বিমল দে
দ্রেপুং গুম্ফার বিরাট পাঠাগার ভবন। সেখানে কম করেও ছত্রিশ হাজার বই আছে । তাছাড়া মন্দিরে রয়েছে তাংগীউর ও কাংগীউরের হাজার কপি। ভারতবর্ষের বহু মনীষীর অমূল্য গ্রন্থ ও বেদান্তে ভর্তি। গুল্ফার সুচিত্রিত তাংখাগুলোকে এক সঙ্গে করলে কম করেও চল্লিশটি ঘর বোঝাই হয়ে যাবে। এ ছাড়া রয়েছে ঐতিহাসিক, পৌরাণিক ও ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহশালা। আমি ত্ৰাপা বা লামাদের সাথে ঘুরে ঘুরে সব দেখেছি। অবশ্য সে সব দুর্মূল্য গ্রন্থ পাঠ করা আমার স্বপ্নেরও বাইরে, সেই সব গণিততত্ত্ব আর দর্শনতত্ত্ব চর্চা করতে হলে আমাকে তিব্বতে জন্মগ্রহণ করতে হবে আর শুধু এক জন্মই নয়, জন্মজন্মান্তর ধরে থাকতে হবে তিব্বতে। খুব দুঃখের বিষয় এই যে, এই গ্রন্থ-সমুদ্রের মধ্যে থেকেও লাসা থেকে কৈলাস যাবার উপযুক্ত কোন মানচিত্র সেখানে পেলাম না। আমি কৈলাস যাবো সে কথা সরাসরি তাদের জানানো অসম্ভব। মহাতীর্থ কৈলাসের সম্পর্কে আমি জানতে চাই সেটাই ছিল আমার প্রশ্ন।
তীর্থযাত্রীদের মধ্যে আমিই ছিলাম শেষ যাত্রী। শেষের তিন জনের সাথে আমার যাওয়ার কথা ছিল, আমি তাদের বললাম, আমি পরে আসছি, ভবিষ্যতে যদি আমাকে না দেখেন তার জন্য চিন্তা করবেন না, ভগবানের যা ইচ্ছা সেটাই পূর্ণ হবে, আমার জন্য আপনারা অপেক্ষা করবেন না। তীর্থযাত্রীদের সাথে সেটাই ছিল আমার শেষ সাক্ষাৎ। তারও তিন দিন পর ১৯৫৬ সালের মে মাসের ২য় সপ্তাহ। খুব ভোরবেলায় দ্রেপুং গুম্ফার ছোট দরজা দিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। তখন সবেমাত্র ভোরের আলো উঁকি দেবার চেষ্টা করছে। রাস্তার কুকুরগুলো এক তরুণ ত্রাপাকে গুম্ফা থেকে বেরুতে দেখে তারস্বরে চীৎকার করে এগিয়ে এল, তারপর মনে হয় সন্ন্যাসী বসন দেখে লজ্জায় থেমে দাঁড়ালো। ভোরের অস্পষ্ট আলোকে দ্রেপুং গুম্ফাটাকে স্বপ্নে দেখা মায়াপুরীর মতো মনে হতে লাগল। তার প্যাগোডা ধরনের ছাদ আর আবছা সোনালী রঙ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আমি ফিরে দাঁড়ালাম, সেদিকে তাকিয়ে শেষ বারের মতো তাকে দেখে নিলাম—শেষ বারের মতো দর্শন করলাম পৃথিবীর বৃহত্তম মঠ ও বৌদ্ধ-তান্ত্রিক ক্ষেত্রকে। মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম সেখানকার লামাদের। সেই মন্দিরের বুদ্ধ মূর্তিকে কল্পনা করে প্রার্থনা করলাম—
তুমি জ্ঞান ও পবিত্রতার অধীশ্বরস্বরূপ আমাকে পথ দেখাও, আমাকে তোমার পথে চালিত কর, আমি তোমাকে আশ্রয় করি—তোমার আলোকে আমাকে আলোকিত কর। দ্রেপুং ও লাসা ছাড়লাম, উদ্দেশ্য সাংপো, প্রধান রাস্তা একটাই,রাস্তা চিনতে কোন অসুবিধাই নেই। সপ্তাহখানেক আগে এই রাস্তা দিয়েই আমরা লাসায় প্রবেশ করেছিলাম। আমার সাথে এবার রয়েছে একটা কম্বল। গুম্ফা থেকে দিয়েছে দু'সের আটা, কিছু শুকনো সব্জি আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের মগ, জুতো, মোজা, একটা ভারী চাদর। দু'দিন আগে গুম্ফার নাপিত নতুন করে তীর্থযাত্রীদের মাথার চুল ফেলে দিয়েছে। মাথার ঠাণ্ডাটা এখন প্রায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। গুরুজী নাসা পান ভালোভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন, দৈনিক নাসা-পানের ফলে সর্দিকাশিটা মনে হয় শরীরের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।
লাসায় যাবার পথে যে সব জায়গায় রাত কাটিয়েছিলাম সেই গুম্ফাগুলো থেকে কী-চু নদীর ধারের রাস্তা দিয়ে তৃতীয় দিনের দিন আমি সাংপোর ধারে এসে পৌঁছলাম ৷ গুরুজী চার টাকার খুচরো পয়সা আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন, কাজেই নদী পার হবার কোন অসুবিধাই নেই। তৃতীয় দিনের দিন দুপুর বেলায় আমি সাংপো পার হলাম । ইয়াকের চামড়ায় তৈরী নৌকাতে পার হতে লাগলো দুটো ফুটো পয়সা মাত্র। তিব্বতে ভারতীয় এই ফুটো পয়সার খুব কদর, কারণ গরীব লোকেরা সেই পয়সার মালা গেঁথে গলায় অথবা কোমরে বেঁধে রাখে তাতে হারাবার সম্ভাবনা কম। মাসখানেক হল আমি তিব্বতে এসেছি একটা জিনিস আমি বার বার লক্ষ্য করেছি যে, এদের মধ্যে কেউ চুরি করে না, যত গরীবই হোক না কেন পরের দ্রব্য এরা কিছুতেই হরণ করে না ।
এখন থেকে আমার নতুন পথ, এখান থেকে একটা রাস্তা গীয়াৎসে হয়ে গ্যাংটকের দিকে চলে গেছে। ঘোড়া বা গাধার পিঠে করে যারা গীয়াৎসে যায়, তাদেরও ওইটাই প্রধান রাস্তা। আমি সেই রাস্তায় না গিয়ে সাংপোর ধার ধরে যে ছোট চলার পথ সরাসরি পশ্চিমের দিকে গেছে সে পথটা ধরলাম। এই রাস্তায় গেলে পথ হারাবার ভয় নেই। সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র তিব্বতের বরফ গলা জল নিয়ে আসামের দিকে বয়ে চলেছে—আমি ধরলাম স্রোতের উল্টোদিকের পথ, সেই পথের শেষেই পাওয়া যাবে উৎস।
সাধুবাবাই আমার গুরুজী আমার পথ প্রদর্শক। গয়া থেকে গ্যাংটক, আর গ্যাংটক থেকে লাসায় এসেছি তাঁরই কৃপায়। এখন ধরেছি কৈলাসের পথ। নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম এখন থেকে আমিই আমার একমাত্র সাথী। সব রকম বাধা বিপত্তিকে অতি সাবধানে এড়িয়ে যেতে হবে ।
সাধুবাবাকে বার বার মনে পড়ল তাঁর এই বৃদ্ধ বয়সে কি দারুণ উৎসাহ, কি সহজ পদক্ষেপ, শরীরের উপর তাঁর অদ্ভূত সংযম। তিনি বার বার বলেছেন শরীরটা মনের চাকর মাত্র কাজেই মনটাকে ঠিক রাখ। মনের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পথের ক্লান্তিতে শরীর ভাঙ্গলে মনটাকে ভাঙ্গতে দিও না। তাঁর এই উপদেশগুলোকে শিরোধার্য করে আমি পা বাড়ালাম সামনের দিকে। মনে মনে ভাবলাম আমার ডানদিকের সাংপো আমার সখা, আকাশ আমার দেবতা আর তুষারশুভ্র পর্বত পথপ্রদর্শক ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন