নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস

বিমল দে

আমি না চাইতেই যেন সব পাচ্ছি। লাসায় বর্তমান তীর্থযাত্রীরা সবাই জোখাং মন্দির ও বাজারেই তাদের যাতায়াত সীমাবদ্ধ রাখেন। আর তাদের মধ্যে যারা শক্ত সামর্থ্য তারা পোতালা প্রাসাদ তিনবার পরিক্রমা করেই ক্ষান্ত হন। পোতালা প্রাসাদে আজকাল তীর্থযাত্রীরা খুব বেশী যাতায়াত করেন না। প্রাসাদে উঠতে হলেই আজকাল বিশেষ অনুমতির দরকার। শান্তিপ্রিয় তিব্বতীরা সাধারণতঃ যাবতীয় বেড়াজাল এড়িয়ে চলে, এমন কি সাধারণ অনুমতিটাকেও তারা ঝামেলা বলে মনে করে ।

আগে কিন্তু এমন ছিল না। জোখাং মন্দির চত্বরে তীর্থযাত্রীরা আসা মাত্রই পেছনে লোক লেগে যেতো। পোতালা প্রাসাদ ও অন্যান্য লাসার দ্রষ্টব্য বস্তুগুলো ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য তারা পেছনে লাগতো। গুরুজী বলেছেন যে, লাসার গাইড সার্ভিস ছিল খুব সস্তা। বছর দশেক আগে একদিনের জন্য একটা পনি ভাড়া করে সম্পূর্ণ লাসা প্রদক্ষিণ করবার জন্য আট আনা পয়সা পেলেই তারা সন্তুষ্ট হত। গুরুজীর কল্যাণে আমার পোতালা দেখা হয়েছে। জোখাং-এ তো রোজই আসছি। রোজই মনে মনে ভাবি যদি কোন রকমে মহামান্য দালাই লামার দেখা পেয়ে যেতাম তাহলে আমার লাসায় আসা সবদিক থেকেই সার্থক হত। আমার সাথী তীর্থযাত্রীদের কথা আলাদা, তাদের একমাত্র জোখাং ছাড়া অন্য কোনো দিকে যাবার ইচ্ছে নেই। অন্যান্যদের মতো আমি ধার্মিক নই। আর জোখাং মন্দিরে ধন্না দেবার মতো চাহিদাও নেই। পথে চলতে চলতেই আমি পেয়েছি দর্শন, সে দর্শন আমার মনকে পূর্ণ করেছে, সে পূর্ণতা হয়তো ছেলেমানুষি। যা পাবার তা না পেয়েই হয়তো আমি ধন্য ।

লাসার মন্দির অধিবাসী লামাদের মধ্যে আর বাজারে চলতে চলতে আমি খুঁজে পাই আমার সেই ছেলেমানুষটি যেটা নকল সেটার দিকেই তার বেশী নজর। মনের মধ্যে কয়েকদিন যাবৎ একটা কথাই বারবার ধাক্কা দিচ্ছে—যদি দালাই লামার দেখা পেতাম—যদি তাঁর দর্শন পেতাম। যদি তাঁর দর্শন পাই তাহলে কি করবো জানি না।গুরুজীকে মনের ইচ্ছাটা বলেই ফেললাম। এই দুর্গম পথে মহাতীর্থে জীবনে হয়তো আর আসা হবে না। কাজেই একবার যখন এসেই পড়েছি তখন এই ইচ্ছাটা পূরণ হবে না ! গুরুজী আমার কথাটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন। তিনি বললেন-দালাই লামার সাথে দেখা হওয়া মুশকিল তাতে অযথা ঝামেলা আসতে পারে। কারণ দালাই লামা যদিও তিব্বতের প্রধান লামা কিন্তু আসলে তিনিই রাজা। তাঁর দর্শন পেতে হলে তাঁর চার-পাঁচটা দপ্তরের মাধ্যমে আবেদন পাঠাতে হবে। আর আজকাল দালাই লামা যদি কোন বেদেশীর সাথে সাক্ষাৎ করেন তাহলে চীনারা ভীষণ রেগে যায়। যে কোন বিদেশীকে মহামান্য দালাই লামার সাথে দেখা করবার আগে স্থানীয় চীনা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। বিশেষ করে আমি আসলে ভারতীয়, সেক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও বেশী। তবে গুরুজী হতাশ হবার পাত্র নন। তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন চল দেখা যাক একটা বন্দোবস্ত হয়ে যাবেই। দালাই-লামা শীতকালে থাকেন পোতালা প্রাসাদে আর শীতের শেষে নেমে আসেন নীচে, তাঁর গ্রীষ্মাবাসে। তাঁর গ্রীষ্মাবাসকে বলা হয় নরবুলিংকা প্রাসাদ। লাসার পূর্বদিকের এক শহরতলীতে সেটা অবস্থিত—এখান থেকে মাত্র মাইল খানেকের পথ ।

আমি গুরুজীর সাথে সকাল দশটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। লাসার এই অঞ্চলটা খুব সুন্দর। দু-দিকে প্রচুর চাষের জমি, আর খামার বাড়ীতে ভর্তি। এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা একটা সম্ভ্রান্ত এলাকায় এসে পৌঁছলাম। দোতলা তিনতলা বাংলো ও প্যাগোডা ধরনের বাড়ীগুলো দেখেই বোঝা যায় যে এটা খুব বর্ধিষ্ণু এলাকা।

গুরুজী একটু দূরে কয়েকটা বাড়ীর দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেনযে বাড়ীগুলো দেখছো ওগুলো সব দালাই লামার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। আমরা একটা বিরাট পাঁচিলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজার কাছে দু'জন সিপাহী দাঁড়িয়ে, আমরা তাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে নমস্কার জানালাম। এই পাঁচিলের ভেতরেই বিখ্যাত নরবুলিংকা প্রাসাদ। এই প্রাসাদের এক কর্মচারীর সাথে গুরুজীর পরিচয় আছে। প্রহরীদের অনুমতি নিয়ে আমরা ভেতরকার দপ্তরে এসে হাজির হলাম। সেখানে আমাদের নাম লিখিয়ে অনুসন্ধান অফিসে জিজ্ঞাসা করতেই তারা একটা বাড়ী দেখিয়ে দিয়ে বললেন—ওই বাড়ীতে খা-ওচে থাকে, আপনারা যেতে পারেন ।

খা-ওচে নরবুলিংকা প্রাসাদের অন্যতম মালি। ছোট্ট একটা কাঠের বাড়ীতে এসে আমরা দরজায় ধাক্কা দিলাম। ভেতর থেকে এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। আমাদের দেখেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তারপর নিজেকে সংযত করে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—-

—কি চাই ?

—খা-ওচে-জী বাড়ীতে আছেন কি ?

—না, তিনি বাড়ীতে নেই তবে তার ছেলে আছে, দাড়ান ডেকে দিচ্ছি।

ঘর থেকে একটি যুবক বেরিয়ে এল। খা-ওচের ছেলে খুব লম্বা চওড়া, ফুলপ্যান্ট পরনে, মাথায় সাহেবী টুপী। তিব্বতের লোকেরা সাহেবী টুপী খুব পছন্দ করে। সে আমাদের সামনে আসতেই গুরুজী তাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন—

—আমি তোমার বাবার পুরোনো বন্ধু, তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছি। তিনি কোথায় আছেন ?

—ওঃ বাবার কথা জিজ্ঞাসা করছেন ? তিনি লেকের ধারে গেছেন চলুন আপনাদের নিয়ে যাই ৷

খা-ওচের ছেলে, নাম ভাবান। সে আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে চলল। সেই সুযোগে আমি দেখতে লাগলাম নরবুলিংকা প্রাসাদটিকে। পাথর ও সিমেন্টের উপর কাঠের বাড়ী, অনেকটা গ্যাংটকে সিকিমের রাজবাড়ীর মতো। কাঠের সুন্দর কারুকাজ করা, তার উপর রঙের বাহার। পোতালার তুলনায় এ এমন কিছু আকর্ষণীয় নয়। নরবুলিংকার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এখানকার সাজানো বাগান। চারিদিকে নানা রকমের ফুল ও ফলের গাছে ভর্তি। প্রত্যেকটি গাছই অতি যত্ন করে লাগানো ।

প্রাসাদ না বলে বাগান বাড়ী বলাই ভালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা একটা লেকের ধারে এসে উপস্থিত হলাম। লেকটা বিরাট নয়, কলকাতার ইডেন গার্ডেনের লেকটার মতই হবে। এর চারপাশে বিভিন্ন পাতা বাহারের গাছে ভরা, লেকের মধ্যে সাপলার মতো ভেসে রয়েছে পদ্ম পাতা, আর মাসখানেক পরেই ফুল ফুটবে। তিব্বতে এই প্রথম নজরে পড়ল জলপদ্ম গাছ। অবশ্য এই ঠাণ্ডায় তাদের বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল। সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম এখানকার জলে রাজহাস দেখে। ভাবন'কে প্রশ্ন করতেই সে বুঝিয়ে দিল যে, রাজহাঁসগুলো তিব্বতেরই। লেকের জল যখন জমে বরফ হয়ে যায় তখন তারা লেকের পাশে কাঠের ঘরে থাকে, তবে তিব্বতের অন্যান্য হ্রদে যে রাজহাঁস ও বিভিন্ন ধরনের হাঁস জাতীয় পাখী আছে সেগুলো সবই দারুণ শীতের সময় ভারতবর্ষের দিকে উড়ে চলে যায়। রাশিয়ার উত্তর (সাইবেরিয়া) থেকেও অনেক হাঁস শীতের সময় লাসায় আসে। সমস্ত তিব্বতের মধ্যে লাসাই বোধ হয় উত্তর মেরুর পাখীদের প্রিয়। প্রচণ্ড শীতের সময়ও কী নদীর ধারে দেখা যায় কিছু কিছু হাঁস শীতের ঠিক আগে রাজহাঁসগুলো যখন ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় তখন সত্যি খুব সুন্দর দেখায় ।

আমি অবশ্য কল্পনা করতে পারি মাত্র তার বেশী নয়। কারণ উড়ন্ত রাজহাঁসের ঝাঁক এখনও আমার চোখে পড়েনি। লেকের উপর রাজহাঁসগুলো পরম শান্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লেকের স্বচ্ছ জলে দেখা যাচ্ছে তাদের প্রতিবিম্ব। আরও একটু এগুতেই নজরে পড়ল কয়েকজন লোক বাগানের কাজ করছে। আমাদের দেখে তারা কাজ থামিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক লোক আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন, তারপর ভালোভাবে গুরুজীর দিকে তাকিয়ে যেন হঠাৎ চিনতে পারলেন। এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন সাধুবাবাকে, যেন অনেক দিন পর খুঁজে পেয়েছে তার পরমাত্মীয়কে। খা-ওর্চের সাথে পরিচিত হলাম। গুরুজী আমাকে দেখিয়ে বললেন—এ আমার চেলা ও মৌনব্রত অবলম্বন করেছে। খা—ওঠে আমার মাথায় হাত দিয়ে সস্নেহে উৎসাহ দিয়ে বললেন—খুব ভালো পথ, খুব ভালো পথ। গুরুজী তাঁকে জানালেন যে আমি বাগান দেখতে ভালোবাসি, আর দূর থেকে যদি কোনরকমে দালাই লামার দর্শন হয়ে যায় তাহলে চির কৃতজ্ঞ থাকবো। ভদ্রলোক এই কথা শুনে খুব উৎসাহিত হলেন। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন—কোন অসুবিধা নেই, চল আগে বাগানটা ভালোভাবে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিই। এই বলে তিনি লেকের ঠাণ্ডা জলে হাত মুখ ধুয়ে তৈরী হয়ে নিলেন। আমি মৌনই রইলাম, গুরুজী তার অনুবাদ করে শোনাতে লাগলেন ৷ বাগানটা সত্যি অদ্ভুত। নরবুলিংকা প্রাসাদের এই বাগানটাকে বলা হয় জুয়েল-পার্ক। এরকম বাগান শুধু তিব্বতে কেন জগতে বিরল। পৃথিবীর ছাদে এই শীতের মধ্যে হলেও এই বাগানে যেন মন্ত্রবলে সব ফুল ফোটে। খা-ওচে বাগানের অন্যতম সুপারভাইজার সে এর জন্য খুবই গর্বিত। সে একবার কালিম্পং আর একবার দার্জিলিং গিয়ে এ বিষয়ে বিশেষ বিশেষ শিক্ষা নিয়ে এসেছে। বাগানটা বিরাট, এর মধ্যে পাওয়া যাবে পৃথিবীর প্রায় সব রকমের ফুল গোলাপ, জলপদ্ম, ডালিয়া থেকে আরম্ভ করে বোগেনভেলিয়া, জিনিয়া, লিলি পর্যন্ত। দালাই লামারা সবাই ফুলের পক্ষপাতি। প্রত্যেকবার যখন নতুন দালাই লামা মনোনীত হন তিনি এই বাগানে নতুন কিছু যোগ করেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত বাড়ীও বটে। কাজেই দূরে বাগানের মধ্যে মধ্যে যে সব দামী দামী বাংলো নজরে পড়ছে তার প্রত্যেকটিই এক একজন দালাই লামার নিজস্ব সম্পত্তি। তাঁদের দেহত্যাগের পর এই বাড়ীগুলো মিউজিয়ামের মতো রক্ষিত হয়, শুধু দামী আসবাপত্র ও বিগ্রহগুলো নতুন বাড়ীতে উঠে আসে।

আমরা একটা ফাঁকা জায়গা দিয়ে পার হবার সময় খা ওচে খুব সসম্ভ্রমে বললেন—ওই দেখছেন কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তীর ধনুক ছুঁড়ছেন তাদের মধ্যে ডানদিকের ভদ্রলোক হচ্ছেন বর্তমান দালাই লামার ভগ্নীপতি, দালাই লামার মা-ভাই-বোনেরাও সবাই এখানেই থাকেন তাঁদের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত আছে পোতালা প্রাসাদে দালাই লামা কাজের চাপে বন্দী হয়ে থাকেন সেখানে তাঁর নড়াচড়ার সময় নেই, তাই তিনি এখানে যখন আসেন তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। এই জুয়েল পার্ক হচ্ছে তিব্বতের নন্দন কানন। নরবুলিংকার ফলের বাগানটাও বড় চমৎকার। আপেল নাসপাতি, প্লাম, চেরী, কমলা প্রভৃতি গাছে ভর্তি। এই গাছগুলোর সবই এসেছে কালিম্পং কার্শিয়াং থেকে। বিলিতি ফুলের বীজ আসে সরাসরি ইউরোপ থেকে ব্রিটিশ-ইণ্ডিয়া ট্রেড মিশনই এর মূলে। এই বাগানেরই এক অংশে আছে ‘ডগ-গারডেন সেখানে দালাই লামার পোষা বিলিতি কুকুরগুলো থাকে। ইংরেজ সরকার প্রাক্তন দালাই লামাকে দুটো মোটর গাড়ী উপহার দিয়েছিল। এখানকার একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী কলকাতায় গিয়ে মোটর মেকানিজম শিখে এসেছে কিন্তু এ সব সত্ত্বেও উপযুক্ত রাস্তার অভাবে সেই দামী গাড়ীটি বাইরে বার করা সম্ভব ছিল না। গাড়ীটা ছিল ত্রয়োদশ দালাই লামার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এখনকার দালাই লামা হচ্ছেন চতুর্দশ দালাই লামা। আজকাল হান্দের দৌলতে কয়েকটা গাড়ীর উপযোগী রাস্তাঘাট হয়েছে, হয়তে তিনি একদিন তা ব্যবহার করতে পারেন ।

. আমরা এইভাবে নরবুলিংকার বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি এমন সময় হঠাৎ খা-ওচে আমাদের থামিয়ে দিয়ে সাবধান করে দিলেন—তোমাদের ভাগ্য খুবই ভাল চেন্-রে-জি তোমাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। এই বলে ভদ্রলোক সরাসরি মাটিতে শুয়ে পড়ল সাষ্টাঙ্গ প্রণামের ভঙ্গিতে, তার ইঙ্গিতে আমরাও গড় হয়ে প্রণাম করতে বাধ্য হলাম। প্রণাম সেরে উঠতে তিনি আমাদের দেখিয়ে দিলেন ওই দেখুন মহামান চেন্-রে-জি যাচ্ছেন চেন্-রে-জি অর্থাৎ দালাই লামা। তিনি যখন রাস্তা দিয়ে যান তখন তিব্বতের নিয়ম অনুযায়ী সবাই থেমে গিয়ে রাস্তার দুধারে হাত জোর করে দাঁড়ায়, আমরাও রাস্তা ছেড়ে বাগানের উপর এসে দাঁড়ালাম। দালাই লামার ছোট্ট প্রসেসন আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে লাগল। সবশুদ্ধ দশজন লোক, মহামান্য দালাই লামাকে চিনতে কোন অসুবিধাই হয় না। দালাই লামার আগে দু'জন দৈত্যাকৃতির তিব্বতী রক্ষী আর তার পেছনে আটজন লোক মাঝখানে উজ্জ্বল কমলা রঙের পোশাকে নবীন সন্ন্যাসী, দালাই লামা। আমাদের সামনে দিয়ে নিঃশব্দে তাঁরা হেঁটে চলে গেলেন। দালাই লামা আমাদের দেখেও যেন দেখলেন না। খুবই অল্প বয়স, পরে জানতে পারলাম যে তিনি আমার থেকে মাত্র পাঁচ বছরের বড়। অর্থাৎ তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে। চোখের উপর দিয়ে তিব্বতের অধীশ্বর ধর্মরাজ চলে গেলেন, ঠিক মতো অনুভব করার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেল ঠিক স্বপ্নের মতো। দালাই লামার মুণ্ডিত মস্তকের উপর খুব ছোট ছোট চুল দেখা দিয়েছে—দোহারা চেহারা, মুখের ভাবটা ঠিক বুদ্ধের মতো, সব রকমের সুখ দুঃখকে তিনি মনে হয় জয় করেছেন ।

দালাই লামা চলে যাবার পর আমরা আবার রাস্তায় নেমে এলাম। এই সুযোগের জন্য খা-ওচেকে আমরা ধন্যবাদ দিতেই তিনি একটু গর্বের সাথে উত্তর দিলেন—এ আর এমন কি, আমরা তো দু'বেলা দেখছি—আর সাধারণ তীর্থযাত্রীরা ওই পাঁচিলের চারপাশে দণ্ডিকেটে ঘুরেও তার দর্শন পান না, সবই কর্মফল আর তাঁর কৃপা, এই বলে তিনি ধর্মরাজের উদ্দেশ্যে প্রণাম করলেন। পোতালা প্রাসাদ আর নরবুলিংকা-প্রাসাদ এই দুটো জায়গাই সাধারণ তিব্বতীদের কাছে পরম পবিত্র স্থান। নরবুলিংকা প্রাসাদে মহামান্য দালাই লামার অতি সাধারণ গতিবিধি, এ বাড়ী থেকে ও বাড়ী যেতে হলে তিনি পায়ে হেঁটেই যান, তাঁর সাথে অবশ্য সব সময়ই দু'চারজন বডি-গার্ড ও উচচস্তরের কয়েকজন লামা থাকেন। দৈনিক মহামান্য দালাই লামার দর্শনাথে তিব্বতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে তীর্থযাত্রীরা এসে ভিড় করেন। পাঁচিলের ধারে তাঁরা| দিনের পর দিন বসে অপেক্ষা করেও যদি তাঁর দর্শন না পান তাহলে সাদা পাঁচিলের চারদিকে ঘুরে দণ্ডি কেটে মনোবাসনা জানিয়েই তারা বিদায় নেন। সেদিক থেকে বিচার করলে বলতেই হবে যে আমার ভাগ্যটা অতি ভালো। নরবুলিংকা প্রাসাদের ছোট বড় বিভিন্ন বাড়ী দেখতে দেখতে আমরা বাগানের চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। খা-ওচে আমাদের নরবুলিংকা-প্রাসাদের আরও অনেক তথ্য নিজের থেকেই জানাতে লাগলেন। গুরুজীর অবশ্য সেদিকে কোন আকর্ষণ নেই, জানবার আকর্ষণটা আমারই বেশী। মৌনী-বাবা না হলে আমি নরবুলিংকা প্রাসাদের খুঁটি-নাটি সব জানবার জন্য খা—ওচেকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতাম। গুরুজী এ বিষয়ে আমাকে খুব সুন্দর একটি কথা উপদেশ দিয়েছেন—যা সহজে আসে সেটাই আমাদের প্রাপ্য, সেটা খাদ্যই হোক আর তথ্যই হোক, সব ক্ষেত্রে ওই একই কথা ।

মহামান্য দালাই লামাকে দেখলাম মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। তাতে মনটা শান্ত হবার কথা, কিন্তু তা না হয়ে তাঁর সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানবার জন্য মনটা

ব্যাকুল হয়ে উঠল। খা-ওচে লামার সাথে আমরা প্রায় সারাটা দিন নরবুলিংকা প্রাসাদের চারিদিকে ঘুরে বেড়ালাম। দুপুরবেলা তিনিই আমাদের থুপা খাওয়ালেন। বিকেলের দিকে তাঁকে কৃতজ্ঞতা ও অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে আমরা বিদায় নিলাম। পাঁচিলের বাইরে এসে বার বার দেখতে লাগলাম চেন-রে-জি'র প্রাসাদটাকে । পোতালায় পেয়েছি শিল্প ও ধনে পরিপূর্ণ এক বিরাট আভিজাত্যের ছাপ। সোনা ও ধনরত্নের মধ্যে পোতালার আত্মাটা যেন চিরবন্দী হয়ে আছে। আর নরবুলিংকা ঠিক যেন তার বিপরীত, এখানে অনুভব করা যায় শুদ্ধ আত্মার মুক্ত বিচরণ।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%