কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো

বিমল দে

কুকুরদের ডাক শুনে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক । প্রথমে গুরুজীকে তিনি চিনতে পারলেন না, কারণ লামার চোখের দৃষ্টি কমে এসেছে। আগে তিনি ছিলেন সহকারী লামা, তারপর প্রধান লামা দু'বছর যাবৎ স্থান ত্যাগ করে চলে যাওয়ার দরুন লামা শেরিং জোং তার স্থান পেয়েছেন ৷

গুম্ফাটা ছোট, বিরাট উঁচু মাটির দেয়াল আর তারই উপরে সামান্য কাঠের কাজ করা ছাদ, দেখেই মনে হয় যে এটা অনেক দিনের পুরোনো। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। একটা বিরাট হলঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় কথাবার্তা শুরু হল। এই গুম্ফায় এখন মাত্র তিনজন লামা থাকেন। তাঁরা গরীব, কোন রকমে দিন চলে যায় । আগে সামাদার জমিদার এখানকার দেখাশুনা করতেন, কিন্তু আজকাল তিনি তার পরিবার নিয়ে সিকিমে চলে গেছেন। এখন অন্যলোক, সে এসব দিকে মন দেয় না। লামা শেরিং জোং তাই খুব আফসোস করে বললেন তিনি এত লোককে কিছুতেই রাখতে পারবেন না। গুরুজী তাকে বুঝিয়ে বললেন যে, আমরা সেখানে তাঁর খরচায় থাকতে চাই না, আমাদের নিজেদের খাওয়ার জিনিসপত্র সব আছে আমরা চাই একটু আশ্রয় আর আগুন, কাঠের দামও আমরা দিতে প্রস্তুত। আর প্রণামী হিসেবে আমরা পাঁচ টাকা দেবো। তিনি একটু ইতস্তত করলেন বটে কিন্তু শেষে রাজি হয়ে গেলেন। লামা শেরিং জোং মনে হয় হাসতে জানেন না, অথবা কোন কারণে সেটা উবে গেছে। আমরা একটা হলঘরে বসলাম।

বেলা যত গড়াতে লাগলো শীতের প্রকোপ ততই বাড়তে লাগলো। এখানকার শীতটা খুবই কষ্টদায়ক। তাপমাত্রা যদি এরকমভাবে কমতে থাকে তাহলে রাত্রিবেলা আমাদের থাকা মুশকিল। গুরুজী তাই সময় থাকতেই লামা শেরিং জোং-কে জিজ্ঞাসা করলেন, যদি তিনি একটা ঘর দিতে পারেন তাহলে আমাদের খুবই ভালো হয়। শেরিংজী মনে হয় এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি রাজি হলেন—তবে তারজন্য আরও তিন টাকা বেশী দিতে হবে। আমরা রাজি হয়ে গেলাম ।

মঠের একটা পুরোনো মন্দিরে আমরা উঠে এলাম। মন্দিরের ঘিয়ের প্রদীপটি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। সেখানে বহু দিনের পুরোনো কয়েকটা বেদীও পাওয়া গেল। শেরিংজী আমাদের বুঝিয়ে দিলেন এ মন্দিরটি খুব পবিত্র। তেরো বছর আগে এটাই ছিল মূল মন্দির তারপর নতুন ঘর হওয়ার পর ভগবান বুদ্ধের মূর্তিটা সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সবই যেমন ছিল তেমনি আছে। সেখানে আমরা থাকবো আর মঠের রান্না ঘরে রান্না করবো। সেটাই ঠিক হল ।

আমার কাছে মন্দিরটা খুব ভালো লাগলো। প্রদীপের অল্প আলোকে প্রত্যেকটা স্টাচুকে মনে হল প্রাণবন্ত। দেয়াল ও থামের সাথে ঝুলানো রয়েছে অসংখ্য তাংখা অর্থাৎ কাপড়ের উপর নিখুঁত শিল্প। অসংখ্য মণ্ডলা ও দেব-দেবীতে ভর্তি। আরও আলো হলে আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেগুলোকে দেখতাম। যাই হোক আপাতত যা দেখছি তাতেই আমি খুশী। ঘরের পরিবেশটা পবিত্র কি না আমার দ্বারা যাচাই করা অসম্ভব। তবে বলতেই হবে যে এর মধ্যে একটা রহস্য ও রোমাঞ্চের ভাব রয়েছে। ঘরের বড় মূর্তিটির দিকে বার বার চোখ পড়তে লাগল, তিব্বতী দেবতা যুবযুং-এর মূর্তি। হিন্দুদের মতে বলতে হবে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন দৃশ্য। পুরুষের বিরাটত্বের সাথে প্রকৃতির অহং একাত্ম হয়ে আছে। এই মূর্তিটার মধ্যে শান্তভাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। শিবের রুদ্ররূপী ধ্বংসের বিকট রূপ, প্রকৃতির সাথে লিঙ্গাবদ্ধাবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। হিমালয়ের প্রত্যেকটি গুম্ফাতেই এই চিত্র বা স্ট্যাচু আমি লক্ষ্য করেছি, মৌনীবাবা হয়েছি বলে সব সময় জিজ্ঞাসাও করতে পারিনি। কারণ আমি কথা বলি সাধারণত রাতে অথবা নির্জনে, তাই এবার সুযোগ এসেছে।

খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই একে-একে শুতে চলে গেলেন আর ঠিক সেই সময়ে গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করলাম—এই মূর্তিটার বিষয় আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন কি ? এই ধরনের প্রশ্নে তিনি কোনদিনই আমাকে নিরাশ করেননি বরঞ্চ উৎসাহ দিয়ে তার সহজ উত্তর দিয়েছেন ৷ তিনি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন--

এই মূর্তিটার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিব ও শক্তির মিলনকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা। আমাদের ব্যক্তি-আত্মা হচ্ছে প্রকৃতির প্রতীক আর বিশ্বাত্মা হচ্ছে শিবের প্রতীক। তবে সেটা হচ্ছে হিন্দুমতে ব্যাখ্যা, তিব্বত বৌদ্ধ তান্ত্রিকের দেশ। এখানকার বৌদ্ধ ধর্মের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তন্ত্রের গূঢ় রহস্য। সে তত্ত্বকে বুঝতে হলে অনেক সাধনা করতে হয়। ভালোভাবে চেয়ে দ্যাখ, পুরুষ মূর্তিটার সাথে নারী মূর্তিটা কণ্ঠলগ্ন হয়ে লিঙ্গাবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বীজ মন্ত্রের সাহায্য নিয়ে আমরা যখন সেই মহাশক্তির সাথে এরকমভাবে একদেহে মিশে যাবো তখনই হবে আমাদের মুক্তি। সাধনার শেষ ধাপ। যুবযুম্ বা পিতামাতার মিলনে সৃষ্টি হয়েছে এই জগৎ, কাজেই এই জগৎকে জানতে হলে আগে জানতে হবে সেই পরমপিতা ও পরমমাতার মিলন রহস্য, সে গুহ্যসূত্র; অবলোকিতেশ্বরের সেই সৃষ্টিরহস্য অতি কঠিন পথ। অনেককাল ধরে এই মূর্তির উপর ধ্যান করলে সেই রহস্যের আলো জানা যায়। তিব্বতী ভাষায় একে বলে 'জিগ্‌-তেন্-বাং-ফিউগ্ গ্াগ্-গ্রব’–এই এতগুলো শব্দ মিলে হয়েছে একটা নাম সেটাই আবার হয়েছে ইষ্টমন্ত্র বা বীজমন্ত্র। এই মূর্তিটারই ভয়ংকর রূপ বজ্রহুংকার মুদ্রা। এই মুদ্রার উপর ধ্যান করলে প্রজ্ঞাদেবীর দর্শন পাওয়া যায়। পদ্মের উপর প্রতিষ্ঠিত এই মূর্তির ধ্যানে জাগতিক ভয় সম্পূর্ণরূপে দূর হয়।

গুরুজী কিছুক্ষণ থামলেন, একই সঙ্গে এর আরও বেশী ব্যাখ্যা শোনালে আমি ধরে রাখতে পারবো না, সে কথা ভেবে আমিও আর গুরুজীকে কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না।

আমি অবাক হয়ে সেই রহস্যময় তান্ত্রিক দেব-দেবীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। গুরুজীই নীরবতা ভঙ্গ করলেন। তিনি বললেন—চুপচাপ তাকিয়ে না থেকে মনে মনে মণিমন্ত্র জপ করতে থাক। এমন এক সময় আসবে যখন দেখবে মন্ত্র আর দেবতা এক হয়ে গেছে। চেষ্টা কর, ধৈর্য ধরে অভ্যাস করতে হবে। তিনি এই কথা বলে কম্বলের ভেতর আশ্রয় নিলেন। আমি বসে রইলাম আরও কিছুক্ষণ ।

মধ্য হিমালয়ের সেই নিঃশব্দ রাত্রিতে আমি প্রজ্ঞাদেবীর আরাধনায় মগ্ন হলাম ৷

গীয়াৎসের পথে

পরেরদিন আবার রাস্তা। সামাদার আগে যে বড় শহরটা দেখেছি সেটা ছিল দোসেন তার কাছাকাছি আমরা রাতের বেলা একটা সুন্দর হ্রদ দেখেছিলাম, সামাদার লামা শেরিং জোং আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আমরা সেখানে আমাদের তীর্থযাত্রার জন্য প্রার্থনা করেছিলাম কি না ? রাতের প্রচণ্ড শীতের জন্য গুরুজী সেখানে আমাদের দাঁড়াতে দেননি। শেরিং জোং বিশেষভাবে উপদেশ দিয়ে বললেন রাস্তায় নেমেই আমরা যেন সেই হ্রদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি। ভারতবর্ষ হতে যারা এদিকে আসে তারা সবাই সেই হ্রদের ধারের মন্দিরে পূজা দেয়। হ্রদের নাম রাম-হ্রদ, অনেকে সেটাকে রাম সরোবরও বলে থাকে কারণ সেটা নাকি মানস সরোবরের মতোই পবিত্র ও সুন্দর। কাজেই বৃদ্ধ লামা শেরিং জোং-এর উপদেশানুযায়ী আমরা রাস্তায় নেমেই প্রার্থনা করলাম। গুরুজী আমাদের বললেন যে তাঁরও ইচ্ছা ছিল সেখানে এক রাত থাকবার, কিন্তু অনেকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন তার কাছাকাছি নাকি হাদের তাঁবু আছে তীর্থযাত্রীদের তারা ভালো নজরে দেখে না। তাই তিনি বাধ্য হয়েছেন সে পথটা সূর্যাস্তের পর পাড়ি দিতে ।

তাংলার পর থেকেই আমাদের পথ সহজ হয়ে এসেছে, তবে পার্বত্য পথ, সহজ বলা মানে কলকাতার লোকদের কাছে খুবই কঠিন। আমরা এখন বিশাল হিমালয়ের ঠিক ছাদের উপর দিয়ে চলছি। উচ্চতা মনে হয় সব সময়ই এগারো-বারো হাজার ফিটের উপর, তারই মধ্যে কোন কোন সময় নামছি, কোন কোন সময় উঠছি।

গ্যাংটক ছাড়ার পর থেকে আমরা উঠেছিলাম নাথুলা উচ্চতায়, সেখানে পেয়েছি কঠিন পাথরের বাধা, তারপর চুম্বি উপত্যকায় পেয়েছি তিস্তা ভ্যালীর মতো সুন্দর বর্ণ । তারপর সেখান থেকেই দেখছি বরফে ঢাকা পর্বত চূড়ার সৌন্দর্য। তার কয়েকদিন পর আবার উঠেছি উপরে, পার হয়েছি তাংলার পর্বত কন্দর, ১৫,৬০০ ফিটের উচ্চতায়ও আমাদের সকলের মন ও দেহ অটুট ছিল। আমাদের এ দলটি যদি তীর্থযাত্রী না হয়ে অভিযাত্রী দল হতো তাহলে বিরাট অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীতে ভরে যেত আমার ডায়েরীর পাতা। তীর্থযাত্রীদের সে অহংকার শোভা পায় না। এ বিরাট হিমালয়ের কাছে আমরা অতি ক্ষুদ্র, এ' বিরাট শক্তির কাছে আমরা তুচ্ছ, এ অসীম মহিমান্বিত তুষার শোভিত সৌন্দর্যের কাছে আমাদের অহংকার করা পাপ। তীর্থযাত্রীর প্রত্যেকটি পদক্ষেপে রয়েছে ভক্তি, নম্রতা আর আত্মসমর্পণের ভাব। পৃথই তীর্থযাত্রীদের সাধনা—এ সাধনায় আছে বৈচিত্র্য আর তথাগতের প্রতি আত্মসমর্পণের ব্রত। জাগতিক পথ হয়ে যাবে সেখান থেকেই শুরু হবে আধ্যাত্মিক পথ।

যেখানে শেষ দু-তিন দিন যাবৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক বল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠাণ্ডাটা এখন অনেক সহ্য হয়ে এসেছে। উচ্চতার জন্য অনেকের হাঁপানির মতো হয়েছিল, আর যাদের কাশি হয়েছিল সেটাও অনেকটা কম। তুনার পর থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য অনবদ্য, চারদিকে শুধু বরফের পাহাড়। বরফের সাদা পর্বতশৃঙ্গগুলো আমাদের সঙ্গে যেন রঙের খেলায় মত্ত হয়েছে। আমাদের সামনে এখন আর হিমালয়ের বাধা নেই, তাকে পার হয়ে তারই অন্যদিকে এসে পৌঁছেছি। এখন আমাদের দেশে বসন্তোৎসবের আয়োজন চলছে আর এখানে মনে হয় চির তুষারের অনন্ত উৎসব চলছে। বন জঙ্গল এখানে স্বপ্নের কথা। বড় গাছ এত ঠাণ্ডায় হয় না। পুরো গরম যখন পড়বে তখন চারদিক শুধু ঘাসে ঢেকে যাবে। এখানকার ঠাণ্ডা খুব কনকনে আর শুকনো, দিনে সূর্যকিরণে তাপমাত্রা বেড়ে ওঠে আর রাত্রিবেলা যায় কমে। সূর্যাস্তের সময় এ রাজ্যটা সম্পূর্ণ যায় পাল্টে। বরফের রঙগুলো আস্তে আস্তে রুপোলী হতে থাকে তারপর শুরু হয় আলো আঁধারের লুকোচুরি খেলা। এ পৃথিবীর উপর নেমে আসে রহস্যময় তন্ত্র-জগৎ।

আমারা আবার ধরেছি উত্তরের পথ, এ ছাড়া অন্য পথ নেই। রাস্তায় দুপুরবেলা আমরা থামলাম। জ্বালানী কাঠ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে সামাদার থেকে কিছু বার্লি ও যবের ছাতু কিনেছি। একটা পাথুরে মাটির বাড়ীর সামনে এসে থামলাম। আমাদের দেখেই বাড়ীর চারপাশ থেকে সবাই ছুটে এল,আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে জিভ বার করে নমস্কার জানালো। তাদের মধ্যে যুবক-যুবতী ও বয়স্ক লোকজনও এসে উপস্থিত হল। আমাদের পরিচয় দিতেই তাদের মধ্যে অনেকে গড় হয়ে প্রণাম করল। আমরা ছাতু ভেজাবার জন্য কিছু গরম জল চাইলাম। তারা বিনা দ্বিধায় গরম জলের জন্য বন্দোবস্ত করতে চলে গেল। এক একটি পরিবার পাঁচ ছ'জনের জন্য গরম জল আনলেই আমাদের সকলের হয়ে যাবে। শিশুরা আমাদের সামনেই বসে রইল। পৃথিবীর এই ছাদে প্রকৃতির কোলে এই শিশুদের দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তাদের চোখে দেখছি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার জ্যোতি, মুখে সরল ও পবিত্রভাব। এখানকার লোকদের মুখেও সেই পবিত্রভাবটা কেউ গোপন করতে পারবে না। এই নিষ্কলঙ্ক স্বর্গভূমিতে এখনও মনে হয় পাপের হাওয়া লাগেনি। হিমালয়ের এই উঁচু বেড়া ডিঙিয়ে মনে হয় পাপ এখানে প্রবেশ করতে পারে না। জীবনযাত্রা এদের যে রকমই হোক না কেন, পোশাকে এরা যতই ভিখিরি হোক না কেন, এদের মধ্যেই আমি দেখতে পাচ্ছি সত্য-শিব ও সুন্দরের প্রকাশ। এদের মতো এত মনখোলা হাসি বোধহয় জগতের আর কোন জাতিই হাসতে পারে না।

মনে হয় আর যদি আমরা নাও এগুতে পারি তাহলে ক্ষতি নেই। এ পর্যন্ত আসাটাই আমাদের একটা বিরাট লাভ ।

গরম জলে ছাতু ভিজিয়ে তাতে নুন দিয়ে আমরা শিশু ও গ্রামবাসীদের সাথে তা

ভাগাভাগি করে খেলাম। এতগুলো সাধুদের সাথে একসাথে বসে খেয়ে গ্রামবাসীরাও খুব আনন্দ পেল। তাদের ভাব দেখে মনে হল, যেন তারা স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করছে। তারপর আবার পথ।

সামাদার পর থেকেই আমরা পেয়েছি নীয়াং নদী, আশপাশের বরফ গলে গলে নালার মতো এসে পড়েছে এই নদীতে, খুব ছোট পাহাড়ি খরস্রোতা। তার কলকল ধ্বনি আমাদের চলার মধ্যে যোগাচ্ছে প্রাণ। মোটেই একঘেয়ে লাগছে না। এই নদীটার অনুসারেই এই উপত্যকার নাম হয়েছে নীয়াংচু। এই নদীর ধার ধরে সমস্ত জীবন হাঁটলেও মনে হয় কেউ ক্লান্তি বোধ করবে না। আমাদের চলায় এখন ছন্দ এসেছে। মনটাও আজকাল খুব হালকা লাগছে। ভারত-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি প্রচুর সৈন্য মোতায়েন দেখে আমাদের মনটাও ভারী হয়ে উঠেছিল, সীমান্তের আবহাওয়াটাও ছিল খুব ভারাক্রান্ত। এখন আমাদের সেই ভয়টাও নেই ৷

সেইদিন রাত্রিবেলা আমরা ছোট একটা বস্তিবাড়ীতে রাত কাটালাম। পরের দিন দুপুরবেলা আমরা পৌছলাম খাংমা নামে একটা বর্ধিষ্ণু গ্রামে।

খাংমা গ্রামে ঢুকতেই সেখানকার এক গ্রামীণ পুলিশ খাম্‌পা শ্রেণীর, আমাদের দিকে এগিয়ে এল। আমাদের প্রণাম করে বলল—আপনারা গ্যাংটক থেকে আসছেন ? আপনারা নেপালী তীর্থযাত্রী ?

হ্যাঁ বলতেই হবে তা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমাদের মনে সংশয় ছিল যে, সে হয়তো আমাদের হান্-চৌকিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাবে। সে বলল—তাহলে আমার সাথে আসনু। আধঘণ্টা পর তার সাথে একটা ছোট বাংলোতে এসে হাজির হলাম। বাংলোর বারান্দায় একজন লামাগোছের তিব্বতী ভদ্রলোক আমাদের হাসিমুখে আপ্যায়ন জানালেন। তার হাসিমুখ দেখে আমাদের সংশয় দূর হল। আমাদের কাছে পেয়েই ভদ্রলোক গড় হয়ে প্রণাম করলেন, তার দেখাদেখি অন্যান্য সকলেও। গুরুজী ও আমরা সকলে তাদের আশীর্বাদ করলাম ।

..ভদ্রলোক এবার অতি বিনীতভাবে নিবেদন করলেন—আমাদের এই ছোট্ট গ্রামে স্বাগতম্ জানাই। আমরা গ্যাংটক থেকে আপনাদের আসার সংবাদ টেলিগ্রাম মারফৎ পাই। পবিত্র সিকিমের মহারাজ আপনাদের যত্ন নেবার জন্য আমাদের বলেছেন। আমার ভাই সিকিমের পবিত্র মহারাজের ওখানে কাজ করে, সে-ই সংবাদটা পাঠিয়েছে।

আমাদের কাছে এটা একটা বিরাট আনন্দ সংবাদ, কিন্তু লামাদের আনন্দে লাফিয়ে উঠলে চলবে না, খুব সংযতভাবে সংবাদটাকে আমরা গ্রহণ করলাম তারপর অতি বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়িয়ে ও হাত তুলে তার সেই ভাইয়ের প্রতি আমরা আশীর্বাদ বাণী উচ্চারণ করলাম ।

ভদ্রলোকের নাম সোরন থাপে। বাংলোটা ছিল ভারতের সম্পত্তি। গ্যাংটক থেকে গীয়াৎসের পথে ভারতীয় ব্যবসা ও তিব্বতীদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য এই ধরনের বহু বাংলো আছে। আজকাল লোকজনদের যাতায়াত কম তাই এই বাংলোগুলো ব্যবহার করা হয় না। হানদের প্রভাবের জন্য তীর্থযাত্রীরাও বড় একটা আসতে চায় না। কাজেই এই বাংলোটা এখন গ্রামের সম্পত্তি। সোরন থাপে এই গ্রামের সর্বেসর্বা, আইন ও শৃঙ্খলা তার হাতে। প্রায় চারশ'র মতো জনবসতি নিয়ে এই গ্রামটা গড়ে উঠেছে। গরমের সময় বার্লির চাষ হয়, আর প্রচুর ভেড়াও আছে। তার থেকে উৎকৃষ্ট উল তৈরী হয়। তিনি আমাদের যতদিন খুশী থাকতে বললেন ।

বাংলোটা খারাপ নয়, দেখেই মনে হয় যে পুরোনো ব্রিটিশ আমলের তৈরী। এক কালে বেড়া, বাগান সব কিছুই ছিল, আজকাল স্থানীয় ছোট ছেলেমেয়েদের খেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে। গরম কালে মনে হয় ভেড়ার আস্তানা। ভদ্রলোক অনেক কষ্টে পুরোনো তালা খুলে আমাদের ঘরগুলো দেখিয়ে দিলেন। আমাদের কাছে এ অতি সুন্দর ব্যবস্থা। তিব্বতে ঢোকার পরে এই প্রথম আমরা পাচ্ছি অতিথি মর্যাদা। খাট ও জাজিমগুলো দেখে মনে হয় পাঁচ বছরের মধ্যে কোন লোকের পা পড়েনি। শীতে ধুলোগুলো জমে আঠার মতো আটকে আছে। স্থানীয় পাথর ও সিমেন্টের তৈরী বাংলোটা সত্যি ভালো। আমরা সেখানে আমাদের মালপত্র নামিয়ে স্থির হয়ে বসলাম ।

সোরন থাপে থাকেন একটু দূরে। তিনি আমাদের বার বার আশ্বাস দিয়ে বললেন—এখানে আমাদের কোন অসুবিধা হবে না, গ্রামের লোকেরা সব সময় আমাদের সঙ্গে থাকবে সাহায্য করবার জন্য। আরও আনন্দের বিষয় তিনি ঘোষণা করলেন যে, আমাদের রান্না করতে হবে না, গ্রামের লোকেরাই ভাগাভাগি করে আমাদের জন্য খাবার তৈরী করে আনবেন ।

গুরুজী বললেন--এখানে কোন কু-লক্ষণ দেখছি না কাজেই ইচ্ছে করলে তুই কথা বলতে পারিস। ইতিমধ্যে আমি তিব্বতীদের কিছু কিছু শব্দ আয়ত্তে এনেছি তবে তাকে ব্যবহার করার সুযোগ পাইনি। অনুমতি যখন পেয়েছি তখন চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? আমি একাই বাংলো ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তাটাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই গ্রামটা। ছোট্ট গ্রাম কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে একটা পবিত্রভাব। পাথুরে-মাটি দিয়ে তৈরী সব বাড়ী, কোন বেড়া নেই। বাড়ীগুলো সব যেন ঠাসাঠাসি হয়ে আছে, চলতে চলতে রাস্তা হয়েছে, আর দু'পাশে পাথর বসিয়ে সেটাকে রক্ষা করা হয়েছে। বাড়ীগুলোর মধ্যে কাঠের বারান্দা নেই, মনে হয় এ অঞ্চলে কাঠ খুবই দুষ্প্রাপ্য। বাড়ীর ভেতর থেকে সবাই বেরিয়ে এসে আমাকে একে-একে প্রণাম করে যেতে লাগলো ।

গ্রামে এখন সবাই জেনে গেছে আমাদের কথা, শিশু থেকে আরম্ভ করে যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই এসে আমাকে স্বাগত জানাতে লাগলো। অনেকে অনেক প্রশ্নও করতে লাগলো, বিশেষ করে যুবক সম্প্রদায়; কিন্তু ভাষার অভাবে উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু হাসিমুখে হাত তুলে তাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে এগুতে লাগলাম । কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামে আমি পরিচিত হয়ে গেলাম ।

বিকেলের দিকে গ্রামবাসীরা এল আমাদের সাথে দেখা করতে। এদের মধ্যে অনেকেই সিকিম দেখেছে। বিকালবেলা বারান্দায় আমরা কম্বল পেতে বসেছি আর আমাদেরই চারপাশে বসেছে গ্রামবাসীরা, সমবেতভাবে আমরা প্রার্থনা শুরু করলাম-

“নমো তস ভগবতো অরহতো সমাসমৃদ্ধ, অরহন্তং সমাসম্বুদ্ধং বিজ্জীচরণ সম্পন্নং সুগত লোকবিদুং অনুত্তমং পুরীসধম্মসারথীং সখারং দেবমনুস্সানাং শিরসা নমামি । ”

আমরা প্রার্থনা করলাম প্রথমে পালিভাষায়, তারপর তিব্বতী ভাষায় । তিব্বতীভাষায় প্রার্থনা আমার খুব ভাল লাগে যদিও তার অর্থ বিন্দুবিসর্গও বুঝি না কিন্তু থেমে থেমে তারা যখন শব্দগুলো উচ্চারণ করে, তখন প্রার্থনাটা খুব শ্রুতি মধুর লাগে । তিব্বতীরা মন্ত্র উচ্চারণ করার সময় প্রত্যেকটি অক্ষর আলাদা আলাদা উচ্চারণ করে, তাকে সমবেতভাবে অনুসরণ করতে হয়। প্রত্যেকটা অক্ষর মনে হয় নাভিদেশ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। মণি-মন্ত্র গ্রামের সকলেই জানে আর কিছু কিছু প্রার্থনাও। প্রায় আধঘণ্টা পর আমাদের প্রার্থনা শেষ হল। সূর্যদেব তখন পশ্চিমদিকে হেলে পড়েছেন । ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে লাগলো, শীতের প্রকোপ বাড়তে লাগলো। বাংলোর বারান্দায় একে-একে সকলে ঠাসাঠাসি করে বসতে লাগলো। বাংলোর সেই ছোট্ট বারান্দায় মনে হল প্রায় আড়াইশ লোক ধরে গেল। তারই মধ্যে রয়েছে শিশু বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা। ঘরের কাজ সেরে মায়েরাও এসে হাজির হয়েছে।

আমাদের কোন কর্মসূচী নেই, আর সাধুপুরুষ দর্শনেই তাদের আনন্দ। সূর্যাস্তের সাথে সাথেই এখানে অন্ধকার নেমে এল। হঠাৎ নজরে পড়ল, তিব্বতীদের মধ্যে অনেকেই লোহার কড়াইতে করে কাঠকয়লার আগুন নিয়ে এসেছে। এরকম অনেকগুলো কড়াই পর পর সেখানে জড়ো হল। সেই আগুনকে কেন্দ্র করে তারা ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে আগুন পোয়াতে লাগলো। এক নজরে দেখলে মনে হয় গ্রামবাসীরা এখানে আগুন পোয়াতেই এসেছে, আমরা উপলক্ষ মাত্র। তাদের মধ্যেই গল্পগুজব শুরু হয়ে গেল, সবাই যেন একই পরিবারভুক্ত। তারই ফাঁকে এক-একজন মাঝে মাঝে উঠে এসে গুরুজীকে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করতে লাগলো। প্রশ্নগুলো খুবই সরল সহজ।

—আপনাদের এখানে আসতে কতদিন লাগলো,

—আপনারা কি চেন্-রে-জিকে দর্শন করতে যাচ্ছেন,

—আমাদের এখানে কতদিন থাকবেন ?—এই ধরনের আরও অনেক প্রশ্ন ।

মা-বোনদের প্রশ্নগুলো একটু আলাদা ধরনের, যেমন—আমার আর কটা ছেলে হবে, মেয়ের বিয়েটা ভালোভাবে হবে কি না, স্বামীর অসুখটা সারবে কি না, ইত্যাদি ৷

আমাদের সাথে কিছু চাল ছিল। রাত্রি যখন আরও ঘনিয়ে এল তখন গুরুজী তাদের সবাইকে একে-একে ডেকে প্রত্যেককে দু'তিনটে করে প্রসাদের মত চাল বিতরণ করতে লাগলেন, গুরুজীর প্রসাদ পেয়ে তারাও সন্তুষ্ট হল। এবার তাদের ঘরে ফিরে যাবার পালা। এমন সময় গুরুজীর কাছে এসে সোরন থাপে ফিফিস্ করে তাঁর কানে কানে কি যেন বলল—গুরুজী ওর কথা শুনে একটু মৃদু হাসলেন, আমার দিকে তাকিয়ে তাঁর কাছে আমাকে ডেকে বললেন,

গ্রামবাসীরা এত ছোট ভারতীয় তীর্থযাত্রী দেখেনি। এদের কাছে তুমি খুব ভাগ্যবান ও পুণ্যাত্মা। তোমার কাছ থেকে এরা কিছু শুনতে চায়, এরা জানে যে তুমি ভারতীয় ।

- গুরুজীর দিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম— যা খুশী । -বেশ! কিন্তু কি বলবো বলুন ?

গুরুজীর আশ্বাস পেয়ে আমি তাঁকে বললাম, ঠিক আছে আমি হিন্দীতে বলছি আপনি তার তর্জমা করে দিন তিব্বতী ভাষায়। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম,

—আমার প্রিয় ভাইবোনেরা, মা আর পিতৃতুল্য পূজনীয় ব্যক্তিগণ! আপনাদের আন্তরিক আপ্যায়নে আমরা খুবই সন্তুষ্ট হয়েছি। ভারত থেকে অনেক দূরে এসে খুঁজে পেয়েছি আমার ভাই-বোনদের। আমি আপনাদের ভাষা জানি না বলে খুবই দুঃখিত, কিন্তু পরের বার যখন আসবো তখন নিশ্চয়ই তিব্বতী ভাষা শিখে আসবো। আমার গুরুজীর কৃপায় এখানে এসেছি। এমন সুন্দর দেশ আমি আর দেখিনি। মহাতীর্থের পথে আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে আমার যাত্রা সার্থক। আপনাদের সহজ ও সরল স্বভাবসুলভ আচরণে মনে হয় আপনারা কৈলাসের শিব-চরিত্রের প্রতীক স্বরূপ। আমি আপনাদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করি—

‘ওম্ ত্রয়ম্বকম্ ইজামহে সুগন্ধি পুষ্টিবর্ধনং

উরভরুকমিভ বন্ধনন্ মৃত্যুরমুক্ষি মামৃতৎ, ওম্ শান্তি, শান্তি, শাস্তি ৷ প্রার্থনা শেষে আমি থামলাম। তারপর সকলে একে-একে আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

গ্রামবাসীদের কাছ থেকে সেদিন রাত্রিবেলা আমরা ভাত ও ডাল পেলাম। অনেকদিন পর তা পেয়ে আমরা সকলেই খুশী। আমরা তিব্বতের যতগুলি শহর ও গ্রাম এ পর্যন্ত পেয়েছি তাতে কিন্তু ইলেকট্রিক কোথাও চোখে পড়েনি। রাস্তার দুধারে দেখেছি শুধু টেলিগ্রাফিক পোস্ট। তিব্বতের লোকেরা আজ পর্যন্ত বিদ্যুতের আলো না পেলেও তাদের আলোর অভাব নেই—ঘিয়ের প্রদীপ অথবা হ্যারিকেনেই এখানকার কাজ চলে। তিব্বতের রাত বড় নিঃশব্দ, সম্পূর্ণ জগৎটাই যেন ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবার জন্য মনে হয় একটা পেঁচাও সেখানে নেই।

গ্রামবাসীদের অনুরোধে পরেরদিনও আমাদের থাকতে হল। আমাদের নিয়েই তাদের আনন্দ, সারাদিন ধরে গ্রামবাসীরা আমাদের চারদিকে ঘোরাফেরা করে। আমাদের আর একটা কাজ হচ্ছে তাদের বাড়ীতে বাড়ীতে যাওয়া, লামাদের বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া একটা পুণ্য কাজ, আর বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে লামাকে খাওয়ানো তো একটা বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। সেদিন বিকেলে আমিও এরকম একটা আমন্ত্রণ পেয়ে গেলাম। সোরণ থাপে নিয়ে গেছে গুরুজীকে, অন্যান্য লামারাও গেছেন বিভিন্ন গ্রামবাসীদের সাথে। আমি আমন্ত্রিত হলাম দোরজের বাড়ীতে। দোরজে ভদ্রলোকের বাড়ীটা খুব কাছে। আমাদের দেশের মাটির ঘরের মতো, জানালা দরজাগুলো খুব ছোট ছোট, চারটে ঘর, তারমধ্যে দুটো ঘরের কোন জানালা নেই। তাদের বড় ঘরে এসে আমি বসলাম। দোরজের ছোট পরিবার। ভদ্রলোকের বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি, তার স্ত্রীই মনে হয় তার থেকেও বেশী সমঝদার। তিব্বতে দেখেছি মেয়েদের প্রভাব খুব বেশী, বিশেষ করে বিবাহিতা মহিলারাই মনে হয় সংসারের মালিক। একাধারে তারা ঘরে কাজ করছে, আর স্বামী, পুত্র-কন্যার দেখাশুনা করছে, অন্যদিকে জমিতে গিয়ে পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করছে। তিব্বতী মেয়েদের কর্মতৎপরতার প্রশংসা করতেই হবে ।

দোরজের ঘরে বিরাট একটা চটের গদি পাতা। গদীর ভেতরে মনে হয় শুকনো খড় ঠাসা, তারই উপরে ভদ্রলোক আমাকে বসালেন। শ্রীমতী দোরজে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলেন, তিনি জানেন যে আমি তাদের ভাষা জানি না, তাই আমাকে হাত ধরে গদীর থেকে তুলে দিলেন। তারপর দড়িতে ঝোলানো তার অতি ময়লা সেমিজটা নিয়ে গদীতে পেতে আমাকে সসম্মানে সেই আসনে হাসিমুখে আবার বসিয়ে দিলেন। তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে মনে হয় ভৎসনার সুরে বললেন—এই ময়লা গদীতে সাধুজনকে বসতে দিতে আছে? যদিও আমার কাছে এই পরিবর্তনটা বিরাট কিছু নয় কিন্তু আমার প্রতি তার নিষ্ঠা ও যত্ন দেখে আমি হেসে তাকে আশীর্বাদ করলাম—মা, ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।

শোবার ঘরের পাশেই ছোট্ট একটা বারান্দা, আমাদের বসিয়ে রেখে শ্রীমতী দোরজে সেখানে গেলেন। ঘরের নমুনা দেখেই বুঝলাম যে সেটি রান্না ঘর। রান্নাঘরের কোন দরজা বা জানালা নেই। তিনি উনোন ধরাতেই কাঠের ধোঁয়ায় সম্পূর্ণ ঘরটা ভর্তি হয়ে গেল। কয়েক শতাব্দীর পুরানো গামলাটায় তিনি জল চাপালেন, মনে হয় অতিথি সৎকারের জন্য। আমি বসে বসে ঘরের অল্প আলোতে তা দেখতে লাগলাম। জলের মধ্যে তিনি চীনা জমাট চায়ের কিছুটা ভেঙ্গে দিলেন সেদ্ধ করতে। সাধারণ তিব্বতীরা পুরোনো চায়ের পাতাই বার বার সেদ্ধ করে খায়। আমার জন্যই মনে হয় তিনি নতুন পাতা ভেজালেন। তিব্বতী চা-এর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার সাথে মাখন মেশানো। সরু কাঠের চোঙ্গার মধ্যে গরম জলের সঙ্গে চা মিশিয়ে ঢেলে দেওয়া হয়, তারপর তার সাথে মেশানো হয় মাখন। সেই চোঙ্গার মধ্যে মাখনটাকে ঘোলের সরবতের মতো করে মেশানো হয় তাতেই লাগে সময়। শ্রীমতী দোরজে তার স্বামীকে ডাকলেন সাহায্য করার জন্য। চা করাটা সত্যি হাঙ্গামার ব্যাপার বটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ছেলেমেয়েরা এসে হাজির হল, বড় দুই মেয়ে বয়েস উনিশ কুড়ি হবে আর তারপরে ছোট ছোট আরও চারটি। দোরজে এবার তার বড় মেয়ের ওপর মাখন মেশানোর ভার দিয়ে আমার কাছে ফিরে এসে বসলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হামালদিস্তের মধ্যে মশলা বাটার মতো করে মেয়েটি চা তৈরী করতে লাগলো। মাঝে মাঝে সে তার মায়ের সঙ্গে  কথা বলছিল। প্রায় এক ঘণ্টা পর চায়ের সঙ্গে মাখনটা মিশে গেলে তাকে আবার গরম করে একটা লম্বা বাঁশের চোঙ্গায় করে ভদ্রমহিলা আমাকে দিলেন। এত কষ্টে তৈরী চা নিশ্চয় ভালো হবে। ঘরের আর কাউকে তিনি দিলেন না। সাধু-সেবাই বোধ হয় তাদের উদ্দেশ্য। আসলে আমি সাধু নই, কিন্তু সরল দোরজে পরিবার সে কথা বুঝবে না। কাজেই তাদের নিরাশ না করে, হাসিমুখে চুমুক দিলাম। চায়ের মধ্যে কি ছিল জানি না কিন্তু একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে যেতেই আমি থামলাম। আমি খুব ভালোভাবে সেই ভাবটা গোপন করে গেলাম। চায়ের ব্যাপারে তিব্বতীরা খুব সেন্টিমেন্টাল, তাদের অসন্তুষ্ট করলে আমাদের পথে কাঁটা পড়তে পারে। ঘরে কোন জানালাও নেই যে তার বাইরে ফেলে দেবো, শুধু তাই নয় এই চায়ের মধ্যে রয়েছে শ্রীমতী দোরজে ও সম্পূর্ণ পরিবারের পবিত্র ভাব। এরা গরীব যা পারে তাই দিয়ে অতিথি সেবা করেছে, এই স্বাদকে তাই খারাপ বলি কি করে, এরা হয়তো এরকমই পছন্দ করে। যুক্তি তর্ক দিয়ে নিজেকে বোঝালাম বটে কিন্তু তবুও দ্বিতীয় বার মুখে ছুঁয়েও তা ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হলাম। অন্য কোন উপায় না দেখে আমি দোরজের ছোট ছেলেকে আদর করে কাছে নিয়ে এলাম তারপর পরম স্নেহের ভাব দেখিয়ে তাকে আমার কোলে তুলে বসালাম, এইবার তার মুখের কাছে বাটিটা ধরে বললাম-খাও। আশ্চর্য! আমার এই ব্যবহারে কেউ এতটুকু টু শব্দ করল না। ছেলেটি এক চুমুক খেয়ে সেও মুখ ফেরালো, এবার তার বড় ভাইকে ডাকলাম সেও এসে এক চুমুক খেল, তারপর আর কোন অসুবিধা হল না, শেষের দিকে দোরজের মেয়েরাও আমার কাপ থেকে চা খেলো, অনেকটা প্রসাদ-প্রাপ্তির মতো হল। খালি কাপটা শ্রীমতী দোরজের হাতে দিয়ে বললাম – খুব ভালো হয়েছে।

আমার কথা শেষ হবার সাথে সাথে তিনি উঠে গিয়ে সেই কাপে আরও কিছুটা চা ঢেলে দিলেন। কি সর্বনাশ, ভালো বলেও বিপদ। এবার তিনি আমাকে হাব ভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে ছেলেমেয়েদের আর দিতে হবে না আমি নিজেই যেন তা পান করি । আমার চারদিকে সবাই বসে আছে আমার দিকে তাকিয়ে, এ যেন জোর করে চিরতার জল খাওয়ানো হচ্ছে।

উপায় নেই তাদের খুশী করতেই হবে। এবার মনে মনে ভাবলাম তিব্বতে প্রথম এই ধরনের পরিবেশে পড়েছি, এই পরিবারকে দুঃখ দেওয়াও আমার উচিত নয়। এই দেশে যখন এসেই পড়েছি কাজেই এদের খাওয়া ও সামাজিক ব্যবস্থার সাথে আমাকে খাপ খাইয়ে নিতেই হবে। অভ্যাসে সবই সয়। এইসব ভেবে আমি চা-এ চুমুক দিলাম ৷ মনে হয় নুন মেশানো হয়েছে, চিনির স্পর্শ মাত্র নেই। এই শীতে দুধকে মাখন করে রাখার সুবিধা, ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে মাখনগুলো শক্ত হয়ে থাকে। মাখনের স্বাদটাও অন্য রকম, মনে হয় ইয়াকের দুধে তা প্রস্তুত। এর আগে রাস্তায় আমরা চা খেয়েছি কিন্তু তাতে মনে হয় কিছুটা গুড় মেশানো ছিল। আমাকে যে বাঁশের তৈরী কাপটা দেওয়া হয়েছিল তাতে কম করেও আমাদের দেশের চার-পাঁচ কাপ চা ধরে যাবে। আমি চা খেয়ে হাসিমুখে তাদের আবার ধন্যবাদ দিলাম, আমার পেটে যে তার জন্য পাক খাচ্ছে সে ভাবটা অতি সাবধানে গোপন করে গেলাম ।

আমাকে ঘিরে তারা বসে রইল, আমার বলার ভাষা নেই নয়তো অনেক কথাই বলতে পারতাম কারণ সাধুবাবা তার মৌনী চেলাকে এখানে ব্রত ভাঙ্গবার আদেশ দিয়েছেন, সুযোগ আছে, অথচ উপায় নেই। দোরজে পরিবারের সবাই আমাকে ঘিরে বসে আছে; দেখে মনে হয় তার মেয়েদের বয়স আমার থেকেও বেশী, আমি তাদের সন্তানতুল্য। তাদের সকলের চোখে মুখে ফুটে রয়েছে এক আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তির ভাব। সময় কাটাবার জন্য আমি মাঝে মাঝে ছোট ছেলেটির সাথে হাসি বিনিময় করতে লাগলাম। তারপর মনে হল এরা হয়তো আমার কাছ থেকে কোন প্রার্থনা বা শ্লোক শুনতে চায়। সে কথা মনে করে আমি চোখ বুজে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে কবিগুরুর লেখা আমার অতি প্রিয় একটি কবিতা আবৃত্তি করলাম। আসলে এই কবিতার সাথে স্থান কালের কোন মিল নেই, কিছু একটা বলার জন্যই বলা মাত্র। আমার আবৃত্তির শেষে শ্রীমতী দোরজে আস্তে আস্তে ঘর থেকে সকলকে বাইরে নিয়ে গেলেন, তার স্বামীও উঠে গেলেন কিন্তু ভদ্রমহিলা আমাকে জোর করে বসিয়ে রাখলেন। তারপর ভদ্রমহিলা নিজেও বেরিয়ে গেলেন। ঘরের মধ্যে বসে রইলাম আমি ও আমার মুখোমুখি তার বড় মেয়ে যে চা তৈরী করতে সাহায্য করেছিল। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগল, কিন্তু কেন ?

মেয়েটা আরও কাছে এগিয়ে এল—আমার ঠিক মুখোমুখি হয়ে বসল। ওর মুখের সহজ আর পবিত্রভাব, তৃষারশুভ্র চোমলহারির মতোই নিষ্কলঙ্ক। আমার মধ্যের সেই পুরোনো বিমলটা যেন ধাক্কা দিতে লাগল—কেন ? মেয়েটা আমার দিকে লাজুক চোখ তুলে কি যেন বললো, আমি বুঝলাম না। তার মাথায় হাত দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে ভগবান তোমাকে রক্ষা করুন। আমি তোমার কথা কিছু বুঝছি না তুমি আমাকে ক্ষমা কর ৷

আমার মনের মৌনীবাবা তখন অন্তর্ধান হয়েছেন। আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম, ষোল বছরের একটি বাঙ্গালী ছেলে মুখোমুখি একটি তিব্বতী যুবতীর সাথে বসে! সে কি চায়, এদের রীতিনীতিই বা কি, আমারই বা কি কর্তব্য? বুকের মধ্যে রক্তপ্রবাহ যেন বেড়েই চলল। অনেকদিন যাবৎ এ অবস্থার মুখোমুখি হইনি। এ পরিবেশে কি করা উচিত, ভালো করতে গিয়ে মন্দও হতে পারে। আমার সামান্য চালে ভুল হলে সম্পূর্ণ সন্ন্যাসীর দলটাই হয়তো পড়বে বিপদে। খুব সাবধানে মনের কৌতূহল সংযত করে রাখলাম। তারপর কর্তব্য ঠিক করার জন্য চোখ বুজে জপতে লাগলাম মণি-মন্ত্র ।

আমাকে ধ্যানস্থ দেখে মেয়েটি নিজেই কথা বলতে আরম্ভ করলো। আমি বুঝি বা না বুঝি তাতে তার কিছু যায় আসে না, সে বলে যেতে লাগল তার কাহানী। মাঝে মাঝে সে চোখ তুলে আমার দিকে তাকায় তারপর আবার বিড়বিড় করে কি যেন বলতে থাকে। মনে হয় সে তার মনকে উজাড় করে তার অন্তরের কথা শোনাচ্ছে। কিন্তু কি বলছে ভগবান জানেন। তারপর ঠাকুর প্রণাম করার মতো করে আমাকে প্রণাম করলো এবং আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর সে বেরিয়ে গেল, ঘরে একে-একে তার বাবা, মা ও ভাই-বোনরা ফিরে এল। আরও কিছুক্ষণ বসে আমি উঠলাম। দোরজে পরিবারের সবাই এল আমার সাথে সাথে বাংলোয়। ভেবেছিলাম গুরুজীকে সেখানে পাবো, তাঁর কাছে সব কিছু বলে এর ব্যাখ্যাটা শোনা যাবে। বাংলোতে এসে দেখলাম তিনি নেই, অর্থাৎ তিনি তখনও ফেরেননি। কাজেই হাসিমুখে দোরজে পরিবারের সকলকে সেই রাত্রের জন্য বিদায় জানালাম। আমাদের দলের প্রত্যেকটি লামার সাথে আমার ভাষা ছাড়াই ঘনিষ্ঠতা জমে উঠেছে। তাদের নামগুলোর সাথে আমার পরিচয় হয়নি। আমি তাদের সাথে অবশ্য ইশারাতেই কাজ সারি, তাদের মধ্যে যিনি খুব চালাক-চতুর, তিনি 'অন্যান্য লামা অপেক্ষা বয়সে ছোট, গুরুজীর অবর্তমানে তিনিই ছোটখাটো দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি এগিয়ে এসে আমাকে হাসিমুখে বললেন-ভক্তরা কিছু কিছু সব্জি, চাল ও গম নিয়ে এসেছে চল দেখা যাক কি রান্না করতে পারি ।

এ অঞ্চলটা তিব্বতের উচ্চাংশ। ফারিজোং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫,০০০ (পনেরো হাজার) ফুট উঁচুতে। তুনাও প্রায় তার কাছাকাছি উচ্চতায়। খাংমা বা নিয়া নদীর উপত্যকাটা অপেক্ষাকৃত কম উঁচু কিন্তু দার্জিলিং বা গ্যাংটকের তুলনায় এ অনেক অনেক উঁচুতে। হিমালয়ের ছাদ এখানে শুধু বরফের রাজত্ব। এখানে একমাত্র ভারতের সাথে বাণিজ্য পথের দরুনই মনে হয় এই শহরগুলো গড়ে উঠেছে, নয়তো এখানে চাষ-আবাদ প্রায় অসম্ভব। সাধারণ লোকেরা গরু-ভেড়া চরিয়ে খায়, আর খুব স্বল্পস্থায়ী গরমের সময় সামান্য বার্লি ও যবের চাষ করে, তবে সে চাষ অধিকাংশ সময়ই ঘরে তোলবার আগে বরফে নষ্ট হয়ে যায়। এমতাবস্থায় লামা যখন আমাকে বলল–সজি পাওয়া গেছে তাতে আনন্দের চেয়ে বেশী আশ্চর্য হলাম। যাই হোক রান্নাঘরে গিয়ে সত্যি অবাক হলাম। সের পাঁচেক আলু, বারো তেরোটা পাহাড়ি বিট আর বার্লি। গ্রামের একজন মাখন দিয়েছে, কাজেই আমাদের পক্ষে এ এক বিশেষ দিন। লামা আমাত্য (তার নাম) আমাকে সবজিগুলো কাটতে নির্দেশ দিলেন। বার্লির খিচুড়ি করা হবে।

পরের দিন ভোরবেলা উঠেই দেখি বারান্দায় শ্রীমতী দোরজে ও তার মেয়ে কড়াইয়ের আগুনটাকে মাঝখানে রেখে বসে আছেন। মনটা অকারণেই জিজ্ঞাসু হয়ে উঠল, কি ব্যাপার এই ভোরবেলা এরা কেন? গতকাল আমার ব্যবহারে এরা কি কিছু খুঁত পেয়েছেন। যাই হোক, আমি যথারীতি কম্বলটা ভাঁজ করে, চোখ রগড়াতে রগড়াতে গুরুজীর কাছে এলাম, তিনি তখনও ওঠেননি। আমি সেখানে বসে রইলাম—যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি ঘুম থেকে ওঠেন। ইতিমধ্যে জানালা দিয়ে শ্রীমতী দোরজের সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি ও তার মেয়ে জিভ বার করে সুপ্রভাত জানালেন। আমি তাদের কাছে না গিয়ে গুরুজীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুরুজী উঠলেন, আমাকে কাছে বসতে দেখে তিনি জিজ্ঞাসা

করলেন—ভালো ঘুম হয়েছিল তো? — আজ্ঞে হ্যাঁ, উত্তর দিলাম। তারপর বিনীতভাবে তাঁকে জানালাম যে বাইরে তাঁর জন্য মনে হয় এক ভদ্রমহিলা অপেক্ষা করছেন। তাই নাকি, বলে তিনি ঘর থেকে বেরোলেন, আমিও তাঁর সাথে বাইরে এলাম, আমাদের ঘর থেকে বেরোতে দেখেই শ্রীমতী দোরজে বারান্দার কোণে রাখা একটা হাড়ি নিয়ে এসে আমাদের কাছে দিলেন। তারপর সবিনয়ে বললেন—আপনাদের জন্য চা এনেছি।

আবার চা, তার ওপর এই সকালে ! চা কথাটা শুনেই কেন জানি না পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠল, মনকে একটু শান্ত করলাম। এরা গরীব শ্রদ্ধাভরে যা এনেছে তা পরমানন্দে গ্রহণ করা দরকার; তথাগত তাতে খুশী হবেন। চা গরম করে আমি ও গুরুজী ভদ্রমহিলার সামনে বসলাম, তিনি আগুনের কড়াইটা আমাদের দিকে একটু এগিয়ে বললেন--আপনার কথা শুনতে এলাম। গুরুজী আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যেন একথাটা আমারই উদ্দেশ্যে বলা। আমি সুযোগ বুঝে গুরুজীকে গতকালের ঘটনাটা সব খুলে বললাম—তারমানে চা পর্ব থেকে আরম্ভ করে তার মেয়ের কথা সব। আর একথাও গুরুজীকে খুলে বললাম যে আমার ইচ্ছে থাকলেও তার মেয়ে আমাকে যা যা বলেছে তার বিন্দু বিসর্গও বুঝিনি। গুরুজী আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর তাদের সঙ্গে কথাবার্তা আরম্ভ করলেন। মেয়েটি সলজ্জভাবে তার কাপড়ের খুঁট চিবোতে লাগলো। আর মাঝে মাঝে আমার সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতে লাগলো। তাদের কথা থামলে, গুরুজী আমাকে বুঝিয়ে বললেন সব। অর্থাৎ দোরজে পরিবার আমার উপস্থিতিতে খুবই সম্মানিত হয়েছে আর আমার মধুর ব্যবহার তাদের সকলেরই খুব ভালো লেগেছে। তিব্বতের রীতি অনুযায়ী সাধু-সজ্জন দেখলে যুবতী মেয়েরা তাদের গোপন কথা জানায় ও বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আবার অনেক সময় কোন দোষ করলে তার জন্য ক্ষমা চায়। দোরজের বড় মেয়েও গতকাল তার মনের কথা জানিয়েছে। সে জানতো যে আমি তার কথা বুঝি না তা সত্ত্বেও সে সব খুলে বলেছে। তাতে মেয়েটির বুক খুব হালকা হয়ে গেছে আর তার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমি অন্তর্যামী, আমি মুখ দেখলেই নাকি সব বুঝতে পারি। বুঝলাম ছোট হলেও আমার প্রতি মেয়েটার বিশ্বাস ও ভক্তি খুব গাঢ়। আমি নিজেকে খুব ধন্য মনে করলাম, তবে মনে মনে ভাবলাম যে এই মেয়েটি আমাকে না বলে যদি গুরুজী বা অন্য কোন লামাকে বলতো তাহলে হয়তো তার সহজ মীমাংসার জন্য উপদেশ পেত। আমার মতো এক ভণ্ডকে বলে সে কি লাভবান হতে পারবে ? ভগবানের কাছে তার কথা পৌঁছে দেবার ক্ষমতা আমার কোথায়! এই মুহূর্তে নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হল। কিন্তু কি-ই বা করতে পারি। এই ছোট্ট পরিবারের জন্য এতটুকু উপকার করার ক্ষমতাও বোধ হয় আমার নেই। অথচ তারা মন উজাড় করে দিয়েছে তাদের আন্তরিক বিশ্বাসে। মেয়েটির বিশ্বাস যে, আমি অন্তর্যামী আমি তার আবেদন সব বুঝেছি, কাজেই সে নতুন করে অন্যের সামনে কিছু বলবে না ।

আমরাও বেশ কিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইলাম। তারপর গুরুজীকে বললাম—আমার হয়ে যা হোক কিছু বলে দিন না। তিনি মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালেন—প্রশ্ন না জেনে কি উত্তর দেওয়া যায়। বিশেষ করে এরকম বিষয় নিয়ে ছেলেমানুষি করতে নেই। তাঁর কথা শুনে আমি মনে মনে হাসলাম — ছেলেমানুষি ! আমাকে দীক্ষা দিয়ে কি তিনি ছেলেমানুষি করেননি? আমাকে মৌনী-বাবা সাজিয়ে তিনি কি ছেলেমানুষি করেননি ? অবশ্য তার ভালো-মন্দের বিচার করা আমার কাজ নয়। এখন আমার প্রধান কর্তব্য হচ্ছে এই সমস্যার সমাধান করা। শ্রীমতী দোরজে আর তার মেয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছেন, আমার কাছ থেকে জবাব না পেলে তারা হয়তো উঠবেন না। মহা সমস্যায় পড়েছি। একদিকে ভন্ডামী আর একদিকে বিবেক এই দুই সমস্যার মাঝে আমি পড়েছি। জবাব আমাকে দিতেই হবে গুরুজী আমার হয়ে এক্ষেত্রে কিছু বলবেন না, তিনি তর্জমা করে দেবেন মাত্র। আমি মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম সহজ সরল ও পবিত্রতার প্রতিমূর্তি, তাকে আবোল-তাবোল বলে ঠকাতে বিবেকে বাঁধছে। বলা যায় না এটাও হয়তো আমার উন্নতির পথে এক ভাগ্য পরীক্ষা। হঠাৎ মনে এক বুদ্ধি এল। গুরুজীকে বললাম বুঝিয়ে দিতে। মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে আমি বললাম, “সোমম্ (মেয়েটির নাম) তুমি আমাকে উপলক্ষ্য করে যে সব কথা বলেছো তা আমি না বুঝলেও অন্তর্যামী জ্ঞানী ও ধ্যানী বুদ্ধ ঠিক শুনেছেন । তাঁর ওপর ভরসা রেখে তুমি জীবন পথে এগিয়ে চল, তিনি তোমার মঙ্গল করবেনই। আমি তিব্বতের সবচেয়ে বড় মন্দিরে তোমার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবো, আমি তোমাকে কথা দিলাম ।

গুরুজী আমার এই কথাগুলো বুঝিয়ে দিতেই মা ও মেয়ে দু'জন আমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো। তাদের মুখ উজ্জ্বল হাসিতে ভরে উঠল। এর চেয়ে বড় উপহার যেন আর হতে পারে না। তার মা আমাকে ছুঁয়ে বললেন—আমি জানি তুমি সব শুনেছো ও বুঝেছ—তোমার জয় হোক! তোমার জয় হোক !

তিব্বতী কথাগুলো সরাসরি বুঝতে পারলে খুবই ভালো হতো। মা ও মেয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল, আমি তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিষ্কলঙ্ক ও নির্মল চরিত্রের এমন নিদর্শন আমার জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়। মানুষকে যারা ভগবান বলে মনে স্থান দেয় তারাই মনে হয় ভগবানের প্রিয়সন্তান।

শ্রীসোরন থাপের আতিথেয়তায় আমাদর খুব ভালোভাবে বিশ্রাম হচ্ছে। আর সেই সাথে সাথে গ্রামবাসীদের সঙ্গে মেশবারও সুযোগ হয়েছে। তারই পরামর্শে গ্রামের আর চারজন বিশিষ্ট লোকের সাথে শ্রীথাপে আমাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করতে চান। তারা এ অঞ্চলের পথ-ঘাট ভালোভাবে জানেন, এ বিষয়ে পরামর্শ দেবেন । বাংলোয় আগে ঠাকুর চাকর ছিল, কিন্তু আজকাল অতিথির সংখ্যা খুব কম, প্ৰায় নেই বললেই চলে। কাজেই আমাদের মতো অতিথিদের দেখা শোনার ভার পড়েছে গ্রামবাসীদের উপর। তারা সব সময়ে আমাদের চারপাশে ঘিরে রয়েছে। যদিও আমাদের চাহিদা খুবই কম তবুও তারা সেবার জন্য সব সময়ই তৈরী। আমরা পরামর্শের জন্য বসলাম, গ্রামের লোকেরা আমাদের জন্য চা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ।

গুরুজীর সাথে পথ সম্পর্কে এ পর্যন্ত কোন কথাই হয়নি। আমি শুধু জানতাম যে তিব্বতে যাচ্ছি, এখন জানি তিব্বতে এসেছি। এরপর কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো, কি খাবো তার সব দায়িত্বই নিয়েছেন গুরুজী, আমাদের কাজ এগিয়ে চলা। কাজেই গ্রামের মোড়লদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা আমার কাছে খুবই আগ্রহের ব্যাপার ।

কথাবার্তায় এই প্রথম জানতে পারলাম আমাদের ভবিষ্যৎ পথ, ওখান থেকে আমরা যাবো গীয়াৎসে (Gyatse)। তারপর সেখানে থেকে পূর্বদিকের পথ ধরে যাবো লাসায়। লাসায় লামাদের শরীর ও মন যদি সুস্থ ও ভাল থাকে তাহলে ফিরে আসা হবে ব্রহ্মপুত্র নদীর ধার ধরে শীগাৎসে ( Shygatse) নামক শহরে। সেখান থেকে আবার শুরু হবে নতুন লক্ষ্যস্থল, কৈলাসনাথ ও মানস সরোবর তারপর আলমোড়ার পথ ধরে ফিরে আসবো ভারতে।

এই খাংমা গ্রাম থেকে সরাসরি লাসায় যাবার একটা পথ আছে, গুরুজীর ইচ্ছা ছিল সে পথ ধরার কিন্তু শোরনজী বলেছেন যে গীয়াৎসে আমাদের যেতেই হবে। টেলিগ্রামটা এসেছে সেখান থেকে, সেখানকার পুলিশ-অফিস আগে থাকতেই জানিয়ে রেখেছে সেখানে আমাদের রিপোর্ট করতেই হবে।

তিব্বতের গুম্ফা মাত্রেই তীর্থক্ষেত্র, ঠিক যেমন ভারতের মন্দিরগুলো। কিন্তু তার মধ্যে প্রধান প্রধান স্থানগুলোতেই তীর্থযাত্রীরা বহু যুগ ধরে যাতায়াত করে আসছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাসা, শীগাৎসে ও কৈলাসনাথের মন্দিরগুলো। লামা ও সাধুদের তিনটি স্থানই মহাতীর্থ, কৈলাসনাথ তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানীয় স্থান দখল করে আছে। পাঁচ বছর আগেও এসব জায়গা ছিল ভারতীয়দের জন্য মুক্ত, আজকাল রাজনৈতিক কারণে সে পথ দিন দিন বন্ধ হয়ে আসছে। চীনা বা হানদের কোন ধর্ম নেই, রাজনীতিই তাদের ধর্ম আর নেতারাই দখল করে আছে ঈশ্বরের স্থান। তবে এখন পর্যন্ত তারা তীর্থযাত্রীদের উপর কোন রকম বাধা নিষেধ জারী করেনি। তবে ভারতীয় সে তীর্থযাত্রীই হোক অথবা স্বর্গযাত্রীই হোক না কেন তাদের প্রবেশ নিষেধ। নেপালীদের জন্য এখনও পথ খোলা আছে, আমি সেই পথেরই পথিক। সাধারণ তিব্বতীদের কাছে নেপাল, সিকিম, ভূটান সবই ভারতের অঙ্গ এদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই

সিকিম থেকে এ পর্যন্ত চলার পথে আবহাওয়াও প্রচুর পাল্টেছে। নাথুলা পার হবার আগে ও পরে পেয়েছি ঠাণ্ডা বাতাস তার সাথে ছিল ভেজা বাতাস কিন্তু তাংলা পার হবার সাথে সাথে সে বাতাস উধাও হয়েছে, এখন পাচ্ছি ঠাণ্ডা শুকনো বাতাস, তাতে হাড়ে কাঁপুনি ধরে। রাতের বেলা যদি আগুন না পাওয়া যেত তাহলে আমাদের পক্ষে এতদুর পর্যন্ত আসা সম্ভব হতো না, দেহটাকে রাস্তায়ই রেখে আসতে হতো।

এখন আমরা রয়েছি বরফের রাজত্বে। হিমালয় পার হতে আমাদের লাগলো পনেরো দিন। এখন আমাদের চারদিকে ছোট-খাটো পাহাড়-উপত্যকা, আর বরফ গলে সৃষ্টি হওয়া পাহাড়ী নদী। ঠাণ্ডা বাতাস দিনের বেলা সূর্যের তাপে একটু দুরে গিয়ে অপেক্ষা করে, সন্ধ্যে হলেই সে আবার নেমে আসে। রাতের ঠাণ্ডা এখানে ভয়ংকর। তিব্বত এক অদ্ভূত দেশ। তার দক্ষিণে হিমালয় পর্বতশ্রেণী, আর উত্তরে কুয়েন লুন পর্বতশ্রেণী। এই দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যে লুকিয়ে আছে এই ভীষণ ঠাণ্ডার দেশ, যার উচ্চতা গড়ে প্রায় তেরো থেকে পনেরো হাজার ফুট আর তাপমাত্রা ওঠে একশ পাঁচ ডিগ্রি পর্যন্ত আর নামে শূন্যের থেকেও পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি নীচে। এখন সবে বরফ পড়া বন্ধ হয়েছে, সূর্যের তাপে দিনেরবেলা আস্তে আস্তে সেগুলো গলতে শুরু করেছে মাত্র । ঠিক গরমকাল এখনও অনেক দূরে।

চুম্বিভ্যালীর পর যতই উত্তরে যাচ্ছি ততই আমরা প্রবেশ করছি বরফের রাজত্বে। এই অঞ্চলে লোকবসতি আছে একমাত্র ভারত-তিব্বত ট্রেড রুট-এর জন্য। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যে নদীটি চলছে সেটা এই অঞ্চলের বরফগলা জলধারা নিয়ে আরও উত্তরে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিশেছে। এই নীয়াং নদীর ধার ধরে এগিয়ে গেলেই পাওয়া যাবে গীয়াৎসে শহর। খাংমা থেকে সংক্ষেপে লাসার দিকে যে পথ গিয়েছে ইচ্ছা থাকলেও সে পথে আমরা এখন যেতে পারছি না অথচ গীয়াৎসে আমাদের যেতে হবে।

সভায় অনেকেই আমাদের সুপরামর্শ দিলেন যে একসঙ্গে না গিয়ে দুটো বা তিনটে দলে বিভক্ত হয়ে গেলেই ভালো, কারণ আর মাইল দশেক উত্তরে হান্ সৈন্যদের বিরাট ঘাঁটি আছে, তারা অকারণে হয়রান করতে পারে। বিশেষ করে আমরা আসছি ভারত থেকে, তারা এই তীর্থযাত্রীদের গুপ্তচরও ভাবতে পারে ।

তাদের দ্বিতীয় পরামর্শ হচ্ছে যতটা সম্ভব বড় গুম্ফাগুলো এড়িয়ে যাওয়াই ভাল । গীয়াৎসের মন্দিরগুলোতে হান্-সৈন্য মোতায়েন আছে, বিদেশী দেখলেই তারা প্রশ্নবাদ করে। বর্তমানে আমাদের উদ্দেশ্য লাসা; লাসা যাবার জন্যই আমাদের অনুমতিপত্র  আছে সেখানে ভয় নেই। গ্রামবাসীরা আমাদের আরও কয়েকদিন রাখতে চায় কিন্তু আমাদের ইচ্ছা যতদূর এগিয়ে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল ।

তিব্বতে আর একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করলাম, সাধারণ তিব্বতীরা এমন কি সোরন থাপে মশাইও এখানকার বিভিন্ন শহরের দূরত্ব জানেন না। মাইলের হিসাব কেউ জানে না, দূরত্ব বোঝায় দিন বা বেলা দিয়ে। অর্থাৎ এখান থেকে ওখানে এক বেলার পথ, পাঁচ-দিনের পথ, সাড়েসাত-দিনের পথ ইত্যাদি। ফাড়ি জোং ও গীয়াৎসের মধ্যে মাঝে মাঝে যদিও লরি যাতায়াত করে কিন্তু তা যাত্রী বহন করে না। যাতায়াতের জন্য গাধা, ঘোড়া, ইয়াকের গাড়ী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের জন্য পাল্কি ব্যবহার করা হয় ।

সভা শেষ হল আলোচনা ও চা চক্রের মাধ্যমে। আমাদের যেতে হবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ।

তিন রাত সেখানে বিশ্রাম করে আমরা গ্রামবাসীদের বিদায় জানাতে বাধ্য হলাম। আমাদের বিদায়কালে গ্রামবাসীদের অনেকেই গামলায় জল এনে তাতে আমাদের পা ধুইয়ে দিল, সেই সাথে সাথে আমরাও তাদের আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক আশীর্বাদ জানালাম, তারপর সমবেত প্রার্থনা করে আমরা পথে নামলাম । আমাদের সাথে সাথে গ্রামবাসীরাও এগিয়ে চলল আমাদের কিছুদূর এগিয়ে দেবার জন্য। গ্রামবাসীদের মধ্যে দোরজে পরিবারও আমার সাথে সাথে চলল। অকারণেই সোমমের দিকে বার বার আমার দৃষ্টি পড়তে লাগলো, মনে হল ওকে কিছুই দিতে পারলাম না। হঠাৎ মনে হল আমার কাছে কয়েকটা বাড়তি রুদ্রাক্ষের হাত-মালা আছে, আমি চলতে চলতে ব্যাগ থেকে সেটা বার করে নিলাম। তারপর শেষ মুহূর্তে সোমমের হাতে গুঁজে দিলাম, হেসে মনে মনে বললাম--এটাই আমার শেষ উপহার। আমি জানি লামাদের কাছ থেকে জপমালা পাওয়া তিব্বতীদের কাছে মহাভাগ্যের বিষয়।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%