গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা

বিমল দে

ওয়াংদি মশায় লোক হিসেবে বেশ ভালো। বয়স হয়ত তিরিশের কাছাকাছি হবে। মাথায় মেয়েদের মতো লম্বা চুল আর লেপ্‌চাদের মতো পোষাক। ওয়াংদি মশায়ের গ্রাম এখান থেকে আঠারো মাইল দূরে, লাসার পথেই। গ্রামের নাম গোশি সেখানে তার একটা ছোট মুদীখানার দোকান আছে। প্রায় পনেরো ষোল,দিন পর তাকে গীয়াৎসে শহরে আসতে হয় মালপত্র কেনার জন্য। তার মাল বইবার জন্য সাথে আছে একটি খচ্চর। শহরে এলেই সে বড় মন্দিরে যায় প্রদক্ষিণ ও প্রার্থনাচক্র ঘোরাবার জন্য। লামাদের সাথেও এর ভালই পরিচয় আছে। খাম্পো প্রত্যেকবার লাসায় যাবার পথে এদের বাড়ীতে চা খান। দেশন ওয়াংদি অন্যান্য বারের মতো এসেছিল বাজার করতে, খাম্পো এ সুযোগটা ছাড়লেন না। তিনিই ওয়াংদির সাথে গোশি গ্রাম পর্যন্ত যাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

খচ্চরটির পীঠেই সব মালপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে, আমাদের হাত একদম ফাঁকা। জানোয়ারটির মনে হয় এখানকার রাস্তাঘাট সব মুখস্থ আর তার পেছনে চলার জন্য কোন চাপ দিতে হয় না, তার নিজস্ব গম্ভীরভাব বজায় রেখে সে হেলেদুলে চলতে লাগলো। আমার মত এক বিদেশী লামাকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে মনে হয় সেও খুব আনন্দিত। ওয়াংদি ধূম পানে ওস্তাদ আর তার সাথে একটি দেশীয় মদের বোতলও রয়েছে। এই শুকনো শীতে দেহ-মনকে চাঙ্গা রাখবার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত আর কিছু হতে পারে না।

গীয়াৎসে থেকে' এবারে আমাদের রাস্তার ধারেই পাচ্ছি নীয়েরু নদী, তাই এই অঞ্চলের নাম নীয়েরু-উপত্যকা ।

গীয়াৎসের মন্দিরগুলো এখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর পাহাড়ের উপরে দুর্গটি আগের থেকেও যেন স্পষ্ট দেখাচ্ছে। গীয়াৎসের এই দুর্গটিকে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এ যাত্রায় আর তা সম্ভব হল না। পাহাড়ের সাথে খাপ খাইয়ে এত সুন্দরভাবে ও কৌশলে সেটাকে দাঁড় করানো হয়েছে যে দেখলেই তার দিকে সকলকে টানে। মনে হয় এই বিরাট প্রাসাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোন যাদুকর লুকিয়ে আছে। পাহাড় কেটে এই সুদৃশ্য বাড়ীটাকে দাঁড় করানো মানুষের পক্ষে মনে হয় অসম্ভব। অনেকক্ষণ ধরে আকাশের গায়ে সেই দুর্গটিকে আমি বার বার ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম। তারপর ধীরে ধীরে সেটাও অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমরাও যাচ্ছি পূর্বদিকে। গীয়াৎসের সেই প্রশস্ত সমতলভুমি ক্রমশঃ একটি সরু উপত্যকায় পরিণত হতে লাগল। এই প্রথম নজরে পড়ল চাষযোগ্য ভূমি। আমাদের দেশের মতো দু'পাশে লাঙ্গল চষা জমি। বরফ এখন গলতে শুরু করেছে, এ পথ দিয়ে যদি ফিরে যাই তাহলে নিশ্চয়ই চোখে পড়বে ইয়াকের কাঁধে লাঙ্গল খাটিয়ে তিব্বতী চাষারা চাষ করছে। রাস্তাটা খারাপ নয়, পাথর বসানো কাঁচা রাস্তা। রাস্তায় প্রায়ই চোখে পড়তে লাগল ইয়াক্, গাধা ও খচ্চরের পিঠে মাল বোঝাই করে লোকজনেরা চলাফেরা করছে। ওয়াংদির থেকে আমার দিকেই তাদের দৃষ্টি বেশী। কাছাকাছি এলেই তারা বিরাট জিভ বার করে আমাকে নমস্কার জানাতে লাগলো। আমাদের ডান দিকের পর্বত-শ্রেণীটাই চোমলহারি, তার ওপরের বরফের দৃশ্যটা এখান থেকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। নীয়াং উপত্যকা থেকে তার দৃশ্যটি ছিল অন্য রকমের। আমাদের রাস্তাটা এবার নদীটাকে নীচে রেখে উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। নদীটা রইল পাহাড়ের নীচে আর সেই পাহাড়েরই উপরে উঠতে লাগলাম। অনেকটা তিস্তা পুলের পরেই গ্যাংটকে আসার পথে যেরকম পেয়েছিলাম। তবে তফাৎ হচ্ছে যে সেই তুলনায় এই নদী খুবই ছোট। নদীর ধারেই এই রাস্তাটাও আগের মতো অত নির্জন নয়। আশপাশে মাঝে মাঝে ঘর-বাড়ীও নজরে পড়তে লাগল। আমরা পাহাড়ের উপর উঠতে লাগলাম। গাছ-গাছড়া খুব বেশী একটা চোখে পড়ে না, এই শুকনো ঠাণ্ডায় মনে হয় একমাত্র পাইনজাতীয় ছাড়া অন্য কোন গাছ হওয়া সম্ভবও নয়।

দুপুরবেলা আমরা একটা ঝরনার কাছে থামলাম, ওয়াংদি খচ্চরকে বরফে ভেজা ঘাস ও জল খাওয়াবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সেই ফাঁকে আমি একটা হিমশীতল পাথরের ওপর কম্বলটা বিছিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম একটু বিশ্রামের জন্য। আমরা শুকনো রুটি ও ঝরনার জলে ছাতু ভিজিয়ে মধ্যাহ্ণ আহার শেষ করে আবার রওনা হলাম। সন্ধ্যার সময় আমরা একটা গ্রাম পেলাম। এই গ্রামটিই গোব্‌শি। গোশি গ্রামে এক হাজারের বেশী লোক হবে না। গ্রামে ঢুকতেই যথারীতি গ্রামের কুকুরদের দ্বারা আমরা আপ্যায়িত হলাম। ওয়াংদি এই গ্রামেরই লোক কাজেই কুকুরগুলো ওকে চেনে। ছোটখাটো কয়েকটি বস্তি বাড়ী দিয়ে গ্রাম শুরু। ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সবাই যে যার ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামের মূল কেন্দ্রটা হচ্ছে চারটি রাস্তার সঙ্গমস্থল। নদীটা এখান থেকে মনে হয় দেড়শো ফিট নীচে। মাটি ও স্থানীয় পাথরের সংমিশ্রণে ঘরগুলো তৈরী। আমরা একটা বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়ীটা খামার বাড়ীর মতো, দরজায় ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেলো। সামনেই দেখলাম তিন-চার জন লোক। একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা, দু'জন যুবক একজন যুবতী। আমাকে দেখেই সবাই অবাক হয়ে গেলো। ওয়াংদি সকলকে আমার পরিচয় দিতেই তারা সসম্ভ্রমে জিভ বার করে নমস্কার করে দাঁড়ালো। তাদের মধ্যে সবচেয়ে খুশী হয়েছেন বয়স্কা ভদ্রমহিলা, আমার পরিচয় পেয়ে তার মুখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমাদের পরিচয়ের পালা চলছিল। ভদ্রমহিলা সবাইকে তাড়া দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমরা একটা ঘরে এসে বসলাম। ঘরের মধ্যে বিছানা, লেপ-তোষকগুলো পাতাই ছিল। সেখানে বসবার জন্য আমি জুতোটা খুলতেই তারা আমাকে বাধা দিল। অগত্যা জুতো নিয়েই আমি তাদের বিছানায় উঠে বসলাম। বলাই বাহুল্য, বিছানাগুলো কোনদিনই পরিষ্কার করা হয়নি। লেপ ও তোষকের নমুনা দেখলেই বোঝা যায়। হ্যারিকেনের অল্প আলোয় ভদ্রমহিলার মুখটা খুব উজ্জ্বল ও পবিত্র বলেই মনে হল। ওয়াংদি সকলের সাথে আমার পারিচয় করিয়ে দিল। বয়স্কা ভদ্রমহিলা তার মা, দুই ভাই, যুবতীটি তার স্ত্রী, আর তার দুই ছেলে এখন ঘুমোচ্ছে।

হ্যারিকেনটা মাঝখানে রেখে তার চারদিকে সবাই আমাকে ঘিরে বসল। দু’ভাই ইতিমধ্যে মালপত্রগুলো খচ্চর থেকে নামিয়ে রেখেছে। এই বাড়ীরই একটা অংশে তাদের দোকান। আমার সাথে তাদের কথাবার্তা খুবই কম হতে লাগলো। ওয়াংদি আমার সম্পর্কে কি বলল কে জানে। যাই বলুক না কেন সেটা যে আমার অনুকূলে ছিল তা বলাই বাহুল্য। কিছুক্ষণ পরে আমরা সবাই রান্নাঘরে এসে বসলাম। ঘরটা কাঠের ধোঁয়ায় সম্পূর্ণ কালো রঙের। আমরা কয়েকটি কাঠের পিঁড়িতে উনোনেরপাশে এসে বসলাম। বাড়ীর সকলের খাওয়া হয়ে গেছে, রান্না হল শুধু আমাদের জন্য। বার্লির ঝোলের মধ্যে শুকনো ভেড়ার মাংস দিয়ে অতি চমৎকার এক তিব্বতী ঝোল তৈরী হল। আমরা খুব ক্লান্ত ছিলাম। কাজেই খাওয়া দাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শোবার বন্দোবস্ত হয়ে গেল। আমি পরের দিন ভোরবেলায়ই রওনা হব। মাত্র একরাত্রির জন্য ওদের ওখানে থাকবো। আমার শোবার বন্দোবস্ত হল ওয়াংদির সাথে। অর্থাৎ ওয়াংদি তার স্ত্রী ও শিশুরা যে বিছানায় শুয়েছে সেখানেই আমার স্থান হয়ে যাবে। একটু ঠাসাঠাসি অবশ্য হবে কিন্তু তিব্বতের শীতে সেটাই সকলের কাম্য। অনেকদিন পর মনে হল আমি ঘরোয়া পরিবেশে এসে পড়েছি।

পরের দিন সকালবেলা শিশুদের খেলার শব্দে আমার ঘুম ভাঙলো, বিছানায় শুয়ে শুয়েই ওরা তাদের বাবার সাথে খেলা করছে। ওয়াংদির স্ত্রী মনে হয় এরই মধ্যে উঠে গেছে। আমিও বিছানায় উঠে বসলাম। শিশু দুটি হঠাৎ এক আগন্তুককে বিছানায় দেখে একটু চুপ হয়ে গেলো, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের সে ভাবটাকে দূর করে আমি ওদের প্রিয় হয়ে উঠলাম। সূর্য এখানে একটু দেরী করে ওঠে। সূর্য ওঠার সাথে সাথেই গ্রামের লোকেরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে রোদ পোয়ানোর জন্য। ওয়াংদি পরিবার খুব মিশুকে ও হাসিখুশী, তাদের দেখেই বোঝা যায় যে আমার উপস্থিতিতে তারা যেন সম্মানিত হয়েছে। সকালবেলা আমি তাদের সাথে দুপা খেয়ে সবাইকে বিদায় জানাতে বাধ্য হলাম। গ্রামের চার মাথায় সবাই এরই মধ্যে আমার বিষয়ে জেনে গেছে। রাস্তার দু'পাশে ছোট শিশু থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে দর্শনের জন্য। আমাকে দেখেই কেউ মাটি ছুঁয়ে, কেউ জিভ বার করে প্রণাম করতে লাগল ৷ তাদের সকলকে আর্শীবাদ করে আমি আবার পথ ধরলাম।

এবার আমি সম্পূর্ণ একা। গোবৃশি থেকে যেতে হবে সামদিং পর্যন্ত সম্পূর্ণ একা । এখান থেকে তিনদিনের পথ; রাতে কোথায় কোথায় থাকতে হবে সব লিখে নিয়েছি। গুরুজী আমাকে লিখে দিয়েছেন স্থানগুলোর নাম। লামারা সবাই সামদিং গুম্ফাতে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। গোশি গ্রামের পর পাবো বালু ; কারো-লা,জারা, নাগাৎসে, ত্রামালুক ও শেষ সামদিং। রাস্তায় পরে মনে মনে ভাবলাম যে গোশি ছেড়ে খুব ভালো করেছি কারণ ওয়াংদি পরিবারের মায়ায় পড়ে যেতাম, বিশেষ করে শিশু দুটি এত হাসিখুশী আর সুন্দর যে একবার কোলে নিলে আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না ।

পাহাড়ের উপর এবারকার রাস্তাটা সরু, নদীটা অনেক নীচে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে রাস্তাটা খাড়াই হয়ে উপরে উঠছে আবার নেমে আসছে। রাস্তার ঠিক পাশেই মাঝে মাঝে খাড়া হয়ে জমিটা নীচে নেমে গেছে, একবার পা পিছলে পড়লে আর দেখতে হবে না। আমার চলায় এবার কোনো বাঁধন নেই, তাড়াতাড়ি বা আস্তে যে রকম খুশী চলতে পারি। তবে আমি এখন ভালোভাবে শিখেছি যে, তাড়াতাড়ি চলার থেকে আস্তে আস্তে চললেই ভালো, তাতে রাত পর্যন্ত চলার দম থাকে। পাহাড়ি রাস্তায় এখন কিছু কিছু গাছপালা দেখতে পেলাম, মনে হয় এই গাছগুলোর কথাই ভুগোলে পড়েছি চিরহরিৎ বৃক্ষ। মাঝে মাঝে দেখেছি পাহাড়ের কোলে ঘরবাড়ী রাস্তায় লোকজনেরও অভাব নেই। এখানে শীত মনে হয় গীয়াৎসের থেকে আরও বেশী। পথটা মোটেই সমতল নয়, বিকেলের দিকে উপত্যকাটা আরও সরু হয়ে আসতে লাগলো, প্রায় সন্ধ্যের কাছাকাছি পেলাম রালুং গ্রাম। রালুং-এর উচ্চতা চোদ্দ হাজার পঁচিশ ফুট। পাহাড়ের উপর এই গ্রামটি যেন ছবির মতো সুন্দর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাড়ী, গোশির তুলনায় এটা আরও বড় গ্রাম। এই গ্রাম থেকেই দূরে দেখতে পেলাম সুন্দর তুষারাবৃত আর একটি পাহাড়, পড়ন্ত সূর্যের রঙিন আলো পড়ে সেটাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। শীতের প্রকোপ বেশী না থাকলে আমি নিশ্চয়ই আশপাশের কোনো পাথরে বসে বসে সেই দৃশ্য দেখতাম। কিন্তু এখন শুধু শীতই নয়, সেই সাথে দিনের আলোও নিভে আসছে। রাত হবার আগেই আমাকে খুঁজে বার করতে হবে এখানকার মঠ। তিব্বতের একটা সুবিধা হচ্ছে যে, এখানে কথা বলা বা জিজ্ঞাসা করার জন্য লোক খুঁজতে হয় না। নতুন লোকের গন্ধ পেলেই এরা দৌড়ে এসে ভিড় করে। আমার লামা বেশ দেখে, অনেকেই ভাবে যে আমি এদেশেরই একজন কেউ, কিন্তু কাছে এসে একটু থমকে দাঁড়ায়, তারা এক পা দু-পা করে এগিয়ে এসে আলতোভাবে দু'একটা কথা ছুঁড়ে দেয়, হয়তো পরীক্ষা করে দেখতে চায় যে আমি সত্যিই তাদের দেশের না বিদেশের। এই পথে কোন চীনা সৈন্য নেই, কাজেই আমার ভাগ্যটা ভালই বলতে হবে নয়তো আমাকে একা পেলে তাদের কবল থেকে সহজে ছাড়া পাওয়া মুশকিল হত ।

একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমি তাদের জিঞ্জাসা করলাম—এখানকার গুম্ফাটা কোনদিকে বলতে পারেন ? আমার প্রশ্ন শুনে সকলেই একসাথে জবাব দিতে লাগলো, সকলেই হাত-মুখ নেড়ে আমাকে বুঝিয়ে দিতে লাগল রাস্তাটার নিশানা। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমি তাদের দ্রুত কথার কিছুই বুঝতে পারলাম না, শেষে এক

ভদ্রলোক দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন- -সকলকে থামিয়ে দিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—গুফায় যাবে? বেশ ভালো কথা, এখান থেকে খুব বেশী দূর নয়। এই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই পাবে, রাস্তায়ই পড়বে।

তাদের হাসিমুখে ধন্যবাদ দিয়ে আমি পা বাড়ালাম। কয়েক পা এগিয়েছি মাত্র এমন সময় পেছন থেকে তিন চারজন ‘ত্রাপা-ত্রাপা' বলে চীৎকার করে আমার দিকে দৌড়ে এল। আমি থামলাম। তারা আমাকে বুঝিয়ে বলল যে পেছন থেকে আমাকে একজন ডাকছেন। পেছনে আবার ফিরে এলাম। যে ভদ্রলোক আমাকে গুম্ফার পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন আসলে তিনিই আমাকে ডাকছেন। কাছে আসতেই তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—একটু চা খাবে? নিশ্চয়ই---বলে আমি আনন্দে যেন লাফিয়ে উঠলাম ৷

ভদ্রলোক আমার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি গ্রামবাসীদের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ইতিমধ্যে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে, সূর্যাস্তের সাথে সাথেই নেমে আসে কনকনে ঠাণ্ডা আর অন্ধকার। ঠিক এই মুহূর্তে এক কাপ গরম চা, আহা! সে যে অমৃত। ভগবানের অশেষ কৃপা ছাড়া এ ব্যবস্থা সম্ভব নয়। আমার পকেটে দু'টাকা রয়েছে কিন্তু চা খাওয়ার কথা মনে আসেনি, কতক্ষণে রাতের বিশ্রাম পাবো, একটু শুতে পারবো—সেটাই ছিল আমার লক্ষ্য।

একটু পরে দোকানের দরজা খুলে এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। তিনি আমাকে ডেকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। দোকানের ভেতরে ঢুকেই বুঝতে পারলাম যে এটি একটি চায়ের দোকান। সুর্যাস্তের সাথে সাথেই এখানকার দোকান-পাট সব বন্ধ হয়ে যায়। ভদ্রমহিলাকে দেখতে ঠিক লেপচাদের মতো, কোমরের উপর জড়ানো সাতপাকের একটা পেছি, মাথার চুল শক্ত করে টেনে বিনুনী করা, পোশাকের সামনের দিকটা খুবই ময়লা, কাজ করবার সময় গামছা হিসেবে মনে হয় বুকের ওপর তিনি হাত পৌঁছেন। একনজরে দেখলেই বোঝা যায় যে তিনি খেটে খাওয়া মানুষ। যদিও চায়ের দোকান কিন্তু ভেতরে বেঞ্চি বা টেবিলের কোনো বন্দোবস্ত নেই। বিরাট ঘরের মাঝখানে একটা বিরাট গর্ত করা হয়েছে, সেখানে আগুন রেখে চারপাশে খদ্দেররা বসে গল্প করতে করতে চা পান করে। এরা খুবই পরিশ্রমী মানুষ। এই অঞ্চলে চাষ-আবাদ করার জন্য পাথর কেটে তৈরি করেছে ধাপে ধাপে চাষের উপযোগী জমি। গরম হয়তো এখানে বড়জোড় এক বা দুই মাস, সেই সময়েই যতটুকু সম্ভব তাড়াহুড়ো করে ফসল ফলানো হয়। চাষ-আবাদ ছাড়া আর একটা জিনিস খুব ঘন ঘন চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে এখানকার গবাদি পশু, ভেড়া, গাধা, ইয়াক্ ইত্যাদি। কুকুর আর মুরগীদের তো এটা স্বর্গরাজ্য। চা মনে হয় তৈরি করাই ছিল সেটাকে গরম করে একটা গ্লাসে করে ভদ্রমহিলা আমাকে দিলেন। পকেট থেকে দুটাকা বের করে বললাম এর থেকে দামটা নিয়ে নিন !

ভদ্রমহিলা সঙ্গে সঙ্গে দু'পা পিছিয়ে গেলেন। তিনি কিছুতেই দামটা গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। চা খেয়ে আমি বেরোতে যাবো এমন সময় ভদ্রলোক আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বললেন—তারপর তার স্ত্রী সাথে কোন একটা বিষয়ে আলাপ করতে লাগলেন। আমাকে বুঝিয়ে বললেন—এখান থেকে গুম্ফার পথ খুব দূরে নয়, তবে রাতের রাস্তাটা খুব ভয়ঙ্কর। গ্রামের কুকুরগুলো তোমাকে চেনে না কাজেই সেটাও একটা বিপদ, রাতের বেলা কুকুরগুলো আরও বিপজ্জনক। তুমি ইচ্ছা করলে এখানে থেকে যেতে পারো, উনোনের আগুন প্রায় সারারাতই থাকে কাজেই কোনো অসুবিধা হবে না ।

আমি একটু দ্বিধা করলাম কিন্তু তাদের সুপরামর্শের বাইরে যেতে আমার সাহস হল না। আমি রাজি হয়ে গেলাম। একটা অচেনা পথিকের প্রতি তাদের দরদ ও আন্তরিকতার পরিচয় পেয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার মতো একটা সামান্য মানুষকে বাঁচিয়ে তাদের লাভটা কি ? মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা সেটাই হয়তো এই তিব্বতীদের বৈশিষ্ট্য। অথচ এরা যখন আমাদের ওখানে যায় তখন এদের বেশভূষার নোংরামি দেখে তাদের আমরা হেয় চোখে দেখি। এদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই দরদী প্রাণটাকে আমরা কতভাবে আঘাত করি, এই কথা ভেবে লজ্জায় আমার মুখটা নত হয়ে এল ।

বুঝলাম যে এই ভদ্রমহিলা আর ভদ্রলোক কর্তা গিন্নী নয়। দোকানের মালিক ভদ্রমহিলা, অর ভদ্রলোক তার এখানে কাজ করেন। তবে তার এখানেই রাত কাটায় । এর বেশী কিছু আর জানতে পারলাম না, তবে তারা দু'জনেই যে মানবদরদী সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ। দোকানটির অবস্থা দেখে মনে হয় না যে এরা বড়লোক। সারাদিন চলার জন্য আমি ক্লান্ত এমন অবস্থায় আমার যেটা একান্তই দরকার তা হচ্ছে আস্তানা আর আগুন। খাওয়া না হলেও চলে। কিন্তু ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা দু'জনেই আমাকে তাদের সাথে খেতে বললেন। খুব সংক্ষেপে আধঘন্টার মধ্যেই রান্না হল। বার্লি সেদ্ধ আর মাংসের কুঁচো দিয়ে একটা ঝোল, সে যেন অমৃত

হঠাৎ মনে পড়ল যে আমার থলির মধ্যে কিছু বাড়তি নুন আছে, তিব্বতে নুন খুব দামী কাজেই প্রয়োজনবোধে বিক্রি করা যেতে পারে। গীয়াৎসে থেকে ছাড়াছাড়ি হবার সময় গুরুজী কিছু ছোট জ্বালানী কাঠ ও লবণের থলিটা আমার ভরসায় রেখে এসেছিলেন। খাওয়ার জন্য ওরা দাম নিতে চায় না, কাজেই ভাবলাম আমার তরফ থেকে কিছু দেওয়া দরকার। তাই খাওয়ার শেষে আমি থলেটা থেকে কিছু নুন বের করে একটা বাটিতে রাখলাম। আমার কাছ থেকে নুন পেয়ে তারা দু'জনেই খুব খুশী। হ্যারিকেনের আলোয় তাদের খুশীতে ভরা মুখটা যেন জ্বল জ্বল করে উঠল। কোনো রকম বাধা না দিয়েই ভদ্রমহিলা তা গ্রহণ করলেন। তারপর আমি কম্বলটা বিছিয়ে শোবার বন্দোবস্ত করে ফেললাম। আমার শোবার সময় ভদ্রমহিলা তার বাক্স থেকে অতি যত্নে রাখা একটা টেবিল ঘড়ি আমার কাছে নিয়ে এলেন, তারপর কোন রকমে আমাকে বুঝিয়ে বললেন আমি ওটাকে চালাতে পারি কিনা। আমি ঘড়িটাকে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম সব ঠিকই আছে, তবে মনে হয় অনেকদিন যাবৎ ব্যবহার করা হয়নি। সেটাকে দম দিতেই চলতে আরম্ভ করল, ভদ্রমহিলা তাই দেখে আনন্দে নেচে উঠলেন। তারপর, তাদের আরও অবাক করে দিয়ে অ্যালার্মটা বাজিয়ে দিলাম। সেটা শুনে ভদ্রমহিলা বাচ্চা মেয়ের মতো হিহি করে হেসে উঠলেন, এই সামান্য ব্যাপারে তিনি যে এত খুশী হয়ে উঠবেন আমি তা ভাবতেই পারিনি। আমি যেন তাদের যাদু দেখাচ্ছি।

ভদ্রমহিলা পরে বুঝিয়ে বললেন—এই ঘড়িটা তার ভাই শিলিগুড়ি থেকে কিনে এনেছিল, কিন্তু মুল্যবান উপহার বলে সেটাকে তিনি সব সময় বাক্স-বন্দী করে রেখেছিলেন। তার ভাই অবশ্য বুঝিয়ে দিয়েছিল কিভাবে সেটাকে চালাতে হয়, কিন্তু তিনি কোনোদিনই সেটাতে হাত দিতে সাহস করেন নি। যাই হোক, আমি ভদ্রমহিলাকে আবার নতুন করে ঘড়ি দেখা, দম দেওয়া ও অ্যালার্ম বাজানো শিখিয়ে দিলাম। ভদ্রমহিলা আমার মতো একজন গুণী সাধু পেয়ে খুবই আনন্দিত হলেন। তার হয়তো আরও অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিল কিন্তু আমার অবস্থা কাহিল, ক্লান্তিতে দুই চোখ আপনা থেকেই বুজে আসছে। তিনি সে কথা বুঝতে পেরে উনোনের পাশে আরও দুটো বড় কাঠ রেখে লেপের মধ্যে আশ্রয় নিলেন। উনোনটাকে মাঝখানে রেখে আমরা তিনজন তিনদিকে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই পেলাম গরম চা, তারপর ভদ্রমহিলা নিজেই এলেন আমাকে এগিয়ে দেবার জন্য। ভদ্রলোক তখনও মহাসুখে নাক ডাকছেন। গ্রামের সবাই তখনও ওঠেন নি, রাস্তায় এসে সামনের দিকে তাকাতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম ৷ আমার সামনেই হিমালয়ের যে অপূর্ব রূপ দেখতে পাচ্ছি তাতে আমার বাদ্ধ হল। একে সুন্দর বললে ছোট করা হয়। অতি সুন্দর বললেও তার আসল রূপ বর্ণনা থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়, মনে হয় এ সৌন্দর্য ভাষা দিয়ে ব্যক্ত করা যায় না। ভাষার বাইরে যে এক অব্যক্ত জগৎ সেই জগতেরই এই প্রাকৃতিক সম্পদ। আমাদের অনতিদূরেই একটি সুন্দর বরফে ঢাকা পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে, সুর্যের আলোকে তার এক পবিত্র স্নিগ্ধ রূপ পৃথিবীর উপর ধরা দিয়েছে। মনে হচ্ছে এই পাহাড়ের উপরেই রয়েছে দেবরাজ ইন্দ্রের ইন্দ্রপুরী, উপরে পরিষ্কার নীল আকাশের চাঁদোয়া খাটিয়ে যেন তার অখন্ড পবিত্রতা রক্ষা করা হয়েছে।

ভদ্রমহিলা আমাকে বিহ্বল দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন—এই পাহাড়টার নাম নোজিন কাং সাং। এই পাহাড়টির ঠিক নিচে দিয়েই বয়ে গেছে সাংপু নদী ; তোমাদের দেশের লোকেরা যাকে বলে ‘ব্রহ্মপুত্র’| মনে মনে তাকে স্মরণ করে প্রণাম জানালাম ।

তিব্বত থেকেই শুরু হয়েছে ব্রহ্মপুত্র। পাহাড়ের উপরকার তুষার গলে গলে তৈরী হয়েছে তার জল। ব্রহ্মপুত্রের আদি দেখতে পাবো মনে আনন্দে বুকটা নেচে উঠল। তিব্বতের এই মহান নোজিন্ কাং সাং পর্বত চোমলহারির সাথে কারো-লা নামক স্থানে মিলিত হয়েছে। লাসার পথে আমাদের সে পথ পার হতেই হবে, এখান থেকে তা মাত্র ঘন্টা তিনেকের পথ। নোজিন্ কাং সাং-এর উচ্চতা চব্বিশ হাজার ফুট। পর্বতশৃঙ্গের উপরে বরফ পড়ে জমাট হয়ে আছে একেই বলে গ্লেসিয়ার। আরও কিছু ভারী হলে হয়তো সম্পূর্ণ চূড়াটাই ধসের আকারে নেমে আসবে নীচে। আকাশের মেঘ পর্বত চূড়ায় বাধা পেয়ে সেখানেই সৃষ্টি করেছে শিবের জটারূপ ভারী বরফ। তারপর সেই বরফ থেকে সূর্যের কিরণে সৃষ্টি হচ্ছে খরস্রোতা নদী। সেই নদীর জলে পুষ্ট হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র। টাইগার হিল থেকে এই ধরনের দৃশ্য দেখা যায় না, একমাত্র যারা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে অজানাকে জানতে অথবা ভাগ্যচক্রে এসে পড়ে তিব্বতের এই অঞ্চলে তাদের কাছেই ধরা পড়ে প্রকৃতি দেবীর এই গূঢ় রহস্যময় দৃশ্য। এ দৃশ্য একবার দেখলেই মনে আনে স্বৰ্গীয় অনুভূতি। স্বর্গরাজ্যকে কল্পনা করার এ-এক চরম সুযোগ ।

বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে রওনা দিলাম রালুং গুম্ফার দিকে। মাইলখানেক হাঁটার পর রাস্তার মোড় ঘুরতেই পাহাড়ের নীচে ছোট্ট একটা গ্রাম নজরে পড়ল, গ্রামটা বর্ধিষ্ণু সবগুলো বাড়ীর ছাদই মন্দিরের মতো, আর বাড়ীগুলোপাথরের তার আশেপাশে রয়েছে সুন্দর কৃষিযোগ্য ভূমি। নদীটা বেশী দূর নয় । দেখেই মনে হয় সুন্দর শান্ত ও পবিত্র পরিবেশ। সেই গ্রামটা দেখিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন—এটাই রালুং গুম্ফা, এই রাস্তাটা ধরে এগিয়ে গেলেই তার দরজা পাবে। ভদ্রমহিলা আমাকে ছেড়েও যেন ছাড়তে চাইছেন না, কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। আমি আস্তে আস্তে এগুতে লাগলাম সেই মঠের দিকে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে দেখা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মাতৃমূর্তি আমার হৃদয়ে গাঁথা হয়ে থাকবে।

গ্রাম বলতে আসলে এটা সম্পূর্ণ একটা বৌদ্ধ বিহার। সাতটা ছোট ছোট বাড়ী নিয়ে এই বিহারটি গড়ে উঠেছে, বড় বড় থামের সঙ্গে অসংখ্য প্রার্থনা পতাকা উড়ছে। সামনেই কয়েকটা গাধা ও ভেড়া আমাকে দেখে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তিব্বতের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী কুকুরগুলো ছুটে এসে আমাকে স্বাগতম জানালো। কুকুরগুলো ছুটে এলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়তে হয় সেটাই হচ্ছে নিয়ম, তারপর মঠের থেকে দু'জন লামা বেরিয়ে এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। অল্প বয়স্ক লামা দু'জন মনে হয় সবে তাদের নবীন জীবন শেষ করে লামা পর্যায়ে পড়েছে। আমার কাছে এসেই জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি মৌনীবাবা, গ্যাংটক থেকে আসছো ? আমি মাথা নেড়ে হাসিমুখে সম্মতি জানালাম। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে হল না। তারা আমাকেই আমার যা জানা দরকার তা জানাতে লাগলো—তীর্থযাত্রীরা সবাই একে-একে এখান দিয়েই গিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকে এখানে রাত কাটিয়েছেন, তুমি এখন যদি রওয়ানা হও তাহলে আজ রাতেই সামদিং গুম্ফাতে পৌঁছতে পারবে সেখানে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করবেন।

লামা দু'জন আমাকে খুব আস্তে আস্তে ভেঙে ভেঙে এই কথাগুলো বুঝিয়ে দিল। এদের ভাব দেখে আমি স্পষ্টই বুঝতে পারলাম যে আমাকে মৌনীবাবা হিসেবেই সবাই ধরে নিয়েছেন কাজেই আমার কথা বলার কোন প্রশ্নই আসে না। তাদের কাছ থেকে পথের নির্দেশও পেয়ে গেলাম। এই পথ ধরেই আমাকে সোজা চলতে হবে। বিকেলের দিকে আমার ডানদিকে পড়বে একটা বিরাট সরোবর, তার নাম যমদ্রোক সরোবর। সেই সরোবরের ধার ধরে রাস্তাটা এগিয়ে গেছে উত্তর দিকে সেখানে পাওয়া যাবে বিরাট একটা বৌদ্ধ বিহার, নাম সামদিং গুম্ফা। সেখানে তীর্থযাত্রীরা সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছেন ।

তাদের কথা শুনে আমি আর দেরী করলাম না। তাদের সাথে আমি সেখানকার বড় মন্দিরে শাক্যমুনিকে প্রণাম করে মন্দিরের চারদিকে প্রার্থনা-চক্র ঘুরিয়ে প্রদক্ষিণ সেরে বিদায় জানালাম। এই রালুং গুম্ফায় বোধ হয় পঁচিশ তিরিশ জনের মতো লামা থাকেন তাদের সকলের সাথেই দেখা হল। কিন্তু মৌনী থাকার জন্য কোনো রকম কথাবার্তাই হয়নি। সেখানকার প্রত্যেকটি লামা আমাকে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন, সকলেই আমার মঙ্গল কামনা করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানালেন ।

রাস্তাটা আস্তে আস্তে এবার উপরের দিকে উঠতে লাগল। তুষারধবল নোজিন্ কাং সাং পর্বতশৃঙ্গের উপরেই মনে হয় এই রাস্তাটা গিয়ে শেষ হয়েছে। ছায়াতে খুব ঠাণ্ডা আর রোদ্দুরে গরম, মাথার উপর এখন নীল আকাশ, একটুকরো মেঘও নেই। আর তারই কোলে সাদা পাহাড়ের চূড়াটি যেন বীর দর্পে দিগ্বিজয়ীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। সকাল থেকে কোনোরকম বাতাস ছিল না এখন যতই উপরে উঠতে লাগলাম ততই বাতাসের প্রকোপ বাড়তে লাগলো। গুম্ফা ছাড়ার পর রাস্তাটা ছিল একদম ফাঁকা এখন পেছন থেকে দুটো গাধা এসে আমার সঙ্গ নিল। গাধার আরও অনেক পেছনে মনে হল আরও কয়েকটি গাধা ও ভেড়া রয়েছে। রাখাল বা এই পালের মালিক বোধহয় তাদের সাথেই আসছে। রাস্তাটা কঠিন নিঃসন্দেহ কিন্তু এখানে চলায় আছে আনন্দ। এই দেবভূমিতে যদি ঠাণ্ডার প্রকোপ না থাকতো তাহলে এখানেই আমি চিরদিনের জন্য থেকে যেতাম। যতই উপরে উঠতে লাগলাম ততই আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হতে লাগল। তারপর এমন সময় এল যখন দু'পা এগিয়েই থামতে হচ্ছে বিশ্রামের জন্য। আরও উপরে হঠাৎ যেন মন্ত্রবলে বাতাসটা বন্ধ হয়ে গেল। মনে হয় উচ্চতার জন্য বাতাসের অভাব অথবা অন্য কোন কারণও হবে। গাধা দুটোকে পেছনে ফেলে আমি শেষে কারো-পাস এর সর্বোচ্চে এসে উপস্থিত হলাম এখান থেকে মনে হয় হিমালয়ের ছাদে উঠে পড়েছি। আমার সামনের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমারও চারদিকে এখন শুধু বরফ আর বরফ। আকাশ থেকে কে যেন সাদা তুলো ফেলে বিছিয়ে দিয়েছে তুলোর বিছানা। এ দৃশ্য মনের উপর প্রভাব আনলো শান্তি আর পবিত্রতার। একে সৌন্দর্য বললে ভুল বলা হবে। শুদ্ধ পবিত্র কথাটা এখানেই যেন রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার হৃদয় এক অব্যক্ত আনন্দে ভরে উঠল। সেই আনন্দের বিশ্লেষণ করতে আমি পারবো না। সেটাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসল রূপটাই ফেলবো হারিয়ে তাই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সেই মহানন্দ সমুদ্রের আনন্দ-রস পান করতে লাগলাম। এই দৃশ্যটাই আনলো উপলদ্ধি। এই জগতের এক অনন্ত আনন্দধারার ছন্দ এসে যেন আমাকে স্পর্শ করেছে। সেই যাদুর ছোঁয়ায় আমাকে খুব হালকা বলে বোধ হতে লাগল। এটাই হয়তো স্থান মাহাত্ম্য। যে মাহাত্ম্যের নেশায় যুগ যুগান্ত ধরে ছুটে আসছে তীর্থযাত্রীর দল। সবাই আসছে এই অমৃতের সন্ধানে। যম, নিময়, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা, সমাধি আমাদের কোথায় নিয়ে যায় আমার জানা নেই, আমার চারদিকের এই ছন্দোময় জগতের আমি সাক্ষী, বিনা সাধনায় আমার এই যে পাওয়া এই পাওয়াটকে রাখবো কোথায় ? সেই করুণাময়ী জগদ্ধাত্রী অনন্তরূপের অধিকারিণী দেবীর প্রতি আমার হৃদয়ের সম্পূর্ণ সত্তা দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাবার জন্য লুটিয়ে পড়লাম তাঁর চরণে। সাষ্টাঙ্গ প্রণামে নিবেদন করলাম আমার ভক্তি-অর্ঘ্য। আমি ধন্য, আমার জন্ম সার্থক। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পাশে এসে দাঁড়াল, আমারই পথের পথিক সেই গর্দভ দুটো। তারাও মনে হয় নীরবে তাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে লাগলো তাদের ইষ্টদেবতার কাছে। তার কিছুক্ষণ পরই দু'জন তিব্বতী লোক একপাল ভেড়া তাড়াতে তাড়াতে সেখানে এসে হাজির হল। আমাকে দেখেই তারা সসম্ভ্রমে জিভ বার করে প্রণাম করে দাড়াল। তারা কি যেন জিজ্ঞাসা করল কিন্তু মৌনীবাবার পক্ষে তার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কারো-লা'র সেই উচ্চাংশের পাশেই নজরে পড়ল বিরাট পাথরের স্তূপ, সেই স্তূপের মাঝখানে দাঁড় করানো একটা বিরাট প্রার্থনা-পতাকা দণ্ড। আমি তিব্বতীদের দেখাদেখি পাশের থেকে একটা পাথর তুলে এনে সেই স্তূপীকৃত পাথরের মধ্যে ফেললাম। তিব্বতের যে কোন-‘পাস' (Pass) পার হবার সময় এই ধরনের স্তূপীকৃত পাথর চোখে পড়বেই। ‘লা’ বা ইংরেজিতে যাকে বলে Pass স্বভাবতই সে অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু যাতায়াতের পথ। স্তূপাকৃতি পাথরের স্থানটা ‘চৈত্য-এর প্রতীক। নির্বিঘ্নে সে অঞ্চলটা পার হবার জন্য ভগবানের কৃপাপ্রার্থী ভক্তদের সামান্য অর্ঘ্যস্বরূপ, ধন্যবাদ জ্ঞাপক। এত উপরে উঠেও মানুষ যাতে সেই পরমেশ্বরকে ভুলে না যায় পাথর সাজিয়ে স্তূপ গঠনের এই চেষ্টা সেই অর্থই বহন করছে। তিব্বতে এই ধরনের বহু ব্যাখ্যা প্রচলিত। সাধারণতঃ তিব্বতীরা অবশ্য এইসব ব্যাখ্যার ধার ধারে না। তাদের কাছে এটা একটা কর্তব্য, এই কর্তব্য কেন পালন করা হবে সে কথা মনে হয় তারা কোনোদিনই ভাবেনি।

আমি ঘন্টাখানেক সেখানে থেকে তারপর আবার পথ ধরলাম। এই পথটা সরাসরি নীচে নেমে গেছে। কারো-লার থেকে কয়েক পা এগুতেই পেলাম রাস্তার উপর জমাট বরফ। এই ঢালু অংশে সূর্যের তাপ অপেক্ষাকৃত কম। কাজেই বরফগুলো গলার সময় পায়নি। সাদা মিছরির মতো জমাট বরফের উপর দিয়া আমি হাঁটতে লাগলাম। কত কষ্ট করে উপরে উঠেছিলাম অথচ নামার সময় মনে হল কোন রকম পরিশ্রমই নেই। আমাদের জগৎটা মনে হয় এই নিয়মেই বাঁধা। কত কষ্ট করেই না সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, কত কষ্ট করে এগুতে হয় সাধনার পথে, অথচ যারা জীবন-সত্যের বাইরে তাদের পথ নীচের দিকে। নীচে নামাটাই সব সময়ে সুবিধাজনক। কাদার মতো বরফে বার বার পা বসে যেতে লাগলো। নীচে নামতে নামতে বার বার দেখতে লাগলাম সেই পর্বতচূড়ার শান্ত উজ্জ্বল রূপ। নীচের থেকে আর এ দৃশ্য দেখা যাবে না। কাজেই হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে নিতে হবে নামার আগেই। আমি একটি সাধারণ ভণ্ড মৌনীবাবা, সাধনালব্ধ আনন্দ আমার সাধ্যের বাইরে। সাধু সেজে যা পাচ্ছি তাতেই আমার প্রচুর লাভ, সত্যিকারের সাধুরা এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই আনন্দ-সাগরে ভাসেন। অবশ্য তাঁদের সাধনায় তাঁরা হয়তো এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দকে চিরানন্দে পরিণত করেন। সে যাই হোক সেটা আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে সম্পূর্ণ এক অন্য জগৎ ।

কারো-লা'র থেকে নীচে এসে পেলাম ছোট্ট একটা গ্রাম, পাথরের বড় বড় বাড়ী তার অধিকাংশই খামার বাড়ী। ভেড়া, শুয়ার, মুরগী, গাধা, ইয়াক ও পাহাড়ী ঘোড়াদের এক বিরাট আড্ডাখানা বলতে হবে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে এটা একটা পশুমেলা । রাস্তার উপরেই তাদের জমা করে রাখা হয়েছে। ওদের পাশ কাটিয়ে অতি সন্তর্পণে আমি এগিয়ে চলতে লাগলাম। গ্রামের ঠিক কেন্দ্রেই পেলাম ছোট একটি চায়ের দোকান। দোকানটির সামনে আগুন জ্বালিয়ে তিব্বতীরা গল্প করছে। তাদের সাথে নমস্কার বিনিময় করে আমি ইসারায় জানতে চাইলাম যে সেদিকে কোনো সরাইখানা আছে কিনা। ইসারায় হলেও মনে হয় আমার কথা তারা বুঝতে পারলো। দোকানদার একটি অল্প বয়েসি ছেলে, সে আমাকে তার দোকানের এক কোণে নিয়ে গিয়ে একটা কৌটো থেকে কিছু যব আর গোটা বার্লি দেখালো, তার সাথে সামান্য শুকনো ভেড়ার মাংস মিশিয়ে সে একটা ঝোল তৈরী করে দিতে পারে। কিন্তু তার জন্য দাম দিতে হবে । আমি অবশ্য দাম দিতে রাজি, আমি পকেট থেকে দু'টাকার নোটটা তাকে দেখিয়ে আশ্বাস দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম যে পয়সার জন্য সে যেন চিন্তা না করে ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার তৈরী হল। গরম গরম খেয়ে আমি তাকে দুটো টাকা দিতেই আনন্দে তার চোখ দুটো জ্বল্ জ্বল্ করে উঠল। দুঃখের বিষয় তার কাছে ভাঙানি নেই, খাবারের দাম মাত্র চার আনা। তার কাছে তিব্বতী ও চীনা মুদ্রা আছে কিন্তু ভারতীয় মুদ্রা গ্রহণ করলে ফেরৎ দিতে হবে ভারতীয় মুদ্রায়। অনেকক্ষণ ধরে ইসারায় তাকে বুঝিয়ে দিলাম যে আমার সেই দেশীয় মুদ্রা নিলে আপত্তি নেই। তার কাছ থেকে পকেট ভর্তি ফেরত পয়সা নিয়ে আমি রওনা হলাম, যাবার আগে তাদের কাছ থেকেই জেনে নিলাম গ্রামটির নাম। ছোট্ট নাম জারা ।

জারা গ্রাম ছাড়ার পর আমার ডানদিকের তুষার ধবল গিরিশিখরটিও আস্তে আস্তে আর একটা ছোট পাহাড়ের ওপারে উধাও হল, রাস্তাটা ক্রমাগতই নীচের দিকে নামছে, ঘণ্টাখানেক চলার পরই রাস্তাটা এসে মিশেছে বিরাট একটা সমতল-ভূমিতে। সেখানেই পেলাম একটা বিরাট সরোবর। এটাই যমোদ্রক সরোবর।

সরোবরটা বিরাট—চিল্কা হ্রদ যাঁরা দেখেছেন তাঁদের পক্ষে কল্পনা করতে সুবিধা হবে। সরোবরের জলে নীলাকাশেরই পরিষ্কার রূপ। আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল এখানকার হাজার হাজার পতাকা। কাঠ থাম বাড়ীর উঁচু অংশে গাছের ডালে চারদিকেই বিভিন্ন রঙের ধর্ম ধ্বজা আর প্রার্থনা লেখা কাপড়ে ভরা। মনে হয় যেন আসন্ন কোনো উৎসব উপলক্ষে সাজানো হয়েছে। গ্রামটার সব বাড়ীগুলোই পাথরের, স্থানীয় পাথর সাজিয়ে সিমেন্ট দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, আর ওপরে টিন বা ঢালাই ছাদ । প্রত্যেকটা দরজা জানালার চারদিকে সুন্দর কাঠের কাজ করা। আশপাশের পাহাড়ের বরফ গলে এই বিরাট হ্রদে এসে পড়ছে, তারপর একটা ছোট খরস্রোতের আকারে সেই জল গিয়ে মিশেছে ব্রহ্মপুত্র নদীতে। এই ধরনের অনেক লেক ও পাহাড়ের জল নিয়েই তিব্বতের ! সাংপো নদী, আমাদের দেশে গিয়ে নাম নিয়েছে ব্রহ্মপুত্র। পাহাড় দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম হঠাৎ তার মধ্যে এই সাগরের মতো হ্রদটা পৃথিবীর আর এক প্রান্তে যেন আমাকে নিয়ে এল। শান্ত স্বচ্ছ গভীর ও গম্ভীর হ্রদের ওপার এখান থেকে দেখা যায় না। হ্রদের চারিদিকে হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনন্তরূপ অচল নির্বিকার শিবের উপর যেমন দাঁড়িয়ে আছে জগৎ প্রতীক মহামায়া ছন্দোরূপা মা কালী ।

রাস্তাটা ধরে একটু এগিয়ে গেলাম, রাস্তাটা ঢুকে গেছে গ্রামের ভেতর। গ্রামে ঢুকতেই পেলাম একটি চৈত্য সেখানে রয়েছে চেন্-রে-জির মূর্তি। প্রণাম সেরে মন্দির প্রদক্ষিণ করতে লাগলাম। এই গ্রামে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করলাম। আশপাশের অধিকাংশ বাড়ী ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ, মন্দির প্রদক্ষিণ করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে উঠলাম। চৈত্য থেকে দু-পা এগিয়ে যেতেই তিন চারটে ছোট ছেলে আমাকে ঘিরে ধরল, তাদের বক্তব্য ঠিক বুঝতে পারলাম না, দেখেই বোঝা যায় যে এরা ভিখিরি নয়, ছোট ছেলেমেয়েদের দেখাদেখি আরও কয়েকজন যুবক আমার দিকে এগিয়ে এল। এদের কথাবার্তা খুব টানা টানা বোঝবার চেষ্টা করেও কিছু বুঝতে পারছি না। তাদের মধ্যে একজন আমাকে অনুসরণ করতে বললেন, আমি তার কথামত শিশুদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে এগিয়ে চললাম। আমাকে সামনে নিয়ে ওরা যতই এগুতে লাগল ততই আশপাশ থেকে ছেলেমেয়েরা তাদের দলে যোগ দিতে লাগল। শিশুদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে আমাকে ঘিরেই ওদের আনন্দ। পাড়ার ঠাকুর বিসর্জন দেবার মতো আমাকে সামনে রেখে মিছিল করে এগুতে লাগল ৷ আমি নির্বোধের মতো ওদের কথানুযায়ী চলতে লাগলাম। গ্রামের একটু উঁচু অংশে একটা দুর্গ, এর গঠন অনেকটা গীয়াৎসের দুর্গের মতো। বাঁ দিকে কয়েকটা বাড়ীর পরই নজরে পড়ল রাস্তার ধারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিরিশ চল্লিশজন লামা, আশপাশে কোন মঠ বা বিহার নজরে পড়ছে না। একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন মনে এসে ধাক্কা দিল—তাঁরা কি আমারই জন্য দাঁড়িয়ে আছেন? কে তাঁদের খবর দিল। হয়তো গ্রামবাসীরা এই ভাবেই নতুন লামাদের সম্বর্ধনা করেন। আরও কাছে আসতেই দেখতে পেলাম লামারা সবাই হাত নেড়ে আমাকে সেদিকে আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করছেন। যতই কাছে এগুচ্ছি মনে হল, ওদের দেখেই আমার বুকের রক্ত যেন ধাক্কা মেরে উঠল, আমি মৌনীবাবাকে ভুলে গিয়ে চীৎকার করে উঠলাম—সাধুবাবা।

উত্তেজনায় কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম, তিনি আমাকে সস্নেহে পীঠে ও মাথায় হাত বুলিয়ে আমার শান্ত ভাব ফিরিয়ে আনলেন, মৌনীবাবা ফিরে পেল তার ভাব। আমি সাধুবাবাকে প্রথমে তারপর একে-একে সব সাধুকে প্রণাম করে তাঁদের দলে যোগ দিলাম। গ্রামের যে সব ছেলেমেয়েরা আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে তারা আমাদের এই মিলন দেখে তৃপ্তি ও আনন্দ পেল। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি লামাদের সাথে ভেতরে ঢুকলাম ।

ভেবেছিলাম যে আমি সাম্‌দিং-এ এসে পৌঁছেছি, আজ রাতে পৌছবার কথা ছিল সন্ধ্যে হতে এখনও অনেক দেরী, এত তাড়াতাড়ি কি করে এসে পড়লাম কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। ঘরে আগুনের পাশে বসতেই সাধুবাবা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন এই গ্রামটা সামদিং নয়, এই গ্রামটার নাম নাগারৎসে (Nagartse) । সামদিং এখান থেকে আরও উত্তরে। সামদিং গুম্ফাতেই সকলের যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গুম্ফার অবস্থা আজকাল মোটেই সুবিধাজনক নয়, তারা আর্থিক অনটনে কাটাচ্ছে। কাজেই তারা একটা পুরানো বাড়ী কয়েকদিনের জন্য ভাড়া করে আছেন, বাড়ীর মালিক থাকেন লাসায়। মালিকের ভাইয়ের কাছে চাবি ছিল, তিনি পুণ্যার্জনের জন্য লামা তীর্থযাত্রীদের এই বাড়ীটা কয়েকদিনের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছেন।

গুরুজী সামদিং পৌছে যখনই দেখলেন যে সেখানে বত্রিশজন লামাদের থাকার বন্দোবস্ত করা যাবে না তখনই তিনি ফিরে এসেছেন এই গ্রামে। গ্রামের প্রাচীন ব্যক্তিদের মধ্যে অনেককে তিনি অনেকদিন যাবৎ জানতেন কাজেই কোন অসুবিধা হয়নি। লাসায় যেতে হলে এই গ্রামের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। তিনি বাড়ী ঠিক করেই সবাইকে সজাগ করে দিয়েছিলেন, এই পথে বিদেশী লামারা এক-এক করে আসবে তাদের দেখা মাত্রই যেন সাধুবাবাকে জানানো হয়। গ্রামের একঘেয়েমী জীবনের মধ্যে এই সাধু খোঁজা কাজটা কয়েকদিনের জন্য গ্রামবাসীদের কাছে একটা খেলা হয়ে দাঁড়াল। প্রথম প্রথম বড়রাই উদ্‌যোগী হয়েছিল কিন্তু তাদের দেখাদেখি শিশুরাও এ খেলায় মেতে উঠেছে। গ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন লামা যেতে দেখলেই তারা সাধুবাবাকে খবর দিয়ে দেয়। গীয়াৎসের থেকে লামারা এই পথে আমার মতোই সামদিং যাওয়ার পথে এখানে একে-একে ধরা পড়েছে। আমিই ছিলাম এদের মধ্যে শেষ যাত্রী।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে সন্ধ্যের কাছাকাছি সাধুবাবার সাথে আমি বেরিয়ে পড়লাম সরোবরের দিকে। সরোবর তো নয় সাগর, এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি যেন পুরীর সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আছি। সাধুবাবার সাথে জপ, সন্ধ্যা, আহ্নিক সেরে আবার ফিরে এলাম গ্রামে। সাধুবাবা আমাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বললেন—খুব সাবধান! তুই কিন্তু মৌনীবাবা, কথাবার্তা একদম বলবি না । গ্রামের সবাই তোকে মৌনীবাবা বলেই জানে। মনে হচ্ছে অনেক যুগ পর আমি আপনজনকে আবার ফিরে পেয়েছি, তাতেই আমার আনন্দ। সাধুবাবার সামনে আমি বছরের পর বছর ধরে মৌনী থাকলেও মনে হয় আমার একঘেয়ে লাগবে না ।

বাড়ীটা একতলা, বড় বড় পাথরের তৈরী পুরু দেয়াল, চারদিকে পাথরের পাঁচিল। দেখে বোঝা যায় বনেদি বাড়ী, রান্নাঘরটাও বিরাট। বাড়ীর ছাদটা প্যাগোডা ধরনের তার উপর কাঠের বরডার দেওয়া কাজ, পাহাড়ি জমিদারদের বাংলোগুলো যেমন হয়ে থাকে। বাড়ীটা পাওয়া গেছে বিনা পয়সায়। লামারা সবাই রান্নাঘরেই আশ্রয় নিয়েছেন। আমার জন্যই তারা সবাই অপেক্ষা করছিলেন—সেদিন রাতেই ঠিক হল পরের দিন সকাল বেলা রওনা দেবো সামদিং-এর উদ্দেশ্যে।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%