বিমল দে
ত্রামালুক থেকে আমরা ক্রমাগত উপরের দিকে উঠে পেলাম সেই অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কন্দর, লাসার পথে এটাই ছিল শেষ বাধা। সতেরো হাজার ফিট উঁচুতে খাম্বা-লা বা খাম্বা পাস। এর আগে আরও তিনটে লা বা পর্বত কন্দর পেরিয়েছি, প্রথমটি ছিল সীমান্তের নাথু-লা, দ্বিতীয়টি ফারির তাং-লা, তৃতীয়টি কারো-লা। কিন্তু এই খাম্বা-লা নিঃসন্দেহে অন্য তিনটি থেকে সম্পূর্ণ অন্য রকমের। খাম্বা-লা'র নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখান থেকে দু-দিকের দুটো দৃশ্য, সম্পূর্ণ আলাদা। একদিকে চোমলহারি ও অন্যান্য হিমালয়ের তুষার ধবল শৃঙ্গ আর অন্যদিকে সাং-পোর উপত্যকা। যমদ্রোক সরোবরটাকে দেখা যাচ্ছে বড় অদ্ভূত রকমের, মনে হচ্ছে একটা বিরাট পাহাড়ের খাদে ঘুমিয়ে আছে একটা বৃশ্চিক। একটু কল্পনার আশ্রয় নিলেই এই হ্রদটাকে বৃশ্চিকের মত চোখে ধরা পড়ে। এত উঁচু থেকে জলটাকে আর জল বলে মনে হয় না, মনে হয় একটা বিরাট বৃশ্চিক দৈত্য ঘুমিয়ে আছে। তাইতো অনেক ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা এই হ্রদটাকে বৃশ্চিক হ্রদ বলে বর্ণনা করেন। এখান থেকেই আমরা প্রথম দর্শন পেলাম ব্রহ্মপুত্রের আদি রূপের। শাস্ত হিমেল বিরাট একটা অজগরের দেহ যেন পড়ে রয়েছে সামনের এই উপত্যকায়। মনে হচ্ছে যেন ছোট একটা পাহাড়ি নদী যার কোনো গতি নেই। শুধু সে তার সত্তা নিয়ে অবস্থান করছে মাত্র। সাংপোর এই শান্তরূপ দেখলে মনেই হয় না যে এই নদীটাই প্রতি বছর প্রলয়ঙ্করী হয়ে ধ্বংস করে শত শত গ্রাম আর প্রাণ। ভারতে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করার আগে এই তিব্বতের উপত্যকায় পশ্চিম থেকে পূর্বে তার পথ প্রায় পনেরো শ' মাইল। সাংপো এখান থেকে দু'হাজার ফুট নীচে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই নদীটি সব সময়ই প্রায় বারো হাজার ফুট উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। খাম্বালা'র পরই পাহাড়টা সরাসরি নীচে গিয়ে মিশেছে সাংপো নদীর উপত্যকায়। এটাই হিমালয়ের শেষ অংশ। মহান হিমালয় পার হয়ে আমরা তার অন্যদিকে এসে পৌঁছেছি। সাংপোর থেকেও উত্তরে ধূ-ধূ করছে চাং-তাং পর্বত। সেই পাহাড়টির উপারেই চীন।
আমি আগেই আমার ডায়েরীতে লিখেছি যে এ অঞ্চলের সৌন্দর্যকে লিখে প্রকাশ করার মত ভাষা আমার নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলতে যা বোঝায় তারও যেন ঊর্ধ্বে এ জগৎ। হিমালয়ের গম্ভীর পবিত্র ও শান্ত সৌন্দর্যের প্রাণ এখানেই লুকিয়ে আছে। সত্যম্ শিবম্ সুন্দরমের পূর্ণ প্রকাশ। খাম্বা-লা'র থেকে আমরা নেমে এলাম নীচের পাটসি নামে একটি গ্রামে। সেদিন রাত্রিতে আমরা তিনটি বাড়ীতে ভাগাভাগি করে কোন রকমে রাত কাটালাম। পরের দিন বিকেলবেলায় আমরা পৌছলাম সাংপোর তীরে। সূর্যাস্তের সাথে সাথে আমাদের প্রার্থনা সেরে পবিত্র সাংপোর জল মাথায় দিলাম। সাংপোর রূপটা খুব ভয়ংকর নয়, অনেকটা হৃষিকেশের কাছে গঙ্গার মত, তবে দুদিকের উপত্যকা এখানে আরও চওড়া। নদীটা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বয়ে চলেছে। এখান থেকে আমাদের নদী পার হতে হবে—লাসা এখন মাত্র দু'দিনের পথ ৷ >
সাংপোর হলদে বালির বিরাট চর, নদীর এদিকে ও ওদিকে অনেক বাড়ীঘর। নদীর পাশ দিয়ে রাস্তায় অনেক লোকজন চলাফেরা করছে। নদীর ওপারেই রাস্তার উপর নজরে পড়ল কয়েকটা লরী। অনেকদিন পর আমরা ফিরে এলাম আমাদের জগতে।
সাংপোর ধারে আসতেই পাহাড়ের সেই শুকনো ঠাণ্ডা থেকে পরিত্রাণ পেলাম। এখানকার ঠাণ্ডা মনে হচ্ছে খুবই ভদ্র। সাংপোর ধার ধরে আমরা এবার পূর্ব দিকে হাটতে আরম্ভ করলাম। রাস্তাটা সাংপোর কাঁকর বালিতে তৈরী। এখান থেকে লাসা পর্যন্ত যেতে আর কোন পাহাড় ডিঙোতে হবে না। কিছুদূর এগুতেই দূরে ডানদিকের পাহাড়ের কোলে দেখা দিল কয়েকটি মন্দির। শুকনো গাছ দিয়ে যেন তাকে ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে ।
এটাই চাসাম গুম্ফা, 'এই গুম্ফার ধর্মশালাতেই আমরা রাত কাটাবো—গুরুজী ঘোষণা করলেন ।
সাংপোর তীরে আসার পর থেকেই আমাদের উৎসাহ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেছে, শ্রান্ত ও ক্লান্ত লামাদের ভেতরে হঠাৎ যেন প্রাণের জোয়ার এসেছে। সাংপোর পথ ছেড়ে আমরা এবার বাঁক নিলাম ডান দিকে ছোট পাহাড়টির দিকে। পাহাড় না বলে সেটাকে একটু উঁচু ঢিবি বলাই ভাল। একটু এগুতেই হঠাৎ পড়লাম যেন বাঘের মুখে—না, তিব্বতী কুকুর নয় আরও সাংঘাতিক—চীনা সৈন্য। ওদের তাঁবুগুলো যে লুকিয়ে ছিল ঢিবির আড়ালে কিছুতেই আমরা তা ভাবতে পারিনি। ওরা হঠাৎ অমানুষিক চিৎকার করে ছুটে এল আমাদের দিকে। এর আগেও এদের আপ্যায়ন পেয়েছি, কিন্তু সেটা ছিল ভদ্র আপ্যায়ন, কিন্তু এবারের আপ্যায়ন আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না, যদি লিখি অভদ্র তাতেও মনে হয় তাদের পূর্ণ সম্মানই দেখানো হল, এই পাহাড়ি সৈন্যদের এটাই বোধ হয় সাধারণ আচরণ
আমাদের ধৈর্য আর শান্তভাব বজায় রাখতে রাখতে সেটাই হয়ে গেছে স্বভাবসিদ্ধ, সর্প দংশনান্তেও মনে হয় সে ভাব থেকে বিচলিত হব না। মাঝে মাঝে মনে হয় যেন প্রাণ থাকতেও আমরা নিষ্প্রাণ। কাম ক্রোধের বাইরে একটা নিষ্প্রাণ জগতের এক অদ্ভূত প্রাণী। আমি সখের সন্ন্যাসী তাই এই ধরনের চিন্তাধারা প্রায়ই মনে উদয় হয়, কিন্তু ইচ্ছে করেই আমি বেছে নিয়েছি এই পথ, কাজেই অভিযোগ করবো কার বিরুদ্ধে। চীনা সৈন্যরা আমাদের সামনে যে রকমভাবে হঠাৎ এসে ঘিরে ধরেছে তাতে মানুষ মাত্রেই চমকে উঠবে। গুরুজী সব রকম মুহূর্তের জন্যই প্রস্তুত ছিলেন, তিনি অনেক চেষ্টায় কোনো রকমে তাদের বোঝাতে সক্ষম হলেন যে আমরা লামা, যাচ্ছি চাসাম গুম্ফাতে। তারা আমাদের পথ ছাড়লো বটে, কিন্তু পেছন পেছন গুম্ফা পর্যন্ত এল। আমরা গুম্ফার মূল দরজায় ধাক্কা দিলাম, ভেতর থেকে একজন লামা এসে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। ঢোকার সাথে সাথেই আমরা জানলাম যে ধর্মশালায় আপাততঃ কোনো অতিথি নেই। কাজেই থাকার কোন অসুবিধা হবে না। আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেখে চীনা সৈন্যরা চলে গেল, মনে মনে ভাবলাম আমি কি তিব্বতে আছি না পিকিং-এ।
ধর্মশালার উনোনের চারপাশে বসে আমরা সেদিন আনন্দে আর আন্তরিকতায় গুরুজীকে বার বার ধন্যবাদ দিতে লাগলাম। শত বাধা তুচ্ছ করে আমরা শেষ পর্যন্ত সাংপোর তীরে এসে যে পৌঁছেছি এর কৃতিত্ব গুরুজীর। লাসার পথে সাংপো পৌঁছনো মানেই লাসা পৌঁছনো।
চাক্সাম একটা বিরাট মঠ। প্রায় সাতশ' লোক সেখানে থাকে। আর ধর্মশালাতে ইচ্ছে করলে তিনশ' লোককে স্থান দেয়া যায়। বুদ্ধ পূর্ণিমা আর পদ্ম সম্ভবা উৎসবের জন্য এই গুম্ফা তিব্বতে খুব নাম করা। ধর্মশালাটি বিরাট, আমরা তারই কোণের তিনটে ঘর নিয়ে আছি। গীয়াৎসে বা অন্যান্য গুম্ফাতে যেরকম আপন করা আপ্যায়ন পেয়েছি এখানে সে রকমটি নয়। এখানকার সবাই যেন আলাদা আলাদা থাকতে পছন্দ করে। লামাদের সাথে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয় চলার পথে, মাথা নীচু করে প্রীতিভাব বিনিময় করি তার বেশী আর কিছু নয়। এখানকার ধর্মশালার যিনি অধ্যক্ষ তার সাথে প্রথমদিনই যা কথা বলার বলেছি তারপর তিনি যেন সম্পূর্ণ উধাও হয়ে আছেন। এখানকার সকলের মনেই যেন একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে।
চাসাম গুম্ফার অবস্থানটি চমৎকার, এখান থেকে সাং-পো নদী আর তার সমতলভূমির দৃশ্যটিও চমৎকার। এখানকার বুদ্ধ মন্দির, পদ্ম সম্ভবার মন্দির আর উপাসনার ঘরগুলোও অতি সুন্দরভাবে সাজানো। কাঠের কাজ, দেওয়ালের চিত্রণ আর বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তিগুলো অতি সুন্দর আর সূক্ষ্মকাজে ভর্তি। গী-ইয়াৎসের গুম্ফাতে সব সময় আমাদের সাথে লামারা থেকে সব কিছুর ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এখানে যেন সবই ফাঁকা ফাঁকা। লামারা থেকেও যেন নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম যে এরা সবাই ধ্যান-ধারণা সমাধির জগতে বিচরণ করছেন, সাধারণ কথাবার্তা ও অতিথি অভ্যাগতদের বিষয়ে তাই এদের ভ্রুক্ষেপ কম। কিন্তু পরে আমাদের সে ধারণা দূর হল। ধর্মশালায় থাকা-খাওয়ার জন্য কোনো পয়সা লাগে না, তাই লাসায় প্রবেশের আগে ঠিক হল যে আমরা আরও একদিন বিশ্রাম করে তারপর রওনা হব ।
পরের দিন বিকেলবেলা ধর্মশালার ভারপ্রাপ্ত লামা এসে আমাদের সবিনয়ে জানালেন যে, এখানকার চীনা কর্তৃপক্ষ আমাদের বিষয় জানিয়ে লাসায় সংবাদ পাঠিয়েছে, অর্থাৎ লাসার চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে মহামান্য দালাই লামার দরবারে নয়, লাসার চীনা কর্তৃপক্ষ যতক্ষণ পর্যন্ত না উত্তর দেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এখানে অপেক্ষা করতে হবে, চীনা কর্তৃপক্ষের আদেশ না পেলে আমরা যেন কিছুতেই সাংপো নদী পার না হই। ভারপ্রাপ্ত লামা খুবই দুঃখের সঙ্গে এ সংবাদটা আমাদের দিলেন। সেই কথায় আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম, কারণ আমাদের ধারণা অনুযায়ী তিব্বত মহামান্য দালাই লামার শাসনাধীন, কিন্তু এখানে চাক্ষুষ দেখছি সবই প্রায় চীনাদের 'অধীনে, তারাই এখানকার আসল মালিক। এখন বিষয়টা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হল, চাসাম গুম্ফার থমথমে ভাবটা এই চীনাদের কারণেই উৎপত্তি হয়েছে। ড্রাগনের মতো চীনারা মনে হয় গুম্ফার সামনে ওৎ পেতে বসে আছে।
গুরুজী আমাদের বার বার সাবধান করে দিলেন, তিব্বত এবং চীনাদের মধ্যে এই সময় শক্তির লড়াই চলছে। তিব্বতীদের আছে মনোবল ও ধর্মবল, অন্যদিকে চীনাদের রয়েছে অস্ত্রবল। জানি না কারা জিতবে, তবে এ পর্যন্ত আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝেনিয়েছি যে চীনারাই কার্যতঃ তিব্বতের শাসনকারী। চীনারা নেপালী তীর্থযাত্রী বলে আমাদের ছাড়ছে, ভারতীয়দের ক্ষেত্রে রাস্তা এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। এর মধ্যে আমাদের কিছুতেই ঢোকা চলবে না, এমন কি চীনারা যদি শত প্রশ্নও করে তাহলেও তাদের অতি সাবধানে এড়িয়ে চলতে হবে। তবে আমাদের মনোবল এতটুকু কমেনি। এতদূর যখন এসেছি তখন লাসা পর্যন্ত যাওয়া হবেই।
চাসামের একজন অল্পবয়স্ক লামার সাথে আমার পরিচয় হল। ভদ্রলোক নিজেই আমাদের সাথে এসে মিশলেন। তিনি এখানকার সহকারী উপ-অধ্যক্ষ। তিনি আমাদের কাছ থেকে পথ ও কোথায় কোথায় চীনা সৈন্য মোতায়েন আছে তা জানতে চাইলেন ৷ আমি মৌনী সাধু কাজেই উত্তরটা জানা সত্ত্বেও চুপ করে রইলাম, আমার ডায়েরীতে সব পরিষ্কার লেখা আছে। অন্যান্য লামারা এ প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে গেলেন। গুরুজীর কড়া নিষেধাজ্ঞা খবরদার এ সবের মধ্যে ঢুকবে না। কার মনে কি আছে, কি কথার কি ব্যাখ্যা করবে তা আমাদের জানা নেই। আমাদের কাছ থেকে কোন রকম উত্তর না পেয়ে সহকারী উপ-অধ্যক্ষ মহাশয় আমাদের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে মেশবার চেষ্টা করে বললেন—আপনারা আমাদের আপনজন কাজেই বলছি, জানেন ১৯৫০ সালের চীনা আক্রমণের পর থেকে আমাদের স্বাধীনতা প্রায় নেই-ই বলতে হবে। অনেক লোক চলে গেছে ভারত ও নেপালের দিকে। লাসার চারদিকে চীনা সৈন্যে ভর্তি, লাসার বাইরের মঠ ও বিহারগুলো এখনও স্বাধীনভাবে রয়েছে, কিন্তু আস্তে আস্তে চারদিকেই চীনা প্রতিনিধিরা তাদের নীতি ঢোকাবার চেষ্টা করছে। সাংপোর এদিকে চীনা সৈন্যরা আগে ছিল না। এই পাঁচ ছ'দিন হল তারা হঠাৎ এখানে এসে তাঁবু পেতেছে। এখান থেকে ফেরী ঘাট দূরে নয় লোকজন চলাচলের ওপর কড়া নজর রাখাই তাদের উদ্দেশ্য। ওরা কিছুতেই বুঝতে পারছে না যে এতে আমাদের তপস্যার ব্যাঘাত ঘটে। আমরা লাসায় পি-এল-ও অর্থাৎ পিস্ লিবারেশন আর্মি ও প্রিপেয়ারেটরি কমিটিতে তীব্র প্রতিবাদ করেছি, এখনও পর্যন্ত তার কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। এই চীনা বাহিনীরা আমাদের শান্তি ও সাধনার খুব ক্ষতি করছে। তাই জানতে চাইছি আপনারা তো বরডার হয়ে আসছেন, এ বিষয়ে আপনাদের মতামত কি ?
তার কথা শুনে গুরুজী বললেন—আমরা সামান্য ও সাধারণ তীর্থযাত্রী। এ পর্যন্ত কয়েক জায়গায় কিছু কিছু সৈন্য দেখেছি বটে কিন্তু আমাদের কোনোরকম অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়নি। আমরা চীনা ও তিব্বতী সৈন্যদের তফাৎ কিছু বুঝি না, আর সেদিকে নজর দেবার সময়ও আমাদের হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা কিছুই বলতে পারবো না। গুরুজীর কথা শুনে ভদ্রলোক আমাদের কাছ থেকে কিছু আদায় হবে না বুঝে বিদায় জানালেন।
সেদিন সকাল থেকেই সূর্যের কিরণ অদ্ভূত ধরনের গরম। কাজেই গুরুজী আমাদের বললেন চল আজকে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করে পূজো দিয়ে আসি। বছরের এই সময়টায় ব্রহ্মপুত্রের (সাংপো) ধারে ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে আমরা সেই ফুল কুড়িয়ে নিয়ে এসে নদীর ধারে এলাম। আমাদের পরনের কাপড় ফতুয়া আর চাদরগুলোও খুব নোংরা ছিল আর মোজাগুলো তো বটেই। সেগুলোও ধুতে হবে। আমরা লেঙ্গট পরে নেমে পড়লাম জলে। জলে পা দিয়েই আমি লাফিয়ে উঠলাম—জলতো নয় বরফের টুকরো ! অসম্ভব, এ জলে স্নান তো দূরের কথা জলকাচা করাও সম্ভব নয়। জল ছুঁলেই মনে হয় নিউমোনিয়ায় ভুগতে হবে। অন্যান্য লামাদের কথা আলাদা তারা সবাই কাঠমাণ্ডুর লোক, বাগমতীর বরফের জলে স্নান করা ওদের অভ্যাস। কিছুক্ষণ পরে মনের জোরে বললাম, যা হবার হবে, ব্রহ্মপুত্রের এই উৎসে স্নান করাও এক মহাপুণ্যের ব্যাপার। এই পুণ্যস্থানে যদি ঠাণ্ডায় মরি তাহলেও নিশ্চয়ই পরকালে স্বর্গলাভ হবে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে সব লামারাই একে একে জলে নেমেছেন কাজেই আমি যদি না নামি তাহলে খুব সহজেই প্রমাণ করা হবে যে আমি শীতের দেশের লোক নই ।
আবহাওয়াটা বড় অদ্ভূত। আকাশের কড়া রোদ ব্রহ্মপুত্রের বালির চড়ায় পড়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আমরা আছি ১২০০০ ফুট উপরে। আমাদের চারদিকের পাহাড়গুলো সব বরফে ঢাকা অথচ এই গরম সূর্যকিরণ দেখে তা মনেই হয় না। গুরুজীকে দেখে মনোবল বেড়ে গেল এই বয়সে তিনি যদি সাহস করে নামতে পারেন আমার সেক্ষেত্রে দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়। আমি আস্তে পা ভিজিয়ে হাতের কনুই ভিজিয়ে ঠাণ্ডাটাকে গায়ে সহ্য করে নিলাম। একটু সময় নিলাম তারপর নেমে পড়লাম স্ফটিকস্বচ্ছ পবিত্র জলে। ডুব দিলাম সর্বপাপহরা ব্রহ্মপুত্রের হীমশীতল জলে। একটা মাত্র ডুব তাতেই মনে হল শরীরের এক বিরাট পরিবর্তন হল। তীরে উঠে গা-মুছে নিলাম, তারপরই শুরু হল আমার আভ্যন্তরিক রক্ত চলাচলের বিরাট পরিবর্তন । কনকনে হাড় কাঁপান ঠাণ্ডাটা বন্ধ হয়ে সমস্ত শরীরের রক্তটা গরম হয়ে উঠল। এক অদ্ভূত আনন্দে মনটা ভরে উঠল, অনেক দিন পর জল পেয়ে আমার দেহটা শান্তি পেল। এই আনন্দ পাবার জন্য পাপ বা পুণ্যের কোন প্রশ্নই আসে না, এই আবহাওয়ায় এটাই স্বাভাবিক। এই পরিবর্তনের নামই বোধ হয় পুণ্যস্নান। অলকানন্দায় যারা স্নান করেছেন তারা বুঝবেন আমি কি বলতে চাইছি।
স্নানের পর আমরা বসলাম পূজোর জন্য। সমবেত প্রার্থনার পর আমরা মনের ভক্তি দিয়ে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করলাম। লামারা সুর করে পাঠ করতে লাগলেন ধৰ্ম্মপদের পবিত্র শ্লোক-
মনই সব অবস্থার সৃষ্টি করে মনই মনকে মালিক করে ।
অপবিত্র মন আনে দুখ্খ জীবনচাকা এইভাবেই ঘোরে ৷
হে দয়াময়! আমাকে এই ঘূর্ণিবাত্যা থেকে মুক্ত কর। ঘৃণা দিয়ে ঘৃণাকে দূর করা যায় না। ভালোবাসার নদীতে অবগাহন করলেই দূর হয় ঘৃণাভাব ...।” চাক্কামের বজ্রধারা মন্দিরটি বিরাট, আর সহস্রবাহু মন্দিরের রঙ তাংখা, আর কাঠের সূক্ষ্ম কাজগুলো দিনের পর দিন ধরে দেখলেও আত্মার তৃপ্তি হবে না। তিব্বতী লামা শিল্পীরা মনের ভক্তি ও শান্তি উজাড় করে দিয়েছেন এই কাজের মধ্যে। পবিত্র পরিবেশে সেগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তাই দেখে দেখেই আমাদের সময় কাটে। লামাদের মতে ভগবান বুদ্ধের আত্মা লুকিয়ে আছে এইসব অব্যক্ত মূর্তিগুলোর মধ্যে
চাক্সাম মন্দিরের আর একটা বৈশিষ্ট্যের কথা না লিখলে আমার রোজনামচা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সেটা হচ্ছে এখানকার ইঁদুর। এখানকার মন্দিরগুলো যেন ইঁদুরের স্বর্গরাজ্য। এদের গতিবিধি এতই স্বাভাবিক যে মাঝে মাঝে ধ্যানমগ্ন লামাদের মাথায় উঠতেও এরা দ্বিধা বোধ করে না। মন্দিরের চাল আর মাখন এদের প্রধান খাদ্য । তিব্বতীদের মতে লামারা দেহত্যাগ করে এইসব ইঁদুরের মধ্যে তাদের আত্মাগুলোকে লুকিয়ে রেখেছেন, তাই এই মন্দির তারা ছাড়তে চান না। কাজেই সে-সব পুণ্যাত্মাদের তাড়িয়ে দেবার মতো বা ফাঁদে ধরার মতো দুষ্ট বুদ্ধি এদের মধ্যে কিছুতেই আসবে না।
বদ্রীনাথের ছারপোকার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আর এখানকার ইঁদুরের কথাও মনে হয় চিরজীবন মনে থাকবে। বিশেষ করে রাতে আমাদের ঘুমন্ত দেহের উপর দিয়ে এদের অবাধ যাতায়াতের কথা আমি কোনোদিনই ভুলবো না। আমার মতে এইসব মন্দিরগুলোকে বুদ্ধ মন্দিরের বদলে গণেশ মন্দির বলে এরা ভুল করেছে। চাসাম মন্দিরে আমার সবচেয়ে বড় লাভ হয়েছে, গুরুজীর সাথে ধর্মচর্চা। গুরুজী রোজই আমাদের ধম্মপদ থেকে বিশেষ বিশেষ অধ্যায় পড়ে শোনাতেন। চার দিনের দিন সকাল বেলা আমরা ছাড়া পেলাম, অর্থাৎ চীনা শিবির-অধ্যক্ষ লাসা থেকে আমাদের যাওয়ার আদেশ পেয়েছেন। সকাল ন'টার সময় আমরা খবর পেলাম। কালবিলম্ব না করেই আমরা রওনা হলাম, দশটার মধ্যে আমরা সাংপোর তীরে এসে পৌঁছলাম ৷
সাংপোর জলটাকে দূরে থেকে যতই শান্ত দেখাক না কেন আসলে এর বেগ ও স্রোতের খুব বদনাম আছে। সাংপোর ধার ধরে আমরা পূর্বদিকে চলতে লাগলাম। কিছুদূর আসতেই প্রথমে নজরে পড়ল তিব্বতী গ্রামবাসীরা মনের আনন্দে গান গাইছে আর নদীতে কাপড় কাচছে ও অনেকে স্নান করছে। ঠাণ্ডার জন্য যে জলে আমি নামতে ভয় পাচ্ছিলাম সেই জলেই দেখলাম মহিলারা মনের আনন্দে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। মহিলাদের মধ্যে অধিকাংশই যুবতী তাদের বুকের কাপড় একদম নেই, পাথরের উপর জামা খুলে রেখে দিয়েছে। রোদ পোয়াবার এরকম দৃশ্য এর আগে কোনোদিন চোখে পড়েনি। আমাদের দেখে তারা একটু থমকে দাঁড়ালো তারপর চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী জিভ বার করে আমাদের প্রণাম করল। কিন্তু তাদের মধ্যে লজ্জার কোন চিহ্ন দেখলাম না। কি সহজ এরা ; এরকম সহজ ও সরলতা বুঝি এখানেই সম্ভব। যেখানে মন পবিত্র সেখানেই আছে মুক্তি ।
আরও কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আমরা পেলাম একটা ফেরী ঘাট। এই অঞ্চলের পারাপারের জন্য এই ফেরীঘাটটাই একমাত্র ভরসা। নদীর জল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, তার উপর প্রবল স্রোত আর এপার ওপারের দূরত্বও অনেক। বহরমপুরের কাছে গঙ্গার মতো অনেকটা, কাজেই সাঁতার কেটে পার হবার তো প্রশ্নই আসে না। সকলকেই বাধ্য হয়ে নিতে হয় ফেরী। প্রয়োজনের তুলনায় ফেরীঘাটের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ছোট একটা কাঠের ঘরকে কেন্দ্র করেই তার প্রাণ। নদীর ধারে যদি বালির ঝড় দেখা দেয় তাহলে মনে হয় এই ঘরটাকে তুলে নিয়ে দূরে ফেলে দেবে। ঘরটার ভেতরে একটা তোলা উনোনে একটা লম্বা টবের উপর জল ফুটছে। আর তার মধ্যেই রয়েছে চা-পাতা। এর মধ্যে কবে যে নতুন চা-পাতা যোগ হয় তা ভগবানই জানেন। চা চাইলে এই ফুটন্ত চায়ের জলটাকেই বাঁশের চোঙ্গা বা অ্যালুমনিয়ামের মগে করে দেওয়া হয়, তবে দেওয়ার আগে তাতে নুন ও মাখন মেশানো হয়। এরকম এক মগ চায়ের দাম দু'পয়সা, জলের দাম বলতে হবে। আমাদের মতো অনেকেই ফেরীর জন্য অপেক্ষা করছে। শিলিগুড়ি স্টেশনে তিব্বতীরা যেরকম দিনের পর দিন অপেক্ষা করে তাদের দলনেতার জন্য আমরাও সেরকম অপেক্ষা করতে লাগলাম ভবসিন্ধু পার হবার তরীর জন্য। ওপার থেকে লোকজন মালপত্র বোঝাই করা নৌকা এল। নৌকা ঠিক নয় একটা ভেলা। গঙ্গাবক্ষে কাঠের বোটের মতো। চারকোণা লগি ঠেলে যতদূর তাকে নিয়ে যাওয়া যায়, তারপর বৈঠা ও কোণাকুণি স্রোতের সাহায্যে নিয়ে আসা হয় ওপারে। বলাই বাহুল্য, এখানে জেটি বা কোনোরকম পুল নেই। বোটটা যতদূর সম্ভব তীরে আসে তারপর সেখান থেকে হাঁটু জলে নেমে আসতে হয়। অবশ্য বর্ষার সময় বা মাসখানেক পর বরফ গলার সময় যখন নদীর ভরাট অবস্থা হয় তখন বোটটা আরও কাছে আসে।
বোটটা যেন একটা গ্রাম বয়ে নিয়ে যায়, এর মধ্যে না আছে কি! ইয়াক, ভেড়া, গাধা থেকে আরম্ভ করে শূকর, মুরগী, মালপত্র, ঘাস, বিচালি, মানুষ পর্যন্ত কিছু বাকি নেই। ঠাসাঠাসি করে কোনরকমে পার হওয়া নিয়ে কথা। ভাড়া চার পয়সা (মাথাপিছু) মাত্র। আজকাল ১৯৫০ সালের পর অর্থাৎ হানদের আগমনের পর থেকে ফেরীর অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে ছিল ইয়াকের চামড়ার ভেলা, তাতে আট দশজনের বেশী একসাথে পারাপার হওয়া যেতো না। আর দিনে কোনো সময় একবার কোনো সময় দু'বার মাত্র পারাপার হওয়া যেতো। কিন্তু আজকাল অবস্থার উন্নতি হয়েছে। দিনে চার বার, আর প্রয়োজনবোধে আরও একবার বাড়ানো যেতে পারে, একটা বিরাট গাদাবোট ছাড়াও আর একটা বিরাট মিলিটারী বোট রয়েছে সৈনিকদের জন্য। তিব্বতী সেনাবাহিনীর অফিসাররাও সেই বোট ব্যবহার করতে পারেন ।
আমাদের পার হতে লাগলো প্রায় একঘণ্টা। তিব্বতে এই প্রথম আমরা যান ব্যবহার করলাম। গ্যাংটক থেকে লাসা পর্যন্ত একমাত্র এই জলযান ছাড়া সবটাই পায়ে হাটা পথ। যাদের ক্ষমতা আছে তারা পনি বা ঘোড়ার ব্যবস্থা করে। মাল টানার জন্য রয়েছে চমরী গাই বা ইয়াক, এদেশে গাধারও অভাব নেই।
সাংপো পার হলাম, আমরা পৌঁছলাম সম্পূর্ণ এক অন্য জগতে। হিমালয় ছাড়িয়ে এবার আমরা স্পর্শ করলাম লাসার পবিত্র মাটি। সুস্থ অবস্থায় পৌঁছবার জন্য আমরা ভগবানের উদ্দেশ্য প্রার্থনা করলাম। তারপর ধরলাম পথ। এবারের পথটা সম্পূর্ণ বালির, চড়ার উপর দিয়ে পথ। শিলিগুড়ি থেকে জলদাপাড়া আসার পথে শীতের সময় তিস্তা নদীর যে চড়া ঠিক সে রকম। আমরা সাংপোর ধার ধরেই পূর্ব দিকে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর গিয়ে সাংপোকে বিদায় জানালাম। বড় রাস্তা ছেড়ে আমরা রাস্তাটাকে সংক্ষেপ করার জন্য একটা ছোট রাস্তা ধরলাম, রাস্তা নয় মেঠো পথ। সাংপোর তিব্বতী উচ্চারণ ৎ-সাং-পো, আমরা এখন তার উত্তরাংশে। এদিকটায় সমভূমি আর ও প্রশস্ত, ওদিকটায় ঠিক সাংপোর পরই শুরু হয়েছে হিমালয় পর্বতমালা অর্থাৎ সাংপোর দক্ষিণাংশ। এদিকে আবাদী জমিও চোখে পড়ত লাগল আর মাঝে মাঝে দু' একটা ঘরবাড়ীও। জমিগুলোর আলা দেখে মনে হচ্ছে যে এখানে ভালই চাষ হয়। রাস্তায় লোকজন ভর্তি, এখান থেকে আর দুটো পুরো দিন হাঁটলেই লাসা, পবিত্র শহর। আমরা একটু ডানদিকে ঘুরে আবার বড় রাস্তায় পড়লাম। এই সমতল ভূমিটাকে বলা হয় কী-চু নদীর উপত্যকা। আমরা এই সংক্ষেপ পথ না ধরলে পেতাম কী-চু নদী ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গম সেখান দিয়েই আসলে রাস্তাটা ঘুরে এসেছে। এই সংক্ষেপ রাস্তাটায় আসার জন্য আমরা প্রায় তিনঘন্টা সময় বাঁচিয়ে এসে পড়লাম কী-চু নদীর ধারে। এখানেই আমরা থামলাম, গ্রামটির নাম চুসুল ।
ছোট্ট গ্রাম, ঘর বাড়ীগুলো সবই পাথরের তৈরী। এখানে অনেক গাছ-গাছড়াও চোখে পড়ল। সিকিমের ছোট্ট গ্রামের মতোই এর রূপ। গ্রামে কোন রকম রেঁস্তোরা বা চায়ের দোকান নেই। আমাদের দেখে আশপাশের বাড়ী থেকে ছোট ছেলেমেয়েরা পিছন ধরেছে, তাদের কাছ থেকেই খোঁজ নেওয়া গেল—এখানে কাঠ পাওয়া যায় কি না। এগারো বারো বছরের একটি ছেলে এগিয়ে এসে বলল –আমি আপনাদের নিয়ে যাবো চলুন ।
ছেলেটিকে 'অনুসরণ করে আমরা নদীর ধারের একটা বাড়ীতে এসে দরজায় ধাক্কা দিলাম। ঘরে লোক থাকলে সাধারণতঃ দরজা খোলাই থাকে কাজেই বোঝা গেল যে ভেতরে কেউ নেই। সেই বাড়ীর সামনে বত্রিশজন লামাকে দেখে আশপাশের সবাই ছুটে এল, ব্যাপার কি? তাদের বুঝিয়ে দিলাম—ব্যাপার অতি সামান্য, আমরা তীর্থযাত্রী, মধ্যাহ্নে আহারের জন্য রান্নার ঘর খুঁজছি।
—তা বললেই হয়, বাড়ীর মালিক এখন নেই, আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, আমরা আপনাদের জন্য কাঠ জোগাড় করে আনছি। ভিড়ের মধ্য থেকে এক ভদ্রলোক এসে সে দায়িত্ব নিলেন ।
এ অঞ্চলে আশপাশে গাছ-গাছড়া অনেক আছে, কাঠের অভাব নেই কিন্তু আমাদের প্রয়োজন শুকনো কাঠ যা এখনই ধরানো সম্ভব। গ্রামবাসীদের সাহায্যে আমাদের সে সমস্যার শীঘ্রই সমাধান হয়ে গেলো। কাঠের দোকানটা আপাততঃ বন্ধ, কাজেই গ্রামবাসীরা ভাগাভাগি করে যে যার নিজের বাড়ী থেকে একটা করে কাঠ নিয়ে এল। আমরা তার দাম দিতে চাইলেও তারা কিছুতেই গ্রহণ করল না। আমাদের সাহায্য করেই তারা কৃতার্থ হল। গ্রামের সকলেই খুব হাসি খুশী। এই সরল গ্রামবাসীদের মধ্যে সহজ ও সরলভাবটা সাদা বরফের মতোই পবিত্র। একটু বড় মেয়েরা দূরে গাছ বা বাড়ীর আড়ালে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের রান্না দেখতে লাগলো। রান্না মানে ছাতু কিছু ডাল ও চালের সঙ্গে গরম জলের মিশ্রণ মাত্র। আনন্দে আমাদের মন ভরাই রয়েছে শুধু দেহের জন্য খাওয়া। আমরা যে যার অ্যালুমনিয়মের বাটিতে নদীর জল ধরে নদীর ধারের একটা বিরাট পাথরের আড়ালে কাঠ ধরিয়ে রান্না করলাম। আমাদের সাথে গ্রামবাসীদেরও খাবার জন্য আমন্ত্রণ জানালাম। তাদের মধ্য থেকে চারটি ছোট ছেলেমেয়ে আর দু'জন বয়স্ক লোক এসে আমাদের সাথে যোগ দিল, বাকি সবাই দূরে দাঁড়িয়ে রইল। খাওয়া-দাওয়ার পর গ্রামবাসীদের ধন্যবাদ দিয়ে মঙ্গলময়ের কাছে প্রার্থনা করে আমারা আবার পথ ধরলাম।
হিমালয়ে উঠবার সময় আমাদের পা ব্যথা খুব বেশী হয়নি কিন্তু চাক্ক্সাম গুম্ফায় পৌঁছাবার পর থেকেই আমাদের জানু খুব কাহিল। খাম্বা-লা'র থেকে নামবার পর থেকেই আমাদের জানুতে ব্যথা ধরেছে। খাড়াই পথে তাড়াতাড়ি নামবার জন্যই এ অবস্থা। সেই ব্যথা এখনও আছে। কাজেই সমতল হলেও আগের মতো আমরা চলতে পারছি না। আমাদের গতি খুব ধীর
কী-চু নদীটি আমার খুব ভালো লাগছে। নদীটা নেমে আসছে লাসার ওদিক থেকে সাংপোর দিকে। আমরা চলছি সেই স্রোতের বিপরীত দিকে। রাস্তাটা প্রায় সমতলই বলতে হবে। নদীর ওপারে একটা পর্বতশ্রেণী মনে হয় আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে নদীটার কাছে। খরস্রোতা নদীর মধ্যে রয়েছে অনেক পাথর, তারই উপর স্রোতটা ধাক্কা খেয়ে জলতরঙ্গের মতো শব্দ করছে। সেই তরঙ্গের ছন্দে পা মিলিয়ে আমরা চলতে লাগলাম ।
সন্ধ্যার একটু পর আমরা একটা বড় গ্রাম পেলাম, গ্রামটির নাম নেথাং। গুরুজী বললেন যে এই গ্রামগুলোকে তিনি খুব ভালোভাবে চেনেন, গত বিশ বছরের মধ্যে এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। আমরা একটা বাড়ীর সামনে এসে থামলাম। আমাদের বাঁদিকে দু'টো বাড়ীর মধ্যে নজরে পড়ল একটা বিরাট চৈত্য। যে বাড়ীটায় আমরা ধাক্কা দিলাম সেটাই হচ্ছে এই গ্রামের গুম্ফা। গুম্ফা না বলে এটাকে ধর্মশালা বলাই ভালো ৷ যাতায়াতের পথে লামারা এই গুম্ফাটাকে ধর্মশালা হিসেবে ব্যবহার করেন।
একজন বৃদ্ধ লামা এসে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। আমাদের কথা শোনার আগেই তিনি বললেন—কাঠ বা কাঠকয়লা একদম নেই সব ফুরিয়ে গেছে, এমাসের ধার্য করা টাকাটা এখনও লাসা হতে এসে পৌঁছয়নি। গ্রামের মুদিখানার দোকানও টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছে, তবে দু'একদিনের মধ্যেই তা এসে পৌঁছাবে, চিন্তার কোনো কারণ নেই। বৃদ্ধ লামা আমাদের কোনো কথাতেই কান দিলেন না। আমরা কোথা থেকে আসছি কতদিন থাকবো, সে সব কোনো প্রশ্নও তিনি করলেন না। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে একটা হ্যারিকেন বা কোনো রকম আলো চোখে পড়ল না। সেই অল্প আলোতেই আমাদের দুটো ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললেন—এখানেই রাতের মতো শুয়ে পড় কালকে দেখা যাবে যদি খাওয়া-দাওয়ার জন্য কিছু বন্দোবস্ত করতে পারি তো করবো। এই বলে তিনি যেন অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলেন। দুটো ঘর থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যবহার করলাম মাত্র একটা ঘর। ঠাসাঠাসি করে শুলে ঠান্ডাটা খুব কম লাগবে। বলাই বাহুল্য, সে রাতে আর কিছু খাওয়া হল না। আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম কাজেই ঘুমটাই আমাদের আসল। ভালোই হল। তাড়াতাড়ি শুয়ে কালকে খুব ভোরবেলা রওনা হওয়া যাবে।
খুব ভোরবেলায়ই আমাদের ঘুম ভাঙলো, আমার সবচেয়ে বেশী যা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে খাদ্য। পেটের মধ্যে যেন হাহাকার পড়েছে, এমন খিদে অনেকদিন যাবৎ পায়নি। আগের দিন কী-চু নদীর জল খেতে খেতে রাস্তায় চলেছি সেটাও তো এই ক্ষুধার কারণ। ভোরের আলো আরও ফুটতেই আমরা তৈরী হয়ে পড়লাম। সরাসরি গ্রামের কোনো চায়ের দোকানে গিয়ে ঢুকতে হবে। এত ভোরে বৃদ্ধ লামাকে জাগিয়ে তোলার কোনো প্রশ্নই আসে না। কোনো রকম শব্দ না করেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম । চোরতেনের কাছে প্রার্থনা সেরে আমরা এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলাম, মনে হয় সেই জায়গাটাই গ্রামের বাজার। কয়েকটা কুকুর আমাদের দেখে সসম্ভ্রমে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তিব্বতে এই প্রথম দেখলাম যে কুকুরগুলোও আমাদের শ্রদ্ধা করে। তারা এতটুকু শব্দও করলো না ।
হঠাৎ নজরে পড়ল রাস্তায় এক ভদ্রমহিলা কাশতে কাশতে এগিয়ে চলেছেন তাকেই থামিয়ে জিজ্ঞাসা করা হল—এখানে কোনো চায়ের দোকান আছে কি না বলতে পারেন? তিনি কাশতে কাশতেই দূরের একটা বাড়ী দেখিয়ে দিয়ে বললেন— দরজায় ধাক্কা দিন ওরা ভেতরেই ঘুমোয়। তার কথামতো আমরা এগিয়ে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ ধাক্কা মারার পর দোকানের ঝাঁপ খুলে রাগতস্বরে একজন হেঁড়ে গলায় জিজ্ঞেস করলেন—কি চাই ? তারপর হঠাৎ এতগুলো লামাকে একসাথে দেখে তিনি জিভ বার করে সসম্ভ্রমে গলার স্বর পরিবর্তন করে বললেন–বলুন আপনাদের সেবায় কি ভাবে লাগতে পারি ।
আমরা ঠিক জায়গায়ই পৌঁছেছি, এটা চায়েরই দোকান। ভদ্রলোক খুব তাড়াতাড়ি কাঠে আগুন দিয়ে পুরোনো বহুকালের কালি পড়া চায়ের পাত্রটা উনোনে চড়ালেন। তৈরীই আছে তার সাথে শুধু মাখনটা মেশাতে হবে মাত্র—তিনি অতি বিনয়ে জানালেন। চা তৈরী হল। তিব্বতে এ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক দিনই চা খাচ্ছি কাজেই নোস্তা চায়ে আজকাল অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কলকাতার চায়ের স্বাদ এখন প্রায় ভুলেই গিয়েছি। আজকের চা খুব তেতো লাগল আমরা সকলেই দু-চুমুকের বেশী পান করতে পারলাম না; আমাদের সেই ভাব দেখে দোকানদার ভদ্রলোক বললেন- –ও ! বুঝতে পারছি আপনারা এ রকম চা খেতে অভ্যস্ত নন। এটা আমার স্পেশালিটি আমি চায়ের মধ্যে কিছুটা ওষুধ পাতা (অনেকটা চিরতার মতো) মিশিয়ে দিই, গ্রামের লোকেরা প্রায়ই পেটের অসুখে ভোগে তাদের পক্ষে এ খুবই উপকারী। ভদ্রলোক খুব গর্ব করে বললেন যে এটা তার ঠাকুরদার আবিষ্কার। ভাগ্যিস্ বাড়ীতে ঠাকুমার দেওয়া চিরতার জল খাওয়ার অভ্যেস ছিল তাই গলধঃকরণ করতে পেরেছি, নচেৎ মুশকিলে পড়তে হতো। তিব্বতীরা বেশ ভালো মানুষ, কিন্তু তাদের জাতীয় খাবারের অপমান করলে তা কিছুতেই ক্ষমা করেন না। তবে তিনি একটু বেশী মাখন দিয়ে তিক্ততাকে লঘু করে দিয়েছেন বলে তার মার নামে দিব্বি কাটলেন। দামেও অবশ্য খুব সস্তা বত্রিশ গ্লাস চায়ের জন্য নিলেন মাত্র এক টাকা। তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা পথ ধরলাম, যাবার পথে আর একবার গুম্ফাতে ঢুকে সেই বৃদ্ধ লামাকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রণাম করলাম । তিনি হাসিমুখে আমাদের আশীর্বাদ জানালেন ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন