ে পড়লাম তাঁর ঠিক সামনে। আমাকে পেয়ে তিনি জড়িয়ে ধরলেন। কি আনন্দ! সাধুবাবাকে খুঁজে পেয়েছি, আমি চেঁচিয়ে আন্চুকে ডেকে বললাম—এই দ্যাখ্ আমার হারানো রত্ন। আমার কথা শুনেই আন্চু নেমে এল, আচুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম সাধুবাবাকে।
একটু পরেই সাধুবাবার সাথের সেই তিনজন লামাও নেমে এলেন।
সাধুবাবা আমাকে দেখে কিন্তু মোটেই বিস্মিত হননি—তিনি জিজ্ঞাসাও করলেন না যে আমি সেখানে কিভাবে এসেছি, তবে তাঁর মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যায় যে তিনি আমাকে পেয়ে খুবই আনন্দিত ৷
আন্চু উপযাচক হয়েই সাধুবাবাকে আমার প্রসঙ্গে দু'এক কথায় কিছু বলল, অর্থাৎ কোথায় থাকি কি খাই ইত্যাদি। সাধুবাবার সঙ্গের লোকেরা আমাকে দেখে বলাই বাহুল্য খুব আশ্চর্য হয়ে গেছে। তারা বুঝতেই পারছে না যে এই হাজার হাজার লোকের মধ্যে কি করে আমি সাধুবাবাকে খুঁজে পেলাম। আমি সেই পুরোনো প্রবাদটাকে আর একবার তাদের শুনিয়ে দিলাম—‘ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়।’
সাধুবাবাকে আবার পাওয়া আমার কাছে এক বিরাট পাওয়া, সেই পাওয়ার বুঝি তুলনা নেই। তাঁকে পেয়ে গ্যাংটকের সৌন্দর্য আমার কাছে দ্বিগুণরূপে দেখা দিল। কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র ও পবিত্র শিখর আমার কাছে আরও পবিত্রতর হয়ে উঠল ।
এবারকার তাঁর দর্শন আমার কাছে আরও উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে মনে হতে লাগল । গ্যাংটকের এই বুদ্ধ লামাদের মধ্যে সাধুবাবা সম্বোধনটাও মনে হল ঠিক খাপ খায় না, তাই গুরুজী বলে সম্বোধন করতে লাগলাম। গুরুজীর সাথে কোন মালপত্র নেই, তবে
তাঁর সঙ্গী লামাদের একটা বাক্স ছিল। আচু উপযাচক হয়ে বলল যে মালপত্রগুলোকে সে পৌছে দেবে। আমি আন্চুকে অনুরোধ করলাম সে হাঁপিয়ে গেলে আমি বইব। পিঠে মাল বইবার জন্য যে দড়ির দরকার হয় সেই দড়ি আমার কাছে নেই, কাজেই আচুর সাহায্য নিতেই হয়। গ্যাংটক থেকে আমরা হাঁটা ধরলাম ওপরের দিকে। প্রধান সড়ক ধরেই আমরা উঠতে লাগলাম। রাস্তাটা বেশ চওড়া ও পরিষ্কার। দার্জিলিং-এর বাজার থেকে মলের দিকে যে মেইন রোডটা এগিয়ে গেছে, ঠিক সেই রকম, আচু হেলে দুলে হাঁটছে, আমরা ঠিক তারই পেছনে পেছনে চলতে লাগলাম । গুরুজীর সাথে রাস্তায় কথাবার্তা কওয়া যায় না, গয়াতে থাকতেই সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। তিনি চলার পথে কথা বলতে চান না, কাজেই আমরা প্রায় নিঃশব্দেই আস্তে আস্তে চলতে লাগলাম। মনে হয় আন্চুকে গুরুজী গন্তব্যস্থান বলে দিয়েছেন, কারণ সে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। এমনি করে খানিকক্ষণ বসে ও দাঁড়িয়ে আমরা প্রায় এক ঘন্টার মধ্যেই এসে পৌছলাম পাহাড়ের ওপরকার একটি বুদ্ধ মন্দিরে, স্থানীয় নাম এচে গুফা (Echey Gompha)। মনে হয় এটাই গ্যাংটকের সর্বোচ্চ পাহাড়। অন্যান্য পাহাড়গুলো গ্যাংটক শহরের বাইরে। এখান থেকে সম্পূর্ণ গ্যাংটক শহরটা পরিষ্কার দেখা যায়, বিশেষ করে রাজপ্রাসাদ ও তার সংলগ্ন মন্দির। কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য আরও চমৎকার।
গুম্ফাতে পৌঁছানো মাত্র প্রায় কুড়ি পঁচিশটি ছেলে এসে গুরুজীকে ঘিরে ধরল, মনে হয় তারা গুরুজীর খুব আপন জন। পাঁচ ছ'জন বয়স্ক লামাও গুরুজীকে স্বাগতম্ জানালেন। গয়ার পথের ভিখিরি সেই গুরুজীকে এখানে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। আনচু আবার আসবে বলে বিদায় নিল, গুরুজী আমাকে তাঁর সাথে থেকে যেতে বললেন। আমার এ এক পরম সৌভাগ্য বলতে হবে, গুরুজীর সম্মানে নিজেকে সম্মানিত বলে মনে করলাম।
এচে গুম্ফা, একটা পাহাড়ের ওপর পাইন ও পাহাড়ী ঝাউ গাছের বনের মধ্যে সুন্দর এক পরিবেশে স্থাপিত। গুম্ফা অর্থাৎ একটি বুদ্ধ মন্দিরকে ঘিরে একটি মঠ ও ছোট্ট একটি ধর্মশালা। বুদ্ধ মন্দিরটি উপাসনা ও পূজার্চনার জন্য ব্যবহার করা হয়। সাধুসন্ন্যাসীরা থাকেন তারই পাশের মঠে আর অতিথিরা থাকেন ধর্মশালায় । বুদ্ধ মন্দির ও মঠের মেঝে ও ভিতটা পাথরে তৈরী আর তারই ওপর সুন্দর কাঠের বিরাট বাড়ী। ধর্মশালাটা সম্পূর্ণই কাঠের, শক্ত কাঠের ওপর ছোট ছোট ঘর। গুরুজীর সাথেই আমার থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে। গুম্ফার চার পাশে পাহাড়ী-মাটির ওপর সিঁড়ির মতো করে বাগান তৈরী হয়েছে আর তারই পাশে এলাচীর বন। গুফায় শিশুর সংখ্যা ছাব্বিশ, তাদের বয়স নয় দশ থেকে চৌদ্দ পনেরোর মধ্যে ; আর পরিচালকমণ্ডলীতে রয়েছেন আটজন। আট জনের মধ্যে দু'জন বড় লামা তারা গুরু স্থানীয়, আর ছ'জন সাধারণ লামা। ছোট ছেলেরা নবীন ব্রহ্মচারী বলা যেতে পারে, তাদের বলা হয় দাবা ।
এক কথায় বলা যেতে পারে যে, মঠের শিক্ষক ও পরিচালক-মণ্ডলীর সবাই লামা পর্যায়ে পড়ে আর ছাত্ররা দাবা পর্যায়ের। ছাত্ররা সবাই পীতবসন পরিহিত। পরিবেশটা অতি চমৎকার। এর আগে এই ধরনের পরিবেশে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়নি। গয়ার সাথে তুলনা করলে এটা সত্যি স্বর্গ রাজ্য, এখানে সকালে উঠে ভিক্ষে করতে হয় না, তার পরিবর্তে করি প্রার্থনা। গুরুজীর সেবারও প্রয়োজন নেই, তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ দিনের বেলায় একটা নতুন কাজ পেয়েছি সেটা হচ্ছে এখানকার মন্দিরের বিগ্রহগুলোর ধুলো পরিষ্কার করে তাতে রঙ করা। দু'জন লামা এ কাজ করেন, আমি তাদের সাহায্য করি মাত্র। এখানেই আস্তে আস্তে পরিচিত হতে লাগলাম ভগবান বুদ্ধের বিভিন্ন রূপের সাথে, আর তার সাথে সাথে প্রচুর তান্ত্রিক বিগ্রহের সাথে। এখানকার বুদ্ধধর্ম মানে তান্ত্রিক বুদ্ধ-তত্ত্ব। এ দুটো পথই আমার কাছে নতুন, ভাষার অভাবে সকলের সাথে কথাবার্তা বলতে পারছি না বলে খুব বেশী একটা অসুবিধা বোধ করছি না ।
কয়েকদিনের মধ্যেই গুরুজীর আর একটা দিক আবিষ্কার করলাম তিনি আসলে একজন নামকরা বৌদ্ধ ভিক্ষু। সিকিমের কাছাকাছি কোথাও তার আদি বাড়ী। তিনি এককালে এখানকার একটি সঙ্ঘের সাথে যুক্ত ছিলেন, তারপর তিনি সে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে এখন সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছেন। তিনি লামা হলেও হিন্দু ধর্মে অনুরাগ বেশী। তাঁর মতে ভগবান তথাগত তো সেই বেদেরই সংস্কারক মাত্র, ভারতবর্ষের মাটিতেই ভগবান বুদ্ধের জন্ম আর সেই মহান্ ভারতের পবিত্র ভূমিতেই বুদ্ধবাণী ও ধর্মের সূত্রপাত আর স্বীকৃতি। কাজেই গুরুজীর কাছে ভারতবর্ষই হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তীর্থ। ভারতের মাটিতেই যুগে যুগে অবতাররা আসেন আনন্দ বাণী নিয়ে। গত পনেরো বছর যাবত তিনি লাসা, গয়া ও সারনাথ যাতায়াত করছেন। ভূটান, সিকিম ও নেপালী লামাদের নিয়ে তিনি যান তিব্বতে আর ফেরার পথে তিব্বতী সাধুদের নিয়ে আসেন ভারত দর্শনের জন্য, বলা যেতে পারে যে সৎসঙ্গের তিনিই পথ-প্রদর্শক। ভিক্ষা করা তাঁর নেশা, ভারতের রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করা মানে এক বিরাট ও মহান্ জগতের সাথে সরাসরি যোগাযোগ, সংস্কৃতির সংযোগ। বিচিত্র মানুষের স্বভাবের সাথে পরিচিত হওয়ার এটা একটা উপায় মাত্র। ভিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ হয়। সাধুরা দান গ্রহণ করে অপরকে মুক্তি দেয়, ব্যক্তি আত্মার কাছে সে ভিক্ষে চায় পরমাত্মার দর্শনের জন্য। মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে যে হরি তার দর্শনেই তার আনন্দ কিন্তু সাধারণ ভিখিরিরা ভিক্ষে করে শুধু পেটের দায়ে, সেটা যুক্তির পথ নয়, বাঁচবার পথ মাত্র ।
এবার গুরুজী এসেছেন গ্যাংটক থেকে একদল সাধুকে লাসার পথে নিয়ে যাবার জন্য। তার সাথে তিনজন সাধু তিব্বতের কোন একটি গুম্ফা থেকে বছর খানেক আগে এসেছেন তীর্থ ও বিদ্যার জন্য, এখন তাঁরা ফেরার পথে, মাসখানেকের মধ্যেই তাঁরা ফিরে যাবেন। গয়া, সারনাথ, বেনারস, কলকাতা, শিলিগুড়ি ও গ্যাংটকের এই গুম্ফাটা হচ্ছে তাদের মিলন ও প্রস্তুতি কেন্দ্র। সাধুবাবা আমাকে নিজে না বললেও এই সংবাদগুলো সংগ্রহ করতে মোটেই অসুবিধা হয়নি ।
দিন দশেকের মধ্যেই আরও আঠারোজন লামা সেখানে উপস্থিত হলেন।
মার্চমাসের প্রথম সপ্তাহে এচে (অনেকে জানে এসে মন্যাস্ট্রি বলে) মন্যাস্ট্রিতে সকলের জমায়েত হওয়ার কথা। হিসাব করে দেখলাম যে নির্দিষ্ট সময়ের আরও আটদিন বাকি । অর্থাৎ আর আটদিন পর আবার গুরুজীর সাথে বিচ্ছেদ হবে। কথাটা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম এবারে আর গুরুজীকে হঠাৎ হারাতে হবে না—মনটাকে প্রস্তুত করার সময় রয়েছে। বিকেলবেলা মঠের চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে গুরুজীকে প্রশ্ন করলাম,
—আপনি লাসায় যাচ্ছেন ?
—হ্যাঁ। গুরুজী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।
—আপনার সাথে আমিও যাবো। আমার কথাটা শুনে তিনি একটু স্নিগ্ধ হাসি হেসে বললেন,
—অন্য কেউ হলে আমি সরাসরি না বলে দিতাম কিন্তু তোকে সে কথা বললে তুই শুনবি না আর আমি জানি যে তোকে আটকে রাখারও কেউ নেই, তবে আমি চিন্তা করে দেখি পরে বলবো ।
—অসুবিধাটা কোথায় ?
—অসুবিধা অনেক। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বলতে লাগলেন—এক নম্বর অসুবিধা হচ্ছে যে তুই লামা বা সাধু নস, সাধু ছাড়া অন্য কাউকে আমি দলে নিতে রাজি নই। কারণ তিব্বতের বরডারে আজকাল চীনা সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে, তারা সাধু ছাড়া অন্য কাউকে ঢুকতে দিতে চায় না। দ্বিতীয় অসুবিধা হচ্ছে যে তুই ভাষা জানিস না, এই দুটোই হচ্ছে মূল অসুবিধা। অন্যান্য অসুবিধাগুলো হয়তো এড়িয়ে চলা যেতে পারে ।
—কিন্তু গুরুজী আমিতো নেপালী, ভোটিয়া, গুর্খা কোনো ভাষাই জানি না তা সত্ত্বেও তো বেশ মানিয়ে নিয়েছি, আমার তো কোন রকম অসুবিধা হচ্ছে না ।
গুরুজী আমার যুক্তি শুনে বললেন—তর্ক করে লাভ নেই, আমাকে একটু ভাবতে দে।
আমি থামতে বাধ্য হলাম। কথাটা ঠিক, তর্ক করে লাভ নেই, তাতে শুধু জটিলতা বাড়ে ছাড়া কমে না। গয়ার সেই ভিখিরি সাধুবাবা গ্যাংটকে গুরুজী। তার ব্যক্তিত্বেও মনে হয় অনেক পরিবর্তন হয়েছে অথবা হয়তো আমার মনের পরিবর্তনের জন্যই মনে হচ্ছে তাঁর পরিবর্তন হয়েছে। অতএব সবুর করা ছাড়া উপায় নেই।
আনচুর সাহায্যের কথা আমি ভুলিনি, আমার সময় হলে বাজারে গিয়ে ওর সাথে দেখা করি অথবা রাতের দিকে ও আমাদের এখানে আসে। গুল্ফার মধ্যে এসে আমাদের সাথে ও বেশীক্ষণ থাকে না, এখানকার নিঃশব্দ তপোবনের আবহাওয়ায় ও হাঁপিয়ে ওঠে। ওর মতে এ জায়গাটা প্রাণহীন, বাজারেই ওর প্রাণ। গুরুজী ওকে স্নেহ করেন, তাই আচু মাঝে মাঝে আমাদের সাথে খাওয়া দাওয়া করে।
সেদিন কথায় কথায় আন্চুকে আমার তিব্বতে যাওয়ার কথা বললাম। আন্চু অবাক হ'ল। জিজ্ঞাসা করল—তিব্বতে কি আছে? গুরুজী ওকে বুঝিয়ে বললেন যে তিব্বত একটি তীর্থক্ষেত্র, তা ছাড়াও দেশ হিসাবে সেটা খুব ভাল। আচু কথাটা শুনল বটে কিন্তু মুখ ফুটে গুরুজীকে কিছু বলল না। পরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমার যদি যাওয়ার উপায় হয়, যদি কোনদিন ঠাকুর করেন তাহলে কলকাতায় যাবো। আচুর কাছে তিব্বত এক মরুভূমি। সেখানে গিয়ে মরার চেয়ে কলকাতায় যাওয়া অনেক ভাল, কারণ সেখানে হরেক রকম মজা আছে আর টাকাতো বটেই ।
আমি সকাল সাতটার সময় ঘুম থেকে উঠি তারপর প্রার্থনা সেরে চলে আসি রান্নাঘরে। সেখানে রান্না তৈরী করতে সাহায্য করি। কয়লার উনোনে রুটি সেঁকা সহজ, কিন্তু কাঠের উনোনে রুটি তৈরী করার একটা বিশেষ বাহাদুরী আছে, বর্তমানে আমি সেটাই আয়ত্তে আনবার চেষ্টা করছি। উনোনে কাঠটাকে ঠেসে ধরছি ঠিক এমন সময় পেছন থেকে গুরুজী এসে দাঁড়ালেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন—বাইরে আয় তোর সঙ্গে একটু কথা বলার দরকার ।
তাঁর কথা শুনে পাশের লামার ওপর দায়িত্বভার দিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম । গুরুজীর সাথে মঠ থেকে বেরিয়ে পাহাড়ী ছোট্ট পথটা ধরে বনের দিকে চলে এলাম। গুরুজী আমাকে একটা পাথর দেখিয়ে দিয়ে বললেন বস্ এখানে ।
পাথরের ওপর বসে আমি গুরুজীর দিকে তাকালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন,
- –তোকে একটা কাজ দিচ্ছি মনোযোগ দিয়ে শোন। আজকে সারাদিন এই পাথরটার এখানেই থাকবি, অন্য কোথাও যাবি না। দুপুরে মঠে শুধু খেতে যাবি, তা ছাড়া সমস্ত দিনটাই এখানে কাটাতে হবে। কি রাজি তো ?
আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নেড়ে জবাব দিলাম—ঠিক আছে ।
—সারাদিন তোর একটা চিন্তাই থাকবে সেটা হচ্ছে তোর বাড়ীর কথা। আজকে সারাদিন ধরে তুই বাড়ীর কথা চিন্তা করবি, তোর বাড়ীর সবাই আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব কাউকে বাদ দিবি না, সকলের কথা চিন্তা কর, বাড়ীর লোকদের সাথে কল্পনায় যোগাযোগ করবার চেষ্টা কর।
আমি জবাব দিলাম--ঠিক আছে।
তিনি আমার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন—কাল সকালে চা জলখাবার খেয়ে এখানে আসবি, আবার কথা হবে ।
গুরুজীর কথানুযায়ী আমি চা জলখাবার খেয়ে চলে এলাম। পাথরের ওপর না বসে আমি আশপাশের চারিদিকে দেখতে লাগলাম ৷ এই বনটা আমার কাছে তপোবনের মতোই লাগছে। রূপকথার গল্পে তপোবনের যে পরিচয় পেয়েছি এটা যেন তারই জীবন্ত রূপ। ঝাউ গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে দেখতে পাচ্ছি কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার ঠিক উল্টোদিকে বিস্তীর্ণ উপত্যকা। এই উপত্যকার গা ঘেঁষে যে পাহাড়টি উঠে গেছে সেটা পার হলেই তিব্বত, দালাই লামার দেশ। মনটা উড়ে গেল তিব্বতে। তিব্বত সম্পর্কে কিছুই জানি না তবুও মনে হয় ওই নামটাই যেন আমাকে টানছে।
না ! এসব কি ভাবছি ? মনটাকে সংযত করলাম তাইতো অতদূরে না গিয়ে গুরুজীর কথামত চললেই ভাল, বাড়ীর কথা ভাবতে হবে।
মনটা যেন প্রস্তুতই ছিল, বাড়ীর কথা মনে হতে প্রথমেই মনে পড়ল ঠাকুরমার কথা, তারপর একে একে দিদি, দাদা ও পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের কথা। আমাকে নিয়ে বাড়ীতে নিশ্চয়ই খুব কথাবার্তা চলছে, কোথায় গেছি কি করছি ইত্যাদি। পাড়ার ও ইস্কুলের বন্ধুদের কথা মনে হতে লাগল। কিন্তু এসব চিন্তার মধ্যে খুব একটা বিশেষত্ব আমি খুঁজে পেলাম না, শুধু বার বার মনে হতে লাগল যে আমি যদি তাদের এখানে আনতে পারতাম, একবার যদি তারা তাদের গণ্ডীর বাইরে এসে এই অনন্ত সৌন্দর্যকে দেখতে পেতো তাহলে নিশ্চয়ই আমার আর তাদের মধ্যে এই প্রভেদটা থাকতো না । ছোটবেলা থেকেই ঘর পালানো আমার স্বভাব, প্রত্যেকবারই বাড়ী ফিরে গিয়ে তাদের বলি আমার নিত্য নতুন কাহিনী, তারা ভালবাসে শুনতে, তারা চায় জানতে অথচ কোনো এক অজ্ঞাত সুখের শিকলটা কেটে তারা বাইরে আসতে রাজি নয়। তাদের মতে--আমি বাউণ্ডুলে, হতচ্ছাড়া ইত্যাদি। আমি বার বার ভাবি, এই বিশ্বজোড়া আনন্দ স্বাদ-পাবার জন্য যদি হতচ্ছাড়া হতে জন্মাতে হয় তাহলে, হে ভগবান! আমাকে অনন্তকাল ধরে এই জন্ম দাও। একতারা বাজিয়ে রাঙা মাটির ওপর দিয়ে যেতে যেতে বাউল যে সুরের আনন্দে আত্মহারা হয়, সে আনন্দ কি ইস্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে পাওয়া যাবে?
গুরুজী আমাকে বলেছেন সারাদিন ধরে বাড়ীর কথা ভাবতে, কিন্তু ভাববো কার কথা? বাড়ীতে ঠাকুরমা ছাড়া আমার বাঁধন নেই। বাপ মা ছোট বেলাই মারা গেছেন, মানুষ হচ্ছি দাদা বৌদিদের কাছে ।
পিতৃ-মাতৃ হারা এটা আমার দুর্ভাগ্য নয়, আসলে পরম সৌভাগ্য। হয়তো এ কারণেই আমি আরও বাঁধন ছাড়া। কাজেই পাথরের ওপর বসে গালে হাত দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ভাববো, এমন ভাবার পাত্র আমি নই। বার বার চেষ্টা করেও সে রকম কাউকে পেলাম না। পাথরের ওপর চুপচাপ বসে থাকতেও আমার ভাল লাগে না, মনে হয় তাতে সময়ের অপচয়। অথচ গুরুজীর কথা অমান্য করতেও ইচ্ছা নেই। আমার এ গুরু ভাবগম্ভীর ঊর্ধ্বলোকের গুরু নন, তিনি আমার বন্ধুস্থানীয়, তাঁর কথার মধ্যে যে স্নেহ ও ভালবাসা লুকিয়ে আছে সেটা আমার অন্তরকে স্পর্শ করেছে। গয়ার ধর্মশালায় তাঁর পীঠে সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছি, আবার নাকে দুব্বোঘাসের সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছি । তাঁর কৌপীন পরে কতবার রাস্তায় বেড়িয়েছি আর তাঁর অকথ্য হিন্দী গালাগাল খেয়ে প্রাণভরে হেসেছি,—বাড়ীর কথা ভাবতে গিয়ে তাঁর কথাই বার বার মনে পড়ে। সাধুবাবা বা গুরুজী আমার ফুটপাতের সাথী, একই নিম-দাতনের এ মাথা দিয়ে উনি দাঁতন করেছেন আর ও মাথা দিয়ে দাঁতন করেছি আমি। এখানে গ্যাংটকেও একই সরায় আমরা ভাত খাই। এ গুরু আমার অন্তরের গুরু আমার দরদী বন্ধু ।
কিন্তু তিনি আমাকে বাড়ীর কথা চিন্তা করতে বললেন কেন ? ঠাকুরমার কি কিছু হল ? আর হলেই বা আমি কি করতে পারি? তাঁর সেবা করার লোকের তো অভাব নেই !
সেদিন সারাদিন এবং সন্ধ্যে পর্যন্ত বাড়ীর কথা চিন্তা করতে লাগলাম, কিন্তু সে চিন্তায় গুরুজীই বার বার এসে পড়েছেন। গয়াতে গুরুজীকে আমি যা বলতাম তিনি তাই শুনতেন, তাঁর খাওয়া-ধ্যান-স্নান-ঘুম সব কিছুর মধ্যে আমার ছিল কড়া নজর। তিনি অনেকবার ধর্মশালা পালটাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি দিইনি। তিনি ছোট্ট শিশুর মতো আমার কথা শুনতেন, সম্পর্কটা ছিল অনেকটা দাদু-নাতির মতো। সে সম্পর্কটা এখনও বজায় আছে তবে পরিবেশের জন্য তার প্রকাশটা কম। সে কারণেই কথাবার্তাও কম। তাঁর ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে, সে কারণেই তিনি বলেছেন বাড়ীর কথা ভাবতে। অতএব আমি ভাবছি। এ ভাবনাটা বিকেলের দিকে আমাকে একঘেয়ে করে তুলল। শেষে পাথর ছেড়ে উঠে দাড়ালাম। বনের একটা গাছকে উদ্দেশ্য করে বললাম—না! আর নয়। বাড়ীতে গিয়ে বাড়ীর কথা ভাববো কিন্তু এখন নয়। গ্যাংটকে বসে বাড়ীর কথা চিন্তা করা মানে এখানকার আনন্দটাকে মাটি করা। সন্ধ্যের দিকে আমি বন ছেড়ে মঠের দিকে ফিরে এলাম। সেদিন রাতে গুরুজীর সাথে আর কোন রকম কথাবার্তা হয়নি ৷
পরের দিন নির্দিষ্ট সময়ে সেই পাথরের কাছে এসে বসলাম গুরু-শিষ্যে। তিনি হাসিমুখে বললেন—আজকেও কি বাড়ীর কথা ভাবছিস ? আমি বললাম—না ৷
তিনি বললেন—তোর যদি বাড়ী যাবার ইচ্ছে থাকে তাহলে আমাকে বল আমি তোকে টিকিট কেটে ফেরার বন্দোবস্ত করে দেবো ৷
টিকিট কেটে! আমি আশ্চর্য হলাম। ভিক্ষে করে যাঁর দিন চলে সে দেবে আমার গ্যাংটক থেকে কলকাতা যাবার খরচা !
মনে হয় গুরুজী বুঝলেন আমি কি ভাবছি। তিনি আগের সুরেই বললেন— হ্যাঁ, টিকিট কেটেই। ঠিক ভদ্রলোকের ছেলেদের মতো তোকে যাবার বন্দোবস্ত করে দেবো, টাকা আমার আছে চিন্তা করিস না ।
—না, আমি বাড়ী যেতে চাই না,'আমি যাবো আপনাদের সাথে তিব্বতে। আমার জন্য চিন্তা করবেন না, আমি আপনাদের পেছন পেছন গিয়ে ঠিক হাজির হব। আমি তাঁকে আশ্বাসের সুরে বললাম ।
—সেটা আমি জানি, তৈয়ার হো বেটা। আনন্দ সংবাদ ! তাঁর কথা শুনে আমি তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরলাম। ভাবাবেগে বললাম ঠিক আছে আমাকে তৈরী করুন ।
তিনি একটু চিন্তা করে বললেন—ঠিক আছে তাহলে মন দিয়ে শোন আমি যা বলছি।
আমি তাঁকে বললাম—যা বলবেন সেটাই হবে আমার ব্রত ।
গুরুজী বলতে লাগলেন,
—এই একই পাথরের ওপর আজকে যতক্ষণ পারিস বসে থাকার অভ্যাস কর, কোমর ধরে গেলে বা খুব কষ্ট হলে মাঝে মাঝে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করবি তারপর আবার এসে এখানে বসবি। বুঝলি তো? কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বলতে
শুরু করলেন—আজকের চিন্তাধারাটা হবে অন্যরকম। ভাল করে শোন, পাথরের ওপর যে রকম করে খুশী তুই বসতে পারিস, কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। বসে সামনের দিকে সোজা তাকাবি, দূরে দেখ পাহাড় আর আকাশের সংগম ঘটেছে, তাই না ? –ঠিক, আমি বললাম।
—দৃষ্টি সব সময়ই সামনের দিকে থাকবে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকে ভালভাবে দেখবি। মনে মনে চিন্তা করবি, এই আকাশ মানে অনন্ত, মহাশূন্য ; সুখ দুঃখের অতীত। আর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করবি যে এই পাহাড়টা বিরাট, তার অস্তিত্ব আছে, সে সীমার মধ্যে আবদ্ধ। গুরুজী আর একবার ভাল করে তাঁর কথাগুলোকে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন তারপর আশ্বাস দিয়ে বললেন, —যদি খুব একঘেয়েমী লাগে অথবা একান্তই অসুবিধা হয় তাহলে মঠে আমার কাছে চলে আসবি ।
–ঠিক আছে। আপনার উপদেশ শিরোধার্য। এই বলে তাঁকে আশ্বাস দিলাম। গুরুজী কিছুক্ষণ সেখানকার বনে পায়চারী করে তারপর শহরের দিকে নেমে গেলেন হয়তো কোন কাজ থাকবে।
‘জয় গুরু’ বলে আমি পাথরের ওপর আমার চাদরটা পেতে বসলাম। বলাই বাহুল্য মঠাধ্যক্ষ আমাকে একটা কম্বল ও চাদর দিয়েছেন, নয়তো এখানকার ঠাণ্ডায় কষ্ট পেতে হতো। গুরুজীর নির্দেশমতো আমি আকাশের দিকে তাকালাম, অসীম নীল আকাশ তার ওপর দিয়ে মেঘ ভেসে চলেছে অনন্ত দিগন্তের দিকে। অনন্ত-অসীম, কথাগুলো চিন্তা করতে লাগলাম আর সেই কথার সাথে আকাশের সামঞ্জস্য খুঁজতে লাগলাম। অনন্ত মহাশূন্য কথাটা কিছুটা হয়তো সত্যি, কিন্তু সুখদুঃখের অতীত মানে কি ? কিছুক্ষণ ভেবে যুক্তি দিয়ে ইহার বিশ্লেষণ করতে লাগলাম—সত্যিই তো এই যে অনাদি অনন্ত আকাশ তার মধ্যে তো কোন দুঃখ নেই, দুঃখটাতো আসলে শরীরের, কাজেই দুঃখের সীমানা হচ্ছে এই শরীর আর জগতের মধ্যে। এই দেহ নশ্বর মরণশীল ; আকাশের এই অনাদি অনন্তের মধ্যে শারীরিক দুঃখ থাকার কথা নয়। অনাদি ও অনন্তকালের তুলনায় এই শরীরের ক্ষুদ্র দুঃখ একান্তই অগ্রাহ্যের। এমনও হয়তো হতে পারে যে, মনটাকে যদি ঊর্ধ্বমুখী করা যায়, মনটাকে যদি অনেক উঁচুতে নেয়া যায় তাহলে জগতের দুঃখকে দুঃখ বলে আর মনে হবে না। এতো গেলো শুধু দুঃখের কথা, কিন্তু গুরুজী বলেছেন, সুখ ও দুঃখের কথা। মনটাকে উঁচুতে তুললে দুঃখটাকে ডিঙ্গিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু সুখটাকে ডিঙ্গোবার দরকার কি? মানুষমাত্রেই তো সুখ চায়। বিশ্লেষণ করতে লাগলাম ; আমার দর্শন পড়া নেই। ধর্মের ‘ধ’ও জানি না, তবুও গুরুজীর আদেশমতো আমাকে ভাবতেই হবে।
আজকের বিষয়টা বেশ ভাল, গতকালের মতো একঘেয়েমী নেই। কখনো বসে কখনো বনের মধ্যে পায়চারী করতে করতে আমি ভাবতে লাগলাম। সকালের রোদটা খুব ভাল লাগে তার ওপর পাইন গাছের মধ্য দিয়ে হিমালয়ের দৃশ্য, এই দুই মিলিয়ে মনটাকে খুব হালকা করে দিয়েছে।
সুখের অতীতে কেন যেতে হবে? মনে হয় সুখটা দুঃখেরই বিপরীত, অথবা সুখদুঃখ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, একটাকে টানলে আর একটা আসতে বাধ্য। সুখ চাইলে দুঃখটাকেও চাওয়া হয়, এরা ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত ঠিক আলো আর অন্ধকারের মতো। হয়তো সে কারণেই গুরুজী বলেছেন—আকাশ, অনন্ত, মহাশূন্য সুখদুঃখের অতীত। আমাদের মন ও হৃদয়টাও নিশ্চয়ই আকাশের মতো, সেখানে বিভিন্ন বস্তুর কারণে সুখদুঃখরূপ মেঘের উদয় হয়, মনেরও ঊর্ধ্বে যে আত্মা সেখানে নিশ্চয়ই সুখ দুঃখের কোন ব্যাপার নেই। মনে হয় আমাদের এই মনটাকে যদি অনন্তের দিকে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে সেখানে সুখ বা দুঃখ কিছুই নেই ।
যুক্তিটা ভাল লাগলো, নিজেকে আশ্বস্ত করলাম। সকালের দিকে এই ধরনের আরও অনেক চিন্তা মাথায় এল আবার নিরুদ্দেশও হল। দেখলাম এই ধরনের চিন্তা মনকে ভারী করে না, বরঞ্চ আরও চিন্তা করবার জন্য উৎসাহিত করে। দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে এল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার জন্য ডাক এল ।
খাওয়ার পর দ্বিতীয় চিন্তার জন্য প্রস্তুত হলাম। দূরের এই পাহাড়টা, কি বিশাল তার রূপ, জগতের এক বিরাট অংশ নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। গুরুজী বলেছেন—পাহাড়টা বিরাট, সে সীমার মধ্যে আবদ্ধ। কথাটা ঠিক, পাহাড় সে যত বড়ই হোক না কেন সে সীমার মধ্যে আবদ্ধ। কিন্তু রূপতো সীমার মধ্যেই পাওয়া যায়, রূপ দেখেই তো আমাদের মধ্যে সুখ ও দুঃখের উৎপত্তি হয়, সুখদুঃখ ‘তাহলে সব সময়ই সীমার মধ্যে আবদ্ধ। কি অদ্ভুত এই জগৎ, এই অনন্ত-অসীমের মধ্যেই রয়েছে সীমা। আমাদের এই দেহটা সীমার মধ্যে আবদ্ধ, কিন্তু মনটাকে মনে হয় চালিয়ে নেওয়া যায় অসীমের দিকে। এই যে আমি বসে আছি এই পাথরের ওপর, আমার এই দেহটা ইহার স্থূলত্ব নিয়ে জড় হয়ে আছে, চোখ, কান ও অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলো মনকে পৌঁছে দিচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ, কিন্তু আমার চিন্তাধারাটা সম্পূর্ণ মুক্ত। সে যেখানে খুশী যাচ্ছে, অনন্ত নীলাকাশকেও সে অনুভব করতে পারছে। কি অদ্ভুত! আমার মধ্যেই তো রয়েছে আত্মারূপী অনন্ত আর দেহরূপী সীমা। গুরুজী কি এটাই আবিষ্কার করবার জন্য আমাকে চিন্তা করতে বলেছেন ? কি জানি, হয়তো এর চেয়ে আরও আকর্ষণীয় তথ্য কিছু লুকিয়ে আছে তাঁর এই উপদেশের মধ্যে। সেও সম্ভব তবে আপাততঃ আমার এর চেয়ে মনে লাগার মতো ভাবধারা বা ব্যাখ্যা মনে আসছে না, তবে পরে হয়তো আসতে পারে, তাই কিছুক্ষণ বনের মধ্যে পায়চারী করে আবার বসে পড়লাম পাথরটার ওপর। নয়নভরে দেখতে লাগলাম শুভ্র ও পবিত্র কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়নাভিরাম দৃশ্য ।
তৃতীয় দিন গুরুজী দিলেন নতুন নির্দেশ। তিনি বললেন—তোমার মনটাকে মনে কর একটা আকাশ আর মনের চিন্তাস্রোতকে মনে কর মেঘ। আকাশের মেঘগুলোকে দেখার মতো মনের চিন্তাস্রোতগুলোকে দেখতে থাক। শুধু নীরব দর্শক হয়ে আকাশের মেঘ দেখার মতো চিন্তাস্রোতটা কোথা থেকে আসছে কোথায় যাচ্ছে তা লক্ষ্য করার চেষ্টা কর ।
আমি বাধ্য ছেলের মতো গুরুজীর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের উপদেশগুলোকে পালন করতে লাগলাম ।
চতুর্থ দিনে গুরুজী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন— তোর কি কোন অসুবিধা হচ্ছে ? একদম না।
–এই বনের মধ্যে একা থাকতে কি খুব একঘেয়েমী লাগছে ?
-না।
কষ্টের কোন প্রশ্নই আসে না। সকলের সাথে ঘন্টা বাজার সাথে সাথে হাজির হই, খাওয়া দাওয়ার পর চলে আসি। সারাটা দিন কাটে সম্পূর্ণ নির্জনে, রাত্রিবেলা মঠে গিয়ে প্রার্থনা করি তারপর শুয়ে পড়ি। এটা প্রায় নিয়মমাফিক হয়ে গেছে, তবে আমি জানি যে গুরুজীর এই নির্দেশের মূলে নিশ্চয়ই কোন কারণ রয়েছে, তাই কোন রকম কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। আমার কাছে একটা নতুন নেশা হয়ে দাড়াল। সম্পূর্ণ নির্জনে এরকম একা একা কোনদিন থাকিনি। মনে হয় আমার আচরণে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি বললেন—আজকে আর তোকে বনে যেতে হবে না। তারপর খুব গোপনভাবে জিজ্ঞাসা করলেন,
——তুই কি সত্যি তিব্বতে যেতে চাস ?
আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে বললাম—নিশ্চয়ই। তবে আপনার যদি একান্তই অমত থাকে তাহলে আপনার সাথে আমি যাবো না। আমাকে রাস্তাঘাট ও প্রয়োজনীয় তথ্য কিছু কিছু জানিয়ে দিলে আমি নিজেই চলে যেতে পারবো ।
গুরুজী আমার কথা শুনে একটি মোক্ষম প্রশ্ন করে বসলেন-তিব্বতে যেতে চাস কেন ?
আমি তাঁর কাছ থেকে এই প্রশ্নটা আশা করিনি, কারণ আমি জানি যে তিনি নিজে ভবঘুরে, তিনি নিশ্চয়ই জানেন এর উত্তর। আমি এর উত্তর জানি না। কিন্তু গুরুজী প্রশ্নটা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন উত্তরের জন্য তাই তাঁকে কিছু বলতেই হবে। উত্তরে জানালাম,
—ওই যে দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর দিয়ে মেঘগুলো যাতায়াত করছে, আপনি কি জানেন কেন তাদের এই গতিবিধি ?
গুরুজী আমার উত্তরটা শুনে প্রসঙ্গ পালটালেন—আজ তুই শিল্পী লামাকে রঙ করার কাজে সাহায্য কর, তারপর কাল সকালবেলা আবার তোকে কিছু করবার জন্য দেবো।
—ঠিক্ হায় গুরুজী, আপ্কো যেয়সা মর্জি।
পঞ্চমদিনে খুব ভোর বেলা গুরুজী আমাকে ঠেলে তুললেন। বললেন—যা প্রাতঃকৃত্য সেরে আয় ।
তখনও সূর্যোদয়ের অনেক দেরী, কম্বল ছাড়তে একটু বেগ পেতে হল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত না ছেড়ে উপায় নেই। বাগান সেরে চৌবাচ্চায় ঠাণ্ডা জলে মুখ ধুয়ে এসে হাজির হলাম গুরুজীর সামনে। তিনি আমাকে নিয়ে মন্দিরে এলেন। মন্দিরে ঘিয়ের প্রদীপটা সব সময়ই জ্বলন্ত থাকে, তিনি সেটাকে একটু উস্কে দিলেন তারপর পাশের নতুন বস্ত্রখণ্ড নিয়ে উগবৎ প্রণাম সারলেন। তাঁর দেখাদেখি আমিও করলাম। তারপর তিনি আমাকে পাশের প্রার্থনা বেদীতে বসতে বললেন। এখানে লম্বা প্রার্থনা বেদীতে সব সময়ই গদি পাতা থাকে, যে-কেউ সেখানে যখন খুশী এসে ধ্যানে বসতে পারে ।
গুরুজী বললেন—ভাল করে ভগবান তথাগতের মুখের ভাব লক্ষ্য করতে থাক ।
প্রদীপের মৃদু আলোতে সেই বিরাট মূর্তিটা প্রায় অস্পষ্ট, তার ওপর বছরের পর বছর ধরে প্রদীপের শিখার কালিতে ঘরটাও প্রায় কালো। ভগবান তথাগতের মূর্তিটাও বিরাট, এত কাছ থেকে সেই মূর্তিটার সম্পূর্ণ অবয়বকে দৃষ্টির মধ্যে আনা মুশকিল । তাই চেয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। প্রদীপের আলোটা সরাসরি তার চোখে গিয়ে পড়েছে, সাদা চোখের ওপর নীল রঙের নেত্রবিন্দুটা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে, সেদিকেই আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রইল। মনে হচ্ছে তিনি যেন আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। সেদিক থেকে আমি দৃষ্টি ফেরাতে পারলাম না। আমার সামনেই যেন দেখতে পাচ্ছি ধ্যানী পবিত্র ও শান্ত বুদ্ধের এক অপরূপ জ্যোতি—অপলক দৃষ্টিতে সেদিকে আমি চেয়ে রইলাম। তার চোখের জ্যোতিতে আস্তে আস্তে সমস্ত মন্দিরটা যেন আলোকিত হয়ে উঠতে লাগল। তথাগতের মুখটা এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কি অপূর্ব অনুভূতি .. |
এমন সময় কানের কাছে গুরুজীর কন্ঠ শুনতে পেলাম—তিনি ফিস ফিস করে বললেন,
এবার আস্তের ওপর চোখ দুটো বন্ধ কর, শরীরটাকে একদম নাড়াবি না, চুপচাপ বসে বসে শুধু ভগবান বুদ্ধের অপূর্ব জ্যোতিটা উপলব্ধি করার চেষ্টা কর। তার আলো যেন আস্তে আস্তে তোর দেহের ওপর এসে পড়ছে, তোর দেহটা আলোকিত হয়ে উঠছে, এইভাবে কিছুক্ষণ বসে থাক, মনে মনে শুধু তথাগতের উজ্জ্বল মুখটা চিন্তা কর। চোখটা বুজেই থাক ; এইবার মুখ ফুটে বল—“ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্ ... ' ; মনে মনে এই মন্ত্রটা জপ করতে থাক্। মন্ত্রটাকে হারাসনি, মুখ দিয়ে বল আর কান দিয়ে শোন্ ।
গুরুর উপদেশানুযায়ী আমি চুপচাপ বসে সেই মন্ত্র জপতে লাগলাম ।
-বেশ কিছুক্ষণ পরে চেষ্টা করেও মন্ত্রটাকে ধরে রাখতে পারলাম না, বার বার হারাতে লাগলাম। এমন এক সময় এল যখন চিন্তা আর মন্ত্রের সঙ্ঘাত বেঁধে উঠল ; আমার ইচ্ছা মন্ত্রটাকে ধরে রাখার, আর চিন্তা বার বারই তার জায়গা দখল করে বসছে। নানা রকমের চিন্তা মাথার মধ্যে যেন কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে তুলছে। আবার শুনতে পেলাম গুরুজীর কন্ঠ—মনটাকে হালকা করে রাখ। মনের মধ্যে চিন্তা এলে তাকে আসতে দে, তার সঙ্গে যুদ্ধ করে লাভ নেই। তাকে ভালবাসা দিয়ে জয় করতে হবে। কোন রকম চিন্তাই খারাপ নয়। ভালমন্দের বিচার করিস না, শুধু আস্তের ওপর চিন্তার জায়গায় মণি মন্ত্রটাকে বসিয়ে দে ।
আমি পা-টাকে একটু বদলিয়ে নড়েচড়ে আবার স্থির হয়ে বসলাম, মনে মনে জপতে লাগলাম—‘ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্ --
এইভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেলো তারপর ঘুম ভাঙার মতো হঠাৎ মনটা জেগে
উঠল, মনে হয় বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চেয়ে দেখলাম সামনে গুরুজী নেই, বাইরের রোদটা দরজা দিয়ে ভেতরে এসে উঁকি মারছে। আমার চমক ভাঙলো, দরজাটা পশ্চিমমুখী, এখান দিয়ে যখন সূর্য ভেতরে আসে তখন সাধারণতঃ বিকেলের দিক। আমি উঠবো কি না জানি না। দেহটাকে খুব হালকা লাগছে, মনটা মনে হয় হালকা মেঘের চেয়েও হালকা—কি অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি! দরজা দিয়ে একটা মুখ উঁকি দিল, তার দিকে তাকাতেই সে নিরুদ্দেশ হল। মঠের কোন একটি শিশু বলে মনে হয়। চুপচাপ বসে স্ট্যাচুগুলোকে আবার দেখতে লাগলাম। এমন সময় ঢুকলেন গুরুজী।
হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলেন—কেমন লাগছে ?
-খুব ভাল লাগছে। দেহ ও মন খুব হালকা লাগছে, মনে হয় আমি উড়ে যেতে পারবো। উত্তর দিলাম ।
গুরুজি হেসে বললেন- -এখন উঠতে পারিস, যা, কিছু খেয়ে নে, রান্নাঘরে নাউকা তোর জন্যে বসে আছে । -
আমি আসন ছেড়ে উঠলাম, ভগবানকে প্রণাম করে গুরুজীকে প্রণাম করলাম। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম—আপনি কি আমাকে বৌদ্ধ ভিক্ষু মতে দীক্ষিত করছেন ? তিনি বললেন—তাঁকে জানাটাই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। মত আর পথ নিয়ে সেই উদ্দেশ্যটাকে হারিয়ে লাভ নেই।
—গুরুজী, আমার জানতে ইচ্ছে করছে, আমি যেভাবে আজ ধ্যান বা প্রার্থনা করলাম সেটাই কি মহাযান বা হীনযান পন্থা ? তিব্বতে শুনেছি বজ্রযানের খুব প্রচলন। উত্তরে তিনি জানালেন—সব যানই সেই মহাসত্যে পৌঁছে দেয় ।
তাঁর উত্তর শুনে আমি থামতে বাধ্য হলাম। বুঝলাম যে তিনি দর্শনের তর্কের মধ্যে মহাসত্যের পথকে হারাতে চান না। গুরুজীর মতে সাধারণের পক্ষে ভজন পূজন আর ধ্যানের মাধ্যমেই সত্যের পথ সহজ। আর যারা দর্শনের কঠিন তত্ত্ব ও রহস্য নিয়ে তর্ক করে তারা চলে কঠিন পথে ।
গুরুজী আমাকে বললেন—এখন থেকে সব সময়ই এই মণি মন্ত্র জপতে থাকবি। যতক্ষণ পারবি মনে মনে জপতে থাকবি, একদম বিরাম দিবি না।
গুরুজীর বাক্য শিরোধার্য। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি তখন বেলা দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে পড়েছে। কিভাবে যে সময়টা এত তাড়াতাড়ি কেটে গেছে আমি সেটা কল্পনাও করতে পারছি না।' মনে হয় ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত আমার এক জায়গায় বসেই কেটে গেছে। আমার কাছে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা—নতুন স্বাদ--নতুন জগৎ। আবার বসবার জন্য মনটা ছট্ফট করতে লাগল। এই অনুভূতিই মনে হয় আনন্দানুভূতি । এতে আমার কৃতিত্ব কিছু নেই, গুরুর কৃপা মাত্র ৷ ‘গুরু কৃপাহি কেবলম্।’
পরের দিন সকালবেলা গুরুজী সকলকে বললেন যে আমি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত
হয়েছি, সকলে হাসিমুখে আমাকে তাঁদের মধ্যে গ্রহণ করলেন। বিকেলবেলা মঠের একজন লামাকে দিয়ে আমার মাথা মুণ্ডিত করে দিলেন, আর তারপর থেকেই আমাকে মঠের অন্যান্য সকলের মতো পীত-বসন পরতে নির্দেশ দিলেন। তাঁদের সাথে আমিও যুক্ত হলাম ৷
সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই হল অতি সাধারণভাবে। কোন রকম জাঁকজমক দীক্ষা-পর্ব পূজো-আচার কিছুই হল না। বিনা উপনয়নেই আমি দীক্ষিত হলাম। গুরুজী বললেন—সত্যের পথ অতি সহজ। আড়ম্বরের কোন দরকার নেই, দরকার অন্তরের ভক্তি ও সততা ।
গুরুজী শিক্ষককে অনুরোধ করলেন আমাকে তিব্বতী অক্ষরগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। হাতে মোটেই সময় নেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে সেটা আয়ত্তে আনতে হবে। শুরু হল আমার তিব্বতী ভাষা শিক্ষা। আমার এখন কোনো নাম নেই, গুরুজী কোন নাম দেননি, মঠের সকলে ‘এই’ ‘ওই’ বলেই সম্বোধন করে। দিনগুলো বেশ আরামে কাটতে লাগলো। লামা বা বৌদ্ধ ভিক্ষুর পোশাকে মনে হল আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বটাই যেন পাল্টে গেছে, এই পোশাকের মাহাত্ম্য আছে বলতে হবে। তিব্বতী ভাষায় ওদের প্রার্থনা, সেটাকে আমি বাংলা অক্ষরে লিখে নিয়েছি কাজেই তাঁদের সাথে সমবেত প্রার্থনায় যোগ দিতে কোন অসুবিধা হয় না। প্রার্থনা ও মণিমন্ত্র ছাড়া আমার কথাবার্তা বলা প্রায় বন্ধ। তিব্বতী ভাষার ক্লাশেও সেই একই অবস্থায় আমাকে শুনতে হয় ও লিখতে হয় কথা বলা নিষেধ। মৌন কথাটাই আমার কাছে স্বাভাবিক হয়ে এল।
তিব্বতে যাত্রার নির্দিষ্ট দিন পেরিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সব যাত্রী লামারা এসে সেখানে জমায়েত হয়েছেন। মার্চ মাসের মাঝামাঝি হয়ে গেল তবুও তাঁদের যাবার কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। গুরুজী বলেছিলেন যে মার্চ মাসের প্রথম দিকেই তাঁরা যাত্রা করবেন। জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হলাম ।
তিনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন-তিব্বতে যাওয়া দিনদিন অসম্ভব হয়ে উঠছে। আগে তিব্বতে যেতে হলে কোন রকম কাগজ পত্রের দরকার হতো না, সীমানার কোন প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু ১৯৫০ সালের পর থেকে নেপাল, সিকিম ও ভুটিয়াবাসীদের কাগজপত্র দরকার হয়। সরকারের তরফ থেকে লিখিত অনুমতি দরকার। কাঠমাণ্ডুর দূতাবাস থেকে একটা ছাড়পত্র দেওয়া হয়, একমাত্র লামারাই আজকাল তীর্থযাত্রী হিসেবে তিব্বতে যেতে পারে। ভারতবাসীদের ওরা কোন রকম অনুমতি দেয় না। তাঁর কথা শুনে আমি জিজ্ঞাসা করলাম — আমিতো ভারতীয় গুরুজী, তাহলে আমাকে নিশ্চয়ই ওরা যেতে দেবে না ।
-সেটা ঠিক, তোকে ওরা বরডারেই আটকে দেবে, তবে আমি ওদের বলবো যে তুই আমার চেলা, সিকিমের ছেলে।
—কিন্তু গুরুজী আমি ভাষা জানি না, আর ওরা আমাকে দেখলেই বুঝবে যে আমি এদেশের ছেলে নই ।
আমার কাঁধে হাত দিয়ে গুরুজী আমাকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি বললেন—তুই চিন্তা করিসনি আমি তোর হয়ে সব ভেবেছি, আমার পরিকল্পনাটা তোকে খুলে বলছি মন দিয়ে শোন ; তুই জানিস যে আমার ডান পায়ের জোর কমে গেছে, তোকে তোর মালের সাথে আমার কম্বলটা বইতে হবে। মনে করছিস এটা কিছুই না এ খুব হাল্কা কাজ কিন্তু রাস্তায় নেমেই বুঝবি। এতেআমার একটা বিরাট উপকার হবে। আমাদের পারমিশন বাহান্নজনের জন্য, মনে হয় কিছুতেই তিরিশজনের বেশী যাত্রী হবে না। চীনারা তিব্বতে আসার পর থেকে লামারা ইচ্ছা থাকলেও যেতে চায় না ; পারমিশনের কাগজে কোন নাম নেই, কাজেই যাকে খুশী আমি নিতে পারি। তুই যাবি আমার চেলা হয়ে, আর যেখানে চীনা সৈন্যরা থাকবেসে সব জায়গায় তুই মৌন থাকবি, আমি বলব যে তুই মৌনী লামা তুই কথা বলিস না। কাজেই যা কিছু বলার আমিই বলবো। মনে থাকে যেন তুই আমাদের সঙ্গে যাবি মৌনীবাবা হয়ে।
গুরুজীর কথা শুনে আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। আমার আনন্দটাকে ধরে রাখতে পারলাম না। তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললাম, জয় সাধুবাবা কি জয়। এই বলেই তাঁকে গড় হয়ে প্রণাম করে বলতে লাগলাম—‘গুরু কৃপাহি কেবলম্, গুরু কৃপা হি কেবলম্।' গুরুজী আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন --
—উচ্ছ্বাস নয়, বৌদ্ধভাবকে আয়ত্তে আনবার চেষ্টা কর, ‘ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদ্মে হুম্ ...।' আমিও তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তথাগতের কৃপার্থে বলতে লাগলাম———ওম্ মণি পদ্মে হুম্, ওম্ মণি পদমে হুম্, ওম্ ম ণি প দ্ মে হুম্ --।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন