মিলেনিয়ামে লাসা

বিমল দে

সময় নিজের গতিতে নিজে এগিয়ে চলেছে। ১৯৫৬ সালের সেই গৃহপলাতক কিশোর আজ দুহাজার চার সালে পৌঁছেছে। কৈলাসেশ্বরের কৃপাধন্য সেই বালকটি ভ্রমণের যে বীজমন্ত্র পেয়েছিল, সেই নাম জপ করে করে সে ঘুরে বেড়াল দিক্ দিগন্তের এই বিচিত্র পৃথিবীর বুকে। শুধু নয়ন ভরে নয়, শরীরের প্রত্যেকটি কোষকে সজাগ রেখে সে উপলব্ধি করেছে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধে ভরা পৃথিবীর বিভিন্ন তরঙ্গকে। হাতে খড়ি হয়েছিল কোলকাতা থেকে কৈলাস। পরবর্তী জীবনে সেই মৌনীবাবাই হল পরিব্রাজক ভূপর্যটক। আশীর্বাদ মানুষকে বড় করে, আত্মাকে তুলে আনে আধ্যাত্মিক মার্গে ।

অদৃষ্ট, কর্মফল, গুরুকৃপা সব কিছুই নির্ভর করে ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির ওপর। সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ এই তিনগুণের মত ইচ্ছাশক্তি জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি যুগে যুগে মানুষকে আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জীবনে এই শক্তিই তো আশীর্বাদের তরঙ্গ দৈনন্দিন জীবনের অলৌকিক সম্পদ। এই পঞ্চভূত’ও মহাভূতে তৈরী মানবদেহে নিশ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে আসছে প্রাণ শক্তি। এই প্রাণ-শক্তিই আমাদের জীবিত করে রাখছে, এটাই সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আমাদের সরাসরি যোগাযোগ, যেমন মায়ের সাথে মাতৃগর্ভে শিশুর নাড়ীর যোগ। আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী, তাতে ঈশ্বরের কিছু যায় আসে না, লাভ ক্ষতি সেটা আমাদের। বাতাস, আলো, আগুন, জল, মাটি, আকাশ সবই তো তার দান তার আশীর্বাদ বৃষ্টির মত পড়ছে, প্রয়োজন মত ধরে রাখো। আর না ধরলেও সেই আনন্দধারা নিত্য বহমান ।

আমি তারই দেওয়া দেহ মন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, নয়নভরে দেখছি তাকেই। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, সমুদ্র, নদী, হ্রদ, ঝর্ণা, পাহাড়-বন-জঙ্গল, সুড়ঙ্গ, পাতাল, শহর সমাজ, জন্তু, জানোয়ার, মানুষ, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি সব কিছু তো তারই প্রকাশ, কোথাও স্থায়ী, কোথাও অস্থায়ী, আনন্দদায়ক, ভয়ানক—সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা সব কিছুতো সেই অব্যক্তের ব্যক্ত রূপ। শুধু দেখি আর দেখি—সেই দেখার মধ্যেই দর্শন”, আত্মোপলব্ধি আপনা থেকেই আসে। লাসা, কৈলাসনাথ, মানস সরোবর ঘুরে আসার পর আমি নিজেকেই বার বার জিজ্ঞেস করেছি, “কি করে হ'ল ?” উত্তর পাইনি। “কি পেলাম?” উত্তর; “প্রয়োজনের চেয়ে অনেক অনেক বেশী পেয়েছি।” প্রয়োজনের থেকে যেটা বেশী জমা পড়েছিল কপালে, সেটাই ছিল আমার ভবিষ্যতের মূলধন। ভূ-প্রদক্ষিণ করার সময় আর আজও সেই মূলধন ভাঙ্গিয়েই চলছি। সেই মূলধন হচ্ছে আশীর্বাদ আর অভিজ্ঞতার ঝুলি ৷

১৯৫৬ সাল থেকেই আমি শুরু করি ভারত ভ্রমণ ভারতের তীর্থে তীর্থে। ১৯৫৯ সালে যখন মাননীয় দালাই লামা ভারতে রিফিউজি হয়ে আসেন, তখন আমি তিব্বতের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমি ভেবেছিলাম, রাজা সে উদ্বাস্তু হলেও রাজাই থাকে, কাজেই তিব্বত তথা দালাই লামার সমস্যাটা আমার সমস্যা নয়। তা সত্ত্বেও কেন জানি না একবার ১৯৬৩ সালে, আমি দিল্লী হয়ে ধরমশালায় যাই, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দালাই লামা ধরমশালায় ছিলেন না, দেখা হল না। ১৯৬৭ সালে আমি বেরিয়ে পড়ি ভূ-পর্যটনে। চলার পথে কথাপ্রসঙ্গে অনেকবার মাননীয় দালাই লামার কথা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় মূলপ্রসঙ্গ ছিল, কি করে তিব্বত-প্রধান ধাম্মীক দালাই লামা ও তাঁর লক্ষাধিক উদ্বাস্তু শিষ্যদের আবার লাসায় ফিরিয়ে আনা যায়। কি করে হেগ-এর আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নিয়ে এবং বিশ্বমানব অধিকারের অজুহাতে চীন সরকারের সাথে একটা শান্তিমূলক আলোচনার মাধ্যমে মাননীয় দালাই লামাকে তাঁর পোতালা রাজপ্রাসাদে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়। মাননীয় দালাই লামা পৃথিবীর এক নম্বর লীডারদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সাহায্যের জন্য দরজায় দরজায় ধর্ণা দিয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্য কোন ফল হয় নি। পৃথিবীর বুকে তখনও তৃতীয় মহাযুদ্ধের ভবিষ্যৎ ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। চীন-রাশিয়া-আমেরিকা-ফ্রান্স সবাই ভিয়েতনাম নিয়ে ব্যস্ত। আর ওদিকে ভেতরে ভেতরে ঠাণ্ডাযুদ্ধের জন্য— দুই মহাশক্তি রাশিয়া ও আমেরিকা প্রস্তুত কাজেই রাজ্যচ্যুত-উদ্বাস্তু দালাই লামা বাধ্য হয়ে গ্রহণ করলেন ধর্মীয় পথ। অনাসক্ত, ত্যাগ আর অহিংসা ব্রত নিয়ে তিনি হাসিমুখেই রইলেন পরবাসী। ভারততীর্থে দালাই লামা হলেন বিশ্ববাসী। ভগবান বুদ্ধের দেশ ভারতই তখন তাঁর দেশ ।

১৯৭২ সালে আমার সাইকেলে ভূ-পর্যটন' শেষ হল। সাইকেল সাঁতার জানে না, উড়তেও পারে না। তাই সব দেশে যাওয়া হয় নি, তাই আবার শুরু হল চলা। চাক্রী করে পয়সা রোজগার — তারপর আবার চলা— । তবে আর্থিক অবস্থা আগের থেকে স্বচ্ছল তাই পরিব্রাজকের থেকে পর্যটক। বহু দ্বীপ, চির তুষারাবৃত পর্ব্বত, দক্ষিণ মেরু, উত্তর মেরু ঘুরে বেড়াতে লাগ্‌লাম। অনুরোধ আসতে লাগল, “বল যা দেখেছো বল”— শুরু করলাম ভ্রমণ কাহিনী লিখতে। নেহাৎই বলার জন্য লেখা, কারণ আমি লেখক নই। এই সময়ই প্রেরণা পেলাম— চারিদিক থেকে ইঙ্গিত এল— আমার শৈশবের সেই না বলা কাহিনীকে বলতে হবে, লিখতে হবে, কে যেন আমার হাতে কলম ধরিয়ে দিয়ে বল্ল— “লেখ”, লিলাম, মানে আমাকে দিয়ে লেখানো হল আমারই কাহিনী । কারণ ভারত থেকে লাসায় আমাদের দলটিই ছিল শেষ তীর্থযাত্রী। লিখতে গিয়ে আবার প্রবেশ করলাম স্মৃতির পটে। সেই থেকে ঘুমন্ত স্মৃতি মাঝে মাঝে জেগে ওঠে বিদ্রোহ করে বলে— চল্ আবার তিব্বত চল্। স্মৃতির বাহনকে শান্ত করার জন্য বলি— “দাঁড়া সময় মতো সুযোগ আসবেই।”

লিখতে গিয়ে বহুবার অন্যমনস্ক হয়ে গেছি, বার বার ভেবেছি, তিব্বত বিশ্ব তীর্থ, জোখাং মানস সরোবর আর কৈলাসনাথের দরজা একদিন না একদিন খুলবেই। কোনো দেশের ইতিহাসই স্থায়ী নয়। আমাদের ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। র পাণ্ডুলিপিতে অনেকবার চোখের জল পড়ে লেখাটাকে ঝাপসা করে দিয়েছিল— করুণাময়ীর কাছে হয়তো সেটাই ছিল আমার আবেদন-পত্র। তারপর হঠাৎ সুযোগ এল ৷

সানফ্রান্সিসকো, সুইজারল্যাণ্ডের জেনেভা ও লজানে পরপর তিনবার মাননীয় দালাই লামার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, তিব্বতে ফিরে যাবার কি হল-

উত্তরে তিনি বললেন— “চীন সরকারের কোন সহযোগীতা পাচ্ছিনা, কোনো সিকিউরিটি নেই, অবস্থার কোনো উন্নতি হয় নি”, তাঁর উত্তর শুনে মনে ভীষণ আঘাত পেয়েছিলাম। যিনি তথাগতের চরণাশ্রিত, কালচক্র যার বীজমন্ত্র, মহাকাল যার নগর রক্ষক, তার জীবন নির্ভর করছে সামান্য চীন সরকারের ওপর। আমি জ্ঞানী নই, তাই সেদিন তাঁর কথা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝেছি যে, ধ্যানী দালাই লামা আর মিডিয়ার সামনে দালাই লামা একই লোক হলেও সময় ও লোক বুঝে উত্তর দিতে হয়। যেমন হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ নীতি “অশ্বত্থামা হত ইতি গজ” স্থান কাল পাত্র ভেদে বিচার ও ব্যবহার।

আমার এক সাংবাদিক বন্ধু ক্লোদ লোভেঁস (Claude Levenson) চতুর্দশ দালাই লামা শ্রী তেনজিং গিয়াৎসোকে সরাসরি প্রশ্ন করল— আপনি আগে ছিলেন লাসায় বিশ্ববিখ্যাত পোতালা প্রাসাদে আর আজ আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশ বিদেশে, কোন্‌টা ভাল লাগে এ বিষয়ে কিছু বলবেন ?

উঃ- অবশ্যই বলবো, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ, পোতালা প্রাসাদে আমি ছিলাম পর্দায় ঢাকা, বাইরের জগৎ সম্পর্কে আমার কিছু জানা ছিল না। তখন বয়সও ছিল কম। দালাই লামার প্রতিটি পদক্ষেপ ও আচরণ ছিল সীমিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। রিফিউজি হয়ে আসার পর আমার চোখের সামনে থেকে একের পর এক সেই পদাগুলো উঠে গেছে। নিজের চোখে দেখছি জগৎটাকে, কত শত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, বন্ধুত্ব হচ্ছে। আমি রাজ্য হারিয়েছি কিন্তু নিত্যনতুন বন্ধু পাচ্ছি। আমার বন্ধুরাই আমাকে আগলে রাখছে, তারাই আমাকে রক্ষা করছে এটা একটা অন্য বিরাট জগৎ। আমি অনেক দেশ ঘুরছি ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, প্রথম প্রথম লোক দেখলেই মনে হত – কি জানি কি জিজ্ঞেস করবে, কি উত্তর দেবো — এখন আর সেই ভয় নেই ।

এই ধরনের বহু প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পোতালার শাক্যমুনীকে পেলাম সাধারণ মানুষের মতো। দালাই লামা আমার থেকে পাঁচ বছরের বড়, কিন্তু জ্ঞান পদমর্যাদায় তিনি অনেক অনেক ঊর্দ্ধে, পরপর তিনবার সাক্ষাৎকারের পর তাঁকে পেলাম নিজের কাছে। অনেক অবলা প্রশ্নের উত্তর আপনা থেকেই পেয়ে গেছি। আমার এই কাহিনী বলার আগে আসা যাক এক নজরে; তিব্বতের কয়েকটা উল্লেখযোগ্য দিন ও ঘটনায় :

১৯৫৯ সালে হিজ হোলিনেস্ দালাই লামা পার্শ্বচর লক্ষাধিক ভক্ত ও অনুচর নিয়ে প্রাণ হাতে করে পালিয়ে এলেন আসাম হয়ে শিলিগুড়ি। নেহরুজী স্বয়ং এবং সরকার তাঁকে স্বাগত জানালেন— ধর্মশালায় তাঁর জন্য তৈরী হল একটা উপনগরী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে চীন সরকারের সব সম্পর্ক ছিন্ন হল। তারপর “হিন্দী চীনি ভাই ভাই” নাম করে চীন সরকার আক্রমণ করল ভারত সীমান্ত— নেপাল, সিকিম, ভূটান ও আসামে দেখা দিল দু'দলের সৈন্যবাহিনী। তিব্বতি শহীদরা হাজারে হাজারে প্রাণ বলি দিল। ১৯৬৫ সালে চীন সরকারের অধীনে স্বাধীন তিব্বত ঘোষিত হল। আর তার এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত কালচারাল রেভোল্যুশানের নাম করে চল্ল তিব্বতিদের ওপর জঘন্য অত্যাচার। অমানুষিক নির্যাতন আর নিরীহ সাধারণ তিব্বতি নিধন যজ্ঞ। এক কলঙ্কময় অধ্যায় তিব্বতের ইতিহাসে রক্তাক্ষরে লেখা হ'ল। চীন কর্তৃপক্ষের এই দানবীয় ঘটনা পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলো দেখেও চোখ বুজে রইল। অসহায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ আর স্বাধীনতাকামী তিব্বতিদের রক্তে রাঙা হয়ে উঠল লাসা ও তিব্বতের প্রত্যেকটি শহর। কালচারাল রেভোল্যুশনের নামে হত্যা করা হল প্রত্যেকটি গোম্ফা, মন্দির ও আশ্রমের নিরীহ সন্ন্যাসীদের। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নাম করে বিরাট তিব্বতে রাজ্যব্যাপী লুণ্ঠন, ধ্বংস আর হত্যাকাণ্ড চল্ল প্রায় দশ বছর যাবৎ। চীনা সৈন্যের কামানের গোলায় ধ্বংস হল প্রায় পাঁচ হাজার চৈত বিহার ও মন্দির। নিহতের সংখ্যা পনেরো লক্ষেরও বেশী। সেই সময় তিব্বতের জনসংখ্যা ছিল মোট ষাট লক্ষের মত। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবরটা জানাজানি হয়ে গেল আন্তর্জাতিক মহলে ।

১৯৭৮ সালে চীন সরকার আন্তর্জাতিক মহল ও উন্নত দেশগুলোর সহানুভূতি পাওয়ার জন্য তিব্বতে পুনঃ ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠা ও ধর্ম্মস্বাধীনতা ঘোষণা করল। এই সময় এবং এই প্রথম তিব্বতি যুবকরা চীনা কর্তৃপক্ষের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।

১৯৭৯ সালে, অর্থাৎ তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামার লাসা থেকে পালাবার কুড়ি বছর পরে, এই প্রথম তিব্বত-নেতা দালাই লামার প্রতিনিধিদের সঙ্গে চীন সরকার বসল স্বাধীন তিব্বতের বিষয়ে আলোচনা চক্রে। পরপর তিন দফায় তারা আলোচনা করল, কিন্তু কোন লাভ হল না শুধুই কথা। মোদ্দা কথা তিব্বত চীন দেশেরই অংশ ।

১৯৮৭ সালে তিব্বতী যুবক-যুবতীরা বেপরোয়া হয়ে চীনা সৈন্যদের বেড়া ডিঙিয়ে লাসায় আগত ইউরোপীয়ান ও আমেরিকান ট্যুরিস্টদের সামনে গিয়ে জানাল দেশের দুরবস্থার কথা। মানব অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত আর সাধারণ নাগরিক অধিকারও তাদের নেই। তিব্বতি যুবকদের এই আস্পর্দ্ধা দেখে সঙ্গে সঙ্গে চীনা সৈন্যবাহিনী তাদের ওপর গুলি চালায়, যারা বাঁচল তাদের বন্দী করা হল কারাগারে। চীনা সরকারের প্রচুর চেষ্টা সত্ত্বেও এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া গেল না, কারণ ট্যুরিস্টদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে গেছে চীনা বাহিনীর অত্যাচারের কাহিনী। এই প্রথম ইউরোপ ও আমেরিকার খবরে বিরাট করে ছাপানো হল চীনা সৈন্যের বর্বর কাহিনী। ছদ্মবেশী চীনা ভাইদের মুখোস খুলে গেল।

১৯৮৮-১৯৮৯ তিব্বতের নববর্ষ উৎসবের সময় আবার চীনা বিদ্রোহ আন্দোলন শুরু হয়। চীন সরকার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও কারাদণ্ড দেয় । এই সময়েই পাঞ্চেন লামা দেহত্যাগ করেন। পাঞ্চেন লামার শহর শিগাৎসের তিব্বতিরা মৃত্যু শোককে কেন্দ্র করে গড়ে তুলল চীনা হঠাও আন্দোলন। প্রচুর লোক ডাকে সাড়া দিল। এইবার চীনা সরকার আন্দোলন আয়ত্ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সম্পূর্ণ তিব্বতে জমায়েৎ নিষিদ্ধ করে কারফিউ জারি করল। আর ওদিকে চীনের রাজধানী বেইজিং-এ এই সময়েই চীনা সামরিক বাহিনী আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে পিষে মারল নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের। তবে এইবারে তিব্বতি নয়, তারা চালাল তাদের নিজস্ব নাগরিকদের ওপর। তাদের দাবী ছিল নাগরিক অধিকার। তিয়েন্-আন্-মেন্-এর সেই বর্বরতা কলংকময় ইতিহাস চীনা কর্তৃপক্ষের এক জঘন্য অধ্যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এক রক্তাক্ত কাহিনী। চাইনিজ্ টর্চার প্রবাদটা আর একবার প্রমাণিত হল।

তারই প্রতিবাদে ইউরোপ বেছে নিল চীন কর্তৃপক্ষের বিরোধীপক্ষ মাননীয় দালাই লামাকে, দেওয়া হল (নোবেল) শান্তি পুরস্কার। চীনা কর্তৃপক্ষ তীব্র প্রতিবাদ জানাল নোবেল পুরস্কার কমিটিকে। কিন্তু ইতিমধ্যেই ডিসিসন নেওয়া হয়ে গেছে তাই একমাত্র হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরা ছাড়া চীনা সাংস্কৃতিক প্রগতিবাদীদের আর কিছু করার ছিল না ।

আমার ভ্রমণ কাহিনীর পর এই ঘটনাগুলো বার বার আমাকে আঘাত দিয়েছে। প্রথম প্রথম অন্য সকলের মতো আমি বয়কট করেছিলাম, ভেবেছিলাম যতদিন এই নৃশংস চীনা সরকার থাকবে ততদিন তিব্বতে যাব না। আবার দালাই লামার প্রতি সহানুভূতির কারণে ভেবেছিলাম, যে চীন সরকার ধার্ম্মিক দালাই লামা ও পাঞ্চেন লামার তিব্বতকে গায়ের জোরে দখল করে নিয়েছে, যে সরকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অজুহাতে তিব্বতের ঐতিহ্যময় চৈত, বিহার, আশ্রম, মন্দিরগুলোকে কামানের গোলায় ধ্বংস করে দিয়েছে, যারা তিব্বতের সাধারণ মানুষের রক্তে ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র নদীকে কলুষিত করেছে, তাদের দেখাও পাপ। এই ধরনের আরও আরও অনেক কারণ, আমাকে বার বার বাধা দিয়েছে। ভেবেছিলাম এই সরকার থাকতে আমি আর তিব্বতে যাবো না ।

আমার বহু যুক্তির বাধা সত্ত্বেও আমার ভেতরকার মন বার বার বলছে— “যুক্তি দিয়ে মনকে ঠকিও না, মন যেখানে যেতে চাইছে সেখানে নিয়ে যাও মুক্তির পথে কোন যুক্তি নেই। পথিকের ব্রত পথ চলা, তর্ক বিচারের ছোট্ট গণ্ডীর মধ্যে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ো না।” শুনলাম, বুঝলাম আমাকে টানছে আবার আমাকে যেতে হবে। বুঝলাম তিব্বত বিধাতার সৃষ্টি, পপুলার চীন সরকারের নয়। আমরা সামাজিক জীব, সমাজে বাঁচতে হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই চলতে হবে। পথিকের ব্রত পথ চলা, অনাসক্তি ভাব নিয়ে সবকিছুর মধ্য দিয়েই চলতে হবে সেটাই তো অভিজ্ঞতা। তারই জন্য চলা, জঙ্গলে কাঁটা আছে বলে তাকে এড়ানো ঠিক নয়— সমুদ্রে ভয়াবহ ঢেউ আছে বলে সমুদ্র লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করি নি ।

তিব্বতের চীনা সরকার যতই অবিচার করুক না কেন, তাই বলে সম্পূর্ণ তিব্বতবাসীকে উপেক্ষা করি কি করে। তিব্বতকে বয়কট করলে মহান হিমালয়ের সন্তান সহজ ও সরল এক বিরাট মানবগোষ্ঠীকে বয়কট করা হবে। তাই মনে মনে ঠিক করলাম, মনের কথাই শুনলাম, যতই বাধা আসুক না কেন আবার যাবো তিব্বতে। তিব্বতের সৌন্দর্য, তার আধ্যাত্মিকতা, তার মানুষ আর জলবায়ুর মধ্যে আবার অবগাহন করতে হবে, যেমন করেছিলাম— কৈলাস প্রদক্ষিণ আর মানস সরোবরে।

একদিকে তিব্বতি সংস্কৃতি উচ্ছেদ পরিকল্পনা আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ। নিষিদ্ধ কথাটার একটা রহস্য আছে। ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে ঐ ঘরে যাবার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে ওঠে। বিদেশীরা বার বার ধাক্কা মারতে লাগল চীন সরকারের দরজায়, ভিসা দাও, যাবার অনুমতি দাও। পপুলার চীন সরকার বুঝল যে, দরজা না খুললে দরজা ভেঙে যাবার সম্ভাবনা, আর চীন সরকারও চায় বহির্বিশ্বে বাণিজ্য করতে। ইউরোপ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিরাট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভাণ্ডারকে উপেক্ষা করলে দেশেরই ক্ষতি। তাই অতি সাবধানে, অতি সন্তর্পণে ভিসা দিতে শুরু করল। পপুলার চীন সরকার আরও দেখল যে আজ তৃতীয় বিশ্বে এক বিরাট বাণিজ্য ভাণ্ডার নিয়ে তৈরি হয়েছে ভারত। শুধু বাণিজ্য নয়, ভারতবর্ষ আজ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পারমাণবিক শক্তি। ১৯৫৯ সালে ভারতের সৈন্যবাহিনীকে অগ্রাহ্য করেছিল কিন্তু আজ তার রাজনৈতিক ভূমিকা পাল্টেছে, ভারত আজ বৃটিশ পরিত্যক্ত দুর্বল জাতি নয়, নতুন ভারত তার বিরাট প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত। হিমালয়ের ওপর তাদের সজাগ দৃষ্টি, তিব্বতের মত অবিচার সে আজ বরদাস্ত করবে না। তাই শুরু হল পপুলার চীন সরকারের শান্তি আয়োজন নীতি। খুলে গেল হিমালয়ের একটি দরজা। পবিত্র কৈলাশনাথ আর মানস সরোবরে তীর্থযাত্রীদের আবার প্রবেশ অধিকার দেওয়া হল।

মৌনীবাবার সেই কথাটাকে আজ নতুন করে সাজিয়ে লিখতে হবে— আসল কথা দালাই লামার লাসা ত্যাগের আগে এবং তদানীন্তন পপুলার চীন

সরকারের কালচারাল রেভোল্যুশনের আগে আমরাই ছিলাম— । পরিব্রাজককে কিন্তু অতদিন বসে থাকতে হয় নি। কৈলাসনাথের ডাকে ১৯৯০ সালের আগেই দুবার নতুন পথে সে কৈলাস পরিক্রমা করেছে। উদ্দেশ্য ছিল কৈলাস পরিক্রমা আর মানস সরোবরে অবগাহন। পথ ছিল নেপালগঞ্জ থেকে সিমিকোট ছোট প্লেনে। সেখান থেকে নারা পর্যন্ত পায়ে হাঁটা পথ। পাঁচ দিনে সর্বোচ্চ পাস নারা-লা পার হলাম উচ্চতা ৪৬২০ মিঃ। তার পরই প্রথম তিব্বতি গ্রাম শের (উচ্চতা ৩৫৬০ মিটার) কার্নালি নদীর ধার ধরেই রাস্তা। নেপাল থেকে তিব্বতে ট্রেকিং করার এটাই সরকারী রাস্তা। নেপালের হুম্‌লা জেলা বিপজ্জনক পাহাড়ি এলাকা পরিবর্তন চোখে পড়ে না। শের থেকে আজকাল দারচেন পর্যন্ত জীপ, মিনিবাস ও ট্রাক হামেশাই যাতায়াত করে। শের, পুরাং, গুর্লা-লা হয়ে বাঁ দিকে রাক্ষসতাল আর ডানদিকে মানস সরোবর রেখে জীপ সরাসরি যাত্রী নিয়ে আসে দারচেন শহরে। সেখানে ছোট বড় ধরমশালার অভাব নেই। সেখান থেকেই শুরু হয় কৈলাস পরিক্রমা।

নিঃসন্দেহে স্বীকার করতেই হবে যে, পৃথিবীর এই দুর্গম অঞ্চলে রাস্তা ও যানবাহনের অনেক সুবিধা হয়েছে। স্থানীয় যাযাবরদের স্থায়ী আস্তানা হয়েছে, আর বলাই বাহুল্য চোখে সবচেয়ে বেশী পড়ে সামরিক বাহিনীর জীপ ট্রাক শিবির আর যাতায়াত। তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্য কৈলাসনাথ দর্শন আর পরিক্রমা। ভাবঘোরে তীর্থযাত্রীরা চেয়ে, থাকে দূরের কৈলাস শিখরে। গত দুবার কৈলাসে গিয়ে কি করলাম সে বিষয়ে লিখে আমার এই অধ্যায় ভরাবো না, তে আমার সব কথা বলা হয়ে গেছে। বেনারস-হরিদ্বারে বা কৈলাসতীর্থে হাজার বছর যাবৎ হিন্দুদের সেই একই পদ্ধতি— বেদান্তের সেই একই পথ, চির পুরাতনই চির নতুন পূজা, পরিক্রমা, প্রার্থনা, ধ্যান আর নীরবতা— সব ধর্ম্মের একই নীতি ।

পর পর দুবার কৈলাসখণ্ডে গিয়ে বুঝলাম যে, তীর্থযাত্রীদের জন্য তিব্বতের যে দরজা খোলা হয়েছে তা আসলে ট্রেকার্স ও অ্যাডভেঞ্চারাস যুবক যুবতীদের জন্য। হিমালয়ের এই নিষিদ্ধ দেশে তারা আসে পাহাড়ি রাস্তায় নিজেদের সাহস-বীরত্ব আর মানসিক ও শারীরিক সহনশীলতা যাচাই করতে। কত কম সময়ে কত দূর গেলাম, কত উঁচুতে উঠলাম, কোথায় কোথায় ক্যাম্প করলাম, আর প্রতি মুহূর্তে সময়, তাপ ও উচ্চতার কথায় ডায়ারীর পাতা ভরালাম। সত্যম্-শিবম্-সুন্দরম্ তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। ভারতের তীর্থযাত্রীরা যায় আমোরা হয়ে ভাব্ ভক্তি দিয়ে তারা রাস্তার পরিশ্রমকে স্বাগত জানায় পুণ্যার্জন আর আধ্যাত্মিক মার্গের আশায়। অবশ্য সব দলেই বিশেষ প্রকৃতির লোক থাকেই সব মানুষ তো আর সমান না।

কৈলাসনাথ আর মানস সরোবরে তীর্থের জন্য যেতে হলে দিল্লী থেকে দলবদ্ধ হয়ে ভারত সরকারের মাধ্যমে যেতে হয়। আর পর্যটন করতে হলে চীন ভূ-খণ্ড হয়ে আসতে হয়। তিব্বতের একটিই এয়ারপোর্ট লাসা। এয়ারপোর্টের নাম গাংগার, এয়ারপোর্ট থেকে লাসায় যেতে প্রায় দুঘন্টা লাগে জীপ বা মিনিবাসে। অন্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চেংদু ও কাঠমাণ্ডু (Chengdu Kathmandu) ।

১৯৯০ সাল থেকেই বার বার চেষ্টা করছিলাম তিব্বতে স্বাধীনভাবে একা ঘোরার। ভিসার দরখাস্তে সে রকমই লিখেছিলাম। একবার না বললে দুবছরের মধ্যে আর আবেদন করা যাবে না, এরকমই নিয়ম। আমার ধৈর্য আছে, তাই নিরাশ না হয়ে আবার ভিসার জন্য আবেদন করি। দলের সঙ্গে সম্পূর্ণ তিব্বত আর লাসায় ব্যক্তিগতভাবে ঘোরার অসুবিধা নেই এটাই তাদের উত্তর। অবশ্য তাদের অজুহাত অস্বীকার করতে পারি না । ভাষা জানি না কাজেই অসুবিধা তো হবেই।

তারপরে আমি উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু যাওয়া ও তার প্রস্তুতির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমার দুই মেরু ভ্রমণকে ভ্রমণ না বলে অভিযানই বলবো কারণ যাদের সঙ্গে গিয়েছি তারা সবাইই অভিযাত্রী এক্সপ্লোরার আর ভ্রমণসূচীর নাম আন্টার্কটিক্ এক্সপেডিসন। আমাদের ভ্রমণ-অভিযান খুবই সফল হয়েছে আর আনন্দ তো বটেই। একটু বিশ্রাম করে আবার আবেদন জানালাম— ভিসার জন্য, তিব্বতে একা একাই ঘুরতে চাই। এবারে আমার ভিসা ফর্মের সাথে আমি ভূ-পর্যটক ও তার প্রমাণপত্রগুলো গুছিয়ে দিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার পরের দিনই ডাক এল, এ্যামবেসেডর মিঃ লিং আমাকে হাসিমুখেই আপ্যায়ন জানালেন আর বুঝিয়ে বললেন— “আপনি চীনা সরকারী ভাষা জানেন না আর তিব্বতি ভাষাও জানেন না কাজেই আপনার ভ্রমণের সুবিধার জন্য একজন তিব্বতি দোভাষী নিন তারপর একমাত্র নিষিদ্ধ এলাকাগুলো ছাড়া যেখানে খুশী যান আমাদের আপত্তি নেই।”

–“অশেষ ধন্যবাদ”। আমি খুশী হলাম। কয়েক সপ্তাহ্ পরই ২০০০ সাল, মিলেনিয়ামের শ্রেষ্ঠ উপহার।

নির্দিষ্ট দিনে আমি রওনা দিলাম। জেনেভা-দিল্লী-কাঠমাণ্ডু-লাসা। দীর্ঘ চার দশক পর আবার লাসায়। লাসা এয়ারপোর্টের নাম গাংগার। মাটি স্পর্শ করেই কৈলাসনাথের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালাম। মনে অদ্ভূত একটা শিহরণ জাগল, আনন্দ আর অনুভূতি একই সঙ্গে মন ও দেহকে হাল্কা করে দিল। মনে পড়ে গেল সেই বহু বছর আগেকার কথা । ঘর থেকে পালিয়ে গ্যাংটক থেকে একটা ছেলে একদল সাধুর সাথে এখানে এসেছিল হেঁটে

কাস্টমসের ওখানে একজন ‘স্বাগত' জানাল— আপনিই মিঃ দে?

-“হ্যাঁ” – “আমি স্রোংশী দোভাষী ওয়েলকাম টু লাসা”।

লাসায় ঢোকার সাথে সাথে চারিদিকে তাকিয়ে দেখি— এ কি? কোথায় এলাম ? আমার সেই স্বপ্নের লাসা কোথায় গেল? আমার শৈশবের সেই স্বপ্নটা হঠাৎ গয়ার সেই সাধুবাবার মাটির হাড়িটার মত সশব্দে ভেঙে পড়ল, হতবাক্ হয়ে চারিদিকে তাকাতে লাগলাম। গাড়ী হোটোলের দরজায় আসতেই স্রোংশী আমার দরজা খুলে আবার স্বাগত জানাল। রিসেপশনের কাগজপত্র সই করে পাশপোর্ট জমা দিলাম। রিসেপশনের মেয়েটি ইংরেজিতে বলল—“ওয়েলকাম টু লাসা, আপনার রুম নং একশ আট দোতলায়। আপনি বিশ্রাম করুন চা পৌঁছে দিচ্ছি।”

আমার রুম নং একশ আট বেশ ভাল নম্বর তো ধন্যবাদ, আমার স্যুটকেস নেই সবই পিঠের ব্যাগে। ঘরে ঢুকেই অবাক হলাম— বেশ সাজানো গোছানো পরিষ্কার ডেকোরেশনে ফরাসী ডিজাইন। ব্যাগটা রেখেই জানলা দিয়ে উঁকি মারলাম, বাইরের দৃশ্য সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ মডার্ন কালচারাল রেভোল্যুশানের নামে লাসায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন । আগেই শুনেছিলাম কিন্তু অনুভব করতে পারিনি— এখন স্বচক্ষে দেখছি হারিয়ে গেছে আমার সেই শৈশবের লাসা। হতাশায় ভেঙে পড়লাম এর জন্যই কি আমার লাসায় আসা? ধাক্কা খেলাম, সত্যি কালচারাল শক্!

চা এল, রিসেপশনিস্টই চা নিয়ে এল সঙ্গে বিস্কুট। বেশ ঠাণ্ডা। আমি প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। তাড়াতাড়ি চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। উত্তেজনাকে আর ধরে রাখতে পারছি না। হোটেল থেকে বেরোতেই স্রোংশী হাত রগড়াতে রগড়াতে এল

—“স্যার আমাদের বস্ আপনার সঙ্গে বসতে চান কোথায় কবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, যানবাহন খরচা সব ব্যাপারেই তিনি আপনাকে পরামর্শ দেবেন।” বুঝলাম এড়ানো যাবে না, আর উচিতও নয়— “ঠিক আছে চল” ওখান থেকে দূরে নয়। একটা নতুন বাড়ীর একতলায় অনেকটা পুলিস স্টেশনের মত একটা অফিস। ঘরে ঢুকতেই অফিসার বললেন— “বসুন”। তারপর পা দিয়ে ইলেট্রিক হিটারটাকে আমার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন—ইংরেজিতেই— “দেখছেন তো ইলেট্রিক এসে গেছে টেলিফোনও কাজ করছে আর ওই দেখুন আমাদের কম্পিউটর। এখানে বসেই বেইজিং-শাংহাই-চেংদু, গিলিন, কুনমিং, নানজিং, জিয়ান্ (Beijing, Shanghai, Chengdu Kunming, Nanjing, Xian) সব জায়গার হোটেল রিজার্ভেশন করতে পারবেন। ভাল ভাল ফাইভস্টার হোটেল। প্রত্যেকটা হোটেলে রেস্টুরেন্ট, কফি শপ্, পিয়ানো বার, ড্যানসিং, পিসিন, টেনিস কোর্ট, জিম্, চেঞ্জ, গাইড়, প্রাইভেট কার সব পাবেন। আসুন আসুন এই দেখুন সুঝু (Suzou) ফাইভ স্টার, কিং ওয়ার্ল্ড, সাউথ প্যাসিফিক্, এই দেখুন আর একটা প্রয়োজনীয় জিনিস— এখানে টাইপ করলাম— বেইজিং এখন আট ডিগ্রী, শাংহাইতে দশ ডিগ্রী...... ভদ্রলোক তাঁর নতুন গেজেট দেখাবার জন্য ভীষণ উৎসাহী, আমি তাকে থামাতে বাধ্য হলাম—

-“সরি আমি আজ খুবই ক্লান্ত, কাল সকালে আসবো”

-“ঠিক আছে, ঠিক আছে দেখলেন তো সব খবরাখবর এখানে বসেই পেয়ে যাবেন আপনি স্রোংশীকে আজকের জন্য পাঁচ ডলার দিয়ে দেবেন।”

—ঠিক আছে বলে আমি তার অফিস ছাড়লাম, উঃ হাঁফ্ ছেড়ে বাঁচলাম।

স্রোংশীকে বললাম—“আমি আজ এই শহরেই একলা একলা ঘুরতে চাই এই নাও পাঁচ ডলার, কাল সকালে হোটেলে দেখা করবে।” বললাম বটে রেহাই পেলাম না,

—“পাঁচ ডলারে অনেক কাজ আমি কোন কাজই করিনি, ঠিক আছে আমি আপনার সাথে সাথেই থাকবো, নয়তো বস্ ভাববে আমি ফাঁকি দিচ্ছি”

-“ঠিক আছে, তবে প্রশ্ন না করলে কথা বলবে না।” স্রোংশী রাজি হয়ে গেল ।

লাসা শহর, হোটেলের নামও লাসা। পুরনো স্মৃতি সেটাই স্বপ্নের সাথে মিশে মনের মধ্যে একটা রহস্যলোকের সৃষ্টি করেছিল। দুটো রাস্তার ফাঁক দিয়ে দূরে দেখা দিল পোতালা প্রাসাদ, উঁকি মেরে বলল— এই দ্যাখ্ আমি এখনও দাঁড়িয়ে, নতুন লাসার মধ্যে হঠাৎ পেলাম পুরনো গন্ধ। আনন্দে নেচে উঠল মন, স্রোংশীকে বললাম— “পোতালায় চল।” সে হাতে ঘড়ি দেখে বলল— “স্যার, ওখানে রেস্টোরেন্ট নেই, এখানে খেয়ে তারপর চলুন”

- -“ঠিক্ আছে, চল ভাল তিব্বতি রেস্টোরেন্টে”

—“তিব্বতি রেস্টোরেন্ট অন্যদিন আজকে চলুন ভাল চাইনিজ রেস্টোরেন্টে, তিব্বতি রেস্টোরেন্টে কোন ভ্যারাইটি পাবেন না স্যার।” তিব্বতে এসে খেতে হবে চাইনিজ রেস্টোরেন্টে। ঠিক্ আছে, মেনে নিলাম। তিব্বত তো এখন চীনদেশ কাজেই উপেক্ষা করি কি করে। কোলকাতা, দিল্লী থেকে শুরু করে জেনেভা-প্যারিস-লণ্ডন-নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি সব জায়গায়ই চাইনিজ রেস্টোরেন্টে ভরা। সেখানে তো মন বিদ্রোহ করে নি কাজেই এখানে কেন করবে? রাজি হয়ে গেলাম । খাওয়ার জন্য বসা নয় আসলে পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হবার জন্যই অর্ডার দিলাম, স্প্রিং রোল-নুড্‌ল-শশুয়ে, স্রোংশী নিল বিয়ার আর রোস্টেড ডাক্।

অদ্ভুত ব্যাপার তিব্বতের এই রাজধানীতে আমার দেখা মানুষগুলো যেন উধাও হয়ে গেছে। রাস্তায় রেড-ইণ্ডিয়ান (আমেরিণ্ডিয়ান)-দের মত হ্যাট্, গায়ে জ্যাকেট লেদার ভারী প্লাস্টিক অথবা উইণ্ড-প্রুফ্, রেস্টোরেন্টের বাইরে একটু দূরে ফুটপাতের ওপর বিলিয়ার্ড টেল খেলা ও দেখার ভিড়। চা এল চাইনিজ ব্ল্যাক টি; জিজ্ঞেস করলাম —“চ্যাং নেই?”—উত্তর আমরা রাখি না তবে বললে করে দেবো এই চায়ের সঙ্গে মাখম্ মিশিয়ে দেবো।” বুঝলাম রেস্টোরেন্টের মালিক চাইনিজ। রেস্টোরেন্টে বসে লাভই হল। স্রোংশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুরু হল ।

–“তুমি বিলিয়ার্ড খেলতে জানো ?”

–“নিশ্চয়ই ভাল খেলি, আপনি খেলবেন ?”

—“না, বিলিয়ার্ড সেটের খুব দাম তাই না?” আমার

আবার প্রশ্ন।

—“না, খুব সস্তায় পাওয়া যায়। আর যে কোন ক্লাবে বা চায়ের দোকানে বিনা পয়সায় খেলা যায়। ক্লাব, স্কুল বা প্রতিষ্ঠানে আজকাল ভীষণ চালু। পাড়াগাঁয়ের লোকেরা, বুড়ো-বুড়ীরা চক্র ঘোরায় আর ইয়ংরা বিলিয়ার্ড খেলে। একটা কিছু করে তো সময় কাটাতে হবে”– বলেই স্রোংশী হো হো করে হেসে দিল ।

——তুমি ঠিকই বলেছো, মালা জপ করাটাও তাহলে সময় কাটানোর জন্য তাই না ?” —“ঠিক, আপনি ঠিকই বলেছেন, ওগুলো সব পুরনো অভ্যেস, ভালভাবে বাঁচতে হলে আমাদের আধুনিক হতে হবে।”

বুঝলাম ওর কথাগুলো অনেকটা শেখানো বুলি। খাবার এল।

-“আচ্ছা এই রাস্তাটাই তো বারখর তাই না?”

-“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, আপনি জানেন? আগে এসেছেন ?”

–“ম্যাগাজিনে ও ডকুমেন্টারী ফিল্মে দেখেছি”, আমি উত্তর দিলাম ।

—“ওঃ তাই বলুন আমরা এই রাস্তাটা ধরে ঘুরবো, তারপর পোতালার দিকে যাবো, এটাই সোজা পথ।”

আমি খুব সাবধানে স্রোংশীর সঙ্গে আলাপ শুরু করলাম, খাওয়ার শেষে বিল হল, আমিই স্রোংশীকে খাওয়ালাম। ডলারে দিলে খুব খুশী, এক আমেরিকান ডলার সমান দশ ইউয়ান। পাঁচ ডলার ভাল খাবার স্রোংশীকে ডবল্ বিয়ার। রেস্টোরেন্ট থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এগিয়েই হঠাৎ বুকের ভিতরটা লাফিয়ে উঠল— “পেয়েছি পেয়েছি, আমার হারিয়ে যাওয়া জোখাং মন্দিরকে পেয়েছি।” ভীষণ আনন্দে প্রায় দৌড়ে গেলাম, তীর্থযাত্রীদের মধ্যে গিয়ে জুতো খুলে সাষ্টাঙ্গে লুটিয়ে পড়লাম জোখাং মন্দিরের দরজায় । কোনো প্রার্থনা নয়, কিছু পাবার জন্য নয়, শুধুই প্রণাম। শরীর, মন ও আত্মাকে লুটিয়ে দিলাম জোখাং-এর দেবতা জর রিপোচ্চের শ্রীচরণে। প্রণাম সেরে উঠে দাঁড়ালাম, তারপর তিব্বতি প্রথায় স্বস্থানে দণ্ডি কেটে উঠে দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকালাম।

জোখাং মন্দির যেমন ছিল তেমনই আছে— এতটুকু পরিবর্ত্তন হয় নি। চারদিকের নতুন বাড়ীঘরের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এই মাত্র। মনের জোর আর আনন্দ ফিরে পেলাম। জোখাং-এর প্রবেশদ্বার পিলার দেয়ালের ডেকোরেশন, অগণ্য প্রার্থনা ও ধর্নার জন্য আগত তীর্থযাত্রী, ধূপের গন্ধ ঘিয়ের প্রদীপ সব মিলিয়ে আমাকে নিয়ে গেল বিগত সেই চার দশকে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ফিরে পেলাম আমার অন্তরের সেই মৌনীবাবাকে ।

জোখাং-এর চারদিকে পরিক্রমা পথ স্থানীয় ভাষায় বলে বারখর। দোকান বাজারে ভর্তি অধিকাংশই পুরনো জিনিসপত্র বা অ্যান্টিকের দোকান, চক্র-মালা, ঘন্টা করতাল, পুরনো পয়সা আর বহু জানা-অজানা পুরনো সামগ্রীতে ভর্তি। বারখরের কোনো কোনো অংশ সম্পূর্ণ আধুনিক আর মন্দিরের আশে পাশে আগের মতোই পুরনো জোখাং আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। আমি আনন্দে ভরপুর, তাই স্রোংশীকে বললাম—

–“আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। কালকে খুব ভোরবেলা ব্রেকফাস্টের আগেই জোখাং-এ আসবো তোমাকে আসতে হবে না, আমি ঠিক চিনে আসতে পারবো। তুমি নটা নাগাদ আসবে তারপরে পোতালা যাবো, আমি এখন আবার জোখাং মন্দিরে যাবো ওখানকার আবহাওয়া খুব ভালো লেগেছে।”

–“বেশ আপনি ধূপকাঠি কিনবেন, আমার চেনাজানা দোকান আছে।”

–“চল ভালই, সস্তায় পাওয়া যাবে তো?” আমেরিকানদের মতো প্রশ্ন করলাম। স্রোংশী আমাকে ধূপকাঠির দোকান ধরিয়ে দিয়ে বিদায় নিল। ধূপকাঠি নিয়ে আমি আবার এলাম মন্দিরে। দেয়ালের গায়ে ধূপকাঠি ও ঘিয়ের মোমবাতি জ্বলে জ্বলে কালো আঠা হয়ে গেছে, সেই পুরনো দৃশ্য আমি খুঁজে পেলাম। দালানে চামড়ার আসন পেতে তার ওপর স্থায়ী দন্ডি কাটছে মানে প্রতিবার দাঁড়িয়ে, বসে ও সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে বারখর ধরে দন্ডি পরিক্রমা। কেউ সামনে পুরু চামড়ার চাদর ঝুলিয়ে দিয়েছে যাতে হাঁটুতে ব্যথা না লাগে অথবা সিমেন্টের ঠাণ্ডাতে যাতে কষ্ট না পেতে হয়। ভালভাবে দেখতে লাগলাম— নিঃসন্দেহে এরা সবাই তিব্বতি । ইষ্টদেবতার প্রতি তাদের অভাব অভিযোগ প্রার্থনা সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তরিক ভাব ও ভক্তি।

পরের দিন খুব ভোরে সাড়ে পাঁচটায় উঠে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লাম, ইচ্ছা ভোরের পুজো দেখা। ভীষণ শীত আর কুয়াশায় ঢাকা রাস্তা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে, নাটমন্দিরে ঢুকে দেখি সবাই নাক ডাক্‌ছে ভাবলাম ভোরের আরতির পর আবার সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, দু-তিনজনের কাশি হয়েছে, বসে বসে কাশছে, ভাষার অভাবে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। ভোরের আরতি ও পূজো দেখার জন্য আমিই একা ভক্ত প্রায় সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে হোটেলে ফিরলাম ।

জ্যাম-বাটার-ব্রেড নিয়ে রিসেপশনিস্ট ঘরে ঢুকল আটটার সময়

—“গুড মর্নিং স্যার শুনলাম আপনি জগিং করতে বেরিয়েছিলেন, খুব ভোরে

উঠেছেন খুব সাবধান ঠাণ্ডা লাগাবেন না।” জগিং কথাটা শুনে অবাক হলাম। হিমালয়ের এই কোণায়ও আমেরিকান স্টাইল এসে গেছে। জবাবে বললাম—

—“হ্যাঁ বেরিয়েছিলাম, আচ্ছা জোখাং-এ কোন প্রোগ্রাম নেই?”

‘জোখাং সকাল আটটায় খোলে, প্রার্থনা ও পাঠ হয়।”

-“অনেককে দেখলাম শুয়ে আছে”

—“ওরা অনেক দূর থেকে এসেছে, ওদের মানত আছে সব সেরে তারপর ফিরে যাবে। লাসার লোককে রাত্রিবেলা থাকতে দেওয়া হয় না” বুঝলাম পুজোর রীতি পাল্টেছে, সরকারী নিয়ম মানতে সবাইই বাধ্য।

স্রোংশী ঠিক সময়েই এল। জোখাং-এ এলাম প্রণাম করতে দন্ডি কাটা ও স্বস্থান প্ৰণাম আরম্ভ হয়ে গেছে। পুরোহিত ও ভিক্ষুদের নিম্নস্বরে ভারীগলায় পাঠ আরম্ভ হয়েছে। ভেরী, বজ্র আর বাদ্যের শব্দে জোখাং-এর দেবতা জেগে উঠেছেন। সারি সারি হলদে টুপীর মাথা নাড়ানো দেহের দোলানীর মধ্যে রয়েছে হিমালয়ের ছন্দ। সেখানে একঘন্টা বসে পূজো দেখে উঠলাম।

উঠতেই স্রোংশী বলল- “এদের দেখছেন তো সবাই হলদে টুপীর দল আর অন্য মনেস্ট্রিতে দেখবেন লাল টুপী, তিব্বতে এই দুটো সম্প্রদায়ই প্রধান”।

আমি স্রোংশীর কথায় সায় দিয়ে বললাম— “টুপীর রঙ আলাদা হলেও এরা সবাই সেই একই বুদ্ধের শরণাগত। যে যানে করেই যাক না কেন গন্তব্যস্থলে পৌঁছলেই হল তাই না ?”

—“হ্যাঁ আপনি ঠিক কথাই বলেছেন আমার বাবাও এই কথাই বলে” স্রোংশী এই প্রথম বাড়ীর কথা বলল ।

বারখরের বাজার এলাকা ছাড়াতেই এবার স্পষ্ট দেখতে পেলাম মহিমান্বিত লাসার চূড়ামণি পোতালা প্রাসাদ। ঠিক যেমন দেখেছিলাম তেমনই আছে। উত্তেজনায় বুকের মধ্যে ধক্ ধক্ করে উঠল। হঠাৎ নজরে পড়ল দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লম্বা কাঠের পাত্রে হামাল দিস্তের মত চা-এ মাখন মেশাচ্ছে, চুলের পরিপাটী বাহার, রঙিন জামা, ঘেরুয়া গলায় বিরাট পুঁথি পাথরের মালা। চোখাচোখি হতেই জিভ বার করে নমস্কার জানাল। একজন অল্পবয়সী আর একজনের মুখে বয়সের ভাঁজ পড়েছে। আমরা দাঁড়ালাম, আমাদের দাঁড়াতে দেখে ওরা উৎসাহিত হল। পাশের দোকানে গিয়ে বসলাম— চাইলাম চ্যাং। কৈলাসনাথ যাবার পথে আগের ছবিগুলো এখনও জীবন্ত কিন্তু লাসায় পুরনো ছবি খুঁজে বার করতে হয়। পুরনো কায়দায় নোন্তা মাখম চা লাসায় এখনও পাওয়া যায় তবে প্রাচীন পরিবেশের অভাব।

আমাদের সামনেই মারপোরি (MARPORI) পাহাড়ের ওপর তেরো তলা দালাই লামাদের রাজপ্রাসাদ। মনটা কেঁদে উঠল ১৯৫৯ থেকে রাজা ছাড়া রাজপ্রাসাদ। ১৯৫৯ সাল থেকে চীনা সৈন্যরা অধিকার করে বসে আছে গেলুপা (GELUGPA) সম্প্রদায়ের প্রাণকেন্দ্র। পোতালা প্রাসাদ জাদুঘরের মতো জনসাধারণের জন্য খোলা, তবে টুরিস্টদের সব জায়গায় যাওয়া নিষেধ। বাইরের প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে গিয়ে ওপরের আলো অন্ধকারের বারান্দা ঘরগুলোর মধ্য দিয়ে সরাসরি ওপরের ছাতে এনে টুরিস্টদের ছেড়ে দেওয়া হল। অন্ধকারের পরই আলো আর স্যাতসেতে ছম্ছমে ঘরগুলোর পরই উন্মুক্ত আকাশ ছাতে এসে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম আমি ও স্রোংশী এই দুজন মাত্র টুরিস্ট কিন্তু ছাতে এসে দেখি আরও আটজনের একটা দল। মিউজিয়ামের মতোই এখানে আসতে হলে টিকিট কাটতে হয় হোটেল বা ট্রাভেল এজেন্সীরাই সে দায়িত্ব নেয়। পোতালার এই ছাত থেকে সামনেই দেখছি জোখাং মন্দির ও চত্বর, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, আর সম্পূর্ণ লাসা শহরের এক অনবদ্য দৃশ্য ।

পোতালা প্রাসাদের দুটো ভাগ, একটা সাদা প্রাসাদ আর একটা লাল প্রাসাদ। সাদা প্রাসাদেই দালাই লামারা একের পর এক পুনর্জন্ম নিয়ে বাস করেছেন, এখান থেকেই তারা সমগ্র তিব্বত শাসন করতেন। সংলগ্ন লাল প্রাসাদ হচ্ছে রাজকীয় বিভিন্ন মন্দির আর দালাই লামাদের মৃত্যুর পর তাদের স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত স্মৃতি সৌধ ও সমাধি বেদী এক বিরাট স্বর্ণভাণ্ডার। গাইডের একটা কথা কানে বাজল — কঠিন শোনাল— “...চতুৰ্দশ দালাই লামা তেনজিং গীয়াৎসো এই প্রাসাদেই তাঁর শৈশব কাটিয়েছেন। ১৯৫৯ সালে তাঁর পার্শ্বচর মন্ত্রী ও পরামর্শদাতারা তাঁকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়।” শুনলাম, এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিলাম ।

সাদা রাজবাড়ীর হাত থেকে লাল রাজবাড়ীর ওপরকার সিংহ-ড্রাগনের প্যাগোডাগুলোর সোনালী রঙ চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়ে দিচ্ছে। এখানে শুধু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা তবে নিঃশব্দে নয়, টুরিস্টদের ক্যামেরার ক্লিক, বাজিং আর ফ্লাশ মনকে স্বপ্ন রাজ্যে বিচরণ করতে দেয় না। ছাত থেকে নেমে এলাম ঢুকলাম পাশের লাল প্রাসাদে। দেয়ালের অতি সুন্দর সূক্ষ্ম কাজগুলো আলোর অভাবে ভালো করে দেখা যায় না। আর ভেতরকার প্রত্যেকটি মন্দিরের গায়ে মানে দেওয়ালে ও থামে কালো তেলের প্রলেপ। গাইড খুব গর্ব করে বলল— “এত সুন্দর সুন্দর কাজগুলো কাঠকয়লার ধোঁয়া আর তেল ও ঘি-এর প্রদীপ জ্বালিয়ে ওরা নষ্ট করে ফেলেছে। কালচারাল রেভোল্যুশনের পর আমরা সেইসব বুজরুকি বন্ধ করে দিয়ে চীনদেশের এই অমূল্য সম্পদগুলো রক্ষা করেছি। আমরা এখন চেষ্টা করছি দেওয়াল চিত্র ও তাংখাগুলোকে পরিষ্কার করে প্লাস্টিক প্রুফ করার। তাতে বহু বছর রাখা যাবে।”

প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে পোতালার রহস্যময় ঘরগুলো ঘুরে বাইরে এলাম। কেন জানিনা এত সুন্দর সাজানো রাজপ্রাসাদ কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই মনে হচ্ছে হানাবাড়ী, চারদিক থেকে বিদেহী আত্মারা এসে আমার চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে মনে হচ্ছে তারা বলছে মুক্তি দে ... মুক্তি দে .... . মুক্তি দে ...। মনে হয় আমি খুব সেন্সি অথবা ভাবপ্রবণ - যাই হোক কিছু একটা হবে। এই পথেই আবার সিঁড়ি আর রাস্তা ধরে চলে এলাম জোখাংএর দিকে। হঠাৎ মনে পড়ল জোখাং মন্দিরে ঢুকেই ডানদিকে ছিল এক অষ্টধাতুর মহাকালের মূর্ত্তি তার পাশেই ছিল আর একটি নারীমূর্ত্তি সম্ভবতঃ মহাকালী। তিব্বতে বা নেপালে মন্দিরে যে কোন ভক্ত ঢুকতে পারে, চরণস্পর্শ করতে পারে, ভারতের মতো পূজারী পাণ্ডার বাণিজ্য বেড়া নেই, অত্যধিক শীতের দেশ তাই চান করতে হয় না, জুতো না খুললেও চলে৷ অনায়াসে ভেতরে এলাম ধূপ ও চালের পাশেই দেখলাম সেই পুরনো, প্রায় অবহেলিত মহাকালের মূর্তি— প্রশ্ন এল মহাকালী কোথায় লুকোলেন? সারাদিন জোখাং-এ বারান্দায় বসে বার বার দর্শন করতে লাগলাম জয় শাক্যমুনী লাখাং, জয়ো শাক্যমুনী, জয়ো রিমপোচে, একই মূৰ্ত্তি বহু নাম। ধূপের গন্ধ নীচু ভারী গলায় প্ৰাৰ্থনা আর অদৃশ্য ও সুক্ষ্ম একটা ভাব লহরী আমাকে আনন্দলোকে নিয়ে এল।

বলাই বাহুল্য স্রোংশী একটু বেকায়দায় পড়েছে। তিব্বতের ওপর বা লাসার ওপর আমার ইন্টারেস্ট কম দেখে ভাবছে খদ্দেরটা হারাবে। উপযাচক হয়ে জিজ্ঞেস করল— “আজকে চলুন তিব্বতি রেস্টোরেন্টে খাবেন ? ”

-- -“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” আমি হেসে জবাব দিলাম, তারপর খুব আন্তরিকতার সুরে বললাম— “স্রোংশী তোমাকে কয়েকটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবো তুমি ইচ্ছে হলে উত্তর দেবে আর যদি না দাও তাহলেও চলবে আমি কিছু মনে করবো না।” একটু দ্বিধা করে ছেলেটি উত্তর দিল

- – “ঠিক আছে বলুন”

-“তুমি কি তিব্বতি মানে লাসার লোক?”

–“হ্যাঁ, আমরা সবাই তিব্বতি। আমরা কী চু নদীর ধারে উচু গ্রামের লোক, এখান থেকে প্রায় এক ঘন্টা লাগে মানে জীপে।”

-“তাহলে তোমাকে খুলেই বলি। আমি তিব্বতে এসেছি তিব্বত দেখবার জন্য, এখানকার মানুষদের সঙ্গে মেশার জন্য। আমি শাংহাই, বেইজিং, হংকং, জিয়াং, চেংদু গেছি, চীনদেশ ঘুরেছি— কিন্তু এখানে এসেছি তিব্বত দেখার জন্য। তুমি আমাকে যতটা সম্ভব তিব্বতের অরিজিনালিটী দেখাও এটা আমার অনুরোধ। অবশ্য যদি সম্ভব হয়।”

আমার কথা শুনে স্রোংশী বেশ কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল—

—“আমাকে একটু সময় দিন আমি আধঘন্টার মধ্যেই আসছি, আপনি ওই ওপাশের দোকানটা দেখছেন যেখানে বাইরে গ্যাসের আগুনে রান্না হচ্ছে ওখানে খেতে চলে যান আমি ওদের বলে রেখেছি। ভাত-ভাজা শুকনো মাছ সব্জি সব পাবেন খাবার আগে ও পরে চা”

—“ঠিক আছে।” আমি রাজি, হোটেলটার মালিক তিব্বতি গ্যারান্টি ।

আধঘন্টা নয় প্রায় এক ঘন্টা পর স্রোংশী (SRONGSHEE) এল সঙ্গে একজন বয়স্ক লোক। স্রোংশী পরিচয় করিয়ে দিল—শুরু হল ওর কথা “আমার বাবা, আমার বাবা খুব মাই ডিয়ার। আমরা গাইড় আমাদের চলতে হয় বসের পরামর্শে, আমি সরকারি গাইড্ সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না, তবে আমার বাবা পারবে। আমরা টুরিস্টদের লাসায় যেখানে খুশী নিয়ে যেতে পারি, এমনকি আমাদের বাড়ীতেও চা-এর জন্য ডাকতে পারি। তবে দালাই লামার লোক বা সাংবাদিক হলে আমাদের সাথে স্পেশাল অফিসার থাকে। বুঝতেই পারছেন আমরা মানুষ, আমাদের খেতে হবে, বাঁচতে হবে, আমাদের বাচ্চাদের একটা ভবিষ্যৎ আছে। সরকারের সঙ্গে সহযোগীতা না করলে আমাদেরই ক্ষতি। দালাই লামা চলে যাওয়ার পর থেকে আমরা শুধু আশায় আশায় পথ চেয়ে বসে আছি, স্বাধীন তিব্বতের স্বপ্ন দেখছি, দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেল— আমরা শুনছি দালাই লামা প্যারিস যাচ্ছেন, লণ্ডন যাচ্ছেন, নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন সবাই তাঁকে সহযোগীতা করছে স্বাধীন তিব্বতের জন্য তারা চীনা সরকারকে চাপ দিচ্ছে। লাসায় আবার ফিরে আসবেন দালাই লামা, পোতালার চারদিক ঢেকে যাবে স্বাধীনতিব্বত পতাকায়। জানেন আমার বয়স এখন তিরিশ, আর কতোদিন বসে থাকবো । আমার বাবা-মা সেকালের মানুষ, তাদের ধৈর্য আছে, কিন্তু আমাদের নেই। আমাদের মধ্যে যারা দালাই লামার কথা বলছে তাদের হুশিয়ার করে দেওয়া হচ্ছে, যারা দেশের লীডার হতে চাইছে তারা রাতারাতি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে, একটু বাড়াবাড়ি করলে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যাচ্ছে।

আপনি কি জানেন এই লাসায় আমাদের সংখ্যা অর্দ্ধেকেরও কম। বেশীর ভাগই পপুলার। ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য দলে দলে চীনের লোকেরা লাসায় এসে ঘাটী বসাচ্ছে চীনের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের অজুহাতে, চীনাদের আনা হচ্ছে। আমাদের কিন্তু অত সুযোগ দিচ্ছে না, বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে যায়।

স্যার, বিশ্বাস করুন আমরাও মানুষ, আমরাও চাই বাঁচতে। আমরা মাটি কামড়ে পড়ে আছি— আমরা তিব্বতি এটা আমাদের দেশ মরতে হলে এখানেই মরবো। রিফিউজি হয়ে আমরা বাঁচতে চাই না। বাঁচবার একমাত্র উপায় লেখাপড়া শিখে বড় হওয়া অন্ততঃ সে সুযোগটা এরা দিচ্ছে— দেখা যাক্ ভবিষ্যতে কি হয়।”

স্রোংশী থামল— খাবার এল হাল্কা খিচুড়ি মত আলু কপি ভাজা, ডাল আলু টমেটোর তরকারী। তিনজনের খাবার চোখের সামনেই রেঁধে দিল আলাদা বাটীতে এল শুয়োরের কষা মাংস। বাবা ইংরেজী জানে না, ছেলে দোভাষীর কাজ করছে। স্রোংশীকে বললামতোমাদের আমিই খাওয়াচ্ছি, লজ্জা করো না, যা খাবার খাও। আশ্বাস পাবার সাথে সাথেই স্রোংশী অর্ডার দিল “একটা বিয়ার”। বাবার নাম জানা নেই, খেতে খেতেই মুখ খুলল –

“জানেন শী কাল রাতে যখন আপনার কথা বলল আমার যে কি আনন্দ হয়েছে আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। ভারতবর্ষ আছে বলেই তিব্বতের ধর্ম্ম টিকে আছে। আমাদের এখানে দিনের পর দিন ধর্ম্ম ভাষা লোপ পাচ্ছে। আর ভারতে তিব্বতি ভাষা ও ধৰ্ম্ম ভীষণ জাগ্রত ও উন্নত। মাননীয় দালাই লামা তো বটেই তিব্বতের জ্ঞানীগুণীরা সবাই এখন ভারতে। আপনি যা জানতে চান আমি সব জানাবো। জানেন আমার ওপরের চার দাদা ভারতে আছে, ছোটভাই কাঠমাণ্ডুতে থাকে। আমি কাঠমাণ্ডু তিনবার গেছি।” বাবার কথার ফাঁকেই স্রোংশী একটা জরুরী কথা বলল, – “হ্যাঁ, আর একটা কথা বলে রাখি। আমার বস্ বা কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবেন আপনি তিব্বতি ভাষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করতে এসেছেন। খুব সাবধান ধর্ম্ম, সমাজ ও দালাই লামার প্রসঙ্গ সরকার পছন্দ করে না।”

স্রোংশীর ডাক নাম শী তবে ও চায় না যে আমি ওকে শী’ বলে ডাকি, ওর সঙ্গে আমার অফিসিয়াল সম্পর্ক।

শুরু হল লাসার আর এক কাহিনী— বহুবার শুনেছি কিন্তু এখন চাক্ষুষ দেখছি, রেস্টোরেন্টে টুরিস্টদের খাওয়ার অসুবিধা নেই, বিশেষ করে তিব্বতি হোটেলে যখন খুশী ঢুকে খাবার চাইলেই ওরা হাসিমুখে করে দেয়। আজকাল মাংসটা খুব পাওয়া যায় । চীনারা শুয়োরের মাংস খুব পছন্দ করে, সব্জি এই সময় চীন থেকেই আসে। আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে উঠে পড়লাম ।

বাবা খাওয়াবার জন্য অনেক ধন্যবাদ দিল আর দূরের দোকানগুলোর দিকে তাকিয়ে শী-কে বলল—“এই ভাল মানুষটাকে লোবশাং তাশির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবি।” —বাবা বিদায় নিল।

র সেই মৌনীবালক বহু বছর পর আজ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে তার স্বপ্নের লাসাকে। আজ আর ঘুরবো না। এখন বিকেল, সকাল থেকে যা দেখেছি তাকে মনে গেঁথে রাখতে হবে, আস্তে আস্তে দেখা ভাল, সেদিনকার মত হোটেলে ফিরলাম। ঘরে হিটিং-এর ভাল বন্দোবস্ত, বিছানা-গদি-চেয়ার-টেবিল আর বাথরুমটাও ভাল গরমজলের জন্য রয়েছে গীজার আর কলিং বেল টেপার সাথে সাথে ওয়েটার— ভারতের যে কোন স্ট্যাণ্ডার্ড হোটেলের সাথে তুলনা করা যেতে পারে ।

আমি জানলার ধারে সোফার ওপর বসে বাইরের দিকে তাকালাম— মনে মনে ভাবলাম এখানে কি অবস্থায় এসেছিলাম আর এখন কি অবস্থায় আছি। আগে যখন এসেছিলাম দেহটা ছিল তুচ্ছ, রহস্যঘেরা এক অধ্যাত্মজগতে বিচরণ করছিল মন ও আত্মা। আর আজ এই হোটেলের বাইরের ভয়ানক ঠাণ্ডা থেকে বাঁচানো হয়েছে দেহটাকে, সব রকমের আরাম দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে এই শরীরকে কিন্তু মনটা যা চাইছিল, সেই রহস্যাবৃত লাসাকে— তাকে এখনও খুঁজে পাই নি ।

পরদিন স্রোংশী আসার সাথে সাথে বেরিয়ে পড়লাম— বারখর দিয়ে আবার পৌঁছলাম জোখাং মন্দিরে। পুজো-পাঠ আরম্ভ হয়ে গেছে, আজ আমার ভাগ্য ভাল মন্দিরে পৌঁছবার সাথে সাথে একজন পুরোহিত আমাকে কাছে ডেকে বসতে বললেন—“এখানে গরম, পাশে কড়াইতে কাঠকয়লার আগুন এখানে বসেই তুমি ধ্যান কর”, তার কথামত বসলাম আমার পাশে স্রোংশীও বসল। নীচু গম্ভীর গলায় পুঁথি পাঠ আর মাঝে মাঝে ঘন্টা ও ড্রামের আওয়াজে নিজেকে হারিয়ে দিলাম।

ঘন্টাখানেক পর পুরোহিতের অনুমতি নিয়ে উঠলাম, বাইরে এসে ধূপকাঠি ও মাখমের মোমবাতি কিনে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করলাম । ইতিমধ্যে জোখাং-এর চারপাশে দোকানগুলো খুলে মেলার আবহাওয়া তৈরি করেছে। মালা-পাথর-ঘন্টা, বজ্র-চক্র পোষাক আর নতুন ও পুরনো দ্রব্যের এক বিরাট বাজার। সবচেয়ে বেশী হচ্ছে পুরনো পয়সা ও লামাদের ব্যবহৃত অনেক আসবাব পত্র। আমরা জোখাং মন্দিরের সামনে উত্তর দিকের ফুটপাথে এসে একটা সুন্দর বুটিকে (দোকান) ঢুকলাম। পরিচিত হলাম লোবশাং তাশির সাথে (Lobsang Tashi)। তিনি খুব আগ্রহ সহকারে দোকানের সব জিনিস দেখালেন, তাংখা-মালা, ব্যাগ, পোষাক বিশেষ করে টুপী-জুতো লামাদের বিশেষ ধরনের পোষাক।

আমি জিজ্ঞেস করলাম— “আমি তো লামা নই, কাজেই এই পোষাক আমার চলবে ?” উত্তরে তাশিজী হেসে বললেন-

—“এগুলো সব তিব্বতি পোষাক, লামারাও পরে আর সাধারণ তিব্বতিরাও পরে। ট্যুরিস্টরা আজকাল অনেক কিনছে। বিদেশেও যায়।”

-“বিদেশেও যায়?” আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

-“হ্যাঁ নিশ্চয়ই, চীনা সরকারের সাথে ইউরোপের অনেক ব্যবসাদার বাণিজ্য করে তারাই সব ব্যবস্থা করে। হবেই না বা কেন, আমাদের সব মাল হাতে তৈরি তিব্বতেই তৈরি, আমাদের দোকানের ইতিহাস শুনবেন ? ”

—“নিশ্চয়ই বলুন”– আমি আগ্রহ প্রকাশ করলাম, ভদ্রলোক পাশের চা-এর দোকানে তিনটে ভাল চায়ের অর্ডার দিয়ে আমাদের টুলে বসিয়ে দোকানের ইতিহাস বলতে শুরু করলেন।

-“আমাদের সবশুদ্ধ পাঁচটা দোকান। দোকানে সব জিনিসপত্র হান্ড্রেড পার্সেন্ট তৈরি হয় আমাদের মনেস্ট্রীতে। লামারাই সব তৈরি করে। আগের যুগে তারা ধ্যান ও প্রার্থনা করেই দিন কাটাতো কিন্তু সময় পাল্টেছে, আগে দালাই লামা ছিলেন, পাঞ্চেন লামা ছিলেন, তাঁরাই ছিলেন তিব্বতের শাসক ও সরকার। মনেস্ট্রীগুলোর খরচা তাঁরা সরকারি আয় থেকেই চালাতেন। পপুলার সরকার কোন কোন মনেস্ট্রীর রিপেয়ারিং খরচা দেয় কিন্তু খাবার আসে ভক্তদের কাছ থেকেই। কোন রকমে দিন কাটাচ্ছি, এভাবে কতদিন চলবে কে জানে। মাননীয় দালাই লামা এখন ভারতে আছেন, বেঁচে গেছেন আর মাননীয় পাঞ্চেন লামা বারো বছর চীনা কারাগারে থাকার পর দেহত্যাগ করেছেন।”

লোবশাং তাশিজীর কথাগুলো শুনে আশ্চর্য হলাম— এই চীন শাসিত রেস্ট্রিকটেড লাসায় বসে তিনি জোর গলায় কথাগুলো বলছেন কি করে, আমি উৎকণ্ঠা দমন করতে পারলাম না, জিজ্ঞেস করলাম

–“আমি ট্যুরিস্ট, আমাকে এই সব কথাগুলো বলার জন্য আপনাকে বিপদে পড়তে

হবে না তো?” স্রোংশী আমার কথাগুলো মনে হয় ভালভাবেই তর্জমা করেছে —তিনি হো-হো করে হেসে বললেন—‘“শী আমার কথা বলে নি বোধহয়, আমি পাঞ্চেন লামার শিষ্য আমার নাম লোবসাং তাশি, আমি লামা, আমি দীর্ঘ কুড়ি বছর জেলে ছিলাম, ছাড়া পেয়েছি ১৯৭৯ সালে। মহামান্য পাঞ্চেন লামার দেহত্যাগের পর চীনা সরকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে, পাঞ্চেন লামার মুল মনেস্ত্রী তাশি লুমপোর লামাদের ভরণ পোষণ বাবদ একটা থোক টাকা ধরে দেয়। আমি কমিটিতে আছি ওই টাকা দিয়েই আমরা পাঁচটা বুটিক খুলেছি, বারখরে এই দোকানগুলো থেকে যা আয় হয় তার থেকেই আমরা মনেস্ট্রীর সব খরচা চালাই।”

–“আপনি কমিটির কথা বললেন, কমিটির ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবেন ?”

চা এল মানে খাঁটি তিব্বতি চ্যাং নোন্তা মাখম দেওয়া স্বাদের জন্য নয় আসলে চাটা খেলেই মনে হয় তিব্বতি গন্ধ শরীরে ঢুকল। পুরনো বাঁশের চোঙায়, এক একটা

চোঙায় তিন চার কাপ তো বটেই। চা খেতে খেতেই তাশিজী আবার আরম্ভ করলেন— -“কমিটি মানে আমরা আগে যারা বিভিন্ন মনেস্ত্রী মানে মঠ ও আশ্রমের পরিচালক মণ্ডলীতে ছিলাম, তাদের মধ্যে অনেককেই ভাল ব্যবহার ও ভাল চরিত্রের জন্য সরকার মুক্তি দিয়েছে। তাদের নিয়েই জন সরকার একটা নতুন মঠ পরিচালক মণ্ডলী তৈরি করেছে। আমাদের মধ্যে সরকারী প্রতিনিধি তো আছেই, আসলে তারাই সর্বেসর্বা, আমরা নিমিত্ত মাত্র। তবে আমাদের বিদ্যা আছে, শিক্ষা আছে, অভিজ্ঞতা আছে, সরকার আমাদের কথা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিতে পারে না। আমরা যারা লামা সন্ন্যাসী, তারা সবাই বিনা মায়নায় কাজ করি, আমাদের খাওয়া দাওয়া পোষাক আর যাতায়াতের গাড়ীভাড়া ওই সরকারি ভাতার থেকেই আসে। আমি এই বুটিক (দোকান) গুলো দেখাশুনো করি, অন্যান্য অনেকে ভাষা শিক্ষা দেয়, পূজো উৎসবের জন্য অনেকে দায়িত্ব নিয়েছে, মঠের শিক্ষা ও ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্যও আমাদের মতো প্রবীণদের ডাকা হয়।”

–“তার মানে বুঝতেই হবে যে আগের মতোই সব কিছু চলছে তাই না ?”

—“তিব্বতের দু'জন মহাজ্ঞানী গুরু, একজন পাঞ্চেন লামা, আর একজন দালাই লামা, একজন দেহত্যাগ করেছেন আর একজন ভারতে উদ্বাস্তু হয়ে আছেন, তিব্বত আজ গুরুহীন, কাজেই আগের মতো চলছে বলি কি করে, আমি এর বেশি কিছু বলতে পারবো না, বাকিটা নিজের চোখেই দেখুন।”

অজস্র অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে কিছু মালা-তাংখা ও সুভনির কিনে দোকান ছাড়লাম ৷ তাশিজী আমার নামে একটা স্ট্যাম্প করে উপহার দিলেন।

লোবসাং তাশির কথাই মেনে নিলাম, শুরু করলাম নিজের চোখে দেখতে। বিচার নয় অনুযোগ নয় শুধু দেখা। হোটেলের অনতিদূরেই নতুন একটা ক্লিনিক হয়েছে। স্রোংশীর ইচ্ছা ওখানে যাই ওর মামা ওই হাসপাতালে কাজ করে। আর স্বাস্থ্য ও শিক্ষার দিকে যদি ট্যুরিস্টরা ইন্টারেস্টেড হয় তাহলে এই নতুন হাসপাতালটা পরিদর্শন করবার অনুমতি দেওয়া আছে। পরের দিন আগের মতোই আমরা এলাম জোখাং-এ পূজো দিতে। পূজারী যথারীতি আসনে বসতে বলল। দুঃখের বিষয় আমি তিব্বতি ভাষা জানি না, জানা থাকলে তাদের সাথে প্রার্থনায় যোগ দেওয়া যেত। প্রার্থনা শেষে আমরা আর একবার চা পান করলাম তারপর এলাম লাসার নতুন এলাকায়, মানে নতুন লাসায়। সত্যি নতুন ঘর বাড়ী দোকান পশরা আর মাইক ও রেডিওর আওয়াজে রাস্তা জমজমাট। নতুন লাসার সাথে পুরনো লাসার বিরাট তফাৎ। লাসায় চলতে চলতে মনে হচ্ছে তিব্বতের বাইরে কোন চায়না টাউনে এসে পড়েছি। পোষাক পরিচ্ছদে মডার্ন আর রাস্তাঘাটে চীনাদের সংখ্যা তিব্বতিদের থেকে অনেক বেশী বলে মনে হচ্ছে। শহরটা এলোমেলো ভাবে গড়ে উঠেছে। আমরা হাসপাতালে এলাম, আউটডোরের ভীড়ের মধ্য দিয়ে ভেতরের একটা অফিসে এসে ঢুকলাম

—মেডিকেল অফিসার আমাকে স্বাগতম্ জানালেন, ভদ্রলোক ইংরেজী জানেন সরাসরি কথা হল। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন

–“আজ ভীষণ কাজের চাপ, আপনার সঙ্গে থাকতে পারছি না, শুনেছি আপনি ভারতীয় বাইরে থাকেন, আমাদের সম্পর্কে অনেক শুনেছেন অধিকাংশই সাংবাদিকদের বাড়িয়ে লেখা সবই নেগেটিভ্। আমরা অনেক ভাল কাজও করেছি আরও করছি সেগুলোও আপনাদের জানা দরকার। ট্যুরিস্টরা মানে বিদেশী সাংবাদিকরা আমাদের ভাষা জানে না তাই বেসরকারী লোকদের থেকে আজে বাজে কথা টুকে খবর তৈরী করে ছাপায়। আমার আজকে সময় কম নয়তো আপনাকে সব ঘুরিয়ে দেখাতাম, সংক্ষেপে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি— আমাদের সরকার ভীষণভাবে উঠে পড়ে লেগেছে এদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য। প্রত্যেকটা মহকুমা ও জেলায় নতুন নতুন স্কুল ও হাসপাতাল তৈরী হয়েছে— কিন্তু স্কুলে কেউ আসতে চায় না। চীন একটা বিরাট দেশ, জাতীয় ঐক্য আর যোগাযোগের জন্য চাই দেশীয় ভাষা। এরা চীনা ভাষা একদম শিখতে চায় না ৷ শিক্ষিত না হলে তারা সরকারী চাকরী পাবে কি করে। আমরা জাতীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রামবাসীদের আকুপাংচার শেখাবার জন্য ‘বেয়ার ফুট ডক্টর’ প্রোগ্রাম চালু করি কিন্তু কেউ আসে না। আমরা কি করবো বলুন। আমরা লাসাকে নতুন করে সাজাতে চাই। চীনের অন্যান্য প্রদেশের মতো অটোনোমাস তিব্বত ব্যবসা-বাণিজ্য করুক বড় হোক, সেটাই তো সরকারের কাম্য। দেশের লোক শিক্ষিত হয়ে সরকারী পদ গ্রহণ করুক সেটাই তো আমরা চাই। আর একটা কথা কি জানেন? আপনি লোবসাং তাশির দোকানগুলো দেখেছেন? ওই লামা ভদ্রলোক চোটসোক কমিটিতে আছে। চোটসোক সরকারের ধর্মীয় সংস্থা। তিব্বতের যত মঠ-মন্দির-আশ্রম-পাঠকেন্দ্র আছে সেগুলো পরিচালনা করে এই কমিটি। কোন সংস্থার জন্য কত টাকা ব্যয় করা হবে বা বরাদ্দ করা হবে তার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী এই কমিটি। বিদেশী লোকেরা বলে আমরা কম্যুনিস্ট পার্টী, তাই ধৰ্ম্মকে অবজ্ঞা করছি। আসলে তা নয়, এই কমিটির মারফতেই আমরা তিব্বতের ঐতিহ্য বজায় রাখছি। আমি আপনাকে তিব্বতের উন্নতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা বিশদ জানাতে পারি কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ আমি খুবই ব্যস্ত তাই আর সময় দিতে পারছি না, আপনি আমাদের থার্ড অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন সে আপনাকে হাসপাতাল ঘুরিয়ে দেখাবে।”

অফিসার আমাদের বিদায় জানালেন। আমি শুধু শুনে গেলাম, থার্ড অফিসারই স্রোংশীর মামা, দেখেই বুঝলাম তিনি তিব্বতি। এখানে মিঃ অমুক বা নামধরে সম্বোধনের ধরণটা নেই সবই অফিসের পদ অনুযায়ী। হাসপাতালে ঢুকে অফিসারের তিব্বতের ওপর ব্রিফিং আশা করিনি। স্রোংশী বলল- এটাই সরকারী নীতি কে কোথায় বসে কি কাজ করছে বলা মুশকিল।

থার্ড অফিসারকে অর্থাৎ মামাকে বেশ ভাল লাগল, তিনি সহাস্যে বললেন-“আপনি প্রশ্ন করুন আমি উত্তর দেবো।”

প্র : শুনলাম তিব্বতে যত মঠ ও বিহার রয়েছে তার পরিচালনায় রয়েছে লোবসা তাশির মত প্রবীন লামারা

উ : হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন তবে এসব লামাদের কোন ক্ষমতা নেই, আজকাল মঠগুলো রিপেয়ার করা হচ্ছে— ওগুলোই তিব্বতের প্রধান অ্যাট্রাক্‌সন।

প্র : উনি বললেন— অনেক প্রাইমারী ও সেকেণ্ডারী স্কুল খোলা সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না— কথাটা কি ঠিক? -

উঃ ঠিক্ আসে না তার মূল কারণ হচ্ছে ভাষা। চীনা ভাষা কম্পাসারী, তিব্বতিরা ভাবে চীনা ভাষায় লেখাপড়া শিখলে ছেলেমেয়েরা তিব্বতের ঐতিহ্য হারাবে আর চলে যাবে চীন দেশে।

প্র : গ্রামের হাসপাতালগুলো ফাঁকা কেন ?

উ : সাধারণ অসুখের জন্য লোকে হাসপাতালে আসে না, রোগ যখন কঠিন আকার হয় তখন তারা আসে, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আকুপাংচারের বেয়ার ফুট ডাক্তাররা কঠিন রোগ সারাতে পারে না, কারণ তাদের শিক্ষা মাত্র বেজিং-এ তিনমাসের। আমিও বেজিংএ ছিলাম, আমি সাতবছর অ্যানাটমী, ফিজিওলজি শিখে তারপর আকুপাংচার শিখেছি। আর একটা কথা কি জানেন, তিব্বতিরা চীনাদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। প্র : কেন বিশ্বাস হারিয়েছে?

উ : দুটো কারণ— এক নম্বর হচ্ছে ১৯৫৯ সালে শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে এরা তিব্বতের অনেক সর্বনাশ করেছে, আর দ্বিতীয় কারণ ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত তিব্বতের স্বাধীনতা সংগ্রমীদের ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার করেছিল তা লোকে এখনও ভুলতে পারে নি।

ভদ্রলোক অনায়াসে কথাগুলো বললেন সরাসরি তার অফিসারের কথার বিপরীত আমি অবাক হলাম— নিজের কৌতুহলকে দমন করতে না পেরে বললাম-

তো ?” -“আচ্ছা আপনি যে এ ধরনের কথা বলছেন তাতে কোনো বিপদের ঝুঁকি নেই

আমার কথা শুনে ভদ্রলোক একটু হাসলেন তারপর বললেন— বিপদের ঝুঁকি পদে পদে কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা বলি— অবশ্য ট্যুরিস্ট বুঝে। ১৯৫৯(1959) সাল থেকে শুরু হয়েছে চীনা কালচারাল রেভোল্যুশনের নামে তিব্বতি ধৰ্ম্ম ও ঐতিহ্য ধ্বংস লীলা । সেই সময়েই পুরনো ধর্ম্মনেতাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে ওরা চীনা নীতি জোর করে চাপিয়েছে। হাজার হাজার তিব্বতিরা চলে গেছে নেপালে ও ভারতে। প্রাচীন

জ্ঞানীগুণীদের আজকাল আর তিব্বতে পাবেন না। তাঁরা সবাই তিব্বতের বাইরে। ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে শুরু হল নতুন জেনারেশনের বিক্ষোভ, স্বাধীন তিব্বত ও চীনা মুক্ত লাসা আন্দোলনে নিহত হল স্বাধীনতাকামী যুবক যুবতীরা। আর যারা মিছিলে যোগদান করেছিল তাদের দেওয়া হল হাজত বাস। এই অত্যাচার চলল ১৯৮৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। আজ সমগ্র তিব্বত ও লাসায় নবীন নেতা আর কেউ নেই। যারা বাকি ছিল তাদের চাকরী ও উন্নত ধরনের জীবনযাপনের জন্য তিব্বতের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হ'ল। রাজধানী লাসা ও তিব্বতের আর্থিক উন্নতির অজুহাতে বাইরের থেকে চীনাদের আনা হয়েছে এবং আনা হচ্ছে। লাসায় আজ প্রায় সত্তর ভাগই চীনা। জোখাং-এর চত্বরে আর পোতালা প্রাসাদ পরিক্রমা পথে আপনি তিব্বতিদের পাবেন কিন্তু তারা সবাই লাসার বাইরের লোক, তারা এসেছে বিভিন্ন পার্বত্যাঞ্চল থেকে। নতুন লাসা এখন ভরে উঠেছে সিচুয়ান (Sichuan), কিংঘাই (Kinghai), ইউনান্ (Yunnan) ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আগত চীনাদের দ্বারা। আর যারা চালাচ্ছে সামরিক বাহিনী থেকে আরম্ভ করে, এই হাসপাতালের পরিচালক পর্যন্ত তারা প্রায় সবাইই এসেছে রাজধানী বেইজিং থেকে। তারা ভালভাবেই জানে আজ আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে ট্যুরিস্টদের আমরা কি বলি না বলি তাতে সরকারের এতটুকু ক্ষতি হবে না। বরঞ্চ তারা বাইরের জগৎকে বলে বেড়াচ্ছে— এই দেখো এরা স্বাধীন, চীনা অধিকৃত স্বাধীন তিব্বত। ট্যুরিস্টরা যেখানে খুশী যেতে পারছে ফটো তুলছে তিব্বতিরা ভালই আছে। নতুন জেনারেশন চীন সরকারকে মেনে নিয়েছে। তবে হ্যাঁ, যাই বলি না কেন, সরকারের কানে সব যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা দালাই লামার সংস্থা, জনসভা, উস্কানী অথবা বেইজিং সরকারের প্রকাশ্য বিরোধিতা না করছি ততক্ষণ পর্যন্ত তিব্বতিদের ওপর সরকার কিছু করবে না ।

হ্যাঁ, আপনাকে মনের কথা কিছু বলে ফেললাম, কারণ আপনি ভারতীয়, গান্ধীর দেশের লোক। আর অতীতে স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ থেকে শুরু করে নারূপা, মাপা, মিলারেপা, পদ্মসম্ভবা পর্যন্ত সবাই মহান্ ভারতের দর্শন ও জ্ঞানে আলোকিত আপনাকে দেখাই তো একটা পুণ্যের ব্যাপার। হ্যাঁ, এইবার আসুন আপনাকে আমাদের এই হাসপাতালটা ভাল করে দেখাই।”

এই বলে তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন ঘরগুলো দেখাতে লাগলেন— “দেখছেন বিরাট লাইন, এরা সবাই আউটডোরের রুগী, সকালবেলা লাইনের জন্য টিকিট দেওয়া হয়েছিল, অধিকাংশই পেটের অসুখ, মাথাধরা, কোমর ব্যথা। মেয়েদের ডিপার্টমেন্ট আলাদা । দেখুন, আমাদের অ্যাক্সিডেন্ট সার্জারীর যন্ত্রপাতিগুলো একবারে নতুন। চিলড্রেন ডিপার্টমেন্টটা দেখুন, নিউট্রিশন, ভ্যাক্সিনেসন-এর ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়েছে। ছোঁয়াচে রোগের জন্য ওই বিল্ডিংটা, ওখানে আমরা যাবো না, সাবধানের মার নেই। জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা আমাদের খুবই সাকসেসফুল প্রজেক্ট। লাসাতে এই ধরনের হাসপাতাল এই প্রথম, মডার্ন আর অভিজ্ঞ ডাক্তারে ভর্তি। হাসপাতালের এই সব অতি আধুনিক যন্ত্রপাতি দেখে রুগীরা ভয়ে পালায়। খুব শীগগীরই আমাদের স্ক্যানার আসবে ।

প্রশংসা করতেই হবে সত্যি আধুনিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর দেখেই বুঝলাম এদের কাজও ভালই চলছে। সব শেষে আমার শেষ প্রশ্ন :

– “এই রোগীদের মধ্যে তিব্বতিদের সংখ্যা কত ?”

আমার প্রশ্ন শুনে ভদ্রলোক তাঁর গাল চুলকে বললেন—

“খুবই কম, খুবই কম। তবে অ্যাক্সিডেন্ট হলে তিব্বতিরা কিন্তু এখানে আসতে বাধ্য

হয় আর ডেলিভারী কেসও প্রচুর। তবে যাই বলুন না কেন, এটা আমাদের বিরাট লাভ । অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে আমরা বিদায় নিলাম।

রাস্তায় বেরিয়ে স্রোংশীকে বললাম— অদ্ভূত তাই না? আমি দুটো দিকই পেয়ে গেলাম একজনের চীনা মন্তব্য আর একজনের স্বদেশী মন্তব্য। স্রোংশী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— আমি দোভাষী আমি দুটো ভাষাই জানি। সেদিনকার মত আমি স্রোংশীকে ছেড়ে দিলাম ।

পরের দিন বেরোলাম পোতালা পরিক্রমায়

পোতালা পরিক্রমার রাস্তাটাকে বলা হয়— লিংখোর (Linkhor)। পবিত্র পোতালা পরিক্রমা। আজ পূর্ণিমা তিথি পদ্মাসম্ভবার আবির্ভাব তিথি। জোখাং-এর বড় পুজো হবে আর দূরের তীর্থযাত্রী জোখাং মন্দিরে ধর্না দেবে আর লিংখোর ধরে পোতালা প্রাসাদ পরিক্রমা। জোখাং-এর মতো এখানে কেউ দণ্ডি কেটে প্রদক্ষিণ করে না, দেওয়াল স্পর্শ করে, মাথা ঠুকিয়ে, চক্র ঘুরিয়ে, বীজমন্ত্র জপে অথবা মণিমন্ত্র ধরেই এগিয়ে যায়। ভোরবেলা হোটেল ছেড়ে আমাদের আসতে আসতে বেলা ন'টা বেজে গেল। জোখাংএ পূজো দিয়ে পোতালার পাদদেশে এসে দেখি ইতিমধ্যেই অনেকে পরিক্রমা শুরু করে দিয়েছে। নানা রঙের যাত্রী, অতি সুন্দর দৃশ্য। এই প্রথম দেখলাম শুধু তিব্বতি, মনটা হাল্কা হয়ে উঠল। স্রোংশী বলল-“এরা সবাই দূর থেকে এসেছে, এরা আসলে অশিক্ষিত, এরা হয়তো জানে না যে পোতালা রাজপ্রাসাদে রাজা নেই। কার জন্য এই প্রদক্ষিণ ? ” আমি স্রোংশীর পিঠে হাত দিয়ে অতি আপন ভাব করে বললাম— “এদের অশিক্ষিত না বলে বল সরল ও সহজ গ্রামবাসী, প্রাসাদে বর্তমান চতুর্দশ দালাই লামা নেই, কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী সব দালাই লামাদের স্মৃতি সৌধ রয়েছে আর প্রাসাদের অভ্যন্তরে রয়েছে মন্দির, তাদের উদ্দেশ্যেই এই ভক্তি নিবেদন। তোমার ঠাকুর্দা নেই বলে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা কি পাপ?”

স্রোংশী আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল—“আপনি সত্যি জ্ঞানী, আপনার কথা মেনে নিতে বাধ্য, এটাই কি ভারতীয় দর্শন ?”

ছোট্ট উত্তর দিলাম— “হ্যাঁ”

আমরা মানে আমি সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে শুরু করলাম প্রদক্ষিণ, হাঁটতে হাঁটতেই স্রোংশী শুরু করল তার লেকচার :

–“আমাদের আশে পাশে যাদের দেখছেন তারা কেউ লাসার লোক নয় আমি দেখলেই ধরে ফেলব। লাসার চীনাদের মধ্যে অধিকাংশই হান, তারা তীর্থ করতে আসে না। আর বহু আন্দোলন, অত্যাচার আর শাস্তি পাওয়ার পর লাসার লোকেরা প্রকাশ্যে ধর্ম্ম চর্চা করতে ভয় পায়। তবে মঠ ও আশ্রম আজকাল খুলছে, সরকারি প্রচেষ্টায় আবার শুরু হচ্ছে অতীতকে জাগাবার চেষ্টা।

আমাদের সামনে ওই দূরে লম্বা চুল মাথায় লাল ফিতে ছেলে ও মেয়েরা সমান উঁচু, ওরা এসেছে উত্তরের চাং তাং (Chang Tang) অঞ্চল থেকে, লাসার থেকে ওখানে আরও বেশী ঠাণ্ডা। ওদের পরণে সব সময়ই ভেড়ার চামড়ার পোষাক। তাদের পাশের দুই মহিলা সামনে চামড়ার পেটী পর্যন্ত ওরা সাং (Tsang) অঞ্চলের, চাষ বাস করেই ওদের জীবিকার্জন হয়। ওদিকে দেখুন, কালো কোট কালো প্যান্ট অনেকটা আমেরিকার ওয়েস্টার্ন ফিল্মের কাউবয়দের মতো টুপী। ওরা ইয়াক ও ভেড়ার কারবার করে, বেশ ভাল লাভ করে ওরা এসেছে লিথাং (Lithang) থেকে। লিথাং অঞ্চলটা খাম (Kham)-এর পূর্বদিকে। একটা মজা দেখবেন চলুন একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে ওদের ছাড়িয়ে যাই।

স্রোংশীর কথামতো আমরা কয়েকজনকে ওভারটেক্ করতেই কানে এল কয়েকটা শব্দ “কুচি কুচি” স্রোংশী আমার দিকে তাকিয়েই হেসে দিল ‘কুচি কুচি’ মানে কি জানেন ? -“না।”

—কুচি মানে ‘দিন দিন’ ‘কিছু দাও কিছু দাও' মানে ভিক্ষা চাইছে, পরিক্রমার সময় কেউ কাউকে ওভারটেক করে না, কিন্তু যারা করে তারা নিঃসন্দেহে ট্যুরিস্ট। ট্যুরিস্টদের কাছে ভিক্ষা চাওয়া নিষেধ নয়। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন যে লাসায় আজকাল ভিখারীদের সংখ্যা কমে গেছে এটা কিন্তু চীনা সরকারের কৃতিত্ব। এই দেখুন আমাদের ডান দিকে একদল লোক সুন্দর দেখতে, খুব সরল এরা কারা জানেন? এরা হচ্ছে আমাদের মানে তিব্বতের বীর সন্তান খাম্‌পা। ওরাও থাকে খাম্ অঞ্চলে। খাম্‌পারা বীর যোদ্ধা সাহসী এমনকি চীন সরকারও ওদের ভয় করে। ১৯৫৯ (1959) সালে চতুর্দশ লামা যখন ভারতে পালিয়ে যান তখন এরাই পেছনকার চীনা সৈন্যদের আটকে রেখেছিল। এরা আসলে খাম প্রদেশের যাযাবর। বীর ও ধার্ম্মিক আমরা সবাই স্বীকার করি যে এই খাম্‌পারাই তিব্বতের বৈশিষ্ট্য আজও বজায় রেখেছে।

আমি স্রোংশীকে অন্যান্য যাত্রীদের আগে যেতে নিষেধ করলাম। ঐতিহ্যকে সম্মান দিতে হবে।

আমাদের আড়াই ঘন্টা লাগল পোতালা প্রাসাদ পরিক্রমা করতে, তারপর আবার এলাম বারখরের জম জমাট কেন্দ্রে। বারখরের মেলায় দুবার তিব্বতি নোন্তা চা খেয়ে হোটেলের পথ ধরলাম। হোটেলের কাছে আসতেই স্রোংশী অতি বিনীতভাবে বলল— “নতুন লাসায় আজকাল ভাল ভাল সুন্দরী চাইনিস্ মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে। লাসায় আর্মি হেড কোয়ার্টার আর প্রচুর সংখ্যায় ব্যবসায়ী আছে আসলে তাদের জন্যই একটা নতুন পাড়া বেশ জমে উঠেছে, আমরা গাইড্ সব ইনফরমেশনই আমরা দিই, তাই বললাম” আমি হেসে জবাব দিলাম- “ধন্যবাদ কাল আবার দেখা হবে। দেখতে দেখতে কয়েকদিন কেটে গেল। দেখছি আর বার বার থমকে দাঁড়াচ্ছি-সত্যি পরিবর্ত্তন— বিরাট পরিবর্ত্তন। পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল যে লাসার রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক আর ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পপুলার বা পিলস্ অব চাইনিস্ গভর্নমেন্ট-এর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আসলে রাজধানী দেখলেও বোঝা যায় সম্পূর্ণ দেশের হালচাল ।

কয়েকদিন ধরে পুরনো লাসা ও নতুন লাসা ভালভাবেই দেখলাম। তারপর বেরোলাম লাসার বাইরে।

লাসার বাইরে অনতিদূরেই দুটো বৌদ্ধবিহার সেরা আর দ্রেপুং। আর প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে তৃতীয়টি গানডেন। দালাই লামাদের যুগে এই তিনটি মঠই ছিল সমস্ত তিব্বতের দর্শন ও ধর্ম্মের মূল কেন্দ্র। পাঞ্চেন লামার ধর্ম্মীয় সংস্থা ছিল শীগাৎসে।

সেরা, অনেকের মতে সেরা বৌদ্ধবিহার হচ্ছে লামাদের মূল শিক্ষাকেন্দ্র। এখানকার তর্কবিদ্যা, তর্কশাস্ত্র আর অতি উন্নত ধরনের জ্ঞান যোগ এককালে শীর্ষস্থানীয় ছিল। বিরাট এলাকা গেলুপা সম্প্রদায়ের পীঠস্থান। চলতি ভাষায় বলে ডপ্ ডপ্ (Dop Dop) কেন্দ্র পাঁচটা বিরাট মহাবিদ্যালয়। ১৯৫৯ সালে চতুর্থ দালাই লামা যখন প্ৰাণ বাঁচিয়ে ভারতে চলে যান, সেই সময় এই সেরা মঠে ছিল প্রায় ন হাজার সন্ন্যাসী। এই মঠে সন্ন্যাসী ছাড়াও ছিল তিব্বত রক্ষী বাহিনী। এই মঠেই ছিল তিব্বত সেনাবাহিনীর মূল শিক্ষাকেন্দ্র বিশেষ করে দালাই লামার বডি গার্ডরা এখান থেকেই তৈরি হয়েছিল। সে কারণে চতুৰ্দ্দশ দালাই লামার পোতালা ছাড়ার পরই সেরা মঠের ওপর চীনা পি-এলএর আক্রমণ হয়। চীনা পিপ্লস্ লিবারেশন আর্মি ভেবেছিল এই মঠেই তিব্বতীদের সুরক্ষা বাহিনী আছে, তাই তারা সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে বিশেষ ধরনের কামান নিয়ে আক্রমণ করেছিল। সেই আক্রমণে মঠবাসী শিক্ষার্থী সন্ন্যাসী আর দেশপ্রেমিকরা অনেকেই প্রাণ দিল আর বাকীরা আহতদের নিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। সেই ধ্বংসাবশেষ আর গোলাবারুদের চিহ্ন আজও বৰ্ত্তমান। চীনা আক্রমণের ফলে সেরা মঠ ও বৌদ্ধবিহারের সব রকম কাজকর্ম স্থগিত রাখা হয়। মানে আইন বলে নিষিদ্ধ ছিল। চীনা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নামে এই ধ্বংসাত্মক লীলা শুধু যে অমানুষিক তাই না— একটা প্রাচীন উন্নত ও আধ্যাত্মিক পদ্ধতিকে ধ্বংস করবার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কথায় বলে রাখে হরি মারে কে? তিব্বতের এই সেরা বিহারের কার্যকলাপ আইন করে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়াতে ভারতের লামা, তিব্বতী মহল, মাননীয় দালাই লামার দরদি মহল ও ভক্তরা ভারতের মাটিতেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল 'নতুন সেরা বৌদ্ধবিহার'। ১৯৯৭ সালে সেই সেরা মঠের উদ্বোধন করলেন হিজ্ হোলিনেস্ ফোরটিনথ্ দালাই লামা। ডিসেম্বরের সেই বিরাট আর ভাবপ্রবণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বিশেষভাবে ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাননীয় দালাই লামা, কর্ণাটকের বীলাকুপ উদ্বাস্তু শিবিরের তিব্বতী ও স্থানীয় জনসাধারণকে বার বার তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন।

২০০০ সালে জেনেভায় এক সম্বর্ধনা সভায় মাননীয় দালাই লামা আমাকে বলেছেন— “ভারতের বীলাকুপের সেরা বৌদ্ধবিহারের (Bylakuppe, Karnataka) ধর্ম্মশিক্ষা বিশেষ করে তর্কবিদ্যা তিব্বতের সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে, কারণ সেরা বিহারের গুরু ও অধ্যাপকরা প্রায় সবাই চলে এসেছে ভারতে, দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই সব জ্ঞানীগুণী লামাদের মধ্যে অধিকাংশই আজ আর তাঁদের দেহে নেই। হয়তো তারাই আবার নবজন্ম নিয়ে ভারতের মাটিতে তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্ম্ম রক্ষা করছেন।”

তবে সব কিছুই যে খারাপ তা নয়। আজকাল চীনা সরকার সেরা বৌদ্ধ বিহারটিকে আবার সাজিয়ে গুছিয়ে তুলেছে। ভক্ত শিল্পী তিব্বতীরা দেওয়ালের কাজ, তাংখা আর পরিত্যক্ত মূর্ত্তিগুলোকে মেরামত করেছে ও করছে। গ্রামের লোকেরা শয়ে শয়ে আসছে ধ্বসে যাওয়া পাঁচিল আর ছাদগুলো মেরামত করতে। ট্যুরিস্টরা আসছে, তারাও সরকারকে চাপ দিচ্ছে আগের মত করে গড়ে তোলবার জন্য।

সবচেয়ে আনন্দ লাগল— যখন দেখলাম মূল মন্দিরটি অক্ষত অবস্থায়ই আছে। ‘হায়গ্ৰীভা’ অক্ষত অবস্থায় এখনও বিদ্যমান। এখানকার মূল কক্ষগুলোকে নতুন ভাবে সাজানো হয়েছে। পুরনোটির গন্ধ এখনও দেওয়ালে আঁচড় কাটলে পাওয়া যায়

প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে স্রোংশী পরিচয় করিয়ে দিল। আমি বেঙ্গল থেকে আসছি শুনেই তিনি বললেন— “মিলারেপা-আপা-নারপা সবাই মহাজ্ঞানী অতীশ গুরু থেকেই জ্ঞান পেয়েছেন। কোলকাতায় নিশ্চয়ই তার বড় মন্দির আছে তাই না ?”

আমি আফশোস করে বললাম—“না, কোলকাতায় বা তার আশে পাশে তার কোন মন্দির নেই, তাকে আপনারাই বাঁচিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি আমি তিব্বতগুরু মিলারেপার ওপর একটা নাটক লিখেছি কোলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে তা অভিনীত হচ্ছে তার মাধ্যমেই আমরা চেষ্টা করছি মিলারেপা দর্শনকে প্রচার করার

আমার কথা শুনে তিনি ভীষণ আনন্দিত হলেন আমাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন“রাত্তিরে আসুন, একসঙ্গে খাওয়া যাবে আর আপনার কথা শোনা হবে

দুর্ভাগ্য বলতেই হবে আমি রাজি ছিলাম কিন্তু স্রোংশী বলল—“আমাদের গাড়ী ঠিক করা আছে দুটো মঠে যাবার জন্য এরপর যাবো দ্রেপুং মঠে আর রাত্তিরেই ফিরতে হবে হোটেলে না ফিরলে অসুবিধা; তবে আপনি যদি আসতে চান পরে প্রোগ্রাম করা যেতে পারে” মনে হল সন্ন্যাসীর কিছু বলার ছিল কিন্তু হল না ৷

বিরাট এলাকা, মন্দির মঠ আর চোরতেনে ভর্তি। তবে লোকসংখ্যা আজ ন হাজারের পরিবর্তে মাত্র দু'শ জন। আর মাঝে মাঝে ছাত্ররা বিভিন্ন কোর্সের জন্য আসে তখন প্রায় চারশর মত দাঁড়ায়। ছাত্ররা তিন মাস, ছ মাস বা এক বছরের উচ্চ শিক্ষার জন্য আসে, আর আগে ছাত্ররা থাকত দশ থেকে কুড়ি বছর পর্যন্ত। বুঝলাম সময় পাল্টেছে, হয়তো একেই বলে যুগধর্ম্ম। আমরা সেরা মঠে প্রায় ২ ঘন্টা কাটিয়ে আবার রাস্তায় পড়লাম । আমাদের জীপের ড্রাইভার চীনা, বেশ হাসিখুশী চটপটে আর কথায় সবজান্তা । সুখের বিষয় ও ইংরাজি জানে না। কথায় কথায় বলল——চীনা অধিকারের আগে এখানে শুনেছি হাজার হাজার ছাত্ররা পড়াশুনো করতে আসত, এটা একটা বিরাট ইউনিভার্সিটী ছিল কিন্তু আজকাল এদের করার কিছুই নেই, সারাদিন কি করে কাটায় ?” -স্রোংশী তর্জমা করে দিতেই আমি উত্তরটা দিলাম

–“আমি আপনাদের রাজধানী বেইজিং-এ গিয়েছি। আগে সম্রাট ছিল, এখন সম্রাট নেই রাজপ্রাসাদ আছে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীতে তার একটা বিরাট গুরুত্ব আর মূল্য আছে। রাজপ্রাসাদ আর ভেতরকার প্রতিটি আসবাব পত্রগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে গুছিয়ে রাখার জন্য রয়েছে হাজার হাজার সরকারী কর্ম্মচারী। তাদের কাজ বেইজিংএর জাদুঘরগুলোকে ধূলো পরিষ্কার করে ট্যুরিস্টদের জন্য সাজিয়ে রাখা। এখানে এই সেরা মঠ ও পোতালা প্রাসাদ জাদুঘরের মতোই পুরনো স্মৃতিটাকে ধরে রেখেছে। লামাদের কাজ তাদের থেকে আর একটু বেশী। এরা চেষ্টা করছে পুরনো সেই শিক্ষা ও বিদ্যাকে এই মন্দির ও মঠগুলোর মধ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। চীনা সরকারও তাই চাইছে। আমার কথা ড্রাইভার মেনে নিল ।

পথে গাড়ীর জন্য দাঁড়াল, তেল নিতে হবে আর পাম্পের সঙ্গে একটা রেস্টোরেন্ট আছে মালিক নেপালী, সস্তায় খুব ভালো নেপালী খাবার তৈরি করে। ব্যাপারটা বুঝলাম । গাড়ীর তেল নেওয়াটা অনেকটা অজুহাত। গাড়ী থামতেই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এল— দেখেই বুঝলাম নেপালী। খুব খুশী হয়ে জোড়হাত করে দাঁড়িয়ে বলল—“নমস্তে।” স্রোংশা সরাসরি অর্ডার দিল—ভাত, ডাল, চিকেন, আলুভাজা।

ভদ্রলোক আমাকে দেখেই বলল-“নেপালী খদ্দের মাঝে মাঝে পাই তবে ইণ্ডিয়ান খদ্দের একদম পাই না— আমি আপনাকে খুব ভাল করে খাইয়ে দেবো, কোনোদিন ভুলতে পারবেন না । ”

হাতে একঘন্টা সময় আছে, স্রোংশীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাশের গ্রামে। পঞ্চাশষাটটা বাড়ী নিয়ে একটা গ্রাম। সবই পুরনো পাথরের গাথনির ওপর নতুন মাটির দেওয়াল আর টালির ছাত। ছেলেমেয়েরা বাইরে খেলাধূলা করছে। সেই পুরনো দৃশ্য বেশ ভাল লাগল। আমাদের দেখে দুজন গ্রামবাসী জিভ বার করে নমস্কার জানাল ।

–“এটা আসলে একটা নেপালী গ্রাম। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে লাসায় দুটো পুরনো সম্প্রদায় বেশ ভাল ব্যবসা করছে, তারা বেইজিং-এ যাচ্ছে আবার কাঠমাণ্ডু যাচ্ছে, আবার সুযোগ বুঝে চোরা কারবারীও করছে তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে ওরা খুব কষ্টসহিষ্ণু।”

– “এই দুটো সম্প্রদায় কারা ?”

—নেপালী আর তিব্বতি মুসলমান। দেশের উত্থান পতনের জন্য এরা মনে কিছু করে না কারণ এদের উদ্দেশ্য ব্যবসা। দালাই লামার আমলে ছিল, এখনও আছে। গ্রাম ঘুরে দেখি এরা নেপালী হলেও তিব্বতের হাওয়ায় নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।

খাবার সময় হল তাই রেস্টোরেন্টে ফিরলাম। এসে দেখি সত্যিই বাহাদুরের রান্নায় হাত আছে, আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-“আমার কাছে ভাল পুরনো আটা ছিল আপনার জন্য দুটো চাপাটি বানিয়েছি” -“বেশ ধন্যবাদ”।

খাওয়া দাওয়ার পর আবার জীপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দূরে দেখা দিল দ্ৰেপুং বৌদ্ধবিহার। অতি সুন্দর পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা দুর্গ। ধূলো উড়িয়ে গাড়ী তোরণের কাছে পৌঁছতেই দেখি চারদিক থেকে লামারা ছুটে ছুটে আসছে। আমাদের দেখেই দুপাশে হাত জোড় করে দাঁড়াল, যেন ভি-আই-পি ঢুকছে। স্রোংশী, ড্রাইভার ও সরকারী জীপ এদের চেনা। একজন বয়স্ক লামা এসে নমস্কার জানিয়ে বললেন

—আপনাদের জন্য খাবার তৈরি করবো ? ”

–“না, আমরা খেয়েই এসেছি, ঠিক আছে” “তাহলে যাবার আগে চা খাবেন। শুনলাম আপনি বাংগাল থেকে এসেছেন খুব ভাল— আপনি পালি ভাষা জানেন— আমি এক বছর শিখেছিলাম, আজকাল আর কোন শিক্ষক নেই।” ভদ্রলোক আনন্দে গদ গদ, তিনি লাসার থেকে টেলিফোন পেয়েছেন আমাকে দ্রেপুং-এর নতুন শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলার জন্য নির্দেশ এসেছে কাজেই শুরু হল তাঁর বক্তৃতা।

আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম—

–“আপনার পরিচয়টা জানা হয় নি”

–“আমি এখানকার সহকারী অধ্যক্ষ, আমাদের অধ্যক্ষ লাসায় থাকেন। এই দেখুন এই বিশাল জায়গা আর বিখ্যাত দ্রেপুং বৌদ্ধবিহার। তিব্বতের সবচেয়ে বড় আর পবিত্র। পোতালা প্রাসাদের থেকেও এর নাম বেশী। এখানে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দালাই লামা বাস করেছেন, তিব্বতের এই বিশাল দেশকে এখান থেকেই শাসন করতেন, পোতালা প্রাসাদ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই। পোতালা প্রাসাদ শুরু হয় মাননীয় পঞ্চম লামার আমলে। পঞ্চম লামা এখানে থেকেই পোতালা নির্মাণের পরিকল্পনা ও তদারকী করতেন। তাঁর সমাধি বেদী পোতালা প্রাসাদেই আর এখানে আছে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দালাই লামার সমাধি বেদী ও মন্দির। আসলে চতুর্থ দালাই লামা পর্যন্ত দ্রেপুংকেই বলা হত তিব্বতের রাজধানী। এই দেখুন মূল মন্দির প্রাসাদ আর বৌদ্ধ বিহার স্থাপিত হয়েছিল ১৪১৬ খৃস্টাব্দে। এই বৌদ্ধবিহারে ছিল চারটে মহাবিদ্যালয় আর রাজ্য শাসনের জন্য বিরাট বিরাট জমায়েৎ কক্ষ। এখানকার দালাই লামার প্রতিনিধি যেত খাম্, আমদো ও সুদূর ভারতের লাদাখ পর্যন্ত। লাদাখের বৌদ্ধবিহারটা দেখবেন, ঠিক এরকম

উনি বলে যেতে লাগলেন আর আমি নয়ন ভরে দেখতে লাগলাম তিব্বতের অদ্ভূত পাহাড়ী স্থাপত্য। ভেতরে সুন্দর করে সাজানো দেওয়াল চিত্র তাংখা মূর্ত্তি আর হাজার হাজার বইয়ের থাক। প্রচুর মন্দির, স্তূপ আর পত্ পত্ করে উড়ছে পতাকার মালা অবাক হয়ে দেখছি দূরে নজরে পড়ল দুটো ভাঙা মন্দির, আমার দৃষ্টি অন্যদিকে আকর্ষণ করে সহকারী অধ্যক্ষ বলে যেতে লাগলেন তাঁর শেখানো বুলি—“আগে এখানেই ছিল সরকারী ভবন, চারপাশে ছিল জমিদার ও শাসনকর্তাদের বাড়ীঘর। প্রায় আট হাজার লোক স্থায়ীভাবেই এখানে থাকতো। কিন্তু সে সময়ে এখানে চিকিৎসার কোন সুব্যবস্থা ছিল না, শুধু বড়লোক বা বিশিষ্ট লামাদের জন্য একটা চিকিৎসা কেন্দ্র ছিল, গরীবদের কথা তারা ভাবতো না। এখন এখানে আকুপাংচারের জন্য বেয়ার ফুট সেন্টার খোলা হয়েছে। আকুপাংচার ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার দিকে সরকারের কড়া নজর দেশের সকলকে শিক্ষিত হতে হবে, দেশে কোনো ভিখিরি থাকবে না। ধর্ম্মকে কেন্দ্র করে বিরাট ফিউডাল সরকার গরীবদের অবজ্ঞা করে নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতো। আজকাল সব পাল্টে গেছে। ১৯৫৯ সালের পর একটা বিরাট সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে গরীবদের বিনামূল্যে চাষযোগ্য জমি দেওয়া হয়েছে। আজ তিব্বত আর মরুভূমির দেশ নয়, মাঠে পাহাড়ে গম আর সব্জির বাগানে ভৰ্ত্তি ... "

—“ওই ভাঙা বিরাট বাড়ীটার কথা কিছু বললেন না তো?”

আমার প্রশ্নে তিনি একটু ঢোক গিলে উত্তর দিলেন—

-“তিব্বতের উন্নতির জন্য যখন চীনা সৈন্যবাহিনী গরীবদের উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসছিল তখন সুযোগবাদীরা আর ধনীরা বাধা দিয়েছিল। চীনা মুক্তিবাহিনীর কামানে তাদের ঠাণ্ডা করে দেওয়া হয় তারই চিহ্ন। বুঝতেই তো পারছেন যুদ্ধ তো একপক্ষে হয় না ।”

ভদ্রলোক থামতেই আমি আবার প্রশ্ন করলাম ---

--“এখানে তো আগে নিরস্ত্র শান্তিকামী লামা ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা থাকতেন তাদের বিরুদ্ধে কামান চালাতে হল কেন?”

—“লামারা শান্তিকামী ছিল, কিন্তু তাদের পিছনে ছিল ফেওদাল সরকারের হাত।” আর একটা প্রশ্ন— “আপনি এই মঠ চালাবার জন্য কোত্থেকে ট্রেনিং ও শিক্ষা পেলেন ?”

- -“আমি তিন বছর বেইজিং-এ ছিলাম তারপর প্রথম পোস্টিং ছিল চেংদুতে ওখানে একবছর থাকার পর এখানে প্রমোশন পেয়ে এসেছি। আমার মাতৃভাষা তিব্বতি, সরকারি ভাষা চীনা।” আমাদের ভবিষ্যতে দুটো ভাষার পরিবর্ত্তে একটা ভাষাই হবে পুরনো বই ও ধর্ম্মশাস্ত্রের চীনা অনুবাদের কাজ চলছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সুবিধাই হবে। পরিদর্শন শেষে আমরা একসঙ্গে বসে চা খেয়ে বিদায় নিলাম। বলাই বাহুল্য যে সেরা ও দ্রেপুং দেখার পর আমার আর কিছু দেখার ইচ্ছাই রইল না। বৌদ্ধবিহারের ওপর কামানের গোলার দাগ আমার মনে ভীষণ ভাবে ব্যথা দিয়েছে। বৌদ্ধবিহারের বাড়ীঘর, মন্দির আর সুন্দর সুন্দর ছোট ছোট গলি সব চোখের ওপর থেকে উধাও হয়ে ভেসে উঠল এক ধ্বংসাত্মক রণক্ষেত্রের চিত্র, যেখানে নিরীহ ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী আর ধর্মীয় নেতাদের রক্তে নদী বয়ে গিয়েছিল। দ্রেপুং-এর পাহাড়ি সৌন্দর্যকে আর উপভোগ করতে পারলাম না। লাসার পথ ধরলাম। যাবার পথে রামচে মন্দিরে পনেরো মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে প্রণাম করে পাশের তিব্বতি চায়ের দোকানে ঢুকলাম, বললাম বেশ ভাল করে খাঁটি তিব্বতি চা খাওয়াও ।

লাসায় ফিরেই ড্রাইভার ও স্রোংশীকে ছেড়ে দিলাম। এখন মাত্র বিকেল চারটে। হোটেলে ঢুকে সরাসরি চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়, বিশাল দুটো বৌদ্ধ বিহারের অনেক কিছুই দেখার ছিল, দেখলামও অনেক কিন্তু বার বার কামানের গোলায় বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের ছবিটাই চোখের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনটাকে কিছুতেই স্থির করতে না পেরে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। অদ্ভুত ব্যাপার রাস্তা থেকে যেন তিব্বতীরা হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। চোখের সামনে শুধুই দেখছি চীনা আর চীনা সেনাবাহিনী । রাস্তার নাম, দোকানের সাইনবোর্ড সবই চীনা ভাষায় লেখা। ট্রাজিসটর বাজছে চীনা সুরে মেয়েলি গলায়, ফুটপাতের ওপর বিলিয়ার্ড খেলার কৌতুহলী জনতা। ভাবলাম আমি কি সত্যি তিব্বতের রাজধানী লাসায় আছি না চেংদুতে ?

আরও দুদিন লাসায় থাকলাম। লাসার জোখাং মন্দির আর বারখারের বাজার, বাইরের ট্যুরিস্টদের কাছে এই দুটো স্থানই আকর্ষণীয়, বাকী সবটাই বলতে গেলে ‘মেড্‌ ইন চায়না'। পোতালা প্রাসাদ এখন সম্পূর্ণ জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। এথেন্স, রোম, প্যারিস, প্রাগ ইত্যাদি ইউরোপের শহর ও ভারতের দিল্লী, জয়পুর, হায়দ্রাবাদের প্রাসাদ ভ্রমণের মত অবস্থা। পোতালার গোল্ডেন-রুফ গলি আর খাঁটি তিব্বতি ধরনের অলি গলি ঘুরিয়ে গাইডেরা শিল্প ও ঐতিহাসিক তথ্য পরিবেশন করে কিন্তু ধর্ম্ম ও দর্শনের কোন উল্লেখই করে না। দালাই লামার প্রসঙ্গ উঠলেই সরাসরি বলে দালাই সেভেন্‌থ্, দালাই এইট্‌থ্ ইত্যাদি।

এবার ঠিক করলাম লাসা থেকে বেরিয়ে যাবো। মানস সরোবর ও কৈলাসনাথ কয়েকবার গেছি, ১৯৫৬ সালের পর এদিকে আসা হয় নি। রাস্তাঘাটের সব নাম চীনা ভাষায় লেখা আর বিশেষ বিশেষ জায়গায় ট্যুরিস্টদের জন্য ইংরেজিতেও লেখা আছে। তিব্বতি ভাষায় কেন লেখা নেই— এই প্রশ্নের উত্তরে খুব স্মার্ট আসার পেয়েছি— “তিব্বতিদের রাস্তাঘাট মুখস্থ তাদের ডিরেকসনের দরকার নেই।” স্রোংশী বলেছেসাইনবোর্ডগুলো চীনা সৈন্যবাহিনী, চীনা ব্যবসায়ী, আর চীনা সরকারী কর্ম্মচারীদের জন্যই লেখা ।

লাসা থেকে বাইরে যাবার পরিকল্পনা করবার জন্য ট্যুরিস্ট অফিসে এলাম। বস্ খাতির করে বসাল, তারপর সরাসরি এলাম আমার ভ্রমণের জন্য একটা গাড়ী আর বিভিন্ন জায়গায় থাকার প্রসঙ্গে। আমাকে মাথা ঘামাতে হল না, ওদের সব কিছুই ছক বাঁধা। আমি তারই মধ্যে একটা আইটিনেরারী বেছে নিলাম। ওই অফিসে আরও চার জনের একটা জার্মান গ্রুপ এসেছে তাদের সঙ্গেই বসে ঠিক করলাম লাসার উত্তরে যাবো, পাহাড়ে ট্রেকিং করার ইচ্ছে। আমিই প্রস্তাব করলাম- নাম সরোবর পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। সবাই রাজি ও খুশী, ট্যুরিস্ট অফিসার তো আরও খুশী, গাইড় গাড়ী, ড্রাইভার, রেস্টোরেন্ট সব ক্ষেত্রেই লাভ। আর তার চেয়েও বেশী লাভ যে এই ধরনের ট্যুরিস্টরা —দালাই লামা, ধর্ম্ম ও রাজনীতির কোন প্রশ্ন করে না। সম্পূর্ণ খরচাকে পাঁচভাগে ভাগ করা হবে সবশুদ্ধ তিন রাত্রি ও চারদিন— প্রথম রাত গেস্ট হাউসে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় রাত্রি ক্যাম্পিং সবশুদ্ধ দিনে মাথাপিছু কুড়ি ডলার। ট্যুরিস্ট অফিসার জানালেন যে আমাদের লাভই হয়েছে, আর্দ্ধেক খরচায় সব হয়ে গেল। বাইরের থেকে এই ধরনের প্রস্তাবের জন্য আরও মাথাপিছু দশ ডলার করে দিতে হয়, আর আরও দশ ডলার সরকারি ঐতিহ্য রক্ষা তহবিলে দান করতে হয়। লাসা থেকে ব্যবস্থা করলেন বলে আপনাদের ঐ খরচটা বেঁচে গেল। মাথা পিছু কুড়ি ডলার বেঁচে গেল ৷

-“ধন্যবাদ — ধন্যবাদ অসংখ্য ধন্যবাদ।”

ট্যুরিস্ট অফিস থেকে বেরোতেই স্রোংশী বলল-

-“আপনি সত্যিই ভাগ্যবান, গানদেন বৌদ্ধবিহার আপনাকে একা যাবার পারমিশান

দিতে চাইছিল না। জার্মান ও আমেরিকান ট্যুরিস্টরা ভাল ওরা খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে না ।” পরের দিন সকাল বেলা আমরা রওনা দিলাম। হোটেলে মালপত্রগুলো রেখে দিলাম কারণ চারদিন পর আবার এখানেই ফিরে আসছি। ফোর হুইল ড্রাইভ, বেশ বড় জীপে ড্রাইভার সমেত আমরা মোট সাতজন, সামনে তিনজন আর পেছনে চারজন আটজন ভালভাবে বসা যায়। ড্রাইভার বলল দশ এগারো জন হলেও চলে যায়। চারজন জার্মানীর দুই দম্পতি আসলে গার্ল ফ্রেন্ড আর বয় ফ্রেন্ড অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে। বেশ হাসিখুশী, পরিচয় হল মার্ক-জুডিথ, হাস-এলজা। ওরা অন্য হোটেলে ছিল ওদের নিয়েই গাড়ী এল। গাড়ীর ছাতে তাঁবু আর ওদের পিঠের ব্যাগ। পরস্পর পরস্পরকে সুপ্রভাত জানিয়ে বসলাম। গাড়ী ছাড়ল ।

গাড়ী ছাড়ল আমাদের প্রোগ্রাম লাসার নরবুলিংকা প্রাসাদ, তারপর লাসার নতুন মডার্ন টাউন ঘুরে সরাসরি গানদেন, দুপুরে গানদেনেই খাওয়া হবে ।

নরবুলিংকা মনের ছবিতে যেরকম ছিল সেরকমই আছে স্রোংশী আরম্ভ করল তার বক্তৃতা। জীপের ইঞ্জিনের শব্দে ওর গলা শুনতে পাচ্ছিল না তাই ট্যুরিস্টরা বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল পুনরাবৃত্তির জন্য বাধ্য হয়ে গাইড মাইক নিল।

এই দেখুন লাসায় অতি আধুনিক ইন্টারনেট সাইট বিল্ডিং, তিব্বতে এই ধরনের বিল্ডিং এই প্রথম। এভেন্যুটাকে দেখুন, প্রশস্ত, পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, বেইজিং-এর অনেক অফিস এই এভেন্যুতেই পাবেন। পুরনো লাসার সঙ্গে এর দিনরাত তফাৎ। সব চীনা জাতীয় উৎসবগুলো এখানেই হয় আর সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজের বাৎসরিক অনুষ্ঠান তো বটেই। দেখার মত। তিব্বতের নববর্ষের উৎসব শাক্যমুনী উৎসব আর অন্যান্য ঐতিহ্যমূলক অনুষ্ঠানগুলো জোখাং মন্দির ও পুরনো লাসাতেই হয় কোনটাকেই বাদ দেওয়া হয় নি। বার বার গাইডের কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে চীনা সরকার এখানে না এলে লাসাকে এখনও চারশ বছর পিছিয়ে থাকতে হত। একটা চাইনিজ্ রেস্টোরেন্টে গাড়ী দাঁড়াল চা খাওয়া ও নতুন লাসার ছবি তোলার জন্য...। অদ্ভুত সাইনবোর্ডগুলোর অধিকাংশই চীনাভাষায়। তারপর এলাম নরবুলিংকার পথে ।

–“এই দেখুন, দালাইদের গ্রীষ্মাবাস-প্রাসাদ নরবুলিংকা। পোতালার তুলনায় কিছু না কিন্তু গঠন আর দরজাগুলোর কাজ দেখার মত।” দেখেই মনে হচ্ছে নতুন রঙ করা হয়েছে।

নরবুলিংকা দেখা মাত্রই মনটা চলে গেল অতীতে, অতীতের সেই ছবির সঙ্গে তুলনা করতে চাইল। তবে মৌনীবাবা যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিল তার আর সেই সময়কার মানসিক অবস্থার সাথে বর্তমানের বিরাট তফাৎ কালের তফাৎ, কিছুটা মিলেছে, দেখলাম বাগান ও নতুনত্ব অনেক কিছুই। মনের মধ্যে তুলনামূলক প্রশ্ন না এনে সরাসরি স্রোংশীর বক্তৃতায় মন দিলাম ।

–“লাসার পশ্চিম শহরতলীর এই জায়গায় প্রথমে ঘাস ও জংলী গাছে ঢাকা একটা ছোট জলাশয় ছিল আসলে একটি উষ্ণপ্রস্রবণ। জলের তাপমাত্রা ছিল স্নানের উপযোগী । সপ্তম দালাই পায়ের ব্যথায় ভুগছিল, এখানে এসে কয়েকবার স্নান করবার পর তার পায়ের ব্যথা অনেকটা কমে যায়। তারপর থেকে প্রতি বছর গরমকালে সে আসতো চান করতে। এই খবর শুনে তদানীন্তন চীনা প্রতিনিধি (দি রেসিডেন্ট কমিশনার ফ্রম দি কিং ডাইনাস্টি The Resident Commissioner from the Qing Dynasty) এখানে ছোট্ট একটা বাড়ী তৈরী করলেন, বাড়ীটার নাম দিলেন উয়ুনাওপোজ্জা (Wunaopozhang), স্থানীয় লোকেরা বলত নাটমন্দির। মূল উদ্দেশ্য ছিল যখন দালাই এখানে স্নান করতে আসবেন, তার যেন কোন কষ্ট না হয়।

তারপর সপ্তম দালাই নিজেই দ্বিতীয় একটা বিরাট বাড়ী তৈরি করালেন, তার নাম দিলেন গেসাংপোজ্জাং ( Gesangpozhang)। তারপর শুরু হলো অভ্যন্তরীণ মন্দির, ভক্তদের থাকবার বন্দোবস্ত আর সুন্দর বাগানবাড়ী। সেই পুরনো জলাশয়টাকে সুন্দরভাবে বাঁধিয়ে পবিত্র স্নান ক্ষেত্র করা হল। গরমকালে এখানকার আবহাওয়া উপভোগ্য। তারপর থেকে দালাইরা ছোট বেলা থেকে আঠারো বছর পর্যন্ত গরমকালে পড়াশোনা করার জন্য এখানেই থাকতেন।”

তার কথা শুনে হঠাৎ সিনেমার মত চোখের সামনে ভেসে উঠল ... এখানেই আমি দেখেছিলাম চতুর্থ দালাই লামা শ্রীমৎ তেনজিন গিয়াৎসোকে। বলিষ্ঠ দীপ্তবান এক নবীন সন্ন্যাসীকে। সেই প্রথম দর্শন। স্মৃতির পটে স্থায়ী চিত্র হয়ে আছে তার সেই চাউনির মধ্যে ছিল এক আকর্ষণীয় শক্তি। ষোল বছরের একটা ভারতীয় ভিখিরী তীর্থযাত্রীর সামনে উদিত হয়েছিল এক প্রশান্ত রহস্যজনক মূর্তি— মাননীয় সর্বজন পূজিত দালাই লামা। সম্পূর্ণ তিব্বতের প্রতীক। মনটাকে আবার নিয়ে এলাম বর্তমানে । গত বছর সুইজারল্যাণ্ডের লজান শহরে দেখা এই দালাই লামার সঙ্গে তার মিলটা কোথায়? মিল অবশ্যই আছে, সেই একই মন, একই আত্মা, নরবুলিংকায় যাকে দেখেছিলাম বাগানে চুরি করে রাজপুত্রকে দেখার মতো করে। তিব্বত-অধিপতি দালাই লামার গুণ-শক্তি তার বিরাটত্বকে জানার মত কোন বিদ্যা বা গল্পকাহিনীজানা ছিল না— সম্পূর্ণ এক অজানা মন দেখেছিল নরবুলিংকা আর পোতালা প্রাসাদের রাজাকে আর এখন তিব্বত-জানা

দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখেছি দালাই লামাকে। মনের কোঠায় সেই পুরনো রহস্যঘন নরবুলি কার নবীন দালাই লামাই স্থায়ী আসন পেতে বসে আছে।

- হঠাৎ যেন দেখতে পেলাম দূরে একটা ছোট্ট দল এদিকেই আসছে। সামনে দুজন লোক এগিয়ে চলেছে ——বলছে নগরবাসী হুশিয়ার মহামান্য তিব্বতিধপতি দালাই লামা আসছেন— প্রশেসনটা এগিয়ে আসছে, প্রশেসনের মাঝখানে এক নবীন সন্ন্যাসী আমাকে কে যেন কানে কানে ফিফিস্ করে বলছে – “ইনিই তিনি, তুমি ভাগ্যবান তার দর্শন পেলে” তাঁকে দেখলাম, কিন্তু আমাকে দেখলেন কি? জানি না, আমি দেখলাম, আমারই লাভ। -

-“চলুন আবার গাড়ীতে উঠি”—কার ডাকে যেন আমার স্বপ্ন ভাঙল, পাশে দাঁড়িয়ে স্রোংশী। গাড়ী আবার ছাড়ল। জানলা দিয়ে শেষবারের মত নরবুলিংকা দেখলাম। সেই নবীন সন্ন্যাসীকে মনে হল কারা যেন শত সহস্র শৃঙ্খলতার মধ্যে আটকে রেখেছিল। ধর্ম্ম ও তপস্যার বেড়াজালে জগৎ-দেখার স্বাধীনতা ওই নবীন সন্ন্যাসীর নেই। সেই নবীন সন্ন্যাসীকে আজ দেখছি ধৰ্ম্মশালায়, গয়ায়, ফ্রান্স, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে—সম্পূর্ণ এক আলাদা মানুষ। পোতালা আর নরবুলিংকা প্রাসাদের পাঁচিলের বাইরের এক মুক্ত পুরুষ। তিব্বতের তন্ত্র বৌদ্ধধর্ম্মের তন্ত্রধারা আর কালচক্রের দীক্ষাগুরু প্রচার প্রসাররত এক কৰ্ম্মযোগী।

গাড়ী এবার একটা উপত্যকার রাস্তা ধরল।

মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ছিল তাকে দমন করতে পারলাম না। স্রোংশীকে জিজ্ঞেস করলাম

- -“তুমি দালাই দালাই বলছিলে কেন তিনি দালাই লামা, একটু সম্মান দেখানো উচিৎ, শত হলেও তুমি তো তিব্বতি”

-“ঠিকই আমি তিব্বতি বটে, কিন্তু চীনা সরকারের গাইড় ও দোভাষী। আমাদের ট্রেনিং হয়েছে বেইজিং-এ। চীনা জাতীয় সরকারের ট্রেনিং ও শিক্ষা অনুযায়ী আমাদের পেশা। বেইজিং-এর ল্যাংগুয়েজ, গাইড় ও আর্কিটেকচার স্কুল আমাদের যা শিখিয়েছে আমরা তা বলতে বাধ্য। আমাদের প্রধান সচিবের নাম হয়তো আপনি শুনে থাকবেন— মিঃ ঝাং হুইঝেন (Mr. Zhang Huizhen), চায়না ও টিবেটান হিস্ট্রির প্রফেসর, আমেরিকায় অনেকবার গেছেন।” –“বেশ, ধন্যবাদ, তোমার এত কোয়ালিফিকেশন, সত্যিই প্রশংসনীয়।”

লাসা থেকে বেরিয়ে আমি যেন মুক্তি পেলাম। একটা অনিন্দ্য সুন্দর উপত্যকার মধ্য দিয়ে একঘেয়েমী শব্দ করতে করতে জীপটা এগিয়ে চলেছে। ছোট ছোট গ্রাম। দূরে অজানা পাহাড়ি চূড়ায় সাদা বরফের খেলা।

দেখা দিল দূরে পাহাড়ের দেওয়ালে খোদাই করা কতগুলো বাড়ী। স্রোংশী সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল—

—“ওই দেখুন দূরে গানডেন মনেস্ট্রী। অপূর্ব সুন্দর।”

গানডেন পাহাড়ি কন্যা, অভিনন্দন, প্রশংসনীয় বহু নামে পরিচিত। এই প্রথম দেখছি এক অবিস্মরণীয় ভাস্কর্য! এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য! তিনটি পাহাড়ি দেওয়ালে তৈরি হয়েছে মানুষের তৈরি কতগুলো অবিশ্বাস্য অট্টালিকা। গাড়ী কাছে আসতেই আরও আশ্চর্য হলাম। মনে হয় কোন এক জাদুকর এই বাড়ীগুলোকে আলাদা জায়গায় তৈরি করে উড়ন্ত দৈত্যদের দিয়ে ওই পাহাড়ের দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রেখেছে। পোতালার থেকে এখানকার স্থাপত্যের বাহাদুরী অনেক অনেক বেশী। ১৪০৯ সালে গেলুপা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ধর্ম্মবীর ৎসোংখাপা-র এক ঐতিহাসিক অবদান। চারহাজার তিনশ মিটার উচ্চতায় বৃত্তাকার পাহাড়ের দেওয়ালে তৈরি এই মনেস্ট্রীর আকর্ষণীয় সৌন্দর্য আমাদের স্তম্ভিত করে দিল।

স্রোংশীকে কিছু বলতেই হল না, সূর্যোদয়ের মত এই গানডেন বৌদ্ধবিহার নিজের সৌন্দর্যে নিজেই উদ্ভাসিত। ওরা ফটো তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর আমি ধরে রাখলাম মনের পর্দ্দায়, শরীরের প্রতিটি কোষকে সজাগ করে দিয়ে গ্রহণ করতে লাগলাম এর সৌন্দর্য। জার্মান সহযাত্রী জুডিথ জিজ্ঞেস করল— “তুমি ক্যামেরা আন নি? আপশোস করো না, আমি জার্মানে ফিরে গিয়ে তোমার জন্য একটা কপি পাঠিয়ে দেবো।”

-“ধন্যবাদ। তুমি ধরে রাখছো ক্যামেরায়, তোমার মৃত্যুর পর এখানকার ফটো এখানেই পড়ে থাকবে, সঙ্গে যাবে না, আমি ধরে রাখছি আমার মনের গহনে, প্রত্যেকটি কোষের স্মৃতিতে আটকে রাখছি এই সৌন্দর্য, পরজন্মে আবার দেখবো, এর স্পন্দন পুনর্জন্মেও আমার শরীর ও মনে ধ্বনিত হবে।”

-“আচ্ছা তুমি পুনর্জন্মে বিশ্বাসী”

-“হ্যাঁ”

-“সত্যি তুমি ভাগ্যবান, কারণ তুমি ভারতীয়, হিন্দু”

গাড়ী বিরাট তোরণ দিয়ে ভেতরে ঢুকল, পাশেই পার্কিং-এর জায়গা। হলুদ রঙের কম্বল জড়িয়ে পাঁচ ছ'জন তরুণ সন্ন্যাসী দাঁড়িয়েছিল। হাসিমুখে আমাদের স্বাগতম্ জানাল— আমরা বিরাট একটা হলঘরে ঢুকলাম, দূরে বিরাট অভয় মুদ্রায় ভগবান বুদ্ধ আমাদের আশীর্বাদ দিচ্ছেন। দেওয়ালে অসংখ্য তাংখা, আর পাশের একটা ঘরে পাঠাগার। সুসজ্জিত কুলুঙ্গি ভৰ্ত্তি শয়ে শয়ে ধৰ্ম্মীয় পুস্তক। সোনালী, হলুদ, নীল, লাল ইত্যাদি উজ্জ্বল রঙে দেওয়াল চিত্র বুদ্ধদেবেরে জীবনী, মারা আর মন্ডলার আকর্ষণীয় চিত্র। হলঘরের প্রত্যেকটি থামই অতি যত্ন সহকারে রঙ করা হয়েছে। পূজোর প্রত্যেকটি সামগ্রীই ঝক্‌ঝক্ করছে মনে হচ্ছে যেন একেবারে নতুন। এত সুন্দর ভাবে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে চিন্তা করলে আশ্চর্য হতে হয়। এর পেছনে রয়েছে প্রচুর পরিশ্রম আর শিল্পীসুলভ মনোভাব। এখানে দিনের আলো বেশ ভালভাবেই প্রবেশ করেছে, কাজেই সূক্ষ্ম কাজগুলো সহজেই চোখে ধরা পড়ছে।

একজন প্রৌঢ় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এগিয়ে এলেন, পরিচিত হলাম— এই মঠের প্রধান লামা। আমি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম, অন্যরা হ্যান্ডশেক করল।

ভদ্রলোক হাসিমুখে অতি বিনয় সহকারে জিজ্ঞেস করলেন—“আপনি কি ভারতীয় ?” —“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

—“আমাদের সকালের প্রার্থনা ও পাঠ হয়ে গেছে, এখন ছেলেরা সবাই খাবার ঘরে চলে গেছে, তবে আপনাদের ইচ্ছে হলে ওদের ডাকতে পারি, ওরা কাংগীওর পাঠ শোনাতে পারে।”

– “না, আপনাকে আর কষ্ট করে ওদের ডাকতে হবে না।”

-“তাহলে চলুন, একসাথে খাওয়া যাক”

–“আমার আপত্তি নেই, তবে নির্ভর করছে স্রোংশীর ওপর।”

-“আমার আপত্তি নেই” স্রোংশী জবাব দিল

খাওয়ার পর আপনাদের যদি ইচ্ছে হয় তাহলে এখানকার পুননির্মাণ তহবিলে কিছু সাহায্য দিলে এই মঠের কাজে লাগবে।

আমরা রাজি হয়ে গেলাম। আমার মনে হয় এটাই আমাদের প্রোগ্রামের মধ্যে ধরা ছিল। চলে এলাম কলেজের হলঘরে। অদ্ভুত ব্যাপার কম করেও দু'শ (২০০)-র মত ছাত্র অথচ নিঃশব্দ। সত্যি, শৃঙ্খলাবদ্ধ। ছাত্রদের সঙ্গেই আমরা বসলাম, যবের ঝোলা ছাতু, আলু সেদ্ধ আর বাঁধাকপির ঝোল ।

খাওয়া দাওয়ার পর মঠধ্যক্ষ মঠ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানাতে লাগলেন। গানদেন মঠ তিব্বতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৯ সালে এখানকার সন্ন্যাসীদের (ভিক্ষু) সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার (৫৫০০)। সেরা ও দ্রেপুং বৌদ্ধবিহারও এরকমই ছিল কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় এটাই ছিল সবচেয়ে উন্নত। মাননীয় দালাই লামার শিক্ষাগুরু ও দীক্ষাগুরু এই বিহার থেকেই বাছাই করা হত। এখানকার আরও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এখানকার মঠধ্যক্ষ বা প্রধান লামা পুনর্জন্ম প্রথা অনুসারে নির্বাচিত হতেন না। তিব্বতের যত মঠ আছে তার মধ্যে যিনি সেরা, তাকেই গানদেনের মঠধ্যক্ষ করা হত। মানে সত্যিকারের যোগ্য ব্যক্তি।

মঠধ্যক্ষের বক্তৃতা আমার বেশ ভালই লাগছিল, কিন্তু সঙ্গী ট্যুরিস্টরা চায় স্বচক্ষে দেখতে, ফটো তুলতে, ভিডিওতে এখানকার জীবনযাত্রাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চায় । দেশে গিয়ে গল্প শোনাবার থেকে ফটো দেখাবার প্রয়োজনটাই বেশী। তাদের মতে— “তিব্বতের ওপর বই আজকাল বাজারে উপচে পড়ছে, সব সবিশদ ভাবে পাওয়া যাচ্ছে, শুধু বাছাই করে পড়লেই হয়। আমরা এসেছি দেখতে— নিজের চোখে যতটা সম্ভব দেখতে হবে— তাদের উপেক্ষা করা ঠিক নয়। তাই স্রোংশী উঠতে বাধ্য হল মঠটা ঘুরে দেখা দরকার, ইতিহাস দরকার নেই। দুর্ভাগ্যের বিষয় মঠধ্যক্ষ ইংরাজী বা নেপালী ভাষা জানেন না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম--

—“একটা প্রশ্ন এখানে শিক্ষা ও দীক্ষা ছাড়া আমার মত সাধারণ তীর্থ যাত্রীরা বা তিব্বতের তীর্থযাত্রীরা কি করে ?”

—“তারা সবাই আসে এই প্রধান মন্দিরের দেবতা অভয় ও আনন্দস্বরূপ ভগবান

বুদ্ধকে দর্শন করার জন্য, যেটা আপনারা করেছেন। আর দর্শন শেষে তারা লিংখোর (Linkhor) পথ পরিক্রমা করে, ঠিক যেমন কৈলাসনাথে সবাই যায় পরিক্রমা করতে।” স্রোংশী তর্জমা করে দিয়েই বলল-

—“লিংকর ট্রেকিং-এর জন্যই আমাদের আসা, চলুন আমাদের সঙ্গে স্থানীয় পনেরোকুড়ি জন যাবে, আমাদের ট্রেকিং হবে আর ওদের পুণ্য হবে।”

গানদেন সত্যিই বিরাট এলাকা, মঠ নয় তো, মঠ-গ্রাম। একের পর এক মন্দির তোরণ আর চোরতেন বা স্তূপে ভর্তি। সব জায়গাই সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীতে ভর্তি। বেশ ভালোই লাগছিল কিন্তু হঠাৎ ধাক্কা খেলাম।

কতগুলো নতুন বাড়ীর পরই ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়ার মতো বিরাট ধ্বংসস্তূপ দেখে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ালাম—

—স্রোংশী বিনা দ্বিধায় বলল—“১৯৫৯ সালে এখানে কোন চীনা সৈন্যর উপদ্রব হয় নি। কিন্তু ১৯৬৬ সালে হঠাৎ পিলস্ লিবারেশান আর্মি এখানে আক্রমণ করে, হঠাৎ বোমাবর্ষণ, তার ফলে এই মঠের প্রধান মন্দির সংলগ্ন সব বাড়ীগুলোই পড়ে যায় । মঠের প্রায় অর্দ্ধেক ধুলিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু সুখের বিষয় যে এখানকার সন্ন্যাসী, গ্রামবাসী, লাসার তিব্বতি সম্প্রদায় সবাই নতুন উদ্যমে নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে শ্রমদান করে এই ঐতিহ্যমণ্ডিত গানদেন মঠকে আবার দাঁড় করিয়েছে। শত চেষ্টা সত্ত্বেও সেই পুরনো শিল্পকলাকে উদ্ধার করা যায় নি। আজকাল চীনা কালচারাল কমিটি অনেক লামাশিল্পীকে উৎসাহিত করছে এখানকার দেওয়াল চিত্র, তাংখা আর মন্ডলাগুলোর পুনরুদ্ধারের জন্য। এই ধ্বংসস্তূপ না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মনে মনে ভাবলাম, তিব্বত যদি সত্যি চীনাভূমি হয়ে থাকে, তাহলে তার ধ্বংস মানে তো চীনা-ঐতিহ্য ধ্বংস। এই ধ্বংসের মূলে কোন ধরনের কালচারাল রেভোল্যুশন আছে বুঝতে পারলাম না ।

লাসা ছাড়ার পর মনটা একটু হাল্কা হয়েছিল, এখন আবার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। লিংকর করে যদি হাল্কা হওয়া যায় তাই স্রোংশীকে বললাম— “চল তাড়াতাড়ি চল পরিক্রমায়”

লিংকর মানে গানদেন মঠ পরিক্রমার পাহাড়ি রাস্তা। একদিকে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ আর অন্যদিকে অর্থাৎ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেই চোখে পড়ে অনিন্দ্য সুন্দর উপত্যকার দৃশ্য। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নামে চীনা সৈন্যরা যতই মানুষ ও মন্দির ধ্বংস করুক না কেন এখানকার আকাশ-বাতাস-উপত্যকা আর পাহাড়ি দৃশ্যের ওপর এরা এতটুকুও আঁচড় কাটতে পারে নি।

মঠধ্যক্ষ ও স্রোংশী নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে আমাদের বললেন যে— - জার্মান গ্রুপ বেশী ট্রেকিং করতে চায় তাদের নিয়ে স্রোংশী সরাসরি এগিয়ে যাবে দূরের প্ল্যাটফর্ম থেকে ওরা ভিডিও তুলবে, তারপর সেখান থেকে নেমে ওরা গাড়ী নিয়ে চলে যাবে শা (Sha) অঞ্চলে, সেখানে ওরা ক্যাম্পিং করে রাত কাটাবে। সকাল বেলা ড্রাইভার ওখান থেকে গাড়ী নিয়ে আসবে। আমাকে নিয়ে আবার ওপরে যাবে দলের সাথে যোগ দিতে।

আর একটা অসুবিধা হচ্ছে যে আমি স্লিপিং ব্যাগ আনি নি, স্রোংশী একটা বাড়তি স্লিপিং ব্যাগ এনেছে, কিন্তু ড্রাইভার বলছে ওর দরকার হবে, কারণ সব সময়ই ‘শা’ অঞ্চলে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া।

ভালই হল আমারও ইচ্ছা গানদেনে রাত কাটানো আনন্দেশ্বর আমার মনের কথাটা ধরে ফেলেছেন। মঠধ্যক্ষ জানেন যে আমি ভারতীয় তারও ইচ্ছা যে আমি ওনাদের সঙ্গে রাত কাটাই। স্রোংশীকে আশ্বাস দিয়ে বললাম—“চলে যাও আমার কোন অসুবিধা হবে না।” স্রোংশী ওদের সাথে চলে গেল, আর আমার সঙ্গে দেওয়া হল আটটি নবীন সন্ন্যাসী— ব্রহ্মচারীই বলবো— এদের ভাষায় “ত্রাবা’।

গানদেনের মঠ ও উপত্যকার সাথে লাডাকের লামায়ারু মঠ ও উপত্যকার অনেক মিল আছে। সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা পরিক্রমা পথ ধরে এগোতে লাগলাম । ত্রাবার দল আমার আগে আগে লাফাতে লাফাতে চলল। দলের মধ্যে একটু নেতা গোছের একটা ছেলে আস্তে আস্তে আমার সঙ্গে হাঁটতে লাগল— পরিচয়ে জানলাম, ওর বাবা লাসায় ব্যবসা করে, প্রায়ই বেচাকেনার জন্য কাঠমাণ্ডু যায়, বাবার সঙ্গে ও অনেকবার কাঠমাণ্ডু গেছে কিছু কিছু নেপালী শব্দ ওর জানা, তাতেই কোন রকমে আমাদের ভাব বিনিময় হতে লাগল। এটাই তীর্থযাত্রীদের পথ তাই প্রায়ই চোরতেন আর প্রার্থনার মালা পতাকা চারদিকে উড়ছে। প্রায় ঘন্টা খানেক হাঁটার পর আমরা বেশ উঁচুতে একটা সমতল ভূমি পেয়ে দাঁড়ালাম। ছেলেরা ওখানে একটা স্তূপের পাশে এসে দাঁড়াল। চারদিকে ইতস্তত ভাবে অনেক কংকাল ও হাড় ছড়ানো দেখেই বুঝলাম এটা শ্মশান মঞ্চ। এখানকার সবচেয়ে উঁচু এলাকা। এখানে শব্ দাহের কোন রীতি নেই। মড়া পোড়াবার জন্য যে কাঠের প্রয়োজন। এই শুকনো ঠাণ্ডা মরুভূমিতে একটা ঘাসও জন্মে না। পাথুরে জমিতে গর্ত খোঁড়ার শক্তি মানুষের নেই। এই জমিতে কবর দিতে হলে চাই বুলডোজারের মত শক্ত যন্ত্র। তাই স্থান কালের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মৃতদেহ সৎকারের এক অদ্ভূত ব্যবস্থা। শবদেহকে টুকরো টুকরো করে কেটে শকুনি ও চিলের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া। এই স্থানটাকে বলা হয় স্বৰ্গ মঞ্চ। এখান থেকে দূরের দৃশ্য অতি চমৎকার, তবে দুঃখের বিষয় এখানে বসার উপায় নেই, ভীষণ কনকনে হাওয়া বইছে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা ফেরার পথ ধরলাম। সেই একই রাস্তা, পাহাড়ী দেওয়াল ধরে এগিয়ে যাওয়া।

প্রায় তিন ঘন্টা হেঁটে আমরা ফিরে এলাম মঠে। মঠধ্যক্ষ আমাদের জন্য বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন, তার সঙ্গে আর একজন বয়স্ক তিব্বতি ভদ্রলোক নেপালী ভাষা বলেন, হিন্দীও বলেন আর কোন রকমে কাজ চালাবার মত ইংরেজিও জানেন। এখানে সরকারী পোস্টে না থাকলে কেউ সহজে নাম বলে না, আমিও ভদ্রলোকের পরিচয় চাইলাম না। তবে বুঝলাম উনি আমার ও মঠধ্যক্ষের দোভাষীর ভূমিকা নিয়েছেন ।

আমাকে ওনারা সরাসরি আনন্দময় শাক্যমুনীর মন্দিরে নিয়ে এলেন বিরাট মূর্ত্তির ডানদিকের একটা দরজা দিয়ে আমরা সংলগ্ন ছোট্ট একটা ঘরে এসে বসলাম। ছোট্ট একটা জানলা দিয়ে দিনের আলো যা আসছে মোটামুটি কাজ চলার মত। আমরা বসতেই একটা ত্রাবা (Traba) কেটলিতে করে চা নিয়ে এল। ঘরে আমরা তিনজন, আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হল এ ঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। শোবার জন্য ঘাসের গদি আর দুটো কম্বল । বাঁশের গ্লাসে চা-পরিবেশন করা হল— তারপর কোন ভূমিকা না করে মঠধ্যক্ষ সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন

“আমাকে উপহার দেওয়ার জন্য মহামান্য দালাই লামার কোন ছবি এনেছেন ?” –“না, আমাকে দালাই লামার ছবি আনতে নিষেধ করেছে।”

- —“ঠিক্ ঠিক্ ছবি যে নেয় সে অপরাধী আর যে দেয় সেও অপরাধী। তা সত্ত্বেও অনেকে আনে, আমরাও গোপনে গ্রহণ করি” তিনি হেসেই বললেন।

–“আপনি কি আমাদের তিব্বত-প্রধান দালাই লামাকে নিজে দেখেছেন ? ” –“আজ্ঞে হ্যাঁ, তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎকারের সুযোগ হয়েছিল”

আমার কথা শুনে দুজনেই খুব উৎসাহিত হয়ে বার বার আমার হাত ছুঁয়ে নিজেদের বুকে সেই স্পর্শ দিতে লাগল যেন পরম প্রসাদ দিলাম। তারপর একের পর এক বহু প্রশ্ন। মাননীয় দালাই লামার শরীর কেমন আছে থেকে আরম্ভ করে পরের জন্মে তিনি কি ভারতেই থাকবেন না তিব্বতে ফিরে আসবেন— ইত্যাদি ইত্যাদি, যার উত্তর আমি দিতে অক্ষম। তবে বহু প্রশ্নের উত্তর না পেলেও তিনি আমাকে প্রশ্ন করেই যেন শান্তি পেলেন।

বিকেল বেলা সূর্যাস্তের আগেই রাতের খাওয়ার জন্য ভেরী বাজল, আমরা উঠলাম। রাতের মেনু গম ভাঙা আর চাল মিশিয়ে খিচুড়ি আর তার সাথে মেশানো আলু ও কপির ঘ্যাট— অপূর্ব স্বাদ। খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা যে যার ঘরে চলে গেল। ইলেকট্রিক এখনও আসেনি তাই পুরনো রীতিই এখনও চলে আসছে। খাওয়ার পর প্রার্থনা, তারপর বিছানা মঠধ্যক্ষ মহাশয় আমাকে ছাড়লেন না, অতিথির যাতে অসুবিধা না হয় তার জন্য নিজেই আমার ঘর পর্যন্ত এলেন, তারপর গদির পাশে একটা মোমবাতি ও একটা দেশলাই দিয়ে বললেন—

“আমার অফিস থেকে আপনার জন্য নিয়ে এসেছি। রাতবিরেতে যাতে কোন অসুবিধা না হয় ৷ আর টয়লেটের জন্য মাঠে যাওয়াই ভাল কারণ ছেলেদের টয়লেটগুলো পরিষ্কারই তবে শীতে আর অন্ধকারে আপনার যেতে অসুবিধা হবে, আমরা কিন্তু দালাই লামার আরও অনেক গল্প শুনতে চাই।”

আমি এবার বললাম— “আপনাদের তো অনেক গল্প শোনালাম এবার আমার কিছু জানার আছে দয়া করে যদি উত্তর দেন তাহলে খুব আনন্দিত হব— তবে আমি জোর করবো না, আপনাদের কোন অসুবিধা হলে মৌন থাকলেই আমি বুঝবো আমার প্রশ্নটা ঠিক হয় নি।” আমার কথা শুনে বুঝলাম উভয়েই রাজি, সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলাম

–“গানদেনের এই মঠটা কি আগের মতোই আছে?”

—“না, সে যুগের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। দালাই লামা ও পাঞ্চেন লামার যুগে

এটা ছিল পৃথিবীর অন্যতম বিরাট ধর্ম্ম প্রচার শিক্ষা ও দীক্ষা কেন্দ্র। আগে ছিল পাঁচ-ছ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা, আর আজকাল মাত্র চারশ ।”

—“চারশ মঠবাসীরা কি আগের মতোই শিক্ষা পাচ্ছে? "

–“না, শিক্ষার পদ্ধতি পাল্টে গেছে, আজকাল তাংখা ও মন্ডলা শিল্পর ওপর বেশী জোর দেওয়া হচ্ছে। পুরনো পুস্তকের চীনা অনুবাদে হাত দেওয়া হয়েছে। তর্ক বিদ্যা াগের মতোই আছে তবে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব, আসল লোকেরা সবাই চলে গেছে ভারতে অথবা নেপালে।”

- -“এই সব ধৰ্ম্মপুস্তকগুলো চীনা অনুবাদ হলে তো ভালই হবে, তাহলে চীন দেশের বিরাট সংখ্যক নাগরিকের কাছে তিব্বতের দর্শন বিলিয়ে দেওয়া হবে তাই না?”

আমার প্রশ্নটাকে অনেকক্ষণ ধরে বুঝিয়ে বলতে হল শেষে কাজ দিল। মঠধ্যক্ষ বিজ্ঞের মত মাথাটা নেড়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে বললেন

—“সম্ভব নয়, আমাদের গুহ্য তত্ত্ব অনুবাদ সম্ভব নয়। আমি চীনা ভাষা শিখেছি এই দেখুন কয়েকটা নমুনা দিচ্ছি, ধরুন—

(১) লো-চেন-অস্-দ্‌পাই বিজয় ধৰ্ম্মবীর

(২) ইরতা-গ্রিন : পালি ভাষায় হায়গ্রিভা মানে ঘোড়ার গলা বিজয় ধর্ম্মকায় (৩) আর্দো-আর্জে অস্, মহা বজ্র ধর্ম্ম, মহাসরস্বতীর পুরুষ অবতার

এই সব গুহ্য তান্ত্রিক দেব-দেবী আর মন্ত্রের চীনা অনুবাদ হলে ওর মন্ত্রধ্বনী নষ্ট হয়ে যাবে, শুধু তাই না— তিব্বতি ভাষায়, পালি ভাষায় আর সবচেয়ে আদি দেবভাষায় সংস্কৃত মন্ত্র চীনা ভাষায় অনুবাদ হলে তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাবে।

এই দেখুন না এই মঠে বোমা ফেলার পর মন্দির ও মঠের বহু মূল্যবান তাংখা আর পবিত্র দেওয়াল চিত্র সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বেইজিং সরকার নাম করা বড় বড় শিল্পীদের নিয়ে এসেছে নতুন করে আবার দেওয়াল চিত্র আর তাংখা আঁকার জন্য কিন্তু কিছুতেই প্রাণ দিতে পারছে না, অনুবাদ হলে সেই একই সমস্যা... ।

আমাদের আলোচনা ভালোই চলছিল কিন্তু দোভাষী ভদ্রলোক এই মঠে থাকেন না, তার বাড়ী পাশের গ্রামে। তার একটা শুয়োর ও মুরগির ফার্ম আছে, সরকারী আর্থিক সাহায্যে ভালই চলছে, অনেক দায়িত্ব, ফিরে যেতে হবে। কাজেই আমাদের আলোচনা থামাতে বাধ্য হলাম আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে তাকে শুভরাত্রি জানালাম ।

মোমবাতি নিভল। এক রহস্যময় স্তব্ধ রজনী আমাকে এনে দিল সেই বহু বছর আগের রিমপোচের সাথে দেখা তিব্বতকে।

পরের দিন সকালে ত্রাবারাই আমার ঘুম ভাঙালো, চা আর বান রুটি নিয়ে এসেছে ব্রেক ফাস্টের জন্য। মঠে এত সুন্দর প্রাতরাশ আশা করি নি— প্রাতঃপ্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করলাম। তারপর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় জানালাম। কথামত জীপ ঠিক সময়ই এল। অতি সুন্দর পাহাড়ি রাস্তা। এখান থেকে কী-চু উপত্যকার সম্পূর্ণ দৃশ্য মনকে আনন্দে ভরিয়ে দিল। আমাদের বেশীক্ষণ ড্রাইভ করতে হল না পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা বেছে নিয়ে ওরা শিবির খাটিয়েছিল আমাকে দেখেই ওরা লাফিয়ে উঠল ঠিক যেন পুরনো বন্ধু। ওরা তৈরি হয়েই ছিল, জীপে উঠল। আবার রাস্তা, আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করার পর আমরা একটা পুরনো মঠে এসে পৌঁছলাম। ভারী আশ্চর্য! অবাক! আরো কাছে এগুতেই সন্দেহ ভাঙল, হ্যাঁ এরা সবাইই সন্ন্যাসিনী। মেয়েদের মঠ দেখবো আশা করিনি। এই অঞ্চলে একটা মেয়েদের বৃদ্ধাশ্রম আছে তাও জানতাম্ না। চীনা সৈন্যরা একাধারে যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল তাতে তো সব ঐতিহ্যই বিলুপ্তির কথা শুনেছিলাম— কিন্তু এখন দেখছি ব্যতিক্রম, মঠের নামটা শুনে আরও অবাক লাগল— নাগা মহিলা আশ্ৰম । F

আমরা মঠের শাক্যমুনী মন্দিরে ঢোকবার অনুমতি পেলাম। সরকারী গাইড় আর গাড়ীতে যারা আসে তাদের অনায়াসেই অনুমতি দেওয়া হয় আর যারা এই অঞ্চলে ট্রেকিং করতে আসে তাদের তো অনুমতি পত্র থাকেই। ব্যক্তিগত ভাবে এলে মঠ ও মন্দির দর্শনে অসুবিধা

সবশুদ্ধ একাশিজন সন্ন্যাসিনী আছে। শুনে আরও আশ্চর্য লাগল যে এদের মধ্যে প্রায় কুড়ি জন চীনা মহিলাও আছে। তাদের মধ্যে দুজন শিক্ষিকা আর আঠারোজন তিব্বতি দর্শন ও বৌদ্ধ ধর্ম্ম শিক্ষার জন্য এসেছে। দুজন শিক্ষিকা কাঠমাণ্ডুতে তিন বছর ধর্ম্ম ও ঐতিহ্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে। একটা মন্দিরে তন্ত্রসাধক, কর্ম পদ্ম (Lotus Karma) সিদ্ধপুরুষের মূর্ত্তির পাশেই বিরাট দেওয়াল ঢাকা কমরেড্ মাও-এর তাংখা রাখা হয়েছে। লাসাতে শুনেছি বুদ্ধ পূর্ণিমার পরেই মাও উৎসব উদ্যাপিত হয় ।

একমাত্র মহিলাদের জন্য, মহিলাদের দ্বারা এই নাগা সন্ন্যাসিনী (কুম্ভ মেলায় নাংগা সন্যাসী, সন্ন্যাসী নয়) মঠ পরিচালিত হয়। তারা আমাদের মন্দির পরিদর্শন করে চা খাওয়ালেন তারপর বিদায়। পরিবেশটা ভাবগম্ভীর, মেয়েদের দেখেই মনে হল— ‘হাসতে মানা।’

ওখান থেকে অনতিদূরে আর একটি মহিলাশ্রম নাম “শা” (Sha Nunnery) মহিলা মঠ। এখানে আরও বেশী, একশো তিরিশ জন। অধিকাংশ তিব্বতি কিন্তু পরিচালিকা চীনা। এদের কাজ তিব্বতের বিভিন্ন দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে গ্রাম বাসীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতন মূলক সরকারী পরিকল্পনার প্রচার করা। যদিও আজকাল চীনা সরকার, চীনা ভাষা ও চীনা প্রধানের যুগ কিন্তু তিব্বতিরা মনে প্রাণে তিব্বতি ধৰ্ম্ম ও সংস্কারের পক্ষপাতী গ্রামবাসীদের মন থেকে, মঠ-মন্দির-বুদ্ধ দালাই লামা চোরতেন-প্ৰণাম-প্রদক্ষিণ, দণ্ডি, মন্ত্র ইত্যাদি ভাবধারাগুলোকে কিছুতেই সরাতে পারছে না। জোর, জুলুম, শাস্তি, প্রলোভন, কারাদণ্ড ইত্যাদি জুলুমের সাথে সাথে, নতুন শিক্ষা, সভ্যতা, খাদ্য, স্বাস্থ্য ইত্যাদি হাজারো সরকারী পরিকল্পনা লাসায় কাজ দিচ্ছে কিন্তু গ্রাম অঞ্চলে সরকার কিছুতেই তাদের চীনাপন্থী করতে পারছে না। তাই আজকাল চীনা সরকার তাদের বাধ্যতামূলক কঠিন পথ ছেড়ে মিশনারী পথ ধরেছে। মঠ, বিহার, আশ্রম, মন্দির ইত্যাদি ধার্ম্মিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিব্বতিদের মধ্যে আরও সহজে চীনা ভাবধারা পৌঁছে দিচ্ছে। শহর থেকে দূরে, সবরকম রাজনৈতিক হাওয়ার বাইরে এই মহিলাশ্রমের বিভিন্ন কাজ আমরা দেখতে পারি নি তবে কথাবার্তায় যতটা বুঝতে পেরেছি তা হচ্ছে এই লামা সন্ন্যাসিনীরা সবাইই সন্ন্যাসী বেশে গ্রাম সেবিকা। স্বীকার করতেই হবে উত্তম পন্থা বেয়ার ফুট ডক্টরদের কাজই হচ্ছে জীব সেবা। জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ।

আমাদের সাথে যে দুজন জার্মান মেয়ে ছিল তারা ইচ্ছা করলে ভেতরের কাজ দেখতে পারতো, কিন্তু দোভাষী পুরুষ, মহিলা মঠে তার প্রবেশ নিষেধ। আর দুঃখের বিষয় যে মঠের কোন মহিলাই ইংরাজী জানে না। কাজেই বিদেশিনীরা দল ছেড়ে যেতে রাজি হল না ।

নাগা ও শা এই দুই আশ্রম ঘুরে আমরা আবার উত্তরের পথ ধরলাম। অনিন্দ্যসুন্দর শারাপা-চু (Sharapa-Chu) উপত্যকা থেকে আস্তে আস্তে পাহাড়ি রাস্তা ধরলাম। গাড়ী গোঙাতে লাগল, মনে হল আমাদের পিঠে বইতে ওর কষ্ট হচ্ছে। তারপর এক সময় গাড়ী থামল, রাস্তা খুব খারাপ, আমাদের ট্রেকিং করতে হবে। রাস্তাটা খারাপ, কিন্তু দৃশ্যটা অপূর্ব। আমরা যেখানে নামলাম তার নাম চেক্-লা (Chek-La)। চেক পাস উচ্চতায় পাঁচ হাজার মিটার। ট্রেকিং শুরু হল। চলার পথে শুধুই দেখা, কথা কম। ড্রাইভার গাড়ীতেই থেকে গেছে, স্রোংশী আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সে চারদিকের দৃশ্য ও পাহাড়ের বর্ণনা দিতে লাগল। আমরা আরও আধঘন্টা পাহাড়ি পাথুরে পথ পেরিয়ে একটা পাহাড়ি পাঁচিলের মোড় ফিরতেই আরও চমৎকার দৃশ্য দেখতে পেলাম, এই উপত্যকার নাম মিগ্গি (Miggi)। দূরে পাহাড়ের গায়ে আটকানো একটা বাড়ী দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কি অদ্ভূত, ওই উঁচুতে আর এই দুর্গম স্থলে কে, কারা, কিভাবে ওই বাড়ীটা তৈরি করল? স্রোংশী আমাদের প্রশ্নের জবাব দিল-

ওইটা হচ্ছে রেটিং গ্রাম (Reting), আর বড় বাড়ীটা হচ্ছে সামদ্রুপ মহিলা মঠ (Samdrup Nunnery)। সবাই বলে সামদ্রুপ লিং। এই অঞ্চলে এটি তিন নম্বর মহিলা মঠ। এই মঠটির চারদিকে চারটে পাহাড়, ওই পাহাড়গুলোই এই মঠের রক্ষক তার মানে চারজন পৰ্ব্বত দেব এই সামদ্রুপ লিং মঠকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে আজ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে। এই অঞ্চলে পর পর তিনটি মহিলা আশ্রম বহু বছর যাবৎ তাদের প্রার্থনা, ধ্যান আর তাংখা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

পাহাড়ে এটাই অদ্ভূত দেখে দূরত্ব বোঝা যায় না। আমরা আরও দেড়ঘন্টা হাঁটার পর ক্লান্ত হয়ে এসে পৌঁছলাম সামদ্রুপ লিং মহিলা আশ্রমে। তাদের হাসিমুখ, প্রার্থনার শব্দ আর ‘নমস্তে’ আমাদের ক্লান্তি দূর করে দিল। আশ্রমের মূল মন্দিরের সামনে আমাদের জন্য বিছিয়ে দেওয়া হল একটা ভারী সতরঞ্চি। এখানকার পরিবেশ, আর মূল মন্দিরের গঠন আমাদের মুগ্ধ করে দিল। চোরতেন প্রদক্ষিণ আর অসংখ্য প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে আমি মন্দিরে প্রবেশ করলাম। সামনে বিরাট শাক্যমুনীর ‘বজ্রপাণি মূৰ্ত্তি । জাম্মান অভিযাত্রীরা সবাই সতরঞ্চির ওপর বসে বিশ্রাম করছে আর আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম তিব্বতের এই রহস্যময় মহিলা আশ্রমের বিভিন্ন মন্দির আর তাদের বর্ণাঢ্য দেওয়াল চিত্রগুলো। দেখে মনে হয় এখানে চীনা সাংস্কৃতিক বাহিনীর বোমা বর্ষণ হয় নি। আমাদের বসিয়ে ‘নমস্তে' বলেই ব্রহ্মচারিণীরা বিদায় নিল।

মঠের পাশেই গ্রাম। আমরা মঠে আধঘন্টা বসে ও মঠ প্রদক্ষিণ করে গ্রামের একটা চায়ের দোকানে বসলাম। আমাদের জন্য অর্ডার দেওয়া হল চা আর আলু-কপি ভাজা। হোটেলের মালিক খাঁটি তিব্বতি, চেহারায়, পোষাকে আর ব্যবহারেই বোঝা গেল যে লাসার থেকে খুব দূরে না থাকলেও এদের মধ্যে এখনও চীনা টুপী চালু হয় নি। এই হোটেলের রান্নাঘরেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তবে অভিযাত্রী বন্ধুরা বাইরে শিবির খাটাবে।

এই প্রথম একটি মঠ ও একটি গ্রাম দেখছি যেখানে কোন চীনা নেই দেখে আনন্দ লাগল। পাহাড়ের ওপর আর অচেনা ও অনুন্নত মঠ বলেই সম্পূর্ণ চীনা হাল চাল থেকে এরা দূরে সরে আছে।

পরের দিন আবার হাঁটা। চেক্‌ লা পাসে (Chek-La Pass) এসে আবার গাড়ীতে উঠলাম। আমরা এখন নীয়েচেন তাংলা (Nyechen Tanglha) পৰ্ব্বত শ্রেণীর ওপর দিয়ে যাচ্ছি, এই সব পর্ব্বতশৃঙ্গের উচ্চতা সাত হাজার মিটারের ( 7000m) বেশী, তবে আমাদের অত ওপরে ওঠার প্রয়োজন নেই রাস্তার অভাব। আমরা পার হলাম লাচেন (Lhachen La) পাস, উচ্চতা (৫১৫০)পাঁচ হাজার একশো পঞ্চাশ মিটার। রাস্তাটা সত্যিই খারাপ কিন্তু দৃশ্যটা মনকে তুলে দেয় উঁচুতে। লাসেন পাস্ পার হতেই সামনে চোখে পড়ল একটা বিরাট লেক স্বচ্ছ নীল জল নামসো লেক (Namtso Lake)। শান্ত পবিত্র আর সুন্দর। আমাদের সব কথাই বন্ধ হয়ে গেল, গাইড বা দোভাষীর কোন ভাষাই এই সুন্দরকে ভাষা দিয়ে ব্যক্ত করতে পারবে না— অনেকক্ষণ নয়নভরে দেখলাম আমাদের প্রত্যেকটি দেহকোষ আনন্দে ভরে উঠল। তারপর আপনা থেকেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা কথা, এটাই তো তিব্বত, এর জন্যই তো আসা!

চীনা আক্রমণ, নীতির পরিবর্তন, রাজনৈতিক ঝড় রক্তপাত— এ সবই জাগতিক, নামৎসোর এই দৃশ্য এই পবিত্র রূপ সব কিছুর উর্দ্ধে। তিব্বতের সামাজিক পরিবর্তন মঠমন্দির ধ্বংস— সব কিছু ছাড়িয়ে এক ঊর্দ্ধ জগতের মহিমা নিয়ে ধ্যান মগ্ন হয়ে বসে আছেন প্রকৃতি দেবী, কোন মানুষ কোন দিনই এর পবিত্রতা হরণ করতে পারবে না ।

“ওই যে দেখছেন লেকের মধ্যে ঢুকে গেছে ছোট্ট একটা ভূ-খণ্ড, দ্বীপের মত ওই

জায়গাটার নাম তাসি দোরজে দ্বীপ (Island of Tashi Dorje), চারপাশে ঘেরা পাহাড়গুলো নীয়েচেন তোংলা পৰ্ব্বতমালা (Chain of Nyechen Tonglha Mountain)। ‘লেকের ধারে কোন মঠ বা চোরতেন আছে কি?” প্রশ্ন করলাম

---- -“না, অন্তঃত আমার জানা নেই তবে ওই দ্বীপে যাবার পথে ডান দিকে পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো গুহা আছে, তারই কাছে একটা ছোট্ট মঠ আছে। শুনেছি আগে মুনী ঋষিরা এখানে এসে সাধনা করতো। এখন সব পরিত্যক্ত, তবে এখানকার রঙবেরঙের পাখী বিশেষ করে সাইবেরিয়ার হাঁসে লেক ভর্তি, এত দূর থেকে দেখা যাবে না, কাছে গেলে দেখা যাবে। চলুন আমরা ওই তাসি দোরজে দ্বীপ পর্যন্ত ট্রেকিং করবো, যাতায়াতে সময় লাগবে প্রায় চারঘন্টা । ”

সঙ্গীরা লাফিয়ে উঠল, এর জন্যেই তো আসা, হাঁটা হবে, দেখা হবে ফটো তোলা যাবে । সবাই মালপত্র নিয়ে তৈরি হয়ে পড়ল ট্রেকিং-এর জন্য। আমি এই সুন্দর দৃশ্যটাকে হারাতে চাই না। আবার কবে আসবো, অথবা আদৌ আসবো কিনা কে জানে। তাই যতক্ষণ পারি এই দৃশ্যকে প্রতিটি অনুপরমাণু দিয়ে অনুভবের দরজা দিয়ে অন্তরে ধরে রাখবো।

জানিয়ে দিলাম –“আমি আর নীচে নামছি না।”

-“কেন এত সুন্দর ট্রেকিং”

—“ঠিক তবে নীচে নামলে ওপরের এই দৃশ্যপটকে হারাবো, আমি এখানে ঘোরাফেরা করবো, তারপর গাড়ীর কাছে চলে যাবো, চিন্তা করো না।”

সবাই রাজি, ওরা চলে গেল লেকের দিকে। আমি একটা সুন্দর জায়গা বেছে নিয়ে তাকিয়ে রইলাম সেই অনন্ত সুন্দরের দিকে। কৈলাসের মানস সরোবর, সাম্‌দিং-এর সরোবর ওদের থেকেও এর সৌন্দর্য্য অনেকগুণ বেশী।

এখানে কোন তীর্থযাত্রী চোখে পড়ে না, চীনা সৈন্যবাহিনীর ট্রাকের শব্দ নেই, আশে পাশে কোন লোক বসতিও চোখে পড়ে না, অখণ্ড নীরবতা। মাঝে মাঝে বাতাসের পাথর ঘেসা শব্দ তানপুরার মত নেপথ্যে সুর এনে দিচ্ছে। অদ্ভুত অনুভূতি। বুঝলাম তিব্বতের সেই রহস্য-দর্শন আজও বিদ্যমান, শুধু স্থান বদলেছে।

আনন্দময় মুহূর্তগুলো খুব তাড়াতাড়ি কেটে যায়— এই পরিবেশে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। সূর্যদেব মাথার ওপর দিয়ে একটু হেলে পড়েছেন এমন সময় লোকজনের কথাবার্তা কানে এল বুঝলাম ওরা ফিরে এসেছে।

হাঁফাতে হাঁফাতে ওরা আমার কাছে এসে বসে পড়ল— তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল—

—“তুমি একটা বিরাট জিনিস হারিয়েছো— এই ট্রেকিংটা অ্যাডভেঞ্চারে ভর্তি, তার সঙ্গে রয়েছে প্রকৃতি শিক্ষা আর অজস্র বুনো হাঁসের চ্যাচামেচি, আমরা আবার আসবো

কয়েকদিনের জন্য। উপযুক্ত খাবার থাকলে আমরা আজই থেকে যেতাম ...”

আবার গাড়ী— এবার এখান থেকে পশ্চিমের পাহাড় ধরে লাসার পথ, যাবার

পথেই একটা চটিতে খাওয়ার বন্দোবস্ত। ওখানকার শান্ত ও অনিন্দ্যসুন্দর পরিবেশ ছেড়ে কারোরই যেতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু উপায় নেই ।

গাড়ী ছাড়ল। পাহাড়ি দৃশ্য— এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে দূরের বরফে ঢাকা পাহাড়ি দৃশ্য। এবার গাড়ী ঘুরল— পাহাড়ের দেওয়াল ধরে আস্তে আস্তে চলতে হচ্ছে, কোন কোন সময় পিছনের চাকায় ঘুর খেয়ে রাস্তার পাঁচিলের পাথর ধ্বসে পড়ছে নীচে— কয়েকশ মিটার নীচে, জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে চলছি। সন্ধ্যার আগেই আমরা একটা চটিতে এসে থামলাম। সাথেই একটা ছোট্ট গ্রাম। গাড়ীর আওয়াজে গ্রামের লোকেরা ছুটে এল। আমাদের চারদিকে ভীড় করে দাঁড়াল।

“কি চাই?” - “কিছু না, আপনাদের দেখছি।”

আমি আর ড্রাইভার মোটেই ক্লান্ত নই, কিন্তু সঙ্গীরা সবাইই কাবু। রাতের জন্য তৈরী হল— ছাতু ডালিয়া আলুসেদ্ধ আর মাংসের স্যুপ, শুয়োরের মাংস।

বহু বছর আগে তিব্বতের যে মানুষগুলোকে দেখেছিলাম তারাই যেন নতুন জন্ম নিয়ে এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, কোনো কথা নয় ওরা বসে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে আর শুনছে আমাদের কথার শব্দ।

আমাদের জন্য দুটো ঘর, ওদের ক্যাম্পিং করার কথা ছিল কিন্তু আজকের এই উচ্চতায় ঠাণ্ডাটাও বেশী তাই ঘরেই থেকে গেল। কিন্তু দুর্ভাগ্য সারা রাত্রি গ্রামের কুকুরগুলো গাড়ীটার চারপাশে ঘুরে ফিরে ঘেউ ঘেউ করছিল, কারুরই ভাল ঘুম হয় নি। ভোর বেলা চ্যাং খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। পরের দিন আবার লাসার পথ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার পাহাড়ি পথ

আমরা দুপুরে আবার লাসায় ফিরে এলাম। মনে হল অনেকদিন পর শহরে এলাম । হোটেলে ঢুকে জানলার ধারে ইজি চেয়ারটায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম— শা রেইটিং, সামদ্রুপ লিং, নাম্‌ৎসো হ্রদ আর নীয়েচেন পর্ব্বতমালা দেখে এলাম। তিব্বতের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় আসা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দৃশ্য আর রহস্যময় পাহাড় উপত্যকা ধরে রেখেছে তিব্বতি ঐতিহ্য আর তিব্বতের বৈশিষ্ট্য। যারা আসতে চান তাদের বলবো-

“আসুন, চীনা সরকারের ওপর অভিমান করে তিব্বতিদের দূরে সরিয়ে রাখবেন না, বিদেশীদের যাতায়াতের ওপরই নির্ভর করছে তিব্বতি ধর্ম্ম সংস্কৃতি রক্ষা আর মঠ ও বৌদ্ধবিহারের পুনর্গঠন।”

আজ যদিও ট্যুরিস্টদের জন্য বহু মন্দির ও বিহার নতুন করে মেরামত করছে, কাল হয়তো সেই সব মন্দির ও মঠে ট্যুরিস্টরা দেখতে চাইবে সত্যিকারের ধর্ম্ম ও ঐতিহ্য। বর্তমানে বহির্জগতের সঙ্গে তিব্বতিদের যোগাযোগের মাধ্যম একমাত্র ট্যুরিস্ট তিব্বতিরা চায় বাইরের সাহায্য প্রেরণা, তাদের জন্যই প্রয়োজন অসংখ্য তিব্বত যাত্রী। একবার যখন শুরু হয়েছে যাতায়াত সে পথেই আসবে হয়তো মুক্তির বাণী ।

আমি লাসায় আরও দুদিন থেকে তারপর স্থল পথেই ফিরে এলাম কাঠমাণ্ডু । আসার পথ ছিল : লাসা, সামডিং, গীয়াসে, শীগাৎসে, ফিনসোলিং, শেগার, রংবুক, টিংরি, কাসা কাঠমাণ্ডু। লাসা থেকে কাঠমাণ্ডু জীপে করে এবং কয়েকবার ট্রেকিং করে আমাদের লেগেছিল দশদিন ।

বিভিন্ন পত্রিকায় বর্তমান তিব্বতের ওপর আমার বহু লেখা পাঠকমহলে পরিচিত, তা সত্বেও পাঠকদের একান্ত অনুরোধে এই অংশটি মূল পুস্তক— র শেষ অধ্যায়ে সংযোজিত হল ।

ধ্যান ধারণার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে যেতে হবে শুদ্ধ অনুভূতির পথে। জীবের সৃষ্টি রহস্য না জানলে সে পথে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। তাই তিব্বতের তন্ত্রশাস্ত্রে মনকে সংযত ও প্রস্তুত করার জন্য সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র। যন্ত্র হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের আল্পনার মত চিত্রাঙ্কন। ভূমিতে, দেয়ালে, চাদর বা কাপড়ের ওপর তার ছবি এঁকে তার মাধ্যমে বিক্ষিপ্ত মণকে একাগ্র অবস্থায় আনা হয়। তারপর সেই অবস্থার থেকেই শুরু হয় তপস্যা। যন্ত্র আবার মন্দির স্থাপন ও শান্তি সংস্থাপন এর জন্যও ব্যবহৃত হয়।

জগৎ সৃষ্টির মূলেই রয়েছে বিন্দু, এই বিন্দু থেকেই সৃষ্টি হয়েছে যোনী এবং যোনী থেকে জগৎ। বিন্দুই সর্ব শক্তির মূল কারণ। আবার এই বিন্দু থেকেই সৃষ্টি হয়েছে গতি ৷

শ্রী যন্ত্র লামাদের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্র। শ্রী যন্ত্রের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে বিন্দু আর তাকে ত্রিভূজাকৃতিতে ঘিরে রয়েছে যোনী, বিন্দুর রং সাদা এবং যোনীর রং লাল।

১৯৫৬ সালে, বিদেশীদের জন্য তিব্বতের দরজা তখন প্রায় বন্ধ, রাজনৈতিক কারণে ভারতের সঙ্গে তিব্বতের সম্পর্ক' প্রায় ছিন্ন, সেই সময় কোন রকম প্রস্তুতি না নিয়েই একদল নেপালী তীর্থযাত্রীর সাথে বিমল দে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে

যান সন্দর লাসায়। তাঁর বয়েস তখন মাত্র পনের। যাত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন নবীন মৌনী-বাবা, তারপর লাসা থেকে সেই দল ছেড়ে যান কৈলাসখণ্ডে; তারই বিশদ বিবরণে ভরা এই ' ' বিমল দে নিজেই বলেছেন যে এটা একটা ভিখিরীর ডায়েরী। কিন্তু এই বইটির মধ্যে পাওয়া যাবে তিব্বতের দৈনন্দিন জীবন আর মহাতীর্থের পূর্ণ বিবরণ ।

[The End]

অধ্যায় ৩৬ / ৩৬
সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%