বিমল দে
সাংপো পার হয়ে চুসুলকে ফেলে এসেছি দু'দিন আগে, এর মধ্যে মাত্র দু'টি ছোট গ্রাম পেয়েছি। সাংপোর জল দিয়ে তৈরী করেছি রুটি, আর শুকনো ঘাসের আগুন জ্বালিয়ে তা সেঁকে পরমানন্দে খেয়েছি। প্রথম রাত কাটিয়েছি একটা পরিত্যক্ত বাড়ীতে। এরকম করে যদি এগুনো যায় তাহলে আমার অগ্রসর অনিবার্য ।
সাংপোর ধারের রাস্তাটা মোটেই সমতল নয়। বড় বড় পাথরের পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে এগিয়ে চলেছে, চলায় মজা আছে একঘেয়েমী মোটেই নেই। দ্বিতীয় দিন বিকেলে হঠাৎ একটা ছোট আস্তানা পেয়ে গেলাম। চলতে চলতে হঠাৎ নজরে পড়ল একটা কুঁড়ে ঘর। নদীর ধারের পাথর কুড়িয়ে, বালি মাটি দিয়ে কোন রকমে তৈরী করা হয়েছে চারটে দেয়াল আর তারই উপরে কয়েকটা গাছের গুঁড়ি ও ঘাস দিয়ে তৈরী করা হয়েছে ছাউনি। আমি ঘরটির চারদিকে ভালোভাবে পরীক্ষা করলাম কিন্তু কারও সাড়া শব্দ না পেয়ে ভাবলাম যে এটা নেহাৎই পরিত্যক্ত কারও আস্তানা হবে। রাতে শীত আছে বটে কিন্তু আগের মতো কনকনে ঠাণ্ডাটা আর নেই। ভাবলাম এখানেই আজকের মতো রাতটা কাটানো যাবে ।
ঘরের ভেতর ঢুকে দেখি যে বেশ কয়েকটি পোড়া কাঠের গুঁড়ি রয়েছে, কাজেই আগুন জ্বালাবার কোন অসুবিধা হবে না, শুকনো ঘাসেরও অভাব নেই ! আকাশ আস্তে আস্তে রঙিন হতে শুরু করেছে, আমি দিনের আলো থাকতে থাকতে সাংপোর ধারে বসে আমার প্রার্থনা ও ধ্যান সেরে নিলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমি সেই কুঁড়ে ঘরটার দিকে এগুচ্ছি হঠাৎ সামনে একটা মনুষ্য মূর্তি দেখে থমকে দাড়াতে বাধ্য হলাম। আমার সামনেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন তিব্বতী। মাথা নীচু করে একটু হেসে, তারপর জিভ বার করে তাকে নমস্কার করে এড়িয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু সম্ভব হল না; তিনি আমার পথ রুখে দাঁড়িয়ে কি যেন জিজ্ঞেস করলেন। তিব্বতী ভাষা হলেও তার উচ্চারণের সাথে আমি পরিচিত নই, কাজেই কিছু না বুঝতে পেরে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম ।
ভদ্রলোককে ভালোভাবে দেখতে লাগলাম। পরনে লামাদের মত লাল সন্ন্যাসী বস্ত্র। তবে মনে হয় তাকে কোনদিন কাচা হয়নি, রঙটা এখন উঠে গিয়ে কালোয় পরিণত হতে চলেছে তার উপর অজস্র পট্টি দেওয়া। মাথায় বিরাট লম্বা চুলের খোঁপা, দাড়ি গোঁফ প্রায় নেই বললেই চলে, চেহারা দেখেই মনে হয় খাঁটি তিব্বতী সম্ভবত উত্তরাঞ্চলের, পায়ে পুরু উলের মোজা আর তার উপর বহুদিনের পুরানো মিলিটারী বুট। দেখেই মনে হয় ভিখারী।
আমার হাতে মগটা ছিল, নদীর জল নিয়ে যাচ্ছিলাম রুটি করার জন্য। কোন কথা খুঁজে না পেয়ে তাকে মগের জল দেখিয়ে কোন রকমে বুঝিয়ে বললাম, আমি সাম্পা তৈরী করতে যাচ্ছি ইচ্ছা করলে তিনি আমার সাথে খেতে পারেন। মনে হয় তিনি আমার কথা বুঝলেন—তিনি একটু হেসে আমাকে অনুসরণ করলেন। আস্তানায় ঢুকে দেখি আমার কম্বলের পাশে আর একটি কম্বল পাতা হয়েছে আর তার উপরে রাখা একটি ঝুলি। বুঝলাম এটা ভদ্রলোকেরই ঝুলি। ঘরে ঢুকতেই তিনি তাড়াতাড়ি তাঁর ঝোলা থেকে একটা দেশলাই বার করে আগুন ধরাতে লাগলেন। আমাদের মধ্যে কোন রকম কথাবার্তা হল না। তিনিই আগুন ধরালেন, তারপর পাশের একটা গর্ত থেকে কয়েকটা অ্যালুমনিয়মের বাটি বার করে দেখালেন। এবার স্পষ্টই বুঝলাম ইনিই ঘরের মালিক। আমি তাকে বিভিন্ন ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলাম আমি একজন পথিক—ছোট লামা—যাবার পথে এখানে একরাত কাটাতে চাই মাত্র। তিনি বুঝলেন কি না জানি না কিন্তু মনে হল আমার কথায় খুশী হলেন। আমার আটার সাথে তিনি কিছুটা বার্লি ও শুকনো মাংসের টুকরো মিশিয়ে দিলেন, তারপর রান্না হলে আমরা দু'জনে পরম তৃপ্তি সহকারে খেলাম। খাওয়ার পর আমি নদীতে গিয়ে আমার মগটা ধুয়ে আনলাম, কিন্তু তাঁর বাটিটা ধুতে দিলেন না, বাটিটার শেষ কণা পর্যন্ত চেটে খেয়ে তারপর রেখে দিলেন ঝোলার মধ্যে।
রাত ঘনিয়ে এল আগুনের ধারে আমরা চুপচাপ বসে বসে এ ওর দিকে তাকাতে লাগলাম। ঘরের কোন দরজা জানলা নেই, ভেতরে থেকে সাংপোর ওপারের ধূ ধূ করা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম সেই মনোরম দৃশ্য। আমাদের ঠিক নীচেই ব্রহ্মপুত্র তার পূর্ণ সত্তা নিয়ে বয়ে চলেছে। শীতের সময়ে উত্তর প্রদেশের শীতের মতোই এখানকার ঠাণ্ডা। অর্থাৎ তাপমাত্রা সহ্যের সীমা পার হয়নি। কলকাতায় এখন বসন্তের হাওয়া দেখা দিয়েছে, এখানে মনে হয় বসন্ত কথাটার কোনো অর্থ নেই। শীত আর গ্রীষ্ম, শীতের শেষ আর গরমের শেষ এই ভাবেই ঋতুকে বর্ণনা করা হয়। মুখোমুখি এক অজ্ঞাত ব্যক্তি সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে সময় কাটাচ্ছি। প্রথমে ভেবেছিলাম তিনি হয়তো স্থানীয় এক অতি গরীব লোক, তারপর মনে হল এক হতভাগ্য ভিখারী, কিন্তু লোকটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝলাম যে এর মধ্যে একটা সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, বয়স প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক চুপচাপ বসে আগুন পোহাচ্ছিলাম এমন সময় বাইরে আর একজনের ছায়া দেখা দিল। লোকটা ভেতরে ঢুকল, লোকটি আমাকে দেখে একটু আশ্চর্য হয়ে গেলো। আমি তার ভাবটা বুঝতে পেরে, তাকে আমার কাঁচা ও ভাঙ্গা তিব্বতী ভাষায় আমার পরিচয় দিলাম। পূর্ব-পরিচিত ভদ্রলোক এবার তাকে বুঝিয়ে দিলেন আমার বিষয়, আমরা পরিচিত হলাম ।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক আগন্তুককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর কার্যকলাপ দেখে আমি
আশ্চর্য হয়ে গেলাম, তিনি তাঁর ঝুলি থেকে প্রথমেই বার করলেন একটি হাড়। দেখেই বুঝলাম যে এটা মানুষের জানুর হাড়, তারপর বার করলেন একটি মাথার খুলি, এরপর একটি শুকনো ছাগলের চামড়া। এগুলো বার করে পাশে রাখলেন। তারপর তিনি আগন্তুকের সঙ্গে কোন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ শুরু করলেন। কথাবার্তার ধরন ও সরঞ্জাম দেখে মনে হল ইনি হয় কোন তান্ত্রিক অথবা ওঝা বৈ আর কেউ নন ৷ তাঁরা দু'জনে খুব ভালোভাবে ঝুলির জিনিসপত্রগুলো পরীক্ষা করে তারপর সেগুলো আবার ঝুলিতে রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পর দু'জনেই উঠে পড়লেন। আমাকে ইসারায় বলে দিলেন কোন ভয় নেই আমি সেখানে ইচ্ছে করলে শুয়ে পড়তে পারি। আমাকে বিদায় জানিয়ে তাঁরা চলে গেলেন। আমি সারাদিন হাঁটার ফলে অত্যধিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, অন্য কোন বিষয়ে চিন্তা না করে শুয়ে পড়লাম। আমার পাশেই কাঠের আগুন ; উত্তাপে আমার চোখ বুজে এল।
পরের দিন খুব ভোরবেলায় আমার ঘুম ভাঙ্গলো, আমার ঘুমটা খুব ভালোই হয়েছিল। ভোরের শীতে ঘুমটা ভাঙ্গতেই দেখি কম্বলটা কখন গা থেকে পাশে পড়ে গেছে, আগুনও নিভে গেছে, আমি তাড়াতাড়ি উঠে প্রাতঃপ্রণাম ও প্রার্থনা সেরে যাবার জন্য তৈরী হয়ে নিলাম। বাইরে বেরোতেই নজরে পড়ল ওঝার ঝুলি দেয়ালের একটা খুঁটির সাথে ঝুলছে। তাহলে উনি নিশ্চয়ই ফিরে এসেছেন, তাকে বলে যাওয়া দরকার এই ভেবে তাকে খুঁজতে লাগলাম। তাকে খুঁজে পেতে দেরী হল না। একটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে তিনি বসে আছেন। কাছে যেতেই দেখলাম তিনি ধ্যানমগ্ন, চোখ বুজে বসে আছেন। তাঁর সামনে একটা চারকোণাচে ঘর কাটা, অনেকটা বাঘবন্দী খেলার মতো। তাঁর শান্ত ও সৌম্য মুখের দিকে তাকিয়ে সত্যি ভক্তি হয়। তাঁর শতচ্ছিন্ন পোশাকের মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে পরম বুদ্ধ। চারিদিক নিস্তব্ধ, সামনেই মনোরম দৃশ্য-সূর্যোদয়ের এখনও অনেক দেরী। তাঁর দেখাদেখি আমিও ধ্যানে বসলাম। আমার যখন ধ্যান ভাঙ্গলো তখন দূরে পাহাড়ের উপর সূর্যের আলো দেখা দিয়েছে। আমার পাশেই বসে আছেন ওঝা। তিনি আমার দিকে সস্নেহে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—ত্রাপা? আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। তিনি এবার তাঁর বাঁ হাতে ঘণ্টা আর ডান হাতে বজ্র নিয়ে আরতির ভঙ্গিতে তা নাড়িয়ে শব্দ করে তারপর উঠলেন। রাত্রিবেলা আমাদের কোনো কথাবার্তা হয়নি, আমরা কেউই কারুর ঠিক পরিচয় জানি না। কৈলাস আমার লক্ষ্য কাজেই এই ধরনের লোকের কাছ থেকেই আসল পথ নির্দেশ পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। তাই আমি এবার তাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম—
আমি তীর্থযাত্রী গ্যাংটক থেকে আসছি, লাসায় গিয়েছিলাম, এখন যাচ্ছি কৈলাসনাথের দিকে, এই যে নদীটা দেখছেন এরই উৎসে যাবো। আমার অঙ্গভঙ্গি ও বার বার সিকিম দার্জিলিং কথাগুলো মনে হয় কার্যকরী হল। আমি যাবার উদ্যোগ করতেই তিনি আমাকে বাধা দিলেন, বললেন থেকে যেতে, অন্ততঃ তাঁর হাব ভাবে তাই মনে হল। আমার হাতে অফুরন্ত সময় তার উপর এই ওঝা সম্পর্কে জানার বিরাট কৌতূহলটা দমন করতে পারলাম না। আমি তাঁর এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলাম ৷
ভাষা শিক্ষার এই মহা সুযোগ, মনের ভাবকে প্রকাশ করার জন্যই ভাষার সৃষ্টি। তাঁর এখানে থেকে আমি সে কথা বিশেষভাবে অনুভব করলাম। তাঁকে ভদ্রলোক বললে ভুল হবে, সাধুও বলা যায় না, পোশাকে ঠিক তান্ত্রিক নন। তাঁর ব্যবহারে আর সঙ্গের জিনিসপত্র দেখে তাঁকে ওঝা বলেই ধরে নিলাম। আমার ধারণাটা ভুল হলেও হতে পারে। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা খুব কমই হয় কাজেই তাঁকে খুব ভালোভাবে দেখতে লাগলাম।
আমার চোখে প্রথমে ধরা পড়েছে তাঁর ঝুলিটা, মাথার খুলি ও জানুর হাড় দেখে সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় বক্রেশ্বরের তান্ত্রিক সাধুদের। সারারাত তিনি কোথায় ছিলেন জানি না। কিন্তু ভোরবেলা তাকে যখন আবিষ্কার করলাম, তখন তিনি গণ্ডির মধ্যে বসেছিলেন। তিনি যখন বসেন, তখন তাঁর চারদিকে মন্ত্র পড়ে দাগ কেটে দেন, সেই সীমার মধ্যে যাতে দুষ্ট আত্মারা প্রবেশ করতে না পারে। যাযাবর যাদুকরদের মতো তিনি মাঝে মাঝে হাতের ঘণ্টা বাজান আর আকাশের দিকে তাকিয়ে কার সাথে যেন কথা বলেন। তাঁর মুখের অত্যধিক দুর্গন্ধ সত্ত্বেও তাঁর এই অদ্ভূত রকমের চরিত্র আমাকে আকৃষ্ট করল। শুনেছি যে তিব্বতে এখনও খাঁটি তান্ত্রিকদের অভাব নেই। মনে হল এই এক সুবর্ণ সুযোগ । এই ধরনের সুযোগ হয়তো জীবনে দু'বার আসবে না ।
বেলা একটু বাড়তেই আমি ওঝার সাথে নেমে এলাম সাংপো নদীতে সেখানে দু'জনে কাপড় দিয়ে কিছু মাছ ধরলাম। ওঝা বাবাজী নদী থেকে একটা সরু নালা কেটে সেই জলটাকে একটা বিরাট গর্তের মধ্যে এনে ফেলেছেন। মাঝে মাঝে সেই নালা দিয়ে ভুল করে কিছু মাছ চলে আসে এই গর্তের দিকে তারপর তাকে ধরার কোন অসুবিধা নেই। আমি না থাকলে ওঝা বাবাজীকে সেই গর্তের জল ফেলে শুকিয়ে তারপর মাছ ধরতে হত। মাছ বলতে ছোট ছোট মরুলা মাছের মতো। ওঝা বাবাজী এই শিকারে অত্যন্ত খুশী হয়ে ছোট্ট শিশুর মতোই খিল খিল করে হেসে উঠলেন। মনে হল বহুদিন যাবৎ তিনি এই ধরনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ইছাপুরের গঙ্গার জলে যে রকম গামছায় মাছ ধরে আনন্দ পেতাম ঠিক সেই রকমই দুই শিশুর মতো আমরা আনন্দে নেচে উঠলাম। প্রায় এক পোয়ার মতো মাছ ধরা হল। তার পর উঠে এলাম আমাদের ডেরায়। তিনি কি ভাবে মাছ রান্না করেন তা জানবার খুব ইচ্ছা ছিল কিন্তু শেষে নিরাশ হতে হল। তিনি মাছগুলোকে কাঁচাই খেতে শুরু করলেন, সকালবেলা খালি পেটে আমার তা সহ্য হবে না, তাই তাঁকেই বললাম সব খেতে । তিনি কোন রকম দ্বিধা না করে সেগুলো একে-একে খেয়ে ফেললেন একটু নুনও মেশালেন না। অভ্যাসে কি না হয়, কথায় বলে শরীর ঠিক থাকলে লোহাও হজম হয়ে যায়। ইতিমধ্যেই আমাদের আন্তরিকতা গড়ে উঠেছে। বাইরের কেউ দেখলে মনে করবে ওর সাথেই আমি বরাবর থাকি ।
সূর্য দেখেই ওঝা বাবাজী তার সময় নির্ধারণ করেন। সূর্যদেব একটু প্রখর হতেই
বাবাজী তাঁর ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে আমার হাত ধরে বললেন চল। হঠাৎ তাঁর এই ডাকে যাবো কি না ভাববার সময় পেলাম না। তিনি আমাকে প্রায় জোর করেই তাঁর সঙ্গে উঠিয়ে নিলেন ।
আমরা রওনা হলাম দক্ষিণ দিকে, এদিক থেকেই আসলে হিমালয়ের শুরু অর্থাৎ এই পাহাড় ধরে সরাসরি দক্ষিণে গেলেই হিমালয় ডিঙ্গিয়ে পাওয়া যাবে ভারত। মাথার উপর সূর্যের তাপ এ সময় খুবই উপভোগ্য, চলায় এতটুকুও ক্লান্তি নেই। ছোট ছোট গাছগুলোতে এখন সবুজের স্পর্শ লেগেছে, শুকনো ঘাসগুলোর মধ্য থেকে ছোট ছোট নতুন ঘাস দেখা দিয়েছে। চলার মতো কোন পথ নেই শুধু পাথরের এদিক-ওদিক দিয়ে লাফিয়ে ডিঙিয়ে চলা। ওঝা বাবাজীর খালি পা, এ রকম পাহাড়ি রাস্তায় তিনি হেঁটে অভ্যস্ত, তাকে অনুসরণ করছি মাত্র। সাংপোর এদিকের দৃশ্যটা মোটেই সুবিধার নয় পাহাড়ের পাঁচিল মাত্র, উত্তর দিকে বিশাল সমতল ভূমি, দূরে ধূ ধূ করছে পাহাড়। প্রায় দু'তিন ঘণ্টা চলার পর আমরা ছোট একটা পাহাড়ি গ্রাম পেলাম। মাটি ও পাথরের দেয়াল, আর টিনের ছাদ। গ্রামটা পাহাড়ের কোলে যেন ঢাকা ছিল, হঠাৎ নজরে পড়ে ছ'টা বাড়ী। একটা বিরাট মাঠকে কেন্দ্র করে তার চারদিকে এই বাড়ীগুলো গড়ে উঠেছে। দেখেই বোঝা যায় যে এরা গরীব চাষী বা মজুর মাত্র। আশপাশের জমিতে সিঁড়ি কেটে চাষ করা হয়, এখন সবেমাত্র বীজ পড়েছে।
দু’একজন আমাদের গ্রামে ঢুকতে দেখে চারদিকে সেই খবর ছড়িয়ে দিল। আমরা বাড়ীগুলোর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওঝা বাবাজী সেখানে গিয়েই তার ঝুলি থেকে একটা ঠ্যাং-এর হাড় বার করে তা দিয়ে একটা বিরাট গণ্ডী কাটলেন, আমরা তার ভেতরে গিয়ে বসলাম। তিনি এবারে আস্তে আস্তে তাঁর ঝুলি থেকে মাথার খুলি, শুকনো চামড়া, বিভিন্ন ধরনের হাড় বার করে যাদুকরের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে রাখলেন। মনে হল সেগুলোই তাঁর প্রচার ও কাজের সরঞ্জাম। তিনি কি করবেন আমি কিছুই জানি না। তাঁর দাগ দেওয়া গণ্ডীর মধ্যে আমি বন্দী হয়ে বসে রইলাম। আস্তে আস্তে লোকজন জড়ো হতে লাগলো। প্রথমেই এল ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দল, তারপর বুড়ো-বুড়িরা, একদম শেষে যুবক-যুবতী ও ঘরের বৌ-রা। ঘরের বৌ অবশ্য নামেই। তিব্বতে ঘরের বৌ-রাই আসলে মালিক। তাদের মতো এমন কর্মঠ নারী পৃথিবীতে আছে কি না সন্দেহ। ভিড়ের মধ্যে যুবকদের সংখ্যা খুব কম। ভেবেছিলাম যে ওঝা বাবাজী কয়েকটা ভেল্কিবাজি দেখাবেন। কিন্তু না তিনি তার থেকেও বেশী প্রয়োজনীয় ব্যক্তি। ওঝা বাবাজীর কাছে এগিয়ে আসতে লাগল বিভিন্ন ধরনের রুগী। অধিকাংশই ঠাণ্ডা কাশিতে ভুগছে। ওঝা বাবাজী তাদের নাড়ী ও চোখের রঙ দেখে কার কি রোগ হয়েছে বলে দিতে লাগলেন। আর ওষুধ হিসেবে তিনি ঘণ্টা বাজিয়ে বিড় বিড় করে মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন। রুগীর মাথায় হাত দিয়ে তিনি উচ্চস্বরে মন্ত্র পাঠ করেন আর মাঝে মাঝে হাতের ঘণ্টা বাজিয়ে তিনি রুগীর চারদিকে ঘুরতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তিনি রুগীকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন, তারপর দেখা যায় একসময় রুগীর মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ার মতো, তার মানে বুঝতে হবে যে তার রোগ সেরে গেছে। এই ধরনের ছোট-খাটো সাতটা রুগীকে
নিরাময় করার পর এল নতুন ধরনের আর এক রুগী । চার-পাঁচজন মহিলা প্রায় জোর করে ধরাধরি করে এক যুবতীকে ওঝা বাবাজীর সামনে এনে হাজির করল। যুবতীটি উন্মত্তের মতো চীৎকার করতে লাগল । তার ঠিক কি রোগ বুঝতে পারলাম না। মেয়েটিকে দেখেই ওঝা বাবাজী প্রথমে মাথার খুলিটাকে পশ্চিমমুখী করে রেখে আমাকে ডেকে তার পাশে একটা গণ্ডী কেটে বসিয়ে দিলেন। আমার কানে কানে বলে দিলেন—ওম্ মণি পদ্মে হুম্—ওম্ মণি পদ্মে হুম্। তার কথা শুনে আমিও মনে মনে ওম্ মণি পদ্মে হুম্ মন্ত্রটা আওড়াতে লাগলাম। এবার তিনি উঠোনের মাঝখানে তিনটে প্রায় তিনফুট সমান কাঠি তিন কোণা করে পুঁতে দিলেন। সেই কাঠিগুলোর মাথা একসাথে করে বেঁধে দিলেন। মাথার খুলিটাকে তিনি নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দিলেন সেই কাঠিগুলোর মাথায়। তিনি যুবতীটির হাত ও পা বেঁধে পাশে একটি গণ্ডি কেটে তাতে বসিয়ে দিলেন। মেয়েটি আগের মতোই সমানভাবে পাগলের মতো চীৎকার করে চলেছে। দেখেই বোঝা যায় যে মেয়েটি সম্ভবতঃ পাগল ৷ আমি ও আশপাশের জনতা অবাক হয়ে ওঝা বাবাজীর কেরামতি দেখতে লাগলাম। সবশেষে ওঝা বাবাজী তাঁর ঝুলি থেকে বার করলেন শেষ অস্ত্র, একটি জানুর হাড় ৷ আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যে এই অস্ত্রটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে দামী আর শক্তিশালী। তিনি এবার চীৎকার করে মন্ত্রপাঠ আরম্ভ করলেন তার বিন্দু বিসর্গ আমি কিছুই বুঝলাম না । আমার কাছে এবার ঘণ্টাটা দিয়ে বাজাতে বললেন। আমিও কথামত ঘণ্টাটা বাজিয়ে চললাম—তিনি এবার নাটকীয় ভঙ্গীতে আরও চীৎকার করে কোন এক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তাঁর সেই নাচটা সত্যি দেখবার মতো। তাঁর ভঙ্গী আর ক্ষিপ্র গতিতে পা বদলানো দেখার মতো। শরীরের জোর যোগ-ব্যায়ামের কৌশল আর তাল এই তিনের এক সুন্দর মিলন দেখতে পেলাম তাঁর এই নাচের ভেতর। নাচের প্রথম দিকটা আহ্বান ও প্রার্থনার ভঙ্গি আর শেষের দিকটায় ভয়ংকর তাণ্ডব মূর্তি। নাচতে নাচতে তিনি ঘেমে নেয়ে উঠলেন। আমরা সেখানে পৌঁছেছিলাম দুপুর নাগাদ আর এখন প্রায় বিকেল গড়িয়ে পড়েছে। ওঝা বাবাজীর নাচের সাথে সাথে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে আমার হাত ব্যথা হয়ে উঠল—কখন যে এই নাচ শেষ হবে কে জানে। ভিড়ের মধ্যে থেকে এক মহিলা একটা বাটিতে করে কিছু পানীয় নিয়ে এসে ওঝা বাবাজীর সামনে রাখলেন। নাচের মধ্যেই তিনি থেমে গিয়ে সেই বাটিটায় চুমুক দিলেন—তারপর বাকিটা আমাকে খেতে বললেন। তার কথামত আমিও তাতে চুমুক দিলাম। মুখে দিয়েই বুঝলাম যে এটি সুস্বাদু বার্লির বিয়ার। তিব্বতে এর আগেও আমি এই জিনিস খেয়েছি। আজকে এই প্রথম আমার পেটে কিছু পড়ল। আলাদা একটা বাটিতে করে এনে মেয়েটাকে কিছু খাওয়ানো হল। দিনের আলো প্রায় নিভে আসতে লাগল। কিন্তু তবুও ওঝা বাবাজীর নাচ থামল না। তার দ্রুত তালটা এখন ঢিমেতালে এসেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এই যে দুপুর থেকে এই পর্যন্ত দর্শকদের কেউই স্থান ত্যাগ করেনি। সবাই বসে বসে ওঝার কৃতিত্ব দেখতে লাগল । সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে শীত আরম্ভ হল, দর্শকরা বাড়ী থেকে কম্বল নিয়ে আসতে লাগল আর যারা যাই যাই করেও যাচ্ছে না তারা দুই হাঁটুর মধ্যে আস্তে আস্তে মুখ গুঁজতে লাগল। তখনও ঠিক অন্ধকার হয়নি। আমার হাতের অবস্থা কাহিল, ঘণ্টাটা হাত বদল করতে করতে প্রায় অবশ হওয়ার অবস্থা। এমন সময় সকলকে অবাক করে দিয়ে তিন কাঠির উপর রাখা মড়ার মাথার খুলিটা জোর করে দুলে উঠল। মনে হল কেউ যেন সেটাকে নাড়া দিচ্ছে। সে অবস্থা দেখে হঠাৎ আমার হাতের ঘণ্টা থেমে গেল। ওঝা আমাকে এক ধমক দিয়ে সাবধান করিয়ে দিলেন ‘বাজিয়ে যা’। দর্শকদের মধ্যে অনেকেই চীৎকার করে পালাতে শুরু করেছে। মাথার খুলিটা থেকে ওঝার দূরত্ব অনেক, বাতাসের নামমাত্র গন্ধ নেই সেখানে অথচ মাঝে মাঝে থেমে মাথার খুলিটা সমানে দুলে চলেছে। আমি মণি মন্ত্রটা এবারে জোরে জোরে বলতে শুরু করলাম।
চারদিকের অবস্থা দেখে মনে হয় যে, দর্শকরা এই দৃশ্য দেখবার জন্যই দুপুর থেকে বসেছিল। দর্শকরা আগে গোল হয়ে বসেছিল। মাথার খুলিটা নড়ার পর থেকে তারা সবাই একজন আর একজনকে ধরে এক জায়গায় জটলা হয়ে পড়েছে। ভয় ও উৎকণ্ঠা দুইই ফুটে উঠেছে তাদের মুখে-চোখে। একবার খুব দুলে উঠে মাথার খুলিটা এবার মাটিতে পড়ে গেলো, সেই সাথে সাথে রুগ্ন মেয়েটিও একটা ভয়ার্ত চীৎকার দিয়ে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ল। ওঝা এবার মেয়েটির কাছে এসে তার নাকে-কানে ও মুখে ফুঁ দিয়ে আরও কয়েকবার তাঁর মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। তারপর তাঁর পা ও হাতের দড়ি খুলে দিলেন। মেয়েটি এবার মুক্তি পেয়ে উঠে বসল। তারপর মনে হয় তার হুস্ ফিরে এল । সেই অবস্থায় নিজেকে দেখে লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দিল। পাশেই একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা নিজের গায়ের কম্বলটা তার গায়ে চাপিয়ে দিলেন। তারপর একে-একে সবাই বিদায় নিল। ওঝা তার জিনিসপত্র গুটিয়ে নিয়ে আমাকে ইসারায় উঠতে বললেন। ছোট্ট একটা গণ্ডীর মধ্যে প্রায় পাঁচ ছ'ঘণ্টা বসার পর আমি মুক্তি পেলাম । মাথার খুলিটাকে একবার হাতে নিয়ে দেখবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু তার আগেই তিনি সেটাকে ঝুলির মধ্যে রেখে দিয়েছেন।
এই ঘটনাটা স্বচক্ষে না দেখলে আমার পক্ষে বিশ্বাস করা অসম্ভব ছিল। মনের মধ্যে অজস্র প্রশ্ন জেগে উঠেছিল, এটা কি পাগলের চিকিৎসা না দুষ্ট আত্মার চিকিৎসা তার কিছুই বুঝতে পারলাম না, তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে ওঝা বাবাজীর অসাধারণ ক্ষমতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। মেয়েটির অভিভাবক মনে হয় খুবই খুশী হয়েছেন, তাঁরা আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন খাবার জন্য। মাটির মেঝের উপর ঠাণ্ডা বোধ করায় তক্তা পাতা, তারই উপর বিচুলি বিছিয়ে গদি তৈরী দেখলেই বোঝা যায় যে সেটা বৈঠকখানা ঘর। ঘরের ভেতর দিয়ে অন্দরমহলে যাবার জন্য আরও একটি দরজা রয়েছে কিন্তু কোন জানালা নেই। ঘরটা প্রায় অন্ধকার, আধঘণ্টা সেই অন্ধকার ঘরে বসে থাকার পর আমাদের পরিচিত সেই মেয়েটি একটি হ্যারিকেন হাতে নিয়ে এসে সলজ্জভাবে জিভ বার করে সম্মান প্রদর্শন করল—আমরা তাকে আশীর্বাদ করলাম। সম্ভবতঃ মেয়েটির মা আমাদের দু'জনকে দুই বাটি করে গরম বার্লির ঝোল দিয়ে গেলেন। মেয়েটি নিয়ে এল একটা বাটিতে করে শুকনো মাংস। আমরা অতি তৃপ্তিসহকারে তা খেলাম, ওঝার সাথেও কিছুটা বিয়ার খেয়েছিলাম কিন্তু সেটা ছিল খুবই সামান্য ৷
আমাদের খাওয়ার পর হ্যারিকেন ও বাসনপত্র নিয়ে মহিলারা চলে গেলেন, আমরা আবার অন্ধকারেই রইলাম। সেই অন্ধকারে কি করব বা কতক্ষণ বসে থাকতে হবে তার কিছুই আমার জানা নেই। ওই অন্ধকারের মধ্যে বার বার মনে হতে লাগল সেই দোদুল্যমান মড়ার খুলিটা। খুলিটা আমার পাশেই ওঝার ঝুলিতে রয়েছে, একবার মনে হল এটা যদি প্রাণ পেয়ে এখন আমাদের সামনে এসে দুলতে থাকে তাহলে ... তাহলে কি হবে, সেই কথাটা ভাবতেই শরীর যেন শির শির করে উঠল। হঠাৎ কানে এল এক শব্দ, ভালোভাবে সেই শব্দটাকে কান পেতে শুনতে লাগলাম । শব্দটা মনে হয় ঠিক আমার পাশের থেকেই, একটু মন দিয়ে শুনতেই তা পরিষ্কার হল, আসলে ওটা ওঝা বাবাজীর নাক ডাকার শব্দ। ডান দিকে হাত দিয়ে ওঝা বাবাজীর দেহটাকে অনুভব করলাম। তিনি পাশ থেকে বোঝাই করা বিচুলি গায়ের উপর কম্বলের মতো করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বুঝলাম আমাদের এখানেই রাত কাটাতে হবে । অবশ্য তা ছাড়া উপায় কি ? এই রাতের অন্ধকারে চলার উপায় নেই ।
ওঝা বাবাজীর মতো আমিও অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে পেলাম ঘরের কোণে জমানো বিচুলির গাদা—সেখানেই আমি ঢুকে পড়লাম। আমি আগেই জানতাম যে গরীবদের বিচুলিই হচ্ছে লেপতোষক, গদি ও গরম,সস্তায় উত্তম ব্যবস্থা। শরীর যখন সত্যি ক্লান্ত ভূতের ভয়ও তাকে মনে হয় জাগাতে পারে না। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা জানি না। পরের দিন ওঝা বাবাজী আমাকে ডেকে তুললেন। মাথার বিচুলি সরিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি দিনের আলো ফুটে উঠেছে তিনি ঝুলি নিয়ে তৈরী, সঙ্গে সঙ্গে আমি উঠে পড়লাম। বলাই বাহুল্য, রাত্রিবেলা এই তুষারের দেশে বেশ শীত পড়েছিল কিন্তু আমার একদম শীত মনে হয়নি; সকালবেলা চলতে চলতে দাঁত ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে লাগল। আমার কাঁপুনি দেখে বাবাজী একটু হাসলেন তারপর চলতে চলতেই তিনি তাঁর ঝুলির ভেতর থেকে ছোট ছোট কিছু শুকনো পাতা বের করে দিয়ে বললেন চিবুতে থাক, অনেকটা নিসুন্দি পাতার মতো সেই পাতাগুলো চিবোতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই গা গরম হয়ে উঠল। এবার আস্তে আস্তে আমরা পাহাড়ের উপর উঠতে লাগলাম, পাহাড়ের উপর থেকে সাংপো উপত্যকার এক নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে পেলাম, সেখানেই আমরা থামলাম। মাঠের চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম যে এটা একটা শ্মশান, তবে পোড়া কাঠের একটু চিহ্নও নেই—চারদিকে ছড়িয়ে আছে মানুষের হাড়, মাথার খুলি, হাত, পা মেরুদণ্ড ইত্যাদি। তিব্বতের এই অঞ্চলে জ্বালানি কাঠের অভাব তাই এখানকার নিয়ম আলাদা । শবদেহকে এই উঁচু জায়গায় এনে ফেলে দেওয়া হয়, শকুনি, শৃগাল ও কুকুররাই তার সৎকার করে। এই অঞ্চলে বিশেষ শ্রেণীর চণ্ডালও আছে, যাদের কাজ শবদেহগুলোকে পাঁঠার মাংসের মতো কুচি কুচি করে কেটে ফেলা। লোকের বিশ্বাস যে শবদেহকে সরাসরি ফেলে রাখলে, তাতে দুষ্ট আত্মা ভর করতে পারে, কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো বিচ্ছিন্ন করে দিলে তাতে অন্য আত্মার অধিকারের কোন ভয় নেই। ওঝা এখানে এসেছেন হাড়ের সন্ধানে। বিভিন্ন শ্মশানে ঘুরে তিনি কোন কোন সময় কাজের উপযোগী হাড় পেয়ে থাকেন। এ বিষয়ে আমার কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তারাপীঠ ও বক্রেশ্বরের কিছু সাধুদের সাথে আমার জানাশুনা ছিল কিন্তু তাঁদের অস্থি সংগ্রহ অনেকটা আস্তানার আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্যই। ওঝা বাবাজী একটার পর একটা হাড় পরীক্ষা করে দেখতে লাগলেন। কয়েকটা হাড় দেখিয়ে তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন—এটি বয়স্ক ব্যক্তির চোয়াল, এটা বয়স্ক ব্যক্তির নিতম্ব। এই যে হাড়টার ডানদিকের অংশটা দেখছো এটা কুকুরে খেয়েছে, তার মানে খুব নরম, অল্প বয়স্ক কোন মেয়ে হবে। তন্ত্র সাধনার জন্য কঙ্কালের দুটো অংশ খুব প্রয়োজনীয়, প্রথম হচ্ছে মাথার খুলি, দ্বিতীয়ত জানুর হাড়। জানুর হাড়টি যদি কোনো কুমারীর হয় তাহলে তো কথাই নেই। আর সবচেয়ে ভালো হয় সেটা যদি কোন ভারতীয় ব্রাহ্মণ কুমারের হয়। তার কথা শুনে আমি একটু হেসে বুঝিয়ে দিলাম যে আমি মোটেই ব্রাহ্মণ কুমার নই, আমি একটি অতি সাধারণ ত্রাপা মাত্র ৷ মনে হয় তিনি আমার ভয়টা বুঝতে পারলেন—একটু হেসে আশ্বাস দিয়ে বললেন—ভয় নেই ।
সেই শ্মশানভূমিতে অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও কাজের উপযোগী কোন হাড় পাওয়া গেল না। মনে হয় তিনি একটু হতাশই হলেন। আমরা আর একটি পথ ধরে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর গিয়ে আর একটি ছোট গ্রাম পেলাম। ওঝাকে দেখেই গ্রামের সবাই ছুটে এল—অনেকটা তামাসা দেখার জন্য। গ্রামের সবাই ওঝাকে চেনে, তার সাথে ত্রাপাকে দেখে অনেকে একটু কি যেন সন্দেহ করছে বলে মনে হয়। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। পরন্তু ওঝা বাবাজীর সাথে থেকে আমার লাভই হয়েছে । কারণ এই ধরনের ব্যক্তির সাক্ষাৎ একান্তই দুর্লভ, আর ভাগ্যচক্রে যখন যোগাযোগ হয়ে গেছে তখন এ সুযোগ কিছুতেই ছাড়ছি না। সবচেয়ে আনন্দের এই ওঝা বাবাজীকে দেখা অবধি তাঁর প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছি। ঐ নোংরা দেহ, স্যাওলা পড়া দাঁত, জটার মতো চুল, শুকনো নাক, দাগ কাটা কপাল আর দুর্গন্ধ ভরা মুখ সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটা বিরাট ব্যক্তিত্ব। সে কাপালিকই হোক, ভণ্ড বাজীকর অথবা যোগীপুরুষ যেই হোক না কেন তা জানার দরকার নেই। তাঁর মুখের মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি এক মহান আত্মার ছাপ। সেটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। নিঃসন্দেহে তিনি পরোপকারী ।
অন্য গ্রামের মতো এই গ্রামটিও ছোট, তবে এখানে একটা চায়ের দোকান আছে আর রাস্তাটা আরও বড়। চায়ের দোকানে আমরা গিয়ে বসলাম। তাদের মধ্যে খবরাখবর বিনিময় হতে লাগল। গ্রামের পাশেই একপাল ভেড়া শুকনো মাঠের উপর খুঁজে বেড়াচ্ছে উঠতি ঘাসের শিষ।
দু' একজন করে আসতে লাগল রুগী। ওঝা বাবাজী তাদের পরীক্ষা করে উপদেশ দিতে লাগলেন। একটা মাত্র ক্ষেত্রে তিনি মাথার খুলি, মুদ্রা ও ঘণ্টা ব্যবহার করলেন । একটি শিশু মনে হয় জ্বরে ভুগছে। বুঝতে পারলাম যে এই গ্রামে কঠিন রুগী কেউ নেই। সেখানে আমরা দু'বাটি চ্যাং খেয়ে আবার রাস্তা ধরলাম। চ্যাং এর জন্য কোন পয়সা দিতে হল না, ওঝা বাবাজী মন্ত্র পড়ে আশীর্বাদ করেই দোকানদারকে সন্তুষ্ট করলেন।
সেখান থেকে আমরা এবার সরাসরি নদীর পথ ধরলাম। মনে হচ্ছে আমাদের আস্তানার পথ। বিকেলের দিকে আমরা আস্তানায় এসে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছেই দেখি একজন গ্রামবাসী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। কারণটা সঙ্গে সঙ্গে জানা গেল। লোকটি তার পীঠের চাদরটা খুলতেই দেখা দিল একটা ঘা। অনেক দিনের পুরোনো মনে হয় সেটিক হয়ে গেছে। ওঝা বাবাজী ভালোভাবে সেটা পরীক্ষা করে মনে হয় তাকে আশ্বাস দিলেন। এক্ষেত্রে ঠিক কি করতে হবে তা তিনি জানেন কয়েকটা শুকনো কাঠি দিয়ে তিনি পোড়া কাঠ-কয়লার কিছুটা জ্বালালেন। সেগুলো যখন বেশ লাল হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই সময় তিনি রুগীকে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বললেন। কথানুযায়ী লোকটি পীঠের চাদর খুলে শুয়ে পড়ল—ওঝা এবার লাল তপ্ত কাঠ-কয়লার খানিকটা একটা কাঠি দিয়ে তুলে সেই ক্ষতস্থানের উপর রেখে দিলেন। তার ফলটা, ঠিক যে রকম ভেবেছিলাম, আগুনটা পীঠে পড়া মাত্র লোকটি জ্বালায় চীৎকার করে উঠল। তার সেই চীৎকারটা সাংপোর জল ও পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। লোকটি চীৎকার করল বটে কিন্তু এতটুকু নড়াচড়া করল না, কি অদ্ভূত দেহ সংযম। তপ্ত কাঠ-কয়লাটা রেখে ওঝা বাবাজী বারো তেরো বার মণিমন্ত্র জপ করলেন। সেই কাঠকয়লাটাকে ক্ষতস্থান থেকে তুলে ফেলে সেখানে মাটির প্রলেপ দিয়ে দিলেন। মনে হয় তাতে ব্যথার কিছুটা উপশম হল। আধ ঘণ্টা শুয়ে থেকে তারপর সে উঠে পড়ল। খুব সাধারণ দেশী চিকিৎসা কিন্তু দারুন উপযোগী। ক্ষতস্থানের উপর মাটির প্রলেপ নিয়েই সে ফিরে গেল ।
সন্ধ্যের সময় আমরা পশ্চিমদিকে মুখ করে কম্বল জড়িয়ে সন্ধ্যা ও ধ্যান করে আগুন ধরালাম। আমি রুটি তৈরী করতে লাগলাম। আর উনি নিজের মনে গুনগুন করে গান করতে লাগলেন । পরেরদিন ভোরবেলা আমি ওঝা বাবাজীকে প্রণাম করে বিদায় জানালাম। সেখান থেকে মানস সরোবর কতদূর, কতদিনের পথ, রাস্তার নির্দেশ ইত্যাদি বার বার জিজ্ঞেস করেও তাঁর কাছ থেকে সঠিক কোন উত্তর পেলাম না। মনে হয় তাঁকে আমি ঠিক মতো বোঝাতে পারিনি। তবে স্পষ্ট করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে এই নদীর পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে, লাসার মতো বিরাট যে শহরটা পাবে সেটাই সীগাৎসে। সাধারণ তিব্বতীদের কাছে সময়ের কোন মূল্য নেই, সাতদিন বা দশদিন তাদের কাছে প্রায় একই। প্রণাম করে উঠতেই ওঝা বাবাজী আমাকে জড়িয়ে ধরলেন—আনন্দে ও গর্বে তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিব্বতীরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে জিভ বের করেই তাদের প্রণাম বিনিময় করে। সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সাধারণতঃ বড় মন্দির বা সম্ভ্রান্ত লামাদের মধ্যে বিনিময় হয়ে থাকে। কাজেই আমার এই প্রণাম ওঝা বাবাজীর প্রতি অতিরিক্ত সম্মানসূচক হয়ে গেছে। তিনি আমাকে বার বার মাথায় হাত দিয়ে বিভিন্ন রকমের মন্ত্র পড়ে আশীর্বাদ করতে লাগলেন। আমি আমার ঝুলি আর কম্বল নিয়ে পথ ধরলাম।
নদীটা এ অঞ্চলে শান্ত ও গভীর, তার পাশ দিয়ে চললেও এতটুকু শব্দ কানে আসে না। বিরাট একটা শক্তি যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। শুকনো পাথরের সাথে আজকে কিছু কিছু ঘাস ও ছোট ছোট গাছের নমুনা পাচ্ছি। অনেকটা পেয়ারা গাছের মতো, কয়েকটা গাছও নজরে পড়ল, তাতে সবে নতুন পাতা দেখা দিয়েছে। নদীর এই তীরে অর্থাৎ দক্ষিণের দৃশ্যটা পাহাড়ের জন্য আটকা পড়ে গেছে—উত্তরদিকের দৃশ্যটা বেশ ভালো । সকালের দিকে ঠাণ্ডা থাকে তারপর সূর্য উঠার সাথে সাথে আবহাওয়া গরম হয়ে উঠে । নদীর ধার ধরে চলেছি—রাস্তা নয়, এমন কি মানুষ চলার মতোও কোন চিহ্ন মাত্র নেই। কাজেই আমার চলার গতি অত্যন্ত মন্থর। কিছুক্ষণ চলি তারপর থামি আবার চলি, মাঝে মাঝে ঝুলি আর কম্বলটাকে কাঁধ বদল করি মাত্র। দুপুরের দিকে চলতে চলতে হঠাৎ কানে এল হাসির শব্দ। কান সজাগ করে রাখলাম—তারপর আবার কানে এল সেই শব্দ। মনে হয় গ্রামীণ মেয়েরা একসাথে খেলা করছে। দু'পা এগুতেই দেখি আমার অনুমানটা সত্য, প্রায় দশ-বারোজন লোক একসাথে নদীতে স্নান করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন যুবতীও রয়েছে, এই ঠাণ্ডা জলে কোনরকমে কয়েকটা ডুব দেওয়া যেতে পারে কিন্তু সাঁতার কেটে জল ছিটিয়ে খেলা করা মোটেই সম্ভব না । যুবতীদের কোমরে যদিও কাপড়ের পটি কিন্তু বুকটা সম্পূর্ণ খোলা। সাধারণ তিব্বতীদের এর আগেও দেখেছি, অত্যধিক গরমে বা স্নানের সময় যুবতীরা বুক খোলা রাখতে মোটেই দ্বিধা করে না। গ্রামীন তিব্বতীদের এই সহজ ও সরলভাবকে প্রশংসা করতেই হবে। আমাকে তাদের পাশ দিয়ে যেতে দেখে তারা সবাই নমস্কার জানালো । আমিও তাদের যথারীতি হাত তুলে সম্ভাষণ জানিয়ে চলতে লাগলাম। সকাল থেকে ওঝা বাবাজীকে ছাড়ার পর এই প্রথম মানুষের দেখা পেলাম। পথের শ্রান্তি তাতেই বুঝি খানিকটা লাঘব হল
হঠাৎ পেলাম একটা পায়ে চলা পথ ; অনেকক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে চলতে চলতে হঠাৎ যেন পেলাম মাঠ। এই পথটা আমাকে ধরতেই হবে কারণ সামনেই নদীটা বাঁক নিয়েছে, নদী থেকে শুরু হয়েছে বিরাট পাহাড়ের পাঁচিল। ইচ্ছে থাকলেও এগুনোর উপায় নেই। কাজেই সেই পথটা ধরে দক্ষিণ দিকে নামতে লাগলাম। ডানদিকে পাহাড়ের পাঁচিলের জন্য সূর্যালোকও এখানে আসতে পারে না। রাস্তা মানে পাহাড়ের উপর দিয়ে চলতে চলতে পায়ের চাপে যে পথ হয়েছে। পাহাড়ের পাঁচিলটা পেরুতেই নজরে পড়ল কয়েকটি বাড়ী। চাষের উপযোগী কিছুটা জমি, দুটো গাধা, কয়েকটা মুরগী আমাকে দেখেই যেন অবাক হয়ে গেল। ভাবটা “তুমি কোথাকার লোক হে” এই ধরনের।
আমি নদীটাকে নিশানা রেখে এগিয়ে চলেছি। পাহাড়টা ডিঙ্গিয়ে আবার ডানদিকে এসে নদীর ধার ধরতে হবে। সাংপোই আমার একমাত্র পথ নির্দেশ। চলতে চলতে হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি এরই মধ্যে কয়েকটি শিশু আমার পিছন পিছন নিঃশব্দে এগিয়ে এসেছে। তাদের দিকে তাকাতেই তারা থমকে দাঁড়ালো। আমিও দাঁড়ালাম । একটু বিশ্রাম নিতে হবে। রাস্তার উপরই কম্বল ও ঝুলিটাকে রেখে বসে পড়লাম। দেখতে দেখতে আমার চারদিকে ভিড় জমতে শুরু হয়েছে। আমার পেছনের শিশুদের উপেক্ষা করে আমি কিছু শুকনো ঘাস পাতা কুড়িয়ে একটু আগুন ধরাবার চেষ্টা করতে লাগলাম। এক ভদ্রলোক এমন সময় আমার দিকে এগিয়ে এলেন—তিনি আমাকে ওখানে আগুন ধরাতে নিষেধ করলেন—তারপর হাসিমুখে তাঁর সাথে যাবার জন্য বললেন। আমি বিনা দ্বিধায় তাঁকে অনুসরণ করলাম। বাড়ীর উঠোনে আসতেই আরও দু'একজন আমার চারিদিকে এসে হাজির হল। তিনি চলে গেলেন বাড়ীর ভিতরে। কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক ফিরে এলেন তাঁর হাতে কয়েকটা ছাতুর বড় বড় লাড্ডু, হাসিমুখে তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমি পরমানন্দে সেই লাড্ডু খেতে লাগলাম । সকলে আনন্দ সহকারে আমার খাওয়া দেখতে লাগলো। লাড্ডুটা যবের আর তার সাথে মনে হয় সামান্য গুড় মেশানো। আমার খাওয়ার শেষে ভদ্রলোক আরও পাঁচটি লাড্ডু আমার হাতে গুঁজে দিলেন। আমি দু'তিনবার না না করেও শেষে নিতে বাধ্য হলাম। রাস্তার জন্য আরও একদিনের খোরাক মজুত হয়ে গেল।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে এবারে তাঁদের উদ্দেশ্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানালাম, তারপর আবার পথ ধরলাম। তিব্বতে চলার একটা সুবিধা হচ্ছে এখানে মূল পথ ধরবার জন্য কোন অসুবিধা নেই। গ্রাম থেকে বেরোবার জন্য সাধারণতঃ একটা মাত্রই পথ, আর তিন বা চৌরাস্তার কোন সমস্যাই নেই, সেগুলো একমাত্র বড় বড় শহরের সমস্যা। পাহাড়টাকে ডানদিকে রেখে আমি প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি আবার পেলাম সাংপোর উপত্যকা ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন