বিমল দে
দ্রেপুং মন্যাস্ট্রি থেকে আস্তে আস্তে তীর্থযাত্রীরা বিদায় নিতে লাগল। প্ৰথম বিদায় নিলেন গুরুজী, তার সাথে গেলেন তিনজন লামা। যাবার পথটা আরও কঠিন। বিশেষ করে এখান থেকে গীয়াৎসে পর্যন্ত, এবার শুধু উঠবার পথ। আসার পথে অর্থাৎ গ্যাংটক থেকে এ পর্যন্ত গুরুজীর মোটা কম্বলটা সব সময় আমার পীঠেই ছিল—অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেটাকে গুরুজীর সাথে দিতে বাধ্য হলাম। গুরুজী সংযমী ও অনাসক্ত পুরুষ। কোনো বিষয়েই তাঁর আসক্তি নেই তিনি তাঁর কর্তব্য করেন মাত্র । তাঁকে বিদায় জানাতে আমার অন্তরটা যেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতে লাগল, অতি কষ্টে তা গোপন করে গেলাম। তাঁকে প্রণাম করে আমি কোন প্রকারে চোখের জল সংবরণ করলাম। হঠাৎ মনটা এমনভাবে কেন যে কেঁদে উঠল কিছুতেই বুঝতে পারলাম না । গুরুজী আমর মাথায় আলতোভাবে স্পর্শ করে আশীর্বাদ করলেন মাত্র সেই মুহূর্তে আমাদের মধ্যে আর কোনরকম কথা হল না ।
তারপর আরও চারদিন কেটে গেল একে-একে দু'তিন জন করে তীর্থযাত্রীরা সবাই বিদায় নিলেন। শেষ দলে আমার যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমি না গিয়ে তাদের বললাম——আপনারা চলে যান আমি পরে যাচ্ছি। গুরুজীর কাছ থেকে কৈলাসের কথা শোনা অবধি আমর মনের মধ্যে সেই একই চিন্তা অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছে ; কৈলাসনাথ শিবতীর্থ মহাতীর্থ। সেই কথাগুলোকে ঘিরে মনে মনে এক কৈলাস লোকের সৃষ্টি করেছি। আর মনের অজ্ঞাতে নিজেই সেই সৃষ্টিজালে আটকে পড়েছি। যে রকম করে হোক যেতেই হবে। গুরুজীর কথাটা বার বার কানে বাজতে লাগল—পথ দুর্গম কিন্তু কৈলাসনাথের পথ নির্দেশ খুব সোজা। ব্রহ্মপুত্র সামনেই তার ধার ধরে সরাসরি উৎসের দিকে গেলেই পাওয়া যাবে মানস সরোবর আর তারই পাশে রয়েছে মহাতীর্থ কৈলাসনাথ। গুরুজী ঠিকই বলেছেন যে এতদূর এসে কৈলাসনাথ না দেখে ফিরে যাওয়া মানে বিরাট সুযোগের অপচয় করা। মনটাকে বেঁধে নিলাম, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যেতেই হবে কৈলাসনাথ ।
ইতিমধ্যে আমি তিব্বতী হরফ প্রায় আয়ত্তের মধ্যে এনেছি। সংস্কৃতই তিব্বতী ভাষার উৎস। তবে সংস্কৃত থেকে এ ভাষা আরও সোজা। স্বরবর্ণ তিরিশটি আর ব্যঞ্জনবর্ণ মাত্র চারটি, ই, উ, এ আর ও । তিব্বতী ভাষায় বলে গিল্ড, শাকু, দ্ৰেংবু আর নারো। এখন আর আমি মৌনী বাবা নই। জোখাং মন্দিরে ধর্ণা দেওয়া পর্যন্ত আমি মৌনী ছিলাম। কয়েকটি নেপালী ত্রাপা'র সাথে আমার ইতিমধ্যেই বন্ধুত্ব হয়েছে তাদের কাছ থেকে অনেক নতুন বিষয় জানতে পারলাম। গুম্ফার ছাত্রদের মণ্ডলা-রহস্য খুব ভালোভাবে জানতে হয়। মণ্ডলা'র জ্ঞান থাকলেই পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য জানা যায় । মণ্ডলার গণিত ও রঙের ব্যাখ্যার জন্য ছাত্রদের প্রায় দু'বছর বিশেষ শিক্ষা নিতে হয়। আর মুদ্রার মাধ্যমে জানতে হয় মনের বিচার আর বিকাশের কৌশল। লামাদের যেকোন পরীক্ষা বা বিতর্কের সময় মুদ্রার বিশেষ প্রয়োজন। মুদ্রা মনের ভাবকে প্রকাশ করে। ধ্যানের সময় বিশেষ মুদ্রা ধারণ করলে ধ্যানের পথ সুগম হয়। দ্ৰেপুং গুম্ফাতেই আমি প্রথম মুদ্রার বিষয়ে অবগত হই ।
শাসন ব্যবস্থা ঃ দালাই লামা ও পাঞ্চেন লামা তিব্বতের দুই মহাপুরুষ। পাঞ্চেন লামা থাকেন সীগাৎসে। তিনি বলতে গেলে প্রায় স্বাধীনভাবেই প্রতিষ্ঠিত। তিনি সীগাৎসে ছাড়া তিব্বতের অন্য কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন না। কার্যতঃ দালাই লামাই তিব্বতের শাসক। চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য আজকাল সে ক্ষমতাটাকে রক্ষা করার অজুহাতে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমি সে বিষয়ে উপেক্ষা করে সরাসরি দালাই লামার শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে দু’এক কথা লিখছি।
দালাই লামার শাসন পরিষদ দুই ভাগে বিভক্ত। উচ্চ পর্যায়ের লামাদের নিয়ে গঠিত ‘ইসাং’ বা ধর্ম পরিষদ। রাজ্যের বিভিন্ন গুম্ফা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের এরাই মালিক । দ্বিতীয় পরিষদকে বলা হয় ‘কাশাগ্’। কাশাগই রাজ্যের আইন ও শৃঙ্খলার মালিক। তিব্বতের বনেদি পরিবারকে বলা হয় গীয়েরপা সাধারণতঃ লামাদের পরেই এই শ্রেণীর স্থান। এই সম্ভ্রান্ত পরিবারের যুবকেরা পাঁচ ছ'বছর লাসার স্কুল থেকে উপযুক্ত শিক্ষা নিয়ে সরাসরি শাসন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে। কাশাগ্ পরিষদের সর্বোচ্চ স্থান হচ্ছে প্রধান মন্ত্রী বা চিকাপ। অন্যান্য মন্ত্রীদের বলা হয় শা-পে, দে-পোং ইত্যাদি। সমস্ত তিব্বতকে পাঁচটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়েছে। লাসা ও সীগাৎসে এই দুটো প্রধান শহর নিয়ে প্রথম প্রদেশ নাম উ-সাং, গারটক দ্বিতীয়,খাম্ তৃতীয়, উত্তর তিব্বত বা চাং চতুর্থ, দক্ষিণ তিব্বত বা লোকা পঞ্চম। যদিও খাম্ প্রদেশ অর্থাৎ চাদো এলাকা এখন সম্পূর্ণ চীনাদের অধীনে তবুও সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী অর্থাৎ চি-কিয়াপ এখনও তার ঘাঁটি আগলে বসে আছেন। প্রত্যেকটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তার দুর্গ-প্রধানের মাধ্যমে শাসন চালিয়ে থাকেন। দুর্গ-প্রধানই প্রাদেশিক সামরিক বাহিনীর সর্বেসর্বা তাকে বলা হয় জোং-পো।
যুদ্ধ-বিগ্রহঃ অন্যান্য দেশের মতো তিব্বতকেও বহিঃশত্রুর আক্রমণ সহ্য করতে হয়েছে। তিব্বতের পুরো ইতিহাস পাওয়া মুশকিল। সপ্তদশ শতাব্দী অর্থাৎ রাজা স্রোং-সান্-গাম্পোর সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে তিব্বতের ইতিহাস লেখা শুরু হয়। হিমালয়ের এই গহন কোণে লুকিয়ে থাকা সত্ত্বেও বার বার তাকে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হতে হয়েছে। স্রোং-সান্-গাম্পো চীনা সম্রাট তাই-সুং' এর কন্যাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। চীনা সম্রাট তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করাতে শুরু হয় প্রথম তিব্বত-চীন
যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে রাজা স্রোং-সান্ জয়ী হন। যুদ্ধের ক্ষতিপুরণ হিসেবে তিনি চীনাদের বেশ কিছু অঞ্চল অধিকার করে বসেন আর সেই সাথে সাথে রাজকন্যাকেও।
কুবলাই খানের আমলে তিব্বত চীনাদের সাথে সন্ধি চুক্তি করতে বাধ্য হয় ফলে তিব্বত চীনদেশের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তারই আনুকুলে তিব্বতের বৌদ্ধ-তন্ত্র সমস্ত চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পনেরোশ' শতাব্দীতে চীনের মাঞ্চুরিয়া প্রদেশের রাজকীয় ধর্ম হিসেবে তিব্বতের গেলুক্-পা সম্প্রদায়কেই গ্রহণ করা হয়। তিব্বতের কাছে এটা একটা বিরাট সম্মান। সেই সময় থেকেই তিব্বত চীনা-শাসনভুক্ত হয়ে পড়ে। চীনা-শাসনভুক্ত হলেও তিব্বতের ধর্মপ্রভাবের ফলে সে একটি স্বতন্ত্র দেশের মতোই স্বাধীনতা উপভোগ করে। সেই সময় থেকে শুরু হয় তিব্বতের দালাই লামা পুনর্জন্ম প্রথা। তিব্বতের প্রথম দালাই লামা ছিলেন গেন্-তুং-দ্রি-পা, তিনি তাশী লুম্পো গুম্ফায় (সীগাৎসে) তাঁর প্রথম ধর্মচক্র স্থাপন করেন। তিনি গেলুক্-পা সম্প্রদায়ের। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে বৌদ্ধ তন্ত্র বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৫৮৭ খৃস্টাব্দে মোগল সম্রাট আল্দান গেলুক্ -পা সম্প্রদায়ের ধর্মনেতাকে বজ্রধারা দালাই লামা নামে অভিষিক্ত করেন ।
১৬৫২ খৃস্টাব্দে পঞ্চম দালাই লামা পিকিং-এ যান এবং সেই সময় থেকেই লাসা পিকিং সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সেই সম্পর্কে আস্তে আস্তে ভাঁটা পড়ে। এই সময় চীন তার আভ্যন্তরিক বিষয়ে জড়িত হয়ে পড়ে। কাজেই তিব্বত আস্তে আস্তে তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। ভারত তখন ব্রিটিশ রাজ্যের অধীনে, কাজেই তিব্বত ব্রিটিশ-রাজের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে বাধ্য হয় ।
এই সময় তিব্বতকে বেশ কয়েকবার যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। ১৭৮৮ খৃস্টাব্দে গুর্খা সেনারা তিব্বত আক্রমণ করে, কিন্তু চীনা সৈন্যের সাহায্যে তিব্বতীরা গুর্খা সৈন্যদের পরাস্ত করে। ১৮৫৬ খৃস্টাব্দে নেপাল তিব্বতের উপর প্রভাব বিস্তার করে। ১৮৫৭ খৃস্টাব্দে নেপালী সৈন্যরা চীনাদের কাছ থেকে তিব্বতে অভিযান করার সন্ধি চুক্তি-পত্রে স্বাক্ষর করে।
১৯০৪ সালে ব্রিটিশ কম্যাণ্ডার ফ্রান্সিস ইয়ংহাসব্যাণ্ড (Francis Yonghusband) লাসায় তার অভিযান চালায়। দালাই লামা বিদেশী আক্রমণ ভেবে পালিয়ে যান চীনে। মহামান্য দালাই লামার অবর্তমানে পাঞ্চেন লামা তিব্বতীদের জনপ্রিয় অধিনায়ক হয়ে উঠেন। তিনি স্বদেশ ও প্রজারক্ষার গুরু দায়িত্ব বহন করেন। বলাই বাহুল্য, দলাই লামা, যিনি বজ্রপাণী ভুবনবিজয়ী, তিনি কি করে তাঁর দেশবাসীকে বিদেশী আক্রমণের মুখে ফেলে দিয়ে নিজ জীবন-রক্ষার্থে পলায়ন করলেন তা দেশবাসীর ভেবে উঠতে পারলেন না। মহামান্য চেন্-রে-জী'র সমালোচনা করা সাধারণ মানুষের শোভা পায় না। তাই তারা চুপ করে গেলো কিন্তু সেটাই ছিল পাঞ্চেন লামার প্রধান হাতিয়ার। সেই সময়েই পাঞ্চেন লামাতাশী লুম্পে প্রজারক্ষার্থে তাঁর অভয়বাণী প্রচার করলেন, তিনি হয়ে উঠলেন সীগাৎসের প্রজাবৎসল ভক্তাধীন জনপ্রিয় তাশী লামা । ১৯১১ সালে চীন দেশে শুরু হয় বিপ্লব (Chinese Revolution) । ত্রয়োদশ দালাই লামা ভাবলেন তিব্বতকে চীনা কবল থেকে মুক্ত করার এটাই সুবর্ণ-সুযোগ, কারণ পিকিং তখন আভ্যন্তরীণ গোলযোগে লিপ্ত। তিনি ঘোষণা করলেন “তিব্বত একটা স্বাধীন স্বাতন্ত্র্য রাজ্য।” দালাই লামার এই ঘোষণায় বিপরীত ফল দেখা দিল, তাঁর নিজ দলের অনেক উচ্চপদস্থ চীন-প্রিয় লামা দালাই লামার এই চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার বিরোধী হয়ে দাঁড়ালেন, কাজেই শুরু হল বিশৃঙ্খলা, শেষ পর্যন্ত দালাই লামার জীবন নিয়ে খেলা শুরু হল, দালাই লামা বাধ্য হলেন পালিয়ে যেতে। তিনি দার্জিলিং গিয়ে ইংরেজদের আশ্রয় ও সাহায্য চাইলেন। ১৯১২ খৃস্টাব্দে ইংরেজদের সহায়তায় তিনি স্বাধীন তিব্বত ঘোষণা করলেন।
শক্তিশালী ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে শক্তি ক্ষয় না করে পিকিং মেনে নিল ১৯১৩ সালের সিমলা কনফারেন্স। চীনারা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলেন বটে, কিন্তু আন্তরিকভাবে স্বাধীন তিব্বতকে কিছুতেই স্বীকার করতে চাইলেন না, পিকিং-এর মতে তিব্বত চীনদেশেরই এক অংশ। তিব্বতের ইতিহাসে মনে হয় এটাই সুবর্ণযুগ। ১৯১১-১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ত্রয়োদশ দালাই লামার অধীনে তিব্বতের শ্রীবৃদ্ধি হতে লাগল। পঞ্চম ও ত্রয়োদশ দালাই লামা তিব্বতের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছেন। পোতালায় তাঁদের স্মৃতি-সৌধমন্দির দেখলেই তা স্পষ্ট বুঝা যায়। দালাই লামার এই স্বাধীন তিব্বত মতবাদ সবাই মেনে নিতে পারলেন না, চীনাপন্থী অনেক লামা ও বর্ধিষ্ণু পরিবারের কিছু লোক ১৯২৪ সাল নাগাদ লাসার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করলেন, পাঞ্চেন, লামা তাদের নেতা। চতুর (ত্রয়োদশ) দালাই লামা সেই বিক্ষোভকে বাড়তে না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন। পাঞ্চেন লামা তাঁর ভক্তদের নিয়ে পালিয়ে গেলেন চীনে। পাঞ্চেন লামা (নবম) তারপর আর দেশে ফিরে আসেননি। ১৯৩৭ সালে তিনি চীনেই দেহত্যাগ করেন, লোকে বলে যে সেই থেকে পাঞ্চেন লামা চীন ঘেঁষা। নবম পাঞ্চেন লামার মৃত্যুর পর, চীনা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দশম পাঞ্চেন লামাকে নিযুক্ত করা হয়। তিনিই বর্তমান পাঞ্চেন লামা (১৯৫৬)। চীনা কর্তৃপক্ষ এই পাঞ্চেন লামাকে নানা বিষয়ে সক্রিয় সাহায্য করে থাকেন। নবম পাঞ্চেন লামার মৃত্যুর পর, চীনা কর্তৃপক্ষই নবম পাঞ্চেন লামার পুনর্জন্মরূপ দশম পাঞ্চেন, লামাকে লামা ঐতিহ্য অনুযায়ী সীগাৎসে আনিয়ে তার ধর্মপদে অধিষ্ঠিত করেন। সেই সময় থেকেই পাঞ্চেন লামা ও দালাই লামার মতগত পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ত্রয়োদশ দালাই লামার মৃত্যুর পর, চীনা কর্তৃপক্ষই আস্তে আস্তে আবার তিব্বতকে চীনের মধ্যে ফিরিয়ে আনবার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন ।
চিয়াং-কাই-সেকের জাতীয় সরকার ত্রয়োদশ দালাই লামার মৃত্যুর পর (১৯৩৪) পিকিং থেকে শোকবার্তা নিয়ে এক সরকারী মিশন লাসায় পাঠান। ত্রয়োদশ দালাই লামার মৃত্যুর পর তার পুনর্জন্ম নিতে প্রায় বছর খানেক সময় লাগে। তারপর সেই নতুন দালাই লামাকে দেশের হাজার হাজার শিশুদের মধ্য থেকে খুঁজে বার করতে লাগে আরও বছরখানেক সময়। সবশুদ্ধ মিলিয়ে চতুর্দশ দালাই লামাকে (বর্তমান) সিংহাসনে বসাতে লাগল ছ'বছর, অর্থাৎ ১৯৪০ সালে চতুর্দশ দালাই লামার রাজ্যাভিষেক হল। তার বয়স ছিল তখন মাত্র পাঁচ বছর। শিশু দালাই লামার হয়ে তার অভিভাবক পরিষদই তিব্বতের শাসনকার্য চালিয়ে থাকে। শিশু দালাই লামা ১৯৪০ সালে নবীশ মাত্র, :শাসন দণ্ড হাতে নিতে তার লাগবে আরও বারো বছর। চীনাদের কাছে এটাই উপযুক্ত সময়। ত্রয়োদশ দালাই লামার বিরাট ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে ভারতবর্ষের ইংরেজশক্তির কাছে সেই সময় হান্না তিব্বতে হস্তক্ষেপ করতে সাহস পায়নি। ১৯৪২ সালের পর থেকে ভারতবর্ষে ইংরেজরা স্বাধীনতা সংগ্রামের কারণে অত্যধিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ভারতবর্ষের সমস্যা সামলানো মুশকিল সেক্ষেত্রে তিব্বতের চিন্তা করা কল্পনার বাইরে। ব্রিটিশ রাজ দুর্বল হয়েছে আর অন্যদিকে চীনারা ঐক্য ও জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত হয়েছে। সেই স্রোতের মুখে পড়তে হল তিববতকে। চীনাদের অগ্রসর কেউ থামাতে পারল না ।
চীনাদের বিরুদ্ধে তিব্বতকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র ভারতবর্ষ, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করল। কিন্তু ভারতবর্ষ তখন নবীন। ইংরেজরা ভারতবর্ষের ধন রত্ন নিয়ে গিয়ে খালি বাক্সটা শুধু ফেলে রেখে গেছে, কাজেই এমতাবস্থায় ভারতবর্ষ তিব্বতকে শুধু মৌখিক সহানুভূতি দেখাতে পারে মাত্র, সুসজ্জিত চীনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হবার মতো অবস্থা তার নেই। ১৯৫০ সালে পিকিং থেকে চৌ-এন-লাই তিব্বত-মুক্তি আন্দোলন ঘোষণা করলেন।
এখন ১৯৫৬ সাল, তিব্বতের বহু এলাকাই এখন চীনাদের দখলে। বর্তমান দালাই লামার পিতৃভূমি চাম্দো এলাকাটা সম্পূর্ণ চীনাদের দখলে। বিভিন্ন রকমের সাহায্যের নামে চীনা সৈন্যরা তিব্বতের গ্রামে গ্রামে ঢুকে পড়েছে। পি এল এ (Peoples Liberation Army ) মুক্তি যোদ্ধাদের নাম করে চীনের লাল জাতীয় পতাকা চারদিকে উড়ছে। স্বীকার করতেই হবে যে চীনাদের দৌলতেই তৈরী হয়েছে তিব্বতের প্রধান চারটি জাতীয় সড়ক। একতা ও বন্ধুত্বের নামে সেই রাস্তা দিয়ে ঢুকছে চীনা সৈন্যবাহিনীর ট্রাক। বিদেশী দূতাবাসগুলো আস্তে আস্তে খালি হয়ে গিয়েছে, ভারতীয় দূতাবাসটি দ্রেপুং গুম্ফার খুবই কাছে তার দরজায় ঝুলছে বিরাট তালা আর বাহারী ফুলের বাগানে চড়ছে ভেড়ার দল। সেদিকে তাকিয়ে বার বারই নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি ফিরে আসবে কি তিব্বতের সেই হারানো দিনগুলো !
ধর্মরাজ্য এই তিব্বত, এখানকার বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা জগৎ বিখ্যাত, তিব্বতের সাধারণ সরল এই পবিত্র মানুষগুলোর প্রার্থনায় কি ত্রাণকর্তা ভগবান বুদ্ধের ধ্যান ভঙ্গ হবে না ! হয়তো এটাই কর্ম, সমষ্টিগত ফলতো ভোগ করতেই হবে। হয়তো এটাই তথাগতের ইচ্ছা !
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন