ত্রাদুম্

বিমল দে

পাসাগুকের পর থেকে পথটা যেন হঠাৎ আমার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো, পাসাগুকের মঠ ছাড়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেখতে পেলাম সাংপোর ধারে জমায়েৎ হয়েছে অসংখ্য লোক, প্রায় শ'খানেক খাঁকি রঙের তাঁবু আর ডজনখানেক জীপ ও লরী ঠিক রাস্তার উপরই দাঁড় করানো রয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম এটা একটা মিলিটারী ক্যাম্প, অতএব এড়ানোই ভালো। বুঝতে পারলাম যে এখানেই পাসাগুকের লোকেরা আসছে কাজের চেষ্টায়, হয়তো রাস্তা মেরামত বা ঐ ধরনের কোন বিরাট সরকারি কাজের পরিকল্পনা চলছে।

যতটা সম্ভব মিলিটারী পোশাককে এড়িয়ে চলাই মঙ্গল। তাই রাস্তা ছেড়ে আমি নেমে পড়লাম ডানদিকের পাথুরে জমিতে। নদীকে পেছনে রেখে সরাসরি এগিয়ে চললাম উত্তর দিকে, উদ্দেশ্য নদীর সাথে প্রায় পঁয়ত্রিশ চল্লিশ ডিগ্রি কোণ রেখে আবার ফিরে আসা। পাথুরে মাটির উপর দিয়ে হাঁটা অনেকটা খালি পায়ে সদ্য কাটা ধান ক্ষেতের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো—পায়ের অবস্থা সত্যিই সঙ্গীন হয়ে উঠছে তবুও হেঁটে চলেছিলাম কিন্তু এর পরের পদক্ষেপে আমি থামতে বাধ্য হলাম। ছোট্ট একটি খরস্রোতা নদী আমার সাথে খেলবার জন্য হঠাৎ যেন এসে হাজির হল । একটি পাহাড়ী ছোট্ট মেয়ের মতোই সে যেন খিল্‌ খিল্‌ করে হেসে উঠল

খরস্রোতা এই নদীটা দেখেই প্রথমে মনে হয়েছিল একটা বিরাট বাধা। নীচে রয়েছে চীনাদের শিবির, নদীপথের বুঝি এখানেই শেষ। মনকে একটু সংযত করতেই নদীর অন্য রূপ দেখতে পেলাম। খরস্রোতা নদীটির কলকল শব্দকে মনে হল ছোট একটি পাহাড়ী মেয়ের হাসির শব্দ। শুদ্ধ নির্মল জল মেয়েটির নিষ্কলঙ্ক পবিত্র চরিত্রের প্রতীক আর সেই স্বচ্ছ জলের তলায় আর তীরের ছোট ছোট গোল পাথরের সদাচঞ্চল নুড়িগুলো নিয়ে মেয়েটি যেন খেলা করছে। মেয়েটি আনন্দ উচ্ছ্বাসে তার এই অনন্ত খেলায় মত্ত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এটাই একটা জীবনের উৎস। ছোট্ট অবস্থায় সে সহজ ও সরল ভাব নিয়ে খেলায় মত্ত থাকে তারপর যতই এগিয়ে চলে জীবনের স্রোত ততই তার মধ্যে দেখা যায় জটিলতা। স্ফটিকস্বচ্ছ জল হয়ে উঠে ঘোলাটে আর তারই মধ্যে দেখা যায় যৌবনের লীলা। পাথরের নুড়িগুলো ছেড়ে নদী তখন রূপ নেয় গর্ভবতী মাতৃরূপে। কত জীব তাতে নেয় জন্ম আবার কত জীব তাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। পরিপূর্ণ নদী তখন জীব-কল্যাণে সদা ব্যস্ত। আবার তারই মধ্যে দেখি সংহারিণী করালমূর্তি। সর্বশেষে সেই মাতৃরূপা নদী তাঁর শেষ অবস্থায় সন্ন্যাসিনীর বেশে ধ্যানমগ্ন হয়ে লাভ করেন নির্বাণ। মহাসাগরের সাথে মিলে গিয়ে তিনি ব্রহ্মালীন হন। তার পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ মাতৃরূপা পরম কল্যাণময়ী নদী তাঁর সন্তানদের মাথায় হাত রেখে শেষ আশীর্বাদ দিয়ে যান। সাগরসঙ্গমের সেই করুণা বারি পেয়ে জীবলোক পায় উদ্ধার ।

নদী জীবনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। আমার সামনের ছোট্ট খরস্রোতা নদীটার মতো আরও অনেকগুলো নদী মিলিয়েই সৃষ্টি হয়েছে সাংপো। ভারতে প্রবেশ করে সে বদলেছে ব্রহ্মপুত্র নামে। এই ছোট্ট রূপটিই আসামে গিয়ে পরিণত হয়েছেন পরিপূর্ণা নদী হয়ে ৷

প্রথম দর্শনে এই ছোট্ট নাম না জানা খরস্রোতাটিকে ভেবেছিলাম আমার বাধাস্বরূপ কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তা হয়ে উঠল আমার সখা। সখাই বটে—এই মহা নির্জন প্রান্তে সে আমাকে বলে চলেছে জীবন রহস্যের কাহিনী। অনেকদিন পর আমি খেলার সাথী পেলাম, তার সাথে আমি কথা বলতে বলতে উত্তর দিকে হেঁটে চললাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর খরস্রোতার জলটা আরও পাতলা হয়ে এল, আমার ভাগ্য যেন আবার খুলে গেল। জামা কাপড় জুতো সব দু'হাতে তুলে ধরে অতি সন্তর্পণে নদীতে নামলাম। পরিষ্কার স্বচ্ছ জল দেখে ভেবেছিলাম খুব বেশী ঠাণ্ডা হবে না কিন্তু জলে পা দিতেই সর্বশরীর অবশ হয়ে এল, সেই সময় সাধুবাবার মূল্যবান উপদেশটি মনে পড়ল। তিনি বলেছেন—তিব্বতের জল অতি ঠাণ্ডা, সে জলে হঠাৎ নামলে ঠাণ্ডায় মরে যাবে। কোন নদী নালা পার হবার সময় সেই জল দিয়ে প্রথমে তেল মাখবার মতো করে সমস্ত গায়ে জল মালিস করে নেবে তারপর ঠাণ্ডাটা একটু সয়ে গেলে জলে নামবে। সাধুবাবার উপদেশ কাজে লাগালাম। এই ঠাণ্ডা নদী পার হবার জন্য সেই কৌশল না জানা থাকলে আমার এই ছোট্ট শরীরটাকে নিয়ে কিছুতেই ওপারে যেতে পারতাম না। খরস্রোতার গতি এখানে আরও ধীর কিন্তু সদা চঞ্চল, তাকে বিদায় জানিয়ে আবার সাংপোর পথ ধরলাম। পথ এখন আরও কঠিন হয়ে এসেছে, চারপাশে কোন গাছ-গাছড়া নেই। ওপাড়ে ধু ধু করছে পাহাড়, বিশাল হিমালয়ের পাঁচিল দিয়ে ভারতবর্ষ থেকে তিব্বতকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। জনমানবের চিহ্নমাত্র নেই । ভাগ্য ভালো যে সঙ্গে খাবার ছিল, নয়তো আগুন ধরাবার মতো একটু তৃণও এখানে নেই, এই চির তুষারের দেশে বুঝি কোনদিন ঘাসও হয় না।

মহাতীর্থের অনন্ত পথ-পথ সত্যি কঠিন কিন্তু মনে আশা আছে এ রাস্তার শেষ হবেই—এই সাংপোর উৎসেই পাবো আমার স্বপ্নে দেখা কৈলাসনাথ। বিশ্রামের মতো কোন রকম আস্তানা পেলাম না কাজেই সারা রাত ধরে চলতে বাধ্য হলাম। পরের দিন সকালে একটা ছোট্ট গ্রাম পেলাম, গ্রামবাসীরা এক নবীন সন্ন্যাসী পেয়ে পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে আশ্রয় দিল। এক বাটি গরম দুধ নিয়ে এক ভদ্রমহিলা আমাকে আপ্যায়ন করলেন। চমরী গাইয়ের সেই দুধ আমার মুখে অমৃতস্বরূপ লাগল। তাঁদেরই একটা ঘরে আমাকে বিশ্রামের জন্য নিয়ে গেলেন। বিশ্রাম! বলাই বাহুল্য গত দু'দিন ধরে অনবরত হেঁটেছি। বিচুলির এই বিছানা পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না । কম্বলটাকে মাথার উপর জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেই গরীব ও ধর্মীয় ভদ্রলোকের বাড়ীতে একদিন ও একরাত্রি কাটিয়ে ওেই পরিবারের মঙ্গল কামনা ও পূজা করে আবার পথে নামলাম ।

তারপর প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পার হলাম দুটো নদী, এই নদী দুটোও সাংপোতে এসে মিশেছে। নদী পার হবার জন্য সেতুগুলোও খুব পুরান। দুটো সেতুই কাঁচা অৰ্থাৎ পাথর বসিয়ে কাঠ ও দড়ির সাহায্যে দোলার মতো করে তৈরী করা। দ্বিতীয় নদীটি পার হবার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পেলাম একটা বাড়ী। কুকুরগুলোই যথারীতি অভ্যর্থনার পর্ব সারলো। অল্প বয়সী দুটো ছেলে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল- -কোথায় যাবেন ? তিব্বতী ছেলেমেয়েরা সাধারণতঃ খুব লাজুক যেচে কথা বলে না। এদের এই বন্ধুভাব দেখে আমার বেশ ভালো লাগল। আমি ছোট্ট উত্তর দিলাম ‘ৎসো মাফাম্’। আমার উত্তর শুনে ছেলেগুলো দৌড়ে চলে গেল। ‘ৎসো মাফাম্’ কথাটার মধ্যে যেন যাদুমন্ত্র ছিল। বাড়ীটার পাশ দিয়ে যাচ্ছি এমন সময় তারা আমাকে ঘিরে আমার চলার পথ আগলে ধরল।

আমি ভিড় দেখে মৌনীবাবা হয়ে গেলাম। সকলেই তাদের সাথে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো। তাদের অনুরোধ রক্ষা করতেই হল। মৌনীবাবা দর্শনেই তারা যেন ধন্য হয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য, আমার বয়সও তাদেরই মতো। চা খাওয়ার পর চারদিকে ভাল করে চেয়ে দেখলাম, পরিবেশটা বুঝতে মোটেই অসুবিধা হল না। এরা নিশ্চয়ই পাশের কোন গ্রামে থাকে, এখানে এসেছে চড়ুইভাতি করতে । চা খেয়ে কিছুক্ষণ কাটিয়ে তারপর তাদের ইসারায় ডেকে একসাথে বসে মণি মন্ত্র পাঠ করে সকলে নীরব হলাম। প্রায় আধঘণ্টা পর আমরা প্রার্থনা করে নীরবতা ভঙ্গ করলাম। আমি অবশ্য মৌনই থেকে গেলাম। খিচুড়ির মতো করে গমের সাথে সবজি সেদ্ধ করে রান্না করা হয়েছে, আর তার সাথে কিছু শুকনো ভেড়ার মাংস। চড়ুইভাতির এক উপাদেয় খাদ্য। সন্ধ্যার কাছাকাছি তাদের সাথে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। আমার ধারণাটা ঠিকই ছিল। এই বাড়ীটার পাশেই ছিল একটা উষ্ণ প্রস্রবণ, গ্রামের লোকেরা এখানে মাঝে মাঝে আসে স্নানের জন্য আর সেই সাথে সাথে বেড়ানোও হয়ে যায় । আগে জানলে আমিও সেখানে স্নান করে নিতে পারতাম—এখন আর আফসোস করে কি হবে ।

যাত্রার পূর্ব মুহূর্তে তাদের কাছেই শুনলাম মহানন্দ সংবাদ, সামনের বড় গ্রামটাই হচ্ছে ত্রাদুম্ (ত্রাদুম)। মাত্র ঘণ্টাখানেকের পথ। ত্রাদুম্ থেকে মানস সরোবর মাত্র এগারো বারো দিনের পথ। সংবাদটা শোনা অবধি আমার অন্তরাত্মা বার বার আনন্দে লাফাতে লাগল। আর মাত্র সপ্তাহখানেকের পথ তারপরই মহাতীর্থের দর্শন পাবো। আমার চারপাশে এই ছেলেগুলো না থাকলে আমি সত্যি নেচে উঠতাম। নিজেকে সংযত করলাম—উচ্ছ্বাস হচ্ছে আবেগের প্রতীক, আমাকে থাকতে হবে তার ঊর্ধ্বে—“যোগস্থ কুরু কর্মাণি।”

আমরা চলতে লাগলাম—সূর্যদেব অস্তমিত হয়েছেন, আর তার সাথে সাথেই নেমে

এল অন্ধকার। তিব্বতে দলবেঁধে অন্ধকারে চলাই একটা খেলা, অন্ধকারও একটা আলো, রাত যত অন্ধকারই হোক না কেন আকাশে তারা উঠলে রাস্তাকে দেখা যাবেই। চলতে চলতে হারিয়ে যাওয়া, একজনকে আর একজন বলে ধরা, হোঁচট খেয়ে সঙ্গীর উপর হুড়মুড় করে পড়া এসবই হচ্ছে মজার ব্যাপার। মনে হয় ঘণ্টাখানেক চলার পর আমরা প্রথম গ্রামের আলো দেখতে পেলাম। গ্রামটা কত বড়, কোথায় শুরু, জায়গাটা কি রকম তার কিছুই বুঝতে পারলাম না—তাদের কথায় জানলাম যে এটাই ত্ৰাদুম্ । গ্রামে ঢুকে কিছুক্ষণ হাঁটার পর অস্পষ্ট আলোয় দেখতে পেলাম একটা মঠের ছায়া। তার কাছাকাছি আসতেই সকলে আমাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল। মঠের দরজার সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ওদের মধ্যে থেকে একটি ছেলে বলল—ভেতরটা খুব সুন্দর, বাইরে থেকে লামারা এসে এখানেই থাকেন ।

মন্দিরের ভারী দরজাটা ঠেলতেই ভেতর দিকে সেটা খুলে গেল, আমি ভেতরে ঢুকলাম। দেয়ালের কোণে একটা কুলুঙ্গীর মধ্যে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে। আমি দরজাটাকে বন্ধ করে দিয়ে প্রদীপের দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রদীপটা হাতে নিতে গিয়ে দেখি যে সেটা চারিদিকের ঘিয়ের আঠায় আটকে আছে, কয়েক শ' বছরের ঘি পড়ে পড়ে বিরাট প্রদীপটার প্রায় অর্ধেকটাই জমাট কালো কালির মতো ঘিয়ের মধ্যে ডুবে গেছে। তা হোক তবুতো সেটা আলো। আধার বিশ্লেষণে আমার কাজ কি? তার আলোটাই আমার দরকার। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর প্রধান বেদীটা পেলাম আর তার সামনেই হাজার প্রদীপের বেদী, আন্দাজ করে আর একটু খোঁজাখুঁজির পর পেলাম প্রার্থনা বেদী। রাত কাটাবার এটাই উপযুক্ত বিছানা। কম্বলটা খুলে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে এলিয়ে পড়লাম গদিতে। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের ক্লান্তি একদম নেই বললেই চলে, ছেলেদের সাথে হাসি খুশীর মধ্য দিয়েই দিন কেটে গেছে

মঠের এই ঘরের মধ্যে শীতটা কিছুতেই রপ্ত করতে পারছি না। দু'বার উঠে গিয়ে প্রদীপের ঐ সামান্য তাপে হাতের তালু গরম করে নিয়েছি। উঠে, কুঁজো হয়ে, দ' হয়ে নানাভাবে চেষ্টা করবার পরও ঘুমোবার মতো অবস্থা খুঁজে পেলাম না। কনকনে ঠাণ্ডা আস্তে আস্তে বুকের ভেতর উঠে কাঁপুনি শুরু করল। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও যখন শরীর গরম করতে পারলাম না তখন ভাবলাম—না, এইভাবে শুয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলাম—এইভাবে শীতে কষ্ট পাবার চেয়ে কৈলাসের পথে এগুনোই ভাল, তাতে অন্ততঃ দূরত্বটা কমবে। প্রদীপের সেই আবছা আলোতে আমি মালপত্র গুছিয়ে কাঁধে তুলে নিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে ঘরের ভেতর ঢুকে প্রদীপটা ডানদিকে পেয়েছিলাম। তার মানে বেরোবার সময় ঠিক তার উল্টো হবে অর্থাৎ প্রদীপটা বাঁদিকে রেখে এগিয়ে গেলেই পাবো দরজা। মনে মনে হিসাব করে এগিয়ে গেলাম বটে কিন্তু দরজাটা খুঁজে পেলাম না। দরজার পরিবর্তে দেয়ালের গায়ে টাঙ্গানো বিভিন্ন তাংখার উপর হাত পড়তে লাগল। কয়েকবার চেষ্টার পরও যখন দরজাটাকে খুঁজে পেলাম না তখন মনে হল যে আমার নিশ্চয়ই দিক ভুল হয়েছে। বার বার আমি মনে করতে লাগলাম, প্রদীপটাই হচ্ছে একমাত্র নিশানা, আমার স্পষ্ট মনে আছে ঘরে ঢুকেই প্রথমে প্রদীপের কাছে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম। ঘরের মধ্যে ওই একটি মাত্রই আলো কাজেই ভুল হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। তবে মানুষ মাত্রেই ভুল করে সেই ভেবে আমি প্রদীপের অন্যদিকের দেয়ালগুলোও খুঁজতে লাগলাম। সেই দেয়াল হাতড়াতে গিয়ে বারবার হাত পড়তে লাগল বিভিন্ন স্ট্যাচুর উপর। অল্প আলোতে ভাল করে কিছু দেখাও সম্ভব নয়। অনেকক্ষণ এইভাবে চেষ্টা করার পরও আমি আশার আলো দেখতে পেলাম না। ঘরে ঢুকবার সময় নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করে থাকবো অথবা দরজাটা হয়তো খুবই মসৃণ দেয়ালের মতো তাই ঠিক খুঁজে পাচ্ছি না। প্রদীপটা হাতে নেবার উপায় নেই, সেটাকে তুলতে গেলে আলোটা নিভে যাবার সম্ভাবনাই বেশী। অগত্যা সকাল হবার ভরসা করে আবার আশ্রয় নিলাম গদিতে। শরীর গরম করার জন্য এবারে কয়েকটা আসন শুরু করে দিলাম—বক্রাসন, ময়ূরাসন ও পশ্চিমোত্তাসন করে হাতে হাতে ফলও পেলাম ।

শরীরের কাঁপুনি কমে এসেছে মনে হল ঘরটা গরম হয়ে উঠেছে। ঠাণ্ডাটা সাধারণতঃ ভোরের দিকে বেশী হয়, কাজেই নিজেকে সেইভাবে তৈরী করতে লাগলাম।আমার দিগভ্রম হয়েছে ভোর হবার আগে দরজা খুঁজে পাবার কোন আশা রাখি না। কিন্তু খুবই আশ্চর্যের বিষয় ঠাণ্ডাটা হঠাৎ যেন কমে এসেছে তবে কি এরই মধ্যে ভোর হয়ে গিয়ে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করেছে? দুঃখের রাতগুলো সাধারণতঃ তাড়াতাড়ি ফুরতে চায় না,কষ্টের রাতগুলো সব সময়ই হয় দীর্ঘ। এই ঠাণ্ডায় রাতটা হঠাৎ যেন শেষ হয়ে গেল। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না—চোখ খুলেই দেখি অবাক কাণ্ড ! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি,সূর্যের আলো নয় আমারই পাশে, গদির কাছে বসে আছেন একজন সন্ন্যাসী, তার সামনে কড়াইতে লাল টকটক করছে কাঠ-কয়লার আগুন। আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলাম, তার পা ছুঁয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম। আগুন ! আঃ এই মুহূর্তে ঘরটাকে মনে হল স্বর্গ। আমি সন্ন্যাসীর পাশে বসে আগুন পোয়াতে লাগলাম। কাঠ-কয়লার আগুনে সন্ন্যাসীর দেবতুল্য মুখটা নজরে পড়ল। আমার মতো তিনিও নিশ্চয়ই মহাতীর্থের যাত্রী। আমি কোন কথাই বললাম না, তাকে হাসিমুখেই বিনীত হয়ে জানালাম আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে শরীরটাকে গরম করে নিলাম, শরীরের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতেই ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসতে লাগল। আমি বসে বসেই ঝিমোতে লাগলাম। আমার সেই অবস্থা দেখে তিনি আমাকে ইসারায় শুয়ে পড়তে বললেন। তিব্বতে ঢোকার পর এই প্রথম লম্বা চুলওয়ালা সন্ন্যাসী নজরে পড়ল। তাঁর সাথে আলাপ করার ইচ্ছেও ছিল কিন্তু ঘুমের কবল থেকে নিজেকে উদ্ধার করা সম্ভব হল না, আমি শুয়ে পড়লাম।

সকালবেলা গ্রামের ছেলেরাই এসে আমার ঘুম ভাঙালো, এদেরই সাথে গতকাল আমি এখানে এসেছিলাম। ছেলেদের সাথে দুটি মেয়েও এসেছে। আমার কাছে এসে প্রণাম করে পাশে দাড়াল, তাদের আশীর্বাদ করে আমি প্রার্থনা করলাম। মেয়েরা আমরা জন্য কিছু খাবার এনেছে। শক্ত মাখন, ভারী রুটি আর গুড়। অতিথি সৎকারের পক্ষে এর চেয়ে ভাল খাবার আর হতে পারে না বিশেষ করে পৃথিবীর বুকে হারিয়ে যাওয়া এই দেশটায়। আমি কিছু খেলাম আর কিছু ওদের বিতরণ করলাম। তাদের সবাইকে ইসারায় পাশে বসতে বললাম তারপর তাদের মঙ্গল কামনা করে আমরা মণিমন্ত্র জপ করতে লাগলাম, আমাদের সমবেত কণ্ঠে মন্দিরের সেই ঘরটা ভরে উঠল।

রাতের সেই সন্ন্যাসীকে দেখতে পেলাম না মনে হয় তিনি খুব ভোরবেলা উঠে চলে গেছেন। খোলা দরজা দিয়ে দিনের আলো এসে পড়েছে। এত কাছে এই দরজাটা আর রাতে এটাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম। রাতের রহস্যটা উদ্ঘাটন করবার জন্য আমি দরজার পাশে দেখা সেই প্রদীপটার দিকে এগিয়ে গেলাম। আবার আমার আশ্চর্য হবার পালা। ঘিয়ের চর্বিতে বসানো সেই প্রদীপটার চিহ্নমাত্র নেই, অনেকক্ষণ খোঁজার পরও সেই দেয়ালের খোপটা খুঁজে পেলাম না। রহস্যই বটে! ছেলেমেয়েরা দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল কাজেই রাতের রহস্যটাকে আপাততঃ স্থগিত রাখতে হল । ওদের সাথে আমি একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের বাড়ীতে এসে আশ্রয় নিলাম। বাড়ীর উঠোনে কয়েকটা টাট্টুঘোড়া আর ইয়াক বাঁধা রয়েছে তাদের পাশ কাটিয়ে একটা কাঠের বারান্দায় এসে উঠলাম। কাঠের বাড়ী—অতি সুন্দর ও সূক্ষ্ম কাজে ভর্তি। কিছুক্ষণ পরই বাড়ীর ভেতর থেকে সবাই ছুটে এসে জিভ বার করে মাথা নীচু করে প্রণাম করে দাঁড়াতে লাগল। সবশেষে এলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা মুখের শতভাজের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে তাঁর সহজ ও পবিত্র চরিত্রের অভিব্যক্তি। তিনি একটা নতুন কাঁথা দিয়ে আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। তিব্বতের এটাই নিয়ম। আমরা যেমন ফুলের মালা দিয়ে গুরু বা পূজ্য ব্যক্তিদের বরণ করি এখানে তেমনি আছে এই কাঁথা। তারও কিছুক্ষণ পর লাঠিতে ভর দিয়ে কোনরকমে এসে হাজির হলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক । আমি তাকে প্রণাম করতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম। এই দেশে লামারা কখনই সাধারণত গৃহীদের প্রণাম করে না ।

আমি তাদের কিছু বলার আগেই তারা বুঝতে পেরেছে যে আমি মৌনীবাবা । আজকাল তিব্বতী কথা চালাবার মত বুঝতে পারি বটে কিন্তু এখানকার লোকেদের কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। এদের টান এবং উচ্চারণের সাথে আমি পরিচিত নই। যাই হোক্ আমি হাব-ভাবে তাদের বুঝিয়ে দিলাম যে আমি তীর্থযাত্রী, যাচ্ছি মানস তীর্থে।

কিছুক্ষণ পর ঘরের ভিতরে একজন এক কড়াই আগুন নিয়ে এসে মাঝখানে রাখলেন। মেয়েদের পোশাকগুলোর রঙ খুব উজ্জ্বল। গলায় পাথরের মালা, বয়স্ক ভদ্রমহিলাদের কোমর-পটিগুলো খুব কাজকরা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এদের গাল, ছেলেমেয়েদের গালগুলো লাল টুকটুক্ করছে ঠিক যেন আপেলের মতো। সকলে মিট মিট করে আমার দিকে চাইছে আর চোখে চোখ পড়তেই সরাসরি মাটিতে দৃষ্টি নামিয়ে রাখছে। আমি শুধু বসে রইলাম। মৌনীবাবার এখন কি কর্তব্য ভগবান জানেন। তিব্বতে ঢোকার প্রথম দিকে এমন অবস্থায় পড়লে আমি খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়তাম । আজকাল তা সহ্য হয়ে গেছে। লজ্জা আর ভয়ের হাত থেকে অনেকটা নিষ্কৃতি পেয়েছি। আমি ধার্মিক বা জ্ঞানী নই, সবই ঠেকে শিখছি।

দুপুরের দিকে সাম্পা খেয়ে সবাইকে ধন্যবাদ আর আশীর্বাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এইভাবে বেশীক্ষণ থাকলে আমি কুঁড়ে হয়ে যাবো শুধু তাই নয় কৈলাস আমাকে ডাকছে কাজেই বসে থাকা মানে সময় নষ্ট। গ্রামবাসী যারা আদর-যত্ন করে স্নেহ দিয়ে আমাকে নতুন জীবন দিল তাদের জন্য আমি বারবার ভগবান বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা জানালাম—-ভগবান তুমি এদের শান্তি ও সুখের পথ দেখাও। এদের সহজ ও সরল মনে তোমার কৃপাবর্ষণ হোক। ত্রাদুম্ শহরটিতে বেড়িয়ে অবাক হয়ে গেলাম, অনেকটা ইয়াটুং-এর মতো বিরাট শহর। হাসিমারা হয়ে ভুটানে যাওয়ার পথে বর্ডারে যেরকম খোলা বাজার আছে এখানকার বাজারটা দেখে ঠিক সেইরকম মনে হল। এই বাজারের অধিকাংশ জায়গাই দখল করে আছে টাট্টু ঘোড়া, ভেড়া আর ইয়াক্। পাহাড়ি পশুমেলা বলা যেতে পারে। ব্রহ্মপুত্রের ঠিক ওপারেই নজরে পড়ল সারি সারি চীনা সৈন্যবাহিনীর শিবির। দুটো নৌকা ফেরীর কাজ করছে। কয়েক মিনিট চলার পরই ঠিক নদীর ধারে নজরে পড়ল একটা বিরাট গুম্ফা। রাস্তাটা গুল্ফার দিকে এগিয়ে গিয়েছে তাই তাকে এড়াবার উপায় নেই। অথচ গুল্ফায় যাওয়ার আমার ইচ্ছা নেই। কি করবো ভাবছি এমন সময় একদল ত্রাবা (ছোট লামা) প্রায় আমার সমান বয়সী বাজার থেকে গুম্ফায় যাবার পথে আমার পেছনে এসে হাজির। এড়াতে পারলাম না। এখানকার রীতি অনুযায়ী যাবার পথে তীর্থযাত্রী মাত্রেই গুম্ফার বড় লামাকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে হয় । তা না জানালে তাদের অপমান করা হয়। আমাকে তারা যখন দেখেই ফেলেছে তখন কিছুতেই গুম্ফায় না গিয়ে উপায় নেই। রাস্তার দু'পাশে সারি সারি মঠের বাড়ী। তারই মধ্যে রয়েছে প্রধান মন্দির। গম্বুজটা সোনার জলে রঙ করা, নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে নজরে পড়বে। আমি রাত্রিতে ত্রাদুমে ঢোকার দরুণ মনে হয় দেখতে পাইনি ৷

মূল মন্দির বা জোখাং-এর চৈত্য স্পর্শ করে প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে প্রদক্ষিণ করতে লাগলাম। প্রদক্ষিণ শেষে ভেতরে ঢুকলাম। সামনেই চোখে পড়ল মঞ্জুশ্রীর বিরাট একটা মূর্তি। সেখানে পৌঁছতেই দূরে নজরে পড়ল কয়েকজন লামা অধ্যয়ন করছেন। আমি তাদের উপেক্ষা করে মন্দিরের কারুকার্যগুলোকে দেখতে লাগলাম। আমার পাশে একজন লামা এসে দাঁড়ালেন, তারপর অতি স্নেহের স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন-তুমি কোথা থেকে আসছো ? আমি ইসারায় তাকে বুঝিয়ে দিলাম যে আমি মৌনী—কথা বলি না। আমাকে অনুসরণ করতে বলে তিনি আগে আগে চললেন। দুটো বাড়ীর পর তিনি দোতলা একটি কাঠের বাড়ীতে আমাকে নিয়ে এলেন, তারপর কানে কানে বললেন—আমাদের মহামান্য গেশে এখন এখানেই আছেন তাঁর দর্শন করে এস । তিনি তোমাকে আশীর্বাদ করবেন।

মনে মনে ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করলাম। মৌনব্রত অবলম্বন করলেও কোনো গেশে বা মঠাধ্যক্ষের সামনে কথা বলার কোন বাধা নেই তাতে বরঞ্চ পুণ্যার্জনই হয়। ঘরের ভেতর ঢুকতেই কানে এল অতি নীচু স্বরে মন্ত্র পাঠের আওয়াজ। ঘরের কোণে ছোট্ট একটা জানালার ধারে বসে আছেন একজন লামা, আমাকে ইসারায় বসতে বললেন। মনে হয় তিনি অন্যদের পড়াচ্ছেন। নিম্নস্বরে মন্ত্রপাঠের মাঝে মাঝে তাঁরা থামছেন আর গেশে তাঁদের দু'একটি কথায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সেই কথাগুলোর মধ্যে একমাত্র ‘কালচক্র' কথাটা বারবার শুনতে পেলাম। সেই কথাগুলো ঠিক বোধগম্য হল না। বেশ কিছুক্ষণ পর পাঠের শেষে লামারা চলে গেলেন রইলেন শুধু গেশে। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন— কে তুমি, কোথা থেকে আসছো ?

সেই পরম পূজ্যপাদ মঠাধ্যক্ষ গেশের সামনে মিথ্যা কথা বলা পাপ। কৈলাসের দরজায় এসে হয়তো সেই পাপেই আমাকে ফিরে যেতে হবে। আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সাষ্টাঙ্গে তাঁকে প্রণাম করলাম তারপর উঠে বসলাম। সৌম্যদর্শন সেই গেশে আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে আবার জিজ্ঞাসা করলেন—কোথা থেকে আসছো, তুমি কে?

আমি অতি বিনীত স্বরে বললাম—আমি তীর্থযাত্রী, গ্যাংটক থেকে লাসায় এসেছিলাম একদল নেপালী লামার সাথে, সেখান থেকে তাদের সঙ্গ ছেড়ে আমি সীগাৎসে হয়ে এ পর্যন্ত এসেছি যাবো দিরাফুক্ (Diraphuk) গুম্ফায়

তিনি আমার কথা শুনে একটু আশ্চর্য হবার ভান করলেন, তারপর একটু তিরস্কারের সুরে বললেন-তোমার সাহস আছে দেখছি, এই বিরাট ঝুঁকি নিয়ে তুমি ভাল করনি।

তার কথা শুনে আমি অনেকটা দমে গেলাম, আমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বেরোল না ।

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর তিনি বললেন—তোমার বাড়ী কোথায় ?

এই প্রশ্নটার জন্যই আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম, ভারতীয় মাত্রেই তিব্বতে প্রবেশ নিষেধ, আর ত্রাদুমে চীনা শিবির দেখা অবধি মনে মনে প্রমাদ গুনছি। আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে গেলাম, কিন্তু গেশে আমার জবাবের জন্য অপেক্ষা করছেন। আরও কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আমি বললাম-আমার গুরুজী নেপালী তিনি এই দলেরও গুরু, তার জিনিসপত্র বইবার জন্যই আমি এসেছি।

আমার কাছ থেকে সরাসরি উত্তর না পেয়ে গেশে আমাকে ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করলেন—তুমি ভারতীয় তাই না ?

আমার মনের ভেতরে যেন ছেঁকা লাগল—কিন্তু শান্তভাবে উত্তর দিলাম-আজ্ঞে হ্যাঁ ।

–তোমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছি, আমিও মাঝে মাঝে ভারতে যাই তবে আজকাল বিভিন্ন কারণে হয়ে উঠে না।

মহামান্য গেশে এবারে ভাঙা হিন্দীতে আমার সাথে কথা আরম্ভ করলেন। আমি তাঁর আন্তরিককতার পরিচয় পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গম্ভীর প্রকৃতির ও রাশভারি গেশে হঠাৎ যেন মুখর হয়ে উঠলেন। কথায় কথায় তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—দিরাফুক্ গুম্ফায় যে যাবে তার জন্য অনুমতি পত্রের দরকার, তোমার তা আছে কি ?

—অজ্ঞে না ? আমি এ দেশের ভাষা জানি না, আর তা ছাড়া আমি যথাসম্ভব মৌনী থাকতে চাই কাজেই কোন কাগজপত্র আমার কাছে নেই ।

তিনি আমার কথা শুনে মহা সমস্যার সম্মুখীন হবার ভান করে বললেন – বুঝলাম ! তুমি এখানে কতদিন থাকতে চাও ?

—একরাত্রি মাত্র কালকে খুব ভোরে উঠে আমি আবার যাত্রা শুরু করবো। আমি কিছুক্ষণ থামলাম তারপর গেশের কাছ থেকে কোন রকম উত্তর না পেয়ে, আমি সহজ হবার জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম—আপনাকে বিরক্ত করলাম বলে ক্ষমা চাইছি । —ঠিক আছে। তিনি গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন।

আমি আবার প্রশ্ন করলাম—এখান থেকে মানস সরোবর ও কৈলাসনাথ কতদিনের পথ বলতে পারেন ?

-প্রায় আট দশ দিন লাগবে,

-পথ কি খুব দুর্গম ?

—নিশ্চয়ই !

—আমাকে এ সম্পর্কে কিছু উপদেশ দেবেন কি ?

গেশে এবার একটু থামলেন, তারপর বললেন—ত্রাদুম্ অর্থাৎ এই শহরটাই হচ্ছে কৈলাসের দিকে যাবার শেষ বড় শহর। এখান থেকে দেড়দিন বা দু'দিনের মাথায় পাবে গীয়াবুনাক্ তার পরদিন সাসাং। গীয়াবুনাক্ ও সাসাং এই দুটোই সাধারণ গ্রাম তারপর তুমি পাবে থোক্‌চেন। থোক্‌চেন হচ্ছে যাযাবরদের ব্যবসাক্ষেত্র। সেখান থেকে প্রত্যেক বছর শীতের সময় যাযাবররা দল বেঁধে ভারতের দিকে পাথর বিক্রি করতে যায়। সেখানে একটা গুম্ফা আছে রাতে থাকার কোন অসুবিধাই হবে না, প্রয়োজন হলে তুমি আমার নাম করতে পারো। খুব সস্তায় সেখানে উলের জামা কাপড় পাবে। গেশে এই কথা বলে হঠাৎ থামলেন। তারপর আমাকে কিছু না বলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন, কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এসে আমার হাতে কিছু খুচরো পয়সা গুঁজে দিয়ে বললেন---ধর, রাস্তায় কাজে লাগবে।

আমি বিনা দ্বিধায় সে দান গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে আরও কয়েকটি মুল্যবান উপদেশ দিয়ে জানালেন যে ত্রাদুমের পর মানস ও কৈলাস পর্যন্ত কোন চীনা শিবির নেই। সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের সংবাদ, সেটাই আমার কাছে ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। আমি গেশে লামার ঘর ছাড়ার আগে আর একটি অনুরোধ করলাম-

—গতকাল রাতে ত্রাদুমে ঢোকবার মুখে যে মন্দিরটা আছে সেখানে রাত কাটিয়েছি। রাতে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে যার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না—আপনাকে ঘটনাটা বলবো দয়া করে শুনবেন কি?

তিনি আমার কথা শুনেই চমকে উঠে বললেন—বলো কি? তুমি সেখানে রাত কাটিয়েছো ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—ঘটনাটার বিশদ বিবরণ শুনিয়ে লাভ নেই। ওখানকার অনেক গল্প আমার জানি। ওই গুম্ফাটা এখন পরিত্যক্ত। অনেক অভিশপ্ত আত্মা ওখানে আনাগোনা করে । আমি আর কয়েকটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তিনি হঠাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন, তিনি এ বিষয়ে মনে হয় কোন কথাই শুনতে চান না। আমি ভাবলাম যে, এই অশুভ প্রসঙ্গটি উত্থাপন না করলেই বুঝি ভালো হত, কিন্তু না জিজ্ঞেস করেই বা 'উপায় কি, মৌনীবাবার না বলা প্রশ্নের কেই বা জবাব দেবে।

গেশে বারান্দা থেকে দু'জন তরুণ লামাকে ডেকে তাদের ওপর আমার ভার ছেড়ে দিলেন। আমি তাঁকে আবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতেই তিনি আশীর্বাদ করলেন — মঞ্জুশ্রী তোমার মঙ্গল করুন, তিনিই মাতা-পিতা ভাই ও বন্ধু। তিনিই সব বুদ্ধ-বোদ্ধার মালিক, মঞ্জুশ্রীর কৃপা ছাড়া সেই আলোর স্পর্শ পাওয়া অসম্ভব—তাঁর ধ্যান কর, তাঁর কৃপা লাভে নির্বাণ প্রাপ্ত হয়। তোমার যাত্রা শুভ হোক ।

আমি তরুণ লামাদের ঘরে স্থান পেলাম। দোতলার প্রায় অন্ধকার একটা ঘরে আরও দু'জন লামার সাথে আমার থাকার বন্দোবস্ত হল। দুটো বাক্স, দুটো ছোট্ট কম্বলের বিছানা, চারটে হাতে লেখা কাঠের বিরাট বিরাট বই, কিছু সন্ন্যাস বস্ত্ৰ, দুটো এ্যালুমনিয়ামের থালা আর একটা গ্লাস। ঘরটিতে এ ছাড়া আর কিছু নেই। এই দারুন শীতেও সন্ন্যাসী লামাদের আর বেশী কিছু দেওয়া হয় না, এ জীবন সত্যি কঠিন। শরীরকে কোনরকমে বাঁচিয়ে মনকে সংযত করে এগিয়ে চলতে হয় এই আধ্যাত্মিক পথে। যাঁরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেন তাঁরাই নির্বাণ লাভে সমর্থ হন। কোন রকমে এই স্থূল শরীরটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে—উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অন্তরালের সেই সূক্ষ্ম শরীরকে নিয়ে। পরেরদিন মঠের ভেরী বাজার আগেই আমি ত্রাদুম্ ছাড়লাম——উদ্দেশ্য থোক্‌চেন। আর মাত্র আট দশ দিন আছে, মনে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে চলতে আরম্ভ করলাম।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%