বিমল দে
গ্যাংটক থেকে লাসায় যাবার পথে প্রায় প্রত্যেক রাতেই আমরা একটা না একটা গ্রাম পেয়েছি, গ্রাম মাত্রেই আছে গুম্ফা কাজেই থাকবার কোনরকম অসুবিধা হয়নি, গুম্ফাগুলোই তীর্থযাত্রীদের ধর্মশালা। তিব্বতের এই অঞ্চলে অর্থাৎ চুসুল থেকে কেউ যদি সাংপো ধরে সীগাৎসের দিকে আসেন তাহলে হতাশ হতে হবে। জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে, একচল্লিশ মাথার সেই ছোট্ট দিংবো গ্রাম ছাড়ার পর গত পাঁচদিনের মধ্যে পেয়েছি মাত্র ছটি বাড়ী খুবই গরীব চাষী, তাদের আন্তরিক ভক্তির কথা আমার ডায়রীর পাতায় লিখে বোঝানো অসম্ভব। সেই প্রাণের স্পন্দনটাকে কি আর ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব! অতিথি সেবার জন্য তারা জীবন দিতে পারে, বিশেষ করে অতিথি যদি লামা বা সন্ন্যাসী হয় তাহলে তো কথাই নেই। এরা বিশ্বাসী আর সরল। সাধনার উচ্চমার্গে এদের কষ্ট করে উঠতে হবে না এরা উঠেই আছে। কোনো রকম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করেই এরা ছুটে আসে সাহায্য করতে। এদের ঋণ আমি কোনোদিনই পরিশোধ করতে পারবো না ।
লাসা থেকে সীগাৎসের দূরত্ব প্রায় একশ তিরিশ মাইল। প্রধান রাস্তা দিয়ে এলে সময় লাগে প্রায় দশ এগারো দিন। আমি সাংপোকে বরাবর অনুসরণ করেছি—আমার কাছে এটাই ছিল সহজ উপায়। রাস্তাতো নয় শুধু পাথর ডিঙ্গিয়ে চলা—খুবই কষ্টকর। নীয়াং নদীর তীর পর্যন্ত আমার আসতে লাগলো প্রায় তেরোদিন।
তেরোদিনের দিন দুপুর বেলা সাংপোর উপত্যকা দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ বাঁ-দিকে নজরে পড়ল আর একটি উপত্যকা। সাংপোর দক্ষিণে হিমালয়ের যে বিরাট পাঁচিলটা ধরে এগুচ্ছিলাম সেটা হঠাৎ যেন শেষ হয়ে গেল। আমার সামনে এখন আর একটা বিরাট সমতল ভূমি, এখানে হঠাৎ যেন গ্রামের সৃষ্টি হয়েছে। বুঝলাম যে সীগাৎসের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি। সাংপোর ঠিক ধারেই পেলাম এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম, গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। গ্রামটা শেষ হয়েছে একটা নদীর সংগমে। এটাই তাহলে নীয়াং নদী। মনটা আনন্দে নেচে উঠল, তিব্বতীরা একান্ত প্রয়োজন না হলে যেচে কারও সাথে আলাপ করে না, কাজেই সেদিক থেকে কোনো ভয় নেই—চায়ের দোকান একটা দেখে সেখানে বসলাম। দোকানের সামনে একটি মেয়ে বিরাট চোঙার মধ্যে করে চায়ের সাথে মাখন মেশাচ্ছে আমাকে দেখেই তারা জিভ বার করে সম্মান দেখাল। দোকানের ভেতরে বসবার কোনো ব্যবস্থা নেই—বাইরে একটা বেঞ্চি পাতা, সেখানে দু'জন বসে গল্প করছে আমাকে দেখেই তারা উঠে দাঁড়াল, তারপর জামার হাতা দিয়ে বেঞ্চিটার ধূলো পরিষ্কার করে দিয়ে আমাকে সেখানে বসতে বলল। আমি সেখানে বসে একগ্লাস চা বানাতে বললাম। তিব্বতের সর্বত্র চা প্রায় একইভাবে তৈরী হয়। এখানেও তাই চা-এর পাতা জলে ভেজানোই ছিল দু'দিন যাবৎ তারা একই পাতা ব্যবহার করে, চা চাইতে তার সাথে মাখন ও নুন মিশিয়ে দেওয়া হয়। লম্বা চোঙগুলো সেই কাজেই ব্যবহার হয়। আমি প্রথম যেদিন এ দৃশ্য দেখেছিলাম সেদিন ভেবেছিলাম যে লম্বা হামাল দিস্তেতে করে মশলা বাটছে।
তারপর কথায় কথায় জানতে পারলাম যে এখানে দুটো ফেরীঘাট আছে। একটা ফেরী ব্রহ্মপুত্র পার হবার জন্য আর একটি নীয়াং নদী পার হবার জন্য। ব্রহ্মপুত্রের ফেরী ধরতে হলে নীয়াং নদী পার হয়ে সীগাৎসে যেতে হবে, দিনে দু'তিন বার নৌকো চলাচল করে। আর এখান থেকে নীয়াং নদী পার হবার জন্য ঘাটে গিয়ে মাঝি বলে চেঁচাতে হয়—নৌকোটা আসে ওপার থেকে, দিনে একবার বা দু'বার নৌকো চলাচল করে। একজনের জন্য হলে মাঝি আসতে চায় না ৷
আমি ঘাটের কাছে দেখলাম যে ফেরীঘাট বলে কিছু নেই। আর এদিক ওদিক তাকিয়েও কোনো নৌকো চোখে পড়ল না। নীয়াং নদী খুব চওড়া নয় তবে সংগমের কাছাকাছি বলে তার দুধারে বালির বিরাট চড়া। এই নদীটারই উৎস দেখেছি সামাদর কাছাকাছি। সেখান থেকে গীয়াৎসে পর্যন্ত এই নদীর ধার ধরেই আমরা গিয়েছিলাম। গীয়াৎসের কাছাকাছি আর একটি উপনদীর সাথে মিশে এখানে বিরাট নদীতে পরিণত হয়েছে।
আমাদের দেশে এই অবস্থায় পড়লে আমি কিছুতেই থমকে দাঁড়াতাম না সাঁতার কেটে পার হয়ে যেতাম, এখানে তা অসম্ভব। এখন যদিও তিব্বতের গরমকাল কিন্তু এই গরমকাল দার্জিলিং-এর গরমকাল থেকে অনেক বেশী ঠাণ্ডা। এই বরফ গলা জলে সাঁতার কাটার আগেই ঠাণ্ডায় আড়ষ্ট হয়ে তলিয়ে যেতে হবে।
পার হবার জন্য অন্য কোনো উপায় না খুঁজে পেয়ে আমি সেই চায়ের দোকানে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। দোকানের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করতেই সে ঘাটের কাছে ছুটে গেল ; তারপর ফিরে এসে হতাশের সুরে বলল-আজকে আর পার হওয়া সম্ভব নয় ওরা নৌকো তুলে ফেলেছে। আমাকে হতাশ হতে দেখে সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল যে, চিন্তার কোনো কারণ নেই আমি ইচ্ছে করলে তার দোকানে রাত কাটাতে পারি। আগুন আছে কাজেই অসুবিধা হবে না। এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর হতে পারে না, আমি রাজি হয়ে গেলাম ৷
সন্ধ্যের কাছাকাছি অর্থাৎ দিনের আলো থাকতেই তারা দোকান গুটিয়ে ফেলল। আমি ছেলেটিকে রাতে থাকার জন্য আগাম হিসেবে একটা সিকি দিলাম। সিকিটা পেয়ে সে কি আনন্দ পেল তা বলার নয়। তিব্বতী দু'চার পয়সা পেলেই এরা খুশী সেখানে ভারতীয় সিকি মনে হল আমি যেন চার গুণ দাম দিয়েছি। সে আনন্দের আতিশয্যে তার সাথে খাবার জন্য অনুরোধ করল,আমি তো প্রায় পা বাড়িয়েই ছিলাম সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। দোকানেই একটা ছোট ঘরে সে থাকে। ছেলেটির সাথে সেই ঘরে এসে ঢুকলাম প্রায় অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, ভেতরে ঢুকে দেখি সেই মেয়েটি একটা হাঁড়িতে করে রান্না করছে। আমাদের ঘরে ঢুকতে দেখেই সে হাসিমুখে আমাকে সম্বর্ধনা জানালো। কোনো রকম ভূমিকা না করেই সে একটা গামলায় করে আমাকে গরম খিচুরীর মতো একটা জিনিস খেতে দিল। ছেলেটি আমার পাশেই বসল। একটা বাটিতে করে সেও খেতে লাগল, আমি আরম্ভ করার আগে হাঁড়িটার মধ্যে একবার নজর দিলাম, হাঁড়িটা প্রায় খালি। আমি গামলা থেকে অর্ধেক খাবার তাকে দিয়ে বললাম—ভাগাভাগি করে খাওয়া যাক, সে প্রথমটায় কিছুতেই রাজি হল না কিন্তু শেষে রাজি হয়ে গেল। দু'জনের রান্না আমরা তিনজনে ভাগ করে খেলাম। দেখে মনে হল এরা ভাই বোন। রাতের অন্ধকার হওয়ার আগেই আমি দোকানে ফিরে এলাম। দোকানের কোন ঝাঁপ নেই আমার মতো আরও দু'জন ওখানে এসে হাজির হয়েছেন। মনে হয় তারাও কালকের ফেণীর জন্য এসে উপস্থিত হয়েছেন। উনোনের ঠিক ধারেই আমি অতিথির মর্যাদায় স্থান পেলাম। ছেলেটি উনোনে একটা বিরাট আধপোড়া কাঠ গুঁজে দিয়ে চলে গেল। আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম কাজেই একটু গরম পরিবেশ পেতেই চোখ দুটো বুজে এল ।
পরের দিন ভোরবেলা আমরা উঠলাম। উঠলাম মানে আমাদের ডেকে উঠানো হল ; মেয়েটি আমাদের ঘুম ভাঙালো। বলার আগেই চা তৈরী ছিল তাড়াতাড়ি চা খেয়ে মেয়েটির হাতে আরও চার পয়সা গুঁজে দিয়ে আমি ফেরীর পথ ধরলাম। এখানে এক গ্লাস চা-এর দাম দু' পয়সা। আরও যে দু'জন নদী পার হবার জন্য আগের দিন এসেছিল তাদের সাথে আমি ফেরীঘাটে এসে পৌঁছলাম।
নৌকাটা দেখে অবাক হয়ে গেলাম, এই ধরনের নৌকা এই প্রথম দেখছি। বিরাট একটা চামড়ার গামলা বলা যেতে পারে। তারই মধ্যে আমরা ঠাসাঠাসি করে ভেতরে বসলাম, দাঁড়িয়ে থাকলে উল্টে পড়ার সম্ভাবনা আছে। একটা তক্তা দিয়ে কোন রকমে বৈঠার কাজ চালানো হচ্ছে হালের কোনো নাম গন্ধই নেই। নদীর স্রোতের উপর ভরসা করেই চলা হয়। কোন রকমে পার হওয়া যায় মাত্র ।
একবার ওপারে এলে তাকে মাথায় করে আবার নিয়ে আসা হয় ঘাটে নয়তো এসে পৌঁছলাম সীগাৎসে।
স্রোতের টানে সাংপোতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। অবশেষে সীগাৎসে তিব্বতের অন্যতম বৃহৎ শহর, লাসা প্রথম দ্বিতীয় সীগাৎসে। তৃতীয় গীয়াৎসে আর ইয়াটুং চতুর্থ, একমাত্র এই শহরটি ছাড়া বাকি শহরগুলো এর আগেই দেখেছি। নীয়াং আর সাংপোর সঙ্গমে গড়ে উঠেছে এই শহর, মহামান্য পাঞ্চেন লামার পুণ্য ক্ষেত্র। ঐতিহ্য অনুযায়ী পাঞ্চেন লামা হচ্ছেন দালাই লামার ধর্ম ভাই। সম্পূর্ণ তিব্বতের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রচারের মূল দায়িত্ব ছিল এই পাঞ্চেন লামার উপর আর দালাই লামার দায়িত্ব ছিল শাসন ও রাজনীতির। কিন্তু কার্যতঃ দালাই লামাই তিব্বতের সর্বেসর্বা আর পাঞ্চেন লামা সাং প্রদেশের শাসক, সাং প্রদেশের তিনটি প্রধান শহর সীগাৎসে, গীয়াৎসে আর ফারী, এই তিন শহরের তিনিই সর্বেসর্বা। পাঞ্চেন লামার স্থানীয় চলতি নাম তাশী লামা ও পাঞ্চেন রিপোচে ! সীগাৎসে লাসার মতোই তিব্বতের অন্যতম মহাপুণ্যক্ষেত্র। সীগাৎসে শহরকে পরিষ্কার তিনভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম হচ্ছে এখানকার দুর্গ, বহু বছর আগে চীনারা এই দুর্গে তাদের প্রধান ঘাঁটি বসিয়েছিল। আজকালও তারা তাশীলামাকে রক্ষা করা ও আইন-শৃঙ্খলায় সাহায্য করার জন্য এখানে তাদের হেড় কোয়ার্টাস স্থাপন করেছে। দুর্গের নীচেই হচ্ছে শহর ও বাণিজ্যক্ষেত্র এই অঞ্চলের মূল বাজার, আর কয়েকমাইল দূরে আছে তাশীলুম্পো নামে এখানকার মূল গুম্ফা। লাসায় যেমন পোতালা এখানে তেমনি তাশীলুম্পো, এখানেই পাঞ্চেন লামা থাকেন। দালাই লামার গ্রীষ্মবাসের মতো তাশীলামারও একটা গ্রীষ্মাবাস রয়েছে, সেটা শহর থেকে প্রায় বারো মাইল দূরে ; তার নাম কুন-কীয়াপ্লিং। সাধুবাবার কাছ থেকে সীগাৎসে বিষয়ে অনেক সংবাদ আমি আগেই জেনেছি।
নীয়াং নদীর চড়া থেকে উপরে উঠতেই চোখের সামনে ফুটে উঠল বিরাট একটা শহর। ঘরবাড়ীগুলো সেখানে খুব ঘন হয়ে উঠেছে, সেদিকেই আমি পা বাড়ালাম। সাংপোর উপত্যকায় একটা বিরাট সমতল ভূমির উপর এই শহরটি ছড়িয়ে পড়েছে। আস্তে আস্তে আমি বাজারের দিকে এগিয়ে চললাম। শহরের প্রত্যেকটা রাস্তাই বাজারে এসে মিশেছে। অনেকটা গীয়াৎসের বাজারের মতো, গাধা, ইয়াক, ভেড়া, মুরগী, কুকুরগুলো রাস্তাটাকে রিজার্ভ করে রেখেছে। দু'দিকে কালিম্পং-এর বাজারের মতো দোকান ও শেরপাতে ঠাসা। তারই মধ্যে আমি এগিয়ে চললাম। হঠাৎ একটা সাইন বোর্ড দেখে থামতে বাধ্য হলাম। হিন্দী ও ইংরেজীতে লেখা রয়েছে ‘হোটেল’। হিন্দীতে যখন লেখা রয়েছে তখন নিশ্চয়ই হিন্দী জানা কাউকে পাওয়া যাবে সেই আশায় সেদিকে এগিয়ে গেলাম। কৈলাসে যাবার পূর্ণ বিবরণ এখান থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। হোটেলটা একতলা সাদা বাড়ী। হিন্দীতে হোটেল লেখাটা প্রায় অস্পষ্ট হয়ে আছে। নীচের তলায় একটা মুদীখানার দোকান। দোকানে হিন্দী জানা কাউকে পাওয়া গেল না, তাই আমি বাড়ীর ভেতরে ঢুকলাম। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমাকে দেখেই অবাক হয়ে তাকালেন। আমি হেসে হিন্দীতে জিজ্ঞেস করলাম—আপনার বাড়ীর দেয়ালে দেখলাম হিন্দীতে লেখা রয়েছে ‘হোটেল’, আপনি কি হিন্দী বোঝেন । আমার কথাটা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। আমার কথায় সরাসরি উত্তর না দিয়ে তার অতি অল্প চুলের বাহার করা গোঁফের উপর আঙ্গুল বুলিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন।
তারপর কোনো কথা না বলে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, আমাকে ইসারায় অনুসরণ করতে বলে তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন, আমি তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। রাস্তার ওপারে এসে দাঁড়ালাম প্যাগোডা ধরনের সুন্দর একটা বাড়ীর সামনে। আমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে তিনি বাড়ীর ভেতরে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁর সাথে আর একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বাড়ী থেকে বেড়িয়ে এসে আমাকে হাসিমুখে আপ্যায়ন জানালেন। এই বয়স্ক ভদ্রলোকের মুখটা দেখলেই ভক্তি করতে ইচ্ছা হয়। তিনি সস্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন- —তুমি কি গ্যাংটক থেকে আসছো ? তার মুখ থেকে সুন্দর হিন্দী শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি বললাম-হ্যাঁ। তিনি আমার উত্তর শুনে অবাক হয়ে গেলেন, তারপর বিস্ময়ে সুর টেনে বললেন—বল কি ! আজকালতো শুনেছি যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই পবিত্র আত্মার সামনে কিছুতেই মিথ্যে কথা বলা সম্ভব নয়। আমি গ্যাংটক থেকে লাসা আর লাসা থেকে এখানে আসা পর্যন্ত সব তাকে খুলে বললাম। আমি তাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে বললাম যে আমি কৈলাসে যেতে চাই মানস সরোবরে একটা ডুব দিতে চাই, আমাকে আপনি দয়া করে সেখানে কি করে কোথা দিয়ে যেতে হবে তা বলে দিন, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো।
ভদ্রলোক আমর কথা শুনে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর হাল্কা দাড়িটা হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি “হুম্” করে একটা শব্দ করলেন মাত্র। যে ভদ্রলোক আমাকে সেখানে নিয়ে এসেছেন তাঁকে চলে যেতে বলে তিনি আমাকে ভেতরের একটা ঘরে নিয়ে এলেন।
কাঠের থাম আর সিমেন্টের দেয়াল। ঘরটা দেখলেই বোঝা যায় যে এটি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার । একটা ছোট ভারী গদীর উপর আমাকে বসিয়ে তিনি উঁচু গলায় কাকে যেন ডাকলেন। ভেতর থেকে এক ভদ্রমহিলা এসে উপস্থিত হলেন। আমাকে দেখেই তিনি থমকে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে মাথা নীচু করলেন। ভদ্রলোক তাঁকে কিছু খাবার আনতে বললেন, তিনি আবার চলে গেলেন। এই সৌম্যমূর্তি দর্শন অবধি আমার মনে যেন আবার নতুন করে জোয়ার এসেছে। তাঁকে দাদু বলেই সম্বোধন করবার অধিকার পেলাম। তিনি আমার সামনে পা গুটিয়ে বসে খুব গোপনীয়তার ভাব করে একটু ভৎসনার সুরে বললেন—তুমি তোমাদের দল ছেড়ে মোটেই ভাল করনি। এসেই যখন পড়েছো তখন কি আর করা যাবে ।
তুমি কৈলাসে যাবে খুব ভালো কথা ভগবান বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব তোমাকে রক্ষা করুন। কিন্তু তুমি নেহাতই ছেলেমানুষ কৈলাস এখান থেকে অনেক দূর তাছাড়া পথও অতি দুর্গম, আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে দিতে পারি সেখানে পৌঁছবার মতো মনোবল থাকলে নিশ্চয়ই পৌঁছতে পারবে ।
আমাদের কথার মাঝেই ভেতর থেকে সেই ভদ্রমহিলা একটা বিরাট কাঠের থালায় করে চা ও নিমকি জাতীয় খাবার এনে আমাদের পাশে রাখলেন। চা খেতে খেতে আরও কথাবার্তা হতে লাগল তারপর হঠাৎ পেলাম অতি প্রয়োজনীয় তথ্য। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেই কথা আবার বলবার জন্য দাদুকে অনুরোধ করলাম, তিনি হেসে আবার বললেন—
মানস সরোবর বললে লোকেরা চিনবে না। ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা ঐ নামেই ডাকে বটে কিন্তু আমাদের কাছে তার নাম সম্পূর্ণ অন্য। মানস সরোবরকে আমরা বলি মাফাম্ সো, অনেকে মাভাং ৎসো নামেও তাকে চেনে। ৎসো মানে সরোবর। মানস সরোবরের পাশেই আছে লাংগাক্ ৎসো তাকে ভারতীয় সাধুরা বলে রাক্ষসতাল। এই দুটো সরোবর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তিব্বতীদের কাছে কৈলাস খুব বড় তীর্থ নয়, বড় তীর্থক্ষেত্র হচ্ছে সেখানকার গুম্ফা। সবাইকে বলবে দিরাফুক গুম্ফা তাহলেই তারা তোমাকে পথ দেখিয়ে দেবে। দাদু একটা কাগজে এই নামগুলো তিব্বতী ভাষায় পরিষ্কার করে লিখে দিলেন।
আমি সঙ্গে নামগুলো প্রায় মুখস্ত করে ফেললাম মাফাম্ ৎসো (Mapham Tso), মাভাং ৎসো, লাংগাক্ ৎসো, দিরাফুক গুম্ফা দিরাফুক গুম্ফা। আমি ইষ্টমন্ত্রের মতোই সেই নামগুলো মনে মনে উচ্চারণ করতে লাগলাম। যদি আমার কাগজ-পত্র বা ডায়রীটা হারিয়ে যায় তাহলেও অন্ততঃ কৈলাসের পথ নির্দেশ আমার মন থেকে হারাবে না। দুপুরে দাদুর সাথেই খাওয়ার আমন্ত্রণ পেলাম। অন্যদিন হলে আমি এই আমন্ত্রণে নিশ্চয়ই লাফিয়ে উঠতাম কিন্তু এই মুহূর্তে কৈলাসের এক স্বপ্নচিত্র মনে উদিত হওয়ায় বারবার মনে হতে লাগল যে এই মুহূর্তেই রওনা হওয়া দরকার । আমার মন আনন্দে লাফাতে লাগলো—পেয়েছি পেয়েছি কৈলাসের পথ-নির্দেশ আমি পেয়েছি।
দাদু আমাকে এটা-ওটা জোর করে খাওয়ালেন, অনেকদিন পর ভাত ও সব্জি খেলাম আর তার সাথে ছিল মাংস। খেয়ে-দেয়ে উঠে আমি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় জানাতেই তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠলেন—তিনি আমার হাতটা ধরে বললেন—পাগল নাকি ! এখন যাবে কোথায় ! বস বস বিশ্রাম কর। তার সেই স্নেহপূর্ণ আপ্যায়ন উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা আমার নেই অতএব আমি রাজি হয়ে গেলাম ৷
পরে জানলাম যে দাদুই এই বাড়ীর মালিক—ভদ্রমহিলা রান্না বান্নার কাজ করেন। তার ছেলেমেয়েরা সবাই কয়েকদিন হল এক আত্মীয়ের বিয়েতে গেছেন। দাদু দার্জিলিং-এ ছোটবেলায় পড়াশুনা করেছেন, কয়েকটি বাংলা শব্দ এখনও তার মনে আছে। কার্শিয়াং কালিম্পং,শিলিগুড়িতে অনেকদিনথেকেছেন,দু'বার তিনি কলকাতায়ও গিয়েছেন। তাঁর মতে বাঙালীদের মতো এত চালাক জাতি পৃথিবীতে আর নেই। তিনি তাঁর ফোকলা দাঁত বের করে মাঝে মাঝে হেসে উঠেন, আর প্রায়ই বহুদিনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তন্ময় হয়ে যান। তাঁর স্মৃতিশক্তির পরিচয় পেয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, তিনি হিন্দী এখনও ভোলেননি। পরে জানলাম দাদু সেই রাস্তার ধারের হোটেলের মালিক, তবে আজকাল আর সেই ব্যবসা নেই। ভারতের সঙ্গে যখন ভাল যোগাযোগ ছিল সেই সময়টা ছিল এর সুবর্ণ যুগ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন