বিমল দে
শেষে এসে পৌছলাম মহাতীর্থের দরজায়। তিব্বতী যাযাবরদের মিলনক্ষেত্র এই থোক্চেন। থোক্চেন চ্যাং-ল্যাং মরুভূমির একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শহর। প্রত্যেক বছর কোন একটা নির্দিষ্ট দিনে তিব্বতী যাযাবররা এখানে এসে মিলিত হয়। তাদের পশমের পোশাক, পুরোনো তৈজসপত্র, ঐতিহাসিক তাংখা, স্ট্যাচু আর বিভিন্ন পাথর ও পুঁথির বিরাট সম্ভার দিয়ে রাস্তার দু'পাশে বসে হাট। ধনী যাযাবর ও ব্যবসায়ীরা সেইসব জিনিস অতি সস্তায় কিনে নিয়ে আসে ভারতের বিভিন্ন বাজারে। নেপাল, ভারত, সিকিম ও ভূটানের সীমান্তবর্তী বাজারে এইসব মালই পরে আমরা দেখতে পাই ।
এখান থেকে আবার শুরু হয়েছে পাহাড়, অর্থাৎ হিমালয় পর্বতশ্রেণী ঘেঁষে এখন এই রাস্তাটা উঠে গেছে উত্তর-পশ্চিম দিকে। সাংপো এখন হারিয়ে গিয়ে ছোট্ট একটা পাহাড়ি ঝরনায় পরিণত হয়েছে। তবে তার স্রোত ও দাপট এখন আরও চঞ্চল। প্রতি মুহূর্তে সে অসংখ্য পাথরের গায়ে ধাক্কা মেরে সৃষ্টি করছে শুভ্র ফেনিল রহস্যঘন ভয়ঙ্কর মূর্তি। এখন এই নদীটি পার হতে মোটেই অসুবিধা নেই। একটু পরিশ্রম করে কোমর জলে নেমে ও বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে অনায়াসেই পার হওয়া যায়। এখন নদী না বলে সাংপোকে একটা পাহাড়ি ঝরনাই বলবো। গৌহাটির কাছে এই সাংপো অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্রর কথা এখন চিন্তাও করতে পারছি না। এই অঞ্চলে সাংপো বহুভাবে ভাগ হয়েছে অর্থাৎ ঠিকভাবে লিখতে হলে বলতে হবে যে এই অঞ্চলের ছোটখাটো কয়েকশ' ঝরনা সৃষ্টি করেছে সাংপো, তিব্বতের প্রধান নদী। এই ছোট ছোট ঝরনার সবগুলিই প্রায় স্বতন্ত্র ভাবে বয়ে চলেছে। থোকচেন থেকে হিমালয়ের এক অনবদ্য দৃশ্য চোখের সামনে ফুটে উঠছে। ত্ৰাদুম্ থেকে আমি শুধু সামনের দিকে নজর রেখে এগিয়ে চলছিলাম তাই বুঝতে পারিনি যে এঁকে বেঁকে এই রাস্তাটা ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠে গেছে। সে কারণেই সম্ভবতঃ আমি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। রাস্তা উপরের দিকে উঠলে বিশ্রাম করে করে উঠতে হয়, তাতে শরীরের শক্তি বজায় থাকে আর পথও হয় সহজ। সাধুবাবার সাথে যাবার সময় এসব দিকে আমার ভাববার প্রয়োজন ছিল না, কারণ তিনিই তীর্থযাত্রীদের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেটাই হয়েছিল আমার বিরাট ভুল। দুনিয়ার এই অজ্ঞাতকোণে নিজেকে সাবধানে না চালালে এখানে দেখবার কেউ নেই, ঠেকে শিখলাম—এবার হতে সে ভুল আর হবে না। আমি কখন যে এত উঁচুতে উঠে এসেছি বুঝতেই পারিনি। এখন বুঝলাম সাংপো হঠাৎ কেন ঝরনার আকার ধারণ করেছে। যে সব ঝরনা সাংপো সৃষ্টি করেছে তার নামগুলো আমি জানতে পারিনি। সাংপোর প্রধান ঝরনাটা আসছে মানস সরোবর থেকে সেটার নাম সামো-সাংপো।
শাম্সাং-এর কাছেই দেখেছিলাম সাংপো সেখান থেকে পরিষ্কার দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তার অপর অংশ আনছে হিমালয়ের বরফ গলা জল। সাংপোর এই দিকে থাকার দরুন আমি অন্যদিকের শাখাটার কথা একদম চিন্তা করিনি। সাংপো নদীর ওপারেই হচ্ছে নেপাল তিব্বত সীমান্ত। সামরিক বাহিনীর ভয়ে সেদিকে যাবার কোন প্রশ্নই নেই। পরে জেনেছি যে সেদিকটাই ছিল সাংপো অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্রের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক উৎস। সেদিকেই আংসি-ইয়ুংদুক, তাচাক্-খাম্বাব নামে ছোট্ট পাহাড়ি খরস্রোতগুলোই সৃষ্টি করেছে মাসাং সাংপো। দক্ষিণের এই মাৎসাং সাংপো আর .উত্তরের মারিয়াম্ চু এই দুই নদী মিলেছে শাম্সাং-এর প্রয়াগে। তিব্বতী তীর্থযাত্রীদের কাছে শাম্সাং প্রয়াগ অন্যতম প্রধান প্রয়াগ তীর্থ। উপযুক্ত পথনির্দেশের অভাবে আমি প্রয়াগের সেই পবিত্র স্থানটি চিনতে পারিনি। সাংপো মনে করে আমি উত্তরের যে শাখা নদী ধরে এগিয়ে চলেছি সেটা আসলে মারিয়াম্ চু নদী ।
থোকচেনের কাছ থেকে যে স্রোতস্বিনীর ধার ধরে এগিয়ে চলেছি—সেটার নাম সামো অর্থাৎ মারিয়াম্ চু কখন পেরিয়ে এসেছি। এই নদীটাই এখন মারিয়াম্ চু’র উৎস। সামো এসেছে সরাসরি মানস সরোবর থেকে। নামগুলো সত্যি গোলকধাঁধার মতো ।
থোচেনের উচ্চতা প্রায় পনেরো হাজার সাতশ' (১৫,৭০০) ফিট। থোকচেনের স্থানীয় নাম তাসাম্। প্রকৃতি এখানে সজীব। ঝরনার মধ্যে পেয়েছে প্রাণ আর চারদিকের পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে তার অসীম রূপের ছটা। অসংখ্য তুষার ধবল পর্বত চূড়ার মধ্যে ডানদিকে দেখা যাচ্ছে মাতৃতুল্যা নন্দাদেবী আর দূরে বাঁদিকে অন্নপূর্ণা। এই দুই চূড়া অনন্তকাল ধরে অনন্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে কৈলাসের দিকে। মহাতীর্থ এখান থেকে আর বেশী দূরে নয় সেইকথা ভেবে বার বার আমার হৃদয় নেচে উঠতে লাগল। হিমালয়ের সৌন্দর্য আমার সব ক্লান্তি দূর করে দিয়ে আমাকে জাগিয়ে তুলল প্রেরণায়। সৌন্দর্যের মধ্যে আছে প্রাণ, সেই প্রাণের স্পর্শে আছে অমৃত, আমি যেন তাই পান করলাম ।
থোকচেন গ্রামটা অনেকটা উচ্চ হিমালয়ের কোন ভুটিয়া পট্টির মতো। গরীব ধরনের কাঠের বাড়ী আর কাঠ পাথরের মেশানো সরাইখানায় ভর্তি। মাত্র দু' পয়সার পরিবর্তে পেয়ে গেলাম গরম জল, বিচুলির গদিঘর, আর আরও দু' আনার পরিবর্তে পেলাম সমস্ত রাতের উপযোগী আগুন, আমার কাছে আছে প্রায় চার টাকা, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী। আমার ঘরের দরজা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি পাহাড়ের এই অনন্ত সৌন্দর্যের লীলা। টাইগার হিল থেকে হিমালয়ের সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, আর এখন বাদ্ধ হয়ে গেছি।
পাহাড় পরিব্রাজকদের আকর্ষণীয় বস্তু, দূর থেকে ধরা পড়ে তার রহস্যঘন সৌন্দর্য
আর কাছে এলেই সে রূপ নেয় শুকনো পাথরের। তবুও অনাদিকাল থেকে মানুষ ছুটে চলেছে তার পেছনে। কিসের আশায়?
পাহাড় আমি অনেক দেখেছি—আর এখন পাহাড়কে নিত্যসঙ্গী করে চলছি। আমার এই নিঃসঙ্গ চলার পথে পাহাড় আমার সাক্ষী দেবতা। পাহাড় আমাকে পথ দেখিয়ে টেনে নিয়ে চলেছে কোন এক অজানা অলৌকিক স্বপ্ন জগতের দিকে ।
তিব্বতের এই প্রান্তে মাথা উঁচু করে পর্বতশৃঙ্গগুলো সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর জীবন দেবতা হয়ে। আকাশ থেকে তারা টেনে আনছে প্রাণ-বারি, আর মন্দাকিনী হয়ে সে বারি সৃষ্টি করেছে সহস্র প্রাণ, নিঃশব্দে করে যাচ্ছে তাদের অনন্ত কর্ম। পাহাড়কে যারা ডিঙিয়ে ধ্বজা উড়িয়ে অভিযাত্রীর নামে নাম কেনে তারা পাহাড়কে দুর্লঙ্ঘ পাথর বলেই চেনে। এই বিরাটত্বের সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতার প্রতিবাদে তারা তোলে অহঙ্কারের ঝড়। তারা পাহাড়কে চেনে বিরাট পাঁচিল হিসেবে, মানুষের ক্ষুদ্র মনেরই প্রকাশ মাত্র ৷
পাহাড়কে যাঁরা চেনেন জীবন-দেবতা হিসেবে তাঁরাই মহৎ। পাহাড় বিশ্ব পিতার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। তার সেই দৃঢ় সংযত ব্যক্তিত্বের মধ্যেই স্নেহ-ধারার অনন্ত ঝরনা পৃথিবীর বুকে আনছে অভয় আর করুণার আশীর্বাণী। পাহাড়কে না জানলেই আমরা পাই ভয় আর জানলেই তাকে পাই। তাকে পেলেই সঙ্গে সঙ্গে আসে সুখানুভূতির এক আনন্দ। সেই আনন্দে নেচে উঠে আমার ভেতরকার ছোট্ট আত্মাটি—পরিণত হয় মহাত্মায়। কিন্তু সেই মুহূর্তটা পলক মাত্র দেখা দিয়েই উধাও হয়ে যায়। তারপর চলে তাকে ধরার চেষ্টা। পাহাড়ের প্রাণ আছে। পরিব্রাজক ও তীর্থযাত্রী মাত্রেই তা স্বীকার করবেন। দিনের মধ্যে তার ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনও ঘটে প্রচুর। এই পরিবর্তন জানতে হলে দিনের পর দিন পাহাড়কে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পাহাড়ের ঘুম ভাঙে তারপর সূর্যদেবের গতির সাথে ছন্দ মিলিয়ে পাহাড়ের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে। সকালের দিকটা বড় অদ্ভূত। প্রতি মুহূর্তের রঙের সাথে সাথে মনে হয় তার রূপের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনটা দেখার জন্য কাউকে যোগী বা মহৎ হতে হবে না, শুধু ধৈর্য আর দৃষ্টি থাকলেই যথেষ্ট। দুপুরের দিকে পাহাড়ের ব্যক্তিত্বের পুর্ণ প্রকাশ ঘটে। আর বিকেলের দিকে দেখা যায় তার পরিবর্তনশীল ধ্যান-গম্ভীর রূপ ।
বরফে ঢাকা পর্বত-চূড়াগুলোর তো তুলনাই চলে না। তাদের সাথে একটু চেষ্টা করলেই মনে হয় কথা বলা যায়। ধ্যানস্থ হয়ে তাদের রূপকে মনে ধরে তাদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব। এরজন্য চাই শুধু ভক্তি আর সমর্পণের ইচ্ছা। প্রত্যেকটি চূড়াই যেন বিভিন্ন দেবতাদের এক একটি মূর্তি। পৃথিবীর এই তীর্থক্ষেত্রে তাদের সাথে মানব-আত্মার মিলন ঘটাবার জন্য দাড়িয়ে আছে নিঃশব্দের অনন্ত সেতু। আমার ভাগ্যটা নাকি খুবই ভালো। তাসামের রাস্তার ধারেই একটা বাড়ীতে থাকতে পেয়েছি। কয়েকদিন যাবৎ স্রোতস্বিনীরজলের স্রোতটা কম এখন পার হওয়া খুবই সহজ। আর এখান থেকে সরাসরি সোমাফাম্-এ যাবার উপযুক্ত সঙ্গী পাওয়া গেছে। এই তিন কারণে আমার মতো সামান্য তীর্থযাত্রীর ভাগ্য খুবই ভালো।
সকাল থেকে দোংগলদাদা আমাকে বার বার এই কথাগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। দোংগলদাদাই এই বাড়ীর মালিক। চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের এক ভদ্রলোক। তিব্বতীরা সাধারণতঃ বেশ লম্বা-চওড়া কিন্তু এই ভদ্রলোকের চেহারাটি অনেকটা শক্ত শেরপা গোছের। সামনের দুটো দাঁত নেই। তার ভেতর দিয়েই ঝরছে হাসির ফোয়ারা। কথা বলার চেয়ে তিনি হাসেন বেশী। জগতের কোনো সমস্যাই মনে হয় তাঁকে এখনও স্পর্শ করতে পারেনি, সাক্ষাৎ আনন্দমূর্তি। এক গামলা গরম জল এনে আমাকে হাত মুখ ধুয়ে নিতে বললেন। অনেকদিন পর গরম জল পেয়ে আমি গলা মুখ কনুই ধুচ্ছি। দোংগালদাদা বসে বসে আমার সৌভাগ্যের প্রশংসা করতে লাগলেন, একই কথা তিনি বার বার বলতে লাগলেন। তাঁর উচ্চারণভঙ্গি আর হাসি আমার মনকে যেন ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতে লাগল। তাঁর উপস্থিতিতেই আনন্দ ৷ দোংগলদাদা থাকেন তাঁর বৃদ্ধা মায়ের সাথে। গরমের সময় তাঁরা এখানে থাকেন আর খুব শীতের সময় তাঁরা নেমে যান পুরাং উপত্যকার দিকে ।
থোকচেনের ছোট্ট খোলা বাজারটা বড় ভালো লাগল। বাজারটাকে আমাদের দেশের একটা বারোয়ারী মণ্ডপের সাথে তুলনা করবো। সবাই সবাইকে চেনে। হাসি-ঠাট্টা আর গানের আসর সেখানে লেগেই আছে ৷
দোংগালদাদার বাড়ীটা অনেকদিনের পুরান। গরমকালে তাঁদের বাড়ীটা ধৰ্মশালায় পরিণত হয়। তিব্বতের সমতল প্রদেশ থেকে দলে দলে তীর্থযাত্রীরা এই পথ দিয়ে যায় মহাতীর্থে। থোচেনের অধিবাসীরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে তীর্থযাত্রীদের নিয়ে। গাধা ইয়াকে ভর্তি হয়ে যায় এখানকার রাস্তা। বিভিন্নভাবে তীর্থযাত্রীদের রসদ জুগিয়েই এদের আনন্দ। পয়সার দিক থেকে কতখানি লাভ হয় বলা মুশকিল, তবে এই কাজে গ্রামবাসীদের ব্যস্ততা অধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। এই গ্রাম থেকেই অনেকে দণ্ডি ও পরিক্রমার জন্য লোক ভাড়া করে নিয়ে যায়। কৈলাস তীর্থে যারা পরিক্রমা করতে অসমর্থ তাদের হয়ে তিব্বতীরাই পরিক্রমা করেন। এর জন্য তারা সামান্য পয়সা ও খাবার পেলেই যথেষ্ট মনে করেন।
কৈলাস ও মানস সরোবরে যাবার পথে এটাই হচ্ছে শেষ গ্রাম। কাজেই তীর্থযাত্রীরা এখানেই তাদের শেষ কেনা-কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এখন গরমকাল সবেমাত্র শুরু হয়েছে, কাজেই ব্যস্ততা কম। দোংগলদাদার মতে আজকাল তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা খুব কম। তিব্বতের বড় বড় শহরগুলো সব পরিবর্তনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সেখানে সবাই ব্যস্ত। সুখের বিষয় যে, তিব্বতের এই অংশে পরিবর্তনের ধাক্কা এখনও আসেনি । এখানকার লোকেরা পরিবর্তনশীল জগতের কোন খবরই জানে না। তাই এখানে আমি মুক্ত। এখানে নেই চীনা সৈন্যদের তাঁবু আর সরকারী জেরা। তিব্বতে প্রবেশ করার পর এই বাজারেই প্রথম আমি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারছি। আমি কে কোথা থেকে আসছি কেউ তা জিজ্ঞাসা করে না। আমার একমাত্র পরিচয় আমি মহাতীর্থের যাত্রী। এখানে আমি মৌনীবাবা নই ।
তাসাম বাজারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এখানকার কবিরাজি আয়ুর্বেদ ও
টোকা ঔষধের কারবারীরা। নানা রকমের শিকড়, পাথর আর বিভিন্ন মরা জীবজন্তুর ছাল ও তেলের বিরাট সম্ভার। শরীরকে রক্ষা করার জন্য যা দরকার, একটা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য যা দরকার তা সবই এখানকার কয়েকটি ছোট্ট প্রায় অন্ধকার ঘরের মধ্যে পাওয়া যায়। যারা বিক্রী করছে তাদের দেখে মনে হবে এদের থেকে নোংরা ভিখিরী বোধ হয় জগতে আর নেই। দেখে মনে হবে একগাদা নোংরা আর কালো ছেঁড়া কাপড়ের উপর যেন একটা নরমুণ্ডকে বসানো হয়েছে। ঘরেরই এক কোণে এরা প্রস্রাব করে অন্য এক কোণে রান্নার বন্দোবস্ত। খখক্ করে কাশির পর ঘন পদার্থ যা মুখে আসছে তাকে মুখের জোর দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে কাঠের দেয়ালের উপর। দাবাখানার এমন দুরবস্থার কথা চিন্তাও করা যায় না। গ্রামে লামার পর এদের দ্বিতীয় সম্মানীয় পদ দেওয়া হয়েছে। গরম যত বাড়তে থাকে ততই এই বাজারের উন্নতি হতে থাকে। ডজনখানেক দোকান প্রায় সারা বছরই এখানে খোলা থাকে। রাস্তার ধারের খোলা বাজারগুলো শুধু গরমকালেই বসে। খোলা বাজারের প্রধান আকর্ষণ পশম । ভেড়ার পশমের তৈরী নানা রকমের পোশাকের বিরাট সম্ভার। সোয়েটার, টুপী, মোজা, চাদর সব কিছুই এখানে পাওয়া যায় ।
আমি প্রথমেই বলেছি যে, তিব্বতের বাজারে প্রথম আমি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছি। ধরা পড়ার ভয়ে অথবা হাঙ্গামার জন্য আমাকে সব সময়ই বাজার ও শহরের মূল কেন্দ্রগুলো এড়িয়ে চলতে হত। থোকচেনের বাজার আমার কাছে তাই হঠাৎ অন্য জগৎ বলে মনে হতে লাগলো। পোশাকের জন্য লামা আমাকে কিছু পয়সা দিয়েছিলেন তাই একটা সোয়েটার কিনবার জন্য দোকানের সোয়েটার ও টুপীগুলো হাতড়ে দেখতে লাগলাম। খাঁটি উল বলতে কি বুঝায় তা এখানেই আমি প্রথম বুঝলাম। হাতে টানা মোটা সূতোয় তৈরী সোয়েটারগুলোর কাজ অতুলনীয়। আর তার মধ্যে আছে রঙের বাহার। দামী সোয়েটার ও চাদরের মধ্যে পুঁতি ও পাথর বসানো। আমার মতো এক গরীব খদ্দেরের জন্য এরা মোটেই উৎসুক নয়, আমাকে নেহাৎই একটা বাচ্চা ছেলে ভেবে কোন আমলই দিল না। অনেকক্ষণ বাছাবাছির পর এক টাকা তিন আনা দিয়ে আমি একটা সোয়েটার ও হাত-মোজা কিনলাম ।
বাজারের অন্যান্য জিনিসের দামও কিছু কিছু জানতে পারলাম, যেমন—একটা পুরো ভেড়ার চামড়ার কোটের দাম দু'টাকা, ভেড়ার চামড়াকে এরা বলে চারু, একটা চারুর দাম মাত্র ন’দশ আনার মতো। তিব্বতী চুকি অর্থাৎ কম্বলের দাম প্রায় কুড়ি বাইশ টাকার মতো। এই চুট্কিকে তিব্বতীরা লেপের মতো ব্যাবহার করে আবার বেশী শীতের সময় সেটাই হয় গায়ের চাদর। সাধারণ হালকা উলের চাদরকে এরা বলে পাংঘি, দাম মাত্র বারো আনা তেরো আনার মতো। লাম বা জুতোর দাম দশ আনা মাত্র। পশম ছাড়া এখানে অনেক চীনা আসবাবপত্রের দোকান রয়েছে। ছোট ছোট চা খাবার টেবিল রংবেরঙের ছোট ছোট বাক্স, কাপ ডিস্ প্রদীপ আর বিভিন্ন ধরনের থালা বাটি খুব সস্তা দরে পাওয়া যায় ৷
এই বাজারেই আমি প্রথম লক্ষ্য করলাম যে এরা মোটেই দরাদরি পছন্দ করে না। একদর এককথা, দরাদরিটাকে এরা অপমানকর বলে মনে করে। তিব্বতের অন্যান্য অংশেও এই একই নিয়ম কি না আমার জানা নেই। প্রায় প্রত্যেকটা দোকানেই কাপড়ের উপর জলরঙা তিব্বতী চিত্র পাওয়া যায়। এই চিত্রগুলোর অধিকাংশই মণ্ডলা ও ভগবান বুদ্ধের বিভিন্ন রূপে ভর্তি। কৈলাসনাথ, রাক্ষসতাল আর মানস সরোবরেরও অনেক কল্পিত চিত্র এখানে চোখে পড়ে, সেগুলো সবই তাংখা হিসেবে বিক্রি হয়। খাবার জিনিসের মধ্যে আটার কাঠি, শুকনো মাংস, চাল ডাল, ভুট্টা, গম, যব, বার্লি প্রচুর পাওয়া যায়। একসের চালের দাম দু'আনা, আর একসের বার্লির দাম চার পয়সা । শুকনো একটা ভেড়ার জানুর দাম তিন আনা । আমার মতে এটা সত্যি সস্তার বাজার।
বাজারের আড্ডাখানা হচ্ছে এখানকার চায়ের দোকান। দোকানের বাইরে দুটো মেয়ে লম্বা কাঠের চোঙার মধ্যে চা-এর সঙ্গে মাখন মেশাচ্ছে, আমাকে দেখেই তারা কাজ থামিয়ে জিভ বার করে সম্মান জানালো, আমিও হাসিমুখে তাদের হাত তুলে আশীর্বাদ করে মাথা নীচু করে দোকানে ঢুকলাম। দোকানের ভেতরটা খুবই ছোট্ট, কাঠের একটি খুপরী ঘর মাত্র। উচ্চতায় এক মানুষও হবে না, মাথা নীচু করে ঢুকেই বসে পড়তে হয় ।
চা খেয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়েই পেলাম মরিয়াম নদী, নদীকে এরা বলে চু। নদীর স্বচ্ছ জল আর দূরের বরফে ঢাকা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে সারাজীবন দেখেও যেন আশ মিটবে না। মনে মনে ভাগ্যদেবতাকে স্মরণ করে তাঁর অপার করুণার জন্য ভক্তিভরে প্রণাম জানালাম। এখানে দাঁড়িয়ে বাড়ীর কথা হঠাৎ মনে পড়ল। ইছাপুরের সেই গরম আবহাওয়ায় ছোট্ট পরিবেশের কথা, কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছি, সেখান থেকে আমি যেন এক স্বপ্নের জগতে চলে এসেছি। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর পায়ে ঠাণ্ডা অনুভব করলাম, কাজেই হাঁটতে বাধ্য হলাম ।
বাড়ীতে ঢোকার পথেই দোংগলদাদার দেখা পেলাম। আমাকে দেখেই তিনি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন—সোয়েটারটা কিনলেন ?
--হ্যাঁ, এটা খুব গরম তাই না ?
হব। —ঠিক ঠিক। তারপরই ঘোষণা করলেন শুভ সংবাদ – কালকেই আমরা রওনা
আনন্দে আমার বুকটা লাফিয়ে উঠল। মনকে বললাম—ধৈর্য ধর শান্ত হও, মহাতীর্থের দর্শন তোর হবেই। খুব ভোরে দোংগলদাদার মা আমার ঘুম ভাঙ্গালেন, পাশের ঘর থেকে দোংগলদাদা বেরিয়ে এসে আমাকে প্রণাম করে ভেতরে ঢুকতে বললেন। আমি তার ঘরে ঢুকে দেখি আরও তিনজন তিব্বতী সেই ঘরে আগুনের পাশে বসে আছেন। উনুনের পাশেই রয়েছে একটা বিরাট গামলায় গরম থুপা, গরম ঝোলের মত তাতে সবাই একে একে চুমুক দিচ্ছেন, আমিও তাদের দলে যোগ দিলাম । থুপা হচ্ছে বার্লি ও মাংসের ঝোল। দোংগলদাদা ছাড়া বাকি তিনজনের সাথে আমার ইতিপূর্বে পরিচয় হয়নি। রাত প্রায় অন্ধকার ; দূরের আকাশে তারাগুলো এখনও তাদের পূর্ণ সত্তা নিয়ে সজাগ হয়ে রয়েছে। তারায় ভরা উজ্জ্বল আকাশটাকে মনে হচ্ছে ঠিক মাথার উপরে, একটু উঁচুতে উঠলেই মনে হয় ধরা যাবে। দারুণ শীত আর অন্ধকার রাস্তা এই দুই বাধাকে তুচ্ছ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ।
প্রথমে ভেবেছিলাম যে এই রাস্তাটাই যখন মহাতীর্থে গিয়ে পৌঁছেছে তখন আর দোংগলদাদার প্রয়োজন কি? কিন্তু চলার পথেই বুঝলাম যে এ পথে দোংগলদাদার একান্তই প্রয়োজন। প্রথম বাধা এখানকার ছোট-খাটো স্রোতস্বিনীগুলো—সেগুলো পার হবার জন্য সরাসরি কোন সেতু নেই। এখানকার অধিকাংশ সেতুগুলোই স্থানীয় পাথর সাজিয়ে তার উপরে কাঠ ও দড়ির কেরামতিতে তৈরী, সেগুলো সবই প্রায় মান্ধাতার আমলে তৈরী, পাথরগুলো সাজিয়ে বসানো হয়েছে মাত্র তার মধ্যে এতটুকু সিমেন্টের ছোঁয়া নেই। অধিকাংশ সেতুই তাদের আয়ুর শেষ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, তাতে পা দেবার আগে দোংগলদাদা ভালোভাবে সেগুলোকে পরীক্ষা করে দেখেন, আবার অনেক সেতু পার হবার বদলে নামতে হয় জলে। আবার অনেক সময় জল পার হবার জন্য উঠতে হয় তার উৎসের দিকে। কাজেই রাস্তা ছেড়ে আমাদের প্রায়ই যেতে হচ্ছে ডানদিকে তারপর আবার ফিরে আসি রাস্তায়। অনেক সময় ছোট্ট নদীগুলোকে দেখলে মনে হয় ডিঙিয়ে পার হওয়া যাবে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ঠিক তার বিপরীত। পাথরের উপর পা দিয়ে ডিঙ্গোবার জন্যও চাই উপযুক্ত অভিজ্ঞতা। পাথরগুলোর চরিত্র জানা না থাকলে তারা গড়িয়ে গিয়ে আমাদের সাথে তামাসা করতে পারে। সেটা মোটেই সহনশীল নয় ।
এই পথে শীতটাও অসহ্য, আবহাওয়া খুবই শুকনো, আকাশে একখণ্ড মেঘও নেই । বহুদূরের পাহাড়গুলোকে মনে হয় খুব কাছে, চলার সাথে শ্বাস প্রশ্বাসের ছন্দ না মিলিয়ে চললে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। কে বলবে যে তিব্বতের এটা অন্যতম প্রধান সড়ক। রাস্তায় জনমানবের চিহ্নমাত্র নেই। শব্দের মধ্যে আমাদের ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, পা ফেলার শব্দ আর মাঝে মাঝে পাহাড়ি নদীর নুড়ি গড়ানো শব্দ। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় নেই বললেই চলে। আমার কাঁধের কম্বল আর ছোট পোঁটলাটা আস্তে আস্তে ভারী হতে শুরু করেছে। ঠাণ্ডায় পা দুটো প্রায় অসাড় হয়ে গিয়েছে, নাকের ডগা আর কানগুলো শীতে কন্কন্ করছে, মনে হচ্ছে অনবরত শ'য়ে শ'য়ে ছুঁচ ফোটাচ্ছে তারই মধ্যে চলতে লাগলাম—মনের একমাত্র আশা কৈলাস দর্শন। সেই ঠাণ্ডায় মণিমন্ত্র সমেত অন্যান্য সব মন্ত্রগুলো যেন মগজের মধ্যে জমে গিয়েছে, কিছুতেই মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে না, আমার পা কান আর নাকটি আমার মনটাকে যেন আঁকড়ে ধরে আছে। আগুনে পুড়ে যাবার মতো তা যেন জ্বলছে। তবুও আমাকে চলতে হচ্ছে—সবাই চলছে আর আমিও তাদের অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছি ।
দোংগলদাদা মনে হয় আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছেন। তিনি থামলেন, তার মুখের হাসিটাও মনে হয় এখন শুকনো। তিনি তার ফোকলা দাঁত বের করে হাসি টেনে বললেন—ঠিক আছে ?
–না—ঠাণ্ডা—নাক কান জ্বলে যাচ্ছে। সেই সময় তিব্বতী ভাষা মুখে ফুটে বেরোলো না মাতৃভাষায় বার বার বলতে লাগলাম—ঠাণ্ডা জ্বলে যাচ্ছে—ঠাণ্ডা—শীত ....। দোংগলদাদা মহাতীর্থের অভিজ্ঞ পথিক, পথ দেখানোই তাঁর পেশা আমার অবস্থা দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন।
সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর পীঠের থলি নামিয়ে তার মধ্য থেকে বার করলেন—কয়েকটি কাঠ আর দেশলাই—তারপর তাতে আগুন ধরিয়ে আমার কাছে ধরলেন আমি ও হাতের দস্তানা খুলে হাত গরম করে নাক ও কানে গরম সেঁক দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর আমার ঠাণ্ডা ভাবটা কমে এল। তিনি আমাকে একটা পাথরের মত জিনিস হাতে দিয়ে বললেন—নাও এটা মুখে রাখ, আস্তে আস্তে চুষে খাবে, এতে শরীর গরম হবে। এটা কি ওষুধ ?
–এর নাম থুমা, এর থেকে বড় ওষুধ তিব্বতে আর নেই। দোংগলদাদা অনেকটা গর্বের সাথে জবাব দিলেন। অন্য তিনজনকে তিনি একটু একটু করে থুমা ভেঙ্গে দিলেন। অনেকটা শিলাজুতের মত দেখতে।
একটু সুস্থ হয়ে উঠার পর আমরা আবার পথ ধরলাম। সন্ধ্যের দিকে একটা ছোট্ট পরিত্যক্ত গুম্ফায় সেদিনকার মত আমরা থামলাম। দোংগলদাদা বললেন—আমরা অনেকখানি পথ পেরিয়েছি এইভাবে হাঁটলে আমরা কালকে দুপুরের দিকে সো মাফামে পৌঁছতে পারবো। আনন্দ সংবাদ বটে কিন্তু আমার এখন যা দরকার তা হচ্ছে পূৰ্ণ বিশ্রাম ৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন