বিমল দে
খাওয়া দাওয়ার পর কথামতো আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বেরোতে আমাদের সত্যি দেরি হয়ে গেলো, তাই গুরুজী সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বললেন, আজকে আমরা যতদূর সম্ভব এগিয়ে যাবো, রাত্রিবেলা সম্ভবতঃ একজায়গায় থেমে রাতের খাবার তৈরী করতে হবে, তারপর খাওয়ার পর আবার চলবো। আমাদের শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ, বিশেষ করে গুরু চু-মিন্জেন-এর আতিথেয়তায় আমাদের শরীর ও মন সম্পূর্ণ ভাবে বিশ্রাম পেয়েছে কাজেই এখন হাঁটতে কোন অসুবিধাই নেই ৷
হিমালয়ের সুন্দর দৃশ্য থেকে আসতে লাগলো প্রেরণা আর সূর্যাস্তের রঙীন আকাশ দিল শান্তি, আমরা নতুন উদ্যমে চলতে লাগলাম ।
রাতে একটা পোড়ো বাড়ীতে রুটি তৈরী করলাম, নুন দিয়ে পরম তৃপ্তিভরে তা খেয়ে আবার চললাম। এবারকার রাস্তা দীর্ঘ আর কিছুটা একঘেয়ে তো বটেই। তিন চার বার বিশ্রাম করে ভোর বেলার দিকে আমাদের সামনে দেখা দিল ফারি ।
শহরে ঢোকবার মুখেই পেলাম একটা চায়ের দোকান। আমরা মালিকের উদ্দেশ্যে ডাকাডাকি করলাম। মালিক উঠলো না তবে তার স্ত্রী, মধ্যবয়স্কা, আমাদের ডাকে সাড়া দিলেন। দরজা খুলেই দেখলেন সামনে এক বিরাট লামা তীর্থযাত্রী। শুধু সুপ্রভাত নয়, এটা একটা বিরাট ভাগ্য। আমাদের সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে তিনি বললেন—কি চাই ? —চা। বলাই বাহুল্য, এত ভোরে চায়ের দোকানে কি কেউ সরবৎ খেতে আসে। আমাদের অপেক্ষা করতে বলে ভদ্রমহিলা ধাক্কা মেরে তার স্বামীকে তুলে দিলেন। উপায় নেই এতগুলো খদ্দেরের ঝামেলা একা সামলানো যাবে না। অবাক কাণ্ড কিছুক্ষণের মধ্যে ঘর থেকে একে-একে তিনজন লোক বেরিয়ে এল। গুরুজী আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন—সম্ভবতঃ এরা তিন ভাই, আর তিন ভাইয়ের একই স্ত্রী। আমি অবাক হয়ে গুরুজীর দিকে তাকালাম, তিনি আমার ভাবটা বুঝতে পেরে বললেন—অবাক হবার কিছু নেই, তিব্বতে এই ধরনের পরিবার প্রায়ই চোখে পড়বে, ঠিক যেমন মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডবের ছিল একমাত্র বউ-দ্রৌপদী। প্রথমে বড় ভাই বিয়ে করে, তারপর ভাইদের মধ্যে যদি সদ্ভাব থাকে তাহলে অন্যান্য ভাইরাও তাকে আপন স্ত্রী বলে গ্রহণ করে। তবে বড় ভাইয়ের দাবী ও অধিকার সব সময়ই প্রাধান্য পায় ।
চা হল আর তার সাথে গরম জলে ছাতু গুলে খেয়ে নিয়ে আমরা প্রস্তুত হলাম। আমাদের প্রত্যেকেরই দৈহিক অবস্থা তখন শেষ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ঘুম ও
বিশ্রাম দুইয়েরই প্রয়োজন। আমাদের আশ্বাস দিয়ে গুরুজী বললেন—ওই যে দেখা যাচ্ছে গুম্ফাটা সেখানেই আমরা এখন যাবো। সকালবেলাটা সেখানেই কাটিয়ে আমরা বিকেলের দিকে আবার রাস্তা ধরবো।
আমাদের নজরে পড়লো গুম্ফার সারি সারি থামে পতাকা, বিরাট বিরাট এই বাঁশ বা কাঠগুলোকে কেউই এড়িয়ে যেতে পারবে না। তিব্বতের যে কোন গুম্ফার এগুলোই হচ্ছে পথ প্রদর্শক। ছোট ছোট কাপড়ে প্রার্থনা লিখে দড়ি দিয়ে অনেক উঁচু করে সেগুলোকে টাঙিয়ে দেওয়া হয়, অনেকটা কলকাতার পূজো উৎসবের কাগজের শেকলের মতো। যত ওপরে টাঙানো যাবে ততই ভক্তের প্রার্থনা পৌঁছবে ভগবানের কাছে। আবার অনেকে ভাবেন যে, বাতাসই বয়ে নিয়ে যাবে সেই প্রার্থনা স্বয়ং বুদ্ধের কাছে। একটা ছোট রাস্তা ধরে এগুতেই গুম্ফার দেয়ালটা ঠিক আমাদের সামনে পড়ল। দেখে মনে হয় স্থানীয় পাথর ও মাটি দিয়ে সেটা তৈরী। অনেক দিনের পুরানো, দরজা নেই, মাটির দেয়ালের মাঝখান ফাঁকা রেখে দরজার কাজ সারা হয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই পেলাম একটা বিরাট উঠোন অনেকটা বিহারের বর্ধিষ্ণু খেতি বাড়ির মতো । উঠোনের চারপাশে গুম্ফার দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে ছাদওলা বারান্দা। ভেতরে কেউ তখনো ওঠেনি, কাজেই জিজ্ঞাসা করার মতো কাউকে পেলাম না। গুরুজীর নির্দেশে ওই বারান্দাতেই আমরা আশ্রয় নিলাম, তারপর কম্বল পেতে ভারী মোজা পায়ে দিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন বাধা আসে ততক্ষণ পর্যন্ত ঘুমিয়ে নিতে হবে।
দুপুর বেলার দিকে আমাদের ঘুম ভাঙলো, বেলা মনে হয় একটা কি দুটো হবে। গুম্ফার ত্রাপারা আমাদের চারদিকে এসে জড়ো হয়েছে, আমাদের উঠতে দেখেই তারা সম্ভ্রমে দূরে সরে দাঁড়ালো। মঠের গুরু বৃদ্ধ লামাও তাদের সাথে এসে হাজির হয়েছেন। আমাদের পরিচয় পেয়েই তিনি আনন্দে আমাদের স্বাগতম্ জানালেন। তিনি বললেন যে, আমরা যতদিন খুশী সেখানে থাকতে পারি কিন্তু মঠের অবস্থা দিনদিন খুবই খারাপের দিকে চলেছে। লাসার থেকে সব সময় সাহায্য আসে না, কাজেই শিশুদের নেওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মোটকথা কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে চলছে। আমরা যদি আমাদের খাওয়ার খরচ দিই তাহলে তিনি সব বন্দোবস্ত করতে রাজি, আর তা না হলে শুধু থাকার বন্দোবস্ত। আমার মতে এটা মোটেই বন্দোবস্ত নয়, যেখানে আমরা শুয়েছিলাম সেগুলো ঘর নয় দেয়ালের সঙ্গে একটা ছাউনি মাত্র । আপাততঃ কিছু ঠিক না করে পরে দেখা যাবে বলে গুরুজী তাকে এড়িয়ে গেলেন। এবার তিনি সবাইকে শহরে বেরোবার জন্য স্বাধীনতা দিলেন। তিনি বললেন——সবাই একসঙ্গে বেরোলে সকলের দৃষ্টি পড়বে, সবচেয়ে ভাল এক-এক দলে দু'তিন জন করে আলাদা আলাদা বেরিয়ে পড়, শহরটা দেখে এস। তিব্বতের এটা খুব দর্শনীয় শহর, যে যখন খুশী আবার ফিরে আসবে, তবে যদি কোন চীনা সৈন্য নজরে পড়ে তাহলে তাদের এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। তাঁর কথা শুনে সবাই একে-একে বেরিয়ে গেল, আমি গুরুজীর সাথেই রইলাম ।
সবাই বেরিয়ে গেলে গুরুজী আবার গুল্ফার বৃদ্ধ লামার সঙ্গে পরামর্শ আরম্ভ করলেন। আজকাল আমি তিব্বতী শব্দ কিছু কিছু আয়ত্ত করার চেষ্টা করছি, দু'একটা শব্দ পেলে মন্ত্রের পরিবর্তে সেটাকেই আওড়াতে থাকি। খুব মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করি তাদের কথা শুনতে। একমাত্র আমি বাদে দলের সবাই অল্পবিস্তর তিব্বতী ভাষা জানেন। গুরুজী বৃদ্ধ লামার সাথে অনেকক্ষণ পরামর্শ করে ঠিক করলেন যে, আমরা দু'বেলা খাবার জন্য মোট দশটাকা দেবো, আর তার সাথে কিছু লবণও তাকে উপহার হিসেবে দেবো। গুম্ফা আমাদের দু-বেলা ঝোলা সাম্পা খেতে দেবে। পরে গুরুজীকে বললাম, বত্রিশ জনের জন্য মাত্র দশ টাকা সত্যি সস্তা বলতে হবে। গুরুজী এক ধমকে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—মোটেই না, দশ টাকা অনেক। সাম্পা মানে এখানকার বার্লির জলের সাথে আটা ও সামান্য শুকনো মাংসের টুকরো মেশানো, এই অঞ্চলেই বার্লি হয় কাজেই খুব সস্তা।
তারপর বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখবার জন্য। গুম্ফা থেকে বেরিয়েই আমরা ডানদিকের একটা রাস্তা ধরে শহরের দিকে চললাম। একনজরে দেখেই বলা যায় যে, এই অঞ্চলের এটাই সবচেয়ে বড় শহর। যতই আমরা তিব্বতের কেন্দ্রের দিকে এগুচ্ছি ততই গ্রামগুলো আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো। মনে হয় এই শহরটি খুব বড়, বাড়ীগুলো উপত্যকার মধ্যে আরও বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে। আমরা ইতস্ততঃভাবে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগলাম। অনেকগুলো বাড়ীর সামনে এই প্রথম নজরে পড়ল সাইনবোর্ড, লেখাগুলো অবশ্য পড়তে পারছি না তবে দেখে মনে হয় বিশেষ প্রয়োজনীয়। মুদীখানার দোকানগুলো আগের চেয়ে অনেক উন্নত। চায়ের দোকানের সামনে উটকো হয়ে বসে ডজনখানেক যুবক আড্ডা মারছে, কয়েকটা ইয়াকে টানা গাড়ীও নজরে পড়ল। তিব্বতে ঢুকে প্রথম নজরে পড়ল রাস্তায় ছাড়া ইয়াক, অর্থাৎ গরু আর মোষের মাঝামাঝি ধরনের জন্তু। একটা মাংসের দোকানের সামনে দেখলাম কয়েকটি লোক পয়সা ছুঁড়ে খেলছে। এই শহরেই প্রথম দেখলাম বেশ কিছু উঠতি বয়সের মেয়েদের। পেছনে টেনে বাধা চুল আর পরণে বাকু অর্থাৎ লম্বা ধরনের সেমিজ। বয়স্কা ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকের প্রায় একই পোশাক। শহরটা খুব জমজমাট, প্রচুর কেনা বেচা হচ্ছে। পোশাকে তিব্বতীরা প্রায় সবাই এক রকম, খয়েরী রঙটা মনে হয় এরা সকলেই পছন্দ করে। ইস্কুল বলতে মঠ অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক। ছোট ছেলেরা সবাই পোশাক পায় মঠ থেকে, তারপর যতদিন তারা মঠে থাকবে ততদিন তাদের আর খাওয়া পরার ভাবনা নেই। মঠ ছাড়া বাইরে কোন ইস্কুল বা পাঠশালা নেই কাজেই অভিভাবকরা তাদের গুম্ফা বা মঠে দিতে বাধ্য। মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই, তবে তারা যৌবনে পৌছলেই বিয়ের প্রস্তাব এসে যায়। তাই সাধারণতঃ যুবতী সন্ন্যাসিনী চোখে পড়ে না। মনে হয় তিব্বতে মেয়েদের সংখ্যা কম যার জন্য সব ভাই মিলে একই মেয়েকে বিয়ে করে সমাজের চাহিদা মেটায়।
ফারিকে এখানকার লোকেরা বলে ফারি জোং, জোং অর্থে দুর্গ। ফারি দুর্গকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই শহর। আর একটি মঠকে কেন্দ্র করে প্রথমে গড়ে উঠেছিল সেই
দুর্গ। সিকিম, ভূটান, শিলিগুড়ির সাথে তিব্বতের এটাই মূল ব্যবসা কেন্দ্র । এই শহরে তাই অনেক বছর আগে থেকেই গড়ে উঠেছে ভারত-তিব্বত ব্যবসা সংস্থা, যার চলতি নাম ট্রেড সেন্টার। সেজন্য ভারতের একজন সরকারী প্রতিনিধি এখানে আছেন ৷
অনেকের পোশাক পরিষ্কার দেখলাম কিন্তু তা সত্ত্বেও এই শহরের জঞ্জাল ও আবর্জনার কথা না বললে আমার বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার বর্ণনা দিতে বাধ্য হচ্ছি।
ফারি শহরের ঠিক কেন্দ্রে আমি ও গুরুজী এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। একটা বিরাট দোতলা বাড়ীর ঠিক নিচে এসে আমরা দাঁড়ালাম। আমাদের ডান দিক দিয়ে একটা ছোট্ট পাহাড়ি খরস্রোতা এগিয়ে চলেছে। গঙ্গায় বান ডাকার ঠিক পরই তার যে ঘোলা জল সে জল এর চেয়ে অনেক পরিষ্কার। এ বর্ণনা দেবার আগে আমি অনেক ভেবেছি এর মধ্যে এতটুকু বাড়িয়ে লেখা নেই, যারা লাসার পথে এই ফারি পাড়ি দিয়েছেন তারা আমার সাথে অবশ্যই একমত হবেন ।
শহরটা নোংরা, কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। কেউ যদি কাঁকুড়গাছি থেকে খাল ধরে গঙ্গা পর্যন্ত হেঁটে আসেন তাহলেও ফারির নোংরামি কিছু আন্দাজ করতে পারবেন না। শহরে নর্দমা বলতে কিছু নেই, সরকারী পায়খানাও নেই। মাঠ ঘাটের অভাব নেই যদিও শহরবাসীদের পক্ষে সব সময় বাইরে সে কাজের জন্য যাওয়া সম্ভব নয় বিশেষ করে জরুরী সময় তা একান্তই অনুপযুক্ত। এখানকার ঘর বাড়ীর রূপ দেখলেই বোঝা যায় যে, রান্না ঘরের জানালা বা দরজার বাইরেই হচ্ছে এদের জঞ্জাল ফেলার জায়গা। জানালা দিয়ে জঞ্জাল ফেলার দরুন অনেক বাড়ীর জানালা বা দরজার সামনে বিরাট স্তূপীকৃত জমাট আবর্জনার দেয়াল উঠেছে। ঘরের যে কোন রকম আবর্জনা এরা ঘরের সামনেই রাস্তায় ফেলে, এর জন্য কার কি অপকার বা অসুবিধা হচ্ছে তা এদের জানার দরকার নেই। বাড়ীঘরের সামনে সেই স্তূপীকৃত ছাইগাদার ওপরেই সকালবেলার দিকে দেখা যায় সারি সারি লোক বসে আছে, বলতে গেলে রাস্তার ঠিক ওপরেই। দিনের যে কোন সময়ে সেখানে বসতে এরা দ্বিধা করে না, মহিলাদের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যবস্থা। ফারিতে একটাই চৌরাস্তা, সেই চৌরাস্তার পাশেই রয়েছে ডাক-চৌকি। লাসা ও ভারত-তিব্বত সীমান্তের পেমা চৌকির থেকে সেখানেই আসে ডাক। সপ্তাহে একদিন এটাই এ অঞ্চলের মূল ডাকঘর। ডাকঘরের বাঁদিকে রাস্তার ঠিক পাশে নজরে পড়ল একটা মাচা। ছেলেমানুষী মাচার মতো, ছ'সাতটা ছোট ছোট কাঠের তক্তা পেতে সেটা করা হয়েছে। মাচার ওপরে একটা শতচ্ছিন্ন চটের বেড়া। মাচাটা প্রায় ৯/১০ ফুট উঁচু হবে। মাচার ঠিক নীচেই পথিকের নজরে পড়বে জমাট বিষ্ঠার পাহাড়, কেউ একটু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটলেই তার মধ্যে পড়ে যাবে ।
এ সত্ত্বেও শহরের লোকগুলো টিকে আছে, কয়েকবার কলেরা বসন্তের মহামারী হয়েও এদের নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। শহরবাসীরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। চৌরাস্তার পর আরও একটি রাস্তায় পড়লাম, সে রাস্তায় পড়েই আমি অবাক
হলাম; নোংরামির চূড়ান্ত রাস্তার দু'ধারে। ঘরবাড়ী থেকে বছরের পর বছর ধরে রাস্তার উপর আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে, আর তারই ফলে রাস্তাটা আস্তে আস্তে উঁচু হয়ে উঠেছে। আমি গুণে গুণে এগারোটি বাড়ী দেখলাম যাদের ঘরে ঢুকতে হলে রাস্তা হতে চারটি সিঁড়ি নামতে হবে।
তবে রাখে হরি মারে কে? তিব্বতের ঠাণ্ডা বাতাসে সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু যায় জমে, যার ফলে দুর্গন্ধটা যতটা হওয়া দরকার ততটা নয়। সামনেই অরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক তুষার ধবল চোমলহরি আর তারই পদতলে ছড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য শহর। কনট্রাস্ট আর কাকে বলে ।
ফারি তিব্বতী শব্দ। এর বাংলা করলে বুঝাবে শূয়ার, নামের দিক থেকে বিচার করলে বলতেই হবে যে এর চেয়ে যোগ্য নাম আর হতে পারে না। গুরুজী এসব দিকে দৃষ্টিপাত করেন না, আমার অনুন্নত পাপী মন হয়তো এ নরক দেখতে বাধ্য হয়েছে, সত্যি জগৎটাই অদ্ভুত যেখানে স্বর্গ সেখানেই যেন নরক
‘নমস্কার জী’ ! হঠাৎ হিন্দী শব্দে সেদিকে তাকাতে বাধ্য হলাম। আমাদের পেছনে কম্বলে সমস্ত শরীর জড়িয়ে এক ভদ্রলোক সহাস্যে দাঁড়িয়ে আছেন। চেহারা ও পোশাক দেখেই বুঝলাম যে তিনি তিব্বতী নন। গুরুজী তার দিকে তাকিয়ে বললেন—‘নমস্কার’। আমিও মৃদু হেসে তার দিকে তাকালাম। ভদ্রলোক গুরুজীকে উপেক্ষা করে আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার হিন্দীতে জিজ্ঞাসা করলেন—তোমাকে দেখে খুব অল্প বয়েস বলে মনে হচ্ছে। তুমি কি হিন্দুস্থান হতে আসছো ?
আমি উত্তর দেবো কি না ভাবছি, কিন্তু আমার হয়ে গুরুজীই উত্তর দিলেন--আমরা নেপাল হতে আসছি, এই ছেলেটি আমার শিষ্য ।
—ওঃ ! তাই বলুন, আমি ভেবেছিলাম ও হিন্দুস্থানী। তা আপনারা কোথায় যাবেন ? ভদ্রলোক আলাপ শুরু করলেন।
-আমরা বেরিয়েছি তীর্থ ভ্রমণে ।
-কোথায় কোথায় যাবেন ?
—ভগবান জানেন, আপাততঃ গীয়াৎসের পথে।
—আপনাদের ভাগ্য ভাল, নেপালী বলেই পারমিশন পেয়েছেন, আজকাল মনে হয় ভারতীয় সাধুদের আসা বন্ধ হয়ে গেছে।
এবার গুরুজী তাকে পালটা প্রশ্ন করতে লাগলেন—আপনি কি হিন্দুস্থানী, এখানে কি করেন ?
—আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি এখানে উলের ব্যবসা করি। এখান থেকে উল কিনে ভারতে পাঠাই আর সেখান থেকে সামান্য কিছু মাল খরিদ করে এখানে বিক্রী করি। এটা আমার নিজের ব্যবসা নয়, মালিকের হয়ে কাজ করি, মালিক থাকে সিকিমে।
ভদ্রলোক আলাপী, তিনি সমস্তিপুরের লোক, এখানে চার বছর যাবৎ আছেন, বছরে একবার দেশে যান। কথায় কথায় তিনি জানালেন যে আজকাল ব্যবসা মোটেই ভাল চলছে না। এ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্য বলতে গেলে আস্তে আস্তে চীনারা দখল করে।
আমরা এগিয়ে চললাম তিব্বতের কেন্দ্রের দিকে অর্থাৎ উত্তর দিকে। চোমলহরি পর্বতচূড়া আমাদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে লাগল। পাহাড়ের ওপর থেকে তার প্রকৃত রূপ দেখা যায় না। সত্যিকারের পাহাড়ের রূপ ধরা পড়ে দূর থেকে। আমাদের সামনে এখন চোমলহরির এক অনবদ্য রূপ দেখা দিয়েছে, কয়েক দিন যাবৎ আমরা তা লক্ষ্য করেছি—অবশ্য লক্ষ্য না করে উপায় নেই। এ পথের পথিকদের মনে হয় সেটাই একমাত্র উপভোগ্য বস্তু। হিমালয়ের অনেক শৃঙ্গ দেখেছি এখন দেখছি চোমলহরিকে, লাসার পথে হিমালয়ের এ রূপ যার চোখে পড়বে না সে অন্ধ, পাহাড়কে একবার দেখলে তার রূপ সত্যিকারের বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে না, তাকে দেখতে হয় বার বার, সূর্যোদয়ে রাঙিয়ে ওঠে তার চূড়া—সেখান হতেই শুরু হয় দর্শন । তারপর আস্তে আস্তে সেই আলোর ছটা ছড়িয়ে পড়ে তার সর্বাঙ্গে—ধরা পড়ে তার অবয়ব। সূর্যের গতির সাথে তার রূপ আর স্বভাবের যেন পরিবর্তন হয়। প্রতিমুহূর্তেই চোমলহরির চেহারার পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ছে, কখনও ভয়ংকর, কখনও শান্ত, কখনও স্নিগ্ধা মাতৃমূর্তি, পরক্ষণেই বজ্রধারী রুদ্ররূপী, মনে একটু কল্পনার কালি ছোঁয়ালেই হল, মনে হয় বুদ্ধের যতগুলো রূপের কল্পনা করা যায় তার সবই পাওয়া যায় এই চোমলহরির মধ্যে। এই ভয়ংকর নিঃশব্দ আর ঠাণ্ডার মধ্যে চোমলহরি পথিকদের যোগায় উৎসাহ আর তার রূপের আকর্ষণে এগিয়ে চলে তীর্থযাত্রীর দল। তাইতো অনন্তকাল ধরে তীর্থযাত্রীরা অক্লান্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও এগিয়ে চলেছে এ পথে। তার ডাকে শত বাধা তুচ্ছ করে আমরাও এগিয়ে চলছি।
বিকেলের দিকে ঠাণ্ডাটা আরও বাড়তে লাগল—পড়ন্ত সূর্যের সোনালী আভায় যখন চোমলহরির তুষার ধবল শৃঙ্গ (৪৭০০ মিটার) মায়াবী মূর্তি ধারণ করেছে, ঠিক সেই সময়ই যেন আমাদের সর্বশরীরে তুষারের ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকতে আরম্ভ করল। সূর্যাস্ত হল আর তার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ যেন ঠাণ্ডায় আমাদের দেহ অবশ হয়ে এল। হঠাৎ বাতাসটা আরও জোরে বইতে লাগল। এ অবস্থার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না, গ্যাংটক থেকে নাথূ-লা পার হবার সময়ও আমরা এত ঠাণ্ডা পাইনি। কম্বলগুলো খুলে যে যার গায়ে জড়িয়ে নিলাম। রাস্তায় যে উলের মোজা আমরা কিনেছিলাম সে মোজাও আমরা পরতে বাধ্য হলাম। কিন্তু মোজা পরার পর দেখা দিল আর এক সমস্যা, এত পুরু মোজা পরে কিছুতেই জুতোর মধ্যে পা ঢোকানো সম্ভব নয়—অর্থাৎ এই ধরনের মোজার জন্য চাই উপযুক্ত তিব্বতী জুতো। আমাদের মধ্যে চার পাঁচ জনতো শীতে রীতিমতো কাঁপতে আরম্ভ করে দিয়েছে। গুরুজী সব দিক বিচার করে আমাদের আগুন জ্বালাতে পরামর্শ দিলেন। একটা বিরাট পাথরকে আড়াল করে আমরা দাড়ালাম, জ্বালানী কাঠ সঙ্গেই ছিল। এখন পরিষ্কার বুঝলাম যে কেন এই কাঠ কেনা হয়েছিল। সেই অবস্থায় আগুনটা যে উপকারে লাগল তা লিখে বোঝাতে পারবো না ।
আগুন পোহাবার জন্য আমাদের বেশ কিছু দেরী হয়ে গেল, গুরুজী আপসোস করে বললেন—আমাদের আরও আগে বেরোনো উচিত ছিল। এই অঞ্চলে কোন জনমানবের চিহ্নও নেই কাজেই আমাদের হাঁটতেই হবে। আমাদের শ্বাসকষ্ট দেখা দিল, বসলে বাতাসের ঠাণ্ডা আর দাঁড়ালে মনের ভেতরের ঠাণ্ডা, আমাদের চলা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। আরও দু'বার আমরা আগুন জ্বালিয়ে শরীরটাকে গরম করে নিলাম। এই সময় গুরুজীর উৎসাহ ও মনোবল দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমরা এইভাবে যদি হাঁটতে থাকি তাহলে মনে হয় প্রত্যেককেই এ পথে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে হবে।
কিন্তু রাখে হরি মারে কে? গোধূলির অল্প আলোয় হঠাৎ আমাদের নজরে পড়ল একটি তাঁবু, ঠিক রাস্তার ধারেই। জলে ডোবার আগে লোকে যেমন একটা ভাসমান পাতাকেও আঁকড়ে ধরে বাঁচবার আশায়, আমরাও ঠিক তেমনি এগিয়ে গেলাম তাঁবুটার দিকে একটু আশ্রয়ের জন্য। তাঁবুটাকে ঠিক তাঁবু না বলে রোদ ঠেকাবার সামিয়ানা বলা যেতে পারে, অর্থাৎ চারদিক খোলা। আমি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখলাম যে আমাদের এই বত্রিশজনের দল যদি এই তাঁবুটার মধ্যে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে চায় তাহলেও এতে স্থান হবে না, বসাতো দূরের কথা। আমাদের দেখে তাঁবুর ভেতর থেকে খক্ খক্ করে কাশতে কাশতে বেরিয়ে এল দু'জন লোক। গুরুজী তাদের সাথে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। আমার সাধারণ বুদ্ধিতে এই প্রথম মনে হল যে গুরুজীর মতিভ্রম হয়েছে, যে তাঁবুর মধ্যে এতগুলো লোকের ঢোকা অসম্ভব, সেখানে আশ্রয় চাওয়ার কোন মানে হয় না। তবে আমাদের দলের প্রত্যেকটি লামাই দেখলাম এই ব্যাপারে একদম চুপচাপ। আমি যদি মৌনী-বাবা না হতাম নিশ্চয়ই তর্কের ঝড় তুলে এক তীব্র প্রতিবাদ করতাম। গুরুজীর সাথে তাদের কি কথা হল জানি না তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার আগুন জ্বালানো হল। সেই আগুনের উপর যাযাবর লোকটা একটা পুরোনো অ্যালুমিনিয়মের হাঁড়ি চাপালো, তাতে ভর্তি করা হল জল। এই যাযাবার পরিবারটি এই অঞ্চলের, এই ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে এদের ছোটবেলা থেকেই পরিচয় আছে, বাতাসের ধরন দেখেই এরা বুঝতে পারে এর উৎস। তীর্থযাত্রীদের কষ্ট শুনে এরা বলল সেটাই স্বাভাবিক। দুপুরবেলা খাওয়ার পর ঠাণ্ডা বাতাসে বেরোনো ঠিক নয় কারণ অনেকক্ষণ হাঁটার পর দেহ গরম হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত হাঁটলে দেহটা উপযুক্ত পরিমাণে গরম হয় আর সেই সময় শরীর সহজেই এই বাতাস সহ্য করতে পারে।
এই অঞ্চলে সব সময় এত ঠাণ্ডা বাতাস বহে না। কয়েকদিন আগে চোমলহরির
জমাট বরফের একটা বিরাট ধস নীচে নেমে এসেছে, আর মৃদু বাতাস তার উপর দিয়ে এসে পড়ছে এই অঞ্চলে। এখন যতদিন পর্যন্ত না বরফ গলে ততদিন পর্যন্ত এই বাতাস বইতে থাকবে। গুরুজী বললেন যে এখন এখানকার তাপমাত্রা বরফ পড়ার মান ছাড়িয়ে অনেক নীচে নেমে এসেছে, অর্থাৎ বরফ পড়া মানে এই কনকনে ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। আমাদের যে ঠাণ্ডা লাগছে সেটা আসছে পায়ের থেকে, পায়ের ঠাণ্ডাটাই মাথায় উঠছে।
এর মধ্যে জলটা গরম হলে সেই জলে কিছু শেকড় ও মাখন ফেলে দেওয়া হল । শেকড়টাকে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ সেদ্ধ করা হল, তারপর আমরা চা-এর মতো করে সেই জল পান করতে লাগলাম ও সেই সাথে আগুনে পা-গুলোকে ভালোভাবে গরম করে নিলাম। এই চা-টাকে আমি গরম আদা জলের সঙ্গে তুলনা করবো, চা খাওয়ার সাথে সাথেই শরীরটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। চা মন্ত্রের মতো কাজ করল।
পরে বুঝলাম যে এই চা-ই হচ্ছে এই পরিবারটির বৈশিষ্ট্য। পথিকদের চা বিক্রি করাই তাদের পেশা। শিকড় দিয়ে যে চা আমাদের জন্য তৈরী করেছে সেটা অবশ্য খুবই দামী চা, গরীবেরা তা কিনতে পারে না। বত্রিশজনের জন্য কম করেও চল্লিশ গ্লাস জল, তার সঙ্গে দামী বিশেষ শেকড়, সামান্য চা আর মাখন। দাম পড়ল মাত্র তিন টাকা। আমাদের কাছে খুবই সস্তা, কিন্তু গুরুজীর মতে খুব চড়া দামে ছেড়েছে। জানি না শিকড়টার কি গুণ লুকিয়েছিল, কিন্তু আমি হলপ করে বলতে পারি যে এটা এর ঔষধ-গুণ। রক্তকে গরম করার এমন অব্যর্থ ঔষধ আমার কল্পনার অতীত। তিব্বতী যাযাবররা এই ধরনের অনেক টোটকা ঔষধ জানে।
আবার চলার আগে, গুরুজী আমাদের রাতে চলার এক চমৎকার উপায় বলে দিলেন। তিনি বললেন যে, সরাসরি উত্তর দিকে আমাদের চলতে হবে। রাস্তা অন্ধকার আর পাথরে ভর্তি তাই তিনি উত্তর দিকের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রপুঞ্জ দেখিয়ে দিয়ে আমাদের সেদিকেই চলতে নির্দেশ দিলেন, অন্য কোন দিকে আমরা যেন নজর না দিই। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাই তাহলেও হারাবার সম্ভাবনা নেই। ওই তারার প্রতি নজর রাখলেই হবে। কতদূর বা কোথায় আসতে হবে সেটা তিনি ঠিক সময় মতো বলে দেবেন। তিনি বার বার সাবধান করে দিলেন——আমরা মুখ দিয়ে যেন নিঃশ্বাস না নিই। তবে প্রয়োজনবোধে নাক দিয়ে টেনে মুখ দিয়ে ছাড়তে পারি। তিনি সকলকে নির্দেশ দিয়ে এগিয়ে গেলেন, আমি রইলাম ঠিক তাঁর পেছনে, ছায়ার মতো। কম্বলটাকে গুটিয়ে আবার আমরা কাঁধে ঝুলিয়েছি প্রয়োজনবোধে ব্যবহার করা হবে ।
রাত্রি বেশ হয়েছে, ক'টা বাজে কে জানে, কারও কাছে ঘড়ি নেই। এত শীত কিন্তু তাপমাত্রা মাপবার কোন যন্ত্র আমাদের নেই, আর কত মাইল আছে তাও জানি না। তবে রেপতেনী বলেছেন যে আমরা এখন চোমলহরি পাহাড়ের ঠিক নীচেই রয়েছি। এখান থেকে পাহাড়ি রাস্তাটা উপরের দিকে উঠে গেছে, একটা পাহাড় ডিঙোতে হবে। এটাই হিমালয়ের শেষ ধাপ, তারপরেই আমরা পাব তিব্বতের সমতলভূমি। এই
রাস্তাটার সর্বোচ্চ অংশে রয়েছে গিরি কন্দর বা পাশ। তারই কাছাকাছি আমাদের রাত কাটাতে হবে। এ পর্যন্ত আমি গুরুজীকে আমাদের যাত্রা পথের কোন রকম পরিকল্পনা জিজ্ঞাসা করিনি, অর্থাৎ কোথা দিয়ে কোথায় যাবো। আমাদের এই তীর্থের শেষ কোথায়, কতদিন এ দেশে থাকবো—এ সবের আমি কিছু জানি না, অন্ধের মতো গেশে রেপতেনকে অনুসরণ করে চলেছি।
চারদিকে নিঃশব্দ, এ অঞ্চলে গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। আমাদের সামনে-পেছনে, ডান-বাঁয়ে হালকা অন্ধকারের এক দেয়াল। বড় বড় পাথরগুলো মাঝে মাঝে চোখে পড়ে আর ছোটগুলোতে হোঁচট খেতে খেতে আমরা এগিয়ে চলেছি। সেই নিঃশব্দের মধ্যে মাঝে মাঝে লামাদের শ্বাস-প্রশ্বাস' শোনা যাচ্ছে। ঠাণ্ডা বটে কিন্তু আকাশ পরিষ্কার, তারার অভাব নেই। আকাশের দিকে নজর দিয়ে চলেছি, অসংখ্য তারা দিয়ে যেন আমাদের পথটাকে আলোকিত করা হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমাদের রাস্তার দু'পাশে যেন হাজার তারা ছড়িয়ে তাকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। তারা দেখে দেখে চোখটা অভ্যস্ত হয়ে গেল, যেন রাস্তার উপরেও আমরা তারার মেলা দেখতে পেলাম। অন্ধকার এখন চোখে সয়ে গেছে। লক্ষ তারার আলোয় লুকিয়ে থাকা অন্যান্য তারাগুলোও আমাদের চোখে একে-একে ধরা পড়তে লাগলো, ঠাণ্ডাটাও এখন কম লাগছে। রাস্তায় চলার মধ্যে পেয়েছি অতি ধীর এক ছন্দ, চারদিকের স্তব্ধতা আমাদের সেই ছন্দের সঙ্গে যেন তাল মিলিয়েছে। এ এক অদ্ভূত অনুভূতি জানি না সেই অনুভূতি কি আনন্দের না স্তব্ধতার অনুভব মাত্র। সমস্ত শরীর মনে হচ্ছে যেন হালকা হয়ে এসেছে, মেঘের উপর দিয়ে আমরা যেন এক স্বর্গীয় আনন্দ উপলব্ধি করে চলেছি অনন্তকাল ধরে মহাতীর্থের পথে।
কতক্ষণ ধরে চলেছি তার ঠিক নেই, হঠাৎ কানে এল এক সুন্দর সুর। আমরা সকলেই কান খাড়া করলাম—ঠিক, ভুল নয়। এ অতি পরিচিত গুরুজীর কণ্ঠ। আমরা দাড়ালাম, তারপর গুরুজীর কণ্ঠের সাথে সুর মিলিয়ে আমরাও আবৃত্তি করতে লাগলাম, নিঃশব্দ রজনীর অধিষ্ঠাত্রী দেবীর উদ্দেশ্যে। গুরুজী বললেন- আমরা এখন তাংলাতে এসে পৌছেছি। তাংলা থেকে চোমলহরি পর্বতশৃঙ্গ খুব কাছে। এই পথের এটাই সবচেয়ে উঁচু অংশ, এবার আমরা আস্তে আস্তে নীচের দিকে যাবো। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছবো পরবর্তী শহর তুংলাতে ।
একটু বিশ্রাম করে আমরা আবার রওনা হলাম। আকাশের তারাগুলো ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হতে লাগলো, বুঝলাম ভোর হতে আর দেরী নেই। সারারাত ধরে হেঁটেছি ; মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা এই অংশটা পাড়ি দিয়েছি। তারার দিকে তাকাতে তাকাতে আমরা আমাদের দেহের ক্লান্তি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এই ধরনের চলা একমাত্র নিঃশব্দতার মধ্যেই সম্ভব। মনকে দূরের তারার সাথে একাগ্র নজরে রেখে যদি চলা যায়, তাহলে মন দেহের ক্লান্তিকে তুচ্ছ করার ক্ষমতা পায়। আমাদের এই চলাই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিব্বতী সাধুরা এবং তীর্থযাত্রীরা এই কৌশলের সাথে খুবই পরিচিত।
এই কৌশল না জানলে চোমলহরির এই পথ এত তাড়াতাড়ি পাড়ি দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার ছিল।
ভোরবেলার দিকে পাহাড়ি রাস্তার শেষ অংশটা পেরোতেই আমাদের সামনে একটি সুন্দর দৃশ্য দেখলাম। পাহাড়, বরফ আর তার উপর সোনালী আভার এক নয়নাভিরাম দৃশ্য, অনেকটা দার্জিলিং-এর টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্যের মতো।
লাসার পথ এখন আমাদের কাছে মুক্ত, আমাদের সামনে এখন সমতলভূমি । সমতল অবশ্য নামে মাত্র, পাহাড়ি অঞ্চলে খুব বেশী ওঠা নামার রাস্তা না হলেই তাকে বলে সমতল। আসল কথা হচ্ছে যেএখান থেকে লাসার পথে আর কোন বিরাট পাহাড় পড়বে না। এখান থেকে উত্তরে ধুধু কুয়েল্ লান্ পর্বত। সুখের বিষয় যে সেটাকে আর আমাদের পার হতে হবে না ।
তিব্বত এখন আমাদের কাছে এমন সহজ হয়ে এসেছে যে ঠাণ্ডা বাতাস, এখানকার লোকজন আর খাবারের সাথে নিজেদের আস্তে আস্তে খাপ খাইয়ে নিয়েছি, পথ ও আজকাল আগের মতো কষ্টকর নয়। পথটা সহজ পেয়ে আমাদের চলাতেও খুব উৎসাহ এসেছে। ফারির পর আমরা আরও কয়েকটি ছোট শহর পেলাম, এক রাত্রি করে প্রত্যেক জায়গায় বিশ্রাম করে ছ'দিনের দিন দুপুরের দিকে আমরা এসে পৌঁছলাম সামাদা নামক একটি শহরে। ফারির পর যে সব শহরগুলো পার হয়েছি তাদের নাম যথাক্রমে তূনা, রাম, দোসেন, এদের মধ্যে দোসেনকেই বলা যেতে পারে শহর। চলার পথে আর একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, এখানে রাস্তার সংখ্যা খুবই কম। আমাদের দেশে যেমন বড় রাস্তার সাথে প্রায়ই ছোট ছোট রাস্তা বা হাঁটা পথ নজরে পড়ে, এখানে সে রকম কিছু নেই, মাঝে শুধু যাযাবরদের সাথে দেখা হয় বটে তা ছাড়া জনবসতি খুবই কম।
সামাদা দোসেনের মতোই একটি শহর, ফারির তুলনায় খুবই ছোট বলতে হবে। এই পর্যন্ত রাস্তায় ইলেকট্রিক চোখে পড়েনি। যানবাহনের মধ্যে কয়েকটি মিলিটারী চীনা জীপ নজরে পড়েছে। লরি, মোটর বা বাস মনে হয় এ অঞ্চলের লোকেরা কোনদিনই দেখেনি। রেলগাড়ীর তো প্রশ্নই নেই। সামাদা শহরে ঢোকবার পথেই একটা সাদা দোতলা বাড়ী আমাদের চোখে পড়ল, বাড়ীটার চারদিকে রঙিন কাগজ ও কাপড় দিয়ে সাজানো। আরও কাছে আসতেই দেখি ঠিক তার সামনে একটা সামিয়ানা গোটানো রয়েছে, নিশ্চয়ই কোন উৎসবের আয়োজন হয়েছে। সামিয়ানার সামনে রাস্তার উপরে বসে আছে বেশ কিছু লোকজন ও ভিখিরি, আর তার পাশেই একটা বাজনার দল। বাজনার মধ্যে রয়েছে দুটো চোঙা-ভেরী, একটা ভাঙা বিরাট খঞ্জনী আর একটা একমুখো ঢোল। আমাদের কাছে আসতে দেখেই রাস্তার উপর থেকে তারা জিভ বার করে নমস্কার জানিয়ে দুধারে হাসিমুখে সরে দাঁড়ালো। আমরাও তাদের হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানিয়ে এগিয়ে চললাম। বাড়ীটা পেরিয়ে কিছুদূর এসেছি এমন সময় পেছন থেকে কয়েকটি লোক আমাদের দিকে দৌড়ে এল, তাদের দেখে আমরা দাঁড়ালাম। তাদের মধ্যে একজন খুব ভক্তিভরে আমাদের প্রণাম জানিয়ে অতি বিনয় সহকারে আমাদের বলল,
—দয়া করে আপনারা আমাদের বাড়ীতে আসুন, বাড়ীর মালিক আপনাদের ডাকছেন।
তার কথা শুনে গুরুজী জিজ্ঞাসা করলেন- -কেন কি ব্যাপার। উৎসব নাকি ? - —আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার বোনের বিয়ে, বাবা আপনাদের ডাকছেন ৷
আমরা তার কথা শুনে নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া-চাও’ই করলাম মাত্র তারপর রাজি হয়ে গেলাম।
তার সাথে সেই বাড়ীতে এসে হাজির হলাম। দরজার সামনেই সেই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখেই তিনি গড় হয়ে প্রণাম করলেন, তার দেখাদেখি অন্য সকলেও। রাস্তার উপরই তিনি একটি সতরঞ্চি বিছিয়ে দিয়ে আমাদের বসতে দিলেন। গুরুজীর আশ্বাস পেয়ে আমরা সকলেই বসলাম ।
ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন তিনি এই অঞ্চলেরই একজন জমিদার। তাঁর বড় মেয়ের বিয়ের দিন আজ, আর সৌভাগ্যক্রমে আজই তিনি এই সাধু তীর্থযাত্রীদের দর্শন পেয়েছেন। ভগবানের অশেষ কৃপাবলে তাঁর মেয়ের এই সৌভাগ্য উপস্থিত। ঠিক বিয়ের দিনে এতগুলো সাধুদের আশীর্বাদ পাওয়া খুবই দুর্লভ। তিনি তাই আমাদের সকলকে সেখানে থাকতে বললেন। দুপুরবেলা গুরুজীকে খেতে হবে আর তার পরিবর্তে মেয়েকে সুখী ও দীর্ঘজীবনের জন্য আশীর্বাদ করতে হবে।
এই মুহূর্তে অন্যান্য লামারা কি ভাবছেন আমি জানি না। তবে আমার কাছে এ এক সুবর্ণ সুযোগ। তিব্বতে ঢোকা অবধি শুধু রাস্তা ও মঠ দেখে দেখে একঘেয়েমী লেগে গেছে। এ সুযোগ না হারানোই ভাল। আমাদের এই তীর্থযাত্রীরা তিব্বতের সমাজ ও লোকজনদের প্রতি একেবারেই উদাসীন, তাদের লক্ষ্য অন্যদিকে। আমি কিন্তু তাদের মতো নই অন্ততঃ এখনও সেই অবস্থায় পৌছাইনি, কাজেই এমন সুযোগ আমার কাছে সত্যি লোভনীয়। গুরুজীর লাভ হচ্ছে দুপুরবেলার খাওয়াটা। তাতে খাওয়ার হাঙ্গামা ও খরচ দুইই বাঁচবে। তিনি যতদূর সম্ভব খরচ ও খাওয়া দাওয়ার হাঙ্গামা বাঁচিয়ে চলছেন । তাঁর মতে প্রথমের দিকে যত বাঁচাবে পরের দিকে ততই লাভবান হবে ।
এই প্রথম দেখছি তিব্বতী সম্ভ্রান্ত পরিবারকে। পুরুষদের ঢিলে-ঢালা পোশাক আর মেয়েদের পোশাকটা, সিকিমিদের মতো অনেকটা, অর্থাৎ পরনে লম্বা বাকু। তবে নতুনত্বের মধ্যে দেখলাম ওদের চুলের বাহার। ছোট্ট কাঠের ফ্রেম দিয়ে মাথার উপরে চুলটাকে ছড়িয়ে বাঁধা হয়েছে অনেকটা চূড়ার মতো। সবাই খুব হাসি খুশী। ওদের পোশাকেই আভিজাত্যের চিহ্ন। রাস্তার লোকেদের সাথে এদের তফাৎটাও অনেক। মনে হয় বিয়ে বা কোন রকম উৎসবের সময়ই এই ধরনের পোশাক ব্যবহার করে ।
গৃহকর্তা কিছুক্ষণ পরে আমাদের কাছে এলেন। তারপর নীচু স্বরে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন, গুরুজী কথাটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে তারপর গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতিসূচক উত্তর দিলেন। বাড়ীর ঠিক পেছনেই একটা তাঁবু খাটিয়ে রান্নার বন্দোবস্ত হয়েছে। বিয়ে বাড়ীর অধিকাংশ লোকজনই সেখানে ভিড় করে আছে, বিয়ে বাড়ীর প্রাণকেন্দ্র মনে হয় সেখানেই রয়েছে। যুবক যুবতীরা হাসাহাসি করছে, ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে, আর বয়স্করা বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও সাহায্য করবার জন্য ব্যস্ত।

আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হল যে বাজারে চাং আনবার জন্য লোক পাঠানো হয়েছে । চাং আসলে চা নয়, এর মধ্যে কণামাত্র 'চা-ও নেই। তিব্বতের খুব প্রিয় একটি ঠাণ্ডা পানীয়, উৎসব ও বিশেষ দিনে এর চাহিদা আরও বেশী। চাং তৈরী হয় বার্লি থেকে। বার্লির পাঁচন থেকে এটা তৈরী হয় বলে এর মধ্যে মাদকতা আছে—অনেকটা আমাদের দেশে যেমন তালের রস থেকে তৈরী হয় তাড়ি। চ্যাং বা চাং খাওয়াতে দোষ নেই; ছেলে-মেয়ে, বাপ-মা, দাদু-দিদিমা সবাই এক সাথে বসে চাং খেতে পারে। কোলের শিশুদেরও ঝিনুকে করে চাং খাওয়ানো যেতে পারে, তাতে নাকি শিশুদের ভালো ঘুম হয়। সমাজের সকল পর্যায়ের লোকেরাই এটা পছন্দ করে, এমনকি লামারাও। তবে লামাদের মধ্যে দালাই লামা সম্প্রদায় অর্থাৎ গেলুপা পন্থার লামারা এই চাং খান না। প্রায় একঘণ্টা বসার পর দেখলাম একটা কুলির পিঠে করে বিরাট একটা টিন এল, বুঝলাম এরই মধ্যে আমাদের পানীয় এল ।
গুরুজী বুঝিয়ে দিলেন যে আমরা তীর্থযাত্রী, আসছি বহুদূর থেকে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে সাধুরাই হচ্ছে সেরা, তাদের সেবা করা একটা বিরাট কর্ম, কাজেই তাদের এই আগ্রহকে উপেক্ষা করা ভাল নয়, তাতে চলার পথে বিঘ্ন আসতে পারে। গৃহকর্তা এসে আমাদের জানালেন জলখাবার প্রস্তুত, আর সেই সাথে তিনি অতি বিনীতভাবে নিবেদন করলেন—আমাদের পরিবারের একান্ত ইচ্ছা যে আপনাদের পাদোদক ধরে রাখি ৷ আপনারা ভগবান বোধিসত্ত্বের দেশ থেকে আসছেন, এ সুযোগ তো আর আমাদের সব সময় হয় না। আশা করি আপনারা এ অধমের প্রার্থনা মঞ্জুর করবেন। আপনারা ঠিক এমন শুভদিনে এসে পৌঁছেছেন, সবই ভগবান চেরেজির ইচ্ছা ।
আমরা সকলে গুরুজীর দিকে তাকালাম, পাদোদক কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তিনি আমাদের বুঝিয়ে বললেন— আমরা হচ্ছি অতি পুণ্যবান মহাত্মা, ভারত হতে যেসব সাধু তীর্থযাত্রীরা আসেন এদের কাছে তারা সত্যিকারের পুণ্যাত্মা। এখন এই ভদ্রলোক আমাদের পাদোদক চাইছেন, মানে আমাদের পা ধোয়ানো জলটা রেখে দেবেন। সেই জলটাকে ঠিক গঙ্গাজলের মতোই বিভিন্ন পবিত্র কাজে ব্যবহার করবেন, প্রয়োজনবোধে অসুখ-বিসুখের সময়ও পান করা যাবে। তিব্বতে এই ধরনের পাদোদক খুবই প্রচলিত ৷
এই ব্যাখ্যা শুনে আমরা রাজি হয়ে গেলাম অবশ্য গররাজি হওয়ার তো কোন প্রশ্নই নেই। আমার মন কিন্তু তাতে সম্পূর্ণ রাজি হল না। চরণামৃত দেওয়া একমাত্র দেবতা ও সৎগুরু ছাড়া সম্ভব নয়। এই লামাদের মধ্যে আমি হচ্ছি এক নম্বরের ভণ্ড। তিব্বতের হাজার হাজার বালক সন্ন্যাসীদের যে কেউ আমার থেকে অনেক পবিত্র। আমার দেহ-মন, বাক্য ব্যবহার, কোনোটার মধ্যেই পবিত্রতার ছাপ নেই। কাজেই আমার মতো পাপীর পা-ধোয়া জল নিয়ে এরা কিছুতেই উদ্ধার পাবে না, মাঝখান থেকে ফোস্কা পড়া পা-ধোয়া জল খেয়ে নিশ্চয় অসুখে পড়বে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বিরাট টিনের গামলায় করে জল এলো। গুরুজী আমাদের সকলকে জুতো খুলতে বললেন, বলা সহজ কিন্তু এই ঠাণ্ডায় জুতো খোলা সত্যিই একটা সমস্যা। যাই হোক, আমরা জুতো খুলতে বাধ্য হলাম, তারপর গুরুজীই প্রথমে সেই হিমশীতল জলে দু'পা ডুবিয়ে পা দুটো ধুয়ে নিলেন। তারপর একে-একে অন্যান্য লামারাও পা ধুয়ে নিলেন, এবার এল আমার পালা। জলে বাঁ পা-টা ডুবোতেই মনে হল ঠাণ্ডাটা আমার শিরা ধরে সরাসরি উঠে আসছে বুকের কাছে। কোনক্রমে সেই ভাবটাকে গোপন করে আমি দু'পা ডুবিয়ে ভালোভাবে পা-টা ধুয়ে নিলাম। একমাস পর এই প্রথম আমার পদযুগল জলস্পর্শ করল। পাশেই একজন ভদ্রমহিলা দাড়িয়েছিলেন গামছা হাতে নিয়ে তাতে পা-দুটো মুছে তার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বিছিয়ে দেওয়া সতরঞ্জিতে বসলাম। জলের ঠাণ্ডায় পা-দুটো জমে যাওয়ার মতো হয়েছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আশ্চর্যান্বিত হলাম। পায়ের রক্ত চলাচল আগের চেয়ে আরও অনেক ভালোভাবে শুরু হল, ধীরে ধীরে পা-টা গরম হয়ে উঠল। মনে হয় এটা আমাদের পক্ষেও খুব দরকার ছিল। তারপর একে-একে বাড়ীর সবাই আমাদের প্রণাম করে যেতে লাগল। একদম শেষে এল কন্যা আর তার ছোট বোন। মেয়েটিকে দেখতে খুবই সুন্দরী। সিল্কের পোশাক, কোমরে পেটি বাঁধা, তিব্বতে অধিকাংশ মেয়েরাই
কোমরে পেটি বাঁধে, ঠাণ্ডার হাত হতে রক্ষা পাওয়ার এটা একটা চমৎকার উপায়। ভূটান বা সিকিমেও এই জিনিসটা চোখে পড়েছে। ভদ্রলোকদের মধ্যে অনেকেরই মাথায় সাহেবী টুপী। তাছাড়া পোশাক স্ত্রী-পুরুষের প্রায় সমান। বিরাট হাতাওলা জামা, শুধু গরমের সময় এরা তার একটা হাতাখুলে রাখে।
মেয়েটি আমাদের প্রত্যেককে একে-একে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করতে লাগল, আর আমরাও তাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করতে লাগলাম। আমার কাছে এলে আমি অতি গম্ভীরভাবে তার মাথা ছুঁয়ে--‘নারায়ণ! নারায়ণ তোমায় রক্ষা করুন, তোমার জীবন সুখের হোক' এই বলে আশীর্বাদ জানালাম। এরপর 'কন্যা' ঘরে গিয়ে আমাদের জন্য চাং নিয়ে এল। কাঠের ও বাঁশের গেলাসে করে চাং (অর্থাৎ বার্লির বিয়ার) আর তার সাথে এল ছাতুর লাড্ডু। খাবার আগে আমরা পরিবারের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করলাম। বিয়ার এর আগে আমি খাইনি। একটু তিতো আর মিষ্টি, অনেকটা বিকেলের ঝরে যাওয়া খেজুরের রসের মতো খেতে। আমি এক গ্লাস মাত্র খেলাম আর আমাদের মধ্যে অনেকে তিন গ্লাস খেলেন। কন্যাকে উপহার স্বরূপ গুরুজী একটা রুদ্রাক্ষের মালা দিলেন। তারপর সবাইকে বিদায় জানিয়ে আবার পথ ধরলাম। গুরুজী আমাকে ফিস্ ফিস্ করে বললেন—যদি আমাদের এত বড় দল না থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের না খাইয়ে ছাড়তো না ।
আমরা সামাদা শহরের মধ্যে ঢুকলাম, শহরটি খারাপ নয় অন্ততঃ ফারির তুলনায় অনেক পরিষ্কার। বাড়ীগুলোও বেশ চমৎকার। অধিকাংশ বাড়ী পাথর আর মাটি দিয়ে তৈরী, জানালা দরজা আর ঝোলানো বারান্দাগুলো অবশ্য কাঠের। বাঁদিকে একটা ছোট মিলিটারী চৌকি। রাস্তার ধারে অনেক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম সূর্যের আলোয় ভেড়ার পশম শুকোতে দিচ্ছে আর প্রয়োজন মতো বস্তায় ভর্তি করছে। এতগুলো লামাকে একসাথে যেতে দেখে শহরের সবাই রাস্তার ধারে ছুটে ছুটে এসে আমাদের প্রণাম করতে লাগল। মনে হল এটাই তাদের আজকের দিনের প্রধান আকর্ষণ । অনেক বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ঠিক দণ্ডি কাটার মতো এসে আমাদের চরণ স্পর্শ করে আশীর্বাদ চাইল—সবাই হাসি খুশী। অনেকগুলো টিন ও কাঠের ঘর আমাদের চোখে পড়ল, মনে হয় এটাই বাজার। আমার ইচ্ছে ছিল শহরটা দেখার কিন্তু গুরুজী থামলেন না ; মিলিটারীরা হাঙ্গামা করতে পারে, আমরা এগিয়ে চললাম। সামাদা পেরিয়ে আরও দু'ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা পেলাম একটা বিরাট গুম্ফা। গুরুজী বললেন—ওই যে দেখতে পাচ্ছো দূরের গুম্ফাটা ওখানেই আমরা আজ থামবো, অবশ্য যদি সেখানে বন্দোবস্ত না হয় তাহলে ফিরে আসতে হবে সামাদায়। যদিও খুব শীত কিন্তু মাথার ওপর সব সময়ই সূর্য থাকায় আমাদের খুব বেশী অসুবিধা হচ্ছে না। তবে সূর্য না থাকলে আমাদের পক্ষে হাঁটা খুব মুশকিল ছিল। এখন জমিটা আবার অসমতল হয়ে আসছে—এই গুম্ফাটাও একটু উঁচু জায়গায় অবস্থিত। গুম্ফার কাছে যেতেই কয়েকটা কুকুর আমাদের দিকে চিৎকার করে ছুটে এল। তিব্বতের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রাম, শহর ও মঠে তাদের অ্যাপ্যায়ন এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল, এখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন