যাত্রা

বিমল দে

লামাদের মধ্যে হঠাৎ আনন্দের সাড়া পড়ল ।

১৯৫৬ সালের ৮ই এপ্রিল, কাঠমাণ্ডু থেকে অনুমতি পত্র এল। কাঠমাণ্ডুর চীনা দূতাবাস থেকে একজন কর্মচারী নিজের হাতে নিয়ে এসেছে সেই অনুমতি পত্র। গুরুজীকে সে চেনে, গুরুজীর নামই গাইড় হিসেবে সেখানে লেখা। এই প্রথম তাঁর নাম জানতে পারলাম। তাঁর নাম গুরু গেশে রেতেন। তিব্বতী পদবী-খুব সম্মানীয় ও উচ্চস্তরের তো বটেই। লামারা একই সঙ্গে গুরুজীর নামে চীনা দূতাবাসে অনুমতি পত্রের জন্য আবেদন করেছিলেন। এটি তারই উত্তর। ভদ্রলোক গুরুজীকে অনুমতি পত্রটি দিয়ে বার বার করে তীর্থযাত্রীদের গুণলেন তারপর প্রত্যেকের পাঁচ আঙ্গুলের টিপসই নিয়ে বিদায় জানালেন। তিনি ছিলেন চীনা দূতাবাসের একজন নেপালী কর্মচারী।

লামাদের মধ্যে চঞ্চলতা দেখা দিল, তৈরী হও, এবার যেতে হবে।

এচে ধর্মশালায় তাঁদের থাকা ও খাওয়া বাবাদ যা কিছু পাওনা তা মিটিয়ে দেওয়া হল। খুব সস্তাই বলতে হবে মাথা পিছু একদিনের জন্য মাত্র দশ আনা । সেইদিনই বিকেলবেলা সিকিমের রাজবাড়ী থেকে আমাদের প্রত্যেকের জন্য এল নতুন কম্বল ও চাদর। সিকিমের মহারাজ বরাবরই যাত্রীদের জন্য এই দানের সঙ্গে তার শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ পাঠান। কৈলাস বা লাসা যাত্রীদের জন্যই এই ব্যবস্থা। সেদিন রাত্রিতেই গুরুজী তাঁর শেষ উপদেশ দিয়ে দিলেন। যাত্রীদের মধ্যে একমাত্র গুরুজী ছাড়া অন্যান্য সকলেরই এই প্রথম তিব্বত যাত্রা, আনন্দ-উৎসাহ আর কৌতূহলের যেন অন্ত নেই ৷

৯ই এপ্রিল ।

পরেরদিন খুব ভোরে উঠে আমরা তৈরী হয়ে নিলাম। প্রত্যেকের পিঠে সামান্য মালপত্র। ভারী পোশাক, হাতে জপমালা আর লাঠি। মালপত্রের মধ্যে আছে প্রধানতঃ কম্বল, আটা, ছাতু। নুন প্রত্যেকের কাছেই কম করেও পাঁচ-ছ কিলো, তিব্বতে নুনটা খুব দামী সামগ্রী, যত ওপরে ওঠা যাবে ততই এর দাম বাড়বে।

সমবেত প্রার্থনা সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম মন্যাস্ট্রি থেকে। বাইরে এসে দূরে পাহাড়টার দিকে দেখিয়ে গুরুজী বললেন—ওই দেখ চুম্বি ভ্যালী—তার গা ঘেঁষে যে পাহাড়টা উঠে গেছে তার ওপর আমাদের উঠতে হবে, পাহাড়ের ওপারেই রয়েছে

আমাদের রহস্য জগৎ তিব্বত আর মহাতীর্থ কৈলাসনাথ ও মানস সরোবর মঠ থেকে অনেকেই আমাদের সাথে সাথে রাস্তায় এসে গিয়েছিল। তাদের বিদায় জানাবার আগে আরেকবার তথাগতের উদ্দেশ্যে আমাদের সমবেত প্রার্থনা করলাম—

‘প্রজ্ঞাহীন লোক ধ্যানে বসতে পারে না ধ্যানহীন ব্যক্তির প্রজ্ঞা হয় না,

হে ভগবান করুণাসিন্ধু জগৎপতে

তুমি আমাদের প্রজ্ঞার পথে চালিত কর,

বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের পথে পরিচালিত কর।'

বলাই বাহুল্য, এই মঠের সবাই তিব্বতী ভাষা জানে। তিব্বতী ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে এখানকার পূজা-পদ্ধতি। গুরুজী সকলের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন—আমার নতুন নাম হল গেলং লামা ।

আমাদের যাত্রা হল শুরু, ছোট বড় সবাইকে একে একে বিদায় জানিয়ে আমরা বড় রাস্তা ধরলাম। সেখানেই দেখা হল আচুর সাথে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে ভাঙা ভাঙা শব্দ মিলিয়ে বলল—‘আমাকে ভুলে যেও না।' আমিও ওর পিঠে মৃদু আঘাত করে আশ্বাস দিলাম। সে জানে যে আমার কথা বলা নিষেধ ।

গ্যাংটক শহরের একটু বাইরেই হচ্ছে এই মঠটা, এখান থেকেই আমরা ধরলাম নাথুলা সড়ক। এই রাস্তাটাই পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকায় পড়ে আবার উঠে গেছে পরের পাহাড়ে, তিব্বতের পথে। আমার নিজের মালপত্রের সাথে যোগ হয়েছে গুরুজীর কম্বল আর একটা অ্যালুমনিয়মের ডেক্‌চি। আমার পিঠের মাল সব মিলিয়ে দশ কিলোও হবে না। পাহাড় থেকে নামতে কোন অসুবিধা হল না। আমার পোশাক বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরই মতো, অসুবিধা যেটা হচ্ছে সেটা হচ্ছে এই পোশাক। ঠিক ভারী নয় কিন্তু মনে হয় জটিল। ছেলেদের লুঙ্গি আর মেয়েদের সেমিজ এই দুটোকে এক করে তার ওপর সোয়েটার আর চাদর জড়ালে যা দাঁড়ায়। যারা অভ্যস্ত তারা বলবে যে শীতের দেশে এর চেয়ে উপযুক্ত পোষাক আর হতে পারে না। কথাটা ঠিক, যারা লুঙ্গি পরে দৌড়য় তাদের কাছে সেটাই উপযুক্ত, আসলে সবই অভ্যাসের ব্যাপার ৷ আমি এই পোষাক পরে এখনও মঠের বাইরে চলা ফেরা করিনি কাজেই আমার কাছে এটা খুবই অস্বস্তিকর লাগছে, বিশেষ করে এই পাহাড়ি এলাকায় ৷

ঘন্টা চারেক চলার পর আমরা পড়লাম সমতল ভূমিতে। ডান ও বাঁদিকের মিলিটারী ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগুতে লাগলাম। গুরুজীর নির্দেশ তাড়াতাড়ি হাঁটবে না, আর চলার পথে কেউ কথা বলবে না। প্রথম দিন, কাজেই সকলেই সুস্থ ও সবল, মনের উদ্যম আর উৎসাহ চলার ভঙ্গিতে প্রকাশ পাচ্ছে। দুপুরবেলায় আমরা থামলাম। শুকনো ডালপালা যোগাড় করে আমাদের খাবারের জন্য উনুন ধরালাম। এ পর্যন্ত শুধু নীচের দিকেই নেমেছি, কাজেই আমরা কেউই ক্লান্ত হইনি। ভাত আর আলুসেদ্ধ পরম আনন্দে খেয়ে, সব জিনিসপত্র গুছিয়ে আবার ধরলাম রাস্তা।

এবারে ওপরে ওঠার পালা। আমাদের এই দলে আমিই সবচেয়ে বয়সে ছোট, আর গুরুজীই বয়োজ্যেষ্ঠ। অধিকাংশ লামাদের বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। এরা সবাই পাহাড়িয়া, কাজেই পাহাড়ই এদের নিত্য সখা, পাহাড়েই এদের প্রাণ। আমিও এদের সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে এগুতে লাগলাম। গ্যাংটকের মতো এই অঞ্চলটাও সুন্দর পাইন ও ফার্ণের বনে ভরা আর তারই সাথে খাপ খাইয়ে রয়েছে সেওলা পাথরের ভ্যাপসা গন্ধ। সিকিমের বড় রাস্তাটা ছেড়ে আমরা ধরেছি নাথুলার পথ। নাথু মানে নাম আর লা মানে সংকট, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ । জীলাপ লা এই ধরনের আর একটি পাশ, এখান থেকে একটি পথ এগিয়ে গেছে সেদিকে। যে বর্ধিষ্ণু গ্রামটা আমরা পার হলাম তার নাম কারপোনাং (Karponang)।

আমরা যত ওপরে উঠতে লাগলাম ততই গ্যাংটক ও সমস্ত হিমালয়ের দৃশ্য পালটাতে লাগল, হিমালয়ের অন্য এক রূপ আমাদের সামনে ধরা দিল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বনের পথ ধরে আমরা এগিয়ে চলতে লাগলাম। আবহাওয়াটা খুবই উপভোগ্য, পাহাড়ে ওঠার জন্য যে পরিশ্রম হচ্ছে তা এখানকার ঠাণ্ডা হাওয়ায় উপশম হচ্ছে। তবে ক্লান্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া মুশকিল। চলা দেখেই বোঝা যায় যে আমরা সবাই হাঁপিয়ে উঠেছি। সন্ধ্যের দিকে গুরুজী বললেন আর কিছুদূর গিয়েই আমরা থামবো। তাঁর কথা মতো ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা একটা ছোট গ্রাম পেলাম, গ্রাম না বলে তাকে চটি বলাই ভাল। একটা কাঠের বাড়ীর সামনে আসা মাত্রই কয়েকজন ভদ্রলোক আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন। গুরুজী তাঁদের ভাষায় কি যেন জিজ্ঞেস করলেন, ভদ্রলোক আমাদের পথ দেখিয়ে দোতলার একটি ঘরে নিয়ে তুললেন। দুটো ঘরে ঠাসা-ঠাসি করে বত্রিশজনের ব্যবস্থা হলো। বুঝলাম সে রাতে সেখানেই থাকতে হবে। গুরুজী বললেন জায়গাটার নাম চেংগু (Chengu)।

প্রত্যেকদিন রাত্রিবেলা শোবার আগে গুরুজী ভগবান বুদ্ধের বাণী পাঠ করেন, সকলে তা মন দিয়ে শোনে। চেংগুর যে ঘরে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছিল, সেখানে ছাদটা খুব নীচু ভালভাবে বসার উপায় নেই, বসতে হলে বারান্দায় যেতে হবে, কাজেই গুরুজী সকলকে একশ আটবার মালা জপ করতে বলে শুতে চলে গেলেন। রাতের খাবার হিসেবে খেতে হল স্থানীয় বাগানের কাঁচা সবজি। মূলো ও ফুলকপি। খিদের মুখে যা পাওয়া যায় তাইই চলে। খাবার থেকে তখন বিশ্রাম আর ঘুমের বেশী প্রয়োজন ।

পরের দিন খুব ভোরে উঠে আবার রওনা হলাম। চাংগু বা চেংগু থেকে আর মাত্র আট মাইল আছে নাথুলা। গ্যাংটক থেকে এখানে আসতে সাধারণতঃ দেড় দিন সময় লাগে কিন্তু আমরা একটা খাড়াই সংক্ষেপ পথে একদিনেই পৌঁছতে পেরেছি।

খুব ভোরবেলায় উঠে আমরা অবার রওনা হলাম। এবার রাস্তাটা সত্যি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এঁকে বেঁকে সরু রাস্তাটা ওপরের দিকে উঠে গেছে, রাস্তার দুধারে সামরিক বাহিনীতে ভর্তি। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য আগের থেকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে, চলার ক্লান্তি কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যেই যেন মিটে যাচ্ছে। আমাদের হঠাৎ থামতে হল--একজন সৈন্য আমাদের কাছে এসে বলল—আর এগুবে না সরাসরি ফিরে যাও। তার কথা শুনে আমরা তো অবাক, গুরুজী খুব ভাল হিন্দী জানেন। তিনি সৈনিককে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেন যে আমরা তীর্থযাত্রী, আমরা যাচ্ছি তাশিলুম্‌পা ও মানস সরোবরের দিকে।

সৈনিক তার কথায় হেসে উঠল—সব তীরথ বন্ হোগিয়া, আপস্ যাও ৷

গুরুজী তার কথায় কান না দিয়ে আমাদের চলতে বললেন। আমরা চলা আরম্ভ করতেই সৈনিকটি পথ আগলে ধরলো, তারপর বলল—ঠিক আছে, যদি যেতেই চাও যাও সামনেই সীমান্ত প্রহরীর পাল্লায় পড়বে, তখব বুঝবে মজা। আমরা তাকে বিনা তর্কে এক পাশে রেখে এগিয়ে চললাম। আধঘন্টা পরই আমরা আবার পেলাম সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বেড়া। একটা গাছকে রাস্তার ওপর রেখে তৈরী করা হয়েছে কৃত্রিম সীমান্ত। ছ'জন জাট সৈনিক আমাদের দেখে এগিয়ে এল। গুরুজী প্রস্তুতই ছিলেন, তিনি তাদের বুঝিয়ে বললেন যে আমাদের ছেড়ে দিলে তার কাজের কোন শিথিলতা হবে না। আমাদের কাগজপত্র সব আছে। গুরুজীর কথা শুনে তারা আমাদের পাশের একটি তাঁবুতে নিয়ে গেল, সেখানে অফিসারের সামনে আমরা হাজির হলাম। অফিসার ভদ্রলোক আমাদের কাগজপত্র খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে আমাদের যেতে অনুমতি দিলেন। সীমান্ত এখনও অনেক দূরে। বলাই বাহুল্য যে এই অঞ্চলে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীই সীমান্ত রক্ষা করছে। সেখান থেকে আরও তিন ঘন্টা পর আস্তে আস্তে রাস্তাটা সরু হয়ে এল। ঘন বনের ভ্যাপসা গন্ধটা আরও ভারী হয়ে এল, শরীরটাও যেন আগের চেয়ে অনেক ভারী ভারী ঠেকছে। রাস্তাটা একেবারে কাঁচা পাথর আর ধুলোয় ভর্তি। আমাদের সামনের পাহাড়টা দেয়ালের মতো যেন এগিয়ে আসছে, গুরুজী আমাদের থামতে বললেন। আমরা সে অপেক্ষাতেই ছিলাম। তাঁর কথা কানে যাওয়া মাত্র আমরা বসে পড়লাম রাস্তার ওপর। উঃ, কি উঁচু এই পথ। আর কতদূর ?

আধঘন্টা বিশ্রাম করে আমরা আবার রওনা হলাম, সামনের বাঁকটা পেরোতেই আমরা পড়লাম একটা বিরাট সৈন্যবাহিনীর হাতে, নাথুলার দৃশ্য এখন সামরিক বাহিনীর দৃশ্য, প্রায় সাড়ে চার হাজার মিটার ওপরে পাহাড়ের ওপর যেন সবাই কুরুক্ষেত্রের জন্য তৈরী আছে। সৈন্য সংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে রয়েছে গোলা বারুদ বন্দুক। সবাই তৈরী শুধু ভেরী বাজার অপেক্ষা। আমাদের চারিদিকে শ'খানেকে জওয়ান এগিয়ে এল, সকলের হাতেই উদ্যত বন্দুক, হঠাৎ দেখে মনে হবে এরা যেন আমাদেরই অপেক্ষায় বসে ছিল। বুঝতে অসুবিধা হল না, এটাই ভারত তথা সিকিম ও তিব্বতের সীমান্ত।

এদের সর্তক দৃষ্টি এড়িয়ে একটা মাছিও সীমানা লঙ্ঘন করতে পারবে না। এদের ক্ষমতা ও কর্মতৎপরতা দেখে মহান ভারতের সৈন্যবাহিনীর তারিফ না করে থাকা যায় না। রাস্তার ধারেই একটা কাঠের বাড়ীতে সীমান্ত চৌকি, সেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। অফিসার ভদ্রলোক আমাদের বসতে বললেন। তার কথার কায়দায় ও হাবভাবে মনে হল.তিনি বাঙালী। আমার কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই।

সামান্য একটু অসাবধানতার জন্য হয়তো আমার সম্পূর্ণ যাত্রাটাই নষ্ট হয়ে যাবে, সামরিক বাহিনীর হলেও দেখে মনে হয় তিনি খুবই ভদ্র। তিনি গুরুজীকে আশ্বাস দিয়ে বললেন যে আমাদের যাওয়ার খবর তিনি সরকারীভাবে জানতে পেরেছেন। কোন অসুবিধা হবে না, আমাদের কাগজপত্র সব ঠিক আছে। গুরুজীর সাথে তিনি হিন্দীতেই কথাবার্তা বললেন। তিনি আমাদের সবাইকে মিলিটারী তাঁবুর ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে সেখানকার কোয়ার্টার মাস্টারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমরা লাসা কৈলাসের দিকে যাবো শুনে চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কি পাগলা নাকি ? শীত এখনও কমেনি আর তাছাড়া রাস্তাও খুব সহজ নয়। আমরা যাবো কি করে ? যাই হোক ভদ্রলোক আমাদের খুব প্রশংসা করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁরা আমাদের বিরাট মগে করে চা সেই সাথে রুটি ও তরকারী পরিবেশন করলেন। আমাদের কাছে এটা অপ্রত্যাশিত, তাঁরা আমাদের পেট ভরে খাওয়ালেন, আমরা তাঁদের প্রাণভরে আর্শীবাদ করে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলাম ।

নাথু-লা'র এই ভয়াবহ গিরিসংকটকে এতক্ষণে দেখবার অবকাশ পেলাম। হিমালয়ের এ আর এক অপরূপ দৃশ্য। পাহাড়ের এটাই হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু অংশ। এখান থেকে পাঁচ মাইল দক্ষিণে আর একটি পথ আছে সেটার নাম জীলাপ লা। দূরে দেখা যাচ্ছে সিকিম আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সুন্দর দৃশ্য আর আমাদের সামনেই চুম্বি উপত্যকার পথ। আরও কিছুদূর এগুতেই বাঁদিকে হঠাৎ নজরে পড়ল বিরাট খাদ, হঠাৎ এখান থেকে পাহাড়টিকে কে যেন দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। বিরাট খাদের পরই ঝরণার এক উগ্র মূর্তি। প্রকৃতির কাছে আমাদের যেন মনে হচ্ছে অতি তুচ্ছ ও নগণ্য কীট। সাবধানে আমরা নামতে লাগলাম। যে কোন মুহূর্তে ধস নামতে পারে। রাস্তার ধারেই নজরে পড়ল ছোট ছোট পাথরের একটা বিরাট স্তূপ। গুরুজী বুঝিয়ে দিলেন—তীর্থযাত্রীরা এখান দিয়ে পার হবার সময় একটা পাথর এর ওপর যোগ করে । মহান হিমালয়কে প্রণাম জানাবার এ আর এক রূপ। আমরাও সেই পাথরের স্তূপে এক-এক করে আরও এক-একটি পাথর যোগ করলাম। আমি প্রার্থনা করলাম — হে দেব-দেবী! তোমরা আমাদের যাত্রা সফলের জন্য আশীর্বাদ করো ।

আমাদের সামনেই চুম্বি উপত্যকার বিশাল দৃশ্য উদঘাটন হল। সামরিক বাহিনীরা যদি না খাইয়ে দিত তাহলে রান্না ও খাওয়ার জন্য আমাদের অনেক সময় ব্যয় করতে হত, সেই সময়টায় আরও এগিয়ে চললাম, পেছনে পড়ে রইল মাতৃভূমি ভারত। ভৌগোলিক সীমা অনুযায়ী আমরা এখন তিব্বতের মাটিতে ।

সমতলভূমির আট মাইল মোটেই কষ্টকর নয়, কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলের আট মাইল খুবই কষ্টসাধ্য। প্রথম প্রথম আমরা আধঘন্টা পর পর বিশ্রাম করতে লাগলাম, তারপর প্রত্যেক পনেরো-কুড়ি মিনিটে আমরা দাঁড়াতে লাগলাম। কাঁকর মেশানো কাঁচা পাহাড়ে-রাস্তাটা যেন এবার আগের চেয়ে অনেক খাড়াই হয়ে গেছে। যত ওপরে উঠছি ততই হিমালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে লাগল। সিকিমের রূপটা আরও অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে, বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়াগুলো মনে হচ্ছে বিরাট বিরাট ঢেউ। দূরের

পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে যেন মেঘের থেকে সরাসরি নেমে এসেছে। হিমালয়ের অনেকগুলো ধাপ ডিঙ্গিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছি। সন্ধে হয়ে এল এখান থেকে সুর্যাস্তের লাল আভা দেখলাম। হঠাৎ গুরুজী আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, পিছন ফিরে তাকালাম সিকিম তথা ভারতবর্ষের দিকে, এরপর আর এই দৃশ্য দেখা যাবে না । সিকিম কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। আমাদের সামনেই নজর পড়ল একটা স্তূপ। কোন সিমেন্ট বা পাথরের কারুকার্য নয়। বলা যায় যে কোন ছোট ছেলে হয়তো আশপাশের পাথর জমিয়ে একটা স্তূপ করবার চেষ্টা করেছে, আবার আমরা জানালাম হিমালয়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ। নাথুলা'র এইটাই সর্বোচ্চ অংশ ১৪০০০ ফিট। গুরুজী বুঝিয়ে দিলেন যে অতি প্রাচীনকাল থেকেই ভারত থেকে তীর্থযাত্রীরা তিব্বতে যাওয়ার পথে একটা করে পাথর এখানে জমা করে রাখে। নাথুলা পৌঁছবার প্রতিভূ হিসাবে, আর তিব্বতীরাও ভারতে যাবার পথে পাশের থেকে একটা পাথর এখানে জমা করে। পাথরের এখানে অভাব নেই, আমাদেরও প্রত্যেককে একটা করে পাথর এখানে রাখতে হবে। গুরুজীর কথামতো আমরা পাথর রাখলাম, সেই স্তূপাকৃতি পাথরের ওপর আরও কিছু পাথর পড়ল ।

বিশ্রামের জন্য আমরা একটা বড় পাথরের পেছনে জড়ো হলাম। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পর আমরা এখন পর্যন্ত অন্য কোন লোকের দেখা পাইনি। শুধু মাঝে মাঝে মাথার ওপর দিয়ে কয়েকটি কাক কা কা করে আমাদের স্বাগতম্ জানিয়েছে মাত্র । গুরুজীকে আমি লামা বলি আর সকলে ডাকে রেন লামা বলে। তিনি সকলকে তিব্বতের গ্রামে ঢোকাবার আগে শেষ পরামর্শ দিতে শুরু করলেন,

—খুব শীগগীরই আমরা তিব্বতের প্রথম গ্রাম পাবো। সম্ভবতঃ গ্রামে ঢোকবার আগেই হানদের (তিব্বতীরা চীনাদের হান্ বলে) সম্মুখীন হতে হবে, এটাই স্বাভাবিক যে তারা আমাদের নানাভাবে পরীক্ষা করবে। তারা যাচাই করে দেখবে যে আমরা সত্যিকারের লামা কি না। তোমাদের সামনে আসছে এক ধৈর্যের পরীক্ষা, তোমরা তার জন্য প্রস্তুত হও।

আমরা আবার চলতে শুরু করলাম। প্রায় সমতলের কাছাকাছি পৌছতেই আমরা পেলাম একটি চৌকি। সীমান্ত প্রহরীরা সবাই তিব্বতী, তাদের সাথে মাত্র দুজন চীনা সৈন্য। চীনা সৈন্যদের পিঠে বাঁধা ওয়ারলেশ রেডিও। তারা আমাদের দাঁড়াতে বলল। তিব্বতী সেনা এগিয়ে এসে গুরুজীকে তিববতী ভাষায় কি যেন জিজ্ঞাসা করল, গুরুজী তার উত্তরে কাগজ বের করে দেখাতে লাগলেন। চীনা প্রহরী দুজন খুব ভাল করে ছাড়পত্রগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। ছাড়পত্র বলতে কাঠমাণ্ডুর চীনা দূতাবাসের অনুমতিপত্র, তার সাথে সিকিম সরকারের প্রশংসা ও শুভেচ্ছা বাণী আর গুরুজীর ব্যক্তিগত পরিচয় পত্র। তার মানে গুরু গেশে রেপতেনের সততা প্রমাণ হলেই চলবে, আমরা তাঁর সহচর মাত্র। তিব্বতী ভদ্রলোক চীনা ভদ্রলোককে কাগজের প্রত্যেকটি শব্দের চীনা ভাষায় তর্জমা করে দিতে লাগল। চীনারা এ বিষয়ে খুবই হুসিয়ার তারা সব মনোযোগ দিয়ে শুনে আমাদের সামনেই ওয়ারলেশ রেডিওর মারফত তার ঊর্ধ্বত মহলে জানিয়ে দিতে লাগল। তিব্বতী ও চীনা ভাষার শব্দগুলো আমার কাছে খুবই অদ্ভুত বলে মনে হল। আমি মনে মনে খুবই আনন্দিত, ভারত ছেড়ে বিদেশে আসার আনন্দে আমার মন তখন খুশীতে ভরা, যদিও শরীর খুবই ক্লান্ত তবুও মনে উৎসাহের অন্ত নেই ৷

আমরা সেখানে ওপর মহলের উত্তরের আশায় প্রায় ঘন্টাখানেক বসে রইলাম, কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। আস্তে আস্তে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল, তবুও কনফারমেশন কিছু এল না। গুরুজী বলে রেখেছেন—খুব সাবধান! ধৈর্য ধরে থাকবে। অতএব ধৈর্য ধরে থাকতেই হবে। সন্ধ্যার আলোও নিভে এল! চৌকির কাঠের ঘরে ওরা একটা হ্যারিকেন জ্বালালো। আমরা বত্রিশ জন লামা, চারজন তিব্বতী সৈন্য, দুজন চীনা সৈন্য, সবাই চুপচাপ, কারও মুখে এতটুকু শব্দ নেই। শুধু থেকে থেকে মালার খস খস শব্দ আর লামাদের ভারী নিঃশ্বাস,সেই নিঃশব্দতাকে একটু নাড়াচাড়া দিতে লাগলো। আমাদের মধ্যে অনেকেই পথের শ্রান্তিতে বসে বসেই ঝিমিয়ে পড়েছে। ঘন্টাখানেক পর চীনা রেডিও বেজে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই সচকিত হয়ে উঠলাম। রুদ্ধ শ্বাসে শুনতে লাগলাম—চীনা শব্দে আমাদের জবাব। চৌকিদাররা ভালভাবে উপরিওয়ালার নির্দেশ শুনতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর তারা আমাদের বুঝিয়ে বলল—ঠিক আছে তোমরা যেতে পারো তবে তোমাদের ভালভাবে সার্চ করা হবে । সত্যি আনন্দ সংবাদ বটে। কথানুযায়ী তারা আমাদের পোশাক ও মালপত্র ভালভাবে সার্চ করে এবং সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হল।

আমরা ছাড়া পেলাম, আমাদের আনন্দ আর দেখে কে? তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা রাস্তায় পড়লাম। রাস্তায় পড়লাম বটে কিন্তু এগুতে গিয়ে দেখি এ আর এক বিপদ, রাত্রির অন্ধকার চারদিকে ঘনিয়ে এসেছে, রাস্তা দেখার জন্য যে সামান্য আলোর দরকার সেটাও নেই। আমরা থামতে বাধ্য, অথচ চৌকিদাররা বলেছে এ অঞ্চলে না থামাই ভাল, কারণ সৈন্য বাহিনীর লোকেরা ভুল করে আমাদের ওপর গুলি ছুঁড়তে পারে। সমস্যা সমাধানের জন্য গুরুজী এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন-তোমরা আমার পেছনে লাইন ধরে এসো আমি প্রথম যাচ্ছি। গুরুজী তাঁর লাঠিটার পেছন দিকটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন, আমি বাঁ হাতে তাঁর লাঠিটা ধরে ডান হাতে আমার লাঠিটা পেছনের দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। এই ভাবে লাঠির শিকল ধরে আমরা চলতে লাগলাম। প্রায় আধঘন্টার মধ্যেই আকাশের তারার আলো আমাদের চোখে ধরা দিল, সেই আলোতেই দেখতে পেলাম রাস্তা।

পাহাড়ে ওঠার পর পা ধরে যায়, আর নামার পর অবশ পা কাঁপে। পাহাড়ে যারা ওঠা নাম করেন তারা ভালভাবেই এই ব্যাপারটা জানেন। আমার সঙ্গী লামাদের অবস্থা কি রকম জানি না তবে আমার অবস্থা খুবই কাহিল, মনে হয় এখানে যদি আমাকে শুতে বলে তাহলে শোবার সাথে সাথেই আমি ঘুমিয়ে পড়ব, কিন্তু চলতেই হবে। ওপরে তারার আলো, পাশে ঝি ঝি পোকার ডাক আর আমাদের চলার শব্দকে কেন্দ্র করেই আমরা চলতে লাগলাম। চলতে চলতে হঠাৎ আমাদের ওপর যেন কারা আক্রমণ করল। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে একঘেয়েমী চলার সাথে আমরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম, হঠাৎ যেন কতকগুলো দৈত্য হারে-রে করে ঘুমন্ত গ্রামবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, ঠিক ব্যাপারটা কি বোঝার আগেই আমরা দেখলাম যে আমাদের চারপাশে প্রায় ডজন খানেক কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারস্বরে চীৎকার করছে, আর একপা এগুলেই তারা মনে হয় আমাদের টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে। আমি আমার মণি মন্ত্র ভুলে গিয়ে বলে উঠলাম--মা তারা রক্ষা কর। তারপর হঠাৎ আমি মৌনী বাবা একথাটা মনে পড়তেই থেমে গেলাম। কুকুরগুলোর চীৎকার মনে হয় কেউ শুনতে পায়নি। কুকুর বেষ্টিত হয়ে আমরা চোরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুরে আস্তে আস্তে দু-একটা আলো দেখা দিতে লাগল। আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম—যাক বাঁচা গেল এটা একটা গ্রাম বলে মনে হচ্ছে। প্রথম গ্রামবাসী এগুতেই গুরুজী তাদের বললেন—আমরা লাসার তীর্থযাত্রী, আমরা মহাগুরু চেরেজি দর্শনে যাচ্ছি। আস্তে আস্তে কুকুরগুলো শান্ত হল।

গুরুজীর সাথে স্থানীয় লোকেদের একটু কথাবার্তা হল, অন্ধকারে কারও মুখই স্পষ্ট করে দেখতে পারলাম না। গুরুজী আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন—এরা ভেবেছিল যে চীনা সৈন্য তাই প্রথম প্রথম কেউ বাইরে বেরোয়নি, এখন থেকে খুব সাবধান থাকিস্। আমাকে গুরুজী না বলে বলবি গেশে রেতেন। আমিও তাঁর কথা শুনে খুব মৃদুভাবে বললাম—ঠিক আছে। আমি অবশ্য মৌনী বাবা, কাজেই কথার কোন প্রশ্নই আসে না, তবে যদি ফস্ করে মুখ ফুটে বেরিয়ে যায় তাই তিনি আগে থেকে সাবধান করে দিলেন।

গ্রামবাসীদের পেছনে পেছনে আমরা একটা ছোট্ট সেতু পার হয়ে গ্রামে ঢুকলাম। কাঠের একটা বিরাট সিংহ দরজা পার হয়ে আমার মনে হল একটা মঠের ভেতরে এসে পৌঁছলাম। হ্যারিকেনের অল্প আলোতে কোন রকমে পথ দেখা যায় মাত্র, তার বেশী নয়।

আমার ধারণাটা পরিষ্কার হল, একটু পরেই একটা বারান্দায় এনে গ্রামবাসীরা আমাদের বসতে বলল। একে শীত তার ওপর ক্লান্ত আর সেই সাথে পেটের মধ্যে মোচড় দিচ্ছে খিদে। অন্যান্য লামাদের অবস্থা কি রকম জানি না তবে আমার অবস্থাকে সত্যিকারের দুরবস্থা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। সঙ্গের প্রত্যেকটি লামার ধৈর্য অপরিসীম, তারা কথা প্রায় বলেই না। গেশে রেতেন বলেছেন—কথা বলা মানেই শক্তি ক্ষয়। যতক্ষণ কথা না বলে পারা যাবে ততক্ষণই শক্তিটা দেহের মধ্যে সঞ্চিত থাকে, প্রয়োজনে তাকে খরচ করতে হয়। আমার যদি এই মৌনী লামার ভূমিকা না থাকতো, তা হলে চেঁচিয়ে বলতাম আমার মনের কথা। আমাকে বলতে হল না, গুরুজী সব বোঝেন। তিনি পৌছানো মাত্র গ্রামবাসীদের জিজ্ঞাসা করেছেন যদি কিছু খাবার পাওয়া যায়। রাত এখন কটা বাজে কে জানে ? নাঃ, এই রাতে দোকান-পাট সব বন্ধ । খাবার কিছু পাওয়া যাবে না, তবে তথাগতের মহাকৃপা বলে স্থানীয় চায়ের দোকানের মালিক সাধুদের সেবার জন্য চা তৈরী করে দিতে রাজী, অবশ্য বিনা পয়সায় নয় ।

তিব্বতী চাকে বলে চ্যাং। প্রচুর পরিমাণে গুঁড়ো চায়ের সাথে মাখন আর নুনের সংমিশ্রণে তৈরী। তা হোক তাতে ক্ষতি কি? খিদের সময় যা জোটে তাই যথেষ্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই মালিক তার ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে এল আমাদের সামনে চ্যাং তৈরী করার জন্য। বত্রিশজনের জন্য করতে হবে কাজেই এটা ছোটখাটো ব্যাপার নয় । মঠের দালানে যে যার কম্বলটা বিছিয়ে আমরা কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম, শ্রান্ত দেহটাকে কিছুতেই যেন ধরে রাখতে পারছি না। তবুও মনের জোর ফিরিয়ে এনে সজাগ থাকবার চেষ্টা করলাম, কারণ এ সুযোগ হয়তো আর আসবে না। গেশে রেতেনের অবস্থা সত্যি প্রশংসনীয়, সব ধকল সামলে তিনি সজাগ হয়ে আছেন। শরীরের বল তো বটেই আর তাঁর মনোবলেরও যেন তুলনা নেই।

কাঠের একটা আলগা উনোন ধরিয়ে তার ওপর বিরাট একটা ডালডা টিনের মধ্যে গরম জল বসানো হল। আর পাশেই বিরাট দুটো টিনের চোঙার মধ্যে মালিকের মেয়েটি একটা ইটের মতো কি যেন ফেলে তাকে একটা বিরাট খল দিয়ে গুড়ো করতে লাগলো। আমি আমার কৌতূহল দমন করতে না পেরে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে হামালদিস্তের ভেতরকার পদার্থের গন্ধ শুঁকবার চেষ্টা করলাম। আমার উৎসাহ দেখে মেয়েটি হেসে বলল—চ্যাং। গন্ধেও মনে হল চা। মনে হয় গুঁড়ো চা'কে জমিয়ে ইটের মতো করা হয়েছে তাতে রাখবার সুবিধা। চ্যাং বা চায়ের খণ্ডটা শক্ত ইটের মতো। মেয়েটির চা গুঁড়ো করা হয়ে গেলে সেই পাত্রের মধ্যে গরম জল ঢেলে দেওয়া হল, তারপর সেটাকে আবার লম্বা লাঠি দিয়ে মেশাতে লাগলো। প্রায় আধ ঘন্টা সেটাকে নাড়াচাড়া করে আবার উনোনের উপর রাখা হল। তারপর সেই চায়ের পাত্রের ওপর ছড়িয়ে দিল সম্ভবত এক বাটি আটা বা ছাতু। তারপর সেটাকে আরও কিছুক্ষণ ফুটিয়ে তার মধ্যে মাখন আর দুধ মেশানো হল ।

আমার কাছে এটা যে শুধু নতুন তাইই নয় অদ্ভুতও বটে। চা না বলে তাকে চায়ের সুপ বলা যেতে পারে। তারপর সেই গরম চা-কে প্রত্যেকের বাটিতে বাটিতে দেওয়া হল।লামাদেরমধ্যে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আর অনেকেই কাঠের আগুন পেয়ে তার পাশে এসে আগুন পোয়াচ্ছিলেন। এই তিব্বতী চা খেতে খুব একটা সুস্বাদু নয় সেটা বলাই বাহুল্য, কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তাপেট ভরার পক্ষে যথেষ্ট। এ রকম এক বাটি চ্যাং-এর দাম নিল দু'আনা। অবশ্য একবার মাত্র দাম দিয়ে যতবার খুশী খাওয়া যায়। গেশে রেতেন আমাদের বললেন যে, মালিক মওকা পেয়ে খুব চড়া দামে বিক্রি করেছে, আসলে এর দাম কিছুতেই চার পয়সার বেশী নয়। দাম মিটিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই চায়ের দোকানের মালিক তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন, তবে উনোনটায় তখনও কাঠ জ্বালছে, কাজেই তিনি লামাদের সেবার জন্য সেটা রেখে গেলেন তার সাথে দুটো চেলা কাঠও বটে। আমরা উনোনটাকে বারান্দায় তুলে মাঝখানে রেখে গোল হয়ে তার পাশে কম্বলকে আশ্রয় করে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়লাম। তিব্বতে প্রথম পদক্ষেপ সত্ত্বেও আমাদের আর এদিক ওদিক চাইবার মত ক্ষমতা নেই। চোখ দুটোকে কিছুতেই আর ধরে রাখা যাচ্ছে না—দেখা যাবে কালকে সকালে। আমি কুকুরকুণ্ডলী হয়ে কম্বল মুড়ি দিলাম ।

কতক্ষণ আমরা ঘুমিয়েছিলাম জানি না, তবে ঘুমটা যে খুবই গাঢ় ছিল সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ। চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙালো। কে বা কারা চেঁচামেচি করছিল সেটা জানবার জন্য অনেক কষ্ট সত্ত্বেও চোখ খুলতে বাধ্য হলাম। চেয়ে দেখি প্রায় ভোর হয়ে এসেছে, আর আমাদের চারপাশে বেশ কিছু তিব্বতী লোক ভিড় করে দাঁড়িয়েছে, আর তারই মাঝে দুজন হান্ বা চীনা সৈন্য তাদের হাতের বন্দুকের খোঁচা দিয়ে সবাইকে জাগিয়ে তুলছে। তাদের মধ্যে মনে হয় আমিই প্রথম জেগেছি। গুরুজী আমারই সাথে শুয়েছিলেন। বন্দুকের খোঁচা এড়াবার জন্য আমি তাঁকে জাগাতে বাধ্য হলাম। শ্রান্ত, বৃদ্ধ গুরুকে কাঁচা ঘুম থেকে তোলার মত পাপ বোধ হয় জগতে আর নেই; তবুও তাঁকে জাগাতে বাধ্য হলাম। তাঁর পা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে অনেক কষ্টে তাঁকে তুললাম । আমাদের সঙ্গী লামাদের মধ্যে প্রায় সবাই কিছু না কিছু তিব্বতী ভাষা বোঝে, কিন্তু গেশে রেতেন অর্থাৎ গুরুজী হচ্ছেন আমাদের গাইড়, কাজে তাঁকেই সব সময়ে এগিয়ে দেওয়া ভাল। গুরুজী চোখ খুলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হল ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। ভোরের আলোতে আমি এই ফাঁকে দেখতে লাগলাম তিব্বতের প্রথম গ্রামকে আর গ্রামবাসীদের।

আমাদের চারপাশে যারা হাজির হয়েছে তাদের একনজরে দেখলেই মনে হয় যে এরা গরীব। দেখতে সিকিমি, বিশেষ করে ভূটানীদের মতো। গায়ের জামা কাপড় খুবই ময়লা কিন্তু সকলেই বেশ স্বাস্থ্যবান, স্ত্রী-পুরুষ সকলেরই মাথায় লম্বা চুল। ছোট ছেলে মেয়েদের দেখলে মনে হয় তারা কোনদিন মাথায় জল বা চিরুনি ছোঁয়ায়নি ।

গুরুজী আমাদের সকলকে প্রস্তুত হতে বললেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের চুম্বি শহরে যেতে হবে, ভারত তিব্বত সীমানার সেটাই হেড কোয়ার্টার, অবশ্য যারা নাথুলা ও জীলাপ লা দিয়ে যাতায়াত করে তাদের কাছে। মঠের বাইরে আসতেই গুরুজী ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন—অর্থাৎ আমরা গত সন্ধ্যার পর যে চৌকিটা পার হয়েছি তারা তাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের রেডিও মারফত জানিয়ে দিয়েছে যে একদল লামা তীর্থযাত্রী বর্ডার ক্রস করেছে আর শীগগীরই তারা চুম্বি শহরে যাবে। সেই কথানুযায়ী চুম্বির থানা আমাদের অপেক্ষায় ছিল, সারা রাত তারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করেও যখন দেখল যে কোন তীর্থযাত্রীর সাড়াশব্দ নেই তখন ভোরবেলা তারা চুম্বি থেকে এগিয়ে এসেছে আমাদের খোঁজে ; এখন এই সৈন্য দুজন আমাদের নিয়ে যাবে তাদের থানায়, সেখানেই আসল কথাবার্তা হবে।

আমরা রাস্তায় নামতেই গেশে রেপতেন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন—জায়গাটার নাম চুবিতাং আর এই গুম্ফা (মঠ)-টাকে ভালভাবে দেখে নাও ৷ এটা অনেক দিনের পুরান, তীর্থযাত্রীরা সাধারণতঃ এখানেই প্রথম রাত কাটায়। আজকাল অবশ্য তীর্থযাত্রীর অভাব ; দুঃখের বিষয় যে আমাদের সীমান্ত রক্ষীদের সাথে যেতে হবে শহরে নয়তো এই মঠটাকে ভালভাবে ঘুরিয়ে দেখাতাম। মঠটার নাম কারগীড গুম্ফা। এই গুম্ফা তিব্বতের অন্যান্য গুম্ফা থেকে আলাদা, সাধারণতঃ গুল্ফার অধ্যক্ষ থাকেন একজন লামা, কিন্তু এই গুম্ফার মালিক লামা নন। সিকিম মহারাজার এক বংশধর এই গুম্ফার সর্বেসর্বা। তবে এই গুম্ফায় অনেক উচ্চ শ্রেণীর লামাও থাকেন। নিম্ন শ্রেণীর বা নবীশ-ছাত্র লামাদের এই অঞ্চলে বলা হয় ত্রাপা। কারগীড গুম্ফার গ্রন্থাগারটিও দেখবার মতো। খুবই আপশোষের বিষয় যে আমাদের এ গুম্ফা থেকে চলে যেতে হচ্ছে। উপায় নেই কারণ এদের সাথে সহযোগিতা না করলে আমাদের তিব্বতের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। বাইরে থেকে এই কারগীড গুম্ফাকে খুব সুন্দর দেখায়, বিরাট কাঠের সিংহদরজা, পাথরের দেয়াল, গ্রামবাসীদের জল পানের জন্য ঝর্ণা, কাঠের সুন্দর কারুকার্য, মঠের মতো হলেও বোঝা যায় যে, এটাকে প্রয়োজন বোধে দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

সীমান্ত বাহিনীর ঘন ঘন সাক্ষাতের ফলে আমাদের মনটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-থেকে তাদের প্রতিই বেশী আকৃষ্ট হতে বাধ্য হয়েছে, আমাদের মনে সব সময়েই একটাই ভয় ছিল, ঢুকতে দেবে কি না। নাথুলার পথটা হঠাৎ নেমে এসেছে তিব্বতের মধ্যে, নামতে নামতেই আমাদের নজরে পড়ছে সামনের উন্মুক্ত চুম্বি উপত্যকা; এই উপত্যকা ধরে চলতে হবে আগামী কয়েকদিন লাসার পথে। তিব্বতটা যেন হঠাৎ সরু হয়ে ঢুকে গেছে দুই দেশের মধ্যে। আমাদের ডান দিকের পর্বতাংশ ভূটান আর বাঁদিকের পাহাড়টা সিকিম ও ভারত। দুদিকেই পাহাড়ের ওপর বরফ পড়ে সাদা হয়ে আছে । চুম্বি উপত্যকা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য আর দেখা যায় না। এখন আমাদের দুদিকেই বিরাট পাহাড়, বলা যেতে পারে যে এখন আমরা হিমালয়ের উল্টোদিকে এসে পৌঁছেছি। একটা ছোট্ট পাহাড়ি নদীর পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে আমরা এগুতে লাগলাম। এই রাস্তাটাই তিব্বত ও সিকিমের প্রধান সড়ক, দেখলে^ মনে হয় না। মঠ ছেড়ে আরও প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর আমরা দেখতে পেলাম একটা শহর, চুম্বি। যদিও তিব্বতীদের কাছে এটি একটি শহর কিন্তু আমার কাছে মনে হল যে মেদিনীপুরের যে কোনো ছোট গ্রাম এর থেকে বড়। রাস্তার দুপাশে দেখতে পেলাম অসংখ্য সরকারী তাঁবু, আর তারই সাথে অসংখ্য চীনা সৈন্য। গেশে রেতেন আমাদের আগেই চিনিয়ে দিয়েছেন—এদের মধ্যে কারা হান্ আর কারা তিব্বতী, তা এখন দেখলেই তফাতটা বুঝি। তিব্বতীদের চলনেই বোঝা যায় যে তারা এই মাটির লোক, চলার মধ্যে আছে এদেশের ছন্দ। আর চীনা সৈন্যদের চলার মধ্যে আছে বিদেশী ভাবব—চলায় আছে মাটিকে দাবিয়ে রাখার দত্ত, ছন্দের অভাব। আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে সে কথাটা সীমানা পার হবার সাথে সাথেই বুঝতে পেরেছি।

চুম্বি একটা পরানো বর্ধিষ্ণু গ্রাম, সিমেন্ট ও পাথরের দেয়াল, তার ওপর কাঠের ঝুলন্ত বারান্দা, বাড়ীটা দেখেই মনে হয় যে শ'খানেক বছরের পুরানো। দরজার সামনে দাঁড়ানো দুটো মিলিটারী জিপ্ কার আর সশস্ত্র প্রহরী। আমাদের বাইরে বসতে বলে গুরুজী চীনা ভদ্রলোকদের সাথে ভেতরে ঢুকে গেলেন কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য। আমরা রাস্তার ধারেই বসে রইলাম। রাস্তার দুপাশে এখন পাহাড়াগুলো আস্তে আস্তে গেন দূরে সরে যাচ্ছে। উপত্যকাটা এখন খুব প্রশস্ত। এখানকার বাড়ীগুলো সব স্থানীয় পাথর ও কাঠ দিয়ে তৈরী, বাড়ীগুলোর মধ্যে কোন রকম উন্নত ধরনের কারুকার্য নজরে পড়ল না। সামনেই একটা বাজার অনেকটা হাটবাজারের মতো। কয়েকটা মুদিখানার দোকান, চায়ের দোকান আর কম্বল ও পোশাকের দোকানের সামনে স্থানীয় লোকদের আনাগোনা লক্ষ্য করতে লাগলাম। সকালের রোদ্দুরটা খুবই উপভোগ্য। প্রায় এক ঘন্টা পর গেশে রেতেন ফিরে এলেন, তিনি বললেন যে খুব ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। এরা একে একে সবাইকে পরীক্ষা করবে, তন্ন তন্ন করে জিনিসপত্র খাটবে। কোন কিছুতেই আমরা যেন বাধা না দিই, বাধা দিলেই তারা ভাববে যে আমরা কিছু গোপন করছি। আসলে আমাদের গোপন কারার কিছুই নেই সে কথাটা আমাদের হাবভাবে যেন প্রকাশ পায়। আমাদের ছাড়পত্র এসেছে কাঠমাণ্ডুর চীনা দূতাবাস থেকে। গুরুজী আসলে তিব্বতের লামা, অন্যান্য সকলে ভূটিয়া ও নেপালী। গুরুজী আমাকে সবাধান করে দিলেন মনে থাকে যেন তুই নেপালের নামা, আমার শিষ্য। আমরা গুরুজীকে আশ্বাস দিলাম আমাদের তরফ থেকে কোন রকমেই তাঁর কথার অমান্য করবো না। প্রথম লামা ভেতরে ঢুকে ফিরে এলেন প্রায় এক ঘণ্টা পর। আমি মনে মনে হিসাব করে দেখলাম যে এই ধরনের সময় যদি প্রত্যেকটি লামার পেছনে নেয়া হয় তাহলে আজকে তো নয়ই কালকেও আমরা ছাড়া পাবো কিনা সন্দেহ। আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে এল। আমরা রাস্তার ধারেই খাবার বন্দোবস্ত করতে লাগলাম। খাবারের খুব অসুবিধে নেই, আটার সাথে জল আর নুন মিশিয়ে গলধঃকরণ করা মাত্র। বাঁচবার জন্য খাওয়া। মনে হয় প্রহরীরা লামাদের শত প্রশ্ন করেও সন্দেহজনক কিছু পাচ্ছে না তাই শেষের দিকে তারা সময় সংক্ষেপ করে দিল। এক এক জনের আধঘন্টার মধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গেল। হঠাৎ ভেতর থেকে চারজন চীনা অফিসার বেরিয়ে এলেন, তিনি সকলকে হুকুম দিলেন—আমাদের মালপত্র যা কিছু আছে সব থলি থেকে বের করে রাস্তায় রাখতে, তাতে সার্চ করতে সুবিধা হবে। তার কথানুযায়ী আমরা জিনিসপত্রগুলো সব রাস্তায় একের পর এক খুলে রাখলাম। বলাই বাহুল্য যে আমাদের মধ্যে গোপনীয় কিছুই নেই, মগ, থালা, ন্যাকড়া, আটা, নুন, আলু, চাল, ডাল, মালা, সোয়েটার, কম্বল, জামা, গেঞ্জি, জুতো, চাদর এর মধ্যে সন্দেহজনক কিছুই পাবার কথা নয়। দেখলে মনে হয় এগুলো আমরা চোরাবাজারের রাস্তার ধারে বিক্রি করতে বসেছি।

অফিসার চারজন সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন, এমনকি আমাদের লাঠিগুলো পর্যন্ত। তারপর তারা রাস্তার ওপরই আমাদের জামা কাপড়ের পকেট (নেই যদিও) খুঁজতে লাগলো। চীনা অফিসারদের সাথে সাথে রয়েছে আরও পাঁচজন তিব্বতী সেনা, তারা প্রত্যেকটি লামাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব আজব প্রশ্ন করতে লাগলেন। একজন তিব্বতী আমার কাছে এগিয়ে থমকে দাড়ালো, আমার সাথে চোখাচোখি হতেই আমি চোখ নামালাম, হাতের মালাকে আঁকড়ে ধরে জপতে লাগলাম মণি মন্ত্র। তিব্বতী লোকটা আমার ঠিক সামনে এসে হাজির হল, তারপর আমার দিকে খুব সন্দেহজনক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে কি যেন জিজ্ঞাসা করল। আমি তার কিছুই বুঝলাম না, সে এবার আমার হাত ধরে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মনে হয় আবার আগের প্রশ্নই পুনরুচ্চারণ করল। আমি এবারে তাকে এড়াতে পারলাম না, আমি আঙ্গুল দিয়ে গেশে রেতেনকে দেখিয়ে দিলাম, মানে—ওনার সাথে কথা বলুন, উনিই আমার সম্পর্কে যা বলার বলবেন। তিব্বতী চৌকিদার—গুরুজীকে ডাকলেন, তারপর আমার সম্পর্কে তাকে বিশদ জানালেন। চৌকিদার সাহেব মনে হল তার কথায় মোটেই সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি তার চীনা অফিসারকে ডেকে ভেতরে ঢুকে গেলেন।

গুরুজী আমাকে অতি নিম্নস্বরে হিন্দীতে বললেন—তুই মৌনী লামা― নেপালের ছেলে, ওরা সেটা বিশ্বাস করতে চাইছে না। খুব সাবধান, ওরা তোকে যাচাই করবে, তথাগতের শরণ নে। বলা সোজা কিন্তু তার শরণ নেবার জন্য যে মানসিক অবস্থার প্রয়োজন হয় আমার সেটি নেই। আমার দীক্ষাটাই হয়েছে খুব তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে, মানসিক প্রস্তুতির আগেই আমি পেয়েছি বীজমন্ত্র। কাজেই মনের ভারসাম্যকে বজায় রেখে এই অবস্থায় তথাগতকে শরণ করা মুশকিল। মনের মধ্যে আমার যাই থাক না কেন বাইরে তাকে প্রকাশ করতে দিলাম না। হাতের রুদ্রাক্ষটাকে আস্তে আস্তে জপতে লাগলাম যেন কিছুই হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গেশে রেপতেনের ডাক পড়ল। তিনি ভেতরে গিয়ে আধঘন্টার মতো জবাবদিহি দিয়ে বেড়িয়ে এলেন। তারপরই আমার পালা। আমি ইষ্টনাম জপ করতে করতে অফিসে ঢুকলাম ।

একটা বহুদিনের পুরানো ঘর। বাড়ীটার পেছনে মনে হয় কোন পার্বত্য ঝর্ণা রয়েছে, তারই ঝিরঝির জল পড়ার শব্দ। ঘরটাও স্যাঁতস্যাঁতে, একটা ছোট জানালা দিয়ে সামান্য আলো এসে পড়েছে। একটা তক্তাপোশ, তারই চারদিকে ভাঙা-হাতল চেয়ার ও টেবিল সাজিয়ে সরকারী অফিসের মর্যাদা রক্ষা করা হয়েছে। চারজন চীনা অফিসার ও দুইজন স্থানীয় তিব্বতী সহকর্মীর সেখানে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পরিবেশটা এর চেয়ে গম্ভীর কল্পনা করা যায় না ।

ঘরে ঢুকতেই আমাকে তারা যেন কি বললেন। আমি মৌন রইলাম। দ্বিতীয়বার তার কি যেন আবার জিজ্ঞাসা করলেন। আমিও মৌন থেকেই তার উত্তর দিলাম। এবার তিব্বতী ভদ্রলোক প্রায় ধমকের সুরে মনে হল একই প্রশ্ন করলেন। আমি নীরব রইলাম। আমার নীরবতা দেখে তারা একটু অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো। আমি মনের জোরটা ইতিমধ্যে ফিরিয়ে এনেছি। পা-টা কাঁপছিল, তাকে সংযত করলাম। ভাগ্য ভাল যে আমার পরণে পা পর্যন্ত ভিক্ষু-লুঙ্গি, নয়তো এদের চোখ এড়াতে পারতাম না। মনে মনে ভাবলাম, এই তিব্বত, এই কৈলাসনাথ এতো মান্ধাতার আমল থেকে আমাদের তীর্থভূমি, শিব স্বয়ম্ভূ তিনি আমাদের ঘরের দেবতা, তাঁর মন্দিরে যাবো সেটা তো আমাদের জন্মগত অধিকার—এ তীর্থ তো আমাদের তীর্থ, হিন্দুদের, পবিত্র ভূমি চীনাদের নয়, এই পবিত্র হিমালয়তো হিন্দুদের, এরা এসেছে জোর করে তা দখল করতে, কাজেই ভয় কি! কিছুতেই ধৈর্যচ্যুতি হতে দেবো না। মনকে আরও সংযত করলাম। মনে মনে বললাম- সাবধান ! এদের এই সামান্য ধমকে আমরা সত্তা এদের কাছে বিলিয়ে দেবো না, দেখ যাক কে জেতে। আরে বাবা ! এরা তো আমাকে খেয়ে ফেলবে না, বড় জোর বলবে যে ফিরে যাও । ঠিক আছে ফিরে যাবো, তাতে কি ? ভয়টা কিসের ? ভয়টা কিসের বলা সোজা, চিন্তা করা আরও সহজ, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে যখন পা ঠক্ ঠক্ করে কাঁপে তাকে থামানো কঠিন। অফিসাররা আমার কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে, নিজেরাই আমার সম্পর্কে সত্য মিথ্যা বিভিন্ন রকমের কল্পনা করতে লাগলেন। তাদের মধ্য থেকে তিব্বতী ভদ্রলোক (সৈন্য) বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর সে একটি তিব্বতী যুবককে নিয়ে ফিরে এল। তিব্বতী ভদ্রলোক আমাকে খুব ভাল করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো তারপর আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার জিজ্ঞাসা করল—তুষ্কা নাম কিয়া হায় ?

বলার ভঙ্গি ও উচ্চারণ শুনে মনে হল লোকটা হয়তো সিকিমের বাজারে কিছুদিন ঠেলাগাড়ী ঠেলেছে। লোকটার অঙ্গভঙ্গীও খুব অভদ্র গোছের, আমার তরফ থেকে কোন রকম সাড়া না পেয়ে সে আবার জিজ্ঞাসা করল—দার্জিলিং সে আয়া তুম, নেপালী নেহি। মনে মনে ভাবলাম যে ও ঠিকই ধরেছে। আমার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে যে আমি নেপালী নই। আবার ভাবলাম একবার যখন আরম্ভ করেছি শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকতেই হবে, অতএব আমি পূর্ববৎ মৌনই থেকে গেলাম। লোকটা এবার সত্যি রেগে উঠল, একটা অশ্লীল গালাগাল দিয়ে মারমুখী হয়ে জিজ্ঞাসা করল—নাম বোল্। চীনা সৈনিকরা তার হাবভাব দেখে কি যেন পরামর্শ করল, তারপর আমাকে ও সেই লোকটাকে অফিস ঘরে রেখে সবাই বাইরে বেরিয়ে এলো। সেই লোকটা এবার আমাকে একলা পেয়ে আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল—হাম্ জান্তা তুম নেপালী নেহি ছ, নাম বোলো। আমি জানি যে যদি একবার মুখ ফুটে নামটা বলি তাহলে আর রক্ষা নেই, এর পরেই শুরু হবে পুলিশি ঝামেলা আর শেষে গুপ্তচর ভেবে আমাকে এরা ধরে রাখবে। কিন্তু কতক্ষণই আর এভাবে থাকা যায়। আর এই লোকটাকে বিশ্বাস নেই, হয়তো রেগে গিয়ে বসিয়ে দেবে একটা কীল, আর দেখতেও ঠিক গুণ্ডাদেরই মতো। হঠাৎ মাথায় এল এক বুদ্ধি। হাতের রুদ্রাক্ষ মালাকে দু'বার খুব তাড়াতাড়ি জপ করার মতো আঙ্গুল দিয়ে গুনে নিলাম তারপর সেই মালাটাকে লোকটার মাথা ছুঁয়ে প্রায় অভিশাপ দেবার ভান করে বলে উঠলাম—‘ওম্ ভূ-ভূর্ব-স্বঃ তৎসবিতুর বরেন্যম্ - .' I

ব্যস্ আমাকে আর শেষ করতে হল না। সে সঙ্গে সঙ্গে প্রায় এক লাফে দূরে সরে দাঁড়ালো তারপর তিব্বতী ভাষায় আমাকে কি যেন বলল, আমি তার কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু ওর হাবভাব দেখে মনে হল যে ও খুব ভয় পেয়ে গেছে, আমি আবার শান্ত হবার ভাব করে জপ করতে লাগলাম। লোকটা মাথায় ধুলো পড়া সাপের মতো যোড় হাত করে বেড়িয়ে গেল। ওর অবস্থা দেখে আমার ভীষণ হাসি পেয়ে গিয়েছিল, ইচ্ছে হল চীৎকার করে হাঃ হাঃ করে হাসি। কিন্তু নিজেকে সংযত করতে বাধ্য হলাম। অফিসার চারজন ভেতরে ঢুকলেন, তারপর অনেকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাইরে বেরিয়ে যেতে বললেন। আমার ফাঁড়া কেটে গেল ।

এটাও গুরুজীর দেওয়া একটা কৌশল মাত্র। গুরুজী একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন যে তিব্বতীরা ভীষণ তন্ত্রে বিশ্বাস করে। ভূত প্রেত ওঝা ও দৈত্য দানবে দেশটা যেন ভর্তি। এখানকার ঐতিহ্য অনুযায়ী লোকেরা বিশ্বাস করে যে যেকোন উচ্চ পর্যায়ের লামারা ভূতকে বশ করতে পারে, অথবা প্রয়োজন বোধে তাদের ডেকে আনতে পারে। লামারা লোকেদের মাথায় হাত দিয়ে আর্শীবাদ করে, আর রুদ্রাক্ষের মালা মাথায় ছুঁইয়ে অভিশাপ দেয়। লামাদের অভিশাপ লাগাবেই লাগবে, বিশেষ করে যারা উগ্র তান্ত্রিক তাদের কথাই আলাদা। গুরুজীর সেই কথাটা যে এত সত্য তা হাতে হাতে প্রমাণ পেলাম ।

লোকটা সেই যে গেল তারপর আর আসার নাম গন্ধও নেই। অফিসাররা গুরুজীকে আবার ডাকলেন আমাকে দেখিয়ে কি যেন উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন। মনে হয় আমি যে একজন খাঁটি লামা গুরুজী সেটাই তাদের বোঝাচ্ছেন। অগত্যা কিছু না পেয়ে অন্যান্য বাকি কজন লামাদের সার্চ ও জিজ্ঞাসাবাদ করে আমাদের ছেড়ে দিলেন। সারাটা দিন সেদিন এইভাবেই কেটে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%