লাসায় শেষের কয়েকদিন

বিমল দে

লাসা থেকে আমরা যাবো যাবো করছি এমন সময় কাশাগ্ সচিবালয় থেকে এক নির্দেশ এল, সেটা আমাদের আবেদনেরই উত্তর। সেই নির্দেশনামতে তীর্থযাত্রীদের পোতালা পরিদর্শনের পারমিশন দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ সকলেই পোতালায় যেতে পারবে। আমাদের কাছে এটা একটা মহানন্দের সংবাদ। আমি গুরুজীর সাথে পোতালায় গেছি বটে, কিন্তু একসাথে যাওয়ার যে আনন্দ সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম। মনে মনে নিজেকে খানিকটা স্বার্থপর বলে মনে করেছিলাম। লাসায় এসে তীর্থযাত্রীরা পোতালা প্রাসাদে ঢুকতে পারবে না সেটা চিন্তা করাও যায় না। কাজেই কাশাগের এই সংবাদে আমরা সকলেই খুব খুশী, লাসায় আসা সার্থক হল। এই সংবাদে আমরা যদিও খুশী হলাম কিন্তু পরের সংবাদে হতভম্ব হতে হল। সেই নির্দেশপত্রের দ্বিতীয় সংবাদে লেখা আছে যে, স্থানীয় হান্ বা চীনা কর্তৃপক্ষ আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যাবার আদেশ দিয়েছে। সেই আদেশপত্রে পরীষ্কার ভাবে উল্লিখিত আছে যে তীর্থযাত্রীদের বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যেতে হবে, অর্থাৎ দলবদ্ধভাবে তাদের চলাফেরা করা চলবে না। শেষের সংবাদটা আমাদের কাছে মাথায় বাজ পড়ার মতো মনে হল। আমরা একসাথে এসেছি এবং একসাথেই যাবো—গুরুজীকে ছাড়া এই অজানা দেশে চলবো কি করে, না জানি রাস্তা না জানি ভাষা কিন্তু আদেশ মানতেই হবে। এখানকার চীনা কর্তৃপক্ষ জেনারেল তাকুয়ান-এর খুব দাপট। লোকে বলে যে সর্বত্যাগী রিপুজয়ী লামাদের বুকেও তার হুকুমে রক্তস্রোত পালটায়। হুকুম অনুযায়ী আমাদের বিশদ পরিকল্পনাও তৈরী করতে হল। ঠিক হল যে আমরা সেইদিনই পোতালা দেখতে যাবো। তার পরের দিন নরবুলিংকায় যাবো চেন্-রে-জি দর্শনে। তারপর দ্রেপুং গুম্ফায় দু'দিন থেকে আবার ধরবো সিকিমের পথ ।

পোতালাঃ পোতালা প্রাসাদে ঢোকবার অনেক ছোট খাটো পথও আছে। আর তাদের নাম বিভিন্ন। পোতালা পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে সাধারণত তীর্থযাত্রীরা দণ্ডি কেটে উপরে উঠে সেই পথটা খুব প্রশস্ত। হৃষিকেষের ঘাট থেকে রামমন্দিরে উঠার রাস্তার সিঁড়ির মতো অনেকটা। বিদেশীদের কাছে এই রাস্তাটাই বেশী পরিচিত । রাস্তাটার নাম তীর্থের পথ। আরেকটা প্রধান রাস্তা মহান দালাই লামা-বা চেন্-রে-জি যে পথে পোতালায় ওঠা-নামা করেন সে পথের নাম দালাই লামার পথ। আর অসংখ্য ছোট-খাটো পথ রয়েছে সেগুলো একমাত্র পোতালার স্থানীয় বাসিন্দা না হলে ব্যবহার করা অসম্ভব ! তবে পোতালায় উঠবার সব পথই সিঁড়িপথ বড় বড় পাথরের সিঁড়ি।

আমাদের এই সফরটি খুবই সংক্ষেপ শুধু বিশেষ বিশেষ স্থানগুলো দেখানো হচ্ছে। গাইডের নাম ওগীয়ান দোরজে। সে পোতালার একজন সরকারী কর্মী। ওগীয়ানকে মনে হল খুব সিরিয়াস ধরনের লোক। প্রয়োজন ছাড়া সে কথা বলে না । ওগীয়ান পোতালার বিভিন্নি ঘরবাড়ীগুলোকে উপেক্ষা করে সরাসরি আরম্ভ করল সমাধি দেবীর প্রসঙ্গ।

পোতালায় অনেক দালাই লামারই সমাধি রয়েছে বটে কিন্তু তার মধ্যে আসল হচ্ছে পঞ্চম ও ত্রয়োদশ দালাই লামার সমাধি। পোতালার লাল প্রাসাদ ও সাদা প্রাসাদের মাঝখান থেকে গম্বুজ আকারের এই দুটো সমাধি উপরের দিকে উঠে গেছে। তিব্বতীদের কাছে এই দুই দালাই লামা বিশেষভাবে পূজ্য। আমি আগেই পোতালা ঘুরেছি কাজেই গাইডের কথায় খুব বেশী মন না দিয়ে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখতে লাগলাম ।

আমরা এলাম দালাই লামার অভিষেক ঘরে সেখান থেকে পোতালা প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ খুব ভালোভাবে দেখা যায়। এখান থেকে দালাই লামা যে ঘরে থাকেন সে ঘরটিও দেখা যায়। ১৯০৪ খৃষ্টাব্দে ইয়ং হাসব্যাণ্ড নামে যে ইংরেজ অভিযাত্রী ও ইংরেজী প্রতিনিধি লাসায় আসেন তিনি এই অভিষেক ঘরে বসেই দালাই লামার সাথে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেন। সরাসরি সেই সময় থেকেই তিব্বতের সাথে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার সরাসরি যোগাযোগ ঘটে ।

পোতালার গম্বুজের পাশ দিয়ে আমরা ছাদে এসে হাজির হলাম। সেখান থেকে চার দিকে দৃশ্যটা অতি মনোরম। লাসার সমতল ভূমিটার চারদিকেই পাহাড়-পাঁচিলে ঘেরা। প্রকৃতিদেবী যেন লাসাকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে সমস্ত দুনিয়া থেকে তাকে আলাদা করে রেখেছে। সে কারণেই বুঝি বৌদ্ধ-তন্ত্র আজও পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। পোতালা প্রাসাদের অভ্যন্তরের প্রত্যেকটি ঘর উজ্জ্বলরঙের কারুকার্যে ঢাকা। খোদাই করাই হোক বা দেয়ালে চিত্রিত করাই হোক প্রত্যেকটি কাজকেই সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাথার উপর দেয়ালের কোণ অথবা অন্ধকার এ সবের অজুহাতে শিল্পী তার প্রতিভার স্ফুরণে এতটুকু দূরে সরে যান নি। লাল-সোনালী-হলদে প্রভৃতি উজ্জ্বল রঙের বিভিন্ন তাংখা, মণ্ডলা, বৌদ্ধ বাণী ও জীবনীতে ভরে উঠেছে পোতালা প্রাসাদের প্রত্যেকটি কোণ। আর সেই সাথে সাথে গম্বুজের রত্নভাণ্ডার তো বটেই। পঞ্চম ও ত্রয়োদশ দালাই লামার গম্বুজের আভ্যন্তরীণ প্রত্যেকটি আসবাবপত্রই সম্পূর্ণ সোনার তৈরী। আর গম্বুজের ছাদটাও নাকি সোনার পাতে মোড়া, যেমন দেখেছিলাম চিদাম্বরনাথম্ মন্দিরের ছাদ ।

গাইড ওগীয়ান দোরজে আমাদের এক ঘন্টার মধ্যে সমস্ত পোতালার উপরের অংশটা দেখিয়ে ছেড়ে দিল। তার দ্রুত তিব্বতী ভাষা ও প্রাসাদের আভ্যন্তরিক অন্ধকার এই দুটো কারণে আমরা সকলেই প্রায় অন্ধকারেই থেকে গেলাম। সে গোঁজামিল দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে আমাদের ছেড়ে দিল। গুরুজী অবশ্য যতটা সম্ভব তর্জমা করে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। আমরা স্পষ্টই বুঝলাম যে ওগীয়ান দোরজে মোটেই এই কাজটা পছন্দ করে না—গাইডের দায়িত্ব তার উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমরা যে ধর্মশালায় আছি সেখান থেকে পোতালার প্রাসাদে উঠতে লাগে প্রায় দেড়ঘন্টা। নামবার সময় কোন অসুবিধাই নেই। আমরা দুপুরে ঘরে ফিরে কিছু শুকনো সবজি ও বার্লি সেদ্ধ করে মধ্যাহ্ন আহার শেষ করলাম। বয়স্ক ব্যক্তিরা সবাই একটু শ্রান্ত বলে মনে হল। বেলা আড়াইটা নাগাদ আমরা বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছি এমন সময় হঠাৎ ওগীয়ান দোরজে এসে হাজির। কোনরকম ভূমিকা না করেই সে জিজ্ঞাসা করল—আপনাদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে— হ্যাঁ, আমরা উত্তর দিলাম । আমাদের উত্তর শুনেই ওগীয়ান বলল—তাহলে উঠুন চলুন আমরা যাবো নরবুলিং কা প্রাসাদে। কালকে আমার সময় হবে না, এখনই চলুন আমি আপনাদের চেন্-রে-জি দর্শন করিয়ে দেবো। সন্ধ্যের সময় তিনি কিছুক্ষণের জন্য দর্শন দিয়ে থাকেন আমি সব বন্দোবস্ত করে দেবো।

আমাদের কথা ছিল কালকে যাবার কিন্তু ওগীয়ান আমাদের কথা শুনতে রাজি নয় । অর্থাৎ ওর কথামতো আজকেই যদি যাই তাহলে ভালো নয়তো কাল ওর সময় হবে না। তিব্বতীদের যে সময় জ্ঞান আছে বা সময়ের দাম আছে সেটা এই প্রথম শুনলাম । আমরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার রওনা হতে বাধ্য হলাম। কেন জানি না প্রথম থেকেই ওগীয়ান লোকটিকে আমার ভালো লাগেনি। ওর রুক্ষ ভাবটা যেন তিব্বতী চরিত্রের বিপরীত। তীর্থযাত্রীদের অন্যান্য সকলেই আমার বয়োজ্যেষ্ঠ মনে হয় এ সব ছোট-খাটো ব্যাপারে তাঁদের কিছু যায় আসে না। তাদের আদর্শ মনে করে আমিও চুপ করে গেলাম।

নরবুলিংকা প্রাসাদে দালাই লামা দর্শনঃ আমরা সবাই জোখাং মন্দিরের কাছে দোকান থেকে প্রত্যেকে একটা করে সাদা কাঁথা (কাপড়ের টুকরো) কিনে নিলাম । আমাদের দেশের ফুলের মালা দেবার রীতি। এদের দেশে মহাত্মা দর্শনে গেলে ফুলের পরিবর্তে এই সাদা কাপড়ের টুকরো বিনিময় করা হয়। মন্দিরের প্রবেশের সময়ও সেই একই রীতি। সন্ধ্যের একটু আগে আমরা নরবুলিংকা প্রাসাদের সামনে উপস্থিত হলাম ৷ প্রাসাদটা, আমি আগেই লিখেছি, অনেকটা বর্ধিষ্ণু বাংলো বাড়ীর মতো। সাদা পাঁচিলের ধারে অনেক তিব্বতীরা বসে রয়েছে। গরীব সাধারণ তিব্বতীদের দালাই লামা দর্শন দেয় না। কাজেই পাঁচিল ছুঁয়ে ও প্রদক্ষিণ করেই তারা সন্তুষ্ট। বিভিন্ন উৎসবের সময় মাননীয় দালাই লামা বা চেন্-রে-জি যখন মঞ্চে যান একমাত্র সেই সময়েই গরীব ও পথের লোকেরা তাঁর দর্শন পেয়ে ধন্য হয় ।

আমাদের এই ছোট্ট তীর্থযাত্রীর দল আসছে সুদূর নেপাল থেকে, কাজেই অমাদের কথা আলাদা। ওগীয়ানের সঙ্গে আমরা প্রাসাদের মূল দরজায় এসে 'সাষ্টাঙ্গ হয়ে প্রণাম করলাম। তারপর সে দরজা দিয়ে না ঢুকে এগিয়ে গেলাম পিছনের দিকে। প্রাসাদের পিছন দিকে আসতেই নজরে পড়ল, পাঁচিল কাটা, আর একটি দরজা। দরজার সামনেই দাড়িয়েছিল একটি চৌকিদার, ওগীয়ান তাকে আগে থেকেই চিনতো, কাজেই কোনো অসুবিধা হল না। চৌকিদার আমাদের একে একে ভেতরে ঢুকিয়েই আবার দরজাটা বন্ধ করে খিল দিয়ে দিল। আমরা একটা ছোট্ট বাংলোর দিকে এগিয়ে চললাম। সেখানে পৌঁছবার আগেই তিনজন তিব্বতী আমাদের দিকে ছুটে এল, ওগীয়ানকে দেখে তারা থামলো। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর, তারা আমাদের সেখানে অপেক্ষা করতে বলে বাংলোর দিকে এগিয়ে গেল। এই বাংলোটাই হচ্ছে মহামান্য দালাই লামার নিজস্ব মন্দির। পোতালার মত নরবুলিংকাতেও দালাই লামার নিজস্ব মন্দির রয়েছে। প্রায় সাত আটজনের মাধ্যমে আমাদের সংবাদ মহামান্য দালাই লামার কানে গিয়ে পৌঁছল। আমাদের ডাক পড়ল দর্শনের। সিকিমের রাজবাড়ীর বৌদ্ধ মন্দিরের মতোই এই মন্দিরটা। পাথর ও সিমেন্টের দেয়াল, কাঠের দরজা জানালা আর টিনের চাল। কাঠের উপরে চমৎকার খোদাই কাজ কার, আর সব কিছুতেই ব্যবহার করা হয়েছে উজ্জ্বল রং। বারান্দায় উঠতেই দালাই লামার একজন পার্শ্বচর আমাদের হাসিমুখে আহ্বান জানালেন। এই ভদ্রলোককে আমি ও গুরুজী আগেই বাগানে দেখেছিলাম সে কথাটা আমরা গোপন করে গেলাম। দরজার ভেতরে ঢুকতেই সামনে নজরে পড়ল বিরাট বুদ্ধমূর্তি, তাঁকে প্রণাম করে দাঁড়াতেই স্টাচুটির নীচে নজরে পড়ল একটা বিরাট ইজি-চেয়ারে বসে আছেন এক ভদ্রলোক। বুঝতে অসুবিধা হল না ইনিই চেন্-রে-জি । অল্প বয়স্ক তরুন তিব্বতরাজ চেন্-রি-জি। তাঁর আশপাশে আরও চারজন দাঁড়িয়ে। প্রথমে গুরুজী তারপর একে-একে আমরা সবাই তাঁকে কাঁথা অর্পণ করে সামনের গদীতে বসালাম। তিনি হাসিমুখে একে-একে আমাদের প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমরা সকলে বসার পর তিনি শুরু করলেন সমবেত প্রার্থনা । দু-মিনিট প্রার্থনার পর তিনি আমাদের আশীর্বাদ করলেন। তারপর আমাদের উৎসাহ ও ভক্তির প্রশংসা করে তিনি চার পাঁচ মিনিট প্রশংসা বাণী দিলেন। তারপর তাঁর সেই দীর্ঘদেহী পার্শ্বচর ইসারায়আমাদের উঠতে বললেন। আমরা আবার প্রণাম করে বিদায় জানালাম। সবশুদ্ধ মিলিয়ে তাঁর কাছে আমরা পাঁচ মিনিট মাত্র ছিলাম। সেই অল্পক্ষণেই দালাই লামার পবিত্র ও উজ্জ্বল মুখটি আমাদের হৃদয় স্পর্শ করল। ওগীয়ান তার দায়িত্ব সম্পন্ন করেই বিদায় জানাল, তাকে আমরা অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে সে উত্তরে বলল—আপনাদের যাত্রা সফল হোক ভগবান আপনাদের রক্ষা করুন। ওগীয়ানের সাথে ইচ্ছে থাকলেও এর বেশী আলাপ করা সম্ভব হল না। নরবুলিংকা প্রাসাদের বাইরে এসেই সে বিদায় নিল। আমরা দালাই লামার পবিত্র স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলাম ধর্মশালায়।

লাসায় আমাদের কর্তব্য সম্পন্ন হয়েছে, জোখাং মন্দিরে আমরা ধর্ণা দিয়েছি প্রদক্ষিণ করেছি প্রার্থনা করেছি। পোতালা প্রাসাদ দেখলাম, দালাই লামা দর্শন পেলাম, তীর্থযাত্রীদের পক্ষে এর বেশী আর কিছু কাম্য নয়। এবারে দ্রেপুং মন্যাষ্ট্রিতে দু'দিন থেকে তারপর ফিরতে হবে। পরের দিনই আমরা খুব ভোর বেলা জোখাং মন্দিরে মহাকালীকে প্রণাম করে লাসা ছাড়লাম।

দ্রেপুং গুম্ফা ঃ সেইদিনই রাত্রিতে আমরা এসে পৌঁছলাম দ্রেপুং-এ৷পুর্ব পরিচয়ের জন্য আর কোন অসুবিধাই হল না। এর আগের বারে যে ঘরে আমরা ছিলাম, সে ঘরটাতেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হল। চীনা কর্তৃপক্ষের হুকুম অনুসারে এখান থেকেই আমাদের বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যাত্রা করতে হবে। এটা তীর্থযাত্রীদের কাছে একটি বিরাট তপস্যা। তবে সমস্যাটা যত জটিলই হোক না কেন তা মীমাংসা করতেই হবে। দ্রেপুং গুম্ফার বর্ণনা আগেই দিয়েছি— তাই নতুন করে আর সে কথা লিখছি না । লাসা ও দ্রেপুং গুম্ফার বেশ কিছুদিন থাকার পর আরও কয়েকটি বিষয়ে বিশদ ভাবে জানতে পারলাম, যেমন—আমরা দালাই লামাকে তিব্বতের শাসন বিভাগীয় সর্বেসর্বা ভেবেছিলাম আমাদের ধারণাটা ভুল। তিব্বতের আভ্যন্তরিক বিষয়েও চীনাদের প্রভাব অস্বাভাবিক ভাবে দিন দিন বেড়ে চলেছে । দ্রেপুং গুম্ফার একটু দূরেই চীনাদের বিরাট মিলিটারী ঘাঁটি বসেছে। লাসার বাজারে চীনা পণ্য সম্ভারের অভাব নেই, অবশ্য আগেও ছিল তবে আজকাল তা আরও দশগুণ মাত্রায় বেড়েছে। তিব্বতীদের রক্ষা করবার অজুহাতে চীনা পিস্-লিবারেশন আর্মি (P. L. A.) লাসাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরেছে। আর শিক্ষা ও বন্ধুত্ব বিনিময়ের নামে ঢুকেছে সেখানকার রাজনীতি ।

দ্রেপুং-এর ছাত্রদের মতে চীনারা যে ভাবে এদেশের চারদিকে প্রবেশ করছে তাতে তিব্বতী ধর্ম ও লামাপ্রথাকে টিকিয়ে রাখা মুশকিল। চীনা ড্রাগন মনে হয় শীগগীরই তিব্বতকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করবেই।

লাসার বিদেশীরা ইতিমধ্যেই তাদের পাততাড়ি গুটিয়েছে। দ্রেপুং সেরা ও গান্‌দেন গুম্ফার ছাত্র সংখ্যা আজকাল অর্ধেকের কমে এসে পৌঁছেছে। দ্রেপুং-এর ভুটানী ও সিকিমি ছাত্ররা ইতিমধ্যেই যে যার দেশে চলে গেছে। অল্প সংখ্যক নেপালী ছাত্র বছরের শেষের দিকে তাদের শিক্ষা শেষ করে বাড়ী ফিরে যাবে। আমরা আসার পথেই দেখেছি যে অনেক মঠের সাথে লাসার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তরুন দালাই লামা ও তার পরিষদ আভ্যন্তরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে অন্যদিকে নজর দিতে পারছেন না। দ্রেপুং গুম্ফায় কয়েকদিন থাকলেই এ বিষয়ে পরিষ্কার জানা যায়। চীনাদের জন্যই আমাদের সমস্যা দেখা দিয়েছে । গীয়াৎসে থেকে আসার সময়েও এই রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। যাই হোক, সেদিন রাতেই গুরুজীর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করলাম। গুরুজীর মতে এতদূর এসে কৈলাস ও মানসসরোবরকে দর্শন না করে ফিরে যাওয়া মানে এক বিরাট সুযোগের অপচয় করা।

গুরুজীর মুখ থেকে কৈলাস কথাটা শুনেই আমার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল। কৈলাসের এক চিন্তা বিদ্যুতের মতো যেন আমার মাথায় ঢুকে গেলো। তাঁকে আরও কয়েকটা প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন-

পথ খুব দুর্গম কিন্তু যাওয়ার পথ-নির্দেশ খুব সোজা। ব্রহ্মপুত্র সামনেই তার ধার

ধরে সরাসরি উৎসের দিকে গেলেই পাওয়া যাবে মানস সরোবর আর তার পাশেই রয়েছে কৈলাস পর্বত, হিন্দুদের সেটাই শিবভূমি মহাতীর্থ কৈলাসনাথ । আমার মনে গাঁথা হয়ে রইল সেই কথাগুলো।

তীর্থযাত্রীদের সাথে গুরুজীকে ফিরতেই হবে। সুস্থ দেহে তাদের ঘরে ফিরিয়ে নেবার গুরু দায়িত্ব নিয়েছেন গুরুজী।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%