দালাই লামা

বিমল দে

লাসার বাজারটা খুব ভালো, আমি আগেই লিখেছি যে সেটাই হচ্ছে তিব্বতের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার প্রধান রাস্তাটাকে বলে ‘ছ’কোণা রাস্তা। এ রাস্তাটার দু'পাশের বাড়ীগুলো বিরাট বিরাট, কিছু কিছু বাড়ী পুরোনো । লাসার একমাত্র এই রাস্তাটার সাথে কলকাতার রাস্তার তুলনা করা চলে। এই রাস্তাটারই উপরে বসে এদের বাৎসরিক মেলা। আমি রোজ সকালে লামাদের সাথে জোখাং মন্দিরে আসি, তারপর সকালবেলার প্রথম পূজোর পর চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি শহরের দিকে! সেদিন ছ’কোণা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা। দেখেই মনে হয় তিনি সম্ভ্রান্ত ঘরের। রাস্তার ধারের একটা বিরাট বাড়ীর দরজার পাশে তিব্বতী ও ইংরেজিতে লেখা একটা নেম-প্লেট দেখেই আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ইংরেজিতে লেখা Trade Agent Mr. Chimi Tshewang . I. Sc., Calcutta । নামটা দেখেই হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল কলকাতার কথা, নিজের অজ্ঞাতেই মনে হয় সেখানে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। আর ঠিক সেই সময়ই ভেতর থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে এল একটি তরুণ। উজ্জ্বল বর্ণ ঠিক নেপালীদের মতো আঁট পায়জামা পরনে। দামী কোট আর মাথায় নেপালী টুপী। বয়সে তরুণ, দরজার সামনে একজন বিদেশী লামাকে দেখে একটু আশ্চর্য হল বটে, তারপর তিব্বতী ভাষায় জিজ্ঞাসা করল—তুমি কি চাও ? আমি তার কোনো উত্তর দিলাম না। সে একটু নীরব থেকে তারপর নেপালী ভাষায় জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি তীর্থ করতে এসেছো? আমি এবার চুপ না থেকে সরাসরি জবাব দিলাম—হ্যাঁ আমি তীর্থ যাত্রীই বটে। দেখে মনে হয় বয়সে আমারই মতো হবে। কাজেই অনেকদিন পর সমবয়সী পেয়ে আমি কথা বলার প্রলোভন ছাড়তে পারলাম না। রাস্তায় দাঁড়িয়েই আলাপ শুরু করলাম। ছেলেটিকে দেখেই মনে হল খুব বিশ্বাসী তাই আমি সরাসরি বলে ফেললাম আমার কথা। অর্থাৎ আমি তীর্থযাত্রী মৌনী বাবা, লাসাতে জীবনে হয়তো আর আসা হবে না তাই মাঝে মাঝে' বেরিয়ে পড়ি একলা। লাসার পথে পথে ঘুরলেই পাওয়া যায় অনেক তথ্য। আমার কথা শুনে সে খুব খুশী হল বলে মনে হল, সে যেন একটা নতুন কিছু আবিষ্কার করেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বাড়ীর ভেতর নিয়ে গিয়ে একটা সু-সজ্জিত ঘরে বসাল। তারপর তাকে যখন জানালাম যে আমি আসলে কলকাতার ছেলে তখন আমাকে সে যেন জড়িয়ে ধরতে চাইল । আধঘণ্টার পরিচয়েই আমাদের মধ্যে হৃদ্যতা হয়ে গেল। Mr Chimi Tshewang ছেলেটির বাবা। ব্যবসায়ী। কালিম্পং, শিলিগুড়ি ও কলকাতার সাথে তার কারবার। ছেলেটির নাম ইয়েশি-ৎ-সেওয়াং। কালিম্পং থেকে সে পড়াশুনা করে, শীতের সময়

দু'মাস দেশে আসে। তার ছোট তিন ভাই, দু'বোন ও মায়ের সাথে একে একে পরিচিত হলাম। তার মা আমার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে বললেন—এ বেলা থেকে যাও আমাদের সাথেই খাওয়া-দাওয়া করবে। আমার আপত্তির কোন কারণই নেই। বরঞ্চ একটি সম্ভ্রান্ত তিব্বতী পরিবারের সাথে পরিচিত হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম ৷

ইয়েশির বাবা ব্যবসায়ী, দুই কাকা সচিবালয়ে কাজ কারেন। দাদু একজন নাম করা লামা। আর ঠাকুর্দা ছিলেন লাসার একজন নামকরা শিল্পী। আমি তাঁদের সাথে এই পরিচয়টা একমাত্র সাধুবাবা ছাড়া আর কাউকে জানালাম না। এই পরিবার থেকেই আমি জানতে পারলাম দালাই লামার ইতিহাস। দালাই লামা সম্পর্কে বিশদ জানাতে পেরে তারা যেন নিজেদের আরও ধন্য মনে করতে লাগলেন। আমার সম্পর্কে বাইরে যাতে জানাাজানি না হয় সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা হল। কারণ হানদের গুপ্তচরের তো অভাব নেই বিশেষ করে তারা যদি একবার কোনক্রমে জানতে পারে যে আমি ভারতীয় তাহলে আমাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ তীর্থযাত্রী দলের ভীষণ সমস্যা হবে। ইয়েশির একান্ত ইচ্ছা একবার কলকাতা দেখার। আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম যে আমাদের বাড়ীতে সে ঠিক বন্ধুর মতো থাকতে পারে। এই সামান্য আশ্বাসে সে যে কত খুশী তা আর লিখে বোঝাতে পারবো না ।

মহামান্য দালাই লামা সম্পর্কে বিশদ বিবরণের জন্য এই পরিবারের কাছে আমি ঋণী, সেটাই আমি আমার ডায়েরীর পাতায় লিখছি। ইয়েশিই আমাকে ডায়েরী লেখবার জন্য দুটো নতুন খাতা, পেন্সিল ও একটা ছোট ছুরি উপহার দিয়েছে।

তিব্বতে বিশেষ করে লাসায় দালাই লামার বহু নাম। তিব্বতীরা উচ্চারণ করে তা-লে-লামা। মোংগল চীনারাই প্রথম দালাই লামাকে এই নামে সম্মানিত করে তিব্বতীরা দালাই লামাকে বলে কীয়াম্-গন্/রিম্-পো-চে, অর্থাৎ রক্ষাকর্তা । অনেকে বলেন—গী-ওয়া-রিম্-পো-চে, অর্থাৎ প্রভু; বুক্‌—অন্তযামী । কীয়াম-গন্-বুক্‌ অৰ্থাৎ আত্মার প্রভু; পোতালায় তাকে চলিত কথায় বলা হয় লাম-পন্-পো, অর্থাৎ প্রধান শাসক লামা ; কুন্ -ডুন্ অর্থাৎ সর্বজ্ঞানী ; চেন্-রে-জি—বজ্রপাণী।

দালাই লামা অমর তিনি এ পৃথিবীতে কর্ম করেও করেন না, তিনি স্বয়ং বুদ্ধাবতার তাই তিনি প্রজাপালনের জন্য বার বার জন্ম নেন। দালাই লামা তিব্বতের প্রধান পুরোহিত এবং শাসক। তিনি একাই সমস্ত তিব্বতের মালিক। তিনি মানুষরূপে সাক্ষাৎ দেবতা। পঞ্চম লামার আমল থেকেই অর্থাৎ ১৬৪১ খৃঃ থেকেই এই ঐতিহ্য চলে আসছে।

দালাই লামার মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা যে কোন একটি পবিত্র বংশে জন্মগ্রহণ করে। তিনিই যে আদি দালাই লামা তার বহু প্রমাণ এই নতুন শিশুকে দিতে হয়। সাধারণতঃ মৃত্যুর পূর্বে বৃদ্ধ দালাই লামা তার পারিপার্শ্বিক অতি নিকট জনদের কাছে বলেন যে তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করবেন। সরাসরি না বলে তিনি অনেক সময় পরোক্ষভাবে তাঁর অভিপ্রায় জানিয়ে দেন। তাতে ভবিষ্যৎ দালাই লামাকে খুঁজে বার করতে সুবিধা হয় । তবে এই ব্যাপারটা খুবই জটিল—মৃত্যু শয্যায় অথবা বৃদ্ধ দালাই লামাকে কেউ সাহস করে জিজ্ঞাসা করতে পারে না তাঁর ভবিষ্যৎ জন্ম কোথায় হবে বলে। অনেকের মতে তাতে তিনি ভাবতে পারেন যে তাঁর উপস্থিতি হয়তো এরা আর চায় না। যে কোন কারণেই হোক তিনি যদি মৃত্যুর পূর্বে তার পরবর্তী জন্মস্থানে ঠিকানা না দিয়ে থাকেন তাহলে দেশের অগণিত নতুন শিশুদের মধ্যে মহামান্য দালাই লামা কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন বা করবেন তার দায়িত্ব পড়ে দেশের বিজ্ঞ লামা ও গণতকারদের উপরে । অবশ্য তিব্বতে শুধু দালাই লামাই নন, উচ্চ পর্যায়ের বহু লামাই এই ধরনের পুনর্জন্ম নিয়ে থাকেন ৷

দালাই লামার মৃত্যুর পর নবজাত দালাই লামাকে খুঁজে বার করবাার দায়িত্ব পড়ে প্রধানতঃ রাজ্যের মন্ত্রী ও তিন গুম্ফার প্রধান পুরোহিতদের উপর । তিন গুম্ফার (দ্রেপুং, সেরা, গান্‌দেন্) পুরোহিতরা একত্র মিলিত হয়ে রাজ্যের সেরা গণৎকারদের সাথে পরামর্শ করেন। দালাই লামার মৃত্যুক্ষণ ও আবহাওয়া বিচার করে গণৎকাররা বিরাট পুজার্চনা করে ধ্যানে বসেন। সেই ধ্যানে বসে অথবা দৈববাণীর মাধ্যমে অথবা স্বপ্নে তার ভবিষ্যৎ দালাই লামা কোথায় জন্ম নিচ্ছেন তা জানতে পারেন। রাজ্যের মুখ্য গণৎকার সেই গুপ্ত সংবাদটি জানান রাজ্যের মন্ত্রী ও তিন গুম্ফার প্রধানদের। মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী এই সময় স্থাপিত হয় অনুসন্ধান সমিতি। রাজ্যের সেরা লামাগণ নিয়োজিত হন এই অনুসন্ধান সমিতিতে। তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গণৎকারের নির্দেশানুযায়ী ছড়িয়ে পড়েন সম্পূর্ণ তিব্বতে। এই ভাবেই শুরু হয় দালাই লামার মৃত্যুর পর তাঁর নবজন্মের সন্ধান ।

মন্ত্রীপরিষদ দালাই লামার সিংহাসনকে উপলক্ষ্য করে তাঁর প্রতিনিধি হয়ে এই রাজ্য শাসন করতে থাকেন। সামিয়ে গুম্ফার গণৎকার ও জ্যোতিষিদের নাম সর্বত্র বিদিত। তারা নবজাতক দেহে কোন কোন চিহ্ন নিয়ে জন্মগ্রহণ করবেন সেটা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারেন। দালাই লামা পুরোনো দেহ ছেড়ে আত্মা কোন পথে কোথায় গিয়ে আবার নতুন দেহ ধারণ করেছেন তা সামিয়ে গুম্ফার জ্যোতিষিরা ভালোভাবে লক্ষ্য করে থাকেন। তান্ত্রিক সাধুরাও এ বিষয়ে খুব বিজ্ঞ। লাসার প্রধান গণৎকারের নাম নেচুং। নবজাতক প্রাক্তন দালাই লামার অনেক চিহ্ন ও স্বভাব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যেমন, পায়ে ব্যাঘ্র-চর্মের চিহ্ন, চক্ষু ও ভ্রু উপরের দিকে টানা, কান দুটো সাধারণ শিশুর কানের থেকে অনেক বড়, কাঁধে তীর চিহ্ন, হাতের মধ্যে শঙ্খ অথবা বজ্র চিহ্ন। প্রত্যেক দালাই লামার দেহে এই সবগুলো চিহ্ন না থাকলেও এরকম তিন চারটে চিহ্ন পাওয়া যাবেই।

নবজাতক শিশুর দেহে এইসব চিহ্ন ও তার স্বভাব-চরিত্র যাচাই করে যখন বোঝা যাবে যে সে-ই দালাই লামার উপযোগী তখন প্রাক্তন দালাই লামার ব্যবহৃত কিছু জিনসপত্রের সাথে অন্যান্য লোকের জিনিসপত্র মিশিয়ে শিশুর সামনে ধরা হয়। শিশুটি সাধারণতঃ ঠিক মতোই দালাই লামার জিনিসপত্রে হাত দেয়, অন্যান্য জিনিসে সে মোটেই উৎসাহ দেখায় না। শিশু ত্রয়োদশ দালাই লামা বেছে নিয়েছিলেন বজ্র। শিশুকে যখন প্রাসাদে আনা হয় তখন সে অনায়াসে তার জিনিসপত্রগুলো দেখে চিনতে পারে। চার-পাঁচ বছরের শিশু হলেও সে অনেক সময় তার প্রিয় ধর্মগ্রন্থটি বেছে নিয়ে পড়তে শুরু করে। এইসব প্রমাণের পর আর কিছুতেই সন্দেহ থাকে না যে এই শিশুটির মাধ্যমেই আসল দালাই লামার পুনর্জন্ম হয়েছে। এবার আসা যাক বর্তমান অর্থাৎ চতুর্দশ দালাই লামা কিভাবে মনোনীত হয়েছেন সেই গল্পে। ঘটনাটা বর্তমান জগতের বিজ্ঞানীদের কাছে অদ্ভূত শোনাবে। বিজ্ঞানীরা আধ্যাত্মিক জগতের কার্য-কারণ জানেন না। তাই তাদের যান্ত্রিক বিদ্যার মধ্যে এই ঘটনাকে এনে যাচাই করবার ক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা সত্য।

ত্রয়োদশ দালাই লামা, থুপ্‌টেন গীয়াৎসো ছিলেন তিব্বতের খুব প্রিয়। তিনি বহুকাল রাজত্ব করে তিব্বতের সামাজিক ও রাজনৈতিক বহু উন্নতিসাধন করেন। পোতালা প্রাসাদে বর্তমানে তাঁর সমাধি বেদিটাই সবচেয়ে বেশী পূজ্য আর ঐশ্বর্যে ভরা তো বটেই। ১৯৩৩ সালে তিনি দেহত্যাগ করেন। তাঁর দেহত্যাগের পর সঙ্গে সঙ্গে গঠন করা হল একটা বিশেষ পরিষদ। এই পরিষদই পরবর্তী দালাই লামা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাজ্য শাসন করবে।

রাজ্যের মুখ্য গণৎকার, জ্যোতিষী ও প্রধান লামাদের ডাক পড়ল পোতালা প্রাসাদে। তাদের উপর ভার পড়ল নতুন দালাই লামা খোঁজার। দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রাক্তন দালাই লামা, কোথায় পুনর্জন্ম করবেন তার কোন ইঙ্গিতই তিনি দিয়ে যাননি। কাজেই জ্যেতির্ষিমণ্ডলের কাছে এটা একটা বিরাট সমস্যা। তাঁরা সমস্যার সমাধানের জন্য ধ্যানে বসে তাঁর আত্মার সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেন---ঠিক সেই সময় লাসার উত্তর-পূর্ব আকাশে হঠাৎ দেখা দিল শরতের মতো হালকা মেঘ। আকৃতি ও প্রকৃতি বিচার করে জ্যোতিষীরা বললেন যে ঐ মেঘ ঠিক যে অঞ্চলের উপর দেখা দিয়েছে সে অঞ্চলেই মহামান্য চেন্-রে-জি জন্মগ্রহণ করবেন। রাজ্যের মুখ্য গণৎকারও পণ্ডিতদের সেই গণনায় একমত হলেন ।

ত্রয়োদশ দালাই লামার মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহকে নরবুলিংকা প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাঁর প্রিয় সিংহাসনে মর দেহটাকে রাখার পর তাঁর মুখটাও নাকি ঐ একই দিকে ঘুরে গিয়েছিল। কাজেই এই দুই ঘটনাকে পণ্ডিতরা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে ধরে নিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আরও তথ্যের জন্য গণৎকাররা অপেক্ষা করতে লাগলেন। এইভাবে প্রায় আরও দু'বছর কেটে গেল। গণৎকারদের মতে এটাই দালাই লামার পুনর্জন্মের উপযুক্ত সময়। প্রায় দু'বছর তাঁর আত্মা স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করে এবার নেমে আসবেন। ১৯৩৫ সালে জ্যোতিষী ও গণৎকাররা একত্র হলেন, তারপর তাঁরা তিব্বতের অন্যতম পবিত্র সরোবরের কাছে এসে উপস্থিত হলেন, লাসার প্রায় নব্বই মাইল উত্তরে এই সরোবরটি অবস্থিত, তার নাম লামোয়-লাৎসো।

হিন্দুদের মানস সরোবরের ন্যায় তিব্বতীদের লামোয়-লাৎসো সরোবর খুব পুণ্য তীর্থ। প্রাচীন কাল থেকেই মুনি-ঋষিরা এখানে তপস্যা করতে আসেন। এই লেকের আয়নার মতো জলে জ্যোতিষীরা দেখতে পান ভূত-ভবিষ্যত ও বর্তমানের ছবি। সেখানে আবার বসলেন চেন্-রে-জির ধ্যানে। অনেকের মতে সেই সরোবরের গভীরে অনেক জাগ্রত দেব-দেবী বাস করেন ; কেবল উপযুক্ত সাধক তাঁদের দর্শন পান ।

ধ্যান, প্রার্থনা ও পূজার্চনাদির পর হঠাৎ সরোবরের জলে তারা দেখতে পেলেন এক অলৌকিক ঘটনা। সরোবরের মাঝখান থেকে আকাশের দিকে উঠে এল তিনটি শব্দ—‘অ’ ‘ক’ এবং ‘ম’। সেই অক্ষরগুলো কিছুক্ষণ থেকে তারপর প্রদীপের আলোর মতো নিভে গেলো। পণ্ডিতেরা প্রথমে ভেবেছিলেন এই শব্দগুলো নিশ্চয়ই কোন মন্ত্ৰ হবে, কিন্তু ঠিক তার পরই সরোবরের জলে পরিষ্কার ভেসে উঠল, একটা ছবি, পরিষ্কার একটা গুম্ফার ছবি,গুম্ফার চূড়াটা উজ্জ্বল সোনালি ও সবুজ রঙের, আর তারই পাশে একটা সবুজ টালির ছাদের খামার বাড়ী। পণ্ডিত ও লামারা সকলে অবাক হয়ে সেদিক তাকিয়ে রইলেন। তাদের চোখের সামনে একটা ছবি ভেসে উঠে আবার যেন ডুবে গেল। এই অলৌকিক ঘটনার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা সবাই ফিরে এলেন, তারপর লাসায় জ্যোতিষীরা বসলেন বিচারে। গণৎকারেরা ডুব দিলেন তাদের রেখাতত্ত্বে। একটা স্থির সিদ্ধান্ত নিতে তাঁদের সময় লাগল আরও একবছর। তারপর গঠন করা হল এক অনুসন্ধান পরিষদ। সেই পরিষদের সভ্যরা সবাই লাসার উচ্চ পর্যায়ের ও উচ্চ পদের লামা। পরিষদের সভ্যদের অধীনে গঠিত হল বিভিন্ন অনুসন্ধান দল। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তারা সবাই বেরিয়ে পড়ল দালাই লামার সন্ধানে। লামোয়-লাৎসো সরোবরের সেই অলৌকিক ঘটনাটা তাদের মধ্যে খুব সাবধানে গোপন রাখা হল ।

এই ধরনের একটা অনুসন্ধান দল এসে পৌঁছল লাসার উত্তর-পূর্ব দিকের দোখাম (Dokham) জেলার তাতার (Takstar) গ্রামে। অনুসন্ধান দলের প্রধান লামা সেখানকার বিখ্যাত কুম্‌ গুম্ফাটাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এই গুম্ফটা অবিকল সরোবরে ভেসে ওঠা ছবির মতো আর গুম্ফার পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা খামার বাড়ী, যার সবুজ ছাদটাও ঠিক যেমন তাঁরা দেখেছিলেন।

অনুসন্ধান দলের দলনেতা লামোয়-লাৎসোয়, পণ্ডিত ও গণৎকারদের সাথে ছিলেন। তিনি এ দৃশ্য দেখে মনে মনে খুবই আনন্দিত হলেন। তিনি তাঁর দলের একজন ছোট লামাকে পাঠালেন সেই খামার বাড়ীর উদ্দেশ্যে। ছোট লামা খোঁজ খবর নিয়ে ফিরে এসে জানালেন যে, সে বাড়ীতে অনেকগুলো ছেলে মেয়ে আছে, সব চেয়ে ছোট ছেলেটির বয়স বছরখানেক। দলনেতা তাঁর কথা শুনে মনে মনে হিসেব করে দেখলেন, তারপর মুখে কিছু না বলে সে রাতের মতো সেখানকার গুম্ফায় আশ্রয় নিলেন। কুম্‌ গুম্ফা বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের কাছে খুব পবিত্র। এখানকার অনেক লামা সাধনার উচ্চ মার্গে উঠে নির্বাণ লাভ করেছেন আর তপস্যা ও শিক্ষার জন্যও এর খুব সুনাম আছে। কুম্ গুম্ফাটি মৌন ব্রতের জন্যও খুব বিখ্যাত। প্রাচীন কালে এখানকার কয়েকজন লামা সিদ্ধিমার্গের উচ্চে উঠে দেশের সর্বত্র তাঁদের বাণী প্রাচার করেছেন। ভূত-সিদ্ধ ও নির্বাণ এই দুই সাধনার জন্য আজও বহু লামা এখানে আসেন ৷ কুম্ গুম্ফার লামারা অনুসন্ধান দলটিকে সাদর আহ্বান জানালেন। সেই গুম্ফাতেই পাওয়া গেল সেই খামার বাড়ীর বড় ছেলেকে। ছোট ভাইয়ের বয়স প্রায় দু'বছর। এর বেশী আর কোন কথাবার্তা হল না ।

পরের দিন অনুসন্ধান দলের নেতা নিজে এক সাধারণ চাকরের মতো ছেঁড়া পোশাক পরলেন আর দলের অন্য সকলকে খুব দামী পোশাকে সুসজ্জিত করে সকলে মিলে এসে উঠলেন সেই খামার বাড়ীতে। বাড়ীর মালিক খুব বড়লোক নয় মধ্যবিত্ত ঘরের। ইয়াক্ মুরগী আর কিছু জমি চাষ করে জীবন যাপন করেন। সকাল বেলায় তিনি একদল লামাকে বাড়ীতে আসতে দেখে, খুবই অবাক হলেন এবং সেই সাথে সাথে অতিথি সেবা করতে পারবেন ভেবে আনন্দিতও হলেন। সেদিন অনুসন্ধান দলের এক ভৃত্যকে দলনেতার পোশাকে সাজানো হয়েছে, গৃহকর্তা তাদের সসম্মানে প্রণাম করে ঘরে এনে বসালেন। দু'একটা কথার পর লামারা তার ছোট ছেলেকে দেখতে চাইলেন। পিতার বুক গর্বে ভরে উঠল। ভাবলেন আশীর্বাদ করার জন্যই তার শিশুকে ডাকা হচ্ছে। তার স্ত্রী দু'বছরের শিশুপুত্রকে কোলে করে সেখানে এসে হাজির হলেন।

দলের আসল নেতা সকলের পিছনে চাকরের মতো চুপচাপ ছিলেন। শিশুটি সকলের দিকে একবার তাকিয়েই সোজা চলে গেল সেই চাকরের পোশাক পরা আসল দল নেতার কাছে। সে তার হাত ধরে বলে উঠল আমাকে কোলে নাও। শিশুর সেই ভাব দেখে পিতা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন, দলনেতার কাছে হাত জোর করে বললেন—প্রভু অপরাধ নেবেন না, শিশুপুত্রকে আপনিই কোলে নিয়ে আশীর্বাদ করুন। তার কথা শুনে সকলেই নীরব রইলেন, কিন্তু শিশুটি এগিয়ে এসে তার পিতাকে বললেন—

—না বাবা আমি ঠিক বলছি—আমি ওর কোলে উঠব। লোকটা সেরা-গুম্ফার বড় সাধু।

শিশু পুত্রের আধো আধো স্বরে এই কথা শুনে সকলেই অবাক হলেন। তখন চাকরের বেশে আসল দলনেতা এগিয়ে এলেন। তাঁকে দেখে শিশুটি আবার আব্দার করে উঠল—

-তোমার গলার ওই মালাটা আমাকে দাও ।

-কেন এটা দিয়ে কি করবে। বড় লামা প্রশ্ন করলেন ৷

—আমি গলায় পরবো ওটা আমার ।

শিশুর কথা শুনে এবার চাকরবেশী দলনেতা আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি মহানন্দে শিশুকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর তিনি সব খুলে বললেন—শিশুর কথাই ঠিক ; তিনিই দলনেতা, সেরা গুম্ফার প্রধান লামা ও কেওৎ-সাং-রিম্-পো-চে। আর তাঁর গলার মালাটা বহুদিন আগে দালাই লামারই দেওয়া। সাধারণ পোশাক পরিধান সত্ত্বেও শিশুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়নি কারণ এই শিশুই হচ্ছে আসল দালাই লামা। এই ভাবেই আবিষ্কৃত হল বর্তমান দালাই লামা অর্থাৎ চতুর্দশ লামা যাঁর আসল নাম তেজিং গীয়াৎসো।

অনুসন্ধান দল পোতালায় ফিরে সে সংবাদ সকলকে দিল। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে শিশু

লামাকে লাসায় নিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত হলেন, কিন্তু চীনাদের সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে তার আসার প্রায় তিন বছর দেরী হল। শিশু দালাই লামার সাথে তার বাবা-মা ভাই বোন সকলেই এলেন লাসায় তাঁর পরিবারের সকলকেই মহা সম্মানে ভূষিত করা হল। পোতালায় তার আগমন উপলক্ষে সম্পূর্ণ তিব্বতে শুরু হল আনন্দ উৎসব।

. পাঁচ বছরের শিশু দালাই লামা, পোতালা প্রাসাদে ঢুকেই তার নিকট পারিষদদের চিনতে পারলেন, এমনকি তাদের নাম পর্যন্ত। তারপর সেই শিশুটি যেখানকার আসবাবপত্রগুলো ইতিমধ্যে সরানো হয়েছে তা বলে দিতে লাগল। লামাদের লাঠির সাথে তার লাঠিটাকে রাখা হয়েছিল সেটাকে পর্যন্ত তার চিনতে অসুবিধা হয়নি। তিব্বতের প্রত্যেকটি লোকের মুখে দালাই লামার এই গল্প মুখস্ত। তারা অপরকে বলতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করে।

সেয়াং পরিবারে আমি মাত্র তিনবার এসেছিলাম। তারপর একদিন আমি নিজেই যাওয়া বন্ধ করলাম। এদের মুখ থেকেই শুনলাম যে চীনা গুপ্তচরেরা নাকি খুব সাংঘাতিক। যদি একবার ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে যে আমি ভারতীয় তাহলে এই পরিবারের মধ্যেও দেখা দেবে দারুণ অশান্তি, আর এই অশান্তির ঝামেলা তিব্বতের প্রধানমন্ত্রীরও এড়াবার সাধ্য নেই ।

তাই আমি তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে যে রকম হঠাৎ আলাপ হয়েছিল সেরকম হঠাৎই সম্পর্ক ছিন্ন করলাম ।

তারপরের কয়েকটা দিন আমি মহামন্দিরে ধ্যান ও বিগ্রহ দেখেই সময় কাটাতাম ৷ গুরুজী কখনো কখনো নাগার্জুন ও চন্দ্রকীর্তির বুদ্ধ দর্শন বুঝিয়ে শোনাতেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি তার দু'এক বর্ণ হয়তো বুঝতে পারতাম আর অধিকাংশ সময়েই হ্যাঁ হ্যাঁ বলে কাটাতাম। আমার মনটা সব সময়ই আবার চলার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%