বিমল দে
লাসায় আসা অবধি স্বপ্নপুরীর মতো এই প্রাসাদটাকে দেখছি, আর তার ভেতরের রূপ দেখবার জন্য ছট্ফট্ করছি। তীর্থযাত্রীদের মন পড়ে আছে জোখাং মন্দিরের দিকে আর আমার মন পড়ে আছে পোতালা প্রাসাদে। গুরুজীকে সেই ইচ্ছাটা বার বার জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হচ্ছে। লাসায় এখন চীনা গুপ্তচরে ভর্তি। জোখাং প্রাসাদ ছেড়ে আমরা যদি পোতালার দিকে যাই তাহলেই লোকের নজরে পড়তে হবে। পোতালা প্রাসাদটা যদিও লাসা তথা তিব্বতের প্রধান দ্রষ্টব্য বস্তু তবু তীর্থযাত্রীদের কাছে তার মূল্য কম। তীর্থযাত্রীদের মূল আকর্ষণ জোখাং মন্দির ।

তৃতীয় দিন সকালে হঠাৎ গুরুজী শুভ সংবাদ নিয়ে এলেন। গুরুজীর এক বিশেষ পরিচিত লামা বর্তমানে পোতালা প্রাসাদেরই কোন একটা দপ্তরে কাজ কারেন । তার সাথে দেখা করার অজুহাতে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। অন্যান্য লামারা ভোরবেলা উঠেই ধন্না দিতে বেরিয়ে গেছেন। আমাদের ধর্মশালার ঠিক নীচেই সারি সারি চায়ের দোকান। সেখান থেকে আমরা দু'কাপ চা খেয়ে রওনা দিলাম পোতালার উদ্দেশ্যে।
লাসা শহরের উত্তরাংশে পোতালা কুড়ি পঁচিশ মিনিটের পথ। পোতালার ঠিক বর্ণনা দিতে হলে আমি বলবো যে ছোট একটা পাহাড়ের চূড়া কেটে তার ওপর তেরো তলার একটা বাড়ী বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই বাড়িতে উঠবার জন্য চারদিকে বিভিন্ন আকারের সিঁড়ির সংযোগ রয়েছে। পৃথিবীর যত রাজপ্রাসাদ আছে পোতালা নাকি তার মধ্যে সবচেয়ে নয়নাভিরাম। পোতালার পিছনে সারি সারি পাহাড়, আর মেঘ দিয়ে তার ব্যাক্-গ্রাউণ্ডটা সাজানো হয়েছে। এই প্রাসাদটাকে পরিষ্কার তিনি ভাগে ভাগ করা যায়। মাঝখানে লাল রঙের আর তার দু'পাশে পাখীর ডানার মতো দুটো সাদা বাড়ী। মাঝখানের লাল বাড়ীটার ছাদগুলো সোনালী রঙের গম্বুজাকৃতির। অনেকটা মন্দিরের চূড়ার মতো আর দু'পাশের বাড়ীগুলোর ঢালাই ছাদ। লাসা শহর থেকে এই প্রাসাদের উচ্চতা প্রায় তিনশ' পঁচাত্তর ফুট। আর প্রাসাদের সর্বোচ্চে মহামান্য দালাই লামার ঘর সেটা চারশ' ফুটেরও উপরে। আমরা পোতালা পাহাড়ের নীচে এসে হাজির হলাম ।
পোতালার ঠিক নীচে এসে বুঝলাম যে, লাসা শহর আর পোতালা দুটো পৃথক । পোতালা রাজপ্রাসাদকে নিয়ে গড়ে উঠেছে আর একটা শহর। পোতালায় উঠবার জন্য কোন বিরাট রাস্তা নেই। এখানকার রাস্তাগুলো সবই সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বিরাট কিন্তু ধাপগুলো ছোট ছোট। ঘোড়ায় চড়ে এই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে মোটেই অসুবিধা হবে না। পোতালা প্রাসাদটি যত সুন্দরই হোক না কেন, এর প্রবেশ পথটা মোটেই পরিষ্কার নয়। প্রথমেই চোখে পড়ল ভিখিরিদের আড্ডা তারপর কতকগুলো নোংরা বস্তিবাড়ী। সেই সব বাড়ী থেকে রাস্তাঘাটে আবর্জনা স্তূপীকৃত করা হয়েছে। এখানকার পৌর সংস্থা এদিকে কোনরকম দৃষ্টি দেন বলে মনে হয় না। বর্ষার জল অথবা ঝড়ই ময়লা পরিষ্কারের একমাত্র উপায়। পাহাড় কেটে সিঁড়ির রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। রাজপ্রাসাদ এখনও অনেক উঁচুতে। আমরা একটা খাড়াই পাহাড়ের গা ঘেঁষে হেঁটে চলেছি। বস্তি এলাকাটা পেরিয়ে আরও এগিয়ে একটা ছোট গলিতে আমরা ঢুকলাম। গলির সিঁড়িতে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে খেলা করছিল আমরা তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন আমাদের ডাকলেন। ভালো করে তাকাতেই নজরে পড়ল, বাড়ীর জানালা দিয়ে এক বয়স্ক লামা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমাদের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন--কোথায় যাচ্ছো ?
—আমরা আমাদের এক পুরোনো বন্ধুকে খুঁজছি, গুরুজী উত্তর দিলেন। —তা তোমাদের দেখেই বুঝতে পারছি, তোমরা তো লাসার লোক নও, তোমাদের বন্ধুর নাম কি ?
—তার নাম ইয়াংচে লামা, একটু বয়স্ক লোক ৷
—ওঃ বুঝেছি—একটু এগিয়ে বাঁদিকের সিঁড়িটার নীচের গলিতে। মনে হয় এখন সে অফিসেই আছে।
ভদ্রলোককে বিশেষ ধন্যবাদ দিয়ে আমরা আবার উঠতে লাগলাম। পোতালার রাস্তা মানেই সিঁড়ি। এখানকার সিঁড়িগুলো খুব অদ্ভূত ধরনের—প্রধান পথটা খুব চওড়া, কিন্তু আশপাশের গলিগুলোর সিঁড়ি খুব খাড়াই। উপর থেকে যদি কেউ একবার গড়িয়ে পড়ে তাহলে তার থামবার উপায় নেই। আমরা নির্দিষ্ট গলিতে এসে ইয়াংচে
লামার বাড়ীর দরজায় ধাক্কা দিলাম। অনেকক্ষণ ধাক্কা দেবার পরও কোন সাড়াশব্দ পেলাম না। আমাদের ডাকাডাকির শব্দে পাশের বাড়ী থেকে এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। তিনি হাসিমুখে আমাদের প্রণাম করে জানালেন—
–ইয়াংচে লামা সকালবেলা বেরিয়ে গেছেন, তিনি ফ্রাদ্রোং মারপোতে গেছেন। ফাদ্রোং মারপোর নীচের তলায় তাকে পাবেন।
ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা আবার সিঁড়ি ধরলাম। দেখতে দেখতে আমরা অনেক উঁচুতে উঠে এলাম। তবে রাস্তাগুলোর দু'পাশে ঘন বাড়ী-ঘরের দরুন দূরের দৃশ্য আমাদের নজরের বাইরে। ফাদ্রোং মারপো পোতালার লাল প্রাসাদের স্থানীয় নাম। পাহাড়ের উঁচু অংশে প্রাসাদের আরম্ভ। দেখলেই বোঝা যায় যে এটা একটি দুর্গ । প্রধানত রাস্তাটা পোতালার লাল প্রাসাদের নীচে এসে থেমেছে। সেখানে এসে আমরা একটু জিজ্ঞাসাবাদ করেই ইয়াংচে লামাকে পেলাম ।
প্রাসাদের নীচে প্রায় অন্ধকার একটা ঘরে এসে ঢুকতেই এক বুড়ো ভদ্রলোককে পেলাম । তাকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন—
—ইয়াংচে লামা ? কেন কি দরকার ?
~~~আমি তার বন্ধু, তার সাথে অনেকদিন যাবৎ দেখা হয়নি তাই দেখা করতে চাই । ---আপনার কি নাম ?
গুরুজী তার পরিচয় দিতেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, অন্ধকারেও যেন তার মুখটাকে গোপন করা গেল না। তিনি উঠে গুরুজী ওরফে সাধুবাবাকে জড়িয়ে ধরলেন। দুই বৃদ্ধের মিলন দৃশ্য বড় আনন্দের, তারা দু'জনে হঠাৎ যেন যৌবনে এসে পড়লেন। তাদের আলিঙ্গন শেষে আমি বৃদ্ধ লামাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম। গুরুজী আমার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। দূরে একটা প্রদীপ জ্বলছিল, বৃদ্ধ লামা সেই প্রদীপটা একটু উস্কে দিয়ে ভালোভাবে আমার মুখের দিকে তাকালেন। বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-তোমার নাম কি বাবা ? আমি উত্তর দিলাম—বিমল। বৃদ্ধ লামার উজ্জ্বল মুখ ও পবিত্রতার সামনে আমার সত্য কথাটা বেরিয়ে পড়ল। গুরুজী কথাটা লুফে নিয়ে বললেন—মানে মৌনী বাবা ও আমারই চেলা ।
তারপর তিনি আমার বিষয় বিস্তারিত ভাবে বৃদ্ধ লামাকে জানালেন। বৃদ্ধ লামা বিস্তারিত শুনে আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন—ভগবান তোমার মঙ্গল করুন, সাবধানে থেকো—সঙ্ঘ, ধর্ম ও বুদ্ধের পথই তোমাকে শ্রেষ্ঠ পথে পরিচালিত করবে। তারপর তিনি প্রায় ফিসফিস করে বললেন—একে খুব সাবধানে ও চোখে চোখে রাখবে, হানদের চোখ যেন না পড়ে।ওরা ভারতীয়দের একদম পছন্দ করে না। তবে খুব যদি অসুবিধায় পড় তাহলে দিকী লিংকায় চলে যাবে, সেখানে ভারতীয় দূতাবাসের সাহায্য চাইবে। তবে এতদূর যখন আসতে পেরেছ তখন তথাগতই তোমাদের রক্ষা করবেন।
কথায় কথায় জানলাম যে বৃদ্ধ লামা ভারতবর্ষকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখেন, তিনি কলকাতায় একবার গিয়েছেন, বুদ্ধগয়াতেও তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। লাসার লোকদের কাছে কলকাতা এক পরমাশ্চর্য স্থান।
বৃদ্ধ-লামার অনেক গুণ, তিনি শিল্পী, গুরু আর বিভিন্ন গুম্ফার হিসাব পরীক্ষক। আজকাল তিনি আগের মতো অতোখাটতে পারেন না, তাই পোতালার বস্ত্র-ভান্ডারের মজুতের হিসাব রাখেন। এই কাজটা আগের কাজের থেকে অনেক সহজ আর দায়িত্বও কম। বৃদ্ধ লামা হঠাৎ আমাকে বললেন–এস এই জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখো দৃশ্যটা খুব চমৎকার। তাঁর কথানুযায়ী আমি তার ঘরের কোণের জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম। ঘরটার দেয়াল পাথরের কিন্তু দরজা জানলাগুলো সব কাঠের, অতি চমৎকার কাজ করা, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই হঠাৎ যেন মাথাটা ঘুরে গেল। জানালাটার পরই পাহাড়ের বিরাট খাদ। এখান থেকে দূরে দেখা যাচ্ছে শহরের দৃশ্য, আমরা এখন পাহাড়ের উপরে। এই ঘরটা পোতালা রাজপ্রাসাদেরই একটা ঘর। বৃদ্ধ লামা রোজ ওঠানামা করতে চান না তাই এই ঘরটাই তার দপ্তর। অন্যান্য লামারা এই ঘরে আসেন তাঁর সাথে পরামর্শ করতে। তিনি বৃদ্ধ বটে কিন্তু শরীরটা খুবই মজবুত। পোতালার সিঁড়ি দিয়ে হাঁটা-চলা করা দুর্বলের কাজ নয়। জানালা দিয়ে বাইরে না তাকালে কিছুতেই মনে হবে না যে আমরা এত উঁচুতে উঠেছি। অনেকদিন পর বৃদ্ধ লামা তাঁর বন্ধুকে পেয়ে বিভিন্ন প্রসঙ্গে ডুবে গেলেন। তাঁদের মূল বিষয় হচ্ছে বর্তমানের তীর্থযাত্রী আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চীনাদের ভয়ে কেউ আসেত চায় না। আর কতকাল এরকম চলবে কে জানে। মহামান্য দালাই লামার বয়স এখন মাত্র একুশ বছর। চীনা রাজনীতি বোঝা কি এইটুকু ছেলের পক্ষে সম্ভব! তবুও দালাই লামা বলে কথা, তিনি হোমরা চোমরা চীনা প্রতিনিধি ও মিলিটারী অফিসারদের সাথে যেরকমভাবে কথাবার্তা চালাচ্ছেন, অন্য কোনো এই বয়সের ছেলের পক্ষে তা সম্ভব নয় ।
প্রায় ঘন্টাখানেক বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম । বৃদ্ধ লামা আমাদের সাথে প্রাসাদের চারতলা পর্যন্ত এলেন সেখানে ছ'জন তিব্বতী প্রহরী প্রাসাদ তোরণে মোতায়েন করা রয়েছে, পরিচয় না থাকলে এখানকার গার্ড অফিস থেকে অনুমতি নিতে হয় প্রাসাদ দেখবার জন্য। রাজ্যের পুলিশ রক্ষীবাহিনী অথবা কাশাগ্ দপ্তর থেকে এই অনুমতিপত্র নিতে হয়। বৃদ্ধ লামার কৃপায় আমাদের আর আলাদা করে অনুমতি নিতে হল না। তিনিই আমাদের বন্ধু বলে দরজা পার করে দিলেন। তারপর বিকেলে আবার দেখা হবে বলে বিদায় জানালেন। ইয়াংচে লামা বয়সে গুরুজীর চেয়ে আরও প্রায় দশ বছরের বড় সেইজন্য গুরুজী তাঁকে বৃদ্ধ লামা বলে ডাকেন। ভদ্রলোক বার বার আমাদের বললেন যে তাঁর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া না করে যেন কিছুতেই না যাই। তিনি সেই সময়ের জন্য বিদায় নিলেন।
পোতালা প্রাসাদটি বহু বছর আগে অর্থাৎ বন্ ধর্মের সময়ে এটা ছিল সাধুদের ধ্যানকেন্দ্র। এখানকার আবহাওয়া আর অবস্থানটি ধ্যানের পক্ষে ছিল খুবই অনুকূল। সমস্ত জীবন ধরে তপস্যা করে যে ফল পাওয়া যায়, এখানে বসে ধ্যান করলে সে ফল পেতে লাগে মাত্র কয়েক বছর। তন্ত্র ও বন্ ধর্ম নিয়ে যাঁরা সাধনার উচ্চমার্গে উঠতে চাইতেন তাঁদের কাছে পোতালা পাহাড়টি ছিল সাধন-সিদ্ধ পীঠ। সেই সময়টা ছিল আজ থেকে প্রায় তেরশ' বছর আগে। প্রাচীন বন্ পন্থীরা এই অঞ্চলটিকে পরম পবিত্র স্থান বলে ঘোষণা করেন ৷
পোতালার শ্রীবৃদ্ধির জন্য সতেরোশ' খৃষ্টাব্দে পঞ্চম দালাই লামা উঠে পড়ে লাগলেন, তাঁরই সময়ে নির্মিত হয় বর্তমান প্রাসাদটি। এর নির্মাণ সম্পর্কে খুব চমৎকার একটি গল্প শুনলাম। গল্পটি এরকম—
পঞ্চম দালাই লামার রাজ্য শাসন ও বিদ্যাবুদ্ধির খুব সুখ্যাতি ছিল। তাঁরই আমলে প্রথম ভৌগোলিক সীমা নির্ধারিত হয়। তিনিই ঠিক করলেন যে এই পোতালার উপর নির্মাণ করবেন তিব্বতের শ্রেষ্ঠ অট্টালিকা। গঠন ও সৌন্দর্যে যেটা হবে তিব্বতের নিজস্ব ভাবধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পোতালা পাহাড়ের উপর প্রাসাদ তৈরীর জন্য চারদিক থেকে তিব্বতের জ্ঞানীগুণীরা এসে হাজির হলেন। তারপর শুরু হল পরমারাধ্য দালাই লামার নেতৃত্বে প্রাসাদ নির্মাণ। প্রাসাদটির পরিকল্পনানুযায়ী তেরো তলা হওয়া দরকার আর ঘরের সংখ্যা হবে প্রায় একহাজার। প্রবল উৎসাহে শুরু হল কাজ, নাগরিকদের উৎসাহ আর রাজার ধনভাণ্ডর দুইয়ের সংমিশ্রণে আস্তে আস্তে পাহাড় কেটে তৈরী হতে লাগলো ঘর-বাড়ী। প্রায় দ্বিতীয় তলা সমাপ্ত হয়েছে এমন সময় রাজা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর সেই অবস্থা দেখে রাজার পার্শ্বচর ও মন্ত্রীরা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন ৷ এমন সময় রাজার মৃত্যু হলে সম্পূর্ণ প্রাসাদ নির্মাণের কাজ থেমে যাবে। এই বিরাট পরিকল্পনাটা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবার উপক্রম। পঞ্চম দালাই লামা ছিলেন দূরদ্রষ্টা তাই তিনি মন্ত্রীদের ডেকে পাঠালেন তাঁর মৃত্যুশয্যার পাশে তারপর তাদের উৎসাহ দিয়ে বললেন—নিরুৎসাহ হয়োনা, থেমে যেয়োনা, যে গুরু দায়িত্ব নিয়েছো তা পালন করতেই হবে। এটা হবে আমাদের তথা সমস্ত তিব্বতের গৌরব। এই প্রাসাদটি হবে হিমালয়ের গৌরব। তারপর তিনি তাদের সাথে আরও গুপ্ত পরামর্শে লিপ্ত হলেন। পোতালার দ্বিতীয় তলাটি তখনও সম্পূর্ণ হয়নি এমন সময় তিনি অর্থাৎ পঞ্চম দালাই লামা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর যোগ্য মন্ত্রীরা সঙ্গে সঙ্গে সে কথা গোপন রেখে দিলেন। তাঁরা অনেকটা দালাই লামার মতো দেখতে এমন একজন বৃদ্ধ লামাকে নিয়ে বসালেন তাঁর জায়গায়, বাইরের লোকজনরা জানলো যে দালাই লামা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন সুস্থ হলেই তিনি ধ্যানমগ্ন থাকেন কাজেই কারও সাথে তিনি দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। প্রকৃত দালাই লামার মরদেহটাকে রাজবাড়ীরই একটা ঘরে গোপনভাবে সমাধিস্থ করা হল। পোতালার কাজ এগিয়ে চলল। দালাই লামার মৃত্যু সম্পর্কে কেউ এতটুকু সন্দেহও করল না। দীর্ঘ তেরো বছর ধরে চলল মানুষ ও পাথরের খেলা—তারপর প্রকাশিত হল রূপসী পোতালা প্রাসাদটি। সেই পোতালা প্রাসাদে নতুনভাবে সাড়ম্বরে সমাধিস্থ করা হল পঞ্চম দালাই লামার মরদেহ। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত পরবর্তী দালাই লামাদের দেহও এখানেই সমাধিস্থ করা হয়। ধর্ম ও কর্মফল অনুযায়ী পঞ্চম দালাই লামা বার বার আবির্ভূত হন চেন্-রে-জি অবতার হিসেবে। তাঁর সাধের পোতালা প্রাসাদের তিনিই অধীশ্বর। এক দেহের অধীনে আর এক দেহ ধারণ করে পুনর্জন্ম নিয়ে তিনিই আসেন । পঞ্চম দালাই লামার আগে কোন দালাই লামা ছিল না। পুনর্জন্মে দালাই লামার ভূমিকাতে পঞ্চম দালাই লামাই হলেন প্রথম দালাই লামা ৷
পোতালা প্রাসাদে সাতটি বিশাল সমাধি মন্দিরে আছে সাতটি দেহে একই আত্মার নতুন দেহ। মনে পড়ে গীতার সেই অমর বাক্য —
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবাণি গৃহাতি নরোপরাণি। তথা শরীরাণি বিহায় জীৰ্ণা ন্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ৷
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণীর যুক্তিসঙ্গত ও আক্ষরিক প্রমাণ এর থেকে বেশী আর কি হতে পারে। দালাই লামার একই আত্মা বার বার নতুন দেহ নিয়ে আসেন পোতালা প্রাসাদে বাস করতে।
পোতালার মাঝখানের বাড়ীটাই খুব রংচঙে, আর তার দু'পাশের বাড়ীগুলো সাদার উপর লাল ও সোনালী দাগ দেওয়া। আমরা ভেতরে ঢুকতেই একজন লামা আমাদের সাথে সাথে ঘুরতে লাগলেন। দেখেই মনে হয় তিনি গাইড। আমরা কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই তিনি সব কিছু বুঝিয়ে বলতে লাগলেন ।
মূল প্রাসাদের মধ্যভাগে রয়েছে পঁয়ত্রিশটি ছোট ছোট মন্দির। এই পঁয়ত্রিশটি মন্দিরের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চেন্-রে-জির মন্দির। সেটা আসলে একটা স্মৃতিসৌধ। অনেকটা তাজমহলের মতো। তবে তাজমহলে বেগম নূরজাহানের দেহটা শায়িত তার উপর রয়েছে কবর। আর এখানে সৌধের উপর নির্মিত হয়েছে স্রোং-সান্-গাম্পোর বিরাট সোনার মূর্তি। এই মূর্তিটা যদি সত্যই সোনার হয় তাহলে পোতালা প্রাসাদটি নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সেরা ও দামী সৌধ। স্রোং-সান্-গাম্পো বা চেন্-রে-জির সেই মূর্তির দু'পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর দুই স্ত্রী। নেপাল ও চীনের রাজকুমারীদ্বয় লাইফ্ সাইজের এই মূর্তিটি মানুষ মাত্রেই প্রশংসা না করে পারবে না। বহুদূর থেকে পোতালা প্রাসাদের এই সাতটি সোনালী রঙের চূড়া আমাদের চোখে পড়েছিল এখন কাছে এসে দেখছি যে সেই চূড়াগুলো আসলে সমাধি চৈত্য অর্থাৎ সাতটি চৈত্য। ত্রয়োদশ দালাই লামার চৈত্যটি সবচেয়ে বড়। এই চৈত্যটি জোখাং মন্দিরের মতো, কয়েকটা সিঁড়ি নীচে নেমে গিয়ে তাকে দেখতে হয়। এই সমাধি বেদি ও মূর্তিগুলো সম্পূর্ণ সোনার তৈরী এর মধ্যে এতটুকু ভেজাল নেই। এক টন সোনা দিয়ে শুধু ত্রয়োদশ দালাই লামার বেদী ও মূর্তিটা তৈরী। আমার মতো এক ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে এর মূল্য যাচাই করা অসম্ভব। এক টন সোনা চোখের সামনে দেখছি—তাকে স্পর্শ করছি, এর আগে কোনদিন এক ভরি সোনাও ছুঁইনি, এদিক থেকে বিচার করে দেখলেও মনে হয় আমার তিব্বতে আসা সার্থক হয়েছে। এক টন সোনার সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের আশপাশে অনেক তিব্বতী গরীব তীর্থযাত্রী আর ভিখিরিরাও রয়েছে। এই বিরাট রত্নভাণ্ডারের তত্ত্বাবধানে কোন সৈনিক বা রক্ষীবাহিনী নেই। এখানেই তিব্বতীদের পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের পরিচয়। এমন পবিত্রতা আর স্বর্গীয় মনোভাবের পরিচয় জগতে বিরল। স্মৃতিসৌধগুলোর দেয়ালগুলোও চমৎকারভাবে চিত্রিত করা। তাতে ভগবান বুদ্ধের জীবনী এবং বহু তথ্য পাওয়া যায়। চীনদেশীয় অনেক উপকথা চিত্রের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিংহ, ড্রাগন, ঘোড়া, হাতী, সাপ, বানর ইত্যাদি বহু জন্তু জানোয়ারের ছবিও চারদিকে রয়েছে। চৈত্যের বারান্দায় সারি সারি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দামী কাপড়ের উপর সৌখিন তৈল চিত্র। তাতে মণ্ডলা,মুদ্রা আর তথাগতের জীবন আলেখ্যতে ভর্তি । পাথরের সাথে খাপ খাইয়ে রয়েছে বিরাট বিরাট থাম। শালগাছের গুঁড়ির মতো সেই থামগুলোও সুন্দর খোদাই কাজে ভর্তি। লাল সোনালী আর হলদে রঙই মনে হয় তিব্বতীদের পছন্দ। যে রঙই হোক না কেন প্রত্যেকটি রঙই খুব উজ্জ্বলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমি শিল্পী নই কাজেই কারুকার্যগুলো বিশেষ বিচার ভঙ্গি নিয়ে দেখার ক্ষমতা আমার নেই। আমি হাতের নখ দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে ভাবছিলাম সেই তাল তাল সোনাগুলোর কথা। যে দেশে এত সোনা জমে আছে সে দেশের লোকেরা ভিক্ষে করে কেন? হয়তো এই সোনাগুলো সবই পবিত্রতা খরচ করার অধিকার মানুষের নেই। এটাই আপাততঃ আমার মনোমতো উত্তর। চেন্-রে-জির সোনার মূর্তিটা তিরিশ ফুট উঁচু। শুধু সোনাই নয় সেই সাথে সাথে খাপ খাইয়ে রয়েছে অজস্ৰ মণি-মুক্তা, দেব-দেবীর চূড়া ও বাসনপত্রগুলো সবই যেন অমূল্য রত্নসম্ভার। পোতালা প্রাসাদের এই লালবাড়ীটার সাতটি চৈত্যই দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ। আমরা এখন হাঁটছি বাড়ীটার নয় দশ তলার উপর দিয়ে। ঘর বা বারান্দাগুলোর কোনটাই সমতল নয়। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে হলেও সিঁড়ি ব্যবহার করে উপরে উঠতে হবে নয়তো নীচে নামতে হবে। একটা পাহাড়কে কেটে এই যাদুপুরী তৈরী করতে কত যে কৌশল আর কেরামতির সাহায্য নিতে হয়েছে তা না দেখলে কিছুতেই বোঝানো সম্ভব নয় ।
আমার অদম্য কৌতূহল দূর করবার জন্য মন্দিরের পেছনদিকের একটা জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। মনে হচ্ছে আমাদের এই প্রাসাদটা শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমার প্রশ্ন করার আগেই লামা ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর অতি নরম গলায় বুঝিয়ে দিতে লাগলেন চারপাশের দৃশ্যাবলী ।
এখন আমরা আছি পোতালা প্রাসাদের গুম্ফায়। এই গুম্ফা বা মন্যাস্ট্রীতে প্রায় দু’শ জনের মতো লামা থাকেন। এই গুম্ফাটা সম্পূর্ণ স্বাধীন, পোতালার নিজস্ব গুম্ফা। এখানকার লামারাই পোতালার চৈত্যগুলোর দেখাশুনা করেন। জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য দৃশ্য। লাসা শহরের ঠিক বিপরীত দিক। কিছুদূরে যে বিরাট গুম্ফাটা দেখা যাচ্ছে সেটাই নামকরা চাপুরী ভেষজ কেন্দ্র। অর্থাৎ তিব্বতের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ও চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়। চিকিৎসাকেন্দ্র বটে তবে আমাদের দেশের হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার চিকিৎসাবিদ্যা সম্পূর্ণ আয়ুর্বেদিক প্রথায় প্রতিষ্ঠিত। আয়ুর্বেদের সাথে পাহাড়ি ও স্থানীয় চিকিৎসাপদ্ধতিও যোগ করা হয়েছে। তিব্বতের নামকরা চিকিৎসকগণ ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা ভারতবর্ষ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র অনুবাদ করে নিয়ে গিয়েছেন, তাদের মধ্যে বৈরচনা, রিন্চেন জাম্পো, ইয়াং লাগ্ বিশেষ নাম করা। তিব্বতের এই চাপুরী বিদ্যানিকেতনে যে সব বই পড়ান হয় তাতে চন্দ্রনন্দন, জনার্দন, ধর্মশ্রীবর্ধন, বাগভট্ট, নাগার্জুন প্রভৃতি ভারতীয় পণ্ডিতদের নাম উল্লেখযোগ্য। পাঁচ-ছটা বড় বড় চৈত্যকে কেন্দ্র করে চাপুরী চিকিৎসালয় গড়ে উঠেছে। এখান থেকে শুধু তার ছাদটাই দেখা যায়। তারই একটু দূরে কী-চু নদীটা ধীরে বয়ে যাচ্ছে, অতি চমৎকার দৃশ্য। জানালার ঠিক নীচেই অর্থাৎ পোতালা পাহাড়ের ঠিক নীচে যে গ্রামটা দেখা যাচ্ছে তার নাম-চো ।
গাইড প্রায় একনিঃশ্বাসে আমাদের জানালার বাইরের দৃশ্য বর্ণনা করে দিয়ে সরাসরি হাত পেতে বলল, দিন চার আনা পয়সা। আমরা দিলাম দু'আনা তাতেই সে খুশী। আমাদের বার বার প্রণাম করতে করতে সে উধাও হল। গুরুজী পোতালা প্রাসাদকে ভালোভাবেই চেনেন কিন্তু লোকটি কিছুতেই আমাদের ছাড়ছিল না। বারান্দাগুলো খুবই চওড়া আর লম্বা তো বটেই। কিন্তু সে তুলনায় খুবই অন্ধকার। ভেতরের ঘিয়ের প্রদীপে পরিষ্কারভাবে সব কিছু দেখা যায় না। ইলেট্রিক সব জায়গায় নেই, আবার অনেক জায়গায় আছে কিন্তু ল্যাম্প নেই। পোতালার এই মন্যাস্ট্রির নাম নাগীয়েত্রাচাং (Namgyetrachang )। বারান্দার দু'পাশে সারি সারি ঘর, মাঝে মাঝে লামাদের সাথে দেখা হচ্ছে বটে কিন্তু অস্পষ্ট আলোতে তাদের বয়স বোঝা মুশকিল। গুরুজীর মতে এখানকার লামারা সবাই বয়স্ক। পোতালা প্রাসাদের জন্য জল আনতে হয় কী-চু নদী থেকে । এত বড় প্রাসাদ কিন্তু জলের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রত্যেকদিন সকালবেলালাইন ধরে দাঁড়িয়ে হাত বদল করে নদী থেকে জল তুলে আনতে হয়। অবশ্য এরজন্য লোকের অভাব নেই। শত শত তিব্বতী দাসেরা রয়েছে প্রভুর সেবার জন্য ।
পোতালার এই চৈত্য এলাকার আর একটা গুরুগম্ভীর বৈশিষ্ট্য আগন্তুক মাত্রেই অনুভব করবেন, সেটা হচ্ছে এখানকার নিস্তব্ধতা। বারান্দায় প্রায়ই লামাদের সাথে ধাক্কা খেতে হচ্ছে কিন্তু কারও মুখে এতটুকু শব্দ নেই। সবাই যেন ধ্যানে মগ্ন। শুধু মাঝে মাঝে শোনা যায় লামাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস, আর কাশি।
লাল বাড়ীটা হচ্ছে পোতালা প্রাসাদের সবচেয়ে পবিত্র অংশ— চৈত্য, সমাধি, বেদি আর মন্দিরে ভর্তি। তবে পূর্বদিকের অংশটা সাদা রঙ করা, বাইরের থেকে দেখতে অনেকটা আমাদের রাইটার্স বিল্ডিং-এর মতো। তবে রঙটা সাদা, পূর্বাংশের ঘরগুলো সব সরকারী আইন-আদালত ও দপ্তরে ভরা। বিভিন্ন এলাকার শাসকদের জন্য এখানে একটি আইন ও শাসন বিভাগীয় শিক্ষা কেন্দ্রও রয়েছে। এই অঞ্চলেরই একটি বিরাট ঘরে তিব্বতের মন্ত্রী-সভাকক্ষ জেনারেল হল। সেই অংশেরই সর্বোচ্চ মাননীয় দালাই লামার ঘর অর্থাৎ পোতালা প্রাসাদের চৌদ্দ তলায়।
দালাই লামা এখানে শীতের সময় মাত্র থাকেন, শীতের শেষেই তিনি নেমে যান নীচে তাঁর গ্রীষ্মাবাস নরবুলিংকা প্রাসাদে। তিনি যখন পোতালা প্রাসাদ থেকে নরবুলিংকাতে যান তখন লাসার নাগরিকেরা তাদের উৎসবে মেতে উঠে, চারদিকের ঘর বাড়ীতে রঙ ও বিভিন্ন পতাকার বাহার দেখা যায়। সেটাই লাসাবাসীদের বসন্তোৎসব। রাস্তার দু'পাশে হাজার হাজার লোক জমা হয় দালাই লামার শোভাযাত্রা দেখার জন্য। আমরা লাসায় পৌঁছবার কয়েক সপ্তাহ আগেই সেই উৎসবটা হয়ে গেছে। এই উৎসবটাই হিমালয়ের বরফ গলার উৎসব, এই বরফ গলে জল হয়ে সমতল ভূমিতে নেমে গিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে লক্ষ লক্ষ জীবকে। এইভাবে পাষাণ হিমালয় করুণাময়ী মাতৃরূপে ধরা দেন প্রত্যেকটি প্রাণীর কাছে। তিব্বতী ভাষায় এই উৎসবকে বলা হয় মলান উৎসব। দালাই লামা সেই মহান হিমালয়েরই প্রতীক। শীতের শেষে তিনি পোতালা প্রাসাদ থেকে নীচে নেমে আসেন, সকলের মাঝে তিনি ধরা দেন। দালাই লামা এখন এখানে নেই, থাকলে চেষ্টা করা যেত তাঁর সাথে দেখা করার।
পোতালা প্রাসাদে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ লামা ও সরকারী কর্মচারীদের বাসস্থান রয়েছে। প্রাদেশিক শাসক ইংরেজীতে যাদের গভর্ণরই বলবো তারা লাসাতে এলে এই পোতালা প্রাসাদেই থাকেন। এখানকার সরকারী অতিথিশালাটি সব সময়ই ভর্তি থাকে। দালাই লামার ঘরটি নীচ থেকে চারশ' ফুট উঁচুতে, তাঁর ঘরগুলো নাকি ঠিক মিউজিয়ামের মতো, দামী ও তিব্বতের সেরা বস্তু সামগ্রীতে ভর্তি। পোতালা প্রাসাদের বহু মূর্তির মধ্যে চন্দন কাঠের একটা বিরাট বুদ্ধ মূর্তি আমরা দেখলাম। অল্প প্রদীপে খুব পরিষ্কারভাবে দেখতে পারলাম না, মুর্তিটি এসেছে সিংহল থেকে। সেটা নাকি এক অলৌকিক মন্ত্রবলে তৈরী। মূর্তিটি যখন পূজা করা হয় তখন প্রাসাদের চারিদিক ভরে উঠে চন্দনের পবিত্র সুগন্ধে। পোতালা তিব্বতের ইন্দ্রপুরী ।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল, কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেলো বুঝতে পারলাম না। ভেতরকার সোনালী, হলুদ, লাল, নীল রঙের বাহার দেখতে দেখতে আমাদের চোখে ধাঁধা লেগেছে। আমরা অনেকগুলো ঘর আর পাথরের সুরঙ্গের মতো বারান্দা ও গলি পেরিয়ে নেমে এলাম নীচের দিকে। হঠাৎ এসে হাজির হলাম উন্মুক্ত আকাশে। একটা গলির মুখে আসতেই দেখা হল কয়েকটি ভিখিরির সাথে। তারা আমাদের বলল যে, একটু এগিয়ে ডান দিকের চায়ের দোকানে একজন লামা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের দুটো পয়সা দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করলাম কিন্তু কোন চায়ের দোকানই নজরে পড়ল না। সম্পূর্ণ হতাশ হওয়ার আগে রাস্তার একটি মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে হাসিমুখে বলল—আমাদের সামনেই তো দোকানটা, দেখতে পাচ্ছেন না? আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি।
এই বলে সে এগিয়ে গিয়ে একটা জানলায় ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে জানালাটা খুলে গেলো, আর সেই সাথে সাথে বেড়িয়ে এল মাখন-চায়ের গন্ধ। মেয়েটিকে আমরা হাসিমুখে ধন্যবাদ জানালাম। জানালার ভেতর থেকে ফোকলা-দাঁতে এক বৃদ্ধা আমাদের দিকে তাকিয়েই বললেন—ওঃ আপনারা এসেছেন। এই বলে উঠে গিয়ে পাশের দরজা খুলে দিলেন। ভেতরে ঢুকে আমরা চটের উপর অতিথির মতো বসলাম। চায়ের দোকানের ব্যাপারটা এতক্ষণে পরিষ্কার হল। এটা সত্যি একটা চায়ের দোকান। অফিসের লোক এসে জানালায় ধাক্কা দিয়ে বলে কত কাপ চায়ের দরকার। ভেতর থেকে তা সাপ্লাই দেওয়া হয়। ভেতরে বসে চা খাবার লোক কম। একান্ত পরিচিত না হলে কেউ ভেতরে ঢোকে না। বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা আমাদের একটু বসতে বলে কোথায় বেড়িয়ে গেলেন, তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললেন যে লামাজী এক্ষুণি আসবেন। ভদ্রমহিলা তার অতি দামী দুটো চীনে মাটির কাপ বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন—দেখছেন এই কাপ দুটো পিকিং-এ তৈরী, বিশেষ অতিথি না হলে আমি এই কাপ ব্যবহার করি না। চা তৈরীই ছিল তার মধ্যে আমাদের দেখিয়ে কিছুটা নোনতা মাখন ঘোলের সরবতের মতো মিশিয়ে দিয়ে কাঠের জ্বালটা উসকে দিয়ে সেটাকে গরম করে নিলেন। চায়ের কাপ দুটো ভালোই তবে মনে হয় কোনদিন সেটাকে ধোয়া হয়নি। যাই হোক, আমরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চুমুক দিলাম ।
ভদ্রমহিলা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ পাড়লেন—শুনলাম আপনারা সাংপো পার হয়ে আসছেন, ফারগোর কাছে ভিখিরিদের পাল্লায় নিশ্চয়ই পড়েছিলেন। আর ওদের কথা বলবেন না, উৎসবের জন্য এরা এসেছিল এখনও যায়নি। প্রত্যেক বছর উৎসবের সময় এরা আসে। তবে হ্যাঁ উৎসবটা তো আর কারও একার নয় কাজেই ওরা আসবে না কেন, ওদেরও তো সখ আছে। তবে পথিক মাত্রেই ঘিরে ধরা এটা কিন্তু ঠিক নয়। আমি অবশ্য এর মধ্যে যাইনি, দোকান ফেলে আমার কোথাও যাবার উপায় আছে । একদিন বন্ধ রাখলেই দপ্তরের লোকদের গলা শুকিয়ে যায়। ভাগ্য ভালো যে আমার ছোট মেয়ে এখনও আমার কাছে আছে নয়তো আমি পেরে উঠতাম না। পাড়ায় ছেলেদের অভাব নেই কিন্তু তাদের ভরসা করা যায় না, ওরা শুধু বাজারে বসে আড্ডা .মারতে ওস্তাদ I
আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে ভদ্রমহিলা একনাগারে নিজের মনেই বক্ বক্ করে যেতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরেই বৃদ্ধ লামা এলেন, তিনি এসেই জিজ্ঞাসা করলেন-
–খাওয়া দাওয়া কোথায় হল ?
—এখনও হয়নি ।
–বল কি, এখনও পেটে কিছু পড়েনি। ঠিক আছে, এক সাথে খাওয়া যাবে ।
বৃদ্ধ লামা দোকানের ভদ্রমহিলাকে ভালো করে একটা সাম্পা তৈরী করতে বললেন রাতের জন্য, তারপর আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পোতালার ছাদ দেখাবার জন্য! এখানকার রাস্তাঘাটগুলো না জানা থাকলে সকলের পক্ষে ছাদে ওঠা সম্ভব নয়। তেরো তলার প্রত্যেকটি বাড়ীর উপরে আছে বিরাট বারান্দা আর প্রত্যেক দু'তিন তলার উপর আছে বিরাট বিরাট ছাদ। দার্জিলিং-এর মল্-এর মতো এখানকার ছাদও খুব প্রশস্ত ।
ছাদ থেকে লাসার চারদিকের দৃশ্য দেখা যায়। বলাই বাহুল্য, এ দৃশ্যটা অতি মনোরম। ছাদ থেকে চৈত্যর চূড়াগুলোতে হাত দিয়ে স্পর্শ করার সুযোগ পেলাম। সোনালী রঙের সেই সব চূড়ার কয়েকটি সত্যিকারের সোনার পাতে মোড়া। কিছুক্ষণ থেকে আমরা নামতে বাধ্য হলাম, কারণ এর মধ্যে ঘণ্টা বেজে গেছে। বিকেলের এই ঘণ্টা বাজার পর বাইরের কাউকে এখানে থাকতে দেওয়া হয় না। মন্দিরের লোহার দরজাগুলো আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়। আর শুরু হয় প্রহরীদের আনাগোনা । সারারাত ধরে আধঘণ্টা অন্তর অন্তর পোতালা প্রাসাদের গলি দিয়ে রক্ষিবাহিনীরা চলাফেরা আরম্ভ করে। লালবাড়ীর প্রহরীরা রাতের বেলা সমাধি বেদির পাশ দিয়ে চলার সময় চীৎকার করে করে বলে “সজাগ থা-কো-ও-ও-ও ... ।"
বৃদ্ধ লামা পোতালার আরও রহস্য আমাদের কাছে উদ্ঘাটিত করলেন। প্রাসাদের নীচের তলাটি বন্দুক ও গোলা বারুদে ভর্তি। গোলন্দাজবাহিনী অবশ্য আমাদের নেই। বিদেশী শত্রু যদি লাসা আক্রমণ করে তবে এখানকার বীর যোদ্ধারা প্রাণ দিতেও দ্বিধা করবে না। আর তার সাথে সাথে আছে রাজ্যের রক্ষাকালী, মা তারার খড়্গ আমাদের রক্ষার জন্য সব সময়ই উদ্যত রয়েছে। সৈন্যাধ্যক্ষ, দালাই লামার শিক্ষক ও উপদেষ্টারা চারতলার বাড়ীগুলোতে থাকেন। তাদের ঘরগুলো সব সম্ভ্রান্ত তিব্বতী প্রথায় সাজানো। রাজ্যের প্রথম শ্রেণীর কারাগারটাও ওই প্রাসাদেরই পিছন দিকে অবস্থিত ৷ বড় লামা ও উচ্চ-পদস্থ সরকারী কর্মচারীরা যদি কোন রকম আইন বিরুদ্ধ কাজ করেন তাহলে সেখানে তাঁদের বন্দী করা হয়।
পোতালা প্রাসাদটা যত সম্ভ্রান্তই হোক না কেন, আবহাওয়াটা আমার কাছে কিন্তু খুব ভারী বলে মনে হল ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় পাথরের হিমশীতল স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। সমাধির পবিত্র নির্মল ও বিমলানন্দ তরঙ্গের এখানে যেন প্রবেশ নিষেধ। এখানকার সোনার প্রদীপে যে ঘিয়ের বাতিগুলো জ্বলছে সেগুলো যেন নিষ্প্রভ। প্রহরীদের চলাফেরায় রয়েছে দম্ভের ধাক্কা। মনকে হালকা করার যে মন্ত্ৰ, সে মন্ত্র পোতালার দুর্মূল্য মণিমুক্তা আর রত্ন সম্ভারের মধ্যে বোধ হয় চাপা পড়ে গেছে। অথবা পোতালা প্রাসাদের সত্যিকারের রসোপলব্ধি করার ক্ষমতা আমার নাই। শেষের উক্তিটা সত্যি হলেই আমি খুশী হব ।
সন্ধ্যা হবার সাথে সাথে আমরা নেমে এলাম প্রাসাদের তোরণে। সেখানকার নোংরা গলিগুলো পেরিয়ে এসে ঢুকলাম সেই বৃদ্ধার চায়ের দোকানে। আমাদের দেখেই বৃদ্ধা ফোকলা দাঁতগুলো বের করে হেসে আমাদের আপ্যায়ন করলেন—ভেবেছিলাম তোমরা পথ হারিয়েছো। ভাগ্য ভালো যে তোমরা নতুন কুঠিতে যাওনি, সেখানে গেলে আজকে আর তোমাদের ফিরে আসতে হত না ৷ ওখানকার সেনারাও খুব কড়া। ঘণ্টা বাজার সাথে সাথেই দরজা বন্ধ করে দেয় ভেতরে কেউ রইল কি না সেদিকে মোটেই ভ্রুক্ষেপ করে না। হ্যাঁ ভালো কথা, এই দেখো তোমাদের জন্য কি রেঁধেছি। আ! এর যা গন্ধ রাস্তা দিয়ে যে যায় সেই-ই একবার করে থমকে দাঁড়ায় এ গন্ধ পাবার জন্য। আর হবেই বা না কেন? এর মধ্যে কি দিয়েছি জানো ? খুব টাটকা শুকনো ভেড়ার মাংস। খেতে কোনো অসুবিধা হবে না, সেদ্ধ করে সেটাকে গলিয়ে দিয়েছি। তার মধ্যে দিয়েছি কী-চু নদীর তিনটে শুকনো ছোট মাছ অবশ্য দাম একটু হবে কিন্তু তোমরা হলে আমাদের সম্মানীয় অতিথি কাজেই যা তা জিনিস তো আর খাওয়াতে পারি না। বৃদ্ধ লামা আমাকে বিশেষ সতর্ক করে দিয়েছেন—খুব সাবধান এরা আমার বিশেষ বন্ধু .. I
বেশ বেশ ! এবার থামো, খেলেই বুঝবো কি রকম হয়েছে। বৃদ্ধ লামা ভদ্রমহিলাকে থামিয়ে দিলেন। ভদ্রমহিলা একবার কথা বলতে শুরু করলে কিছুতেই তাকে থামানো যায় না ৷
আমার ভদ্রমহিলাকে খুব ভালো লাগল। প্রাণখোলা হাসি আর মনের সরলতা এ দুই মিলিয়ে তিনি যেন এক আনন্দের মন্দাকিনী ।
খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা উঠলাম, শহরে ফিরতে হবে। বৃদ্ধ লামা আমাদের অনুরোধ সত্ত্বেও একটা পয়সাও নিলেন না। তিনি বললেন---আমার যা আছে তার কিছুটা যদি তোমাদের সেবায় লাগাতে পারি তাহলে আমার পুণ্যই হবে। তোমরা যে দয়া করে এসেছো এতেই আমার আনন্দ, এ আনন্দ থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না ।
বৃদ্ধ লামাকে বিদায় জানালাম। তিনি আমাকে শুধু একটা অনুরোধ করলেন—আমি এর পরের বার বুদ্ধ গয়ায় গেলে সেখানকার একটু মাটি যেন তাকে এনভেলাপে করে পাঠাই। আমি তাঁকে কথা দিলাম। ঘণ্টাখানেক পর ভদ্রমহিলার ঝোলের ভূয়সী প্রশংসা করে এবং বৃদ্ধ লামাকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে আমরা শহরের অন্ধকার পথে পা বাড়ালাম । আমাদের মাথার উপর পোতালা প্রাসাদের বিরাট বিরাট ঘরগুলো মনে হল সোনার ভারে যেন আস্তে আস্তে বসে যাচ্ছে মাটিতে। সম্পূর্ণভাবে মাটিতে বসে যাবার আগে মহামান্য দালাই লামা ও তার মন্ত্রীপরিষদ পারেন না কি দেশের গরীবদের কিছু কিছু তার ধন বিতরণ করতে। তাতেতো মুক্তি ও চিরনির্বাণের পথই উদঘাটিত হবে, এই ইচ্ছাটা আমার মতো হয়তো আরও হাজার মনে হাজার বার জেগেছে। প্রজাপালক দীন দয়ালু, অন্তর্যামী চেন্-রে-জি নিশ্চয়ই সে কথা অনুভব করেছেন। মনে হয় তার যুক্তি সম্পূর্ণ অন্যরকম। লাসার আকাশে চাঁদ উঠেছে, সেই আলোকে সম্পূর্ণ লাসাকে মনে হচ্ছে মায়াপুরী, তারই আলোয় পাথরে হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চললাম আমাদের ধর্মশালার দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন