বিমল দে
দশটা নাগাদ আমরা চুম্বির শেষ চায়ের দোকান থেকে মাখন চা খেয়ে নিলাম, প্রথম দিন মোটেই ভাল লাগেনি, কিন্তু এখন মনে হয় খারাপ না। তিব্বতী চা আমাদের দেশের গুড়ো বা পাতা চায়ের মতো নয়; চায়ের পাতা বা কচি ডালগুলোকে গুড়িয়ে সেটাকে শক্ত ইটের আকারে জমাট করা হয়। তারপর প্রয়োজনানুযায়ী সেটাকেই ভেঙ্গে ভেঙ্গে চা তৈরী করা হয়, বলা চলে চা-এর ইট। বহন করার পক্ষে সুবিধা, মনে হয় এটা চীনদেশীয় প্রথা। চা বললেই তৈরী হয় না, এরা আগের থেকে তৈরী করে রাখে। গরমজলে চা ফুটছে তো ফুটছেই, সেই গরম চায়ের জলটাকে নিয়ে লম্বা চোঙ্গায় মাখন মেশাতে লাগে প্রায় আধঘণ্টা। গরমজলে চায়ের পাতায় যখন আর কোন রকম স্বাদ থাকে না তখন সেটাকে না পাল্টে তারই ওপর যোগ করা হয় চায়ের পাতা অর্থাৎ জমাট চায়ের অংশ। সপ্তাহে একবার মাত্র এই পুরোনো পাতার জল বদলায়। প্রথমবার সাম্পাকে ভেবেছিলাম চা, কিন্তু এখন দেখছি যে সাম্পা অর্থে বলা যেতে পারে ছাতু ধরনের।
অনেক দিন পর ভাল খাবার ও ঘুম হয়েছে এখন সবাই নতুন উৎসাহে পা বাড়াচ্ছি। আমাদের সামনের দৃশ্যটা অতি সুন্দর। সামনেই দেখতে পাচ্ছি বরফে ঢাকা—চোমলহরি পাহাড়ের শৃঙ্গ, আর পেছন দিকে মনে হয় কাঞ্চনজঙ্ঘা উঁকি মারছে আমাদের অভয় দেবার জন্য। পাহাড়ি নদীটা এখন আরও সুন্দর রূপ নিয়েছে, তার দু'পাশ ছোট ছোট জংলা ফুলে ভর্তি, ছোট ছেলেমেয়েরা সেখানে বুনো ফল কুড়োচ্ছে আর আমাদের দেখতে পেলেই থ' হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। মনে হয় এরা একসাথে এতগুলো লামা দেখায় অভ্যস্ত নয়। রোদটা মাথার উপর ধীরে ধীরে উঠে আসছে, এ রকম হাওয়ায় হাঁটতেও কোনো অসুবিধা হয় না। মাঝে মাঝে পথচারীদের সাথে দেখা হয়। আমাদের কাছাকাছি এলেই হয় জিভ বার করে অথবা মাথা নীচু করে সম্মানসূচক অভিবাদন করে। আজকে সকাল থেকে চীনা সৈন্যদের সাথে দেখা হয়নি। আমার মালের উপর বাড়তি মাল হচ্ছে ছোট রসাল জ্বালানী কাঠ। পাঁচ কিলো মাত্র, বেশী ভারী নয়, মাঝে মাঝে বিশ্রাম করে আমরা এগিয়ে চলতে লাগলাম। রাস্তাটা উঁচু নীচু পাহাড়িয়া পথ নয়। দুপুরবেলা আমাদের খাওয়া হয়নি, তাতে মোটেই অসুবিধা হচ্ছে না। গুরুজী বলেছেন যতদূর এগিয়ে চলা যায় ততই মঙ্গল, আর রসদ যত কম খরচা করা যায় ভবিষ্যতে ততই লাভবান হব ।
বিকেলের দিকে একটা শহর পেলাম, নাম ইয়াটুং। শহরে ঢোকার মুখেই আমরা পেলাম একটা সুন্দর সেতু। সেটা পার হয়ে ওদিকে আসতেই বাঁদিকে পড়ল বিরাট সৈন্যাবাস, দেখেই বোঝা যায় যে এরা চীনা সৈন্য। এখানেও আছে একটা চেক্-পোস্ট, আমাদের কাগজগুলো দেখাতেই তারা কোন হাঙ্গামা করল না। ইয়াটুং একটা সুন্দর শহর। সুন্দর মানে এ পর্যন্ত যে সব শহর পেরিয়েছি তার মধ্যে মনে হয় একমাত্র এটাকেই ছোট খাটো একটা শহরের পর্যায়ে ফেলা যেতে পারে। এ পর্যন্ত আমাদের চোখে কোন রকম গাড়ী পড়েনি, রাস্তায় গাড়ী চাপা পড়ার ভয় নেই।
চুম্বিকে যেমন দেখেই মনে হয়েছিল খুব পুরোনো একটা গরীব গ্রাম, ইয়াটুং-এ কিন্তু সেই ভাবটা নেই। এখানে সবাই কর্মব্যস্ত, মনে হয় এই শহরে বেচা কেনা মন্দ হয় না । গাধা ও ঘোড়ার পিঠে মাল বোঝাই, দোকানগুলোতেও লোকজনে ভর্তি, আমাদের দেখে অনেকেই এগিয়ে এসে প্রণাম জানিয়ে গেছে, তীর্থযাত্রীদের দর্শন ও প্রণামেই অনেক পুণ্য হয়। আমরা থামতে বাধ্য হলাম; গুরুজীর সামনেই একটা তিব্বতী পরিবার উলের মোজা ও টুপি বিক্রির জন্য বায়না ধরেছে। আমাদের পায়ের দিকে দেখিয়ে বার বার ওরা বলতে লাগলো যে এখানকার উল খুব সস্তা। ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে হলে এদের কাছ থেকেই কেনা ভাল কারণ আমাদের কারও পায়েই ঠাণ্ডার উপযোগী মোজা নেই ৷
গুরুজী তাদের এড়াবার জন্য শত চেষ্টা করেও এগুতে পারলেন না, কাজেই তিনি অন্যান্য লামাদের জিজ্ঞাসা করলেন তারা মোজা কিনতে রাজি আছেন কি না। একটু অমত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সকলেই রাজি হয়ে গেলেন। কথাটা সত্যি অর্থাৎ সকলেই ঠাণ্ডায় খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। আমাদের মধ্যে সাতজন লামার পায়ে কাপড়ের জুতো মাত্র। তিব্বতী পরিবারটি যাযাবার। সারাটা শীত ধরে তারা মোজা, কম্বল, সোয়েটার, টুপি ইত্যাদি বোনে আর গরমের দিনে সেগুলো বিক্রি করে, খাঁটি উল সে বিষয়ে কোনরকম সন্দেহ নেই। ভেড়ার লোম থেকে সরাসরি সূতো কেটে তারই থেকে তৈরী, হাতেকাটা খখসে উল। লোকটা তীর্থযাত্রী পেয়ে এক ঢিলে দুই পাখী মারতে চায় । সে একেবারে জলের দরে বিক্রি করবে, তাতে ব্যবসা হবে আর সেই সাথে সাথে হবে পুণ্য। সে অত্যন্ত বিনয়ের হাসি হেসে বললে—আমি যদি বড়লোক হতাম তাহলে আপনাদের আমি এগুলো প্রণামী হিসাবেই দিতাম ।
সত্যি জলের দরে পেলাম বত্রিশ জোড়া খাঁটি তিব্বতী উলের ফুল সাইজ মোজা, তার দাম নিল মাত্র দশ টাকা। লামারা এত সস্তায় নিতে চান না, সরল পেয়ে তাকে ঠকাতে কেউ চায় না। কিন্তু যাযাবরটি আগের মতো দিলখোলা হাসি হেসে বলল – না আমি এর বেশী কিছু চাই না। আপনারা সবাই লামা তার ওপর তীর্থযাত্রী, আপনারা আমার মোজা পরে সব তীর্থ ঘুরবেন এটা আমার মহা সৌভাগ্য! আপনারা তো . জানেনই যে আজকাল তীর্থযাত্রীর সংখ্যা খুবই কম। আরও দু'টাকা হাতে দিয়ে আমরা তাকে প্রাণভরা আশীর্বাদ করে আবার চলতে লাগলাম ।
ইয়াটুংয়ের ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট, বাজার, সব কিছু দেখে মনে হচ্ছে এটা বর্ধিষ্ণু
শহর, অনেক নতুন নতুন কাঠের বাড়ীও নজরে পড়ছে। এখানকার দোকানে ভারতীয় জিনিসপত্রগুলো ফলাও করে সাজানো হয়েছে। টর্চ ও ব্যাটারী, খাতা, পেন্সিল, শ্লেট, অ্যালুমিনিয়ামের জিনিসপত্র, গামছা, কাপড় এগুলোর ছাপ দেখলেই বোঝা যায় যে ভারত থেকে এসেছে। ভারত মানে গ্যাংটক বা শিলিগুড়িই হচ্ছে এদের ব্যবসায়িক বড় বাজার। এখানকার তিব্বতীদের মধ্যে অনেককে দেখলাম বেশ ভাল ও পরিষ্কার পোশাক পরনে। রাস্তার ধারে যুবকদের সাথে অনেক যুবতীও চোখে পড়ল, তারাও মনে হয় বেশ ভদ্র ও শিক্ষিত। তিব্বতে শিক্ষা বলতে সবই গুম্ফা বা মঠের অধীনে। উপযুক্ত শিক্ষা পেতে হলে ত্রাপা হওয়াই ভাল। অনেক বাড়ীঘরে বেশ সাজানো,ফুলের বাগানও নজর এড়াল না। লাসার পথে ইয়াটুং, ভারত ও তিব্বতের প্রথম ব্যবসায়িক বাজার বলে মনে হল। আমরা বরাবরই উত্তরের দিকে এগিয়ে চলেছি।
গুরুজী আমাদের একটা স্তূপের কাছে দাঁড়াতে বলে খোঁজ করতে গেলেন রাতে থাকার জন্য। ইয়াটুং-এ থানা ও ট্যাক্স্ অফিসও আছে। গুরুজী ফিরে এসে বললেন—রাতে এখানে থাকার কোন অসুবিধা নেই, তবে সকলের একজায়গায় থাকার মতো কেউ বন্দোবস্ত করতে পারবে না। দু'চার জন হলে কোন অসুবিধা ছিল না, কিন্তু বত্রিশজনের জন্য কোন হোটেল বা সরাইখানা এখানে নেই। কিন্তু লামারা কেউই গুরুজীকে ছাড়তে রাজি নন। কাজেই আমরা আরও এগিয়ে চললাম। গুরুজী বললেন—একটু দূরে অনেকদিনের একটা পুরানো মঠ আছে মঠাধ্যক্ষকে আমি চিনি, চল দেখা যাক যদি সে থেকে থাকে তাহলে কোন অসুবিধাই হবে না, তাতে খরচটাও বাঁচবে আমরা নিজেরাই রান্না করে নিতে পারবো ।
আমরা রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের উপর উঠতে লাগলাম। এক ঘণ্টার মধ্যেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষা একটা মঠ আমাদের চোখে পড়ল। গুরুজী সকলকে সেদিকে আকৃষ্ট করে বললেন -চেয়ে দেখো কি চমৎকার দেখাচ্ছে, এই মঠটার নাম দুংকার অর্থাৎ দুংকার গুম্ফা ৷ ভগবান তথাগত যদি প্রসন্ন হন তাহলে সেখানেই আমরা আজ রাতটা কাটাবো। আমরা বিশ্রাম করবার জন্য একজায়গায় বসলাম। গুরুজী সেই সময়ে সেই গুম্ফা সম্পর্কে কিছু বলতে লাগলেন ৷
তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের বহু শাখা প্রশাখা আছে, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে গেলুক-পা সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায়ই তিব্বতের মুখ্য সম্প্রদায়। এই মঠের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোয়াং লোবসাং চোদেন। এই মঠের মূল পূজারী ছিল এক অশরীরী আত্মা, ক্রুলপ তার স্থানীয় নাম। এখানে ছোট ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ লামা করার জন্য ভর্তি করা হয় চল দেখা যাক এই মঠটা দেখবার মতো ।
আমরা আরও কাছে আসতে প্রথমেই পড়ল একটা চৈত্য যার স্থানীয় নাম চোরতেন, তারপর আরও কয়েকটা। সেগুলোর পাশ দিয়ে মণি মন্ত্র পাঠ করে এগিয়ে চললাম। সামনেই পড়ল বিরাট একটা পাথরের দেয়াল, মনে হয় একটা দুর্গ। আমরা আরও এগিয়ে এলাম তার প্রধান দরজার দিকে। আরও একটু এগিয়ে যেতেই হঠাৎ যেন পড়লাম বাঘের মুখে, ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করল দুটো কুকুর, আমরা পিছু হঠতে বাধ্য হলাম। ভাগ্যিস কুকুর দুটো বাঁধা ছিল নয়তো এতক্ষণে আমাদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠতো। লম্বা চেন দিয়ে কুকুর দুটোকে বাঁধা হয়েছে, মঠের সিংহ দরজার প্রহরী হিসাবে। আমাদের বেশীক্ষণ সেখানে দাঁড়াতে হল না, ভেতর থেকে কয়েকটি ত্রাপা অর্থাৎ নবীশ লামা ছুটে এসে কুকুরগুলোকে সামলে নিল। আমাদেরও পরনে লামার পোশাকে দেখে তারা সসম্ভ্রমে প্রণাম করে পাশে এসে দাঁড়ালো, গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করলো—আপনারা ভেতরে আসবেন ?
নিশ্চয়ই। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। মঠতো নয় যেন দুর্গ। পাহাড়ের কোলে অতি সুন্দর স্থাপত্যশিল্পের এক নিদর্শন, এতদিন পর মনে হল আমরা সত্যিকারের এক বিহারে এসে পৌঁছেছি। আমরা ভেতরে বেশ কিছুদূর পৌঁছে একটা উঠোনের মধ্যে পড়লাম, এর চারপাশে নবীশদের থাকবার ব্যবস্থা তারই এক কোণে একটা অফিস ঘর। আমাদের আর অফিস পর্যন্ত যেতে হল না, মনে হয় কোন ত্রাপা আমাদের সংবাদ আগেই সেখানে পৌঁছে দিয়েছে। একজন বয়স্ক ভারিক্কি গোছের লামা আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন, বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—কোথা থেকে আসছেন, কোথায় যাবেন ?
শুকনো প্রশ্ন। গুরুজী সংক্ষেপে আমাদের কথা তাকে জানালেন তারপর জিজ্ঞাসা.. করলেন- -গুরু চু-মিন্জেন্ এখানে আছেন কি ? তিনি আমাকে চেনেন।
–তা বেশ, তা বেশ, ভেতরে আসুন, গুরুজী গালিগংএ গেছেন। আপনারা তো সেই পথেই এসেছেন, দেখা হয়নি ?
–না, আমাদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। গুরুজী তার সঙ্গে কাজের কথায় এলেন । সোজা কথা আজকে এই বত্রিশজনকে নিয়ে এখানে থাকা যাবে কি না। ভদ্রলোক এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না, তার কারণ গুরু চু-মিন্জেন হচ্ছেন এখানকার মঠাধ্যক্ষ অতএব তাঁর অবর্তমানে কেউ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ঠিক আছে, তিনি যতক্ষণ না আসেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করছি। আমরা কাঁধের মালপত্রগুলো অফিস ঘরে রেখে, হালকা হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম এদিক ওদিক,মঠটাকে ভাল ভাবে দেখবার জন্য। আমি গুরুজীর সাথেই রইলাম। আমরা একটা বিরাট চোরতেন-এর কাছে এসে দাঁড়ালাম। গুরুজী বললেন- ভালভাবে এর কাজগুলো লক্ষ্য করে দেখো। সূক্ষ্ম শিল্পের নমুনা, স্তূপ আমি এ পর্যন্ত অনেক দেখেছি, সত্যি ! এত সুন্দর রং বেরঙের কারুকার্য এর আগে চোখে পড়েনি। তার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, অজস্র মণি মন্ত্র খোদাই করা রয়েছে। ছোট বড় মাঝারি ছাড়াও শিল্পী তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছে প্রত্যেকটি অক্ষরের ওপর “ওঁ মণি পদ্মে হুম্'। গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করলাম—গ্যাংটক থেকে এ পর্যন্ত রাস্তায় অনেক চোরতেন (স্তূপ বা চৈত্য) পেরিয়েছি বিশেষ করে তিব্বতে ঢোকার পর থেকে দেখছি চোরতেনের ছড়াছড়ি, এর মূল অর্থটা কি আমাকে বলবেন ?
আমার কথা শুনে তিনি একটু মাথা নাড়লেন তারপর বললেন— চোরতেনের অর্থ ব্যাপক। বিভিন্ন লোক ও সম্প্রদায় বিভিন্ন রকম তার ব্যাখ্য করে, তবে তার মূল অর্থ একই। চোরতেন আমাদের এই জড় জগতের প্রতীক। তাই কোন মহান বা ধার্মিক ব্যক্তি দেহত্যাগ করলে, এই চোরতেন স্থাপিত করে তার প্রতি সম্মান দেওয়া হয় । ভারতে এই ধরনের স্তূপ তুই দেখেছিস। চোরতেন অনেক সময় সমাধি বেদীতুল্য, যখন একটা চোরতেন পাবি তখন সেটাকে বাঁদিকে রেখে এগিয়ে যাবি, তার প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করবি। চোরতেন ধর্মের প্রতীক, সংঘের প্রতীক, বুদ্ধের প্রতীক। চোরতেন যেরকম ভাবেই তৈরী হোক না কেন তাকে কোন সময়ই অবহেলা করবি না। চোরতেন মন্দিরের প্রতীক, চোরতেনের মধ্যে আছে প্রাণ। ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ ও ব্যোমের প্রতীক। চোরতেনকে ভালভাবে পরীক্ষা করলেই এই পাঁচটি অংশ পরিষ্কার বুঝবি। আজকে নয় একদিন সময় করে তোকে ভাল করে বুঝিয়ে দেবো। অন্যান্য গুম্ফার * মতো এখানেও মন্দির, বিদ্যালয়, লামা ও ত্রাপাদের থাকার বন্দোবস্ত রয়েছে। শিল্প শিক্ষার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটা বাড়ী আছে। বর্তমানে ছাত্রের সংখ্যা পঞ্চান্ন, তবে প্রয়োজনবোধে দু'শ জন ছাত্রের জন্য এটা প্রস্তুত। এতো হল ছোটদের কথা। এই দুংকার গুম্ফা উচ্চ শ্রেণীর লামাদের এক জমায়েৎ কেন্দ্র, বিভিন্ন জায়গা থেকে লামারা আসেন শিক্ষা ও প্রচার সম্বন্ধীয় সভা সমিতির জন্য। এখানকার ধ্যানের ঘরগুলোও অতি সুন্দর জায়গায় অবস্থিত। সেখান থেকে দেখা যায় চোমলহরি তথা হিমালয়ের এক অনবদ্য দৃশ্য। প্রায় সন্ধ্যের কাছাকাছি একটা তিব্বতী ভেরী বেজে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে সবাই ছুটে চলে গেল। মনে হয় জমায়েতের বাঁশী। হঠাৎ কানে এল গুঞ্জন ধ্বনি, মনে হল ভীমরুলের চাকে কে যেন ঢিল মেরেছে। শব্দটা অবিকল ঠিক সেই ধরনের, বুঝলাম লামারা প্রার্থনা করছে। লামাদের প্রার্থনা সাধারণতঃ খুব নীচু গলায় থেমে থেমে হয়। কেউ যদি সেই শব্দে অভ্যস্ত না হয় তাহলে আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, সে কিছুতেই আন্দাজ করতে পারবে না এটি তিব্বতী ভাষায় প্রার্থনা হচ্ছে। আমরাও সেদিকে এগিয়ে গেলাম। হিমালয়ের ঠিক কোলে শিশুদের এই সহজ ও সরল প্রার্থনায় ভগবান সাড়া দিতে বাধ্য। প্রার্থনা শেষে সবাই চলে গেল খাবার ঘরে। আমরা অফিস ঘরের এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগলাম। গুরু চু-মিন্জেন এলেন তারও অনেক পরে। এখানকার ছেলেরা সংবাদ বহনে খুব চতুর, গুম্ফায় ঢোকবার আগেই তিনি আগন্তুকদের সংবাদ পেয়েছেন। অফিস ঘরের সামনে আসতেই হ্যারিকেনের আলোয় তিনি দেখতে পেলেন আমাদের গুরুজীকে, দুইজন দুইজনকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, বহুদিনের পর যেন দুই ভাইয়ের মিলন হল। আনন্দের উচ্ছ্বাসটা কেটে গেলে গেশে রেপতেন আমাদের মিঠাধ্যক্ষ চু-মিন্জেনের সাথে একে-একে পরিচয় করিয়ে দিলেন। থাকবার কথা বলার সাথে সাথেই তিনি রাজী হয়ে গেলেন, তিনি বললেন একদিন নয় যতদিন খুশী থাক। তিনি আমাদের রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন, সেখানে বিরাট হাঁড়ি আর কড়াই দেখিয়ে বললেন তোমাদের রান্নার জন্য এগুলো ব্যবহার করতে পারো, উনোন কাঠ সব তৈরী। তারপর জংকার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন—এ তোমাদের সাহায্য করবে। চল এখন মন্দিরে যাওয়া যাক তোমরা সেখানেই আজকের সন্ধ্যাধ্যান করতে পারবে। আঁকা-বাঁকা সরু গলির মধ্য দিয়ে আমরা এসে হাজির হলাম আর একটা বিরাট বাড়ীর সামনে। হ্যারিকেনের আলোয় কাঠের দরজার কাজগুলো ভালভাবে লক্ষ্য করতে পারলাম না। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। তিব্বতের কোন বুদ্ধমন্দিরে ঢোকবার জন্য জুতো খুলতে হয় না, মনে হয় খুব শীতের জন্যই এই ব্যবস্থা। সামনেই সারি সারি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে, তারই আলোয় দেখা যাচ্ছে বিরাট অবলোকিতেশ্বরের শান্ত মূর্তি । এই মূর্তিই এদের মূল দেবতা। চার হাত, নীচের দুহাত দিয়ে অভয় দিচ্ছেন আর উপরের দুই হাতে বজ্র ও পদ্ম। অবলোকিতেশ্বরের বাম ও ডান দিকে আরও অনেক মূর্তি রয়েছে। আমার নজরে পড়ল তারই পাশের বিরাট থাগুলোর দিকে। সেগুলো সব বড় বড় বইয়ে ভর্তি, প্রত্যেকটা বইয়ের উপরে ও নীচের মলাট কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরী আর তার সামনে রঙ্গীন কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঢাকা, সম্ভবতঃ প্রদীপের কালি থেকে বাঁচাবার জন্য। এই বইগুলো আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো, সেই দিকে আমি এগিয়ে গেলাম। হাত দিয়ে বইগুলোকে একটু স্পর্শ করবার চেষ্টা করতেই মঠাধ্যক্ষ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তিনি মৃদু হেসে তীব্বতী ভাষায় কি যেন জিজ্ঞেস করলেন—আমি বুঝতে না পেরে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি এবার আমার দিকে চেয়ে স্পষ্ট হিন্দীতেই জিজ্ঞাসা করলেন, তুম্ কি ধার কা আমী হো? অন্য সময় হলে নিশ্চয়ই আমি মৌনী বাবার ভান করতাম, কিন্তু এখানকার এই পবিত্র পরিবেশে সে মিথ্যাটা মুখ দিয়ে বেরোলো না, সেটা রেখে দিলাম চীনা সৈন্যদের জন্য। আমি উত্তর দিলাম—কল্কাত্তাকা। তিনি আনন্দিত হলেন, আমি গেশে রেপতেনের দিকে ফিরে বললাম—ওনাকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি আমার সম্পর্কে সব জানেন।
আমার কথা শুনে গেশে রেতেন চু-মিন্জেনকে খুব আস্তে আস্তে মানে ফিফিস্ করে আমার পরিচয় দিলেন। মঠাধ্যক্ষ আমার পরিচয় পেয়ে খুব আনন্দিত হয়ে বললেন—অল্প বয়সে তীর্থ করাই ভাল, সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে খুব কাজে লাগে, বিশেষ করে গেশে রেপতেনের মতো বিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গ খুব দুর্লভ। জানো আমি ও গেশে রেপতেন লাডাকে এক সাথে চার বছর ছিলাম। আমি আমার আগের প্রশ্নে ফিরে এলাম। জিজ্ঞাসা করলাম—এই বইগুলো কি মহাযান গ্রন্থের ভাষ্য ?
চু-মিন্জেন উত্তর দিলেন——না, দাঁড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি। এই বলে পাশের একটা থাক থেকে দুহাতে বিরাট একটা বই বের করলেন। বইটা একটা তক্তার উপর রেখে তিনি আমাকে ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। বইটার সাইজটা বিরাট, আড়াই ফুট লম্বা ও দু-ফুট চওড়া। তিনি বইটাকে সসম্মানে প্রণাম করে আমাকে বললেন—এইটি আমাদের তিব্বতীয় উপনিষদ্, আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। বুদ্ধ নীতি শাস্ত্র, এই বইটা ভারতের সংস্কৃত বই থেকে অনুবাদ করা হয়েছে, নাম কাংগীউর। তুমি এই ধরনের বই একমাত্র বড় বড় গুম্ফা ছাড়া আর কোথাও পাবে না। এই যে দেখছো চারপাশের দেওয়ালগুলো ঠাসা বই। প্রত্যেকটি খোপের সংখ্যার উল্লেখ আছে, এ ধরনের একশ আটটা (১০৮) বই নিয়ে তৈরী কাংগীউর। অর্থাৎ কাংগীউর একশ আট ভাগ, প্রত্যেকটা ভাগ নিয়ে তৈরী এক একটা বই। হাতে ছাপানো ভারী ভারী বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় নিতে হলে কি করেন ?
জবাবে মৃদু হেসে তিনি বললেন- সেটা একটা সমস্যা বটে। এ-ধরনের চারটে বই এক গাধার দু'পাশে দুটো দুটো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, তারপর সেই গাধাকে লামা বা আপা টেনে নিয়ে যায়। চলার পথে অবশ্যই হুঁশিয়ার থাকতে হয়, যাতে বইয়ের প্রতি কোনরকম কু-দৃষ্টি না পড়ে
–এই বইগুলো কি ছোট লামারা পড়তে পারে ?
–না, এর জন্য চাই উপযুক্ত প্রস্তুতি। পনেরো ষোল বছর মঠে থাকার পর, আস্তে আস্তে তাদের আমরা তাংগীউর-এর সহজ ভাষ্য বোঝাই।
—তাংগীউর ? সেটা আবার কি ?
—তাংগীউর হচ্ছে কাংগীউর-এর সহজ ব্যাখা, সেটাও তিব্বতী ভাষায় লেখা। এস পাশের ঘর তোমাদের দেখাচ্ছি। তাঁকে অনুসরণ করে আমরা সবাই পাশের ঘরে এলাম, তিনি দুটো ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে আমাদের চারদিকে তাকাতে বললেন। তাঁর কথানুযায়ী আমরা চারদিকে তাকালাম, কাঠের একটা বিরাট ঘর তার দেয়ালগুলো সব বইয়ে ঠাসা। চু-মিন্জেন আবার শুরু করলেন,
–এই ঘরটায় যত বই দেখছো তার সবগুলোই তাংগীউর। বিশেষভাবে এই ঘরটা তৈরী হয়েছে এই বইগুলো রাখবার জন্য। তাংগীউর-এর দুশ পঁচিশ ভাগ (২২৫), এখানে গুণে গুণে দেখো দুশ পঁচিশটা খোপ আছে। ছোট লামা বা ত্রাপাদের এই বই ধরতে দেওয়া হয় না। বইগুলোর উপরে ও নীচে কাঠের মলাট আর প্রত্যেকটি পাতা আলাদা আলাদা করা, পাতার মধ্যে কোন সংখ্যা দেওয়া নেই। একটার পর একটা সাজানো, যারা এই বই পড়তে আসে তারা যথাযোগ্য সম্মান, মনোযোগ ও যত্ন সহকারে এর ব্যবহার করে। চু-মিন্জেন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—এটা রামায়ণ ও মহাভারত থেকে অনেক কঠিন।
আমাদের মূল মন্দিরে রেখে দুই গুরুজী চলে গেলেন বাইরে। শান্তি ও রক্ষার আশ্বাস পেয়ে আমরা সেখানকার গদীতে ধ্যানে বসলাম ।
পরেরদিন সকাল বেলা। গুম্ফাবাসীরা সকালে কেউ খায় না। দিনে দুবার মাত্র এরা খায়। প্রথম খাওয়া দুপুরবেলা আর দ্বিতীয় খাওয়া সন্ধ্যের আগে, আমরাও তাদের সাথে যোগ দিলাম ।
গুরু চু-মিনজেন আমাদের দ্বিতীয় মন্দিরে নিয়ে এলেন দর্শনের জন্য, দ্বিতীয় মন্দিরটি মনে হল প্রথম মন্দিরটির থেকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ। মনে হয় পাহাড়ের দেয়াল কেটে এই মন্দিরটি তৈরী হয়েছে। অনেকগুলো মূর্তি, ধর্মরাজের মূর্তি, যবযুম ও বিভিন্ন ধরনের আসুরিক মূর্তি। যদিও তখন সকাল কিন্তু দিনের আলো মনে হয় ভেতরে ঢুকতে পারে না, একটাই মাত্র দরজা কোন জানালা নেই। তৃতীয় মন্দিরটি শুধু দেবদেবীতে ভরা, মনে হয় স্থানাভাবে সেগুলোকে একজায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে, সব কয়টি মন্দিরেই টাঙানো রয়েছে রঙ বেরঙের বহু তাংক৷ অর্থাৎ কাপড়ের উপর বিচিত্র রঙের যন্ত্র, মণ্ডলা, বুদ্ধ মূর্তি ও জন্ম-মৃত্যু জরার প্রতীক। এই মন্দিরগুলোর সোনার তৈরী প্রদীপের কাজগুলোও দেখবার মতো, মন্দিরের গঠন এমনভাবে তৈরী যে কেউ না নিয়ে গেলে সেখানে একা একা যাওয়া মুশকিল ।
এমন সময় খাওয়ার ভেরী বেজে উঠল। আমাদের ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই ফিরে আসতে হল। আমরা আজ ছাত্রদের সাথে নিমন্ত্রিত অতিথি, গুরু চু-মিনজেন আমাদের তরফ থেকে কিছু চান না। তিনি বললেন--তথাগতের ইচ্ছায় আর কুবেরের কৃপায় তাঁর ভাণ্ডারে অভাব নেই, তীর্থযাত্রীরা সেখানে একবেলা আহার করলে গুম্ফার মঙ্গলই হবে। তিনি যদিও একটু গম্ভীর প্রকৃতির কিন্তু তাঁর মনের প্রসারতা আমাদের মুগ্ধ করল। ছাত্রদের সাথে আমরা একসাথে খেতে বসলাম। সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে গেশে রেন ঘোষণা করলেন যে, খাবার পরই আমাদের আবার পথে পড়তে হবে ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন