মিলারেপা

বিমল দে

তিব্বতের প্রাণ পুরুষ মিলারেপা

মিলারেপা

বইটি লেখার সময়ে ও পরে বার বার অবতার মিলারেপার কথা লিখতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু আমার সেই তীর্থ ভ্রমণের সময় মিলারেপার অনেক ছবি ও তাংখা দেখা সত্ত্বেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতাম না–হয়তো আমার তখনকার পাপী মনটিতে সেই পবিত্র পরমপুরুষের রেখাপাত না হওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া যে পরিপ্রেক্ষিতে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই সময় তিব্বতের কোনরকম পটভূমিকাই আমার জানা ছিল না। সাধুবেশে আমি যে একটি ঘর পালানো ছেলে ভিন্ন আর কিছুই ছিলাম না এটাই তার প্রমাণ। বইটিতে আমার সেই সময়কার অভিজ্ঞতাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম । .

বইটি প্রকাশের পর আমার শুভাকাঙ্ক্ষী এবং প্রিয় পাঠকদের তরফ থেকে মিলারেপা সম্পর্কে আরও দু'চার কথা লিখবার জন্য অনুরোধ এসেছে। পরিশিষ্টে তাই এই অংশটি জুড়ে দিতে বাধ্য হলাম ।

হিমালয়ের গগনভেদী চূড়া দেখলেই যেমন মনে পড়ে স্বয়ম্ভূ শিবের কথা, তিব্বতীদের কাছেও তেমনি বুদ্ধাবতার মানেই মিলারেপার নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তিব্বত অতীতকাল থেকেই একটি রহস্যঘন দেশ হিসেবে জগতে খ্যাত। সেখানকার সাধনপদ্ধতিও তাই রহস্যে ঘেরা। তিব্বতে তন্ত্রসাধকদের চূড়ামণি হচ্ছেন এই মিলারেপা। একাদশ শতকের এই তন্ত্রসাধক আজও তিব্বতের তন্ত্রসাধকদের মূখ্য গুরু এবং লামাদের বরণীয়।

১০৫২ খৃষ্টাব্দে তিব্বতের গুন্ থাং প্রদেশের কিয়াং সা উপত্যকায় মহাতান্ত্রিক মিলারেপার জন্ম। পিতার নাম সেরাব গিয়ালৎসেন, মাতার নাম কারমো কিয়ে ছোট বোনের নাম পেতা। আর বাগদত্তা স্ত্রীর নাম জেসে। জন্মের পূর্বেই পিতা, তাঁর বন্ধুকন্যার সাথে মিলারেপার বিয়ে দেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। অর্থাৎ তাঁর ছেলে হলে এবং তাঁর বন্ধুর মেয়ে হলে বিবাহসূত্রে তাঁরা আবদ্ধ হবেন। অবশ্য পরে মিলারেপা তাঁর পিতার বন্ধুকন্যা জেসেকে নিজ পত্নীরূপে মানসিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন বটে কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোনদিন শারীরিক মিলন ঘটেনি। এবং একসঙ্গে বসবাসও করেননি ।

মিলারেপার জীবনী এক অবিশ্বাস্য কাহিনী, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা খুবই অত্যাশ্চর্য কাহিনী। যারা মিলারেপার জীবন নিয়ে গবেষণা ও সাধনা করেন তাঁরা বলেন সে কাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই রহস্যঘন মিলারেপার জীবন সম্পর্কে সবকিছু আজও জানা যায়নি। খুব সংক্ষেপে তার কিছুটা লিখলাম মাত্র । মিলারেপার বয়স যখন মাত্র সাত বছর তখন তাঁর পিতা এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলেন—তিব্বতের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক আনিয়েও কিছু করা সম্ভব হল না। তাঁদের আনন্দের সংসারে হঠাৎ নেমে এল অন্ধকার। সেরাব গিয়ালৎসেন তাঁর পত্নী কারমোকিয়ে-কে দিয়ে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে মৃত্যুশয্যার পাশে ডেকে আনালেন। তারপর তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন “তোমরা আমার অতি নিকট বন্ধু ৷ আর তুমি আমার ভাই, তোমাদের সকলের কাছে আমর শেষ মিনতি, ভগবানের দোহাই, নিশ্চয়ই রাখবে। আমার প্রচুর ধন-সম্পত্তি, জমি-জমা, সোনা, অলংকার সবই রেখে যাচ্ছি আমার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যার ভরণ-পোষণের জন্য। আমার স্ত্রী বিষয় সম্পত্তির কিছুই জানেন না, কাজেই তোমাদের কাছে বার বার ভগবানের দোহাই দিয়ে অনুরোধ করছি তোমরা এদের দেখো। আমার নাবালক পুত্রের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করো, তার বয়স হলে তাকে সব বুঝিয়ে দিও।” তারপরই তিনি পরলোক গরম করেন।

সেরাব গিয়ালৎসেনের মৃত্যুর কয়েকদিন পরই তার ভাই সেরাব গিয়ালৎসেনের বিধবা পত্নীর কাছ থেকে সব কেড়ে নিলেন, শুধু তাই নয়, এমন কি তাদের সেই প্রাসাদোপম বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলেন। বিধবা কারমোকিয়েন একে তার প্রিয় স্বামীর শোকে কাতরা তার উপর দেবরের এই নিষ্ঠুর আচরণ ; কিন্তু নিরীহ কূলবধূ কিই বা করেন! মেয়েকে কোলে নিয়ে শিশুপুত্রের হাত ধরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব যাঁরা এককালে তার স্বামীর ছত্রতলে বাস করতেন তাঁরা এ দৃশ্য দেখেও দেখলেন না। সেরাব গিয়ালৎসেনের দুষ্ট ভাইয়ের বিরুদ্ধে কথা কয় এমন সাধ্য কার !

কারমোকিয়েন তাঁদের পুরানো এক জমির ওপর, গ্রামের কোণে এসে কোন রকমে মাথা গুঁজবার মত স্থান করে নিলেন। তাঁর স্বামীর যেসব সৎ বন্ধু ছিলেন তাঁরাই মাঝে মাঝে তাদের জন্য চুপি চুপি খাবার দিয়ে আসতেন ।

একে স্বামীহারা তার ওপর এই দুরবস্থা, সব থাকতেও তারা সর্বহারা! দু'দিন আগে যে ছিল ধনী, আজ সে পথের ভিখিরী। শিশুকন্যা আর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে শুধু বার বার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলতে লাগল, “হায় ভগবান, এ তুমি আমাদের কি করলে ?”

আস্তে আস্তে দেবরের অত্যাচার আরও চরমে উঠল। কারমোকিয়েন আর স্থির থাকতে না পেরে একদিন পুত্র মিলারেপার হাত ধরে বাইরে এসে দাঁড়ালেন—তারপর অশ্রুরুদ্ধ স্বরে মিলাকে বললেন—“তুই যদিও ছোট ছোট তবুও তো তোকে শুনতে হবে কারণ তুইই আমার একমাত্র ভরসা, আমার আশার আলো। এই অত্যাচার আর সইতে পরছি না। আমাদের এই দুরবস্থার জন্য দায়ীতোর কাকা। যেমন করেই হোক এর এৰ প্ৰতিশোধ নিতেই হবে। তুই আমাকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর যে এর চরম প্রতিশোধ তুই নিবি। তুই যদি আজ আমাকে কথা না দিস্ তাহলে আমি ওই পাহাড়ের উপর উঠে ঝাঁপ দিয়ে মরবো। আমার এখনো একটু জমি আছে সেটা বিক্রি করে যা পাই তাই দিয়ে তোকে পাঠাবো তিব্বতের সেরা তন্ত্রগুরুর কাছে। তুই কথা দে- -তোর বাবার কথাকে যারা অশ্রদ্ধা করেছে, তোর মাকে যারা ঘরছাড়া করেছে, শিশুদের মুখ থেকে যারা দুধের বাটি কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেই হবে তোর সাধনা। তোকে মাতৃ আজ্ঞা পালন করতেই হবে।” শিশু মিলারেপা বয়সে যদিও শিশু কিন্তু পুর্বসংস্কারবশে তিনি জ্ঞানী। চুপ করে মায়ের কথা সব শুনলেন। তারপর নীরবেই মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য করলেন। কয়েক দিন পর শিশু মিলারেপাট আদরের বোন পেতা আর দুঃখী মাতাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন উপযুক্ত তন্ত্রগুরুর সন্ধানে। শী একাদশ শতাব্দীর তিব্বত সেই সময় তিব্বতের পথেঘাটে তান্ত্রিকদের আড়ড়া, তাদের মধ্যে থেকে উপযুক্ত গুরু খুঁজে পাওয়া একমাত্র পূর্বজন্মের কর্মফল ভিন্ন অসম্ভব। মিলারেপার কর্মফল ছিল অতি অসাধারণ, মায়ের চোখের জল তাঁর অন্তরে কাটা হয়ে বিধতে লাগল। মনের জোর এবং জিজ্ঞাসু মন নিয়ে তিনি কুড়োতে লাগলেন--মারণ-উচাটন ইত্যাদি গুপ্ত বিদ্যা। মিলারেপা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তান্ত্রিকদের সাথে সাথে হয়ে উঠলেন তান্ত্রিক। শিশুর পবিত্র ও সরল মন গুপ্তবিদ্যার সিদ্ধস্থান। বালক মিলারেপা কয়েক বছরের মধ্যেই হয়ে উঠলেন—তন্ত্রসিদ্ধ

সিদ্ধিরাজ এদিকে মিলারেপার গ্রামে, তার পিতার ধনসম্পত্তিতে ধনী হয়ে তার কাকা হয়ে উঠেছে সত্যিকারের অর্থপিশাচ। তার ভিতরকার মায়া দয়া সম্পূর্ণ ভাবে তিরোহিত হয়েছে। তাদের পরিবারের এই সময় এক বিবাহ উপলক্ষে পাড়ার সবাই নিমন্ত্রিত হয়েছে, বিশেষ করে তার কাকার আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু বান্ধব সবাই সেখানে উৎসবে মত্ত। বলাই বাহুল্য, মিলারেপার মা ও বোন তখন গ্রামের কোণে অন্নাভাবে দিন গুনছেন। বিবাহ উৎসব যখন পূর্ণ মাত্রায় জমে উঠেছে ঠিক সেই সময় হল এক অবাক্ কাণ্ড ! বিরাট শব্দ করে সেই বাড়ীটার ওপর হঠাৎ যেন বজ্রপাত হ'ল আর তার ফলে সেই বাড়ীটা ধ্বসে পড়ল। চাপা পড়ল বিয়ের বর কনে আর নিমন্ত্রিতের দল, চারদিকে থেকে সবাই প্রাণভয়ে আর্তনাদ করে উঠল। দুঃখিনী মা কারমোকিয়েন সেই শব্দ শুনে তাঁর শিশু কন্যাকে কোলে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর গ্রামের চীৎকার শুনে তিনি কুড়ে ঘরের বাইরে এলেন ঘটনাটা কি তা দেখবার জন্য। তিনি যখন আবিষ্কার করলেন যে তাঁর সেই প্রাসাদোপম বাড়ীটা ভোজ বাড়ীর সবাই'র ওপর ধ্বসে পড়েছে তখন কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি, তারপর একটু ধাতস্থ হবার পরই উল্লাসে নেচে উঠলেন—তিনি হঠাৎ উন্মাদের মতো আনন্দে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন— তারপর চেঁচিয়ে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে নেচে নেচে বলতে লাগলেন— “হয়েছে, বেশ মজা হয়েছে-আমার ছেলে তার কাকার ওপর প্রতিহিংসা নিচ্ছে, এই বজ্রপাত মিলারেপা পাঠিয়েছে, সে-ই গুপ্তবিদ্যা রপ্ত করে এই মারণ অস্ত্র পাঠিয়েছে—বাণ মেরে বাড়ীটা ধ্বংস করেছে। তোমরা সবাই শুনে রাখো এ আমার মিলার কাজ, সে আজ সব অত্যাচারের শোধ নিচ্ছে।” দুঃখিনী মা যেন স্বৰ্গানন্দ ভোগ করছেন। এতদিনে তাঁর আশা পূর্ণ হচ্ছে। বাড়ীর মধ্যে সকলে চাপা পড়লেও তাঁর কাকা আর কাকিমা কিন্তু কোন রকমে ঘরের কোণে থেকে প্রাণে রক্ষা পেয়ে গেল—তাদের কৃতকর্মের সব জরিমানা তখনও বুঝি দেওয়া হয়নি। সকলে কারমোকিয়েনের সব কথা শুনলো। প্রথম প্রথম বিশ্বাস না করলেও শেষে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করল। সকলেই ভাবলো অসম্ভব হলেও সম্ভব হতে পারে, অধিকাংশ লোকে বিশ্বাস করলো ভয়ে। জিঘাংসার আনন্দে মা তখন প্রায় দিশাহারা। ব্যাপারটা অতি দ্রুত ঘটে যাওয়ায় গ্রামবাসীদের মনে দাগ কাটতে কয়েকদিন সময় নিল, তারপর তারা যখন কারমোকিয়েনের কথায় বিশ্বাস করলো তখন তারা কারমোকিয়েনকে ঘৃণার চোখে দেখতে লাগল। তার প্রতি গ্রামের অত্যাচার আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। ভিক্ষান্নও প্রায় বন্ধ হল ৷

সেই অত্যাচারে স্থির থাকতে না পেরে, কারমোকিয়েন দূত মারফৎ একটা চিঠি লিখে তার ছেলের কাছে পাঠালেন। তাতে তিনি লিখলেন যে অত্যাচার এখন চরমে উঠেছে, কাজেই আরও প্রতিশোধ নিতে হবে, প্রয়োজন হলে ঘর-দোর সব জ্বালিয়ে দিতে হবে—এটাও মায়ের আদেশ। পিতৃঋণ এইভাবে মিলারেপাকে শোধ দিতে হবে। চিঠি পাঠিয়ে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন—আর এক প্রলয়ের জন্য।

এরপর আবার একদিন শুরু হল প্রকৃতির তাণ্ডব নৃত্য, গ্রামে এবং আশে-পাশের ক্ষেতে যখন শাক-সব্জীর প্রাচুর্য, নতুন ফসল ঘরে উঠাবার জন্য যখন সবাই প্রস্তুত, সেই সময় শুরু হল শিলা বৃষ্টি। পরিষ্কার নীলাকাশ, এতটুকু মেঘের চিহ্ন নেই অথচ কোথা থেকে যে এই শিলাবৃষ্টি শুরু হয়েছে কেউ বুঝতে পারছেন না। আশ্চর্য বটে ! কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠ ঘাট শিলাবৃষ্টিতে সাদা হয়ে উঠল। সব ফসল নষ্ট হয়ে গেল, এই দেখে গ্রামবাসীরা হায় হায় করে উঠল।

আর ওদিকে মিলারেপার মা আর একবার আনন্দে নেচে উঠলেন। যারা তাঁদের সব বিষয়-সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদেব ঘরছাড়া করেছে তাদের প্রতি এটা হল চরম বজ্রাঘাত। সে বছর ফসলের অভাবে গ্রামে দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। অনেকে মরল আর যারা বেঁচে রইল তারা এই অরাজকতার জন্য দায়ী করল কারমোকিয়েনকে। তাকে সবাই ধিক্কার দিতে লাগল। কারমোকিয়েনের তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ যে দুঃখে তিনি কালাতিপাত করছেন তার থেকে বেশী দুঃখ আর পৃথিবীতে কি আছে। তার ছেলে মিলারেপা শক্তিশালী তান্ত্রিক হয়েছে, এটাই তাঁর সবচেয়ে গর্বের বস্তু হয়ে উঠল।

এই ঘটনার পরে মিলারেপার মা যত খুশীই হোন না কেন, মিলারেপার মনে এল এক বিরাট পরিবর্তন। তার গুপ্তবিদ্যার ফলে যে গ্রামের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল তার জন্য মিলারেপার মনে দেখা দিল অনুশোচনা। হিংসা দিয়ে তিনি হিংসাকে জয় করতে চাইলেন। মার্গে উঠার এটাই কি সত্যিকারের সোপান, ইত্যাদি বহু প্রশ্নে তার মন ভারাক্রান্ত হযে উঠল। তিনি নির্জনে বসে বার বার নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন—ধ্বংস নয়, মৃত্যু নয়, চাই আনন্দ, চাই মুক্তি। মারণ উচাটন বশীকরণ ধ্বংস বজ্রপাত এ সবই তো এ জগতের বিষয়। জগতের বাইরে আনন্দলোকে যাবার আসল পথ কি? সেটাই এখন আমাকে খুঁজে পেতে হবে। মিলারেপা হঠাৎ যেন নিজেকে নূতন করে আবিষ্কার করলেন। গুপ্তবিদ্যায় সিদ্ধি লাভ করে নিজেই ধ্বংসের জালে জড়িয়ে গেছেন, মুক্তির বদলে হয়েছেন সিদ্ধিবন্দী। তাঁর অন্তর-আত্মা এবার কেঁদে উঠল। চাই মুক্তি, চাই আনন্দ, সে এখন খুঁজতে হবে—এর জন্য চাই শুদ্ধগুরু। সে গুরু কোথায় পাওয়া যাবে? কে দেবে তার সন্ধান। মিলারেপার জীবনে এল বিরাট পরিবর্তন। জীবনমুক্তির জন্য তিনি খুঁজতে লাগলেন উপযুক্ত গুরু।

মিলারেপা তিব্বতের প্রত্যেকটি পাহাড়ে পর্বতকন্দরে উপত্যকায় দিনের পর দিন পর্যটন করতে লাগলেন আর খুঁজতে লাগলেন ইষ্টগুরু। তার সেই চেষ্টা বিফল হল না । আলো কোনদিন গাছের পাতায় ঢাকা পড়ে না, সূর্যকে মেঘ দিয়েও চিরকাল ঢেকে রাখা যায় না। মিলারেপা খুঁজে পেলেন গুরু। জ্ঞানিগুরু বিক্রমশীলের অধ্যক্ষ অতীশ দীপংকরের প্রভাবে সেইসময় যে সব যোগীরা তাঁর দর্শন তিব্বতে ছড়িয়ে দেন তারমধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য গুরু নারোপা। গুরু নারোপার শিষ্য মাপা ভারতবর্ষ থেকে তার জ্ঞান ভাণ্ডার ও পুঁথি তিব্বতে নিয়ে আসেন। ভাগ্যদেবতা মিলারেপাকে নিয়ে এলেন সেই গুরুর পদতলে।

শুরু হল মিলারেপার মুক্তিস্নান। সে স্নান তো সহজ নয়, হাবু ডুবু খেতে খেতে বেঁচে থাকার মতো।

গুরু মার্গা প্রথমেই আদেশ দিলেন—“এখানে আমি একটা দশতলা বাড়ী করতে চাই, দুরে ওইখানে অনেক পাথর আছে সেগুলিকে একে একে এনে সাজাতে হবে। বাড়ীটা সুন্দর হওয়া চাই আর আমি চাই যে সেটা গোলাকৃতি হবে। তোমাকে একাই সব করতে হবে। তুমি তো যাদুকর কাজেই দেখা যাক তোমার কেরামতি । বাড়ী হয়ে গেলে তোমাকে দীক্ষা দেবো।” দীক্ষার কথা শুনেই মিলারেপার প্রাণে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। শুরু হল কাজ। কাজটা খুবই কঠিন। প্রথমে ভিত কাটা, তারপর পাথর কাটা, এরপর সেগুলোকে একটা একটা করে এনে সাজিয়ে দেয়াল তোলা । সাধারণ লোকের পক্ষে এ কাজ খুবই কঠিন। মিলারেপার পক্ষেও কাজটা খুব কঠিন কারণ এ কাজটা সম্পূর্ণ করতে হবে তার যাদুবিদ্যার কৌশল না খাটিয়ে। কয়েকদিনের মধ্যে তার হাত ও পায়ের চামড়া ফাটতে আরম্ভ করল, তারপর পিঠে পাথর বইতে বইতে চামড়ায় দেখা দিল ক্ষতচিহ্ন। তবুও তিনি হাসিমুখে চালিয়ে যেতে লাগলেন তার কাজ। তাঁর মনে একমাত্র ভরসা যে জীবনমুক্তির জন্য তিনি দীক্ষা পাবেন। বাড়ীর নীচের তলাটা সবে মাত্র সম্পন্ন হয়েছে এমন সময় গুরু মার্সা এলেন——তারপর কোনরকম ভূমিকা না করেই চেঁচিয়ে উঠলেন – “এরকম করে কে করতে বলেছে—এরকম হবে না, সব ভেঙ্গে ফেলে দাও।” গুরুবাক্যের এতটুকু প্রতিবাদ না করে নিজের তৈরী ঘরগুলোকে ভেঙে দিলেন। তারপর গুরুর আদেশে আবার শুরু হল নূতন কবে ঘর তোলা। একে শীত তার উপর তিব্বতের এই খস খসে পাথর । কোনরকম যাদুবিদ্যার প্রয়োগ না করে আস্তে আস্তে তিনি আবার গড়ে তুলতে লাগলেন গুরু নির্দেশিত গৃহ ।

এবারে অনেক চেষ্টায় প্রায় দোতলা পর্যন্ত তুলেছেন আবার এলেন গুরু, তিরস্কার করে বললেন এরকম বাড়ী আমি চাই না অন্য রকম হবে, শুধু তাই নয়, স্থানও পরিবর্তন করতে হবে। গুরুর কথায় এতটুকু প্ৰতিবাদ না করে আবার তিনি নিজের হাতে এত কষ্ট করে গড়া বাড়ীটা ভাঙতে ৰাধ্য হলেন। আগের বারের মতো এবারেও তিনি গুরুকে কিছুই বললেন না। আবার নূতন নির্দেশে শুরু হল গৃহনির্মাণ। তাঁর হাত দুটো পাথরের জন্য ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে— হাতে ন্যাকড়া বেঁধে তাঁকে কাজ করতে হয়, পিঠের ঘা-টা বিরাট, সম্পূর্ণ পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। রক্তে ক্ষত-বিক্ষত দেহ, তবুও তাঁর এতটুকু প্রতিবাদ নেই। দ্যা এরপর আরও কয়েকবার চলল- এই ভাঙা গড়ার খেলা। কিন্তু শেষবারে মিলারেপার দেহ সত্যি ভেঙে পড়ল। গুরুপত্নী দামেমা মাঝে মাঝে খাবার নিয়ে আসেন, আর ক্ষত-বিক্ষত দেহে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন আর নীরবে মিলারেপার এই অবস্থা দেখে অশ্রুপাত করেন। দামেমাই আজকাল মিলারেপার মায়ের স্থান অধিকার করেছেন, তাঁর এই স্নেহই মিলারেপার দুঃখে ভরসা। এত দুঃখেও মিলারেপা শুরুর বিরুদ্ধে এতটুকু প্রতিবাদ করেননি। তারপর এমন একদিন এল যখন মিলারেপার ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে আর কাজ করা অসম্ভব হয়ে দাড়ালো। করুণাময়ী দামেমা মৃত্যু পথযাত্রী মিলারেপার কথা স্বামীকে জানালেন—আর সেই সাথে সাথে প্রার্থনা করলেন—মিলারেপার প্রতি সদয় হতে।মার্পার চরিত্র দামেমার ঠিক বিপরীত । এত জ্ঞানী হয়েও মিলারেপার প্রতি তার এতটুকু করুণা হ'ল না, উপরন্তু দামেমাকে ভর্ৎসনা করে বললেন—“ও সব ন্যাকামি করছে, ওই ভণ্ডামী আমার কাছে খাটবে না। দশতলা বাড়ী হয়ে যাওয়ার পর আমি তাকে দীক্ষা দেবো সে কথা তো আগেই বলেছি।” দামেমার কথায় মাপার পাষাণ হৃদয় গলল না। দেহের অবস্থা আরও কঠিন হয়ে উঠল, মিলারেপা কুষ্ঠ ব্যাধির মতো চলচ্ছক্তি রহিত হলেন—এতদিনে তিনি মুখ ফুটে কথা বললেন—তিনি অতি বিনীতভাবে বললেন — “আমি যখন আপনার আদেশ বহন করতে পারছি না তখন আর এখানে থেকে কি হবে, আমাকে চলে যেতে আজ্ঞা দিন।” গুরু আগের মতোই তিরস্কারের স্বরে বললেন- “তুমি কেথায় যাবে? তোমার দেহ মন ও প্রাণ আমাকে সমর্পণ করেছো। তোমার দেহ তো আর তোমার নয়; ও সবই আমার। কাজেই তোমার যাওয়া চলবে না।”

গুরুর এই বাক্যের পর আর কথা চলে না—মিলারেপা ভেবে দেখলেন কথাটা সত্য। গুরুর চরণে একবার যা নিবেদন করা হয়েছে তার ওপর আর তাঁর অধিকার নেই। দামেমা ঘরের ভেতর থেকে সব কথাই শুনলেন--তারপর স্বামীর কাছে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই মিলারেপার সেবায় গেলেন। মা হয়ে এ দুরবস্থা তিনি কি করে চোখে দেখবেন। গুরু মাপা আর গুরুপত্নী দামেমা দু'জনের চরিত্র ঠিক বিপরীত। একজনের বজ্রাদপি কঠোরাণি, আর একজনের মৃদুনি কুসুমাদপি। মিলারেপা দেখলেন যে তাকে নিয়েই গুরুমার যত চিন্তা ভাবনা। গুরুমার কষ্ট মিলারেপার জন্যই—কাজেই এমতাবস্থায় সেখানে না থাকাই উচিত। একটু সুস্থ হতেই একদিন ভোরবেলা তিনি বেরিয়ে পড়লেন নিরুদ্দেশের পথে।

সকালবেলা মিলারেপাকে ডাকতে গিয়ে দামেমা দেখলেন যে মিলারেপা ঘরে নেই,

সে চলে গেছে, সঙ্গে নিয়ে গেছে শুধু কয়েকটি বই যেগুলো ছিল মিলারেপারই পৈতৃক সম্পত্তি। দামেমার মাতৃহৃদয় কেঁদে উঠল। স্বামীকে গিয়ে সে কথা জানাতে সেই বজ্রকঠিন গুরুও চোখের জল সম্বরণ করতে পারলেন না। গুরুমা এই প্রথম বুঝলেন যে তার স্বামীর হৃদয়েও মিলারেপার স্থান ছিল। তাদের একটি নিজস্ব শিশুপুত্রও ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হয় মিলারেপার অবর্তমানে ঘর হয়ে গেল শূন্য । দামেমা কিছুতেই বুঝতে পারলেন না কেন তার স্বামী মিলারেপাকে এত কষ্ট দিতেন । মাপা জ্ঞানী গুরু, মনে মনে ভাবতেন যে নিশ্চয়ই একদিন দামেমা সব বুঝতে পারবেন। মিলারেপা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর আবার ফিরে এলেন। গুরুর পায়ে অর্পিত ধন নিয়ে তিনি কিছুতেই চলে যেতে পারেন না। তাকে পেয়ে দামেমা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মাপাও মনে হয় খুশীই হলেন, তবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটল না। এইবারে মিলারেপার দীক্ষার প্রশ্ন করা হলে মাপা বললেন— গুরুদক্ষিণা ছাড়া কিছুতেই দীক্ষা দেওয়া চলবে না। মিলারেপাকে নিয়ে গুরু মাপার চলল নতুন খেলা। দামেমা মিলারেপাকে একটা বহুমূল্য মণি দিয়ে বল্লেন—“এইটা গুরু প্রণামী দিয়ে তুমি দীক্ষা নিতে পারো”, কিন্তু গুরু অতি কঠিন। দামেমা তার ধর্মপত্নী অতএব দামোর সম্পত্তি মানেই গুরু মাপার সম্পত্তি, অতএব অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। দীক্ষা ও গুরুদক্ষিণা নিয়ে আরও কিছু সময় অতিবাহিত হয়। মা দামেমা মিলারেপাকে নিয়ে গুরুর এই খেলাকে আর সহ্য করতে পারলেন না। কারণ তিনি ভাবলেন যে এইভাবে আশার আলোর পিছনে ঘুরে ঘুরে ছেলেটা একদিন মারা পড়বে। তাই তিনি গুরু মাপার প্রধান শিষ্য এবং দর্শন শাস্ত্রের অধিকারী নোংডুন-এর কাছে একটা চিঠি ও কয়েকটি অতুলনীয় সামগ্রী সমেত মিলারেপাকে পাঠিয়ে দিলেন দীক্ষার জন্য। নোংডুন মিলারেপার মারফৎ গুরুমার চিঠি ও বস্তু সামগ্রী পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলেন এবং বিশেষ যত্ন ও পবিত্রতার সঙ্গে মিলারেপাকে প্রাথমিক দীক্ষিত করলেন। আনন্দলোকের পথে মিলারেপা আর এক সোপান আরোহণ করলেন। মিলারেপা শুরু করলেন তপস্যা। এরপর এল সেই আকাঙ্ক্ষিত দিনটি। যেই দিনটির জন্য মিলারেপা ধৈর্য ধরে এত দৈহিক এবং মানসিক কষ্ট স্বীকার করেও অধীর আগ্রহে দিন গুনছিলেন।

গুরু মাপা ধূমধাম করে মিলারেপাকে পূর্ণ দীক্ষা দিলেন, স্বার্থক হল মিলারেপার মানব জীবন। সেইদিনই গুরু মার্সা মিলারেপাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন – “তুমি তোমার আরদ্ধ কর্ম সম্পন্ন করেছো, দৈহিক ও মানসিক কষ্টের মাধ্যমে তোমার কৃতকর্মের ফল পুড়িয়ে দিয়েছো। তোমাকে তোমার গুপ্তবিদ্যার কর্মফল থেকে উদ্ধার করবার জন্যই আমি তোমার ওপর এত বোঝা চাপিয়েছিলাম, আমি জানতাম যে তুমি পারবে। দামেমা যদি তার স্নেহ দিয়ে তোমার পথ আটকে না রাখতো তাহলে আরও আগেই তুমি মুক্তি পেতে।” স্নেহময়ী দামেমা গুরু ও শিষ্যের এই মিলন দৃশ্য দেখে আনন্দের আবেগে অশ্রু সম্বরণ করতে পারলেন না। পুত্রের আনন্দে মাতার আনন্দ ৷ গুরু মাপা, মাতা দামেমা আর মিলারেপার সেই আনন্দের দিনটি ইতিহাসের পাতায় রইল অমর হয়ে। এবার আর কোন প্রতিবন্ধক নেই। এখন থেকেই মিলারেপার শুরু হবে শুধু তপস্যা, তপস্যা আর তপস্যা ।

তবে মূল সিদ্ধাসনে বসবার আগে মিলারেপার একটা কর্তব্য বাকী ছিল— সেটা হচ্ছে তার দুঃখিনী মাতা ও স্নেহের ছোট বোনটির খোঁজ নেওয়া। তারা কোথায় আছে, কি করছে, কিভাবে তাদের চলছে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া তাঁর কর্তব্য। তাই মিলারেপা রওনা হলেন তাঁর গ্রামের দিকে। নিজের কীর্তি সম্পর্কে মিলারেপা সচেতন ছিলেন, তাই সরাসরি গ্রামের কাছে এসেও তিনি গ্রামে ঢুকলেন না, গ্রামের বাইরে থেকেই তিনি খোঁজ খবর নিতে লাগলেন। অপরের মুখ থেকে তিনি নিজের কাহিনী শুনলেন—কাকার বাড়ী ধ্বসে পড়া থেকে আরম্ভ করে গ্রামে কিভাবে শিলাবৃষ্টি পড়ে মহামারীর সৃষ্টি হয়েছিল ইত্যাদি সব কাহিনী। কাকা কাকিমা এখনও বেঁচে আছেন। বাগদত্তা বধূ জেসে এখন পূর্ণ যুবতী, তিনি সব সময়ই মিলারেপার প্রত্যাবর্তনের আশায় দিন গুণছেন। মাতা কারমোকিয়েন দেহত্যাগ করেছেন আর বোন পেতা ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব কাহিনী শুনে মিলারেপার মনটি দুঃখে ডুকরে কেঁদে উঠল। সন্ধ্যার পর মিলারেপা আস্তে আস্তে তাঁর গ্রামে ঢুকলেন। দীর্ঘদিনের তপস্যার ফলে আর গুহায় গুহায় রাত কাটাবার দরুণ অন্ধকার তাঁর কাছে আর অন্ধকার নয়। রাতের তারাই তাঁর কাছে প্রদীপের আলো। তিনি দেখলেন তার কাকার বাড়ীর ধ্বংসস্তূপ, তারপর এলেন তাঁদের সেই পরিত্যক্ত কুটীর ঘরে। ঘরের চালা ধ্বসে পড়েছে, জানালা দরজা তো নেই। কোনরকমে চারটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে মাত্র। ভগ্ন কুটিরের সেই মেজেতে ছেঁড়া কাঁথা ও তক্তার মধ্য থেকে মিলারেপা কোন রকমে উদ্ধার করলেন তাঁর দুঃখিনী মায়ের শবদেহ। একমাত্র কিছু হাড় ছাড়া সেই দেহের আর কোন চিহ্নই নেই। বনের পশুরাই তার সৎকারের বন্দোবস্ত করেছে। মায়ের পরিত্যক্ত হাড়গুলো নিয়ে মিলারেপা দুঃখের বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে বসে পড়লেন। ছোটবেলা থেকেই মিলারেপা গান গাইতে ভালবাসতেন, দুঃখে বা সুখে সব সময়ই তিনি গান গাইতেন। এই সময়ে, তার শিশুকাল থেকে এই পর্যন্ত যে সব ঘটনা ঘটেছে সব মনের ওপর ভেসে উঠল। পিতার মৃত্যু, মায়ের প্রতি তার কাকার লাঞ্ছনা, মায়ের আদেশে গুপ্তবিদ্যার জন্য গৃহত্যাগ, তারপর বিদ্যালাভ ও বশীকরণ, শুদ্ধ সাধনার পথ অন্বেষণ, দীক্ষালাভ, সব শেষে এখন মিলারেপার জীবনে এসেছে স্থিতি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে যাদের জন্য জীবনের এই বিরাট পরিবর্তন, যারা ছিল কাছে তারা এখন দূরে। কার কাছেই বা মিলারেপা তাঁর আত্মকথা শুনাবেন, এই চিন্তাস্রোতগুলো মিলারেপার মধুর কণ্ঠ দিয়ে সংগীতের আকারে প্রকাশ হতে লাগল। মনে হল তাঁর পিতা ও মাতা পরলোক থেকে মিলারেপাকে আশীর্বাদ করতে লাগলেন ৷

পরদিন মিলারেপা মাতার অবশিষ্ট অস্থিগুলো সংগ্রহ করে গ্রামের কাছেই একটি স্থানে সমাধিস্থ করে. তার ওপর তৈরী করলেন এক সুন্দর সমাধিস্তূপ। সেই সমাধিস্তূপের পাশে বসে তিনি আবার গাইলেন জীবন মরণের চির বন্ধন থেকে চিরমুক্তির গান । এরপর মিলারেপা গ্রামের অনতিদূরের একটি গুহাতে তপস্যা করতে লাগলেন ৷ কয়েকদিন পর তিনি ভিক্ষার জন্য আবার এলেন গ্রামে। ভোলানাথ মিলারেপা ভেবেছিলেন যে গ্রামের মানুষ এতদিন পর তাঁকে ভুলে গিয়েছে, কিন্তু নিয়তির পরিহাস আর গুপ্তবিদ্যার কর্মফল এখনও খণ্ডাতে কিছু বাকি ছিল। ভিক্ষার জন্য প্রথম যে বাড়ীর দরজায় এসে দাঁড়ালেন সেটাই ছিল তাঁর কাকীর বাড়ী। মিলাকে দেখেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলেন, ক্রুদ্ধস্বরে বাঘিনীর মতো তিনি সকলকে জড়ো করে চেলাকাঠ নিয়ে গুহাবাসী রুগ্ন মিলারেপার ওপর এতটুকু দ্বিধা না করে প্রহার করতে লাগলেন। তাতেই কাকী ক্ষান্ত হলেন না, তিনি তাদের কুকুরগুলোকে লেলিয়ে দিলেন। মিলারেপা কোনপ্রকারে পাশের একটি পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোন রকমে প্রাণরক্ষা করলেন। অবস্থা একটু শান্ত হলে তিনি পুকুর থেকে উঠে এলেন—তারপর কাকার দিকে তাকিয়ে আবার একটা গান ধরলেন— গানের আসল কথাটা এইরূপ—“ঠিক কথা যে আমি তোমাদের বাড়ী ধ্বসিয়েছি, তোমাদের জমিতে মহামারী এনেছি—তোমার ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়স্বজনদের মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী, কিন্তু তার আগের কথাগুলো কি তুমি ভুলে গিয়েছো ? আমার পিতার জমিজমা সর্বস্ব অপহরণ করে তুমি কি একটি বিধবাকে ঘরছাড়া করনি? নিঃসম্বল অবস্থায় সেই বিধবা দুটি শিশুকে নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে অন্নের জন্য কি ঘুরে বেড়ায়নি, তোমার অত্যাচারে সেই বিধবার চোখের জলে দুটি শিশুর ভবিষ্যৎ কি তোমরা করুণার চোখে দেখেছো, দুঃখিনী মা এখন অন্নাভাবে ঘরের মধ্যে পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল আর তার মেয়েটি পেটের দায়ে কোথায় চলে গেল তার জন্য কি তুমি দায়ী নও ? আর এখন বলছে তোমাদের অমঙ্গলের জন্য আমিই দায়ী। আমি এখন চিরানন্দের জন্য দীক্ষা নিয়েছি, আমার পথ এখন আর হিংসার নয়, আমার পথ মুক্তির পথ—ক্ষমার পথ। তোমাদের আমি ক্ষমা করলাম। আর তোমাদের মুক্তির জন্য আমি প্রার্থনা করবো। তোমরা আমাকে যে যাতনা দিলে তার জন্য আমি এতটুকু দুঃখিত নই, ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন। আসলে তোমাদের জন্যই তো আমার এই পথ অবলম্বন করা।' মিলারেপার এই গান শুনে সেই পাষাণহৃদয়া কাকীও অশ্রু সম্বরণ করতে পারলেন না। এরপর মিলা গ্রামের যেখানে যান সেখান থেকেই পেলেন রক্তচক্ষু আর ভৎসনা !

এরপর মিলারেপা দেখা করলেন তার বাগদত্তা বধূ জেসের সাথে। জেসের তখন ভরা যৌবন—মিলারেপার জন্যই তিনি বসেছিলেন। মিলারেপা তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে তাঁর পথ অতি কঠিন পথ, সে পথে কাউকে জড়াতে তিনি চান না। বস্তুতঃ সেটা সন্ন্যাসের পথ—-ত্যাগের পথ। সব কিছু ত্যাগ না করলে পরিপূর্ণতা আসে না । তাইতো তিনি এ পথ বেছে নিয়েছেন। মিলারেপা জেসেকে জীবনের পথে চলবার জন্য যথাযথ উপদেশ দিলেন আর জেসেও তা মেনে নিলেন—। তবে জেসে ইচ্ছে করলে মিলারেপাকে মাঝে মাঝে দেখতে যেতে পারেন, তাতে কোনো বাধা নেই ৷

জেসের মাধ্যমে মিলারেপা তার বোন পেতাকেও খুঁজে পেলেন। পেতা এখন রাস্তার ভিখিরী। সে মিলারেপার এত কৃচ্ছ্রসাধনের কিছুই বুঝল না। ভিখিরী পেতার কাছে মিলারেপার যত অলৌকিক ক্ষমতাই থাক না কেন--আসলে সেও ভিখিরী বই আর কিছু নয়। অলৌকিক শক্তিবলে সে যদি বড়লোক না হতে পারল তাহলে তার স্বার্থকতা কোথায়! পেত্তাকেও মিলারেপা সাধনগুহায় আসবার অধিকার দিলেন।

মিলারেপার লৌকিকাচার ও কর্তব্য এবার শেষ হ'ল, আবার শুরু হ'ল তাঁর তপস্যা। পাহাড়ের নির্জন গুহাই তার একমাত্র স্থান। গুরু মাপা, তাঁর গুরু নারোপার কাছ থেকে অর্থাৎ ভারতবর্ষ থেকে যে সব দুষ্প্রাপ্য পুঁথি সংগ্রহ করে এনেছিলেন তারই মাধ্যমে চলল মিলারেপার শাস্ত্র সাধনা। মহাগুরু নারোপা ছিলেন পূর্ণসিদ্ধ, মৃত্যুর পরও তিনি বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে বেঁচে ছিলেন। তিনিই মার্সাকে স্বপ্নে বলে দিলেন যে মিলারেপাই হচ্ছে তাঁর উপযুক্ত প্র-শিষ্য ; এই মিলারেপার মাধ্যমেই তিব্বতে প্রকাশিত হবে সিদ্ধ সাধনার প্রকৃতরূপ। মহাগুরুর দর্শনে ও মিলারেপার সাধন প্রসঙ্গ আলোচনা করার জন্য গুরু মাপা আবার এলেন ভারতবর্ষে। মহাগুরু তাঁকে দর্শন দিয়ে আবার দর্শন-শাস্ত্রে ভরিয়ে দিলেন তাঁর ঝুলি। এইভাবে মিলারেপা পরোক্ষভাবে ভারতীয় দর্শন সাধনা সমাপ্ত করলেন ।

মিলারেপা জন্মেছিলেন সাধনার ব্রত নিয়ে। সাধনার যে মার্গেই যান সেই মার্গের উচ্চ শিখরে না উঠে ছাড়েন না। সিদ্ধ সাধনার পর শুরু করলেন বদ্ধ সাধনা, অর্থাৎ গুহার মধ্যে ভেতর থেকে পাথরের পর পাথর সাজিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বাইরের জগৎ থেকে আলাদা করে নেওয়া। মিলারেপার এই বদ্ধ সাধনার সময় গুরুমা দামেমা গুহার একটা ফুটো দিয়ে মিলারেপাকে দিনে একবার খাবার দিয়ে আসতেন। মিলারেপা কোনদিন খেতেন, কোনদিন খেতেন না। একবার ধ্যানে বসলে আর ধ্যান ভাঙতো না, ধ্যানের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেতেন আনন্দলোক । ক্ষুধা-তৃষ্ণাকে তিনি অতি ছোটবেলা থেকেই জয় করেছিলেন। দিনের পর দিন তাঁর না খেলেও চলতো।

গুরু মার্সা মিলারেপার একাগ্রতায় ও তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে ব্রহ্মবিদ্যা প্রদান করলেন। সদ্গুরু মার্সা মিলারেপাকে এই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা দিয়ে বললেন—“তুমি আমার প্রাণাধিক, আমার যথাসর্বস্ব তোমাকে দিয়ে আমি এখন মুক্তি পেলাম। আমার গুরুর কাছে কৃত ঋণ সমাপ্ত হল । তুমিই হবে আমার উত্তরাধিকারী।”

পরবর্তীকালে মিলারেপাই হয়েছিলেন গুরু মাপার আশ্রমের প্রধান গুরু। সর্ব তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে মিলারেপা তাঁর গানের মাধ্যমে সকলকে উপদেশ দিতে লাগলেন। জগতের যাবতীয় বাসনার পরিণতি দুঃখে, দুঃখ দিয়ে দুঃখ জয় করা যায় না, হিংসার দ্বারাও নয়। জগতেই যারা আনন্দ খোঁজে সে আনন্দ জগতেই শেষ হয়, আসল আনন্দ রয়েছে মহাজগতে—সেটা চিরানন্দ-তার শেষ নেই ।

ধ্যানের মাধ্যমে মন শান্ত হয় ; সেই শান্ত মনে আত্মাজিজ্ঞাসা করলে উপযুক্ত পথের সন্ধান পাওয়া যায়। সর্বজীবে সমভাব মানবজীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। চিন্তাশূন্যতার একটা মহাসমুদ্র আছে, সেই সমুদ্রে অবগাহন করলে পাওয়া যায় অমৃতলোকের সন্ধান। এই শূন্যতা রিক্ততা নয়—দেহবোধশূন্য অবস্থাই বুদ্ধাবস্থা এটাইতো বজ্রযানের চরম পরিণতি।

মিলারেপা তপস্যার জন্য একটি গুহায় কোনদিন বসে থাকেননি। একটু বাধা বা বিরক্তি এলেই তিনি গুহা পালটাতেন, এইভাবে তিনি হিমালয়ের গুহায় গুহায় বছরের পর বছর ঘুরে সাধনা করলেন। এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়ে যেতেও তাঁর কোনরকম বাধা ছিল না। দেহ তাঁর কাছে প্রধান নয়, সে মনের দাসমাত্র; মন যেখানে যাবে দেহ তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য। শেষের দিকে মহাযোগী মিলারেপা গতিসিদ্ধি লাভ করলেন। বিনা পরিশ্রমেই তিনি স্থান পরিবর্তন করতেন। তারপর মহাযোগীর কথা আর গোপন রইল না, তিব্বতের গ্রামে গ্রামে প্রচারিত হয়ে গেল এই সিদ্ধ পুরুষের বাণী। দলে দলে লোক এসে জড়ো হতে লাগল তাঁর গুহার কাছে।

মিলারেপার বোন পেতা মিলারেপার সাথে আবার যোগাযোগ করে চলে আসে দাদাকে সাহায্য করতে বিশেষ করে তার গুহায় খাদ্য-সামগ্রী পৌঁছে দেবার দায়িত্ব সেই গ্রহণ করে। তবে দাদার এই কঠোর তপস্যার কারণ তার কাছে চিরদিনই অজ্ঞাত থেকে গেছে। পেতার সেই একই কথা–মহাগুরু হয়েও যদি ন্যাংটা থাকতে হয় তাহলে এত কষ্ট করে সাধনার কি প্রয়োজন আছে? জেসেও মিলারেপার সাথে মাঝে মাঝে দেখাশুনো করেছেনে বটে, কিন্তু সারাটা জীবন তাকে নিঃসঙ্গই থাকতে হয়েছে। কারণ মিলারেপার কাছে দেহের কোন মূল্য নেই—মূল্য আছে মনের। সেই মহামূল্য মন কে যদি বুদ্ধের চরণে না সমর্পণ করা যায় তাহলে তার স্বার্থকতা কোথায়? তাই তিনি বারবার গাইতেন—“সব ছাড়ো, সব ছাড়ো, সব না ছাড়লে কিছুই পাবে না ।

মিলারেপার উপদেশ আর গান আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র তিব্বতে। মিলারেপা হয়ে উঠলেন তিব্বতের মহাগুরু ও জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ। সম্মান ও খ্যাতি মিলারেপাকে তাঁর সিদ্ধাসন থেকে নামাতে পারেনি। গুহাবাসী থেকেই মিলারেপা প্রচার করতে লাগলেন তাঁর অমর আনন্দবাণী—আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবনের জন্য ক্ষুদ্র আনন্দের পিছনে না ছুটে চিরজীবনের জন্য মহানন্দের সন্ধান খুঁজতে হবে। গৃহ-জমি-সোনা-শিষ্য এ সবই এই সাধারণ জীবনের জন্য, যে কোন অজ্ঞান লোকই এর অধিকারী হতে পারে। কিন্তু যারা প্রজ্ঞাবান তারা চান চিরন্তন সত্যকে জয় করতে। দেহে বল থাকতে সেই সাধনায় অগ্রসর হতে হবে, পরে নয়। মিলারেপা প্রথমবার তাঁর গ্রামে ফিরে গিয়ে একটি গানের মাধ্যমেই এই কথাটি সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছিলেন—‘যখন উর্বর ছিল জমি, জমির মালিক ছাড়ল ভূমি। যখন মালিক এল ফিরে তখন আগাছায় জমি গিয়েছে ঢেকে। অর্থাৎ মন ও দেহে যখন শান্তি ও সামর্থ্য থাকবে সেই সময়ই সাধন মার্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পরে হবে বলে সাধন মার্গকে যারা দূরে সরিয়ে রাখে তাদের অবস্থা, উর্বর জমি ছেড়ে মালিকের অন্যত্র গমনের সাথেই তুলনা করা যেতে পারে ৷

এই দেহ নশ্বরই, কাজেই এর পেছনে ছুটে লাভ নেই। সেই দেহ যত বড় মহাপুরুষেরই হোক না কেন, দেহের কোন মূল্য নেই, মুল্য আছে আত্মার। তাই

মিলারেপা তাঁর শিষ্যদের বলে গিয়েছেন—“আমার মৃত্যুর জন্য কেউ শোক করবে না—আমার মর-দেহ নিয়ে কোনরকম অনুষ্ঠান করবে না—এই দেহটা কোন এক অজানা গুহায় যদি পড়ে থাকে এবং তা যদি পশু ও কীটের ভক্ষ্যবস্তু হয় তাহলেও তোমরা তারজন্য কোনরকম চিন্তা করবে না। মৃত্যুর পর আমি কোথায় যাবো কোথায় থাকবো সে চিন্তাও তোমরা করবে না, কারণ মুক্ত আত্মার কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, সেটাই হচ্ছে পরম মুক্তি।”

মহামুনি, তিব্বতের বাউল ঋষি মিলারেপা তাঁর সব বাণীই গানের মাধ্যমে সকলকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সুকণ্ঠে যিনিই তাঁর বাণী পেয়েছেন তিনিই ধন্য হয়েছেন। প্রকৃতিদেবী ছন্দের আকারে মিলারেপার দেহে প্রবেশ করেছিলেন—আর তারা দেবী জুগিয়েছেন তাঁর ভাষা। মিলারেপার কঠোর জীবন পরবর্তীকালে ভরে উঠেছিল পূর্ণ আনন্দ ও ছন্দে ।

মহাযোগী ও অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন মিলারেপার মৃত্যুটিও ছিল বড় অদ্ভূত ও বেদনাদায়ক। মিলারেপা ছিলেন পরম পবিত্রতার প্রতীক। গরীব জনসাধারণের তিনি ছিলেন পিতৃস্বরূপ। ধর্মের ব্যাপারে তাঁর শিক্ষা ছিল অতি সহজ। তিনি কত কষ্ট ও তপস্যার ফলে আধ্যাত্মিক জগতের উচ্চ শিখরে উঠেছেন, অথচ অন্যের জন্য তিনি সব সময়ই সহজ ও সরল পথ বলে দিতেন। শাস্ত্রপাঠ ও আড়ম্বর অনুষ্ঠান পূজাপদ্ধতির মাধ্যমে সময় নষ্ট না করে সরাসরি ধ্যানের মাধ্যমে সমাধিস্থ হওয়ার কথাই তিনি উপদেশ দিতেন।

মিলারেপার এই সহজ ও সরল পথের উপদেশ সেই সময়কার লামা মহলে খুব বেশী মর্যাদা পায়নি। কারণ সেই সময়কার অধিকাংশ লামাই সাধারণ মানুষদের বিশ্বাস ও সরলতার সুযোগ নিয়ে গুরু-ব্যবসা বেশ জমিয়ে বসেছিলেন। এই শ্রেণীর লামারা ছিলেন খুব ধনী আর সমাজে প্রভাবশীল।

লামা সাফুয়া তাঁদেরই একজন। মিলারেপার সুনাম ও অত্যাশ্চর্য অলৌকিক ক্ষমতা ও তপস্যার কথা তখন তিব্বতের ঘরে ঘরে প্রচারিত। লামা সাফুয়ার অনেক ভক্তও মিলারেপার আদর্শে ঝুঁকে পড়েছে দেখে সাফুয়া হিংসায় জ্বলে উঠল। মনে মনে ভাবল মিলারেপা যদি এইভাবে আর কয়েক বছর তাঁর উদার বাণী প্রচার করতে থাকেন তাহলে শুধু লামা সাফুয়া নয়, তিব্বতের সমস্ত লামা ব্যবসায়ে ভাঙন ধরবে। লামা সাফুয়া ছিল লামার ছদ্মবেশে সত্যিকারের ভণ্ড।

মিলারেপাকে সে লামা মহলে তর্কে আহ্বান জানালো। মিলারেপা তার সেই অভিপ্রায় বুঝতে পেরে লামা সাফুয়াকে নিরস্ত্র করলেন। লামা সাফুয়া তারপর বিভিন্ন কারণে ও অকারণে মিলারেপাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করতে লাগল। মহযোগী মিলারেপা হাসিমুখে লামা সাফুয়ার সব চেষ্টাই ব্যর্থ করে দিলেন। এবার লামা সাফুয়া মরিয়া হয়ে উঠল—যে কোন প্রকারে হোক মিলারেপাকে জগৎ থেকে সরিয়ে দিতে হবে, নয়তো লামাকুলের সর্বনাশ হয়ে যাবে ।

অনেক চিন্তা-ভাবনা করে কপট লামা সাফুয়া এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। লামা সাফুয়ার চরিত্র বলতেই কিছু ছিল না—তার কয়েকটি উপপত্নী ছিল। তাদেরই একজনকে ডেকে সে তার ষড়যন্ত্রের কথা জানালো । মহিলাটি প্রথমে রাজি হতে চাইল না। কিন্তু লামা সাফুয়া তাকে বুঝিয়ে দিল যে মিলারেপা আসলে একটি ভণ্ড, তার ভিতরে সত্যিকারের জ্ঞান বলতে কিছু নেই, কাজেই এমন লোকের প্রাণহানিতে জগতের কল্যাণ বই অকল্যাণ হবে না। মহিলাটি এবারে রাজি হল। লামা সাফুয়া তার হাতে একবাটি দই দিয়ে বলল যে, এই দইটা মিলারেপাকে খাইয়ে দিতে হবে। এই দইয়ের মধ্যে আছে মরণ বিষ যা খেলে কোন মানুষই আর বেঁচে থাকতে পারে না। ভক্তাধীন মিলারেপা ভক্তের হাতের এই খাদ্য গ্রহণ করবেই। যে রকম করেই হোক, মিলারেপাকে এটা খাইয়ে দিতে হবে। লামা সাফুয়ার প্ররোচনায় এবং আশ্বাসে মেয়েলোকটি দইয়ের বাটি নিয়ে মিলারেপার গুহার কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। মিলারেপার দর্শনের জন্য রোজই কেউ না কেউ কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে আসে, কাজেই মিলারেপার শিষ্যদের মধ্যে কেউ বিষপূর্ণ দধিপাত্র হাতে নিয়ে মেয়েলোকটিকে দেখে সন্দেহ করেননি। অন্তর্যামী মিলারেপা মেয়েলোকটিকে দেখেই হেসে স্বাগত জানালেন, তারপর বললেন, যে, “আমি জানি তুমি কি এনেছো, তবে আজ নয় কাল এস।” মিলারেপার কথা শুনে মহিলাটির বুক কেঁপে উঠল এবং ভয়ে সর্বশরীর কেঁপে উঠল। কোন রকমে মিলারেপাকে প্রণাম করেই দৌড়ে পালিয়ে গেল। লামা সাফুয়া তার ষড়যন্ত্র ভেস্তে যাচ্ছে দেখে মরিয়া হয়ে উঠল। সে মেয়েলোকটিকে আশ্বাস দিয়ে বলল যে, ভয়ের কোন কারণ নেই, দইএর মধ্যে কি আছে তা মিলারেপা কিছুই জানেন না। তাঁর হেঁয়ালিপূর্ণ কথায় ভেঙে পড়লে চলবে না। সাফুয়ার কথায় মেয়েটি আরও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, সৌম্যমূর্তি মিলারেপাকে দর্শনের পর তাঁকে হত্যার কথা কিছুতেই মহিলাটি চিন্তা করতে পারছে না। লামা সাফুয়া কিন্তু তার কান্নায় এতটুকু বিভ্রান্ত না হয়ে তাকে আশ্বাস দিয়ে বলল যে মিলারেপাকে সে যদি এই বিষাক্ত দই খাওয়াতে পারে তাহলে সে তাকে তার প্রবীণ স্ত্রীর পদে স্বীকৃতি দেবে, শুধু তাই নয় মহিলাটিকে একটি সুন্দর ও মহামূল্য রত্ন উপহার দেবার অঙ্গীকার করল। নারীজাতি সাধারণতঃ এই ধরনের প্রলোভনে নিজেকে সংযত রাখতে পারে না।এক্ষেত্রেওহল তাই—ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে রাজি হয়ে গেল। পরেরদিন মিলারেপার ওখানে আবার বিষাক্ত দই নিয়ে যেতেই মিলারেপা তাকে সস্নেহে পাশে বসালেন, তারপর আগের মতই অভয় দিয়ে বললেন—“আমি জানি তুমি কার জন্য কি করছ। অবলা নারী, ভগবান তথাগত তোমাকে রক্ষা করুন। কিন্তু আমি যদি এক্ষুনি তোমার এই খাদ্য খেয়ে প্রাণত্যাগ করি তাহলে তুমি তোমার প্রতিশ্রুত রত্নখন্ড পাবে না ; তার চেয়ে ভাল হয় যদি তুমি আগে তা সংগ্রহ কর, তারপর তোমার কাজ কর।” মিলারেপার কথা শুনে মহিলাটির অন্তঃকরণ ভয়ে কেঁপে উঠল, কিন্তু রত্নখন্ডের প্রলোভন সামলানোর মতো মনের অবস্থা তার ছিল না। তাই এবারেও সে ফিরে গেল। লামা সাফুয়া তার কাজ হাসিল করবার জন্য এখন যে কোন রকম পুরস্কার দিতে প্রস্তুত। সে মহিলাটিকে একটি দামী রত্নখণ্ড দিয়ে বলল—“যাও, এবারে আর কোন কথা নয়, তোমার কাজ তোমাকে করতেই হবে।”

রত্নখন্ড নিয়ে সে মিলারেপার গুহায় আসতেই মিলারেপা বললেন, “পৃথিবীতে যারা জীবন ধারণ করে আসে, একদিন না একদিন তাদের আবার সে জীবন ত্যাগ করতেই হবে। আমারও এখন সময় এসেছে যাবার ; তুমি বা লামা সাফুয়া উপলক্ষ মাত্র । আমার জীবনের মূলমন্ত্র হচ্ছে ক্ষমা। তোমাদের আমি ক্ষমা করলাম। ক্রোধ হিসা এসব আমি বহুদিনই বর্জন করেছি। আমি যে তোমার বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণ করছি সে কথা আমি গোপন রাখলাম তোমার মঙ্গলের জন্য। কাউকেই বলব না।” এই কথা বলে মহামুনি মিলারেপা সেই বিষাক্ত দই ভক্ষণ করলেন। মহিলাটি আর স্থির থাকতে পারল না—উচ্চস্বরে কেঁদে মিলারেপার পায়ে লুটিয়ে পড়ল, তার জানতে আর বাকি রইল না যে মিলারেপাই হচ্ছে সত্যিকারের বুদ্ধাবতার, লামা সাফুয়া হচ্ছে আসল ভণ্ড ও পাপী ।

এই ধরনের বিষক্রিয়ায় সাধারণলোক বিষাক্ত কেউটে সাপের দংশনের মতোই সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। কিন্তু মিলারেপার এটা ইচ্ছামৃত্যু, মৃত্যুটাও তাঁর সম্পূর্ণ আয়ত্তের মধ্যে । তাঁর আরও কিছুদিন দরকার ভক্ত শিষ্যদের মন তৈরী করবার জন্য। তাই শরীরে বিষের ক্রিয়া দেখা দিলেও তাঁর মন রইল সম্পূর্ণ তার অধিকারে। দেহের যাতনা থেকে মনটাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।

কয়েকদিনের মধ্যেই ভক্ত শিষ্যেরা জানতে পারল যে গুরুদেব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কিন্তু কারণটা সকলেরই রইল অজানা। মিলারেপা অতি বিষাক্ত দধি খেয়েও কয়েকদিন বেঁচে আছেন সেই সংবাদে সবচেয়ে বেশী অস্বস্তিতে পড়ল লামা সাফুয়া । দুষ্টাত্মা সাফুয়া মনে মনে প্রমাদ গুল। মিলারেপা তার ষড়যন্ত্র সব জেনে ফেলল কিনা জানবার জন্য আর স্থির থাকতে না পেরে নিজেই চলে এল মিলারেপার কাছে। তারপর সহানুভূতির ভান করে সকলের সামনেই মিলারেপাকে জিজ্ঞাসা করল—“আহা ! আপনার এই অবস্থা কে করল--আপনার মতো বিজ্ঞ লোকের সমাজে বেঁচে থাকার খুব প্রয়োজন—আপনিতো অলৌকিক বিদ্যার অধিকারী, কাজেই আমার ওপর এই রোগের বোঝা চাপিয়ে দিন, আমি আপনার হয়ে মরব।” লামা সাফুয়ার এই চরম কপটতা দেখেও তিনি স্থির রইলেন, সস্নেহে বললেন—“কারও মনে দানব এসে ভর করেছিল তাই সে এমন কাজ করেছে। এ রোগের জ্বালা অসহ্য ; কোন মানুষই তা সহ্য করতে পারবে না। কাজেই তোমাকে এ রোগের ভার দেওয়া অসম্ভব তোমার দেহ তা সহ্য করতে পারবে না।”

দুষ্টাত্মা পাপাচারী লামা সাফুয়ার মন তখন অস্থির। মিলারেপা তার ষড়যন্ত্র জানতে পেরেছেন কিনা তা জানবার জন্য সে যেন পাগল হয়ে উঠেছে, তাছাড়া মিলারেপার শক্তি যাচাই করবার এই তো চরম মুহূর্ত। কাজেই সে সকলের সামনে বারংবার মিলারেপার ব্যাধি বহন করবার জন্য পীড়াপিড়ি করতে লাগল। অবশেষে বাধ্য হয়ে দয়াবতার মিলারেপা বললেন—“আমার এ ব্যাধি তুমি কিছুতেই বহন করতে পারবে না—তবে তুমি যখন চাইছ আমি তোমাকে দেখাচ্ছি—গুহার বাইরে যে দরজার

কাঠগুলো দেখছো তার উপর আমার যন্ত্রণা আরোপ করছি, ভালোভাবে চেয়ে দেখো।” তার কথামতো সকলেই সেই কাঠগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল—কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই শক্ত কাঠগুলো মনে হল আগুনে পুড়ে উঠে বিকৃত হয়ে গেল। চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখে সকলে শিউরে উঠল। কারো বুঝতে বাকী রইল না যে মিলারেপা কি সাংঘাতিক ব্যাধিতে ভুগছেন। এ দৃশ্য দেখার পরও লামা সাফুয়া মিলারেপাকে উদ্দেশ্য করে বলল—“ওটা তো কাঠ, কাজেই ওকে নিয়ে এ রকম অলৌকিক বিদ্যা দেখানো সম্ভব, কিন্তু আমি হচ্ছি রক্ত-মাংসে গড়া শক্ত লামা সাফুয়া। আমার উপর এই রোগটা চালনা করে দিন, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।”

এবার মিলারেপা বললেন — “ঠিক আছে, তাই হবে, আমি আমার যন্ত্রণার অতি সামান্য অংশমাত্র তোমার দেহে সঞ্চারণ করে দিচ্ছি, তবে তোমার অসহ্য লাগলে আমাকে বলতে দ্বিধা করবে না।” এই বলে মিলারেপা তার যন্ত্রণার কণামাত্র লামা সাফুয়াকে দিলেন। লামা সাফুয়া চোখের পলকে সেই যন্ত্রণায় আহত হয়ে ভূমির উপর চীৎকার করে লুটিয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে বুঝতে পারল যে, মিলারেপা সত্যিই মহাযোগী ও পরম অবতার। যন্ত্রণার সামান্যমাত্র অংশেই মনে হল সেই দারুণ মৃত্যুযন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারবে না, মিলারেপা সে রোগ ফিরিয়ে না নিলে সে এক্ষুনি মারা পড়বে। ভূমির উপর আছাড় খেয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে লালা পড়তে আরম্ভ করেছে—এই সর্বনাশা খেলা সে নিজেই তো ডেকে এনেছে—আর স্থির থাকতে না পেরে কোন রকমে মিলারেপার পায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাতর স্বরে বলল – “আমাকে বাঁচান, আমাকে রক্ষা করুন, আমার যোগ্য শাস্তি আমি পেয়েছি।” সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাধি আবার ফিরিয়ে নিলেন। লামা সাফুয়া প্রাণে রক্ষা পেয়ে সেই করুণাবতার মিলারেপার চরণে সর্বস্ব সমর্পণ করে মুক্তির জন্য দীক্ষা চাইলেন। মিলারেপার মৃত্যুর জন্য যে দায়ী তাকেও তিনি ক্ষমা করে জীবে দয়ার এক সুন্দর উদাহরণ স্থাপন করলেন। মিলারেপাকে যারা আঘাত হেনেছেন তাদের সবাইকেই তিনি বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, মিলারেপার সেই কাকীও মিলারেপার কাছে দীক্ষা নিয়ে মুক্তিস্নান করেছিলেন।

শরীরের এই বিষক্রিয়ার পরও মিলারেপা বেশ কয়েকদিন বেঁচে ছিলেন এবং সেই সময় তিনি তাঁর ভক্ত শিষ্যদের তাঁর জীবনের শেষ উপদেশাবলী দিয়ে যান। তারপর এক শুভ মুহূর্তে তিনি ব্রহ্মলীন হলেন।

গুহাবাসী—উলঙ্গগুরু—লতাগুল্ম খেয়ে যিনি সকলের অজ্ঞাতে সাধনা করেছিলেন, পরবর্তী যুগে তিনিই হলেন তিব্বতের মহাগুরু লামাপূজ্য সাধকশ্রেষ্ঠ কবিবর মিলারেপা।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%