বিমল দে
যাযাবরদের সাথে আমার সাক্ষাৎ নিশ্চয়ই ভগবানের আশীর্বাদ, নয়তো এত তাড়াতাড়ি লাংবোনা গুম্ফায় আসা সম্ভব ছিল না। বিকেলের দিকে সম্পূর্ণ জগতের একটা নতুন রূপ ; অস্তমিত সূর্যের আলোয় চারিদিকের পাহাড়-নদী-হ্রদ ও আকাশের রঙ পাল্টাতে লাগল। সবচেয়ে সুন্দর লাগছে ভারত সীমান্তের গুর্লা মান্ধাতার বিভিন্ন চূড়াগুলোকে। বরফের চূড়ায় রঙিন সূর্যের আলো পড়ে কখনও সোনালী কখনও রূপালী রঙের ঢেউ বইতে লাগল। আর কৈলাস শিখরকে দেখাচ্ছে ঠিক যেমন গ্যাংটকের গুম্ফা থেকে দেখেছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ৷
সূর্যাস্তের পরেই হঠাৎ রাত নেমে আসে তাই আমি পরে ভালো করে দেখবো ভেবে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম। নদী পেতে অসুবিধা হল। পার হয়ে যাবার উপায় নেই। সঙ্গম থেকে এবার ধরলাম উত্তরের পথ। এটাকে মোটেই রাস্তা বলা যাবে না, পাথরের উপর দিয়ে ডিঙ্গিয়ে চলা মাত্র। এখানকার অপরূপ সৌন্দর্য দেখা সত্ত্বেও মনের মধ্যে একটা আপসোস বারবার উঁকি মারতে লাগলো, ভেবেছিলাম পৃথিবীর এই শ্রেষ্ঠ তীর্থে এসে শুধু দেখরো মহাপুরুষদের ভিড়। মানস সরোবরের ধারে শুধু পাবো ধ্যানমগ্ন যোগীদের আস্তানা—কিন্তু কোথায় তাঁরা? রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার একটু আগেই পেলাম একটা সেতু সেখান থেকেই দেখতে পেলাম আধো আলোয় আধো ছায়ায় একটা বিরাট দু-তলা বাড়ী। এই প্রথম কোন কুকুর আসেনি আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে, গ্রামের ছেলেমেয়েরা কেউ আসেনি মৌনীবাবাকে করতে—আমাকেই খুঁজতে হল সেই বিরাট বাড়ীর প্রবেশ পথ । অনুসরণ
রাতের আলো সবে মাত্র পৃথিবীকে গ্রাস করছে, অন্ধকার এখনও চোখে সহ্য হয়ে উঠেনি—ভাগ্য ভালো যে নির্বিঘ্নে এ পর্যন্ত এসে পৌঁছতে পেরেছি। শীতের প্রকল্প শুরু হয়েছে—কম্বলটাকে চাদরের মতো জড়িয়েছি, মাথায় জড়িয়েছি চাদর, হাতে দস্তানা, পায়ে লাম অর্থাৎ তিব্বতী জুতো, তাতেও মনে হয় শীতের কবল থেকে রেহাই নেই। রাতের অন্ধকারটা চোখে সহ্য হয়ে এলে আবার শুরু করলাম খোঁজা। লাংবোনা গুম্ফার চারিদিকে ঘুরে দেখলাম প্রায় ধর্মশালার মতো একের পর এক অনেকগুলো দরজা, কোন্ দরজাটা প্রধান তা আবিষ্কার করা কঠিন। কোন ঘর থেকে এতটুকু সাড়া শব্দ পাচ্ছি না, আলোর চিহ্নমাত্র নেই। মনে হয় সবাই আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কোন উপায় না পেয়ে আমি একের পর এক দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলাম, কিন্তু উত্তর পেলাম না। দু'তিনবার বাড়ীটার চারদিকে ঘোরার পরও কোন দরজা খোলা পেলাম না। রাত্রির জন্য অন্ততঃ কোন রকম একটা ছাদ পেলেই আমার চলে যাবে সেই আশায়
আশপাশে খোঁজ করতে লাগলাম। রাত যতই গভীর হতে লাগল ততই মনে হল রাতের তারাগুলো থেকে যেন আলো ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোতে হঠাৎ মনে হল বাইরে থেকে সিঁড়ি উপরের দিকে উঠে গেছে। কাঠের সিঁড়িই বটে, সিঁড়ি ধরে উপরে উঠেই পেলাম একটা বিরাট বারান্দা তারপর আবার সারি সারি ঘর ।
আমি একটার পর একটা ঘরে আবার জোরে জোরে আঘাত করে যেতে লাগলাম। বলা যায় না যদি কেউ থাকে। আমার অনুমান মিথ্যা নয়, কোণার ঘরটায় আঘাত করতে হল না মনে হল ভেতরে কেউ শব্দে উঠে পড়েছেন। মনে মনে ভাবলাম—যেই হোক না কেন আমার একটা আস্তানার প্রয়োজন, অসময়ে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবো, প্রয়োজন হলে পায়ে পড়তেও দ্বিধা করবো না—শীতের হাত থেকে বাঁচবার জন্য আমাকে একটা ঘর পেতেই হবে। আমি বেপরোয়া হয়ে সেখানে ধাক্কা মারতে যাবো, এমন সময় ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেল। আমার সামনেই আবির্ভূত হলেন এক মহাপুরুষ, তাঁর দর্শনে আমার সমস্ত লোমকূপগুলো খাড়া হয়ে উঠল, আমার বাদ্ধ হয়ে গেল, আমার শরীরের সব শক্তি যেন নিমেষে উধাও হয়ে গেল। আমি প্রায় চৈতন্য হারিয়ে দাঁড়িয়ে সেই মহাপুরুষটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। ঘরের ভেতর একটা কড়াইতে হোমাগ্নির মতো আগুন জ্বলছে, তার সামান্য আলোতে আর বাইরের উজ্জ্বল তারার আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেলাম তাঁর রূপ। সেই দিব্য পুরুষের দেহ থেকে যেন জ্যোতি ঠিকরে পড়ছে—এই দিব্য পুরুষটিই আমাকে একবার শীতের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তিনিই আমাকে তাঁর অলৌকিক শক্তিবলে নদী পার করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমার জীবনদাতা আবার তিনি এসেছেন আমাকে রক্ষা করতে। কে বলবে ভগবান নেই? আমার সামনেই তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মাথায় বিরাট জটা, পরনে ছোট্ট একটা কৌপীন, বিরাট দেহ। আমাকে বাঁচাবার জন্য তিনি আবার এসেছেন, প্রথমবার তাঁকে চিনতে পারিনি। এবার তাঁকে ছাড়ছি না, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার করণীয় কি ? আমার সব বুদ্ধি আর চিন্তা হঠাৎ যেন উধাও হয়ে গেছে। কতক্ষণ যে দাঁড়িয়েছিলাম জানি না—শিবরূপী সেই পরমপুরুষ নিশ্চয়ই অন্তর্যামী। তিনি আমার অবস্থা বুঝতে পেরে আমাকে তিব্বতী ভাষায় ভেতরে ঢুকতে বললেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁকে অনুসরণ করলাম। প্রণাম করতে গেলে যদি তিনি আবার উধাও হয়ে যান, কথা বলতে গেলে তিনি যদি অর্ন্তহিত হন যতক্ষণ তাঁর দর্শন পাওয়া যায় ততক্ষণই জীবন সার্থক। তাই অপলক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমাকে ধরে আগুনের পাশে বসালেন তারপর ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। তাঁর এই মানুষিক আচরণে আমি অনেকটা ধাতস্থ হলাম। তারপর সেই পরমপুরুষ প্রায় নিজের মনেই বলে উঠলেন—
এ ঘরে কোন প্রদীপ নেই কাজেই শুয়ে পড় কাল সকালে তোমার সাথে কথা বলবো। তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছো এখন শুয়ে পড়, এই বলে তিনি আগুনের ধারে শুয়ে পড়লেন। তাঁকে ভালোভাবে দেখার জন্য কাঠকয়লার আগুনটাই যথেষ্ট। আমি কম্বলের উপর কম্বল চাপিয়ে শীতে কাঁপছি আর উনি খালি গায়ে একটি কম্বলের উপর
নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লেন, ঠিক যেমন বেনারসের সাধুরা গঙ্গার ধারে শুয়ে রাত কাটান । মহাযোগী এই বাবাকে এবার আর আমি ছাড়ছি না। ঘরের তাপে আমার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলো । আমি আমার চিন্তাশক্তি ও যুক্তি আস্তে আস্তে ফিরে পেলাম। সেই পরমপুরুষটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, সাক্ষাৎ শিব ঠাকুর নিশ্চয়ই তাঁর কৈলাস ছেড়ে আমার মতো একটা সাধারণ ছেলের সামনে থেকে ঘুমোবেন না। যোগী, মুনী ও ঋষিরা হাজার হাজার বছর তপস্যা করে যাঁকে পান না তাঁকে আমি কি করে পেলাম। আমার না আছে পুণ্য না আছে ভক্তি, উপরন্তু আমি একটি পাপী মৌনীবাবা হয়ে এ পথে আসার সময় কত লোককেই না আশীর্বাদ করেছি—আজকের এই শীতের রাতে আমাকে বাইরে রাখলে অন্ততঃ কিছুটা পাপের প্রায়শ্চিত্ত হত। কিন্তু এ যেন ঠিক তার বিপরীত। এতৎ সত্ত্বেও আমাকে তিনি বার বার তাঁর দু'হাত বাড়িয়ে রক্ষা করছেন। আর যাই হোক মানস সরোবরের এই পবিত্রভূমিতে যাকে আজ পেয়েছি তাঁকে আর ছাড়ছি না। মনে মনে তাঁকেই আমি জীবনদেবতা হিসেবে গ্রহণ করলাম ।
আমি না শুয়ে নয়নভরে সেই মহাপুরুষকে দর্শন করতে লাগলাম। মনে হল তিনি যেন শিব হয়ে শুয়ে আছেন, আর অদৃশ্য মা-কালী তাঁর ওপর দাঁড়িয়ে আছেন—আমি দর্শক হয়ে তাই দেখছি। কৈলাসের দৃশ্য মনে পড়ল, কৈলাস শিখরই তো তাঁর উপযুক্ত স্থান যেখানে তিনি পার্বতীর সাথে বসে তাঁর সৃষ্টি-লীলায় ব্যস্ত। তবে তিনি কেন এখানে এলেন? হয়তো আসতে তিনি বাধ্য তাঁর সৃষ্টিকে বাঁচাবার দায়িত্ব তো তাঁরই। তিনিইতো বিষ্ণু হয়ে তাঁর সৃষ্টি রক্ষা করছেন আবার প্রয়োজন বোধে ধ্বংস করছেন। পর্বতচূড়া ও কৈলাস শিখরে যে জমাট বরফের পাথর, ব্রহ্মরূপে তিনিইতো তার সৃষ্টিকর্তা, আর নদীরূপে তিনিই বিষ্ণু আবার ধ্বংসের মালিকও তিনিই। আমি কল্পনাই
করতে পারছি না যে সশরীরে আমি এখন কৈলাসের পাদপদ্মে বসে আছি—একি স্বপ্ন ... একি সত্য—মন বার বার সংশয়ে ভরে উঠছে...। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, ভোরবেলা ঘুম ভাঙল। চোখ খুলতেই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল রাতের কথা, তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম সামনের দিকে তাকাতেই দেখি তিনি উধাও হয়েছেন—-আপসোসে মনের ভেতরটা যেন জ্বলে উঠল, আবার হারালাম তাঁকে। এমন সময় কানে এল কার মৃদু কণ্ঠস্বর। কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলাম, আওয়াজটা আসছে পাশের ঘর থেকে—শুনে মনে হল সংস্কৃত শ্লোক, তিব্বতীদের প্রার্থনার শব্দটা অনেকটা নিম্নস্বরের নাভি নাদ। এটা নিশ্চয়ই কণ্ঠস্বর। তাহলে পাশের ঘরে নিশ্চয়ই কেউ আছেন। আওয়াজটা আসলে পাশের ঘরের নয় আসছে নীচের থেকে। কম্বল জড়িয়ে নীচে নেমে এলাম, কানে এবার স্পষ্ট শুনতে পেলাম সংস্কৃত শ্লোক- অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ
সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি ।
যথৈধাংসি ........
অনেকদিন পর যে মাতৃভাষা শুনছি—কৌতূহল দূর করতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে
উঁকি দিলাম দরজা ফাঁক করে, আনন্দে আমার ভেতরটা নেচে উঠল ঠিক যেমন হয়েছিল গ্যাংটকের বাজারে সাধুবাবাকে দেখে। রাতের সেই মহাপুরুষই ভগবান বুদ্ধের সামনে বসে গীতা পাঠ করছেন। আনন্দের বেগ আমি সামলাতে পারলাম না, দরজা খুলে ঢুকে গিয়ে সরাসরি তাঁর পায়ে আত্ম-নিবেদন করলাম - পেলাম। " । আবার তাঁকে
তিনি পাঠ থামিয়ে আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন –নারায়ণ নারায়ণ, তাঁর আশীর্বাদে আমি ধন্য হলাম। তারপর শুরু হল আমাদের আলাপ। মাথায় বড় বড় চুল, লম্বা দাড়ি, সর্বাঙ্গে ভস্মমাখা, পরনে একটি ছোট্ট কৌপীন, এই শীতের দেশে তিনি নিশ্চয়ই মহাযোগী। তাঁর পরিষ্কার হিন্দীতেই বুঝলাম তিনি ভারতীয় যোগী। তিনি এর আগেও একবার দেখা দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন সেই কথা জানাতেই তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন যে তিনি আমাকে এই প্রথম দেখছেন——তাঁরই মতো অন্য কাউকে হয়তো দেখেছি। এ বিষয়ে তিনি আর কথা বাড়াতে চাইলেন না। আমার পরিচয় জিজ্ঞাস করাতে, আমি তাঁকে সবিস্তারে আমার কথা জানালাম। তাঁকে স্পষ্ট বললাম যে, আমি বাড়ী থেকে পালিয়ে এসেছিলাম গয়ায়, তিব্বতে আসার কোন পরিকল্পনাই আমার ছিল না, সাধুবাবার প্রতি আমার আকর্ষণই আমাকে এই মহাতীর্থে পৌঁছে দিয়েছে।
তিনি আমার কথা অতি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন তারপর আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর সেই কঠোর চাউনির সামনে আমি মাথা নত করতে বাধ্য হলাম। তাঁর চোখের মধ্যে লক্ষ্য করলাম এক সম্মোহনী শক্তি লুকিয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে তিনি আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন—তারপর আমাকে তাঁর বুকের মধ্যে টেনে ধরে বললেন--সব্ কুছ্ শংকরকা খেল্ হ্যায়। তিনি কেন এই কথাটা বললেন বুঝলাম না। তাঁর স্পর্শে আমি শান্তি আর একটা বিরাট আশ্রয় পেলাম, একমাত্র এই মহাপুরুষটিকে দেখার জন্য যদি আমাকে কৈলাসে আসতে হত তাহলেও মনে হয় আমার এই পরিশ্রম সার্থক। আমার জীবন ধন্য হল। কৈলাস থেকে মানসের এই পুণ্যভূমি শিবভূমি, আমাদের সামনেই রয়েছে অবলোকিতেশ্বরের এক বিরাট মূর্তি আর তিনি পাঠ করছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অমৃতবাণী। গীতা পাঠ করতে করতে তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে শিব কৃষ্ণ বুদ্ধ সবই সমান। আমরা যে ভাষায় যাকেই প্রার্থনা করি না কেন তা পৌঁছয় সেই একই পরমপুরুষের কাছে। শিব তুল্য সেই মহাপুরুষের কাছে বসে প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে গীতার অমৃতবাণী শুনতে লাগলাম । সংস্কৃত শ্লোকের চেয়ে সেই মহাপুরুষের উপরই নজর নিবদ্ধ ছিল। হঠাৎ যেন তিনি আমাকে বশীভূত করে ফেলেছেন।
তারপর একসময় আমরা উঠে ঘরের বাইরে এলাম। লাংবোনা গুম্ফাটা বিরাট নয়, সেটাকে মাঝারি ধরনের একটা ধর্মশালা বললেই ঠিক হবে। আমরা দু'জন ছাড়া সেখানে আর একটি প্রাণী ও নেই। বাইরে এসে আমরা সাতবার গুম্ফা পরিক্রমা
করলাম তারপর কৈলাস পর্বতের দিকে তাকিয়ে জোড়হাতে শুরু করলাম সূর্য প্রণাম-
ওম্ সূর্যং সুন্দর লোকনাথম্ অমৃতম্ বেদান্ত সারং শিবম্। জ্ঞানং ব্রহ্মময়ং সুরেশরম্ অমল লোকৈক চিত্তম্ স্বয়ম্।। ইন্দ্রাদিত্য নরাধিপং সুরগুরুং ত্রৈলোক্য চূড়ামণিং ব্রহ্মাবিষ্ণু শিবস্বরূপ হৃদয় বন্দে সদা ভাস্করম্। ওম্ হিরণ্যময়েন পাত্রেন সত্যস্যাপিহিতং মুখম্ তত্ত্বং পুষণপাবৃণু সত্য ধর্মায় দৃষ্টয়ে ... । ।
প্রার্থনা শেষে তিনি শুরু করলেন সূর্য প্রণাম ব্যায়াম। আমিও চেষ্টা করলাম তাঁকে অনুসরণ করতে। ব্যায়ামের পর তাঁর সাথে আরও অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ পেলাম।
ঘরের কোণে একটা ঝুলি টাঙ্গানো তাতে রয়েছে কিছু গম ও ছাতু। আর আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে একটা অ্যালুমনিয়মের ভাঙা হাঁড়ি। কৈলাস থেকে বরফ গলা জল নিয়ে গীউমা (চু) নদীটা মানস সরোবরে গিয়ে পড়েছে। সেই নদীর জলেই তিনি একবেলা গম সেদ্ধ করে খান। খাওয়া বলতে সেটাই সব। একটু আপন হতেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম—এই প্রবল শীতেও আপনি উলঙ্গ রয়েছেন এটা কি আপনার বহুদিনের তপস্যার ফল ?
তিনি হেসে জবাব দিলেন—না, ভস্মই হচ্ছে শীত থেকে রক্ষা পাবার মূল হাতিয়ার। সদাশিব তিনি ঐ চিরতুষারের উপর অনন্তকাল ধরে বসে আছেন সেটা তো ভস্মেরই কারণে। কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন—আমাদের জীবনে সবই মায়া। এই জগতের সব পদার্থই অগ্নিদাহ্য—শেষে যা থাকে তাই ভস্ম। ভস্মই জীবনের সার। কাম-ক্রোধ-লোভ-মহ-মোদ-মাৎসর্য সব পুড়িয়ে দাও মনের আগুনে তারপর যা পড়ে থাকবে সেটাই তো ভস্ম, সেই ভস্মই তুমি জানবে আমাদের জীবনের অমৃত। সদাশিব তিনি আমাদের কাছে কিছুই চান না, তিনি নিজে ভস্মমেখে বসে আছেন। আমরাও যদি সেই ভস্ম মাখতে পারি তাহলেই আমাদের কোন পাপ স্পর্শ করতে পারবে না। আমি তাঁর কথাগুলো ভুলে যাবার আগেই তাড়াতাড়ি ঝোলার ভেতর থেকে পেন্সিল আর কাগজ বার করে লিখে নিতে লাগলাম । তিনি তা দেখে হেসে উঠলেন—মনে হল আমি ছেলেমানুষি করছি, তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন—বাবা জগতের সত্য জিনিসটাকে চিত্তের উপর লিখে রাখার চেষ্টা কর। তাঁর কথা শুনে আমি কাগজ পেন্সিলটাকে আবার ঝুলির মধ্যে রাখতে বাধ্য হলাম ৷
তিনি উপদেশ দিয়ে বললেন –বাবা তুমি অনেক পুণ্যের ফলে এখানে এসে পৌঁছেছ। ভারত হতে যারা কৈলাসনাথে আসেন আলমোড়া দিয়ে সেটা খুব সংক্ষেপ
পথ, দু'তিন সপ্তাহ মাত্র লাগে, আর তুমি এসেছ লাসা হয়ে সেটা তিব্বতীদের পথ, ভগবান শিবশংকর তোমাকে ডেকেছেন তুমি ভাগ্যবান। আমাকে তোমার সংকল্প খুলে বল আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
তাঁর কথা শুনে আমি অবাক হলাম, জিজ্ঞাসা করলাম—বাবা সংকল্প জিনিসটা কি? এই মহাপুরুষকে দেখা অবধি বার বার আমার কৈলাস শিখরে শিবের কথাই মনে হচ্ছে তাই তাঁকে কৈলাস-বাবা বলেই গ্রহণ করেছি। তিনি সংকল্প কি সেটাই বুঝিয়ে বললেন—
সংকল্পকে কথায় বলা হয় তীর্থযাত্রীর ইচ্ছা। তীর্থস্থান বা যে কোন মন্দিরে দর্শনের সময় মনের ইচ্ছা বা বাসনার জন্য প্রার্থনা করতে হয়। মানুষ মাত্রেই এই ইচ্ছা বা সংকল্প নিয়েই তীর্থক্ষেত্রে আসে। অনেকদিনের সাধনা রাস্তার কষ্ট ও তপস্যার পর তারা ভগবানের কৃপা ভিক্ষা করে। ভগবান তুষ্ট হয়ে তাদের মনোবাসনা পূরণ করেন ৷
বাবাকে জানালাম যে সে ধরনের কোন সংকল্পই আমার নেই। লাসায় জোখা মন্দিরেও আমি কিছু চাইনি, আর এখানেও আমি কিছু চাইতে আসিনি। সংকল্পের বিষয় আমি এই প্রথম শুনছি। আমার এই অপরাধের জন্য বাবার কাছে ক্ষমা চাইলাম। তারপর আবার শুনালাম আমার ইতিহাস, তার মানে আমার এই কৈলাস পর্যন্ত আসাটাই হঠাৎ হয়ে গেল। বিনা মন্ত্রেই আমি ধ্যান করি, বিনা তন্ত্রেই আমি হয়েছি লামা। বিনা তপস্যাতেই আমি এসেছি এই স্বর্গভূমি কৈলাসে আর বিনা প্রার্থনাতেই পেয়েছি আপনার আশ্রয়। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না বার বার মনে হচ্ছে যে আমি স্বপ্ন দেখছি।
কৈলাসবাবা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—জগতে কোন কিছুই বিনা কারণে ঘটে না । কর্মফলেই আমরা জন্মেছি আর কর্মফলেই আমরা সুখ ও দুঃখ ভোগ করি। তোমার যদি কোনো রকম সংকল্প না থাকে তাহলে তো তুমি মহাত্মা। যোগীরা বলেন, বিনা সংকল্পে যারা কৈলাসনাথ দর্শন করেন তারাই পান মুক্তি
বাবাকে আমি খুলে বললাম যে আমি এক মহাপাপী, সাধুবাবার সঙ্গ পাবার জন্য আমি তাঁর থেকে দীক্ষা নিয়ে হয়েছি লামা, চীনাদের হাতে ধরা পড়বার ভয়ে হয়েছি মৌনীবাবা। সাধু না হয়েও কত লোককে আশীর্বাদ করেছি—আমি মিথ্যাবাদী।
বাবা বললেন—তা সত্ত্বেও তুমি এসে পৌঁছেছ এই মহাতীর্থে, মানুষের লক্ষ্য যদি ঠিক থাকে তাহলেই হল, তুমি যদি কারুর অনিষ্ট না কর তাহলেই তো ঠিক পথ ধরা হল ।
কথায় কথায় মনে পড়ল সেই লামার দেওয়া চিঠিটার কথা, সেটাকে বার করে বাবার হাতে দিলাম। তিনি চিঠিটা নিয়ে বার বার এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে বললেন যে তিনি তিব্বতী ভাষা পড়তে পারেন না তবে বুঝতে পারেন আর বলতেও পারেন।
কৈলাসবাবার কাছ থেকে মানস সরোবর ও লাংবোনা গুম্ফা সম্পর্কে বিশদ জানতে পারলাম। থোক্চেনকে অনেকে বলে তাসাম, আমি ভেবেছিলাম সেটাই তার স্থানীয় নাম। আসলে তাসাম কথাটার মানে অনেকটা থানার মতো। এই অঞ্চলে যে জায়গায় থানা বা সরকারী দপ্তর আছে তাকে বলা হয় তাসাম। তাসামেই বসে সে অঞ্চলের সেরা হাট। কৈলাসনাথ ও মানস সরোবরের তীর্থযাত্রীদের বাজার হাট করার জন্য তাসামে আসতেই হয়। মানস সরোবরের পূর্বদিকে যেমন আছে থোক্চেন তাসাম, তেমনি উত্তরে আছে তারচেন তাসাম। মানস সরোবরের দক্ষিণদিকে যারা আসেন তারা তালাকোট থেকে বাজার হাট করেন। শাস্ত্রে আছে যে, কৈলাস দর্শনে সাতজন্মের পাপ দূর হয়, আর মানস সরোবরে ডুব দিলে হয় মুক্তি।পুণ্যাত্মা ও সাধু মহাপুরুষরা এখানেই তপস্যার ফলে বর লাভ করেন, আর তাঁর দর্শন পেয়ে নির্বাণ লাভ করেন। বৌদ্ধ ও হিন্দুদের এটা পরম পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, এরচেয়ে পুণ্যভূমি জগতে আর নেই। এখানে কোন হিন্দু মন্দির নেই। আগে ছিল কি না তাও কেউ বলতে পারবে না । প্রাচীন কোন হিন্দু মন্দিরের চিহ্নও এখানে নেই। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই বৌদ্ধ-তান্ত্রিক। হিন্দু সাধু বা তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন দর্শন স্পর্শ ও স্নানের জন্য। মানস সরোবর ও রাবণ সরোবর যদিও বিরাট সমতলের উপর অবস্থিত তা হলেও একটু দূরে তার চারপাশে ছোট খাটো অনেক পাহাড় আছে। সে সব পাহাড়ের আছে অসংখ্য গুহা, অনেক সাধু মহাপুরুষরা তপস্যা করবার জন্য সেখানে আসেন ।
মানস সরোবরের চারদিকে অনেকগুলো গুম্ফা আছে, শীতকালে যখন নদীর জল জমে বরফ হয়ে যায় তখন তিব্বতীরা এই গুম্ফাগুলোকে ধর্মশালা হিসেবে ব্যবহার করেন। গুম্ফাগুলো সাধারণ বাড়ীর মতোই। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের অনেকে মানস সরোবরে পিতৃ-তর্পণ, শ্রাদ্ধ বা প্রায়শ্চিত্তের জন্য আসেন। এইসব গুম্ফাগুলোতে তার জন্য পাণ্ডা ও পুরোহিত পাওয়া যায়। এখানে কৈলাসবাবার দর্শন আমার পথে এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করল। প্রথমে ভেবেছিলাম তিনিই স্বয়ং শিব। তারপর ভেবেছি তিনিই আমার ইষ্টদেবতা আমাকে ইনিই বার বার বিপদ থেকে রক্ষা করছেন। কিন্তু কৈলাসবাবার মতে তিনি নাকি আমার জন্য কিছুই করেননি,তাঁর দর্শন করুণাময়ের আর এক লীলা মাত্র। ভাবতেও আশ্চর্য লাগছে যে, তাঁকে এই লাংবোনা গুম্ফায় কি করে সম্পূর্ণ একা পেলাম। যোগাযোগের কথা যতই ভাবছি ততই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। করুণাময়ীর একি অসীম করুণা। কি জানি হয়তো একেই বলে স্থান মাহাত্ম্য।
কৈলাসবাবা আসলে পৌড়ি গাড়োয়ালের লোক। আলমোড়ায়ই তিনি বেশি থাকেন। তাঁর নিজস্ব কোন আশ্রম বা ডেরা নেই। তিনি এবার নিয়ে সাতবার কৈলাসখণ্ডে এলেন। প্রত্যেকবারই তিনি মাসখানেক থাকেন। দেখলে মনে হয় ষাট পঁয়ষট্টি বছরের কিন্তু আসলে তারও বেশী। প্রাণায়াম ও হঠযোগের ফলে শরীরটাকে মজবুত রেখেছেন আর ধ্যান ধারণার ফলে আধ্যাত্ম জগতের অতি উচ্চ পর্যায়ে তিনি উঠে আছেন। আমার মতো একটি সাধারণ ছেলের পক্ষে তাঁর শক্তি জানা অসাধ্য।
যদিও মানস সরোবর, রাক্ষস সরোবর ও কৈলাস পর্বত এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তীর্থ তবুও সেখানে আজকাল তীর্থযাত্রীদের ভাঁটা পড়েছে। বছর চারেক আগেও এই সময় এখানে তীর্থযাত্রীদের ভিড় হতো আর আজকাল লোকজন নেই—সেই ধর্মশালা বা গুম্ফাগুলো আজকাল প্রায় শ্মশানে পরিণত হয়েছে। আলমোড়া ও কাশ্মীর থেকে তীর্থযাত্রীদের পথ এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। সিকিমের পথতো আমি নিজের চোখেই দেখেছি। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে যারা ছিল ধনী তার সবাই বলতে গেলে ভারতীয়। গরমকালে তাই চারদিক থেকে যাযাবররা মানস ও কৈলাসখণ্ডে এসে ভিড় করতো। পশম ও পাথর বিক্রি করাই ছিল তাদের প্রধান ব্যবসা। অপেক্ষাকৃত গরীব যাযাবররা তীর্থযাত্রীদের কাছে ভেড়ার দুধ বিক্রি করতো। আর যুবকরা পথক্লান্ত অথবা অসুস্থ তীর্থযাত্রীদের হয়ে পরিক্রমা করতো। গরমের সময় মানস পরিক্রমার কোন প্রশ্নই উঠে না কিন্তু শীতকালে কৈলাস পরিক্রমা খুব কঠিন। শীতকালে আট আনা ও গরমকালে মাত্র চার আনা পয়সা হলেই এরা তীর্থযাত্রীর নামে পরিক্রমা করে।
এই অঞ্চলে গুম্ফা ছাড়া যাযাবরদের কালো কালো তাঁবু নজরে পড়ে। এদের মতো সহজ ও শক্ত মানুষ পৃথিবীতে আর নেই। এই অঞ্চলটি অর্থাৎ কৈলাসখণ্ড যদিও তিব্বতের মধ্যে তবুও এখানে ভূটান রাজ্যের আধিপত্যই বেশী। এখানকার মূল মণ্ডি বা বাজার আর অনেকগুলো গুম্ফার মালিক ভূটান সরকার। রাজনৈতিক কারণে আজকাল ভূটানী ব্যবসায়ীরা এখানে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক লামা সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে ভূটানে অথবা কাশ্মীরের দিকে চলে গেছেন। সে কারণেই অন্যান্য অনেক গুম্ফার মতো এই লাংবোনা গুম্ফাও পরিত্যক্ত হয়েছে। কৈলাসবাবা প্রায় দু'সপ্তাহ যাবৎ এখানে এসেছেন। কয়েকদিন মৌন থেকে পূজা ও প্রার্থনা করে, কৈলাস পরিক্রমার পর এখন বিশ্রাম করছেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি চলে যাবেন।
বাবা একটা ঘর দেখিয়ে বললেন যে এখানেই তিনি ‘চাম্’ তপস্যার জন্য প্রথম এসেছিলেন। ‘চাম্’ তপস্যার বিষয় আমি জানতাম না তাই বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম—এই তপস্যাটা কি রকম ?
তিনি উত্তরে বুঝিয়ে দিলেন চাম বা ছাম হচ্ছে তিব্বতী শব্দ অর্থ নির্জন। নির্জনে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে ভগবৎ চিন্তা করাকে বলে ছাম-তপস্যা। এটা তন্ত্র সাধনার এক প্রধান অঙ্গ। মহাকাল বা ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করে তাঁর পায়ে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিতে হবে। এই তপস্যা খুবই কঠিন মার্গ। তিনদিন, সাতদিন, এক বছর, দু'বছর, দশ বছর যার যেমন ক্ষমতা সে সেইরকম প্রতিজ্ঞা নিয়ে এই ঘরে প্রবেশ করে। ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার কোন জানালা দরজা নেই। ঘরের ভেতরে ঢুকতে হয় যে গুহা দিয়ে সেই গুহাটিও অতি ছোট, আঁকাবাকা পথ গুহাতে এসে পৌঁছেছে তাতে এতটুকু আলো প্রবেশ করে না । খাবার জন্য দিনের বেলা গুম্ফা থেকে একজন লামা এসে গুহার কাছে দাঁড়িয়ে হাত তালি দিয়ে খাবার রেখে যায়। বাইরের জগতের সাথে সেটাই একমাত্র সম্বন্ধ কোন রকম কথাবার্তাই হয় না। সাধককে গুহার কাছে এসে খাবার নিয়েই আবার প্রবেশ করতে হয় অন্ধকারে। খাওয়ার শেষে সে থালাটা গুহার মুখের কাছে রেখে আবার ঢুকে পড়ে বদ্ধ ঘরের মধ্যে। সম্বলের মধ্যে থাকে দুটো কম্বল আর -জপের মালা। নিজের সাথে মুখোমুখি হবার এটাই নাকি চরম পন্থা। মনের উপর ভীষণ জোর আর ইদমের ওপর ঐকান্তিক ভক্তি না থাকলে এই সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা সম্ভব নয়। অন্ধকার ঘরে একের পর এক দুষ্টু আত্মারা এসে প্রথম প্রথম ভয় দেখাতে থাকে,
তারপর তারা তপস্যার ব্যাঘাতের জন্য আনে নানা রকমের প্ররোচনা। এইসব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাধক শব্দ স্পর্শ-রূপ-রস ও গন্ধকে জয় করেন। তারপর আসে অহংকার মন বুদ্ধি ও চিত্তের জয় ৷
মহাযোগী তান্ত্রিকরা বছরের পর বছর এখানে তপস্যা করে অলৌকিক বিদ্যার অধিকারী হন। এটা মুক্তির পথ নয় শক্তি সাধনার পথ। কৈলাসবাবা সেখানে ছিলেন তিন মাস। সেই সময়ে তাঁর চোখের জ্যোতি অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। তারপর আবার তিনি সূর্য সাধনা করে সেই জ্যোতি ফিরে পান। বিকেলের দিকে কৈলাসবাবা গায়ে কম্বল জড়ান কিন্তু সব সময়ই খালি পা। এই ঠাণ্ডায় যেখানে ভারী খাঁটি-উলের মোজা ও জুতো পরে আমি শীত আটকাতে পারছি না সেখানে তিনি খালি পায়ে স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছেন—একেই বুঝি অলৌকিক বিদ্যা বলে। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় মানস সরোবরের অন্য রূপ চোখে পড়ল। জলের রঙটা আগে দেখেছিলাম গাঢ় সবুজ ও নীল রঙের মতো আর এখন দেখছি শুধু যেন নীল। সূর্যাস্তের দৃশ্যটা অনবদ্য।
বাবা বললেন যখন সাধারণ সৌন্দর্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তখন ইচ্ছা হয় সকলকে ডেকে তা দেখাই, সকলের সাথে ভাগ করে নিই সেই সৌন্দর্যের মহিমাকে—সেটাই মানুষের ধর্ম। কিন্তু এখানকার সৌন্দর্য অসাধারণ, এ সৌন্দর্য স্বৰ্গীয় সৌন্দর্য। এখানে উপলব্ধি করতে হয়, পরমেশ্বরের এই লীলাতে অবগাহন করতে হয়, মানস সরোবরের ঠাণ্ডা জলে ডুব দিলে এখন ঠাণ্ডায় ভুগতে হবে। কাজেই এই দৈব সৌন্দর্যে অবগাহন কর, মন ভরে দেখো তারপর চেষ্টা কর সেই সৌন্দর্যকে অন্তরে নিয়ে নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তোলো। যাঁহার কৃপায় এই ত্রিভূবন সৌন্দর্যে ভরে উঠছে তাঁর কৃপা থেকে আমরাই বা বাদ যাই কেমন করে আমরা তো আর এই ভুবনের বাইরে নই। মানস সরোবরই মন সরোবর। সাধনার দ্বারা গড়ে তুলতে হবে মানস সরোবরের মতো উদার আর গভীর ভাব। মানস সরোবরের উপর উঠছে ছোট ছোট ঢেউ সেগুলো হচ্ছে সংকল্প। সেই সংকল্পগুলো কৈলাস নাথের শ্রীচরণে সমর্পণ করছে তার প্রণতি । মানস তীর্থের মৃদু ঠান্ডা বাতাসে স্নান করে তীর্থযাত্রীরা পাচ্ছে মুক্তি। গঙ্গায় শীতের সময় পূর্ণ জোয়ারের পর যেরকম ভাব-গম্ভীর স্তব্ধতা দেখেছি দেখতে অনেকটা সেরকম। এপার ওপার অনেকটা কলকাতার কাছে গঙ্গার দেড়গুণের মতো। মানস সরোবরের চারদিকে ঘুরতে হলে প্রায় পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন মাইল অর্থাৎ পরিধি হাঁটতে হবে। আমি কৈলাস বাবার সাথে দাঁড়িয়ে আছি মানস সরোবরের উত্তরে, এখান থেকে দূরে গুরলা মান্ধাতা পাহাড়টা অদ্ভূত রকমের সুন্দর দেখাচ্ছে। আরও দূরে ধুধু করছে হিমালয়। চারদিকের স্তব্ধতা আর সৌন্দর্যে হৃদয় ভরে উঠে। এ কথা ভাষা দিয়ে লিখতে পারছি না। এই পরিবেশে থেকে চিন্তাই করা যায় না যে জগতে পাপ ও হীনবৃত্তি বলে কিছু আছে। মানস সরোবর সম্পর্কে অনেক পৌরাণিক গল্প আছে। স্বামী প্রণবানন্দজীর লেখা Exploration in Tibet হইতে উদ্ধৃত হিন্দুশাস্ত্রে আছে যে মহানাগ এই মানস সরোবরেই বাস করে। মানস সরোবরের মাঝখানে আছে কল্পবৃক্ষ, সেই বৃক্ষের ফল খেয়ে নাগরাজ জীবন ধারণ করেন, আর বাকি ফলগুলো জলের তলায় ডুবে গিয়ে হয়ে যায় সোনা। একমাত্র ধার্মিক ছাড়া মানস সরোবর কেউ পার হতে পারে না। মানস সরোবরে শিব ও পার্বতী আসেন স্নান করতে, সেই সময়ে এখানকার রাজহাঁসে চেপে সরস্বতী দেবী আসেন তাঁদের দর্শনে। রামায়ণ মহাভারত স্কন্দপুরাণ এই মানস সরোবরের গুণগাথায় ভরা। পুরাণে আছে মহারাজ মান্ধাতা এই মানস সরোবর প্রথম দর্শন করেন সেই থেকে এর নাম হয়েছে মানস। অনেকের মতে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মন-স্বরূপ এই সরোবর। ঐতিহাসিকরা বলেন আর্যদের আগমনের পর থেকেই এই সরোবরের কথা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে প্রবেশের পথে তাঁরা এখানকার সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন।
স্থানীয় লামা ও তিব্বতীরা বিশ্বাস করেন যে ভগবান বুদ্ধ এই মানস সরোবরের মাঝখানে বসে আছেন। তাঁকে ছায়া দিচ্ছে একটি অনভতত্ত্ব বৃক্ষ। সেই বৃক্ষের ফুল ফল ও পাতায় আছে অমৃতত্ত্ব। তা খেলে আসে নির্বাণ। জরা ব্যাধি ও মৃত্যু থেকে পাওয়া যায় মুক্তি। শীতের দিনে দণ্ডিপ্রণাম করে কেউ যদি সরোবর পরিক্রমা করেন তাহলেও পাওয়া যায় নির্বাণ লাভ। তিব্বতীদের এই ধরনের পরিক্রমায় লাগে প্রায় পঁচিশ ছাব্বিশ দিন। অস্তমিত সূর্যের আলোতে সরোবর ও দূরের পাহাড় এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। তার উপর রাজহাঁসগুলোকে দেখে মনে হয় এ সত্যি স্বপ্নলোক। বাবা আমাকে ব্রহ্মগায়ত্রী মন্ত্রের সুর ধরিয়ে দিলেন আমি তাঁর সাথে উচ্চারণ করতে লাগলাম—ওম্ ভূ-ভূবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যম্ ভর্গো দেবস্য ধীমহী ধীয়ো ইয়ো নঃ প্রচোদয়াৎ ওম্।
সন্ধ্যের পরই আমরা ফিরে এলাম, সন্ধ্যের পর কৈলাস বাবার অন্য রূপ দেখলাম সেই সদাহাস্যময় বাবা হঠাৎ যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। গুম্ফায় ফিরে এসে আমি কাঠ জ্বালিয়ে কড়াই প্রস্তুত করে ঘরে নিলাম। ঘরে এসেই দেখি বাবা কম্বলের উপর বসে ধ্যানস্থ হয়েছেন। আমি কোন শব্দ না করে কম্বলটা বিছিয়ে তার উপর বসে পড়লাম জপমালা নিয়ে।
ওম মণি পরেরদিন খুব ভোরে বাবা আমাকে ডেকে তুললেন। উঠেই দেখি গরম আটার ঝোল প্রস্তুত, অবাক হলাম কারণ তিনি দিনে একবার মাত্র আহার করেন। আমি উঠেই শুরু করলাম নাম জপ মাসখানেক যাবৎ এটাই আমার প্রভাত সঙ্কীর্তন, পদ্মে হুম্ ... । বাবা আমাকে বললেন—গায়ত্রী মন্ত্র জপ কর অন্য কোন মন্ত্র নয়। আমি তার কথা মতো শতবার গায়ত্রী মন্ত্র জপ করে আসন ছাড়লাম। তাঁর সাথে শুরু করলাম সূর্য প্রণাম ও ব্যায়াম। সব শেষ করে যখন উঠলাম তখনও বাইরে সম্পূর্ণ ভোর হয়নি।
তিনি আমাকে আটার ঝোল খাইয়ে দিয়ে বললেন—আমি রাস্তা বলে দিচ্ছি তুই এখনই রওনা হয়ে পড় কৈলাসনাথ দর্শনে। দিরাফুক্ গুম্ফায় চিঠিটা দেখাবি কোন অসুবিধা হবে না। দিরাফুক্ গুফায় তিনদিন থাকবি তারপর চলে আসবি নীচে আমার সঙ্গে আবার দেখা হবে পারখায়, এই বলে তিনি আমাকে কৈলাস শৃঙ্গ প্রদক্ষিণের নির্দেশ দিয়ে দিলেন ।
আমি তাঁকে প্রণাম করে বেরিয়ে পড়লাম। কৈলাস বাবাকে এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে হবে ভাবতে পারিনি, মনে হল তিনি আমাকে যেন ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দিলেন। এই ব্যবহারে কোন দয়া মায়া নেই। মহাত্মাদের আচরণ সাধারণ মানুষ হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন, জীবনটাকে তাঁরা দেখেন সম্পূর্ণ অন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। তাঁদের মধ্যে উচ্ছ্বাস নেই আছে শুধু কর্তব্য। শীতের কথা আর লিখে কি হবে, শীতের গায়ে ধাক্কা মেরেই চলেছি—তার স্পর্শে বার বার শরীরের মধ্যে উঠছে হাড় কাঁপুনি। আমি গুম্ফা থেকে বেরিয়ে সরোবরকে বাঁ দিকে রেখে হাঁটতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর ধীরে ধীরে শরীরটা যেন জেগে উঠল।এতদিন যাবৎ মণিমন্ত্রটাকে আমার চলার সাথী করে তুলেছিলাম। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে একটা তাল এসে গিয়েছিল চলার পথে সেই মন্ত্রটাই এসে জুড়ে বসল আমার মনে, শুরু করলাম আবার ওম্ মণি পদ্মে হুম্ ওম্ মণি ...। আস্তে আস্তে আমার সামনের পর্দাটা যেন উঠতে লাগল, ভোরের আলোর সাথে সাথে সামনের রঙ্গমঞ্চ আমার সামনে দৃশ্য হল । একি অপরূপ !
কৈলাসের আজ অন্য রূপ, আধো আলো আধো ছায়ায় তার রহস্যময় রূপটা যেন আমাদের মধ্যে ধরা দিয়েও দিচ্ছে না। তাকে পেতে হলে চাই আরো আলো। অজ্ঞানের কুয়াশাকে জ্ঞানের আলোকে দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে। তার জন্য চাই সূর্যদেবের তপস্যা। আমি এবার শুরু করলাম প্রার্থনা ওম্ সূর্যং সুন্দর লোকনাথম্ অমৃতম্ ...
অনেকক্ষণ চলার পর এবার পেলাম একটা চৌরাস্তা। চৌরাস্তা মানে দুটো হাঁটা
পথ। মানস সরোবরকে এবার ছাড়তে হল, তাকে স্পর্শ করে জল মাথায় ছিটিয়ে—অপবিত্র পবিত্রবা সর্বাবস্থাং গতো পিবা যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্য অভ্যন্তরং সূচী—এই মন্ত্র বলে তাকে আপাততঃ ছাড়লাম এবার ধরলাম সরাসরি উত্তরের পথ। কৈলাসনাথ এখন জেগে উঠেছেন ধরা দিয়েছেন ভক্ত হৃদয়ে তাঁর আকর্ষণে আমি চলতে লাগলাম, তাতে নেই ক্লান্তি নেই কষ্ট। রাস্তাটা এখন উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে অথচ এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। থোকচেনের ওদিক থেকে কোনো এক অজানা পাহাড়ের পেছনে শুরু হয়েছে সূর্যদেবের আগমন প্রস্তুতি । সমস্ত আকাশ নতুন রঙে সেজে উঠছে। তারই ছটা এসে পড়েছে কৈলাস নাথের চূড়ায়, দেমচোগ্ দেবের মাথার চূড়াতে সোনালী রঙ ছোঁয়ানো হচ্ছে সমস্ত জগৎ এখন নিঃশব্দে সেই দিকে তাকিয়ে আছে, শিল্পীর শেষ তুলির আঁচড় পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠবে জগৎ উৎসব, শিব মিশবে সূর্যের সাথে। এ এক অদ্ভূত পরিবেশ, অদ্ভুত আনন্দ, নিঃশব্দের ছন্দে হৃদয় বার বার নেচে উঠছে। প্রতিটি প্রাণী আর আকাশ-বাতাস-জল সবাই এক শুভ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে।
তারপর এল সেই পরম লগ্ন। সূর্যদেব জগৎপিতা উদয় হলেন, . চারিদিকের তুষার শুভ্র পাহাড়ের উপর অপ্সরীরা শুরু করল তাদের অনবদ্য নৃত্য—সেই নৃত্যের সাক্ষী আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । রূপের আনন্দ-রস আমার প্রতিটি রোমকূপের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে লাগল। এ-কি রূপ ! নিঃশব্দের এ-কি ছন্দ। কৈলাসের এ-কি জ্যোতি! তারপর চলল রঙের খেলা—তারই রঙে রঙ লাগিয়ে বিশ্ব সংসার যেন হোলি উৎসবে মেতে উঠল। এই স্বর্গরাজ্যে এই উৎসব চলে প্রতিদিন। দেবতা এখানে রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছেন ভক্ত হৃদয়ে। স্বর্গ থেকে আনন্দের ঝরনা ঝরে পড়ছে এই পৃথিবীর বুকে ।
পরম পিতার প্রতি শ্রদ্ধায় আপনা থেকেই আমার মাথা নত হয়ে এল। এখন বুঝলাম যে কেন বাবা আমাকে শেষ রাতে তুলে এখানে পাঠিয়েছেন। বাবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে আমার জীবন ধন্য হল । প্রচণ্ড শীত কাজেই এবার আমাকে আবার চলতে হল। রাস্তাটা দেখছি ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠতে আরম্ভ করেছে। শুরু হল এবার কৈলাস শিখরে আরোহণ ।
মানস সরোবর ও রাক্ষস সরোবরের উত্তরের দিকে একটা পর্বতশ্রেণী, এই পর্বতশ্রেণী দুটো পাহাড় নিয়ে গঠিত। একটার নাম ‘লা’ আর একটার নাম ‘ঝোং’ তারই মধ্যে যে উচ্চতম শিখর সেটাই হচ্ছে কৈলাস শিখর। সেখানেই আমাকে যেতে হবে । লাংবোনা গুম্ফা থেকে দিরাফুক্ গুম্ফার দূরত্ব ষোল থেকে কুড়ি মাইলের মধ্যে। আমি এরই মধ্যে মনে হয় ছ’সাত মাইল পার হয়ে এসেছি। সূর্যদেব আস্তে আস্তে প্রখর হয়ে উঠছেন এই সময় হাঁটতে বেশ ভাল লাগে। পথের ক্লান্তি আগের মতো নেই। কৈলাস শিখরটা আসলে একটা পাহাড়ের উপর মন্দিরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কৈলাস শিখরে উঠবার কোন প্রশ্নই আসে না, সেটা হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে তারই উপর রয়েছে চির তুষারের গম্বুজ। কৈলাস পরিক্রমা করতে হলে ‘লা’ অথবা ‘ঝোং’ পাহাড়ে উঠতেই হবে,এই দুই পাহাড়ের ঠিক সঙ্গমে গড়ে উঠেছে প্রকৃতি-মন্দির। এর গঠনটাও বড় চমৎকার। ঠিন যেন মন্দির আর তার নীচেই রয়েছে দুটো পবিত্র সরোবর। মানস সরোবরে আছে রজঃগুণ আর রাক্ষস সরোবরে আছে তমোগুণ, তাদের এই দুই গুণের সাথে কৈলাসনাথের সত্ত্বগুণ মিশে তৈরী হয়েছে অমৃতবারি, বিভিন্ন নদীর মাধ্যমে সেই অমৃতধারা গিয়ে পৌঁছচ্ছে মর্ত্যবাসীদের কাছে ।
পাহাড়ের উঁচুতে উঠতেই পেলাম একটা গ্রাম। এই গ্রামটাকে অনেকটা থোচেনের সাথেই তুলনা করা যায়। এগারোটি একতলা বাড়ী রাস্তার দু'পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরবাড়ীগুলো প্রায় ফাঁকা। লাসা থেকে যে রাস্তাটা গ্যাংটক, লাডাক ও কাশ্মীরের দিকে চলে গিয়েছে এইটাই সেই রাস্তা। থোচেনের পর এই রাস্তাটাকেই আমি ছেড়েছিলাম মানস সরোবরে যাবার জন্য। এখানকার উচ্চতা প্রায় ১৫০০ (পনেরো হাজার) ফিট। কয়েকটা গাধা, ইয়াক ও কুকুর একটা বাড়ীর পেছনে নিশ্চিন্ত মনে সহাবস্থান করছিল—কুকুরগুলো আমাকে দেখেই ছুটে এল, কিন্তু আমার তরফ থেকে কোনরকম সাড়া শব্দ না পেয়ে অনেকটা ব্যর্থ মনে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের ধারণাটা এই রকম যে এই ক্লান্ত ছেলেটাকে আর খাটিয়ে লাভ কি ? চৌমাথাতে একটা চায়ের দোকান পেলাম। বলাই বাহুল্য, কৈলাসখণ্ডে এই প্রথম দেখছি চায়ের দোকান । কোনরকমে মাটি-পাথর-কঞ্চি-কাঠ দিয়ে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। দোকানের ভেতরে দু'জন চাদরে সর্বাঙ্গ ঢেকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমিই তাদের উপযাচক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—তারচেন কি এই পথে ?
তারা কোন রকম শব্দ না করে আঙ্গুল দিয়ে সামনের পথ দেখিয়ে দিল। আমিও তাদের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে আবার পথ ধরলাম। পারখা গ্রামের শেষে হঠাৎ নজরে পড়ল একটা বাজার। সেখানেই গ্রামবাসীরা সবাই জড়ো হয়েছে। কৈলাসখণ্ডে মনে হয় এইটাই একমাত্র গ্রাম। আমি তাদের পাশ কাটিয়ে অর্থাৎ কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে এগিয়ে চললাম সরাসরি উত্তরের দিকে। পারখা থেকে আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর পেলাম তারচেন নামে একটা জায়গা। অনেকদিনের পুরোনো একটা কাঠে অস্পষ্ট অক্ষরে হিন্দীতে লেখা রয়েছে ‘কৈলাস নাথ'। তিব্বতে এই প্রথম চোখে পড়ল পথ নির্দেশ। মনে হয় আমারই মতো কোন ভারতীয় তীর্থযাত্রী রাস্তার এই নিশানাটা লিখে রেখেছিল। তার একটু দূরেই নজরে পড়ল তিব্বতী ভাষায় পাথরের উপর লেখা ‘কাং-রিপোচে’। এই তারচেন থেকেই শুরু হয় কৈলাস প্রদক্ষিণ বা পরিক্রমা ।
অবশেষে আমি এসে পৌছলাম দেবাদিদেব মহাদেবের শ্রীচরণে; মনের ভক্তি উজাড় করে দিয়ে বললাম—প্রভু তুমিই কৃপা করে এতদূর আমাকে নিয়ে এসেছো তুমিই বলে দাও আমার পথ—আমি তোমার শ্রীপাদপদ্মে আত্মনিবেদন করছি। এই বলে সাষ্টাঙ্গে দণ্ডি প্রণাম জানালাম প্রভুর উদ্দেশ্যে তারপর মুখ থেকে আপনা হতেই উচ্চারিত হতে লাগলো-
ওম নমঃ শিবায় ওম্ নমঃ শিবায়
ওম নমঃ শিবায় ওম্ নমঃ শিবায়
ওম নমঃ শিবায় ওম্ নমঃ শিবায়
তারচেন স্থানটি কৈলাস শিখর প্রদক্ষিণের শুরু অর্থাৎ এখান থেকে পরিক্রমা শুরু করে সবাই আবার এখানেই আসে। পরিক্রমা তিরিশ-বত্রিশ মাইল, একদিনেই সাধারণ পরিক্রমা সমাপ্ত হয়। দণ্ডিপ্রণামে লাগে প্রায় ষোল থেকে কুড়ি দিনের মতো। পরিক্রমার সময় বিশ্রামের জন্য এবং ধ্যান ও পূজার্চনার জন্য তার চারদিকে পাঁচটা গুম্ফা আছে। দিরাফুক্ গুম্ফা তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তারচেনে একটা মাত্র বাড়ী তার কোন দরজা নেই—আগে নিশ্চয়ই ছিল। যাযাবরদের কয়েকটি তাঁবুকে কেন্দ্র করেই এখানকার জীবন। ছেলে-বুড়ো মিলিয়ে গুণে দেখলাম তারা সংখ্যায় মাত্র ন’জন। সেখানেই জমাট দুধ মাখন আর চলবার মতো একান্ত প্রয়োজনীয় কিছু কিছু জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। এরাই পরিক্রমার জন্য ভাড়া খাটে অথবা সামান্য পয়সার বিনিময়ে গাইড হিসেবে পরিক্রমায় সাহায্য করে।
আমার কেনাকাটার কিছুই নেই আর গাইড ভাড়া করার তো প্রশ্নই আসে না। যাযাবরদের দু’একটা ছেলে আমার কাছে এসে প্রণাম করেই দূরে সরে দাঁড়ালো, কৈলাসনাথের এই পুণ্যভূমিতে যারা বাস করেন তারাও নিশ্চয়ই পুণ্যবান, তাই তাদেরও আমি প্রথামত প্রতিনমস্কার বা আশীর্বাদ না জানিয়ে সরাসরি দণ্ডি প্রণাম বিনিময় করলাম ।
তারচেন থেকে একটা রাস্তা সরাসরি উত্তরের দিকে উঠে গেছে, আর একটা রাস্তা প্রথমে উত্তর-পশ্চিমের দিকে গিয়ে তারপর উত্তর দিকে উঠে গেছে। বাবা এই দ্বিতীয় রাস্তাটি নেবার কথাই বলে দিয়েছেন। তারচেন মানস সরোবর থেকে প্রায় দু'শ ফিট উপরে অর্থাৎ মানস সরোবরের উচ্চতা প্রায় ১৪৯০০ ফিট আর তারচেনের উচ্চতা প্রায় ১৫১০০ ফিট ।
তারচেন থেকে রাক্ষস সরোবর ও মানস সরোবর আর ইহার বিশাল সমতলভূমি অতি পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। মানস ও রাক্ষস সরোবরের আকৃতিটাও এখান থেকে সুন্দরভাবে দেখা যায়। মানস সরোবর গোলাকার আর রাক্ষস সরোবর প্রায় ভগ্ন ত্রিভুজাকৃতির। এখান থেকেই গুরলা মান্ধাতার পর্বতচূড়াগুলোর অনবদ্য রূপ পথিক মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
কিছুদূর যাবার পর পেলাম একটি ঝরনার মতো নদী। নদীর দু'ধারের বরফ তখনও সম্পূর্ণ গলেনি। এই পাহাড়ের নাম অনুসারেই নদীটির নাম লা-চু, চু অর্থাৎ নদী । পেমা ফুক নামক একটা জায়গায় হালকা কাঠের সেতু পার হতেই পেলাম একটা গুম্ফা। কৈলাস পরিক্রমার পথে এটাই প্রথম গুম্ফা। এই ধরনের আরও চারটে গুম্ফা কৈলাসের চারদিকে বৃত্তাকারে ঘিরে রয়েছে। একতলা একটা বাড়ী। বাড়ীটার কাছে যেতেই ভেতর থেকে দু'জন লামা বেরিয়ে এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানালেন, আমিও হেসে তাদের নমস্কার জানালাম। তারা দু'জনেই আমাকে হেসে উৎসাহিত করে এগিয়ে যেতে বললেন, গুম্ফার নাম নীয়াংরি গুম্ফা।
লা-চু নদীকে আমার ডানদিকে রেখে আমি উপরে উঠতে লাগলাম। পাহাড়টা এবার আরও খাড়া হয়ে উঠেছে। মাথার উপর সূর্যদেবের উত্তপ্ত উপস্থিতির জন্য ঠাণ্ডার হাত থেকে আপাততঃ রেহাই পেয়েছি। এখন আমি কৈলাসনাথের পাদপীঠে এসে পৌঁছেছি। পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এই যে কাছে গেলেই তার ব্যক্তিত্ব যায় হারিয়ে। দূর থেকেই তার ব্যাপ্ত সুন্দর রূপটা চোখে পড়ে আর কাছে গেলে সেই বিরাটের এক কণামাত্র পড়ে ধরা। সেই বিরাট আরও হাজার হাজার গুণ বিরাট হয়ে আমাদের মত ছোট্ট মানুষকে করে ফেলে আরও ছোট্ট, আমরা যাই হারিয়ে। কৈলাসনাথের পাদপীঠ স্পর্শ করে আমি তাই হারিয়ে গেছি কৈলাস পাহাড়ের হাজার লক্ষ পাথরের মধ্যে

এখান থেকে কৈলাসনাথের চূড়া দেখতে পাচ্ছি না। ঠিক যেমন মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় না মন্দিরের চূড়া। আমার বাঁদিকেও নজরে পড়ল অনেকগুলো পাহাড়ের চূড়া—সেগুলো এখনও সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা। সেই বরফগুলো সবে মাত্র গলতে শুরু করেছে। ছোট ছোট অসংখ্য ঝিরঝিরে স্রোতস্বিনী মাঝে মাঝে একসাথে মিলে গিয়ে তৈরী করেছে ছোট ছোট খালের মতো জলধারা। ঝরনার আকারে সেগুলিই এদিক ওদিক থেকে বার বার উঁকি মেরে তীর্থযাত্রীকে উৎসাহিত করছে। দৃশ্যটা বড় চমৎকার এ অঞ্চলে কোন গাছপালা নেই কিন্তু পাথর আর বরফের লুকোচুরিতে সৃষ্টি হয়েছে সম্পূর্ণ এক নতুন মায়াজগৎ। চলার কষ্ট আছে কিন্তু এক
স্বর্গীয় অনুভূতিতে সেই কষ্ট পরিণত হচ্ছে আনন্দে। নদীর ধার ধরে ধরে আমি এগিয়ে চলতে লাগলাম ।
অনেকক্ষণ পর আরও একটা গাছের গুঁড়ি পাতা সেতু পার হবার পর নজরে পড়ল একটা বাড়ী। মনে মনে ভাবলাম—এটাই হবে পরিক্রমার দ্বিতীয় গুম্ফা অর্থাৎ দিরাফুক্ গুম্ফা। আমার অনুমান মিথ্যা নয়। আর একটু কাছে যেতেই চোখে পড়ল একটি চোরতেন আর প্রার্থনা পতাকা। উচ্চতা এখন প্রায় ষোল হাজার দু'শ ফিট (১৬২০০ ফিট সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে)। এখান থেকে ঠিক মাথার উপরেই দেখতে পেলাম রূপোলী রঙের গম্বুজ মহাতীর্থ কৈলাস শিখর, তাকে আবার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম জানালাম। তারই ঠিক নীচে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে স্বয়ং মহাদেবের কোলে এসে আশ্রয় পেয়েছি। বিশ্ববিধাতার আশ্রয় পেয়েছি এখন আর ভয় কিসের! এ এক অদ্ভূত অনুভূতি ! এটাই তো আসল স্বস্তি।
দিরাফুক্ গুম্ফার মূল মন্দিরটা খুঁজে পেতে কোন অসুবিধাই হল না। ভেতরে ঢুকেই প্রার্থনা করলাম ভগবান বুদ্ধের মূর্তির সামনে, তারই পাশে রয়েছে ভগবান দেমচোগ (দোমচেক্) আর ভগবতী দোরজে ফাগমোর মূর্তি। কৈলাস অধিপতি ত্রিভুবনেশ্বর ইনিই আমাদের হরপার্বতী। পুরুষ ও প্রকৃতির লিঙ্গাবস্থা—সৃষ্টির আদিকারণ। এই সৃষ্টিকর্তার কৃপা ভিন্ন সৃষ্টি রহস্য জানা অসম্ভব। তাই তিনি তান্ত্রিকদের পরমপূজ্য দেবতা। কাং রিংপোচের অধিশ্বর অধিশ্বরী মূল মন্ত্রস্বরূপ যবযুং। যুগলমিলনের এই রহস্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কুলকুণ্ডলিনীর মূল স্রোত। শিবপার্বতী, হরগৌরী রূপী এই মূর্তিকে ইষ্টমন্ত্র হিসেবে নিয়ে জপ করতে হয়। আর মূর্তির কল্পনারূপ ধরতে হবে মানসপটে, লিঙ্গাবস্থার পরম কারণের উপর ধ্যান করে তারপর হয় সিদ্ধিলাভ। এই সিদ্ধিলাভই মূলাধার চক্রের সাথে সহস্রার মিলন। চার পাপড়ির মূল আধার সং-বং-শং-ষং মিলিত হয় লং মন্ত্রে তারপর আপন তেজে সেই প্রকৃতি শক্তি উঠে যায় শিবশক্তির দিকে, একের পর এক চক্র পার হয়ে সপ্তম চক্রে সে পরিণত হয় ভূমালোকে। এক মিশে যায় অমৃত সমুদ্রে। শক্তিরূপিণী জ্ঞান-প্রজ্ঞাদায়িনী করুণাময়ীকে বার বার আমার অন্তরের ভক্তি নিবেদন করতে লাগলাম ।
হে দেবী, মা—তুমিই মন, তুমি চিদাকাশ, আগুন, জল আর পৃথিবী, তোমা ভিন্ন এ জগতে কিছুই নাই। সব কিছুই তোমার লীলা-সৃষ্টি সেই কারণেই তুমি শিবের আসনে বসে আছ। তুমিই চিত্তস্বরূপ চিদানন্দময়ী এ বিশ্ব সংসারে জ্ঞান শক্তিরূপিণী ৷
প্রার্থনা শেষে আমি বসলাম ধ্যানে। প্রদীপের মৃদু আলোয় মঞ্জুশ্রীর মূর্তিটাই আস্তে আস্তে আমার হৃদয় অধিকার করে বসল। ধ্যান ভাঙার পর আমি মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বেলা তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। আমি কাউকে দেখতে না পেয়ে গুম্ফার চারিদিকে ঘুরতে আরম্ভ করলাম। গুম্ফাটাকে একটা বিরাট দোতলা বাড়ী বলা যেতে পারে। বাড়ীটার পেছন দিকে যেতেই শুনতে পেলাম কথাবার্তা। সেই শব্দ অনুসরণ করে আমি একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। তারপর দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি

মেরে দেখতে পেলাম কয়েকজন লামা একসাথে বসে কথাবার্তা বলছেন। দেখে মনে হল যে কোন বিতর্কের জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছেন।
আমাকে কিছু বলতে হল না, একজন আগন্তুক দেখে তারাই আমার সামনে এসে একে-একে হাজির হলেন। আমি তাদের প্রণাম করে ঝোলা থেকে জ্ঞানীগুরুর লেখা চিঠিটা বার করে দিলাম। চিঠিটা এহাত ওহাত করে শেষে বয়স্ক একজন লামার হাতে গিয়ে পড়ল। তার মাথার টুপী দেখেই বুঝলাম যে তিনিই সম্ভবতঃ দিরাফুক্ গুম্ফার অধ্যক্ষ। বেশ ঘি দুধ খাওয়া চেহারা, চর্বির চাপে মনে হয় শরীরটা আসনের মধ্যে থেঁতলে বসে গেছে। আমার চিঠিটা তিনি বারবার পড়লেন তারপর সেটাকে উল্টে পাল্টে দেখলেন। চিঠিটার মধ্যে কি লেখা ছিল আমি জানি না কিন্তু অধ্যক্ষ মহাশয়ের ভাবটা দেখে মনে হল যে তিনি চিঠিটার সারমর্ম বিশ্বাস করেও যেন করতে পারছেন না। আমি মৌনী-ত্রাবা হয়েই সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ভেবেছিলাম তিনি হয়তো আমাকে আদর করে বহুদূরের এই গরীব তীর্থযাত্রীটাকে বসিয়ে খাইয়ে তারপর থাকতে বলবেন। তিনি চিঠিটা পড়ে আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার ভান করলেন। তার ভাব দেখে আমি খানিকটা জব্দ হয়ে গেলাম, নিরুৎসাহিত তো বটেই। প্রভু কৈলাসনাথ দর্শনে মনে যে মহানন্দের বিপ্লব বইছিল সেটাও যেন হঠাৎ ধাক্কা খেল ৷
আমার চারিদিকে একুশজন লামা রয়েছেন তারা সকলেই দেখতে তরুণ ও যুবক। তাদের তরফ থেকে কোনরকম সাড়া না পেয়ে আমি নিজেই ইশারায় উপাযাচক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- -খুব খিদে পেয়েছে কিছু ভিক্ষা পাওয়া যাবে কি? আর একটু বিশ্রামও দরকার। আমার কথাগুলো না বুঝার কোন কারণই নেই তবুও তারা যেন কোন এক অজ্ঞাত কারণে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের মনোভাবটা বুঝা মুশকিল । এই অসময়ে তাদের মধ্যে এসে আমি যেন খুব অপরাধ করে ফেলেছি। অগত্যা কোন উপায় না পেয়ে বিশ্রামের জন্য আবার ঢুকে পড়লাম মন্দিরে। মন্দিরের গদিতে বসে অন্ততঃ বিশ্রাম করা যেতে পারে। মনে মনে ভাবলাম, হয়তো উপোস করেই সবাই কৈলাস পরিক্রমা করেন তাই হয়তো আমাকে এঁরা ব্রতচ্যুত করতে চান না ।
দিরাফুক্ গুম্ফার এই মন্দিরটাকে আমি মন্দির না বলে বলবো একটা পাঠাগার ও ছাপাখানা। একদিকে ঠাকুর-বেদী, শ'খানেক ঘিয়ের প্রদীপ, মূর্তি, আর পূজার আসবাব পত্রে ভর্তি, তারই সামনে পুরোহিত ও ভক্তদের গদি আর অন্যদিকে দেয়ালগুলো সারি সারি বই ও ছাপাখানার সরঞ্জামে ভর্তি। ছাপাখানা বলতে সবই হাতেরই ছাপার জন্য, কাঠ কালি ও ভারী কাগজে ভর্তি। দেয়ালগুলো সব ভারী কাঠের চারকোনাচে খোপে ভর্তি। সেগুলো সবই ভারী ভারী বইয়ে ভর্তি। প্রত্যেকটা বইয়ের সামনে নাম লেখা কাপড় ঝুলছে। অবলোকিতেশ্বর, মঞ্জুশ্রী ও যবযুং-এর মূর্তিগুলোর কাঁধে অসংখ্য কাঁথার চাপে মুখগুলো প্রায় ঢাকা পড়েছে। প্রদীপটাকে দেখেই মনে হচ্ছে হাজার বছরের পুরনো। স্বর্গে যাবার সময় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মনে হয় এই প্রদীপের আলোতেই ধ্যানস্থ হয়েছিলেন। কেদারনাথের প্রদীপকে এর তুলনায় নতুনই বলবো। মন্দিরের প্রত্যেকটি থামের সাথে ঝুলছে অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য করা তাংখা। তার অধিকাংশই কৈলাসনাথ মানস সরোবরের বিভিন্ন কল্পিত রূপ, মণ্ডলা আর দেমচোগ্-এর মহিমা গাঁথা। পরিবেশটা খুবই রহস্যময়। আমি ঘুরে ঘুরে এসব দেখছি এমন সময় দরজা দিয়ে এক-এক করে কয়েকজন লামা এসে আমার পাশে জড়ো হতে লাগলেন। তাদের এই নির্বাক ও নিঃশব্দ আগমনে একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। পরে বুঝলাম যে তাদের উদ্দেশ্য মহৎই, তারা সকলেই আমার সাথে পরিচিত হতে চান। নিঃশব্দেই আমরা দৃষ্টিবিনিময়ের মাধ্যমে মনের ভাব আদান-প্রদান করতে লাগলাম ।
পরে তাদেরই ইশারায় আমি বাইরে এলাম। তারপর তাদের পিছন পিছন এসে হাজির হলাম রান্নাঘরে। সেখানে উনোনের সামনে আরও দু'জন লামা বসেছিলেন। আমাকে তারা অতি আদরে হাসিমুখে উনোনের ধারে বসিয়ে খেতে দিলেন। মনে হল তারা যেন আমার আপনজন, বেশভূষায়ই বুঝতে পারলাম যে তারা সাধারণ লামা। দিরাফুক গুফায় একমাত্র এই দু'জন লামারই হাসিমুখ। বাকি সকলের মুখ মনে হয় তপস্যার আগুনে শুকিয়ে গিয়েছে। এখানেই আমি অনেকদিন পর পেলাম ভাত ও শুকনো মাংসের ঝোল। পেট ভরে খেলাম। সন্ধ্যার অনেক আগেই লামারা প্রার্থনা শেষে খেতে বসে গেলেন। আমি রান্নাঘরেরই এক কোণে বেশ গরম পেয়ে কম্বলটা বিছিয়ে বসে পড়লাম। একমাত্র মন্দির ছাড়া রাত্রিবেলা কেউ আলো জ্বালে না তাতে আলোর খরচ বাঁচে আর অন্যদিকে শরীরের পক্ষেও ভাল। আমি শেষ বেলায় খেয়েছি বলে দ্বিতীয়বার আর খেলাম না ।
সন্ধ্যের পর দিনের আলো থাকতে থাকতেই যে যার ঘরে চলে গেলেন। অধ্যক্ষ লামাকে আর দেখতে পেলাম না। অবশ্য তাঁর দর্শনের জন্য আমিও কোনরকম চেষ্টা করিনি। একই দিনে আমি অনেকখানি দূরত্বে এসে পড়েছি, তাই আমিও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আগুন আর আশ্রয় পেয়ে কম্বলটার মধ্যে নিজেকে আড়াইপাক জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম।
উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে শোবার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। ভোর বেলা লামাদের খক্খক্ করে কাশি সবে শুরু হয়েছে মাত্র। আমি তাড়াতাড়ি উঠে তৈরী হয়ে পড়লাম। মন্দিরে ঢুকে প্রার্থনা সেরে তারপর বেরিয়ে পড়লাম পরিক্রমার জন্য। বাবা আমাকে পথের নিশানা বলে দিয়েছিলেন কাজেই অসুবিধার কোন কারণই নেই, দিরাফুক্ গুম্ফা থেকে একটা রাস্তা লা নদীর ধার ধরে সরাসরি উত্তর দিকে সিন্ধুনদীর উৎসের দিকে চলে গিয়েছে। আর একটা রাস্তা নদী পার হয়ে কৈলাসনাথের চারদিকে ঘুরে আবার এসে পড়েছে তারচেনে। দিরাফুক্ গুম্ফা থেকে এই দুটো মাত্র রাস্তা আছে কাজেই হারাবার কোন সম্ভাবনা নেই ৷ আমি নদী পার হয়ে পূর্বদিকে এগুতে লাগলাম। পাহাড়ী রাস্তা এখানে এখনও বরফ সম্পূর্ণ গলেনি, কাজেই পাথর আর বরফের মধ্য দিয়েই কোন রকমে পা ফেলে এগিয়ে চলেছি। শীত যে কত রুক্ষ হতে পারে তা এপথে যারা না এসেছেন তাদের বলে বা লিখে বুঝানো মুশকিল।
এবার রাস্তাটা ক্রমাগত উপরের দিকে উঠতে লাগল । এখন প্রায় চারদিকেই বরফের রাজত্ব। সাদার উপর সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মতো আর নুনের পাহাড়ের মতো বরফের ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ভাগ্যিস তিব্বতীরা আমাকে তাদের একজোড়া জুতো দিয়েছিল নয়তো শীতে এখানেই আমার দেহটাকে রেখে যেতে হত । রাস্তা নামে মাত্র, এখন চারদিকেই বরফে ঢাকা। সাদায় সাদা, একটা গাছ বা তৃণখণ্ডও নেই। ভোরের আলো এখন বেশ পরিষ্কার হয়ে দেখা দিয়েছে, তবে সূর্যের আলো বা সূর্যোদয়ের কোন আভাস পাচ্ছি না। আমার সামনেই আর একটা ছোট পাহাড় সেটার ওপর দিয়েই রাস্তাটা এগিয়ে গিয়েছে। এই পাহাড়টাই সূর্যকে আড়াল করে রেখেছে। এখান থেকে কৈলাস শিখরও দেখা যাচ্ছে না কারণ এই রাস্তা আর কৈলাস শিখরের মাঝখানেও কয়েকটি পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তিব্বতের পথে এই প্রথম বরফের উপর দিয়ে হাঁটছি। এই বরফগুলো পেঁজা তুলোর মতো নয়, পেঁজা তুলোর মতো আকাশ থেকে পড়ে ঠাণ্ডায় জমে গেছে । শূন্য ডিগ্রিতে বাতাস ঘনীভূত হয়ে তুষারাকারে মাটিতে পড়ে কিন্তু তার থেকেও বেশী ঠাণ্ডায় সেগুলো জমে গিয়ে শক্ত পাথরে পরিণত হয়েছে। আমাকে অতি সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। পাথরের উপর শেওলা জমে এমন পিচ্ছিল হয়েছে যে একটু বেকায়দায় পড়লেই এখান থেকে পড়ে গিয়ে জীবননাশের ভয়।
যেহেতু রাস্তা ক্রমশঃ উপরের দিকে গিয়েছে তাই আমি অতি সাবধানে হাঁটছি কিন্তু তা সত্ত্বেও হাঁপিয়ে উঠেছি। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর উপস্থিত হলাম পাহাড়ের সর্বোচ্চাংশে। উঠেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, এখান থেকে আবার পেলাম চারিদিকের মনোরম দৃশ্য। আমার ডানদিকে কৈলাস শিখর, সামনে মানস ও রাক্ষস সরোবর। কৈলাস শিখর আর সরোবরের মাঝামাঝি দূরত্বে নেতেন পাহাড়। এই ছোট্ট পাহাড়টাকেই শিবভক্তরা বলেন শিবের ষাঁড়, আবার কারও মতে নন্দী। তিব্বতীরা বলে ইয়েলাক্ জুং। সূর্যদেবের দেখা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সূর্যদেবের অবস্থান দেখেই বুঝতে পারলাম যে, অনেকক্ষণ আগেই তিনি উদয় হয়েছেন। কৈলাস পরিক্রমার এটাই সর্বোচ্চ অংশ। স্থানটির নাম দোলমা-লা ১৮,৬০০ (আঠার হাজার ছ’শ) ফুট উঁচু। এবার আর কষ্টের কোন কারণই নেই। দোলমা-লা থেকেই ডানদিকে দেখতে পেলাম গৌরীকুণ্ড। ছোট্ট একটা হ্রদ। দোলমা-লা থেকে যদিও এটাকে খুব কাছে মনে হয় কিন্তু এর দূরত্ব প্রায় মাইলখানেক। গৌরীকুণ্ডে কোন নদী এসে পড়েনি আর এখান থেকে কোন নদীও শুরু হয়নি। পাহাড়ের মাঝখানে বরফ পড়ে সেগুলোই জমে আছে।
আমি রাস্তা ছেড়ে অতি সন্তর্পণে গৌরীকুণ্ডে এগিয়ে এলাম। জলস্পর্শ করতে গিয়ে হাত ঠেকল বরফে। জলটা জমে কাঁচের মত স্বচ্ছ হয়ে আছে। আমার কাছে এটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। ঠাণ্ডায় জল জমে যায় শুনেছি কিন্তু শুনা বা বইয়ে পড়া আর নিজের চোখে দেখে ছুঁয়ে অনুভব করা সম্পূর্ণ আলাদা। আমার কাছে এটা একটা নতুন খেলা। প্রথমে ছুঁয়ে দেখলাম যে জলটা স্থির ও কঠিন, কয়েকটা পাথর কুড়িয়ে জলে ফেলে দেখলাম যে তাতেও ভাঙল না পাথরগুলো হ্রদের উপরেই গড়িয়ে পড়ল। তারপর অনেক সন্তর্পণে তাতে পা দিয়ে দেখলাম আমার ভার সে সহ্য করতে পারে কি না, এইভাবে নানা পরীক্ষা করে শেষে হ্রদের উপরে এসে দাঁড়ালাম। এই নতুন অভিজ্ঞতায় মনটা আনন্দে নেচে উঠল। এবার শুরু করলাম তার উপর দিয়ে হাঁটা। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি একটা পরিপূর্ণ হ্রদের উপর দিয়ে হাঁটছি। প্রকৃতির লীলা কি অদ্ভুত ! এক অলৌকিক শক্তির পরিচয়।
মনের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভূত আনন্দ, আর তার সাথে সাথে সামান্য উৎকণ্ঠা। যে যাদুবলে জলটা হঠাৎ এমন জমে গিয়েছে সেই যাদুতেই যদি এখন হঠাৎ জলগুলো তার নিজ তরল রূপ ধারণ করে তাহলে আমার অবস্থা আর দেখতে হবে না। এই গৌরীকুণ্ডের মাঝখানেই হবে আমার শেষ অধ্যায়। যদি তাই হয় তাহলে ক্ষতি কি ? এই মহাতীর্থে মৃত্যু মানে নিশ্চয়ই অমরত্ব প্রাপ্তি। যুক্তি দিয়ে আমার সেই উৎকণ্ঠাকে দূর করে দিলাম। হ্রদের মাঝখান থেকেই দেখতে পেলাম আভ্যন্তরীণ দৃশ্য। জলের নীচে কিছু শেওলা জাতীয় গাছ আর পাথরের স্তর। মাঝে মাঝে রয়েছে আটকে যাওয়া বুদ্, সেগুলো হীরকখণ্ডের মতো যেন শূন্যের উপর ভাসছে। হ্রদের উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কয়েকবার আছাড় খেতে হল। ভাগ্য ভালো যে কম্বল আর চাদরের জন্য দেহটা সরাসরি শক্ত বরফের উপর পড়েনি নয়তো হাত বা পা ভেঙে এখানেই পড়ে থাকতে হত। বরফের উপর দিয়ে এই চলাকে অনেকটা পুকুরের জলে শেওলা পড়া সিঁড়ির সাথে তুলনা করতে পারি। অতি সাবধানে আমাকে চলতে হচ্ছে, একটু অসাবধান হলেই পিছলে পড়ার ভয়। ভাগ্য ভালো এই হ্রদটা মোটেই মানস সরোবরের মতো বিরাট নয়—প্রায় আধঘণ্টার মধ্যেই আমি পার হয়ে গেলাম ওপারে। তীরে উঠে বার বার তাকিয়ে দেখতে লাগলাম এই গৌরীকুণ্ড। আমি একটা পূর্ণ সরোবরের উপর দিয়ে হেঁটে পার হলাম অথচ একবিন্দু জলও আমাকে স্পর্শ করল না ; কথাটা ভাবতেও আশ্চর্য লাগছে, অবিশ্বাস্য সত্য। এই অভিজ্ঞতাকে আরও স্থায়ী করবার জন্য আমি আবার হেঁটেই পার হয়ে এলাম তার উত্তর দিকে অর্থাৎ যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানেই আবার এসে হাজির হলাম। কৈলাস পরিক্রমায় এটাই বলবো আমার সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা। নতুন অভিজ্ঞতা যদি আনন্দের হয় তা আনে প্রেরণা আমি সেই প্রেরণাতেই আবার পরিক্রমার রাস্তা ধরলাম ।
গৌরীকুণ্ডের পরই শুরু হল ছোট ছোট ঝরণার রাজত্ব, পাহাড় থেকে এখন অনেক নীচে নেমে এসেছি, উত্তাপে এখানকার বরফগুলো সবে গলতে শুরু করেছে। কানের কাছে এখন শুরু হল শব্দতরঙ্গের রাজত্ব। তারও অনেক পর পেলাম একটা পাহাড়ী নদী—এটাই ‘ঝোং’ নদী। এই ঝোং নদীটা কালীঘাটের আদিগঙ্গার থেকেও ছোট, কাজেই পারাপার হতে বিপদের ঝুঁকিটা কম। সেখানে একটা যাযাবরদের তাঁবু দেখতে পেলাম, দেখতে পেলাম বললে ভুল হবে ওরাই আমাকে দেখতে পেল। তিনটি ছেলেমেয়ে আমাকে দেখে ছুটে এসে জিভ বার করে রাস্তার উপর এসে দাঁড়ালো, আমি তাদের মাথা ছুঁয়ে একটু আদরের ভঙ্গিতে প্রত্যুত্তর দিলাম । তারাই আমাকে প্রায় জোর করে তাদের তাঁবুতে টেনে নিয়ে গেল। ছেলে দুটির বয়স দশ বারো হবে, আর মেয়েটির বয়স আরও কম। তাঁবুর কাছে আসতেই তাদের অভিভাবক আমার কাছে ছুটে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানালো। আমি একটু অবাক হলাম বটে কারণ তিব্বতীরা সাধারণতঃ জিভ বার করেই প্রণাম করে থাকে। মনে হয় এখানে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জন্য তারা এই অভ্যাসটা গ্রহণ করেছে। তাঁবুর ভেতরে ঢুকলাম—তাঁবুটা ভারী ত্রিপলের টানা চাদর। বিচুলির কয়েকটা গদী আর প্রচুর পরিমাণে উল। উলগুলো দেখেই মনে হয় ভেড়া থেকে সদ্য কাটা হয়েছে।
আমাকে তারা প্রায় জলের দরে কয়েকটা জিনিস বিক্রী করতে চাইল আমি ইশারা তাদের বুঝিয়ে দিলাম যে আমার কিছুই দরকার নেই। পশমের পোশাক বিক্রী করতে না পেরে কয়েকটা কৌটো খুলে দেখাতে লাগল সেই অঞ্চলের কিছু মূল্যবান পাথর । দুর্ভাগ্যের বিষয় যে পাথরগুলো যত সস্তাই হোক না কেন তা কিনবার মতো পয়সা আমার নেই। কিন্তু তাতেও তারা নিরস্ত হল না। একটা পুরনো কাঠের বাক্স বের করে তার ভিতর থেকে বার করে দেখাতে লাগল সে অঞ্চলের কিছু কিছু ধন্বন্তরী ওষুধের নমুনা ৷
আমি ইশারায় তাদের থামিয়ে দিলাম, শেষে বুঝিয়ে বললাম যে তারা যদি আমাকে এক বাটি গরম দুধ, চা বা কিছু খাবার দিতে পারে তা হলেই আমি খুশী হব। এই বলে তাদের হাতে দু’আনা পয়সা দিলাম। ভদ্রমহিলা পয়সা পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে তাঁবুর কোণে রাখা একটা বাটি 'থেকে জমাট দুধের কতগুলো টুকরো হাতে দিলেন, তারপর বুঝিয়ে দিলেন যে আমাকে দেবার মতো অন্য কিছু তাদের নেই। খিদের সময় এটাই যথেষ্ট। এখান থেকে মানস সরোবর ও রাক্ষসতাল মনে হচ্ছে খুবই কাছে। ঝোং চু'র ধার ধরেই এগিয়ে চলতে লাগলাম। সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে সেই সময় এসে পৌছলাম জুথুলফুক্ গুম্ফায় ।
বাইরের চোরতেন ঘুরে প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে দরজায় আঘাত করতে যাবো এমন সময় পাশের একটা ঘর খুলে একজন লামা বেরিয়ে এসে আমাকে হাসিমুখে বরণ করলেন। তিনি বয়স্ক ও বিজ্ঞ দেখেই মনে ভক্তির উদয় হয়। দিরাফুক্ গুল্ফার লামাকে দেখে আমার মোটেই ভালো লাগেনি কিন্তু এখানকার লামাকে দেখেই মনে হল তিনি দেবতুল্য। বয়স কম করেও পঞ্চাশোধের। হাসিমুখে তিনি আমাকে সরাসরি তাঁর পূজোর ঘরে নিয়ে গিয়ে তুললেন। সেখানে প্রার্থনা করে আমরা এসে হাজির হলাম রান্নাঘরে। সেখানে আরও দু'জন তিব্বতী লোক বসে আগুন পোয়াচ্ছিল—আমাকে দেখেই তারা উঠে দাঁড়ালেন। আমার হাব-ভাব দেখেই তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে আমি মৌনী, কোন রকম ভণিতা না করেই তাঁরা এক বাটি সাম্পা গরম করে আমাকে খেতে দিলেন—আমি তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাটিতে চুমুক দিলাম। মানুষের মধ্যে যে দেবাত্মা আছে তাকে আমরা যাচাই না করেও জানতে পারি। জুথুলফুক্ গুম্ফার বড় লামার দর্শন মাত্রেই মনে হয় দেব দর্শন করলাম। তাঁর মিষ্টি মুখ আর ব্যক্তিত্বের মধ্যে ফুটে রয়েছে হিমালয়ের মহিমা। এই গুম্ফায় পদার্পণের সাথে সাথেই এই মহাপুরুষটি নিঃশব্দে আমাকে আশীর্বাদ করে ঘরে বসিয়েছেন, তারপর খাইয়ে আবার আশীর্বাদ করে রাস্তার শুভযাত্রা কামনা করে আমাকে উৎসাহিত করেছেন ৷ না চাইতেই তিনি সব দিয়েছেন, আমি পেলাম সব কিন্তু তাঁকে আমি দিতে পারলাম কি আমার প্রাণ উজার করা ভক্তি ?
জুথুলফুক্ থেকে তীর্থযাত্রীরা যান তারচেনের ধর্মশালায়। সেখানেই কৈলাস পরিক্রমার সমাপ্তি-প্রার্থনা করে পূজা করেন। বাবা আমাকে যেতে বলেছেন সরাসরি পারখায় সেখানেই তাঁর সাথে দেখা হবে। তাই আমি ধরলাম পারখা বা তাসামের পথ, বিকেলের আগেই পৌঁছলাম পারখার চৌরাস্তায়। সেখান থেকে কৈলাস শিখরের দিকে চেয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করে নদীর জল মাথায় ছিটিয়ে কৈলাস পরিক্রমার সমাপ্তি ঘোষণা করলাম ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন