লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা

বিমল দে

তিব্বত পুরোহিত প্রধান দেশ ৷

আমি আগেই লিখেছি যে দ্রেপুং সেরা এবং গান্‌দেন এই তিনটি গুম্ফা হচ্ছে তিব্বতের শিক্ষা জগতের পীঠস্থান। ছোট দশ বছরের ত্রাপা বা দাবা থেকে শুরু করে আশী বছরের বয়স্ক লামা পর্যন্ত সকলেরই শিক্ষার স্থান। কিভাবে একটা শিশু ভবিষ্যতে লামা পর্যায়ে উন্নীত হয় তারই সম্পর্কে দু'চার কথা লিখতে বাধ্য হচ্ছি।

লামা শব্দের অর্থ আমাদের ভাষায় বলবো সাধু অথবা মহাত্মা। একটি শিশু (বালক) লামা হয়েই জন্মায় না। তার পরবর্তীকালের জ্ঞান ও বিচার বুদ্ধি অনুসারে তাকে পদবী দেওয়া হয়। সেই পদবীর সাথে অনেকেদেহত্যাগকারী কোন লামার যোগসূত্র খুঁজে বার করে তার পুনর্জন্ম বলে প্রচার করা হয়। মহামান্য দালাই লামা এবং পাঞ্চেন লামাই তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ।

শিশুর জন্মমাত্র পিতা-মাতা ঠিক করে ফেলে যে সে তাদের ছেলেকে মঠে পাঠাবে কি না, যেহেতু মঠগুলোই হচ্ছে তিব্বতের একমাত্র শিক্ষাকেন্দ্র। সেই হেতু পুত্ৰ সন্তানকে সেখানে পাঠানোই হচ্ছে ভবিষ্যতের উন্নতির পথ। পুত্র সাত আট বছর বয়স হওয়া মাত্র পিতা বা অভিভাবকেরা স্থানীয় গুম্ফার অধ্যক্ষের সাথে যোগাযোগ করে। তারপর অধ্যক্ষ ছেলেটিকে দেখে একটা দিন ধার্য করেন তার ভর্তির জন্য। অবশ্য ভর্তি হবার জন্য ছেলেটির ভালো স্বাস্থ্য আছে কি না সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে নেন। গুম্ফার অধ্যক্ষ যদি ছেলেটির অভিভাবককে চেনেন তাহলে তো কথাই নেই যদি পরিচয় না থাকে তাহলে গুম্ফা পরিষদ এবিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে থাকেন। তিব্বতে বা বৌদ্ধ ধর্মে সাধারণতঃ জাত বিচার নেই। উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণীর কোন প্রশ্ন নেই। তবে কামার ও চণ্ডালদের শিশু-পুত্রদের সাধারণতঃ গুম্ফা পরিষদ গ্রহণ করেন না। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে যে বৌদ্ধ ধর্মে প্রাণী হত্যা নিষেধ। কামারেরা লোহার অস্ত্র তৈরী করে যুদ্ধ বা প্রাণিহত্যার জন্য, আর আদালতের মুণ্ডচ্ছেদকারীদেরও ওই একই কারণে সমাজের নিম্নে পর্যায়ে স্থান দেওয়া হয়েছে ৷

গুম্ফার অধ্যক্ষ একবার ভর্তির আদেশ দিলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভর্তি করানো হয় । যাদের বাড়ী গুম্ফার কাছাকাছি তারা দৈনিক স্কুলের মতো যতায়াত করতে পারে । যদি অভিভাবক তার ছেলেকে এই মুহূর্তে ছাড়তে রাজি না হন তাহলে আরও কয়েক বছরের জন্য বাড়ীতে অভিভাবকের কাছে থেকে যাতে পড়াশুনো করতে পারে সে বিষয়ে পরামর্শ দেন। অভিভাবক যদি এই প্রথম শিক্ষার দায়িত্ব নেন তাহলে ভালোই নয়তো গ্রামের কোন লামা পাঠশালার মতো করে শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব দিয়ে থাকেন।

ছাত্রাবস্থায় এই প্রথম সোপানকে বলা হয় গে-গ্লুক, আর পাঠশালার এইসব ছোটখাটো লামাদের বলা হয় গে-গান। গে-গান লামারা সংসারী, গৃহী বা ব্যবসায়ীও হতে পারে, তাতে বাধা নেই। কয়েক বছর গে-গানের কাছ থেকে শিক্ষালাভের পর সে যখন গুফায় বসবাসের জন্য আসে, তখন তাকে আবার শুরু সামনে নতুন করে পরীক্ষা দিতে হয়। গুম্ফায় বরাবরের জন্য প্রবেশের সময়ই হয় প্রথম দীক্ষা। মুণ্ডিত মস্তক ও গৈরিক বস্ত্র এই সময় থেকেই পড়তে হয়। অভিভাবকের সাধ্য অনুযায়ী গুরুদক্ষিণা এই সময়ই দিতে হয়। অনেক সময় গুরুদক্ষিণার উপর নির্ভর করে ছেলেটির ভবিষ্যত ৷

গুম্ফার অধ্যক্ষের উপর ছেলেটিকে মানুষ করার পুরো দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। ছোট ত্রাপা আস্তে আস্তে নিজের সম্পর্কে সচেষ্ট হয়ে উঠে, গুরু সেবাও তার শিক্ষার একটি প্রধান অঙ্গ। এইভাবে আরও কয়েক বছর কাটে, তেরো-চোদ্দ বছরে তাকে বসতে হয় আবার পরীক্ষায়। এই পরীক্ষায় পাস করলে তাকে গে-প্রুক থেকে গে-নীয়েন পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। গে-নীয়েন শ্রেণী থেকে শুরু হয় সত্যিকারের তপস্যা। এই সময়ে তার স্বভাব-চরিত্র ও শৃঙ্খলার উপর ভীষণ চাপ দেওয়া হয়। তিন চার বছর যাবৎ গে-নীয়েন শ্রেণীর পড়াশুনা শেষ হলে তাকে পরীক্ষায় বসতে হয়। এই পরীক্ষাটা আমাদের দেশের ম্যাট্রিক বা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। পড়াশুনার বিষয়গুলোর মধ্যে প্রধানতঃ থাকে ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, অঙ্ক, ভুগোল। পূজা-পাঠ ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপর বিশেষ চাপ দেওয়া হয় ।

গে-নীয়েন পর্যায় থেকে আরও উঁচুতে অর্থাৎ মহাবিদ্যালয়ে যেতে হলে তাকে অনেক রকম পরীক্ষা দিতে হয়, এবং পণ্ডিতদের সাথে বিতর্ক প্রতিযোগিতাতেও অংশ গ্রহণ করতে হয়। সব রকম পরীক্ষায় পাস করলে পর তাকে পুরোহিত পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। এই নতুন সম্মানের জন্য সমাবর্তন উৎসব ও লামা পর্যায়ের শেষ উপনয়ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হয়। লামাদের এই পর্যায়কে বলা হয় গেট্‌-সুল বা গেল্।

গে-নীয়েন পরীক্ষায় জন্য নবীশকে যে সব ব্রত পালন করতে হয় তার মধ্যে পালনীয় হচ্ছে প্রাণিহত্যা, অপহরণ, ব্যভিচার, মিথ্যাকথন ও সুরাপান থেকে বিরত থাকা। গুম্ফা বা মঠের প্রত্যেককেই সাধু জীবন-যাপন করতে হয় অর্থাৎ পঞ্চব্যসন থেকে দূরে থাকতে হয়। যেমন অকালভোজন, নৃত্যগীতাদিতে অনুরাগ, গন্ধমাল্যাদি ব্যবহার, কোমল শয্যায় শয়ন ও সোনা-রূপা টাকা-পয়সা বর্জন, এগুলো বৌদ্ধ ধর্মের অবশ্য পালনীয় প্রতিজ্ঞা। গেত্-শুল্ পর্যায়ের জন্য ছাত্রকে গ্রহণ করতে হয় ছত্রিশটা প্রতিজ্ঞা। সে প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য চাই শারীরিক ও মানসিক গঠন। শরীর যখন সর্ব রোগমুক্ত থাকে তখনই মন হালকা হয় নিশ্চিন্ত মনে পরম জ্যোতির্ময় মহাবুদ্ধের ধ্যানে বসতে পারে। গেত্‌-শুল্ পর্যায়ের লামারা সব রকমের সরকারী সাহায্য ও সুযোগ সুবিধার অধিকারী। এই সময় দু'চার বছর এদিক-ওদিকে কিছু যায় আসে না, যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন সেটা হচ্ছে মনের সংযম। যার মধ্যে অহিংসা সত্য, ধর্ম ও দম আছে সেই প্রকৃত লামা। গেত্‌-শুল্'র বৃত্তির অধিকারী হওয়া তিব্বতীদের জীবনের এক শুভ ও পৰিত্ৰ অধ্যায়। এই সময় ছাত্রের পরিবারের সবাই আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। গেত্-শুল্-এর সাধারণ ছাত্ররা অর্থাৎ যারা লেখাপড়ায় মেধাবী নয় তাদের অভিভাবকেরা আসেন বিভিন্ন রকমের অনুরোধ নিয়ে। এই ক্ষেত্রে অভিভাবক যদি হোস্টেল খরচা দিতে সমর্থ হন তাহলে ছাত্রদের রাখার কোন অসুবিধা হয় না। তিব্বতী লামাদের প্রায় আশীভাগই এইখানে থাকতে বাধ্য হয়। যে সব গেত্‌-শু'র ছাত্ররা টাকা দিয়ে গুম্ফার পড়াশুনা করে তাদের সংখ্যাই বেশী। এই টাকাটা গুম্ফার উন্নতিকল্পে ব্যবহার করা হয়। গুম্ফার ছোট্ট ঘরের মধ্যে শুরু হয় চিরমুক্তির কঠোর পরিশ্রম। গেত্‌-শুল্ অবস্থা থেকেই তাদের লামা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে তাদের পূর্ণ স্বীকৃতি এখনও অনেক দূর। এই সময় তাদের বলা হয় ত্রাপা, বয়েস এখনও কুড়ির নীচে। হোস্টেলে তাদের নিজস্ব জিনিসপত্রের মধ্যে থাকে দুটো বিরাট চাদর, লামার পোশাক, দুটো কম্বল, প্রদীপ, একটা বাটি একটা গ্লাস একটা থালা ও কয়েকটা বই। এই সময় থেকেই ত্রাপার উপর পড়ে মন্দিরের দায়িত্ব। মুণ্ডিত মস্তকের জন্য দায়িত্বভার দেওয়া থাকে গুম্ফার নাপিতের উপর।

লামাকে এই সময় থেকেই পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কাংগীউর মুখস্ত করে তার ব্যাখ্যা ও টীকা গুরুর কাছ থেকে শিখতে হয়। ধর্মপুস্তকগুলোর প্রতিলিপি তৈরী করা ও বিভিন্ন ধরনের মগুলা অঙ্কনের উপরও চাপ দেওয়া হয়। আধ্যাত্মিকতার গূঢ় রহস্য নিয়ে বিতর্ক চলে ছাত্রদের মধ্যে, গুরুরা থাকেন বিচারকের আসনে। তর্কে যারা জয়ী হয় তাদের সম্মানীত করা হয় গেলং-মা পদবী দিয়ে। কুড়ি বছর পর থেকে লামাকে রাজ্য শাসনের জন্য অথবা গুম্ফার দায়িত্ব নেবার জন্য বিশেষ আইনসংক্রান্ত বিষয়ে অথবা দর্শন নিয়ে চর্চা করতে হয়। নির্বাণ লাভের জন্য সত্যিকারের সাধনাও শুরু হয় এই অবস্থা থেকে। যাঁরা রাজ্য শাসনের দিকে এগিয়ে যান তাঁরা বিবাহ করে সংসার ধর্ম পালন করেন। আর যাঁরা অধ্যাত্মমার্গের দিকে যান তাঁরা বেছে নেন চিরকুমারের কঠোর পথ।

এটা হচ্ছে তিব্বতের মোটামুটি ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। লাসা হতে যে সব গ্রাম অনেক দূরে সেখানে গুল্ফার অধ্যক্ষরা স্থির করেন ছাত্রদের ভবিষ্যৎ। তবে যেমন করেই হোক রাজধানীর যে কোন রকম উচ্চ পদের জন্য প্রার্থী নির্বাচন করা হয় দ্রেপুং সেরা ও গান্‌দেন গুম্ফা থেকে।

তিব্বতের ধর্ম ও ইতিহাস

তিব্বতে প্রবেশের পর থেকেই যত দেখছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি, এরা সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ভগবান বুদ্ধ ছিলেন বৈদিক যাগ যজ্ঞ ও ক্রিয়াকাণ্ডের বিরোধী। তিনি ছিলেন জাত বিচারের বিরুদ্ধে, মানুষমাত্রেই নির্বাণলাভের অধিকারী। ব্রাহ্মণ হয়েও যারা ব্রহ্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না, ভগবানের বিষয়ে উপলব্ধি না করে যারা শুধু ভগবান ভগবান বলে শুকনো মন্ত্র উচ্চারণ করে, মাছ মাংস খেয়ে যারা জীবে প্রেম ধর্ম শেখায় তাদের বিরুদ্ধে ছিল ভগবান বুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিযোগ। যাগ-যজ্ঞের মাধ্যমে পুরোহিত পোষণের তিনি ছিলেন বিরোধী। পূজার্চনা ও অসংখ্য দেব-দেবীদের মেলায় যখন অন্তর্যামী নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই সময়ই মহাবতার বুদ্ধদেব এগিয়ে এলেন।অন্ধকারে যারা হারিয়ে যাচ্ছিল তাদের তিনি দেখালেন আলো। তিনি সকলকে বুঝিয়ে দিলেন এই দুনিয়ার আনন্দ-রহস্য। তিনি বললেন—পথ হারাইও না। জীবনে মোক্ষ ব্যতীত অন্য কিছু কাম্য নেই। অন্ধকারে পথ ভুল করো না, মুক্তিমার্গে চল, সেখানেই আছে সচ্চিদানন্দ ।

তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। প্রত্যেকটি মন্দিরের বেদীতে বুদ্ধদেবের বিভিন্ন মূর্তির সাথে রয়েছে অসংখ্য হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি। কালী, তারা, দুর্গা, ভৈরবী, ব্রহ্মা, সরস্বতী এই ধরনের আরও বহু দেব-দেবীর মূর্তি আমি নিজের চোখেই বিভিন্ন গুম্ফায় দেখেছি। তাছাড়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এখানকার বৌদ্ধ ধর্মের সাথে তন্ত্র-সাধনার অদ্ভূত মিশ্রণ। এর কারণ জানতে হলে আসতে হবে পূর্ব ইতিহাসে অর্থাৎ কিভাবে বৌদ্ধ ধর্ম এদেশে প্রভাব বিস্তার করল। সংক্ষেপে তারই আলোচনা করা যাক।

তিব্বতের আদি ধর্ম হচ্ছে বন্-পা। মারণ-উচাটন-পিশাচ-সিদ্ধ নরবলি এইসব নিয়েই ছিল তাদের কারবার। সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে তাদের থেকে সুযোগ সুবিধা আদায় করে অনেক অসাধু সাধুর পর্যায়ে বসে ধর্মের নামে ফাঁদ পেতে বসেছিল। তিব্বতের সাধারণ মানুষরা বরাবরই সরল ও সহজ, তারা এইসব বিভীষিকার বিরুদ্ধে কোনোদিনই মাথা তোলবার সাহস পেতো না। তারই মধ্যে মাঝে মাঝে জাতীয় বা উপজাতীয় নেতারা মাথা তুলে উঠে দাড়াতো, তাদের মধ্যে যারা শক্তিশালী তারা নিজেদের রাজা বলে ঘোষণা করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজত্ব চালাতো, আবার অন্য শক্তির কাছে হেরে গিয়ে মাথা নত করতো। সেই সময়কার সঠিক ইতিহাস এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু যেই রাজ্য শাসন করুক না কেন, ধর্মটা ছিল বন্-পা, অনেকটা নিম্নমার্গের তন্ত্রের মতো। তান্ত্রিক ধর্মের আদি হচ্ছে দেহ তত্ত্বকে জেনে তারপর আস্তে 'আস্তে মন শব্দ স্পর্শ রস গন্ধকে জানা, তারপর আরও ঊর্ধ্বে উঠে পঞ্চমহাভূত ভূত ও জাগতিক পদার্থের উৎস। খুঁজে বার করা। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরা ও অপরা বিদ্যার মাধ্যমে প্রকৃতি ও পুরুষের মিলন রহস্য জানা। কিন্তু সে পথ যেমন জটিল ঠিক তেমনি কঠিন। তাই অনেকেই পথভ্রষ্ট হয়ে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন রহস্যের মূল সূত্র না ধরতে পেরে দেহ-তত্ত্ব নিয়েই খুশী হল। শক্তিরূপী মায়ের সৃজনী শক্তির সন্ধানের কঠিন পথ ছেড়ে দিয়ে রূপ-রস-গন্ধের আকর্ষণে থেমে যেতো সেখানে। অথবা সচ্চিদানন্দের বদলে তারা ভোগানন্দ পেয়েই ক্ষান্ত হতো। এই ভাবেই তিব্বতে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য বন্-পথ, তন্ত্র-পথ। তন্ত্রের আলোর পথে না গিয়ে তাদের অধিকাংশই বেছে নিত অন্ধকার পথ, অর্থাৎ একটা দেহ ও তার আত্মাকে নিয়ে যত রকম খেলা খেলা যায় তার কোনোটাই বাদ ছিল না। তিব্বতী রাজা বা নেতারাও এই ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বন্-পা যদিও তন্ত্রের মতো কিন্তু তন্ত্রের সঙ্গে তার তফাৎ ছিল বিরাট ৷ বন্-পা ধর্মে ছিল ড্রাগন ও পিশাচদের রাজত্ব। এই সময়কার তিব্বতের পুরা ইতিহাস আজও পাওয়া যায়নি। খৃস্টাব্দ সপ্তম শতকে অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের শুভ আর্বিভাবের প্রায় বারোশ' বছর পর বুদ্ধদেবের বাণী প্রথম তিব্বতে প্রচারিত হয়। তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের মুলে ছিলেন তদানীন্তন রাজা স্রোং-সান্ গাম্পো। তারই নামানুসারে তিব্বতী মঠগুলোকে বলা হয় গোম্‌ম্পা বা গুম্ফা।

প্রায় ৬৫০ খৃস্টাব্দে তিব্বতের মহান্ প্রতিপত্তি রাজা স্রোং-সান্ গাম্পো (Srong-Tsan-Gampo) তিব্বতের সীমাকে সুদূর চীন ও দক্ষিণে নেপাল পর্যন্ত বিস্তারের জন্য এই দুটো দেশ আক্রমণ করেন। চীন আক্রমণ করে তিনি বিজয়ী হন এবং চীন আক্রমণ থেকে সেখানকার রাজকন্যাকে বিয়ে করে তিব্বতে নিয়ে আসেন। চীন দেশ সেই সময় ছিল ভারতের মিত্র, বৌদ্ধ ধর্ম সেই সময় চীনদেশের রাজ ধর্ম হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। চীনা রাজকন্যাকে বিবাহের সাথে সাথে তিনি সেখানকার ধর্মকেও বরণ করে আনলেন তিব্বতে। তারপর ফিরে এসে তিনি আক্রমণ করলেন নেপাল। নেপালের রাজা তার আক্রমণের ধাক্কা সামলালেন সন্ধি চুক্তি করে। সেই সন্ধি অনুসারে, নেপাল রাজ অংশু বর্মা তাঁর মেয়ে ভূকুটিকে সমর্পণ করতে বাধ্য হলেন তিব্বতরাজ স্রোং-সান্-গাম্পোর হাতে। বলাই বাহুল্য, সম্পূর্ণ নেপাল তখন ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

এইভাবে রাজা স্রোং-সান্-গাম্পো চীন ও নেপাল থেকে রাজকন্যাদের সাথে সাথে আনলেন বৌদ্ধ ধর্ম। রাজার উপর এই দুই রাণীর প্রভাব ছিল খুব বেশী। এই দুই রাণীর অনুরোধে ও চাপে রাজা তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মকে রাজ ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। নেপালের রাজকন্যা সেই সময় তার সাথে বিয়ের যৌতুক হিসেবে নেপাল রাজ-প্রাসাদ থেকে অসোভ্য বুদ্ধের এক বিরাট মূর্তি নিয়ে এসেছিলেন। সেই স্টাচুই হচ্ছে তিব্বতের প্রথম বুদ্ধ মূর্তি। রাজা স্রোং-সান্-গাম্পো তার সম্মানার্থে লাসায় এক বিরাট মন্দির তৈরী করে সেই বিগ্রহকে স্থাপন করেন। তিব্বতরাজ এইভাবে বৌদ্ধ ধর্মে তিব্বতকে দীক্ষিত করেন। লাসায় বুদ্ধ মন্দির স্থাপন করেই তিনি তাঁর কাজ শেষ করেননি। বৌদ্ধ দর্শন তাঁর যোদ্ধা মনকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে ফেলল, নতুন ধর্মে দীক্ষিত হয়ে তিনি পেলেন শান্তি আর আনন্দের পথ । তিনি আনন্দিত হয়ে তার অর্থমন্ত্রীকে তিব্বতের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের নিয়ে যেতে বললেন ভারতবর্ষে। বুদ্ধদেবের ভূমি থেকে শিখে আসতে হবে সত্যিকারের বৌদ্ধধর্ম । তারপর সেই ধর্মে দীক্ষিত করতে হবে তিব্বতের প্রত্যেক নাগরিককে। বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য এমন চেষ্টা বোধহয় একমাত্র সম্রাট অশোক ছাড়া আর কেউ করেননি।

অর্থমন্ত্রী থন্-মি-সবোথ ভারতবর্ষে এসে মহাপণ্ডিত লিপিদত্তকে গ্রহণ করলেন আচার্য হিসেবে। তিনি নিজে শুরু করলেন বিভিন্ন পালি ও সংস্কৃত বই থেকে তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ। তাঁর সেই পালি ও সংস্কৃত থেকে বৌদ্ধ দর্শন বেদ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অনুবাদই পরবর্তী যুগে কানজুর ও তানজুর হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। রাজা স্রোং-সান্-গাম্পো নিজেই তাঁর মন্ত্রী ও পরিবারবর্গকে ‘ওম্ মণি পদ্মে হুম' এই বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করলেন। এই সময় থেকেই তিব্বতে শান্তি ও ধ্যানের কথা প্রথম প্রচারিত হয়

বৌদ্ধধর্ম প্রসারের সাথে সাথে প্রাচীন বন্-পা ধর্মটা একটু দূরে সরে দাঁড়িয়েছিল মাত্র। তিব্বতের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে ভূতের ভয় ও দৈত্য দানবদের অত্যাচারের কথা এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে সহজে তার থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া খুবই মুশকিলের ব্যাপার। যে সব ওঝা ও সুযোগবাদী পুরোহিতেরা বুদ্ধের শান্তি বাণীর জন্য তাদের কারবার গুটিয়ে নিয়েছিল তারা রাজা স্রোং-সান্-গাম্পোর মৃত্যুর সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল আবার জনসাধারণের উপর। রাজধর্ম বুদ্ধ বাণীকে দূরে সরাবার সাধ্য তাদের নেই তাই তারা অতি চতুরতার সঙ্গে কৌশলে, বৌদ্ধধর্মের সাথে সাথে তন্ত্র মতকে সংযোগ করে দিল। বৌদ্ধধর্ম তন্ত্রও এবং ভারতীয় ধর্ম কাজেই তাকে দূরে সরানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। দুই রানী, রাজা স্রোং-সান্ গাম্পো ও তার অর্থমন্ত্রীর আপ্রাণ চেষ্টায় তিব্বতে যে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, রাজার মৃত্যুর পর, সেখানে দেখা দিল আবার ভূতের তাণ্ডব। শত চেষ্টা সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে মহাকাল ও ড্রাগনের প্রবেশকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারল না, বুদ্ধের থেকে ড্রাগন প্রীতিই যেন জনসাধারণের রক্তে মিশে গেছে। এই ক্ষেত্রে বলা ভালো যে চীনে এই সময় বৌদ্ধধর্মের মধ্যেও ড্রাগনের প্রভাব ছিল অসাধারণ। কাজেই চীনা রাজকন্যার সাথে সাথে বৌদ্ধ দর্শন ও ড্রাগন স্থাপত্য এদেশে এল । বন্-পা ধর্মীয় পুরোহিতেরা সেই সময় ভারতীয় তন্ত্র সাধনার নাম করে তাদের নিজ নিজ ধর্মকে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করতে লাগল। প্রায় একশ' বছর যাবৎ বৌদ্ধ ও বন্-পা ধর্মের রেষারেষি চলতে লাগল। তারপর সিংহাসনে উপবিষ্ট হলেন স্রোং-সান্-গাম্পোর উপযুক্ত উত্তরাধিকারী থ্রি-স্রোন্ ইদে-সান্ (Thri-Sron - Ide - Tsan 155 - ৭৮০ খৃস্টাব্দ)। রাজা থ্রি-স্রোন্-ইদে-সান্ শাসনভার হাতে নিয়েই ফিরিয়ে আনলেন তিব্বতের ভারসাম্য। তিনি তার মহান্ পূর্বপুরুষের নাম নিয়ে পারিষদদের ডেকে বললেন—আমাদের দেশের বন্-পা ধৰ্ম হচ্ছে আদি ধর্ম কিন্তু বৌদ্ধধর্ম আমাদের দেশে এনেছে শান্তি। বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করেই আমাদের পিতৃপুরুষেরা মোক্ষ ও নির্বাণ লাভ করেছেন। কাজেই সেটাকেও ছাড়লে চলবে না। তাই এমন একজন ধর্ম নেতাকে খুঁজে বের করতে হবে যিনি এই দুই পক্ষকে সসম্মানে বিচার করে একটা মীমাংসার পথ দেখাতে পারবেন। রাজার কথা শুনে চারদিকে মন্ত্রীরা ছড়িয়ে পড়ল উপযুক্ত ধর্মীয় নেতার সন্ধানে। শুধু তিব্বতের নয় তিব্বতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ল তিব্বতের রাষ্ট্রদূত, যুদ্ধ নয় চাই শান্তি, সেই শান্তির জন্য চাই এক মহাগুরু ।

অনেক খোঁজাখুঁজি ও অনেক বাক-বিতণ্ডা ও যুক্তির ঝড় পেরিয়ে শেষে রাজা খুঁজে পেলেন উপযুক্ত গুরু। এক অসাধারণ গুরুর সন্ধান পাওয়া গেল কাশ্মীরে। কাশ্মীরের মহাপণ্ডিত গুরু পদ্ম সম্ভবাকে গ্রহণ করা হল রাজ্যের আচার্য হিসেবে। গুরু পদ্ম সম্ভবা সম্মানিত হলেন তিব্বত-গুরু পদে। তাঁর নাম হল রিপোচে অর্থাৎ মহার্ঘ গুরু। অনেকে তাঁকে জানেন উরগীয়ান লামা বলে। কাশ্মীরের উরগীয়ান গ্রামে তাঁর জন্ম। গুরু পদ্ম সম্ভবার জন্ম রহস্যও অতি অসাধারণ, তিনি কোনো মানবগর্ভে জন্মাননি, তিনি সরাসরি প্রকাশিত হয়েছেন একটা পদ্মফুলের ভেতর থেকে। তিনি ছিলেন সর্বজ্ঞ পণ্ডিত।

তিব্বতে এসেই তিনি লেগে গেলেন সংস্কারের কাজে। তন্ত্র ও বেদ উভয় শাস্ত্রেই তার ছিল অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর সেই সাথে সাথে বৌদ্ধ-শাস্ত্র তো বটেই। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ পণ্ডিত। প্রাচীন পন্থীদের সরাসরি অগ্রাহ্য না করে তিনি অনাবশ্যক রীতিগুলোকে আস্তে আস্তে দূরে সরাতে লাগলেন। তিনি জানতেন যে হঠাৎ যদি তিনি তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করেন তাহলে বৌদ্ধধর্মই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুগের পর যুগ ধরে দৈত্য-দানব-ভূত-প্রেতের উপর ভিত্তি ও বিশ্বাস করে এই ধর্মটা তিব্বতীদের সংস্কারের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে, সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে এ ধর্মটাকে উড়িয়ে দেওয়া চলবে না। উপরন্তু তিনি নিজেও ছিলেন তান্ত্রিক, কাজেই খুব সাবধানে তিনি নিজের অভিমতটাকে তাদের মধ্যে বিতরণ করতে লাগলেন—অর্থাৎ দৈত্য-দানব ও ভূত-প্রেতকে শ্রদ্ধা সহকারে আস্তে আস্তে বশে আনতে হবে তারপর শান্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। একবার শান্তি এলে তারপর মুক্তি-মোক্ষ ও নির্বাণ লাভের পথ খুঁজে ধার করতে হবে ।

তাঁর এই ঐক্যবাদ সকলের পছন্দ হল। যারা তাঁর কথায় অবিশ্বাস বা অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করতো তাদের পদ্ম সম্ভবা নানা রকম ঐশ্বরিক ও অলৌকিক শক্তি দেখিয়ে বশে আনতেন। দেখতে দেখতে গুরু রিপোচের নাম সারা তিব্বতে ছড়িয়ে পড়ল । প্রাচীন পন্থীরাও তাঁর কাছে এসে অলৌকিক শক্তির জন্য দীক্ষা গ্রহণ করতে আরম্ভ করলো, সেই সাথে সাথে রাজধর্ম বৌদ্ধধর্মেরও বিস্তৃতি শুরু হল। রাজা থ্রি-স্রোন্-ইদে-সান্ পদ্মসম্ভবার গুণ ও অলৌকিক শক্তির প্রতিভা দেখে রাজ্যের কোষাগার উন্মুক্ত করে দিলেন ধর্ম প্রচারের জন্য। এই সময় বহু তিব্বতী পণ্ডিত ভারতবর্ষে আসেন ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃত চর্চার জন্য। বিখ্যাত পণ্ডিত শান্ত রক্ষিত এই সময়ই তিব্বতে যান। রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় এই সময় চীন ও ভারতবর্ষ থেকে পণ্ডিতেরা আসতেন ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার জন্য। এই সময়েই বৌদ্ধ ধর্ম প্রসঙ্গে লাসার রাজপ্রাসাদে এক বিরাট বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ভারতীয় পণ্ডিত কমলাশীল চীনা পণ্ডিতদের পরাস্ত করেন। পণ্ডিত কমলাশীলের অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে রাজা খুব খুশী হলেন বটে কিন্তু চীনারা লজ্জায় ও অপমানে বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে ফেলল, তারই কিছুদিন পর এক চীনা চক্রান্তের ফলে আততায়ীর দ্বারা পণ্ডিতপ্রবর কমলাশীল নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় ভাবমূর্তির জয়জয়কার যেন আরও দ্বিগুণভাবে ছড়িয়ে পড়ল। তিব্বতের জ্ঞানীগুণীদের মধ্যে ভারতীয় দর্শন চর্চার এক বিরাট জোয়ার দেখা দিল। সম্ভবতঃ সেই সময় তিব্বতীয় ভাষায় ভারতীয় দর্শন ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের আরও অনেক অনুবাদ হয়।

গুরু পদ্ম সম্ভবার জয় জয়কার চারদিকে আরও ছড়িয়ে পড়ল। তিনি একাধারে বৌদ্ধ-ভিক্ষু, তান্ত্রিকাচার্য ও উরগীয়ান লামা হিসাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়কে বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞান ও দীক্ষা দিতে লাগলেন। এইভাবে তিনি জয় করলেন প্রাচীন পন্থীদের।

গুরু রিম্পোচে চারদিকে প্রচুর মঠ ও বিহার স্থাপন করলেন, আর সেই সাথে সাথে বহু তান্ত্রিক মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করলেন। তার ব্যক্তিগত জীবনটা ছিল খুবই অদ্ভূত। তন্ত্র, বেদ ও বৌদ্ধ দর্শনে তিনি ছিলেন চূড়ামণি। তার চার প্রধান স্ত্রী, অনেক উপপত্নীও নাকি ছিল। কিন্তু তাই বলে তার সম্মান বা প্রতিপত্তি এতটুকু কমেনি। তিনিই তন্ত্র ও বৌদ্ধ শাস্ত্রের এক সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন তিব্বতের বৌদ্ধতন্ত্র মার্গ। বুদ্ধদেবের বাণী ও উপদেশ প্রচারের জন্য তিনি প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে মোতায়েন করলেন লামা। এই লামা একাধারে রাজা ও ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করবেন। তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের গোড়া পত্তন করেন রাজা স্রোং-সান্-গাম্পো, কিন্তু আর সেই ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেন তারই বংশধর রাজা থ্রি-স্রোন্-ইদে-সান্। এর মূলে মহামান্য গুরু পদ্ম সম্ভবার দান তিব্বতের ইতিহাসে লেখা থাকবে। তিব্বতের লামা পূজা এই সময় থেকেই শুরু হয়।

গুরু রিম্পোচে শেষ বয়সে বৌদ্ধধর্ম প্রসার ও প্রচারের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দেন। তন্ত্র থেকে তিনি আস্তে আস্তে সরে এলেন মোক্ষ ও নির্বাণের দিকে। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁরই এক প্রাচীনপন্থী (বপন্থী) সহকর্মীর হাতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর এই উগ্র প্রাচীনপন্থী পুরোহিতটি বহু অমূল্য তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করা সংস্কৃত গ্রন্থের বিনাশ করেন। সেইসব গ্রন্থের অনুবাদ আর পাওয়া যায়নি। গুরু পদ্ম সম্ভবার হত্যাকারীকে পরে ধরতে পেরে তার মুণ্ডচ্ছেদ করা হয় ।

তিব্বতে গুরু রিম্পোচ বুদ্ধাবতার হিসেবে আজও পুজিত। আমার মতে সমস্ত তিব্বতে গুরু রিম্পোচেই প্রাচীন জাগ্রত দেবতা বাংলায় যেমন মা-কালী। নী-ইংমা-পা সম্প্রদায়রা গুরু রিম্পোচেকেই সর্বাধিক সম্মানিত গুরু বা দেবতা বলে পূজা করে। গুরু রিম্পোচের দুই স্ত্রীর মূর্তিও সেই সাথে সাথে মন্দিরে স্থান পেয়েছে। প্রাচীন পন্থীদের ধাক্কা খাওয়া সত্ত্বেও ভারতবর্ষ থেকে রীতিমত পণ্ডিতদের যাতায়াত বেড়েই চলল। এগার শতাব্দীতে রাজা ইয়ে-সেস্-অদ্ Ye - Ses - Od)-এর আমলে এক যুবক পণ্ডিতের দল ভারতবর্ষে আসেন বৌদ্ধধর্ম দর্শন শিখবার জন্য। তাদেরই আমন্ত্রণে ভারতবর্ষ থেকেও একদল পণ্ডিত তিব্বতে যান ধর্মপ্রচারের জন্য। সে দলের নেতা ছিলেন মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর। পণ্ডিত অতিশ দীপঙ্কর তাঁর সুযোগ্য শিষ্য ব্রম্‌-টন্‌ (Brom-Ton)-এর সাহায্যে 'প্রবর্তন করেন কদম্-পা সম্প্রদায়। পরবর্তীকালে এই কদম্‌-পা সম্প্রদায়ই গেলুক্‌-পা নামে স্বীকৃতি পায়। দালাই লামা এই গেলুক্‌-পা সম্প্রদায়েরই প্রধান পুরোহিত। *

একাদশ শতাব্দীতে লাসায় গেলুক্‌-পা সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোন বৌদ্ধ সম্প্রদায় ছিল না। সবাই দালাই লামার একাধিপত্য মেনে নিয়েছিল। কিন্তু পঞ্চাশ শতাব্দীতে হঠাৎ দেখা দিল আর একটি সম্প্রদায়, যার নাম শাক্য। শাক্য সম্প্রদায় নী-ইংমা-পা ও গেলুপা'র মাঝামাঝি পথের পথিক। এই শাক্য সম্প্রদায় সম্রাট কুবলাই খানের পৃষ্ঠপোষকতায় অন্যান্য ছোটখাটো সম্প্রদায়কে দূরে সরিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল। প্রবল পরাক্রান্ত চীনা সম্রাট প্রয়োজনবোধে তার সৈন্যবাহিনী নিয়েও সাহায্য করবেন বলে শাক্য সম্প্রদায়কে প্রতিশ্রুতি দিলেন। তাশী লামা অর্থাৎ পাঞ্চেন লামা শাক্য সম্প্রদায়ের নেতা বলে স্বীকৃতি পেলেন।

এইভাবে শুরু হল তিব্বতের দুটো প্রধান সম্প্রদায়। লাসায় দালাই লামার অধীনে গেলুক্‌-পা আর গীয়াৎসের পাঞ্চেন লামার অধীনে গড়ে উঠল শাক্য সম্প্রদায়। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্ম প্রথমে ছিল নী-ইয়াংমা সম্প্রদায় স্বয়ং পদ্ম সম্ভবা ছিলেন তার গুরু। তারপর গুরু অতীশ'র অধীনে সৃষ্টি হল' কদম্-পা সম্প্রদায়। তারপর দালাই লামার নেতৃত্বে গড়ে উঠে গেলুক্‌-পা ও পাঞ্চেন লামার শাক্য। শাক্য সম্প্রদায় পঞ্চদশ শতাব্দিতে খুব প্রবল হয়ে গেলুক্‌-পা সম্প্রদায়কে প্রায় পিষে ফেলার উপক্রম করে। সেই সময় তিব্বতে আবির্ভূত হল সোং-কা-পা নামে এক প্রতিভাশালী লামা। তিনি দালাই লামার কদম্-পা ওরফে গেলুক্-পা সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তোলেন। তিনি ছিলেন একাধারে ধর্মীয় নেতা আর অন্যদিকে সমাজ সংস্কারক। সব দলীয় কোন্দল ঘুচিয়ে দিয়ে তিনি স্থাপন করলেন একনায়কত্ব। তারই আমল থেকে সম্পূর্ণ তিব্বতে দালাই লামার শাসনাধীনে আসে । অর্থাৎ ১৬৪০ খৃস্টাব্দ থেকে সম্পূর্ণ তিব্বত দালাই লামাকে প্রধান লামা ও শাসক বলে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় ন

বিখ্যাত গান্‌দেন গুম্ফা এই সোং-কা-পা লামারই প্রতিষ্ঠিত। লাসায় সোং-কা-পা'র স্থান অতি উচ্চে অর্থাৎ দালাই লামারই পূর্ব জন্ম। সোং-কা-পা’ই বার বার দালাই লামার রূপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। গেলুক্-পা ও শাক্য এই দুই প্রধান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যেও তন্ত্রের প্রভাব খুব বেশী। তন্ত্রকে বাদ দিয়ে আজ তিব্বতের লামা পুরোহিতদের কল্পনা করা যায় না ।

পঞ্চাশ শতাব্দির পর থেকে তিব্বতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কোন কোন সময় একটা মঠ বা মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সম্প্রদায়। তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য উরগীয়েন-পা, গান্‌দেন-পা, কারগীউড়-পা, কারমা-পা, দেকুং-পা, দুক্-পা, তন্ত্র মার্গ, শূন্য মার্গ, পং-পা। বাইরে থেকে তাদের এই ভেদ বোঝা অসম্ভব। যেটা চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে এদের চাদরের বা টুপীর রং। তাই তাদের বলা হয় হলদে চাদর সম্প্রদায় ও লাল চাদর সম্প্রদায়। হলদে চাদর সম্প্রদায় হচ্ছে গেলুক্‌-পা বা দালাই লামার লোক আর লাল চাদর হচ্ছে শাক্য মুনি বা পাঞ্চেন লামার লোক। দালাই লামার সম্প্রদায়ভুক্ত লামারা সাধারণতঃ চিরকুমার ব্রত গ্রহণ করে থাকেন আর পাঞ্চেন লামা সম্প্রদায়ের লামারা বিবাহ করতে পারেন।

বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান, হীনযান, তিব্বতে এসে চৈনিক বৌদ্ধশাস্ত্র ও তন্ত্র-শাস্ত্রের সাথে মিশে বহুযানে পরিণত হয়েছে। আমার মতো এক অজ্ঞান তীর্থযাত্রীর পক্ষে তার বিচার বা বিশ্লেষণ করা মুশকিল। তাই চোখের সামনে যা দেখছি বা শুনছি তাই লিখে যাচ্ছি আমার ডায়েরীর পাতায়। পথের দুধারের সব ফুল কুড়িয়েই ভর্তি করলাম আমার ডালি, পণ্ডিত ব্যক্তিদের উপর ছেড়ে দিলাম তোড়া সাজাবার ভার ।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%