বিমল দে
স্রোং-সান্-গাম্পো পরিণত করেন তার প্রাসাদে। লাসার শাসন কার্যের জন্য আশপাশের গুম্ফা থেকে লামাদের নিযুক্ত করা হয়। দ্রেপুং, সেরা এবং গানদেন এই তিনটি গুম্ফাই বলতে গেলে লাসার মালিক। আগের লামা-প্রধান অর্থাৎ দালাই লামা ও নির্বাচিত করা হত এই সব গুম্ফা থেকে ।
লাসা বড় আজব শহর। সকালবেলা ধর্মশালার জানালা দিয়ে লাসা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। মনে হল আজব শহরে এসে পড়েছি। এখানকার অধিকাংশ বাড়ীঘরই প্যাগোডা ধরনের। চীন বা জাপানের ছবিতে এই রকমই দেখেছি। আর সেই সব বাড়ীগুলোর মাঝে মাঝে বেখাপ্পা ধরনের আধুনিক বাড়ী। শহরের প্রধান আকর্ষণ বাজার। সেখানেই লুকিয়ে আছে শহরের প্রাণ। এখানে তীর্থযাত্রীরা সবাই স্বাধীন, যে যেখানে খুশী যেতে পারেন, যার যা খুশী করতে পারেন, সকলেই মুক্ত ।
ভোরবেলা আমাদের সঙ্গী লামারা একে-একে সবাই উঠে মন্দিরের দিকে চলে গেলেন, আমি গুরুজীর সাথেই রইলাম। যদিও আমি তীর্থ করতে এসেছি তবুও যতটা সম্ভব শহরটাকে ভালোভাবে দেখাই আমার উদ্দেশ্য। রাজপ্রাসাদ পোতালাকে কিছুতেই এড়ানো যাবে না। শহরের যেখানেই যাওয়া যাক না কেন সেটা চোখে পড়বেই। শহরের বাইরে থেকে জোখাং মন্দিরের ছাদগুলো খুব ভালোভাবে নজরে পড়ে কিন্তু শহরের ভেতর থেকে তার কিছুই দেখা যায় না। আর রাস্তা না জানা থাকলে সেখানে যাওয়াও মুশকিল। কালিম্পং-এর বাজারের প্রায় চারগুণ বড়, তবে বাজারের গলিগুলো খুবই নোংরা। তুলো আর পশমের বাজারটা বিশেষ আকর্ষণীয়। ভেড়ার লোমগুলোকে বড় বড় বস্তায় করে রাস্তার ধারেই রাখা হয়েছে ঠিক তুলোর মতো। নানা রকমের পশমের তৈরী জামা কাপড়ের দোকানগুলোয় লোকে জম-জমাট। উলের মোজা, সোয়েটার, টুপী এখানে খুবই সস্তায় বিক্রি হয়। বাজারের এক অংশে পাইকারী আর অপর অংশে খুচরো বাজার। খুচরো বাজারের দোকানদাররা অধিকাংশই মহিলা, তারা খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সুন্দরভাবে চুল বাঁধা, পোশাকেও পরিষ্কার ৷ রাস্তায় চলতে চলতে প্রায় কানে আসে মেয়েদের মনখোলা হাসির শব্দ। সবজির বাজারটা খুবই শুকনো। শাক-সবজি সবে হতে শুরু করেছে। বরফের পরেই জমিতে লাঙ্গল পড়েছে মাত্র, ফসল উঠতে এখনও মাসখানেক লাগবে। কিছু পাহাড়ি শাক, আলু, টমাটো-স্কোয়াশ আর ছোট ছোট তেলাকুচোর মতো কিছু সবজি চোখে পড়ল। সিকিম বা কালিম্পং থেকে আগে কিছু কিছু শাক সবজি আসতো এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। আজকাল বাজারের অবস্থা মোটেই সুবিধার নয়। সীমান্তের কড়াকড়ি দিন-দিন বেড়েই চলেছে। ভারতের সঙ্গেই ছিল এদের মূল কারবার সেই কারবার, এখন উঠে গেছে। পশমের আশীভাগই বিক্রি হত কলকাতার ব্যবসায়ীদের কাছে, সেটাও আজকাল বন্ধ হয়ে গেছে। সম্প্রতি পিকিং-এর ব্যবসায়ীরা এখানে যাতায়াত শুরু করেছে খুব শীগগীরই মনে হয় তারাই এ বাজারের দখলদার হয়ে যাবে। তিব্বতী লামারা প্রাণিহত্যা করে না, কিন্তু মাংস খেতে আপত্তি নেই, কাজেই শুকনো মাংস ও মাছের বাজারটাও বেশ উল্লেখযোগ্য। সাধারণতঃ গ্রামবাসীরাই শুকনো মাছের থলি নিয়ে বসে। কী-চু নদী হতে টাটকা মাছও স্থানীয় লোকেরা এখানে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। সাধারণ তিব্বতীদের মাছ মাংসই মনে হয় প্রধান উপাদেয় খাদ্য । য মদ্রোক হ্রদ ও সাংপো নদী হতেও প্রচুর পরিমাণে (শুকনো) মাছ আসে । যানবাহন সমস্যার জন্য তিব্বতে টাটকা জিনিসের খুবই অভাব। স্থানীয় ফসলের উপরই ভরসা করে থাকতে হয়। বলাই বাহুল্য, তিব্বতের এই দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলেই মাত্র ভালো ফসল ফলে। এই অঞ্চলটা অপেক্ষাকৃত উচ্চতায় কম আর উপত্যকাটাতেও অনেক সমতল ভূমি আছে। শীতের প্রকোপও এখানে অপেক্ষাকৃত কম। চাষের উপযোগী আবহাওয়ার দরুন এই অঞ্চলেই লোকসংখ্যা প্রচুর। তিব্বতের প্রায় সত্তরভাগ লোক বাস করে এই কী-চু নদীর দু'পাশে ।
আমরা এবারে এলাম মুদীখানার গলিতে। সেখানে চাল-ডাল-যব-গম-বার্লি তার এক বিরাট সম্ভার। ডালের মধ্যে মুগ মটরই প্রধান। ছাতু ও বিভিন্ন ধরনের বার্লি দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমরা পাচসের চাল কিনলাম দু'টাকা দিয়ে। কৌটো মেপে চালটাকে আমাদের চাদরে ঢেলে দিল, আর তীর্থযাত্রী বলে ফাউ হিসেবে পেলাম আরও প্রায় একসের চাল। তারপর আড়াই সের মুগ ডাল কিনলাম দশ আনা দিয়ে। কলকাতার তুলনায় সস্তাই বটে, বাজারে অসংখ্য দোকান, কিন্তু খোলাবাজারের ফেরীওয়ালাদেরও সংখ্যা প্রচুর। চমরী গরুর শুকনো দুধ এখানকার আর এক উল্লেখযোগ্য ব্যবসা। চকোলেটের মতো ছোট ছোট করে কেটে সেগুলো সের দরে অথবা ডজন ভাগে বিক্রি করা হয়। বাজারের শেষের দিকে লাসা গেটের কাছে আর একটা জিনিস নজরে পড়ল। ভিখিরিরা ভাগে ভাগে পয়সা বিক্রি করছে, ভারতীয় পয়সা দিয়ে খুব সস্তায় তিব্বতী পয়সা কিনতে পাওয়া যায়। তীর্থযাত্রীরা ভিখিরিদের দেবার জন্য এই সব খুচরো পয়সা কিনে থাকে। ঠিক যেমন দেখেছি রামেশ্বরম-এর ঘাটে। বাজারের চায়ের দোকানে এই প্রথম নজরে পড়ল তেলেভাজা, অনেকটা পিঁয়াজী সিঙ্গারা ধরনের। রুটি, বিস্কুট, তরকারি, ডাল, রাস্তার ধারেই বিক্রি হয়, ভাষা না জানলেও কিনতে কোনো অসুবিধা হয় না। তিব্বতী চা, আর মদের দোকানের তো ছড়াছড়ি। ফলের মধ্যে কমলালেবু, ন্যাসপাতি আর আপেল প্রচুর পরিমাণে লাসার আশপাশেই জন্মায় তাই এই ফলগুলো বাইরে থেকে আনতে হয় না। মন্দিরের জন্য ছোট ছোট তাংখা, গামছা, ছোট চাদর আর প্রার্থনা পতাকার সারি সারি রঙ বেরঙের দোকান আছে। এ ছাড়াও রয়েছে পূজোর সরঞ্জামের দোকান, সেখানে ঘন্টা, ডমরু ভেরী, ও নানা ধরনের লামা ও পুরোহিতদের পোশাক পাওয়া যায়। মন্দিরে ফুলের প্ৰচলন নেই ।
বাজারের পাশেই রয়েছে প্যারেড-গ্রাউণ্ড। লাসার পুলিশবাহিনী এখানেই জমায়েত হয়, আর বড় বড় অনুষ্ঠানগুলোও এখানেই হয় ।
ঘরবাড়ীগুলোর অধিকাংশই অতি সুন্দরভাবে রঙ করা। সম্ভ্রান্ত বাড়ীগুলোর ছাদগুলো প্যাগোডা ধরনের আর ঢেউ তোলা ছাদের শেষের দিকে উজ্জ্বল ড্রাগন মূর্তিগুলো মনে হচ্ছে লাসা শহরের জাগ্রত প্রহরী। লাসা শহরে চীনের প্রভাবকে কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যাবে না, সম্ভ্রম রেষ্টুরেন্টগুলোতে চীনা মেনুতে ভর্তি, খাওয়া দাওয়ার স্টাইলও চীনাঘেঁষা। সেখানে চামচের পরিবর্তে কাঠি দিয়ে খাওয়াতেই লোকে অভ্যস্ত। কলকাতায় যেমন বিলিতি ধরনের রেস্টুরেন্টে খাওয়াটা উন্নত আভিজাত্যের প্রমাণ, তিব্বতীয়দের চীনা খাদ্য গ্রহণও অনেকটা সেই ধরনের । চীনা খাদ্য, বাসন, ও ঘরের সাজসজ্জার জন্য চীনদেশীয় ডেকোরেশন করা উন্নত রুচির পরিচয়। বাজারের অনেক সম্ভ্রান্ত দোকান চীনদেশীয় জিনিসপত্রে ভর্তি, অনেকটা কলকাতারর নিউ মার্কেটের মতো। ছোট্ট একটা চীনা মার্কেটও আছে। সেখানে লাসার সুন্দরীরা চাকরদের নিয়ে আসে মার্কেটিং করতে। সেই বাজার চীনা সামগ্রীতে ভর্তি ।
লাসা শহরটা খুব বড় নয়। দৈর্ঘ্যেও-প্রস্থে দু’মাইলের বেশী নয়। শহরের উত্তর দিকে পোতালা প্রাসাদ—দক্ষিণে নদী পশ্চিমে দ্রেপুং গুম্ফা আর পূর্বে নরবুলিংকা অর্থাৎ চেন্-রে-জির গ্রীষ্মাবাস-প্রাসাদ। দ্বিতীয় দিন আমরা সবাই মিলে আবার গেলাম মূল মন্দিরে সন্ধ্যারতি ও সমবেত প্রার্থনার জন্য। জোখাং-এর সমবেত প্রার্থনার সুর আমাদের কাছে নতুন, সে প্রার্থনা যদি সারারাত ধরে শোনা যায় তাহলেও আমরা ক্লান্ত হব না। পৃথিবীর এই পর্বতচূড়ায় সম্পূর্ণ মানব জাতির এটাই বোধ হয় শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন