বিমল দে
দ্বিতীয় দিন রাত্রিবেলা আমরা হলঘরে বসে নিঃশব্দতা উপভোগ করছি এমন সময় একটি ত্রাপা এসে গুরুজীকে বলল—মহামান্য খাম্পো আপনাকে ডাকছেন। গুরুজী তার কথা শুনে উঠে চলে গেলেন।
আমরা বসে রইলাম। এই হলঘরটা সাধারণত লামাদের ধ্যান ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হয়। দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য তাংখা। কাঠের কাজগুলো ড্রাগন মূর্তিতে ভর্তি, আর বেদীতে রয়েছে অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি। ঘিয়ের প্রদীপটা সব সময়ই জ্বলে কিন্তু খুবই ক্ষীণ, তার আলোতে ভালোভাবে কিছুই দেখা যায় না। এই হলঘরটার দিনরাত্রি সব সমান। তিব্বতের অন্যান্য মন্দিরের মতোই এখানে কোনোরকম জানালা নেই। দিনের বেলা দরজা দিয়ে যতটুকু আলো আসে তাতে ঘরটার সব শিল্পগুলো দেখা যায় না। তিব্বতের সব গুম্ফাতেই দেখছি অতি সুন্দর ও অপূর্ব শিল্পসম্ভার। কিন্তু উপযুক্ত আলোর অভাবে সেগুলো অখ্যাতই থেকে গেছে। শিল্পী তার শিল্পকে এখানে স্থান দিয়েই তার কর্তব্য শেষ করেছেন, জগতে এর পরিচয় হোক বা না হোক তাতে তার কিছুই যায় আসে না। ভগবান সর্বব্যাপী ও সর্বজ্ঞ তিনি এই উপহার নিশ্চয়ই গ্রহণ করেছেন। তিব্বতে যে কোন ব্যাপারে এরা অতি উজ্জ্বল রং ব্যবহার করে তাতে অনেক সময় ক্ষীণ আলোকেও দেয়ালের কাজগুলো দেখা যায়। কিন্তু সেই কাজগুলো যদি পঁচিশ তিরিশ বছরের পুরোনো হয় তাহলে সেগুলো দেখা অসম্ভব, কারণ সেগুলো প্রদীপের কালি পড়ে প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। আমাদের এই হলঘরটার অবস্থাও তাই। প্রদীপের কালি ছাড়াও এখানে আছে কাঠের ধোঁয়া, তার কবল থেকে এই দেয়ালের ছবিগুলো কিছুতেই মুক্তি পায়নি ।
গুরুজী এলেন প্রায় একঘণ্টা পর, তাঁকে দেখেই মনে হয় যে তিনি চিন্তান্বিত ৷ তিনি আমাদের মাঝখানে বসে তাঁর সমস্যাটা বললেন ।
যদিও তিব্বত একটি স্বাধীন রাজ্য কিন্তু তার সীমান্ত ও পররাষ্ট্র বিভাগটার পুরো দায়িত্ব হানদের হাতে। গীয়াৎসের হান্ সামরিক বাহিনী বিদেশীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। আমরা এখানে পৌঁছবার আগে তারাই আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের এক প্রতিনিধি খাম্পোর কাছে এসে নতুন আদেশ জারী করেছেন। সেই আদেশের প্রথমটি হচ্ছে, সাতদিনের বেশী তীর্থযাত্রীদের গীয়াৎসে থাকা চলবে না; দ্বিতীয়ত, শহরে কোন রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে গেলে সামরিক প্রধানের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে এবং তৃতীয়ত, এখান থেকে লাসার পথে তিন জনের বেশী একসাথে যাওয়া চলবে না। প্রথম ও দ্বিতীয় সর্তটি মোটেই অসুবিধার নয়, কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে তৃতীয় সর্তটি নিয়ে অর্থাৎ দলবদ্ধভাবে যাওয়া চলবে না ।
আমাদের ইচ্ছা ছিল তিনদিন থেকে চারদিনের দিন খুব ভোর বেলা এখান থেকে রওনা দেবো, কিন্তু একবার যখন হানদের দৃষ্টি আমাদের উপর পড়েছে তখন এখানে আর না থাকাই মঙ্গল।
গীয়াৎসে আমাদের মোটামুটি দেখা হয়েছে তবে আরও কিছুছিন থাকলে এখানকার ভেতরকার তথ্য জানা যেতো কিন্তু ‘ন্যন্যঃ পন্থা ন বিদ্যতে', আমাদের যেতে হবে। গুরুজী বললেন--ভগবান তথাগতের এইরূপই ইচ্ছা। পরে ঠিক হল যে আমাদের ভাগ হয়ে তিনজন তিনজন করে যেতে হবে, অর্থাৎ তিন দশকে তিরিশ আর বাকি থাকবে দু'জন। গুরুজী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—আমি বুঝতে পারছি যে তুই আমার সাথে যেতে চাস। কিন্তু তা সম্ভব না কারণ খাম্পোর ইচ্ছা যে তুই আরও দু'তিন দিন থাক। তাঁর বাক্য শিরোধার্য। গুরুজী সবচেয়ে আগে যাবেন আর আমি যাবো একদম শেষে। বলাই বাহুল্য, আমাকে এবার একা একা যেতে হবে।
সেদিন রাতেই গুরুজী সবাইকে ভাগ করে দিলেন, আর সেই সাথে সাথে রাস্তাঘাটও বলে দিলেন। অর্থাৎ গুরুজী যাবেন সকালবেলা তারপর একঘণ্টা দেড়ঘণ্টা পর পর তিনজন তিনজন করে রওনা দেবেন। পরের দিন ষোলজন রওনা দেবেন বাকি ষোলজন রওনা দেবেন তারও পরের দিন ।
এখানকার মঠে খাবার জন্য ডাক পড়ে দু'বার, প্রথমবার সাড়েদশটা নাগাদ আর দ্বিতীয়বার বিকেল চারটে নাগাদ। সকাল বা রাতে এরা খায় না। আমাদের খাওয়ার মধ্যে হচ্ছে ভাত আর লাব্রা ধরনের তরকারী, আর বার্লির ডাল। গুরুজীকে বিদায় জানালাম খাওয়া-দাওয়ার ঠিক পরই। মঠের বড় লামারা সবাই তাঁর যাত্রার শুভ কামনা জানিয়ে প্রার্থনা করলেন। তিনি যাবার ঘণ্টাখানেক পর খাম্পো আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে হাজির হতেই তিনি আমাকে তার পাশে বসতে বললেন। আমি তাঁকে প্রণাম জানিয়ে পাশে বসলাম। আমি ইতিমধ্যে তিব্বতী ভাষা কিছু কিছু বুঝতে পারি বটে কিন্তু বলতে পারি না। খাম্পোর ঘরটা বিরাট। বড় বড় কাঠের থাম বসিয়ে ছাদটাকে ধরে রাখা হয়েছে।
দেয়ালের গায়ে লাল-হলুদ ও সোনালি রঙের বিভিন্ন ছবি আঁকা। ঘরটায় একটামাত্র জানালা, সেই জানালা দিয়ে দেখা যায় অন্যান্য মন্দির ও বাড়ীঘর। আমি সেদিকে দেখছি এমন সময় খাম্পো আমার নাম ধরে ডাকলেন, আমি চমকে তাঁর দিকে তাকালাম। গ্যাংটক ছাড়ার পর আমায় সেই নাম ধরে কেউ ডাকেনি। খাম্পোর মুখের দিকে আমি অবাক হয়ে তাকালাম, তবে কি তিনি সর্বজ্ঞ ? খাম্পোজী আবার নাম ধরে ডেকে পরিষ্কার হিন্দীতে বললেন-
-শোন বিমল, তোমার বিষয়ে আমি সব শুনেছি। গয়া থেকে এ পর্যন্ত তুমি যেরকমভাবে এসেছো তাতে আমি খুবই অবাক হয়ে গেছি। তোমার সাহস ও ধৈর্যের প্রশংসা করি। তুমি আমার সাথে কথা বলতে পারো তাতে কোন অসুবিধা হবে না ।
আমি খুব লজ্জিত হয়ে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে অপরাধীর মতো বললাম—আমাকে ক্ষমা করবেন ।
সেই মহামান্য বিরাট পুরুষটির সামনে নিজেকে হঠাৎ খুব ছোট বলে মনে হল । আমি তাঁকে কি বলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। খাম্পোজী নিজেই আমাকে সহজ করে দিলেন—আমি গয়াতে তিনবার গিয়েছি আর সারনাথে থেকেছি দশ বছর। কলকাতার অনেক লোকের সাথে আমার পরিচয় আছে। তুমি এতদূর যখন এসেই পড়েছো তখন ভয় নেই, তথাগত তোমায় রক্ষা করবেন। এই বলে তিনি জোর গলায় ডাকলেন—সামশর্গে ! তাঁর ডাক শুনেই একজন লামা তার কাছে ছুটে এলেন, খাম্পো তাকে দু-কাপ চা আনতে বললেন। আগে ভেবেছিলাম এখানকার সর্বত্যাগী বড় লামারা হয়তো চা-পান করেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটো কাচের গ্লাসে চা এল আর তার সাথে কিছু নোনতা বিস্কুট ।
চা খেতে খেতে তিনি আমাকে তাঁর পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে দিলেন। গীয়াৎসের অনেকের মতে আমি ভারতীয়, যদিও নেপালী লামাদের সাথে আমি এসেছি কিন্তু এখানে অনেকে আমাকে নেপালী বলে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। তিব্বতী মাত্রেরই বিশ্বাস ভারত হচ্ছে পবিত্রভূমি। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় মুনি-ঋষিরা এ পথে কৈলাস-তীর্থে যাতায়াত করছেন। তাঁদের দর্শনে আসে শান্তি আর তাঁদের আশীর্বাদে হয় পাপমুক্তি। প্রায় চার পাঁচ বছর যাবৎ ভারতীয় সাধুদের এ পথে দেখা যায় না। কাজেই এখন আমার মতো একজন ভারতীয়কে পেয়ে তারা খুবই খুশী। হোক ছোট তাতে ক্ষতি নেই এই বিরাট পথ আর হিমালয় পার হয়ে যারা এই পর্যন্ত আসতে পেরেছে তারা সবাই পুণ্যবান। খাম্পো চান না যে জনসাধারণের এই মতবাদ এখানকার চীনা কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তাতে অসুবিধা হতে পারে। তিনি নিজে ভারতবাসীদের খুব প্রশংসা করেন, তাই তিনি ঠিক করেছেন যে বাকি যে দু'দিন আমি থাকব, সে দু'দিনে কিছু শিখে যাওয়া উচিত। শুধু মন্দির আর লামা দেখে এখানে সময় নষ্ট করা উচিত নয় ৷
গীয়াৎসের বিভিন্ন পর্যায়ের দীক্ষার জন্য বিভিন্ন রকম বন্দোবস্ত আছে। তারই মধ্যে লাভজনক একটি প্রক্রিয়া তিনি আমাকে শিখিয়ে দেবেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
—তুমি কোনো সংস্কৃত মন্ত্ৰ জানো ?
—নিশ্চয়ই। আমি উত্তর দিলাম ।
-কোন মন্ত্ৰ তুমি জানো ?
—সাধুসঙ্গ আমি অনেক করেছি কাজেই অনেক মন্ত্র আমার মুখস্থ, এমন কি ব্ৰহ্ম গায়ত্ৰী মন্ত্ৰ পর্যন্ত ।
খাম্পো অবাক হলেন—বলো কি, তুমি গায়ত্রী মন্ত্র জানো ? তুমি কি ব্রাহ্মণ, তোমার উপনয়ন হয়েছে ?
—আজ্ঞে না, আমার উপনয়ন হয়নি, আমি ব্রাহ্মণও নই। মানুষ মাত্রেই ঊর্ধ্বমার্গে
ওঠার উপযোগী, গায়ত্রী মন্ত্র তারই একটি সোপান মাত্র। আমি জাত মানি না; মানুষের মধ্যেই ভগবান আছেন সেটাই স্বীকার করি ।
-- -বেশ! বেশ! তাহলে বলো তো দেখি মন্ত্রটা ।
তাঁর কথা শুনে আমি আসনকেটে বসে চোখ বুজে শুরু করলাম—
—ওম্ ভূ ভূবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যম্ ভার্গো দেবস্য ধীমহী ধীয়ো ইয়ো ন প্রচোদয়াৎ ওম্।
খাম্পোজী আমাকে থামতে বললেন। তাঁর মুখ দেখে মনে হয় তিনি আমার প্রতি খুবই প্রসন্ন হয়েছেন, তিনি জোর গলায় কাকে যেন ডাকলেন। আগের লামাটি এগিয়ে এলে তিনি তাকে কি যেন বললেন, তারপর ভদ্রলোক চলে গেলেন। খাম্পোজী এবার আমার সাথে কলকাতার গল্প আরম্ভ করলেন। তাঁর মতে কলকাতা একটি যাদুকরের দেশ, কলকাতার সবচেয়ে আশ্চর্য হচ্ছে সেখানকার ট্রাম। তিনি চালকের পাশে থেকে খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করেছেন। সামান্য একটা চাকা ঘুরিয়ে অতগুলো মানুষকে নিয়ে হেলেদুলে সে কলকাতার রাস্তাগুলোর মধ্যে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। তিনি যত ভাবেন ততই আশ্চর্য হয়ে যান।
আমি তাঁর কথা শুনে বললাম—ট্রামগুলো চলে ইলেক্ট্রকে জানেন নিশ্চয়ই ? তিনি শিশুর মত হেসে উঠলেন---হ্যাঁ, সেটাই তো আসল আশ্চর্যের কথা। ওই সরু তারটার ভেতর দিয়ে যে একটা প্রচণ্ড শক্তি কাজ করছে সেটা ভাবলেই অবাক হয়ে যাই ।
দরজার কাছে একজন লামাকে দেখে আমরা থামলাম। খাম্পো হঠাৎ আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন,—তিনি লামাকে ডেকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন—ইনি গেলুক্-পা সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় প্রধান লামা। দার্জিলিং ও কালিম্পং-এ তিনি ছিলেন আর সারনাথেও পড়াশুনা করেছেন। ওর সাথে তুমি দু'দিন থাকবে। ইনি তোমাকে কিছু জিনিস শিখিয়ে দেবেন ।
আমি লামাকে প্রণাম করলাম, খাম্পোজির সাথে আরো কিছুক্ষণ আলাপ করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সম্ভব হল না। তিনি খুব ব্যস্ত তা সত্ত্বেও যে আমার সাথে তিনি সহজভাবে কথা বলেছেন ও আমার জন্য ভেবেছেন তার জন্য আমি কৃতার্থ হয়ে রইলাম। মুখে কিছু বললাম না অবশ্য। তাঁকে ভক্তিভরে প্রণাম করে দ্বিতীয় লামার সাথে বেড়িয়ে পড়লাম। গীয়াৎসের ধর্মশহরের গেলুক্-পা সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় প্রধান লামা, নাম থেরেপা, বয়স মনে হয় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। মুখটা হাসিখুশী না হলেও খুব গম্ভীর নয়। তিনি খুব পরিষ্কার হিন্দী বলেন না, তিব্বতী নেপালী ও হিন্দী শব্দের সংমিশ্রণে আমার সাথে কথা আরম্ভ করলেন, বুঝতে মোটেই অসুবিধা হয় না।
আমরা একটা পুরোনো মন্দিরের ভেতর এসে ঢুকলাম, মন্দিরের ভেতরটা খুব ঠাণ্ডা ও স্যাঁতসেঁতে। তিনি একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে আমাকে সেখানে অপেক্ষা করতে বললেন। প্রদীপের আলোয় দেখলাম অনেকগুলো দেব-দেবীর মূর্তি। দেয়ালের গায়ে সারি সারি খোপের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য তিব্বতী পুস্তক। কিছুক্ষণ পরে তিনি দুটো
ভারী কম্বল নিয়ে উপস্থিত হলেন। সেই মন্দিরের ভেতরে এক কোণে কাঠের উপর কয়েকটা পাতলা গদী পাতা ছিল আমরা তার উপর পাশাপাশি বসলাম। এবার কম্বলটা দিয়ে ভালোভাবে মাথা ও শরীরটাকে জড়িয়ে বসলাম। এই মন্দিরটার দরজা বেশ বড়ই কিন্তু ঠিক দরজার সামনেই রয়েছে আর একটি বিরাট মন্দিরের পাঁচিল কাজেই দরজা থেকেও না থাকার মতো, তাতে আলো একদম ঢুকতে পারে না। আর সূর্যকিরণ তো স্বপ্নের ব্যাপার। বাইরের সুন্দর গরম রোদ ছেড়ে আমরা ঢুকলাম এক অন্ধ গুহায় ৷
প্রদীপের আলোয় সব মূর্তিগুলোকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। অনেকগুলো কাপড় ও চাদরের ভেতর দিয়ে যে মুখটা মোটামুটি দেখা যাচ্ছে সেটা হচ্ছে মা তারার মূর্তি। শুধু মুখটা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। লামা থেরেপা সেদিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মৃদু গলায় বললেন—আমরা এখন মা তারার ধ্যান করবো। আমার অন্তরাত্মা নেচে উঠল—মা তারা মা কালীরই এক রূপ, কাজেই ক্ষতি কি? ছোটবেলা থেকে পাড়ার কালী মন্দিরের সাথে আমাদের পরিচয়, কাজেই লামা থেরেপার কথাটা ভালোই লাগল । তবে মনের উৎকণ্ঠা দমন করতে না পেরে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—
——আপনারা তো বৌদ্ধ, কাজেই আপনাদের মন্দিরে মা তারার আবির্ভাব কি রকম করে হল ?
—আমরা তান্ত্রিক বৌদ্ধ, পরে যদি সময় হয় তোমাকে বুঝিয়ে বলবো, এখন এস ধ্যানে বসা যাক ।
সাধারণ লোকে ভগবান বা দেব-দেবীর উপর ইহকাল পরকালের সমস্ত ভার সমর্পণ করে দিয়ে বসে থাকে, কিন্তু লামাদের নিজস্ব চেষ্টার ফলে সব কর্মফল কাটিয়ে ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। কর্মফলের বন্ধন কাটাবার জন্য প্রয়োজন নির্বাণ লাভের।
—নির্বাণ লাভের কথা আমি বহুবার শুনেছি আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন কি ? আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম।
-নিশ্চয়ই। এই বলে তিনি একটি শ্লোক তর্জমা করে বললেন—এই যে চারদিকে মন্দির, আকাশ, পথ, পাহাড়, মানুষ সব দেখছো নির্বাণে এসব থেকে সম্পূর্ণ এক আলাদা জগতে আমাদের অবস্থান ঘটে, সেটাকে মনের এক অবস্থা না বলে বলতে হবে অহংকারকে ছাড়িয়ে আরও উঁচুতে আমরা উঠে যাই, সে জগতে জল নেই, পৃথিবী নেই, বায়ুর অস্তিত্ব নেই, সেখানে আমাদের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের দরকার হয় না। সে জগতে তারাসকল জ্যোতি দান করে না, সূর্যেরও প্রকাশ নেই, চন্দ্র ও অন্ধকারের সেখানে প্রবেশ নিষেধ। সে এক অমৃতময় জগৎ সেখানে রূপ ও অরূপ সুখ ও দুঃখ হতে বিমুক্ত হয়ে আমরা বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হই। সেই গভীর নীরবতাই হচ্ছে নির্বাণ জগৎ, স্থান কাল ও পাত্র'র ঊর্ধ্বে এক অমৃতময় জগৎ ।
লামা থেরেপা একটু থামলেন তিনি চোখ বুজে মনে হয় সেই অবস্থাটি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে তিনি চোখ খুললেন তারপর বললেন—তোমার কি মন্ত্র জানা আছে? আমি তাঁর প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে
চুপচাপ না বোঝার ভান করে বসে রইলাম, তিনি কি বুঝলেন জানি না তবে তিনি প্রসঙ্গ পাল্টালেন ও বললেন----
-তোমাকে এখানে চুপচাপ ওই মা তারার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হবে। তুমি এখানেই বসে থাক, একদম উঠবে না। আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না আসি ততক্ষণ পর্যন্ত এখানেই থাকবে। এই বলে লামা উঠে গেলেন ।
আমি তাঁর কথামতো সেখানেই বসে রইলাম। মা তারার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিন্তু মনের মধ্যে উঁকি দিতে লাগল ভগবান বুদ্ধের বিভিন্ন রূপ। প্রায় আধ ঘণ্টা (বা এক ঘণ্টাও হতে পারে) পর লামা ফিরে এলেন, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
—চুপচাপ বসে থাকতে তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে ?
আজ্ঞে না। তিনি আমার পাশে বসলেন এবং আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে পাগলেন-
—তুমি জান হিন্দুধর্মের সাথে মহাযান বৌদ্ধদের অনেক মিল আছে। শুধু মা তারাই নয়, আমাদের প্রজ্ঞাপারমিতার সাথে হিন্দুদের সরস্বতীর তুলনা করা চলে। বৌদ্ধ আরতি হিন্দু অদিতি, বুদ্ধেরই এক শক্তির নাম তারা। শিবের সাথে মঞ্জুশ্রী, ইন্দ্ৰ ও বোধিসত্ত্ব বজ্রপাণি একই, যে রকম করেই হোক নির্মাণ লাভ বা মোক্ষই আমাদের চরম লক্ষ্য।
--আপনি হিন্দু-ধর্ম সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন দেখছি।
—না-না। আমি হিন্দু ধর্মের কিছুই জানি না, তবে বৌদ্ধ ধর্মের জন্য এ সব আমাদের পড়তে হয়েছে। আমি তোমাকে তারার সম্পর্কে কিছু বলবো, মন দিয়ে শোনো। মা তারা হচ্ছেন অবলোকিতেশ্বরের শক্তি, যেমন হিন্দু ধর্মে পাবে শিবের শক্তি কালী উমা, পার্বতী ইত্যাদি। ভগবানকে পেতে হলে আগে তার শক্তিকে পাওয়া দরকার। মা তারা মুক্তি-দায়িনী সংকট নাশিনী, তিব্বতের মা তারার দুটি রূপ একটি সবুজ রঙের, সবুজ তারার হাতে থাকে উৎপল ফুল আর সাদা তারার হাতে থাকে একটি পদ্মফুল—এতটা বলে লামা একটু বিশ্রাম করলেন অর্থাৎ আমাকে হৃদয়ঙ্গম করার সময় দিলেন, তারপর আবার শুরু করলেন—আমরা এখন সুবজ তারার ধ্যান করবো, আমাদের মতো সাধারণ লোকের বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি অত সহজে সম্ভব নয়, তারজন্য প্রয়োজন হাজার হাজার বছর, এমনকি শাক্য মুনিকেও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির জন্য, অবলোকিতেশ্বর বা পদ্মপাণিকে পেতে হলে চাই তার শক্তির পূজা, ধৈর্য ধরে তাঁর পূজা করতে হবে। তাঁর পূজার আগে তাঁর রূপের ধ্যান করতে হবে। তুমি চোখ বোজ আমি তোমাকে তার রূপের বর্ণনা দিচ্ছি তুমি কল্পনা করে তাকে দেখবার চেষ্টা কর।
—ঠিক আছে আমি আপনার কথামতো চোখ বুজছি। আমি একটু নড়ে চড়ে বসে কম্বলটাকে জড়িয়ে নিলাম ।
লামা থেরেপা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন—চিন্তা কর আকাশ, শুধু আকাশ। তার মধ্যে কোন রঙ নেই সে এক মহাশূন্য, সেই মহাশূন্যে চাঁদ নেই, তারা নেই, সূর্য নেই, আলো নেই, অন্ধকার নেই। এবার চিন্তা কর সেই মহাশূন্যের উপর ধীরে ধীরে উদিত হচ্ছে একটা সবুজ পাহাড়, সেই পাহাড়টা সবুজ জ্যোতির্ময়, এবার তুমি সেই সবুজ রঙটাকে মনে ধরে রাখার চেষ্টা কর । সেই রঙটা ক্রমে ক্রমে জমা হয়ে তৈরী হচ্ছে একটা নারীমূর্তি, সেই নারীমূর্তিই আমাদের আরাধ্য দেবী ভগবতী তারা। এবার চোখ খুলে দেখো সামনেই তিনি, এই করুণাময়ী রক্ষাকর্ত্রী দেবী মা তারার মুখাবয়ব ।
আমি লামার কথামতো ঘিয়ের প্রদীপে ভালোভাবে দেখতে লাগলাম মা তারার মূর্তিটির দিকে। তারপর লামার কথানুযায়ী আবার চোখ বুজলাম। তিনি আবার শুরু করলেন—আবার কল্পনার আশ্রয় নাও, তার একটা মুখ, দুটো হাত, তার ডানহাতে অভয় মুদ্রা, বাম হাতে উৎপল-পুষ্প, চুলের অর্ধেক মাথার ওপর খোঁপা করা আর বাকি অর্ধেক পিঠের উপর ছাড়া, কল্পনা কর তিনি সর্বালঙ্কারে ভূষিতা। তার স্তনযুগলের উপর দিয়ে পড়েছে ছোট্ট একটি বস্ত্রখণ্ড ; আর পরনে লাল বসন। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন বীরের মতো। আর তাঁর পীঠস্থান রয়েছে সবুজ একটি অর্ধ-চন্দ্রের উপর, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আলোর উপর, তিনি জ্যোতির্ময়ী, তাঁর দেহ সর্ব লাবণ্যে ভরা, তিনি ষোড়শী সদাহাস্যময়ী বরপ্রদায়িনী; হে দেবী! হে মাতা ! তোমাকে আমি ধ্যান করি, তোমাকে আমি ধ্যান করি—তোমাকে আমি ধ্যান করি ... ।
আমি অপলক দৃষ্টিতে সেই অভয়দায়িনী মা তারাকে নয়ন ভরে দেখতে লাগলাম । বেশ কিছুক্ষণ পর মনে হল তিনি যেন ধীর পদক্ষেপে অর্ন্তহিত হয়ে যাচ্ছেন, অনেক কষ্টেও কল্পনায় তাঁর রূপ ধরে রাখতে পারলাম না। প্রচণ্ড শীতে আমার সর্বশরীর যেন কাঁপতে লাগলো। আমি চোখ খুললাম, কম্বলটা ভালোভাবে জড়িয়ে লামা থেরেপাকে বললাম—কিছু মনে করবেন না, খুব শীত করছে তাই ধ্যানস্থ হতে পারছি না। আপনার কি শীত করছে না ? তিনি আমার সাথে একমত হয়ে বললেন—হ্যাঁ কথাটা ঠিক্ । আমি দরজাটাকে বন্ধ করে এসেছিলাম কোন ছোট ছেলে হয়তো সেটাকে খুলে দিয়েছে। যাই হোক, চল আজকের মতো এখানেই ইতি করি ।
আমরা মা তারাকে প্রণাম করে উঠলাম। বাইরে এসে দেখি সত্যি শীত পড়েছে। প্রায় সন্ধ্যে হতে চলেছে, কাজেই শীত সূর্যাস্তের সাথে সাথেই বেড়ে যায়। লামা থেরেপা থাকেন অন্যান্য লামাদের সাথে, আমি তাঁর সাথে রান্নাঘরে উঠে এলাম। বিরাট রান্নাঘর, কাঠের আগুনে রান্না হয়। এতবড় রান্নাঘর অথচ তার একটাও জানালা নেই। অন্য একটা ঘরের ভেতর দিয়ে এখানে আসতে হয়, মনে হয় উত্তাপটাকে সম্পূর্ণরূপে ধরে রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা। অন্যান্য লামাদের খাওয়া হয়ে গেছে আমরাই ছিলাম বাকি। বার্লি ও চালের সংমিশ্রণ করে তাতে সামান্য আলু ছেড়ে দিয়ে তৈরী হয়েছে খিচুড়ী, খেতে যেন অমৃত। লামা থেরেপা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—
–তুমি কি আজ রাতে এখানে শোবে না তোমার সঙ্গীদের সাথে থাকবে ?
—আমি অনেকদিন যাবৎ তাদের সাথে আছি এবং থাকবো কিন্তু আপনাদের সাথে থাকবার এ সুযোগ হয়তো আর পাবো না, যদি অনুমতি দেন তাহলে এখানেই থাকি ।
—তা ঠিক, তুমি ইচ্ছে করলে এখানেই শুতে পারো, এখানে আরও দু'তিনজন রাতে শোয় কোনো অসুবিধা হবে না, উনুনের কাঠগুলো সারারাত ধরেই জ্বলে এ ঘরটা সব সময়ই খুব গরম থাকে ।
লামা থেরেপা আরও কিছুক্ষণ আমার সাথে থেকে চলে গেলেন। ভেবেছিলাম রাত্রিটাও তাঁর সাথে কাটাবো কিন্তু শেষ পর্যন্ত উনি আমাকে রান্নাঘরে রেখে চলে গেলেন। অন্যান্য লামাদের সাথে থাকার চাইতে এখানকার এই উনোনের ধারে রাত কাটালে আর এক অভিজ্ঞতা হবে। তাই আমি আমাদের ধর্মশালায় গিয়ে ওদের নিকট হতে সে রাতের মতো বিদায় নিয়ে এলাম। কথামতো আমি উনোনের পাশেই একটা থামের কাছে কম্বল নিয়ে শুয়ে পড়লাম। আশপাশে আরও তিন চারজন লামা এরই মধ্যে নাসিকা গর্জন শুরু করেছে। রাতে এদের করার কিছু নেই কাজেই খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। রান্নাঘরে কোনো লামা থাকে না, রান্না ও রান্নার কাজে যারা সাহায্য করে তারাই থাকে। তারা খুব ভোরবেলা ওঠে। তিব্বতীদের কেউই মনে হয় ভোরবেলা মুখ-হাত-পা ধোয় না। এই শীতে তা সম্ভবও নয়। পায়খানার জন্য রয়েছে বিরাট বিরাট গর্ত, যার যখন খুশী ব্যবহার করতে পারে। জলের ব্যবহার খুবই কম, অন্তত আমি তাই দেখছি। পাতা বা খবরের কাগজ পেলে তাতেই চলে পরিষ্কারের কাজ। বিশেষ লামাদের কথা আলাদা, তাদের জন্য রয়েছে গরম জল। তিব্বতে সাধারণ লোকদের পক্ষে এটা শুধু যে দুষ্প্রাপ্য তাই নয় দুর্মূল্যও বটে ।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই উদয় হলেন লামা থেরেপা। এরই মধ্যে আমার দু-কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে, কাজেই আমি খুবই চাঙ্গা হয়ে উঠেছি, লামা থেরেপার উপর দায়িত্ব পড়েছে আমাকে গড়ে তোলার। তিব্বতীরা আমাকে দু-কাপ চা খাইয়েছে, লামাকে বললাম আমার হয়ে তাদের ধন্যবাদ দিতে। তিনি শুনেই অবাক হবার ভান করে বললেন—খেয়েই যখন ফেলেছো তখন ধন্যবাদ দিতেই হবে। আজকে ভেবেছিলাম সকালে কিছু না খেয়েই মায়ের ধ্যানে বসবো, অবশ্য আমারই ভুল হয়েছে তোমাকে আগে জানানো উচিত ছিল।
আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মূল স্তূপের কাছে এসে সাতবার প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে প্রদক্ষিণ করলাম। শেষে স্তূপের চারপাশের খোদাই করা মূর্তিগুলোকে খুব ভালোভাবে দেখতে বললেন—তিনি আমাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে বললেন,
এই দেখো ভৈরচনার সিংহ এটা রাজার প্রতীক । অশোভ্যের হস্তী শক্তির প্রতীক। রত্নসম্ভবার ঘোড়া গতির প্রতীক। অমিতাভের ময়ূর সৌন্দর্য আর ছন্দের প্রতীক ।
কিছুক্ষণ পর আমরা কুম্ স্তূপ ছেড়ে নীচে নেমে এলাম। তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন তারপর বললেন—ওই মন্দিরটা নির্জন ছিল কিন্তু খুব স্যাঁতসেঁতে আর ঠাণ্ডা, চল যাই মৈত্রেয় মন্দিরে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো অথচ চমৎকার কারুকার্য করা একটা মন্দিরে এসে হাজির হলাম। লামা আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে মৈত্রেয় হচ্ছেন ভবিষ্যৎ বুদ্ধ। মৈত্রেয়াবস্থার পর মানসী বুদ্ধ তারপর শাক্যমুনী বোধিসত্ব ৷ এই মৈত্রেয় বুদ্ধই অসংগামুনীকে দেখা দিয়ে তন্ত্রের গুঢ় রহস্যের সন্ধান দেন। আমরা সেখানে যাচ্ছি বটে কিন্তু আমাদের লক্ষ্য থাকবে তারা দেবীর দিকে। তিব্বতে মহাযান হীনযান বজ্রযান তন্ত্রযান সবই সমানভাবে স্বীকৃত এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন পথ বেছে নিয়ে তা অভ্যেস করে।
আমরা মন্দিরে ঢুকে দরজার কাছাকাছি একটা বেদীতে বসলাম। তিনি কোনো রকম ভূমিকা না দিয়েই সরাসরি বললেন—
এবার চোখ বোজ। মনে মনে বলো- -হে দেবী! আমার হৃদয় চক্র খুলে দাও তুমি আমার প্রতি কৃপা পরবশ হও ;
সংস্কার থেকে মুক্ত কর,
মা তারা তুমি আমাকে ভয় থেকে মুক্ত কর,
মা তারা তুমি আমাকে থেকে মুক্ত কর।
ত্বম্ ওম্ বজ্রঃ সমজঃ, নমো গুরুভ্য, নমো আর্য তারা মণ্ডলেভ্য
মা তারা তুমি আমাকে ব্যাধি
ওম্ আর্য তারা সপরিবারে অর্ঘ্যম্, প্রতিচ্য হুম্ স্বাহা ।
পদ্মম্ প্রতিচ্য হুম্ স্বাহা
হে দেবী! তোমার চরণে আমি আশ্রয় নিচ্ছি, আমি তোমাতে আত্মসমর্পণ করছি. আমি বৌদ্ধ ও সংঘে আত্মনিবেদন করছি ...
ধ্যানাবস্থায়ই শুনতে পেলাম মন্দিরের পূজার আহ্বান। ভেরী, ঢোল ও কাঁসরের শব্দ হিমালয়ের পাথরে পাথরে লেগে ধ্বনিত হতে লাগল। মনে হলো জগন্মাতা তারার পূজায় সবাই প্রস্তুত হয়ে পড়েছে। এক অপূর্ব অনুভূতির মধ্যে আমি চোখ খুললাম । এবার আমাদের যাবার সময় হয়েছে।
খাওয়া-দাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক একটু বিশ্রাম করে তারপর আবার কথামতো এলাম মৈত্রেয় মন্দিরে। ধ্যানে বসার আগে লামা থেরেপা আমাকে বললেন – -তুমি এখনও ছোট, কাজেই সাধনমার্গের কষ্টকর উপায়গুলো তোমার না মানলেও চলবে। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম—কষ্টকর উপায়গুলো কি ?
প্রথম প্রথম সেগুলো সোজা কিন্তু যতই তুমি ঊর্ধ্বমার্গে উঠবে ততই কঠিন। যেমন ধর প্রথম প্রতিজ্ঞাগুলো হচ্ছে—প্রাণিহত্যা, অপহরণ, ব্যভিচার, মিথ্যাকথন ও সুরাপান থেকে বিরত থাকা। দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞাগুলো হচ্ছে—অকালভোজন, নৃত্যগীতাদিতে অনুরাগ, গন্ধমাল্যাদি ব্যবহার, কোমল শয্যায় শয়ন ও সোনা রূপাদি গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। সাধারণ মানুষ ও গৃহীদের এগুলো হচ্ছে প্রধান শত্রু ।
আমি লামাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- আমার অনেকগুলো বদস্বভাব
আছে এই যাত্রায় সেগুলো কিন্তু সম্পূর্ণ ছেড়ে আসতে পারিনি। সেইসব বদঅভ্যাসগুলো আমার সাথে সাথেই যাচ্ছে, কাজেই আমার মতো পাপীকে মা তারা কৃপা করবেন কি ?
আমার কথা শুনে তিনি উত্তর দিলেন—নদীগুলো সাগরে যাওয়ার আগে অনেক আবর্জনাই বয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু তাই বলে সাগর কি তাকে গ্রহণ করে না। এই বলে তিনি একটু থামলেন
তারপর আবার মুখ খুললেন—সবুজ মা তারার আরাধনায় মনের সব মলিনতা দূর হয়। তারপর অনেকক্ষণ আমরা চুপচাপ বসে রইলাম। পাশের মন্দির থেকে লামাদের স্তোত্র পাঠ আমাদের কানে আসতে লাগল। সেই স্তোত্র পাঠ বড় চমৎকার শুনতে। থেমে থেমে নীচুস্বরের আবৃত্তির স্বরগুলো হিমালয়ের ওপর ছোট ছোট অসংখ্য শৃঙ্গের মতোই কোনো নাভিপ্রদেশ থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে আর নামছে। তার অর্থ না বুঝলেও সেই ছন্দ ও সুর হৃদয়কে স্পর্শ করে। দরজার বাইরের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে অসংখ্য প্রার্থনা পতাকা, মনের ইচ্ছাটাকে ভাষায় প্রকাশ করে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে,অনেক ঊর্ধ্বে বাতাসের সাহায্যে সেই প্রার্থনা গিয়ে পৌঁছচ্ছে মা তারার কাছে মনোবাসনা পূর্ণ করার তিনিই মালিক।
এবার চোখ বুজে মন দিয়ে শোনো আর আমার মুখে মুখে বলো-
ওম্ বজ্ৰ সমজাঃ ওম সর্ব তথাগত অৰ্ঘ্যম্ প্ৰতিচ্য হুম্ স্বাহা। " " পদ্মম পদ্মম্ " " " " পুষ্পে " " " " ধূপে " " " " " " " " আলোকে " " " গন্ধে … " " নৈবিদ্যে " " ל " শব্দে " " "
এইবার একুশবার দাঁড়িয়ে ও জানুর ওপর বসে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে মাকে প্রণাম কর। প্রত্যেকবারই মায়ের মূর্তি হৃদয়ে স্মরণ করবে। আমি তাঁর কথামতো একুশবার ওঠ-বস করে মার উদ্দেশ্যে প্রণাম করলাম। একুশবারকে মনে হল একশ আটবার। যাই হোক, শেষে আমি বসলাম । এবার তিনি আগের মতোই বললেন—
—এবার তোমার কপালে মন দিয়ে দেখবার চেষ্টা কর সেখানে লেখা আছে ‘ওম্’ । কণ্ঠে মন দাও মানসপটে কল্পনা কর যে সেখানে লেখা আছে ‘আহ্’। এবার হৃদয়ে মন দাও—চেষ্টা কর যে সেখানে লেখা আছে ‘ত্বম্’। এবার কপালে মন দাও সেখানকার ‘ওম্’ সাদা বর্ণের। এবারে কণ্ঠের ‘আহ্ শব্দ লাল বর্ণের। এবারে হৃদয়ে মন দাও সেখানকার ‘ত্বম্’ শব্দ নীল বর্ণের ৷
আমি তাঁর কথামতো বর্ণগুলোর রঙ দেখবার চেষ্টা করতে লাগলাম । আমি চুপচাপ বসেছিলাম—-মন্ত্র ও রঙ হারিয়ে আমি আমার নিজস্ব গড়া এক স্বপ্নজগতে বিচরণ করছিলাম, সেখানে হিমালয়ের সাদা শৃঙ্গগুলোর উপরে চলছিল শিব ও শক্তির লীলা । বোধিসত্ব বুদ্ধ ও মৈত্রেয়কে হারিয়ে আমি বিচরণ করছিলাম আমার প্রিয় হর-গৌরীর রাজত্বে। চমক ভাঙলো লামার সুমধুর কণ্ঠস্বরে—
ওম্ তারে তুত্ তারে তুরে স্বাহা। মা আমাকে সংস্কার থেকে মুক্ত কর, আমাকে ভয় থেকে মুক্ত কর, আমাকে ব্যাধি থেকে মুক্ত কর। আমাকে বুদ্ধের পথ দেখাও, ধর্মের পথ দেখাও, সঙ্ঘের পথ দেখাও...,
গীয়াৎসের চতুর্থ দিন, এক-এক করে সব লামাদের বিদায় জানালাম, একমাত্র আমিই সেখানে রইলাম, মা তারার যে আরাধনা শিখছি তা শেষ না করে যেতে পারবো না, তাতে অমঙ্গল হবে। আমার আপত্তি নেই তবে গুরুজীর অবর্তমানে খুবই ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে মনে ভাবলাম—মা তারার আরাধনার যদি সত্যিই প্রয়োজন থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই গুরুজী আমাকে শিখিয়ে দিতেন। আবার পরক্ষণেই মনে হতে লাগলো এটাই ছিল ভবিতব্য যখন যা হবার হবেই—যখন যা আসবার আসবেই। এটাই নিয়তি, এটাই তাঁর ইচ্ছা ।
থেরেপা লামা আমাকে সকালবেলা বিভিন্ন মন্দির দেখাতে লাগলেন। কোন মন্দিরের কোন বৈশিষ্ট্য সেগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন—যার অধিকাংশই আমি বুঝতে পারলাম না কিন্তু তাতে লামার কিছু যায় আসে না। তিনি গাইডের মতো অনর্গল বলে যেতে লাগলেন—মনে হয় এটাই তাঁর কর্তব্য অথবা তাঁকে এই দায়িত্বই দেওয়া হয়েছে। প্রায় চারঘণ্টা ধরে বিভিন্ন মন্দির ঘুরে আমরা এসে পৌঁছলাম মহামান্য খাম্পোর ঘরে।
খাম্পো সাধারণতঃ হাসেন না কিন্তু হাসলে তাঁকে বড় সুন্দর দেখায়। তাঁর সেই বিরাট দেহটায় পরিস্ফুট হয়ে ওঠে শিশুর সৌন্দর্য, তিনি আমাকে দেখে সহাস্যে আমার মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-কি, কেমন লাগছে আমাদের এখানে ? বেশ ভালোই লাগছে। আমিও হেসে উত্তর দিলাম ।
তারপর অনেকক্ষণ তাঁর পাশে বসে রইলাম, কোন কথাবার্তা নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তিনি উঠলেন, তারপর আমাকে বললেন- এসো আমার সাথে ।
আমরা সেই বাড়ীটার পেছনের দিকের একটা সরু গলি দিয়ে হেঁটে একটু উপরদিকে উঠলাম, একটি বিরাট মন্দিরের মতো বাড়ীতে এসে আমরা থামলাম। বাড়ীটার উঠোনে রোদে বসে ত্রাপারা স্তোত্র পাঠ করছিল। আমাদের দেখেই তারা সবাই উঠে দাঁড়াল। আমরা তাদের দিকে হেসে হাত নাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম কোণের একটা বড় ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকেই দেখলাম এটা একটা পুরোনো মন্দির। সামনের বিরাট বেদীর ওপর নজরে পড়ল একটা ভয়ংকর মূর্তি, তার সামনে আমরা প্রণাম করে দাঁড়ালাম, খাম্পো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—এই মূর্তিটা কার বলতে পারো ?
অনেকক্ষণ সেই ভয়ংকর মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে তারপর বললাম,
–না, চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক ধরতে পারছি না ।
—এই মূর্তিটা হচ্ছে মহাকালের, মহাকাল খুব জাগ্রত দেবতা। তুমি এখানে কিছুক্ষণ একা একা থাকবে। তুমি এই মহাকাল দেবের কাছে তোমার অভিষ্ট ফল প্রার্থনা কর। তারপর তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে। এই কথা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন ।
সেই মহাকালের কাছে কি চাইব, চাইবার আছেটাই বা কি! এ পর্যন্ত আমি না চাইতেই সব পেয়েছি, যেটা চাইব সেটা হয়তো আমার পক্ষে ভালো নাও হতে পারে, অথচ খাম্পো বলেছেন কিছু চাইতে। সেই ভয়ংকর মহাকালের কাছে কিছু চাইতেও যেন ভয় করতে লাগল। শেষে কিছুই না চেয়ে বসে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে চুপচাপ বসে থেকে তারপর উঠলাম। যে পথে সেখানে গিয়েছি সেইপথেই ফিরে এলাম খাম্পোর বাড়ীতে।
খাম্পো আমাকে দেখে পাশে বসতে বললেন। তিনি অধিকাংশ সময়ই বসে থাকেন। তিনি তাঁর ঘরে বসেই গীয়াৎসের পবিত্র মন্দির এলাকাকে পরিচালনা করেন। সবশুদ্ধ নিয়ে সেখানে তিন হাজারের মত লোক আছে। চারটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ; মন্দির ও তার সংলগ্ন প্রাঙ্গণগুলো, রাস্তাঘাট, পুরোহিত সব কিছুর পরিচালনার ভার তাঁর উপরে। ১৯৫০ সালের আগে তিনিই ছিলেন সম্পূর্ণ গীয়াৎসের মালিক। এখন বয়স বাড়ার সাথে সাথে দায়িত্বটাও কমে আসছে। রাজনীতিরও আজকাল অনেক পরিবর্তন হয়েছে, আগে ছিল ধর্ম-ভিত্তিক এখন হচ্ছে আইন-ভিত্তিক। খাম্পো অবশ্য এ ব্যাপারে কিছু বলতে চান না। তবে তাঁর মতে প্রত্যেকটা দেশই তথাগতের বৌদ্ধ ধর্ম ও সংঘের ভিত্তিতে স্থাপিত হলে, দুঃখ-কষ্ট ও জরা থেকে এ জগৎ রক্ষা পেতে পারে ।
খাম্পোকে হঠাৎ একটি প্রশ্ন করলাম—আমাকে হঠাৎ আপনি এত দয়া করছেন কেন ? আপনি তো জানেনই যে আমি মোটেই এ পথের পথিক নই। বাড়ী থেকে পালিয়ে এসেছিলাম গয়ায়, তারপর গুরুজীর কৃপায় এখানে ।
তিনি হেসে বললেন—আমি তোমার প্রশ্নে খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমার প্রশ্নই প্রমাণ করছে যে তুমি সত্যবাদী ও সরল। আমি তাঁর কথার প্রতিবাদ করে উঠলাম কিন্তু তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে তাঁর কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন—তুমিতো একা নও ভারতের শত শত ছেলেরা ইস্কুল পালাচ্ছে আর বাড়ী থেকেও পালাচ্ছে কিন্তু তাদের মধ্যে একজনও তো এই পথে আসে না। এ পথে আসার জন্য চাই উপযুক্ত প্রস্তুতি আর পূর্বজন্মের কর্মফল। তাঁর ইচ্ছায় তুমি একবার যখন এখানে এসে পৌঁছেছ তখন কিছু শিখে যাও। তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্ম অন্যান্য দেশের বৌদ্ধ ধর্ম থেকে আলাদা। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হিন্দু দেব-দেবী। তুমি এখানে তাদের আসল ও আদিরূপে দেখতে পাবে। যেমন ধর মা তারার আরাধনা, বল তুমি কি তা শিখে খুশী নও ?
তাঁর কথা শুনে আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। তিনি নিজেই আমার হয়ে জবাব দিলেন—বুঝতে পারছি যে তোমার পক্ষে তাঁর আরাধনা করা প্রথম প্রথম খুবই মুশকিল। কিন্তু যত তুমি এতে অভ্যস্ত হবে ততই দেখবে তাঁর কৃপালাভে তুমি সমর্থ হবে। সবুজ আর্য তারা এটা প্রথম দীক্ষা, দ্বিতীয় দীক্ষা হবে সাদা আর্য তারার আরাধনার। তুমি এখন লাসায় যাচ্ছো যাও ফেরার পথে তোমার ইচ্ছে হলে দ্বিতীয় দীক্ষার বন্দোবস্ত করা যাবে ।
কিন্তু খাম্পোজী আপনি আমাকে দীক্ষা দিলেন কেন ?--আমি জিজ্ঞাসা করলাম ৷
এই দীক্ষার মাধ্যমে তুমি সত্যিকারের তিব্বতী লামা সম্প্রদায়ের মধ্যে পড়লে, বাইরের কেউ তোমাকে অপদস্ত করতে পারবে না। আর এই ধর্ম তোমাকে তিব্বতে থাকাকালীন সাহায্য করবে ও রক্ষা করবে। এখন না হলেও তুমি পরে বুঝবে। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছানুসারে হয়েছে—তোমার গুরুকে আমি সে কথা জানিয়েছি। যাই হোক, তোমার যাত্রাপথ শুভ হোক তোমার মঙ্গল হোক। এই বলে তিনি চুপ করলেন।
প্রথমে তাঁর গুরুগম্ভীর ভাব দেখে ভেবেছিলাম যে এই বিরাট দেহটার মধ্যে শুকনো নীতিবাক্য ছাড়া আর কিছু নেই, কিন্তু এখন হঠাৎ আমার সামনে তাঁর মহানুভবতার রূপ খুলে গেল। খাম্পোর দরদী হৃদয়ের কাছে আমার মাথা নীচু হয়ে এল। তাঁকে ভক্তিভরে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম ।
তিনি মাথায় স্নেহের স্পর্শ দিয়ে বললেন—তোমাকে আমার ভালো লেগেছে এই দীক্ষা তারই কারণ হিসেবে গ্রহণ কর। তথাগত তোমার মঙ্গল করুন। মা তারা তোমার চিত্তকে পাপমুক্ত করুন ।
গীয়াৎসেতে আমি সবশুদ্ধ ছিলাম পাঁচদিন, ছ'দিনের দিন সকাল বেলা আমি শহর ছাড়লাম। খাম্পো আমাকে শহরের এক ভদ্রলোকের সাথে ছাড়লেন। ভদ্রলোকের নাম দেশেন ওয়াংদি, তাঁর সাথে আমি যাবো পরের গোশি গ্রাম পর্যন্ত। ভদ্রলোক সেখানে থেমে যাবেন, এই পথ ধরেই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে যমদ্রোক সরোবর পর্যন্ত। সেখানে সামদিং গুম্ফা থেকে পাওয়া যাবে পরবর্তী নির্দেশ। এখান থেকে সামদিং পৌঁছতে বেশ কয়েকদিন লাগবে। পথে বার বার খাম্পো আর লামা থেরেপার কথা মনে হতে লাগলো। ভোরবেলাই মঠ ছাড়তে হয়েছে তাই তাঁদের সাথে দেখা করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। গীয়াৎসেতে আমার লাভ হয়েছে প্রচুর। আধ্যাত্মিক লাভ তো বটেই আর পার্থিব লাভও বটে। একজোড়া নতুন তিব্বতী জুতো, নতুন গৈরিক বসন আর দু'টাকা নগদ। এ সবকিছুই খাম্পোর কৃপায় পেয়েছি। এ শীতের দেশে এর চেয়ে বড় উপহার আর কিছু হতে পারে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন