ভাষা

বিমল দে

আমি ইতিমধ্যে কিছু কিছু তিব্বতী শব্দ আয়ত্ত করে ফেলেছি, ধীরে ধীরে বললে এদের কথা বুঝতেও পারি। সবচেয়ে ভালো লাগে এদের প্রার্থনা, এদের ছন্দটা ঠিক যেন পাহাড়ের মতো উঁচু নিচু। কণ্ঠের সুর বলতে খুব বেশী নেই, গদ্যটাকে ছন্দের 'আকারে এরা পরিবেশন করে। মনের ভাব আর আন্তরিকতা দিয়ে গদ্যটাই পদ্যের মতো প্রকাশিত হয়। আমার শোনা বারণ নেই কাজেই সব সময়ই তাদের কথা শুনছি— মৌনীবাবার বলতে বারণ, তাই ইচ্ছে থাকলেও অভ্যাসের সুযোগ নেই।

প্রত্যেকটা শব্দকে এরা কেটে দু'ভাগ করে উচ্চারণ করে, যেমন রাজহাঁসকে বলা হয় গাংপো। কথাটাকে একসাথে উচ্চারণ না করে এরা বলে গাং-পো। হরিণকে বলে খাস্সা, উচ্চারণ করে খা-সা, প্রার্থনা পতাকা—ধার-চাক বা ধার-চক, শূকর (Pig)—পাক্‌-কো, ফুল—মে-তোক, পুল----ঝাম্‌-পা, ভেড়া—লুক্‌-ছা, জমি—সা-চা, লংকা—আ-কার ইত্যাদি ।

এক অক্ষরেরও অনেক শব্দ আছে যেমন—ন্যা— মাছ, ভা—গরু, হাম্—শেয়াল, ইত্যাদি

পুরো একটা কথা বলতে ওদের অনেকবার থামতে হয়, যেমন——থা-চু দি-থুং থুং বে', অর্থাৎ এই প্রার্থনা পতাকাটা ছোট

খণ্ডত (ৎ) এবং অনুস্বার (ং) এরা খুব ব্যবহার করে। ৎ প্রায়ই শব্দের আগে ব্যবহার করতে শোনা যায়, অর্থাৎ শব্দটা উচ্চারণ করার আগেই ত্ থেকে আরম্ভ করে। যেমন ৎ-সাং-পাখীর বাসা, ৎ-জাম—বাসনপত্র, ৎ-সান-দেংপাইন গাছ

প্রচণ্ড শীতের জন্য মনে হয় ভাষাটা এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ শীতে কাঁপতে কাপতে সহজেই এই ভাষায় কথা বলা যায়। এই পর্যন্ত রাস্তায় খুব অল্প লোকই পেয়েছি যারা একশ দু'শ ও হাজার সংখ্যা পর্যন্ত গুনতে পারে। বাজারের সাধারণ খুদে দোকানদাররা অধিকাংশ সময়ই এক থেকে দশ বা কুড়ি পর্যন্ত গুনতে পারে। আর যোগ বিয়োগ করার জন্য অনেক সময় দেখেছি তারা ছোট পাথরের সাহায্য নেয় । অনেকে জপের মালাও অঙ্ক করার জন্য ব্যবহার করে। সংখ্যাগুলো তিব্বতী ভাষায় শুনতে খুব ভাল লাগে। ছোটরা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে যখন পড়ে মনে হয় এরা কবিতা পাঠ করছে। যেমন——চিগ্‌-নী-সুম-ঝি- গা-ডু-ডুন-গী-গু-চু অর্থাৎ ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০ । তারপর চু-চিগ্, ভ্ গী-সু, ঙ্গের-চী, সু-চু, সা-চিগ্‌, ইত্যাদি। ঘড়ির ব্যবহার তিব্বতে খুব কম। বড়লোকদের ঘড়ি আছে বটে কিন্তু সেটা সম্পত্তি বা সৌখিনতার প্রতীক। গুম্ফাতেও ঘড়ির ব্যবহার এ পর্যন্ত দেখিনি। সময়টা নির্ধারণ করা হয় ভোরের মুরগীর ডাক ও সূর্যের উপর ভরসা করে। আমার ডায়েরীতে সেই সময়গুলোও মোটামুটি লিখে রেখেছি- চাক্‌-তাং পো— চাক্‌-নীই-পা— থোং-রাং— ৎ-সে-শার ভোর রাতের প্রথম মুরগীর ডাক ভোর রাতের দ্বিতীয়বার মুরগীর ডাক প্রথম ভোরের আলো সুর্যোদয় সকাল (সকাল আটটা বা সাড়ে আটটার (মতো ) সূর্য উপরে (সাড়ে দশটা এগারোটার (মতো) -গা-তো- ৎ-শা-তিং— নীইং-কুং— দ্বিপ্রহর গং-তা- বিকেল নীই-গে— সূর্যাস্ত সা-রিপ- রাত্রি নাম্‌-চে- মধ্যরাত্রি

যে কোন গুম্ফায় থাকতে হলে উপরি-উক্ত সময়গুলো জানা দরকার কারণ এরই উপর নির্ভর করে তৈরী করা হয়েছে গুম্ফার কর্মসূচী। বারের হিসাবটা আমাদের দেশের মতোই, সাত দিনে এক সপ্তাহ। সোমবার—জা নীংমা, মঙ্গলবার—জা দাবা, বুধবার—জা-মিংমা, বৃহস্পতিবার—জা লাক্‌ পা, শুক্রবার—জা ফুরপু, শনিবার—জা-পাসাং, রবিবার—জা পেম্ পা

আমি তিব্বতী ভাষা অ আ ক খ থেকে শিখিনি, এদের লেখা পড়তে হলে এই ভাষাটাকে ভালভাবে শুরু থেকে আয়ত্তে আনা দরকার। আমার শেখা মানে চলার পথে কানে যা আসছে আর তা থেকে যা বুঝছি সেটাই বার বার মনে আবৃত্তি করে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। যারা লেপচা ভাষা জানেন তাদের পক্ষে এ ভাষাটাকে বুঝতে খুব সুবিধা। আমি শিখছি বাধ্য হয়ে। গীয়াৎসে থেকে যে রকম ভাবে আসতে হল একলা, বলা যায় না—ভবিষ্যতে আবার যদি ছাড়াছাড়ি হয়ে যাই তাহলে চালিয়ে নেবার মতো কিছু কথার অবশ্য দরকার। কাজেই এখন থেকে আমি আরও সজাগ হয়ে রইলাম, নতুন শব্দ পাওয়া মাত্র চেষ্টা করছি তাকে ধরে রাখতে। সবচেয়ে ভাল লাগে এদের প্রার্থনা ও মন্ত্র পাঠ। যারা ভূটানে গেছেন এবং সেখানকার গুম্ফার সাথে পরিচিত তারা নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত হবেন ।


সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%