বিমল দে
চৌরাস্তার চায়ের দোকানটা পার হতেই দু'তিনজন লোক আমার দিকে ছুটে এল—আমি অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকালাম। প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে তারা আমাকে বলল যে গুরুজী আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। গুরু! মনে মনেই বার বার উচ্চারণ করলাম—কোন গুরু ? তিব্বতে লামা মাত্রেই আমার গুরু। আর এই কৈলাস খণ্ডে যাঁর দর্শনকে আমি ভগবৎ দর্শন বলে মনে করছি তিনিই হচ্ছেন কৈলাসবাবা—তাহলে কি তিনিই লাংবোনা গুম্ফা ছেড়ে এতদূর এসেছেন আমার জন্য! মনের প্রশ্ন মনেই রেখে আমি তাদের অনুসরণ করলাম। চৌ-মাথার পর একটু এগিয়ে চায়ের দোকানের পাশের একটা বাড়ীতে ঢুকতেই সামনে দর্শন পেলাম কৈলাসবাবার। তিনি আমাকে দেখেই বললেন-এস বস, আমি জানি দিরাফুক্ গুম্ফায় তুমি একরাতের বেশী থাকবে না। আমি তাঁকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালাম তারপর মনে মনে বললাম—আপনি তো অন্তর্যামী নয়তো এখানে এত তাড়াতাড়ি আপনার দর্শন পেলাম কি করে ? তিব্বতী লোক দু'জন বাবাকে প্রণাম করে আবার ফিরে গেল। বাবা এ অঞ্চলের প্রায় সবাইকে মনে হয় আমার এ রাস্তা দিয়ে যাবার কথা বলে রেখেছিলেন। পারখায় এলে তিনি এ বাড়ীতেই থাকেন। বাড়ীর মালিক ও তার সহধর্মিণী মনে হয় বাবার ভক্তশিষ্য। বাবা বললেন যে পারখা গ্রামটা এ অঞ্চলের খুবই উল্লেখযোগ্য স্থান। এখানকার তাসাম থোকচেনের থেকেও বিখ্যাত। কৈলাস মানসের সব তীর্থযাত্রীরাই এখানে আসেন তাদের বাজার হাট করতে। এখানকার যিনি শাসনকর্তা তিনি নিজেও ধার্মিক। পারখা গ্রামের সংলগ্নই রাক্ষসতাল বা লাংগাক ৎসো। বাবার কাছ থেকেই শুনতে পেলাম রাক্ষসতালের মাহাত্ম্য। রাক্ষসতাল ও মানস সরোবর দুটো যমজ সরোবর, একটা থেকে আর একটাকে পৃথক করা যায় না। কথিত আছে যে, রাবণ এই হ্রদের ধারেই শ্রীদেবীর তপস্যা করেছিলেন। রাক্ষসতাল থেকে মানসের দূরত্ব মাত্র মাইলখানেক । এই রাক্ষসতাল থেকেই শুরু হয়েছে বিখ্যাত সাতলেজ নদী। ধার্মিক তিব্বতীরা শীতের সময় রাক্ষসতাল ও মানস সরোবর একই সাথে প্রদক্ষিণ করেন। অনেকের মতে এই রাক্ষসতালেই লুকিয়ে আছে কুবেরের ভাণ্ডার, তাই এই দুই সরোবরের মাঝখানের অংশে এখনও ধূলোর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণভস্ম। এখানকার বালিতে পাওয়া যায় সোনা । তিব্বতীদের কাছে এই স্থানটা কুবেরের স্থান। এখানকার এই স্বর্ণভস্ম তুলে নেয়া মহাপাপ। তিব্বতীরা কোনদিন তাতে হাত লাগায়নি। মহামান্য দালাই লামাকে একবার স্থানীয় লোকেরা এখানকার একটি বিরাট সোনার পাথর উপহার দিয়েছিলেন কিন্তু মহামান্য দালাই লামা তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন যে এ স্বর্গীয় সম্পদে মানুষের অধিকার নেই। তারপর সেই সোনার পাথরটাকে রাক্ষসতালে ফিরিয়ে এনে মাটির নীচে রাখা হয়। আমাদের মনের দুই ভাব, একটি দেবভাব আর একটি অসুরভাব। একটি হ্যাঁ আর একটি না বাচক—এই দুই শক্তির টানাটানিতে মানুষের চিত্তবৃত্তি নিরোধ অসম্ভব হয়ে উঠে। সেইসময় তপস্যা করতে হয় কৈলাস অধিপতির। তাঁর কৃপায় এবং আশীর্বাদে অসুরশক্তি অস্তমিত হয়ে দেবশক্তির উদয় হয়। এই দেবশক্তিবলেই মানুষ অমৃত লাভ করে।
পরের দিন খুব ভোরবেলা উঠে আমরা রাক্ষসতালের কাছে এসে দাড়ালাম । ভোরবেলা শান্ত হ্রদের উপর কয়েকটি রাজহাঁস চরে বেড়াচ্ছে। দূরে গুরলা মান্ধাতার উপর সবেমাত্র ভোরের রঙ দেখা দিয়েছে। নদীর ধারে কয়েকটি ছেলে ঢেউয়ে ভেসে আসা মরা মাছ কুড়োচ্ছে। রাক্ষসতাল আর মানসের মধ্যে দৃশ্যত কোন পার্থক্য নেই ঢেউ, রাজহাস আর জলের রঙ একই।
লা চু ও ঝোং চু নামে যে দুই নদী কৈলাসকে প্রায় পরিক্রমা করেছে তারা একসাথে মিলিত হয়ে এই রাক্ষসতালে এসে পড়েছে। সঙ্গমের ধারেই একটা ছোট্ট কাঠের ঘর । সেই ঘরের পাশেই আশপাশের পাথর কুড়িয়ে একটা চোরতেন তৈরী করা হয়েছে। আমরা কাঠের ঘরে এসে প্রবেশ করলাম। ঘরটার দারজাটা খোলাই ছিল, ভেতরে ঢুকেই দেখি সেখানে ইতিমধ্যে আরও পাঁচজন লোক বসে আছেন। তাদের মাঝখানে একটা কড়াইতে কাঠের আগুন। আমরাও তাদের সাথে আগুনের চারপাশে গিয়ে বসলাম। বাবা তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন—দু’বাটি চ্যাং তৈরী কর। তাঁর কথা শোনা মাত্র একজন উঠে গিয়ে সরোবর থেকে জল এনে উনোনে চড়ালো। বাবা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে এই সরোবরের ধারে একরকম শেওলা জাতীয় ঘাস পাওয়া যায়। এরা প্রত্যেকদিন ভোরবেলা এসে সেই ঘাস সংগ্রহ করে সেগুলোকে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে। এর থেকে সুন্দর রুটি হয় তা খেতে খুব ভালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চ্যাং পেলাম। চ্যাং খেয়ে আমরা গা গরম করে সেখানে বেশ যুতসই করে বসলাম। আমার কম্বল আর ঝুলিটা সঙ্গে সঙ্গেই থাকে কাজেই সেটাকে পেতেই তার উপর দু'জনে মুখোমুখি বসলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন— -তোর বাবা-মা তো নেই বললি তাদের নাম মনে আছে কি ?
—নিশ্চয়ই !
–ঠাকুর্দার নাম মনে আছে কি ?
-আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি জবাব দিলাম ।
ঠিক আছে তাতেই হবে। এই বলে বাবা পদ্মাসনে বসলেন তারপর আমাকে বললেন—চোখ বুজে কৈলাস শিখরকে কল্পনা করতে। আমি তাঁর কথামতো কাজ করলাম ।
অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন—এইবার আমি যা বলছি তুই তা উচ্চারণ কর। তাঁর কথামতো আমি শুরু করলাম—
ওঁ পরমশি সুষুম্নাপথেন মূলঙ্গাটমুল্লাসোল্লস জ্বল প্রজ্জ্বল প্রজ্জ্বল হংসঃ সোহহং স্বাহা। ওঁ আত্মতত্ত্বায় স্বাহা, ওঁ বিদ্যাতত্ত্বায় স্বাহা, ওঁ শিবতত্ত্বায় স্বাহা ওঁ দেবাংস্তপয়ামি, ও ঋষিংস্তপয়ামি, ওঁ পিতৃংস্তপয়ামি । ওঁ মনুষ্যাংস্তপয়ামি, ও গুরুং স্তপয়ামি ...
আমি সেই মন্ত্রগুলোর কোন রকম ব্যাখ্যা বা তাৎপর্য না বুঝেই বাবার কথানুযায়ী তোতাপাখীর মতো বলে গেলাম। ঘরের সেই কাঠের উত্তাপে আর বাবার উদাত্ত কণ্ঠস্বরে সেখানে এক পবিত্রভাব ও আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমরা বাইরে এলাম, ইতিমধ্যে সূর্যোদয় হয়েছে। রাক্ষসতালের তীরে কুচো পাথরের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবা বললেন-লামা ধর্মটা হচ্ছে বুদ্ধ তন্ত্র ; বুদ্ধদেবের বাণী আর তন্ত্রের সাধনা এই দুটোর সংমিশ্রণে হয়েছে লামা ধর্ম। বুদ্ধ বাণীর মূল কথা হচ্ছে শূন্য, এরা শূন্যবাদী আর আমরা হচ্ছি পূর্ণবাদী। পরমব্রহ্ম তো শূন্য নন তিনি পূর্ণ তাইতো আমরা বার বার বলি-
“ওঁম্ পূর্ণমাদাঃ পূর্ণমিদম্ পূর্ণৎ পূর্ণমুদচ্ছতে
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেব অবসিস্যতে।”
কৈলাসাধিপতি দেম্চোক, ধরমপাল আর পাবো তাকে লামারা যে নামেই ডাকুক না কেন তিনি আমাদের সেই আত্মভোলা শিবই। তার পরনে বাঘের চামড়া একহাতে ডমরু আর একহাতে ত্রিশূল। ডমরু বজ্রজ্ঞানের প্রতীক আর ত্রিশূল সংহারের প্রতীক।
কৈলাস শিখরের আশপাশের অন্যান্য পর্বতশিখরে থাকেন অজস্র দেব-দেবী। ভগবান বুদ্ধ তাঁর পাঁচশ ভক্ত শিষ্য নিয়েও এই পাহাড়েই বাস করেন। কৈলাসশিখরে হরপার্বতী লিঙ্গাবস্থায় আছেন—এই লিঙ্গাবস্থাই জগৎ সৃষ্টির মূল রহস্য। হরপার্বতী, যবযুং বা শিব ও শক্তি যে নামেই তাকে অভিহিত করা হোক না কেন আসলে তিনি একই।
কৈলাসের এই পুণ্যভূমিতে হিন্দুদের মূলমন্ত্র হচ্ছে ওম্ নমঃ শিবায়—এই মন্ত্ৰেই উদ্ধার পাওয়া সম্ভব। কৈলাস পর্বতের আর এক নাম মেরু-পর্বত। কৈলাস পর্বতই জগতের মেরুদণ্ড। এখানকার পবিত্র বায়ুই সমস্ত পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছে। এখানকার আধ্যাত্মিক শক্তিই পৃথিবীর যাবতীয় পাপাচরণ খণ্ডন করে পৃথিবীকে প্রলয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে। পৃথিবীর সমুদয় পাপের বোঝাকে এখানকার পুণ্যশক্তি দিয়ে ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে পবিত্রতায় পরিণত করা হচ্ছে। এই মেরু পর্বতই রক্ষা করছে পৃথিবীর ভারসাম্য। কৈলাসনাথের পবিত্রতা, রাক্ষসতালের শক্তি আর মানসতীর্থের শান্তভাব এই তিনের সংমিশ্রণে তৈরী হয়েছে এখানকার জলবায়ু আর আবহাওয়া। এখানে যে সব তীর্থযাত্রীরা আসেন তাঁরা বহন করে নিয়ে যান এখানকার দৈবাশীৰ্বাদ ।
এই অঞ্চলের নদীগুলো মর্ত্যবাসীদের জন্য বয়ে নিয়ে যাচ্ছে শ্রীকৈলাসনাথের চরণামৃত। চার দিকের চার প্রধান নদী, যেমন কৈলাসনাথের পূর্বদিকে অশ্বমুখ বা তাম্চোগ্ খাম্বাব থেকে শুরু হয়েছে ব্রহ্মপুত্র; পশ্চিমদিকের হস্তীমুখ বা লাংচেন খাম্বাব থেকে শুরু হয়েছে সাতলেজ ; উত্তরে সিংহমুখ বা সেংগে খাম্বাব থেকে শুরু হয়েছে সিন্ধু ; আর দক্ষিণে ময়ূরমুখ বা মাগ্চা খাম্বাব থেকে শুরু হয়েছে কারনালি । এই চারটি নদীই পৃথিবীর অন্যতম পুণ্যবতী নদী। এর জলে স্নান করলে তর্পণ বিনাই মুক্তি লাভ হয় ৷ এরাই তো ধ্যানী-বুদ্ধের চার বাহন
আমরা হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গাচু নামে একটা নদীর সংগমে এসে থামলাম। এই গঙ্গানদীর সাথে ভারতের গঙ্গানদীর কোন মিলই নেই। গঙ্গাচু রাক্ষস সরোবর ও মানস সরোবরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে। মানস সরোবরের জল বেশী হয়ে গেলে এই গঙ্গাচু'র মাধ্যমেই তা এসে পড়ে রাক্ষস সরোবরে ।
গঙ্গাচু'র ধারে এসে আমরা দাঁড়ালাম। বাবা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—জামা কাপড় সব খুলে নেমে পড় জলে, আমি অবাক হলাম মনে মনে ভাবলাম এই ঠাণ্ডা জলে যদি ডুব দিই তবে আর উঠতে হবে না। এই কথাটা মনে হতেই নিজেকে সাবধান করে দিলাম—সাক্ষাৎ শিবতুল্য বাবা সামনে থাকতে ভয় কিসের? শুধু তাই নয় তিনিই আমাকে বলছেন জলে নামতে, তাঁর কথায় কোন রকম সংশয় আনাই পাপ। আমি তাঁর কথামতো এক-এক করে চাদর জামা খুলতে আরম্ভ করলাম। বাবা আমাকে অবাক করে দিয়ে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই জলে—ঠাণ্ডা তো দূরের কথা মনে হয় তিনি গরম জলে পরমানন্দে স্নান করছেন। তাঁকে দেখে আমার ভরসা হল আমিও এক-পা দু’-পা করে জলে নেমে পড়লাম। আশ্চর্য বটে ঠাণ্ডা তো নয়ই বরঞ্চ গরমই বলব। জলটা বেশ গরম। আমার চারদিকে সাদা বরফের রাজত্ব আর তারই মধ্যে গঙ্গাচু'র এই জায়গাটায় বইছে গরম জল। পথশ্রান্ত ও ক্লান্ত তীর্থযাত্রীদের জন্য এটা দৈব ব্যবস্থা। মহানন্দে আমি বার বার ডুব দিতে লাগলাম। আমার আনন্দোচ্ছ্বাস তখন আর দেখে কে? বাবার কাছে শুনলাম যে কৈলাসখণ্ডের এই পুণ্যস্নানে নাস্তিকের মনেও ভগবৎভাব দেখা দেয় ৷
এই স্থানটা আসলে একটি কুণ্ড, এই কুণ্ডটা বহু প্রাচীনকাল থেকেই তীর্থযাত্রীদের জন্য সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেছেন। গঙ্গাচু ধীরে ধীরে তার প্রস্থ বাড়িয়ে কুণ্ডটাকে প্রায় গ্রাস করেছে, কুণ্ডর জল অত্যধিক গরম গঙ্গাচু'র জল মিশে তা গায়ে সহ্য করার মতো তাপে ফিরিয়ে এনেছে। অনেকক্ষণ আমরা স্নান করে গঙ্গাচু'র অন্যদিকে উঠে এলাম, অর্থাৎ আরও দক্ষিণে। বাবা তাঁর ভিজে কৌপীনটাই পড়ে রইলেন। আমার ব্যাগের মধ্যে তিনি একটা কাগজে মুড়ে কিছু ভস্ম রেখে দিয়েছিলেন, সেটাকে নিয়ে তিনি সর্বাঙ্গে ভালো করে মেখে নিলেন ।
আমরা এবার মানস ও রাক্ষস সরোবরের ঠিক মাঝখান দিয়ে দক্ষিণদিকে নামতে লাগলাম। চলতে চলতে তাঁকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলাম—আপনার কথামতো আমি মন্ত্রপাঠ করলাম বটে কিন্তু তার বিন্দু বিসর্গ কিছুই বুঝলাম না। তিনি তাঁর জিভ দুটাকে একটু সামলে নিয়ে বললেন—তোকে নবজীবন দিলাম—প্রথমে প্রায়শ্চিত্ত তারপর মন্ত্র আর শেষে তর্পণ, কৈলাসে আসা তোর সার্থক হল ।
বাবার কথাতে আমি কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করলাম। একেই বলে গুরু কৃপা, আমি কিছুই চাইনি—আমার কর্তব্য-অকর্তব্য কিছুই জানা নেই, বিনা প্রস্তুতিতে আমি এসে
পড়েছি। মানস সরোবর ও কৈলাসে এসে কি করতে হয় লোকে কি করে তার কিছুই আমার জানা ছিল না। স্বয়ং শিব নেমে এসেছেন কৈলাস বাবার রূপ ধরে, তিনিই অসীম করুণা আর কৃপা করে আমাকে অধর্মের থেকে হাত ধরে ধর্মের পথে টেনে তুলছেন।
কৈলাসবাবাকে যত দেখছি ততই অন্তর ভক্তিভরে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল। আমি দীন ভিখিরী, হাতে নেই কড়ি, আমি ত্রাবা, জানি না মন্ত্র, অন্তরে নেই প্রার্থনা। এই মহাপুরুষকে দেবার মত কোন কিছুই আমার নেই—হৃদয়ের ভক্তি উজার করে যে দেবো সে ভক্তিই বা কোথায়? তাই বার বার মনে হচ্ছে যে তিনি সাক্ষাৎ পরম ব্রহ্ম জগৎ পিতা, সন্তানের চাহিদা তিনি জানেন—না চাইতেই তিনি দান করেন, চিরজীবন আমি তাঁকেই স্মরণ করে বেঁচে থাকবো সেটাই হবে আমার ভবিষ্যৎ জীবনের পাথেয়।
চলতে চলতে তিনি বললেন—ঐ যে দূরে দেখছিস বরফে ঢাকা পাহাড় তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে উঁচু সেটার নাম মেমোনানি তারই ডানদিকে আরও দু'টো উঁচু পাহাড়, ঠিক তার সামনেই আর একটা ছোট পাহাড়। আমি তাঁর কথামতো সেদিকে ভালো ভাবে লক্ষ্য করে দেখতে লাগলাম ।
তারপর তিনি আবার শুরু করলেন--সেই পাহাড়ের পাশ দিয়েই রাস্তাটা এগিয়ে গিয়েছে সরাসরি ভারতের দিকে। এর এক নাম গুরলা মান্ধাতা, এবার আমাদের সামনের যে পাহাড়টা দেখছিস এটা গুরলা পাহাড়, মেমোনানির এই পাহাড়ের উপর দিয়ে যেতে হবে সেটাই ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের প্রধান পথ। তুই যে পথে এসেছিস সে পথে কোন ভারতীয় আসে না। আর ভয় নেই এখান থেকে ফেরার পথ খুব সোজা। কৈলাসবাবা তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমাকে বললেন—এবার কতগুলো নাম বলছি মুখস্ত করে রাখ। তার কথা শুনে আমি তাড়াতাড়ি কাগজ পেন্সিল বার করতে যাচ্ছি। তিনি আমাকে বাধা দিলেন—-কাগজে নয় মনে, কাগজে যা লিখবে তা তো বেশীদিন থাকে না মনের লেখাই তো আসল। আমি নিরস্ত হলাম। আমি যা বলছি বার বার মনে মনে বল তাহলেই মুখস্ত হয়ে যাবে—তালাকোট্ লিপুলেক্ ধরচুলা আলমোড়া—আমি তাঁর কথামতো বার বার আবৃত্তি করতে লাগলাম—তালাকোট্ লিপুলেক্ ধরচুলা আলমোড়া, তালাকোট্ লিপুলেক্ ধরচুলা আলমোড়া
আমরা সরাসরি একটা পাহাড়ের নীচে এসে দাঁড়ালাম। এই পাহাড়টা অনেকটা গম্বুজের মত দুই সরোবরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ডান দিকে রেখে আমরা এবার ধরলাম মানস সরোবরের তীর। সূর্য যখন মাথার উপর ঠিক সেই সময় আমরা এসে পৌঁছলাম মানস তীর্থের গোসুল গুম্ফায় ।
গুম্ফাতে ঢুকবার সময় বাবা বললেন— আজকে এখানেই থাকবি তারপর কালকে গুরলা লা'র পথ ধরে ফিরে যাবি। হিন্দুস্থানে ফিরে যাবার কথা শুনেই আমার বুকটা ধুকধুক করে উঠল—তিনি হঠাৎ যেন একটা শোক সংবাদ ঘোষণা করলেন।
প্রত্যাবর্তনঃ গোসুল গুম্ফায় পদার্পণ মাত্রেই সেখানে যেন বাবাকে নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেলো, একজন বিরাট একটা কম্বলের জামা তাঁকে পরিয়ে দিলেন, আর একজন তাঁকে বসবার জন্য একটা ভারী আসন পেতে দিলেন। যেন একজন মহান জ্ঞানীগুরু সেখানে এসে উঠেছেন। বলাই বাহুল্য যে বাবার সাথে থাকায় আমার ভাগ্যে ও আতিথেয়তা জুটে গেল। বাবা আসনে বসেই আরম্ভ করলেন মন্ত্রপাঠ -
হরি ওম্ তৎসৎ, হরি ওম্ তৎসৎ, হরি ওম্ তৎসৎ ৷
অউম্ সর্বসমোহিন্যে বিদ্মহে বিশ্বজনন্যৈ ধীমহি। তন্নঃ শক্তিঃ প্রচোদয়াৎ ॥
অউম্ ভগবত্যৈ চ বিদ্মহে মহেশ্বরৈ চ ধীমহি।
তন্নঃ অন্নপূর্ণা প্রচোদয়াৎ ৷
অউম্ বেদাত্মনে বিদ্মহে হিরণ্যগর্ভায় ধীমহি।
তন্নো ব্রহ্মা প্রচোদয়াৎ ৷
অউম্ নারায়ণায় বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি।
তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ
অউম্ তৎপুরুষায় বিদ্মহে সহস্রাকার মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ॥*
তারপর সকলে মিলে চারদিকে বসে ধ্যানমগ্ন হলেন। অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভঙ্গ হল, ওষ্কার ধ্বনির মাধ্যমে। বাবা নিজেই প্রথমে শুরু করলেন ওষ্কার ধ্বনি। সেই মুহূর্তে মনে হল কৈলাস শিখর থেকে একটা শব্দ আস্তে আস্তে রূপ নিল সেই রূপ যেন জ্যোতিতে পূর্ণ আর সেই জ্যোতির চারদিকে সহস্র ছোট ছোট আগুনের শিখা মুহুর্মুহুঃ জন্ম নিচ্ছে। সেই অনুভূতিতে আমরা সবাই আনন্দলোকে বিচরণ করতে লাগলাম ।
ধ্যানভঙ্গের পর বাবার সাথে সকলে চলে এলাম সরোবরের ধারে সেখানে কোন রকম কথাবার্তা হল না নিঃশব্দে সবাই পায়চারী করতে লাগলাম। অনেকক্ষণ পর আমরা গুম্ফায় এসে খেতে বসলাম। আলু সেদ্ধ পাহাড়ী কফি সেদ্ধ আর তার সাথে নুনের মতো আটা ছড়ানো। বাবা ও এই গুম্ফার কেউ নুন খান না। খাওয়ার পর আবার মৌনাবস্থা ৷
গোসুল পৌঁছনোর পর থেকেই বাবার বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আমার সেই মনখোলা আপনজনটি যেন হঠাৎ দূরে সরে গেছেন। যিনি আমাকে মানস সরোবর ও কৈলাসের কাহানী বলতেন, যিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আমাকে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত ও তর্পণ করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। বাবা যখন চোখ বুজে থাকেন তখন তিনি ধ্যানমগ্ন আর যখন চোখ খোলেন তিনি মন্ত্র অথবা নামগান করেন। রাত্রিবেলা আমার থাকার বন্দোবস্ত হল অন্যান্য লামাদের সাথে। অন্যান্য লামাদের
এই মন্ত্রগুলো পরে পূজ্যপাদ পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীগোপীনাথ কবিরাজ মহাশয়ের কাছ থেকে শুদ্ধ করে লিখে নিয়েছিলাম। সাথে এই গুম্ফার লামাদেরও বিরাট পার্থক্য নজরে পড়ল। লামা হলেও মণি মন্ত্রের সাথে এঁরা বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেন। মনে হয় এর মূলে আছে কৈলাস বাবার প্রভাব। এখানেও সকলে একবেলাই খান। সন্ধ্যার পরই আমরা যে যার বিছানায় চলে গেলাম । বিছানায় বসে-বসেই চলল নাম জপ। বাবার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই আমি মণি মন্ত্রের বদলে গ্রহণ করেছি শিব মন্ত্র। মণি মন্ত্রটাকে আমি আমার মনের সাথে যুক্ত করে নিয়েছিলাম, কিন্তু শিব মন্ত্রটাকে মনে হচ্ছে আমার হৃদয়ের সাথে যুক্ত। মাসখানেক যাবৎ তিব্বতী তাংখা, মণ্ডলা আর মহান্ ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনবরত শুনছি বিভিন্ন মন্ত্র তার উচ্চারণ ও ধ্বনি, সেগুলো বুঝবার জন্য আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে রেখেছি কিন্তু তা সত্ত্বেও ঠিক হৃদয়ঙ্গম করতে পারছি না। প্রস্তুতির অভাবে এগুবার চেষ্টা করেও থেমে যেতে বাধ্য হয়েছি। অথচ বাবার ক্ষেত্রে অন্যরকম—তিনি আমাকে কয়েকবার মাত্র বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—কিভাবে মূলশক্তি শিবশক্তির সাথে এসে মিলিত হয়। তাঁর সেই উপদেশটা শোনামাত্রই মনের ঘর পেরিয়ে সরাসরি সে গিয়ে পৌঁছেছে হৃদয়ে। বাবার কথাগুলো সত্যি অমৃত। তিনি বলেছেন মন দিয়ে আমরা বুঝি আর হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। জলকে দেখা আর জানা আর তা পান করা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস !
বিছানার উপর সহজাসনে বসে আমি বাবাকে স্মরণ করে তাঁরই উপদেশানুযায়ী মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলাম — মূলাধারের লং; স্বধিষ্ঠানের বং; মণিপুরের রং; অনাহতের যং; বিশুদ্ধের হং ; আজ্ঞার ওম্; সহস্রার বিন্দু ; আর শেষে মনটাকে স্থির করবার চেষ্টা করলাম মহাশিবের শ্রীপাদপদ্মে
গুম্ফার লামাদের মধ্যে রিদ্যাং লামাই সর্বাপেক্ষা পূজনীয় তাঁরই তত্ত্বাবধানে গুম্ফার সকলে কাজ করে। গোসুল গুম্ফার লামারা সব সময় এখানে থাকেন না। শীতের দিনে তাঁরা চলে যান দক্ষিণের বড় গুম্ফায়। মাসখানেক হল লামারা সবাই এসেছেন। তপস্যা ও পুণ্যার্জনের জন্য। ভারতবর্ষ থেকে সাধুরা এসে সাধারণতঃ এই গুম্ফায়ই থাকেন । এখান থেকেই তাঁরা কৈলাস পরিক্রমার মন্ত্র শুরু করেন। আর শত বাধা সত্ত্বেও যাঁরা মানস সরোবর পরিক্রমা করেন তাঁদেরও শুরু এখানেই। গোসুল গুম্ফার কাছেই মানস ও রাক্ষস সরোবরের দূরত্ব সবচেয়ে নিকটবর্তী। রিদ্যাং লামাই তীর্থযাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ ও উৎসাহ দিয়ে থাকেন। গুম্ফার অনতিদূরেই আছে যাযাবরদের অঁবু সেই তাঁবুটাই এখানকার মুদীখানার দোকান। রাক্ষসতাল সরোবরটি যদিও খুব কাছে কিন্তু তীর্থযাত্রীদের মানস সরোবরই মূল কেন্দ্র। ধার্মিক লামা ও যোগীপুরুষদের কাছে দুই সরোবর আর কৈলাস এই তিনটিরই সমান প্রয়োজনীয়তা।
রাতের ঘুমটা ভালোই হয়েছিল কিন্তু ভোররাত থেকেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেছে । সকলেই খক্ খক্ করে কাশছেন——সকলেই ঠাণ্ডায় ভুগছেন—সে শব্দকে উপেক্ষা করে ঘুমানো অসম্ভব। মাঝখানে বিরাট লোহার কড়াইয়ের আগুনটা প্রায় নিভে আসছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাঘর থেকে কিছু কাঠকয়লা এনে তাতে দিলাম, তারপর জুতো সোয়েটার কম্বল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। ভোরের তারা তখনও জ্বল জ্বল করছে—পূর্বাকাশে সামান্য আলোর আভাস দিয়েছে মাত্র। আমি হাঁটতে হাঁটতে সরোবরের দক্ষিণের দিকে এগুতে লাগলাম। জলের উপর দুটো রাজহাস দেখতে পেলাম—তারপর হঠাৎ নজরে পড়ল নদীর ধারে আগুন। কাছে যেতেই দেখি তিনজন লোক চুপচাপ বসে আগুন পোহাচ্ছে। আমি তাদের সাথে যোগ দিলাম। তারা আমাকে প্রণাম করে তাদের উদ্দেশ্য জানাতে লাগল। সূর্যোদয়ের আগেই সরোবরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে যেসব মরা মাছগুলো ডাঙায় এসে পৌঁছেছে সেগুলোকে সংগ্রহ করা ভালো, নয়তো এখানকার মাছরাঙা পাখীগুলো জেগে উঠলেই মাছগুলোকে খেয়ে ফেলে। আর ভোরবেলা এলেই এখানকার শেওলা ভালো পাওয়া যায়। সেগুলো রাতের ঠাণ্ডায় জমে যায়, ভোরবেলা সেগুলোকে সংগ্রহ করার অনেক সুবিধে। ভোরবেলা একজন তীর্থযাত্রীকে দেখে তারা খুবই খুশী, আজকে তাদের ভাগ্যে নিশ্চয়ই বড় মাছ জুটবে। তাদের আশা পূর্ণ হোক ; মনে মনে তাদের জন্য প্রার্থনা করে আবার পথ ধরলাম।
আমার সামনেই মানস সরোবরের শান্ত শীতল জল, অগাধ পরিপূর্ণতা বোধ হয় একেই বলে। ঠিক উল্টোদিকেই এখন সূর্যোদয়ের সময় হয়েছে। এখান থেকে মনে হচ্ছে সরোবরের ওপার থেকেই যেন সূর্যোদয় হচ্ছে। আবার সেই ভূবনমোহিনী রূপ । গুরলা পাহাড়ের রূপোলী চূড়াগুলো আস্তে আস্তে জেগে উঠতে লাগল—উত্তরে মণ্ডপের মতো কৈলাস শিখর মাথা তুলে দাঁড়ালো। আর তারপরই চলল নিঃশব্দে সেই পরিবর্তনের উৎসব, আমি অতি সামান্য একটা ভিখিরী সেই উৎসবের বর্ণনা দেবার সাধ্য আমার নেই, তার চেষ্টা করতে গেলে সেই মহাসুন্দরের গায়ে কালির আঁচর ছোয়ানো হবে মাত্র । কাজেই নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম—কৈলাস খণ্ডের সূর্যোদয়। শুধু একদিনের জন্যও এই মহাসুন্দরের রূপ যদি কেউ দর্শন করে তাহলেই এ জীবন ধন্য। আমি তাকে প্রণাম করে বললাম—আমার এ জীবন সার্থক হল পূর্ণ হল। এই অসীম সৌন্দর্য আমার সত্তাকে ছুঁয়ে দিয়ে আমাকে মনের জগৎ থেকে অনুভূতির জগতে তুলে দিয়ে গেল। গুম্ফায় ফিরে এসে দেখি সবাই বাবাকে ঘিরে বসে জপ করছেন। আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম। জপের শেষে বাবা আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, আমি তাঁর সেই জ্যোতিকে সহ্য করতে না পেরে মাথা নত করলাম ।
তিনি ইশারায় ঘরের একজন লামার দিকে তাকিয়ে আমার উদ্দেশ্যে বললেন—দুখাং লামা আজকে তালাকোট যাবে তুমি ওর সাথে চলে যাও তোমার রাস্তায় কোন অসুবিধা হবে না ।
বাবার কথাই আমার আশীর্বাদ তবুও এই স্বর্গলোক ছাড়তে হবে শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম বাবার পায়ে কিছুদিন পড়ে থাকবো, তাঁর দর্শনে আমি পেয়েছি আলো তাঁর কথায় পেয়েছি অভয় আর আশীর্বাদ, তিনি আমাকে দিয়েছেন অমৃতের সন্ধান—জীবনে আর কি চাই। আমি বার বার ভাবতে লাগলাম, বাবার অসীম কৃপার কথা। আমাকে ফিরতে হবে, এই চিন্তাটা আমার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল—এত তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে ?
দুখাং লামা আমাকে বাইরে ডাকলেন। তাঁর বয়স চল্লিশেরা কাছাকাছি-চেহারায় স্পষ্ট বনেদি ঘরের ছাপ। বাইরে আসতেই তিনি ভাঙা হিন্দীতে আমাকে বললেন—বুঝতেই পারছি যে গুরুকে ছাড়তে খুব কষ্ট হচ্ছে কিন্তু মন খারাপ করবে না। উনি সব দিক বিবেচনা করেই কথা বলেন, তাঁর কথাই গুরুবাক্য বলে মেনে নাও। আমি অতি ধীরে মাথা নেড়ে তার কথায় সায় দিলাম তারপর জিজ্ঞাসা করলাম—কবে রওনা হবেন ?
এক্ষুণি, এখনই রওনা দিলে আমরা কালকে শিম্বিলিং গুম্ফাতে পৌঁছতে পারবো—আমাদের জন্য কিছু খাবার তৈরী হচ্ছে। সাংপা খেয়েই আমরা রওনা হবো । সাধু মহন্তদের কথাই আলাদা যাত্রার জন্য সব সময় তারা প্রস্তুত। তাদের সামনে বা পিছনে কোন বাধা নেই। সেদিন গুম্ফায় একমাত্র আমাদের জন্যই সকালের খাবার প্রস্তুত হল। বুঝলাম সারাদিনে সম্ভবতঃ আর খাবার জুটবে না।
কৈলাসখণ্ড থেকে বিদায় নিতে হবে কথাটা শোনার একঘণ্টার মধ্যেই আমরা খেয়ে দেয়ে তৈরী হয়ে নিলাম। বাবাকে প্রণাম করতেই তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে মনে মনে মন্ত্রোচ্চারণ করে আশীর্বাদ জানালেন। মুখে কিছুই বললেন না। যাবার আগে তাঁর সাথে কিছু কথা বলার ইচ্ছা ছিল ; কিন্তু তিনি মৌনভাব অবলম্বন করাতে আমার আর কিছু বলার সাহস হল না। মনে মনেই তাঁর কাছে প্রার্থনা করলাম—তুমি আমাকে আলোকের সন্ধান দিয়েছো।-আশীর্বাদ কর তোমার নির্দেশিত পথেই যেন চলতে পারি।
তারপর বাবা আবার ধ্যানে বসলেন। আমি তাঁর সেই ধ্যানমগ্ন রূপকেই গ্রহণ করলাম আমার হৃদয়ে। তাঁর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে তাঁর রূপকে সামনে রেখে আমরা রওনা হলাম।
মানস সরোবরের ধার ধরে প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর আমরা পাথর সাজানো একটা চোরতেন পেলাম। এই চোরতেনের কাছে আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বিশ্রাম করলাম, তারপর মানস সরোবরের জল স্পর্শ করে মাথায় ছিটিয়ে দিলাম। সামান্য জলপান করে উচ্চারণ করলাম—অপবিত্র পবিত্রোবা সর্বাবস্থাংগতো পিবা যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং সং বাহ্য অভ্যন্তরং সূচী। চোরতেন সাতবার প্রদক্ষিণ করে আমরা আবার রওনা দিলাম। কিছুক্ষণ পর মানস সরোবরের প্রায় লাগোয়া পেলাম আর একটি ছোট্ট হ্রদ। অনেকটা সেই গৌরীকুণ্ডের মতোই দেখতে, আয়তনেও প্রায় সেরকমই, তবে এর জল মানস সরোবরের থেকে বেশী ঠাণ্ডা। হ্রদের নাম শুসুপ্ত। শুশুপ্ৎসো কথাটা থেকেই মনে হয় এই কথাটা এসেছে।
দুখাং লামা আমাকে বললেন—এই ছোট্ট হ্রদটার তাৎপর্য আছে। আমাদের মন যখন অজ্ঞানান্ধকারে ডুবে থাকে তখন সুখানুভূতি সম্ভব নয় সেই সুপ্ত মনটাকে ভগবান দেচোকের আশীর্বাদে জাগিয়ে তুলে তাকে পরিণত করতে হয় মানস সরোবরে। মনের জাগরণ অবস্থাই হচ্ছে মানস সরোবর। মনের প্রসারতা মানেই মানস। মনকে গভীর ও উদার করতে হবে সেটাই তো আসল মুক্তি ।
এবার শুরু হল পাহাড়ে উঠার পথ। এখান থেকে আমাদের উঠতে হবে প্রায় এক
হাজার দু'শ ফুট। ঠিক যেমন পেয়েছিলাম ইয়াংটু-এর কাছে, খুব আস্তে আস্তে আমরা উঠতে লাগলাম। কৈলাসনাথ এখন আমাদের ঠিক পিছনে, বারবার থামতে হচ্ছে কারণ পথটা প্রায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ পথে কোন রকম মন্ত্র নেই, কোন রকম জপ নেই শুধু কৈলাসনাথের রূপটা কল্পনা করেই হাঁটতে হচ্ছে। পথটা খুবই কষ্টকর, এই শীতের মধ্যেও ঘামে আমার শরীর ভিজে গেছে। দুখাং লামার কথাই আলাদা, তিনি এ অঞ্চলের মানুষ এখানেই তার জন্ম, আর পাহাড়ে চলা তার কাছে সম্ভবতঃ আমাদের সমতলে চলার মতো। মাঝে মাঝে থেমে কৈলাসনাথের দিকে তাকিয়ে বাবাকে স্মরণ করে আবার চলতে লাগলাম। চলার পথে আমার নিশ্বাস প্রশ্বাসই মনে হচ্ছে আমার একমাত্র সাথী। প্রকৃতির সেই মনোহরা রূপ যেন আস্তে আস্তে মন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কথায় বলে যার কেউ নেই তার ভগবান আছেন, কাজেই তিনিই একমাত্র ভরসা। পথ যত দীর্ঘই হোক না কেন তার শেষ আছে। আর মঙ্গলময়ের কৃপায় শেষ পর্যন্ত আমরা এসে পৌঁছলাম সেই পাহাড়ের উপরে। স্থানটির নাম গুরলা-লা, উচ্চতা প্রায় ষোল হাজার দুশ (১৬,২০০) ফুট। উঠেই পেলাম একটি চোরতেন, কয়েকটা সাদা পতাকা উড়ছে, তীর্থযাত্রীদের মনকে হালকা করবার জন্যই পাশে রয়েছে প্রার্থনা চক্র। সেখানে প্রায় বরফে ঢাকা পাথরের উপর চিত হয়ে শুয়ে পড়লাম। দুখাং লামা ঠিক যেন পাহাড়ী ইঁদুর এতখানি উঁচুতে উঠতে তার কষ্ট হয়েছে বলে মনে হয় না। একটু বিশ্রাম নেবার পরই সেখান থেকে দেখতে পেলাম মানস সরোবর, রাক্ষসতাল আর কৈলাস শিখরের সুন্দর দৃশ্য। আর দক্ষিণে রাস্তাটা নেমে গিয়েছে নীচের সমতলে। এই সমতলের পর আবার শুরু হয়েছে পাহাড় ৷
দক্ষিণেই আমাদের চোখে পড়ল বরফে ঢাকা পর পর তিনটি চূড়া, সেটাই গুরলা মান্ধাতা বা মেমোনানি। গুরলা পাহাড়ের এই তিনটিই সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, সর্বোচ্চ শৃঙ্গ পঁচিশ হাজার তিনশ' পঞ্চান্ন ফুট। আর তার বাঁদিকে ও ডানদিকে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট দুটো শৃঙ্গ। সেখান থেকে বরফ গলে যে নদীটির সৃষ্টি হয়েছে তার নাম গারু। এই অঞ্চলের ছোট বড় সব পাহাড়ী নদীগুলো একত্র মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে বিখ্যাত করনালী নদী। আলমোড়া থেকে তীর্থযাত্রীরা কৈলাসে যাবার পথে এখানেই কৈলাসনাথ ও মানস সরোবর প্রথম দর্শন করেন। সে কারণে এখানকার স্থান মাহাত্ম্যও অনেক।
আমরা এখন একটা পাহাড়ের সর্বোচ্চ অংশে দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে দুই লোক। একটি কৈলাসখণ্ড বা মহাতীর্থভূমি আর একটি মর্ত্যলোক বা মহাভারতভূমি। এখান থেকেই আমাদের কৈলাসখণ্ডকে বিদায় জানাতে হবে। সূর্যদেব এখন হেলে পড়েছেন কিন্তু সন্ধ্যা হতে এখনও অনেক দেরী । কৈলাসনাথ-মানস সরোবর -রাক্ষসতাল সকলের উদ্দেশ্যে ভক্তিভরে প্রণাম জানালাম আর বাবাকে স্মরণ করে জানালাম আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিদায় জানালাম আমার বহু কষ্টার্জিত স্বর্গলোককে। প্রার্থনা জানালাম স্বর্গের দেবতাদের উদ্দেশ্যে। এবার পথ অনেক সোজা, শুধুই নীচে নামার পথ। গুরলার এই পর্বত কন্দরটির চারদিক এখনও বরফে প্রায় ঢাকা। বরফ গলতে এখনও মাসখানেক সময় লাগবে। নীচে নামতে নামতে দুখাং লামা বললেন-তোমার কর্মফল সত্যি খুব ভালো। লামা বা সাধুরা অনেক চেষ্টা করেও বাবার সাথে কথা বলতে পারেন না আর তুমি তাঁর সাথেই ছিলে।
আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-তিনি কোথায় থাকেন ?
—তাঁর থাকার কোন ঠিক নেই, তিনি যখন আসেন তখন চারদিকে ঘুরে বেড়ান, সকলেই তাঁকে ভক্তি করেন, সকলেই তাঁকে চান। তিনি সূর্যের তপস্যা করেন, লোকে বলে যে, তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা আছে।
—তিনি কি প্রত্যেক বছর গরমের সময় এখানে আসেন ?
—তিনি যোগীপুরুষ ঠাণ্ডা গরমের কোন প্রশ্নই আসে না। তাঁর যখন খুশী তিনি তখনই আসেন। এই দেখ না আজকাল মানে বছর খানেক যাবৎ ভারতের পথ একদম বন্ধ হয়ে গেছে অথচ বাবার পথতো কেউ বন্ধ করতে পারেনি ।
–বন্ধ কেন ? হঠাৎ প্রশ্নটা করলাম ।
তিনি জবাব দিলেন—আজকাল লাসায় খুব গণ্ডগোল চলছে। ভারতের সাথে চীনাদের সম্পর্ক ভালো নেই, তাই তারা আটকে দিয়েছে সব পথ। তোমার তো এই সব পথ জানা নেই, তা ছাড়া চীনা সৈন্যদের হাতে পড়লে ওরা অনেক ঝামেলা করে সেইজন্যই তো বাবা তোমাকে আমার সাথে পাঠিয়ে দিলেন। আমি তোমাকে সব পথ বলে দেবো।
দুখাং লামার কাছ থেকে সে অঞ্চলের আরও অনেক তথ্য জানতে পারলাম। এই সমতল ভূমিটাকে বলে পুরাং। এই সমতলেরই শেষ অংশে অবস্থিত শিম্বিলিং গুম্ফা। সেটাই এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গুম্ফা। শিম্বিলিং কথাটা মনে হয় শিবলিঙ্গ থেকে এসেছে। লামা ধর্মের আগে হয়তো এখানে শিবলিঙ্গের কোন মন্দির থেকে থাকবে। শিম্বিলিং গুম্ফার কাছেই যে শহর তার নাম ' তালাকোট। তালাকোট এ অঞ্চলের সেরা গ্রাম। প্রত্যেক মাসে তিন দিন সেখানে হাট বসে আর অনেক দোকানও আছে। আগে এই গ্রামে হিন্দু তীর্থযাত্রীরা থাকতেন আর এখান থেকেই গাধা, ঘোড়া, ইয়াক ভাড়া করে কৈলাসের দিকে রওনা হতেন। এই গ্রামে গাইড, পুরোহিত, দণ্ডি, কুলি, পীঠের ঝোলা সব কিছুই পাওয়া যেতো, আজকাল সেই ব্যবসা উঠে গেছে। সেসব দিনগুলো ছিল খুব আনন্দের। এই অঞ্চলে চোর ডাকাতও খুব ছিল, কোন তীর্থযাত্রীদের একলা পেলেই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। কাজেই তীর্থযাত্রীরা সবাই তালাকোট থেকে দলবেঁধে কৈলাসের পথ ধরতেন। বলাই বাহুল্য যে দুখাং লামা ভারত দরদী, তার কথা শুনতে শুনতে এগুতে লাগলাম। সন্ধ্যোর সময় আমরা কারদুং নামে একটা গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম। গ্রাম না বলে বস্তী বলাই ভালো। পাথর ও মাটির দেয়ালের উপর কোন রকমে একটা ছাদ তোলা হয়েছে মাত্র। একটা চায়ের দোকানে আমরা এসে উঠলাম। রাত্রিতে মাথা গুঁজবার মতো একটা স্থানের দরকার। দোকানের মালিকের অনুমতি নিয়ে সেখানেই আমরা রাতের আশ্রয় নিলাম । পরের দিন আবার ধরলাম পথ, দোকানের মালিক ভোরবেলা আমাদের জন্য চা তৈরী করে দিয়েছিলেন। চার বাটি চা মাত্র দু' পয়সা। আর শোবার জন্য চার পয়সা পেয়েই মালিক খুশী হয়েছেন। এখন পথটা নীচের দিকে নামছে—পাশেই খাদের মধ্যে নদী। পথটা খুব বিপদজ্জনক। স্থানীয় কুচো পাথর দিয়ে এই রাস্তাটা তৈরী। সব সময়ই মনে হচ্ছে পায়ের তলার পাথর সরে যাচ্ছে। একটু অসাবধান হলেই খাদে পড়ার সম্ভাবনা। নদীটা মনে হয় পাহাড়ের মধ্য দিয়ে কেটে এগিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে সুড়ঙ্গের পথ, আবার কখনও কখনও দুদিক খেয়ে প্রশস্ত হয়ে পড়েছে। চলায় বেশ বৈচিত্র্য আছে। তবে যারা এই পথে কৈলাসের দিকে যান তাদের জীবনটা হাতে নিয়ে এগুতে হয়। আলমোড়া থেকে কৈলাসের পথে এটাই সবচেয়ে দুর্গম। সকাল থেকে অনবরত না থেমে চলতে লাগলাম। মানস সরোবর থেকে যে পথটি আমরা একদিনে নেমে এসেছি সেই পথে সাধারণ তীর্থযাত্রীদের উঠতে লাগে প্রায় তিন দিন । রাস্তার অবস্থা সত্যি ভয়ংকর।
সেদিন সন্ধ্যের সময় আমরা এসে পৌছলাম শিম্বিলিং গুল্ফায়। গুম্ফাটি বড় চমৎকার। দূর থেকে দেখে মনে হয় একটা ছোট গ্রাম। কাছে এসে দেখি যে সেটা আসলে একটা বিরাট বাড়ী। পাহাড় কেটে সেটাকে তৈরী করা হয়েছে। অনেকটা উড়িষ্যার উদয়গিরির গুহার মতো। একটা বিরাট রাস্তা হঠাৎ যেন পাহাড়ের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। পাহাড়ের কোলে পাহাড় কেটেই তৈরী হয়েছে তার ঘরগুলো। তারই নীচে বয়ে চলেছে করনালি নদী। স্বপ্নের মতো। দুখাং লামা এই গুম্ফার লোক, তিনি তীর্থ করতে কৈলাসখন্ডে গিয়েছিলেন মাত্র। আমরা সরাসরি এসে দুখাং লামার ঘরে ঢুকে পড়লাম। হিমালয়ের কোলে হারিয়ে যাওয়া এই গুম্ফাটির কথা আমি কোনদিন ভুলবো না। ইচ্ছা ছিল একটু বাইরে গিয়ে ঘুরে ফিরে দেখি। কিন্তু পায়ের যে অবস্থা তাতে কোন রকমে কম্বলাশ্রয় পেলেই সে সুখী হবে। অন্যান্য ঘরের মতো দুখাং লামার ঘরটাও খুব ছোট্ট আর অন্ধকার মানে কোন জানালা নেই। মনে হয় এটা পাহাড়ের ভেতরের দিকের ঘর। আমি লামাকে জানিয়ে দিলাম আজকে আর কিছু খাবো না। আমাকে কোন রকমে একটু শোবার বন্দোবস্ত করে দিলেই খুশী হব
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন—ঠিক আছে এখানেই শুয়ে পড় আমি আরও দুটো কম্বলের বন্দোবস্ত করছি—আগুনের খুব অভাব। কথামাত্র কাজ ; আমি আর কোনরকম কথা না বাড়িয়ে বিচুলির একটা গদীর উপর নিজেকে ছেড়ে দিয়ে কম্বল চাপা দিলাম। ভোরবেলা লামাদের প্রার্থনায় আমার ঘুম ভাঙলো । আমি সরাসরি প্রার্থনাঘরে না গিয়ে বিছানার উপর বসেই প্রার্থনা আরম্ভ করলাম।
অনেকক্ষণ পর দুখাং লামা এলেন, তিনি সহাস্যে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন——গতকাল তো কিছুই খাওয়া হয়নি খিদে পেয়েছে নিশ্চয়। তার দিকে তাকিয়ে একটু শুকনো হাসি হাসলাম। তিনি আমাকে নিয়ে একটা হলঘর পেরিয়ে ছোট্ট একটা কুঠুরী ঘরের ভিতরে নিয়ে এলেন। সেই ঘরের জানালা দিয়ে তিনি আমাকে বাইরের দৃশ্য দেখতে বললেন। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আমি খুবই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। গ্রামটা অনতিদূরেই, এখান
080
থেকে গ্রামের ঘরবাড়ীগুলো খুবই সুন্দর দেখাচ্ছে। এই গ্রামটাই তালাকোট, একনজরে দেখলেই বোঝা যায় যে এটা একটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম। দোতলার ছাদ পেরিয়ে একটা কাঠের ঘরে এসে ঢুকলাম। এটাই রান্নাঘর। রান্নাঘরে ঢুকতেই সেখানকার লামা ও তিনজন দাবা (ত্রাপা) আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। একটা বড় বাটিতে করে মাখন চা আর ছাতুর লাড্ডু আমার হাতে দিয়ে প্রাতঃরাশ করতে বললেন। আমরা ছাদে এসে রৌদ্রে দাঁড়ালাম, শিম্বিলিং গুম্ফাটা খুব আশ্চর্যজনক। এর গঠনটাও বিশেষ আকর্ষণীয়। পাহাড়ের গা কেটে এটাকে অতি নিপুণতার সাথে তৈরী করতে হয়েছে। এই গুম্ফাটা দ্রেপুং গুম্ফারই একটি প্রধান শাখা। কাজেই এর গঠনটাও অনেকটা সেরকম। এর অনেকগুলো ছাদ। আমার মনে হয় যে বহুকাল আগে এখানে অনেকগুলো গুহা ছিল, সেই গুহার মধ্যে ঋষিরা আসতেন তপস্যা করতে। এখানকার জলবায়ু আর চারদিকের নিঃস্তব্ধতা ধ্যান ও তপস্যার উপযোগী। সেইসব গুহাগুলোর মধ্যে কোনটা নিশ্চয়ই শিবলিঙ্গ মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী যুগে তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এখানকার ছোট্ট পরিবেশ। বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা সেই পুণ্যক্ষেত্রেই তৈরী করেন এই বিরাট প্রতিষ্ঠান। এটা আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব কল্পনামাত্র অর্থাৎ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটাই লিখলাম ।
লাসার দ্রেপুং আসলে এই গুম্ফার মালিক। তবে এই সংস্থাটাকে সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য একটা স্থানীয় সমিতি রয়েছে। গুম্ফায় থাকেন চারজন বড় লামা আর তেত্রিশজন ছোট লামা, যাদের বলা হয় দাবা বা ত্রাপা। গুম্ফার কম্বল-ঘি আর খাবার দাবারের সম্পূর্ণ খরচা আসে দ্রেপুং গুম্ফা থেকে। রান্নাঘরের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য রয়েছে বাজার সরকার ।
গুম্ফার অধ্যক্ষকে বলা হয় খেংপো, মহামান্য খেংপো আর বাজার সমিতির প্রধান, এই দুজনের উপরই গুম্ফার পুরো দায়িত্ব। মহামান্য খেংপো এসেছেন সরাসরি দ্রেপুং গুম্ফা থেকে। তিনি দ্রেপুং-এর প্রতিনিধি। এই গুম্ফার অধীনে আরও ছোট-বড় ছ'টি গুম্ফা আছে।
আমাদের খাওয়ার পর তাদের প্রণাম ও ধন্যবাদ দিলাম। দুখাং লামা তারপর আমাকে নিয়ে এলেন খেংপো লামার সাথে দেখা করিয়ে দেবার জন্য। গুম্ফার নিয়মানুসারে আগন্তুকমাত্রেই অধ্যক্ষের সাথে দেখা করা দরকার। তিনিই এখানে থাকবার অনুমতি দিয়ে থাকেন। আমরা এবার নেমে এলাম একতলার প্রধান দরজার কাছে। সেখান থেকে কয়েকটা সিঁড়ি পেরিয়েই কাঠের একটা সুসজ্জিত ঘরে এসে উঠলাম। সেই ঘরের ভেতরে ঢুকে আমাকে অপেক্ষা করতে বলে দুখাং লামা একটা দরজা খুলে অন্দরমহলে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি এসে আমাকে বললেন—চল তিনি তোমাকে দর্শন দেবেন বলেছেন ।
ঘরের ভেতর ঘর, অতি চমৎকার কাঠের কারুকার্যে ভরা একটা বড় ঘরে এসে আমরা দাঁড়ালাম। ঘরের দুটো ছোট জানালা তারই ভেতর দিয়ে দিনের আলো এসে ঘর উজ্জ্বল করে তুলেছে। ঘরের দেয়ালগুলোও ঠিক পোতালার দেয়ালগুলোর মতোই সূক্ষ্ম কারুকার্যে ভরা। এমন কি মাথার উপরের দেয়ালেও ভগবান বুদ্ধের সোনালী রঙের এক বিরাট চিত্র।
প্রত্যেকটি থামের সাথে ঝুলছে বিরাট বিরাট তাংখা। তাতে রয়েছে মণ্ডলা আর জীবনচক্রের বিভিন্ন চিত্র। জানালার কাছেই একটা বিছানার উপর বসে আছেন গুম্ফার মাহামান্য অধ্যক্ষ। মাথায় ত্রিকোণাকৃতির টুপী, গায়ে ঢিলে হাতার জামা আর জানু ঢাকা রয়েছে বিরাট একটা কারুকার্য করা চাদরে। তাঁর সামনেই অতি সুন্দর খোদাই কারুকার্য করা একটা হাত বাক্স। তাঁকে দেখেই আমি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলাম। তিনি হাত তুলে আমাকে আশীর্বাদ করলেন। তারপর তিনি দুখাং লামার সাথেই কথাবার্তা আরম্ভ করলেন। প্রথম প্রথম খুব ছন্দোময় মনে হল তারপর তাঁদের কথাবার্তার সুরে একটু ছন্দোপতন লক্ষ্য করলাম। তারপর আমাকে তারা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পরামর্শ শুরু করলেন। তাঁদের কথাবার্তার কিছুটা বুঝলাম বটে কিন্তু অধিকাংশই রইল আমার ধারণার বাইরে। তবে আমি স্পষ্টই বুঝলাম যে আমাকে নিয়েই তাদের মূল সমস্যা।
অনেকক্ষণ পরামর্শ করার পর আমরা অধ্যক্ষকে প্রণাম করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দুখাং লামাকে একটু চিন্তান্বিত দেখলাম। সেখান থেকে আমরা কয়েকটা বিরাট হলঘর পেরিয়ে এসে পৌঁছলাম গুম্ফার মূল মন্দিরে। মন্দিরে ঢুকতেই সামনে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি চোখে পড়ল। মূর্তিটা উজ্জ্বল সোনালী রঙের। তার দু'পাশে আরও দুটো তথাগতের মূর্তি। তার ঠিক সামনে একটি ছোট মূর্তি, ধ্যানী বুদ্ধের রূপ। বড় মূর্তিটা কম করেও প্রায় ছ'ফুটের মতো হবে। মূর্তিটার দু'পাশে দুটো থাম। থামটাকে জড়িয়ে আছে দুটো ড্রাগন, তার মুখ দুটো হেলে পড়েছে ভগবান বুদ্ধের দিকে সম্ভবতঃ শয়তানের প্রতীক। বেদীর সামনেই জ্বলছে জ্ঞানালোক ঘিয়ের প্রদীপ। আমরা প্রণাম করে সামনের গদীতে বসলাম ।
তিব্বতে বুদ্ধ মন্দির মাত্রেই ছোটখাটো একটা যাদুঘর। চারিদিকে বহু পুরান ও দামী আসবাবে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে তাংখার বাহার কিছুতেই চোখ এড়াবে না ।
দেয়ালের গায়ে খুপড়ির মধ্যে রয়েছে অসংখ্য বই। প্রত্যেকটি বইয়ের খাপ অতি সুন্দরভাবে কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঢাকা। আমাকে বইয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে দুখাং লামা বললেন—এ আর কি দেখছো আমাদের পুস্তকাগারের বইগুলো দেখলে তুমি আবাক হয়ে যাবে। এই অঞ্চলে একমাত্র আমাদের গুম্ফাতেই তাজুর ও কান্জুর-এর পুরো সংকলন আছে। এই বলে তিনি একটু নড়ে চড়ে বসলেন তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- -এবার আসা যাক আমাদের কথায়—একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমার ইচ্ছে ছিল যে তোমাকে এই গ্রামের চারদিকে ঘুরিয়ে দেখাই আর এ গ্রামের অনেকে ভালো হিন্দী জানে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। কিন্তু অধ্যক্ষ মশায় আমার সাথে একমত নন। প্রথমতঃ হিন্দুদের (এস্থলে ভারতীয়দের এখানে প্রবেশ নিষেধ। কাজেই প্রশ্ন উঠবে যে আমি কিভাবে এলাম, কে অনুমতি দিল, আমাদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ হয়েছে ইত্যাদি। দ্বিতীয় সমস্যা হল যে, কোন ভারতীয়দের সাথে যোগাযোগ করতে হলে স্থানীয় লাসা কর্তৃপক্ষের অনুমতি চাই। তিব্বতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও জাতীয় মুক্তিবাহিনীর লোকেরা সর্বত্র নজর রেখেছে। পুরাং জেলা কর্তৃপক্ষ এখন নামে মাত্র শাসক। অধ্যক্ষের মতে আমাকে এখান থেকে বের না করানোই মঙ্গল। “ওরা” দেখতে পেলে অকারণে ঝামেলা বাড়বে। এ ঘটনা আমার কাছে নতুন নয়। দুখাং লামাকে আর কিছু ব্যাখ্যা করতে হল না আমি বুঝে ফেললাম আমার অবস্থা। অর্থাৎ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব “ওদের” হাতে ধরা পড়ার আগেই আমাকে স্থান ত্যাগ করতে হবে।
দুখাং লামা বা এখানকার কর্তৃপক্ষ আমাকে নিয়ে মুশকিলে পড়ুক সেটা আমি মোটেই চাই না। তাকে আমি বুঝিয়ে বললাম যে, দুঃখ করার কিছু নেই। তালাকোটের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এই গুম্ফা, সেটা তো দেখা হলই। আর তিব্বতের বহু গ্রাম আমি দেখেছি কাজেই নতুন করে আর কিছু যদি নাও দেখি তাহলেও আপসোসের কোন কারণ নেই ।
দুখাং লামা আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন যে ভারতে যাওয়ার এটাই মূল রাস্তা, কিন্তু পাহাড় ডিঙিয়েও যাওয়া যায়, এ অঞ্চলের যারা রিফিউজি হয়ে ভার তের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে সেই রাস্তায় এখনও সৈন্যবাহিনী বসেনি। মনে মনে ভাবলাম যে এইসব কারণেই হয়তো বাবা আমাকে এই দুখাং লামার সাথে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি দূরদ্রষ্টা কৃপাসিন্ধু। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় আবার আমার মাথা নীচু হয়ে এল। অগত্যা আমাকে বাধ্য হয়ে গুম্ফার মধ্যেই সারাদিন এঘর ওঘর করে কাটাতে হল। দুখাং লামাই আমাকে সব রকমের আশ্বাস দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। সন্ধ্যার সময় তিনি আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, আমরা নদী পার হয়ে তালাকোট গ্রামটাকে বাঁদিকে রেখে এগিয়ে গেলাম আরও নীচের দিকে। তারপর দূরের পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে বললেন—ওই যে পাহাড়ের চূড়াটা ‘দেখছো তার বাঁদিক দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে ভারত যাবার প্রধান রাস্তা—লিপু-লেক তিব্বত, নেপাল আর ভারতের সীমান্ত শহর। সেখানে অজস্র চীনা সৈন্য মোতায়েন আছে কাজেই সেদিকে যাবে না। লিপু লেকের উচ্চতা প্রায় ষোল হাজার সাতশ' পঞ্চাশ ফুট, আমরা গুরলা লা পেরিয়েছি ষোল হাজার দু'শ ফুটে, কাজেই বুঝতে পারছো তোমাকে বেশ কষ্ট করতে হবে। তোমার ভাগ্য ভালো আকাশে চাঁদ পাবে, কাজেই রাতের বেলা চলতে অসুবিধা হবে না। ওই পাহাড়ের ঠিক নীচ দিয়েই একটা সরু রাস্তা পাবে। তুমি সর্বোচ্চে উঠেই দেখতে পাবে অন্যদিকে ঢালু হয়ে-পাহাড়টা সমতলে গিয়ে মিশেছে। পাহাড় থেকে তুমি যখনই সমতল দেখতে পাবে তখনই বুঝবে যে তুমি ভারতে প্রবেশ করেছো আর ভয় নেই। তুমি এখন থেকে যদি হাঁটতে আরম্ভ কর তাহলে ভোর হবার আগেই পাহাড় ডিঙ্গিয়ে যাবে। তবে খুব সাবধান রাস্তায় বরফ পাবে—বাবাকে স্মরণ করবে তিনিই তোমার দায়িত্ব নেবেন।
দুখাং লামা আমাকে শুধু যে সীমান্তের আটঘাট বলে দিলেন তাই নয় সেই সাথে সাথে কাঁধে একটা ছোট থলে ঝুলিয়ে দিয়ে বললেন—দু'দিনের খাবার এর মধ্যে আছে কাজেই তোমার অসুবিধা হবে না তবে খুব সাবধান গলা শুকিয়ে গেলেও বরফ তুলে খেও না। দুখাং লামা সত্যিকারের হিতাকাঙ্ক্ষী আর ভারতদরদী, প্রণাম আর ধন্যবাদ
দিয়ে তাঁর সেই ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। আমি মনে মনে ভাবলাম যে চীরজীবন এই মানুষটির কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। তিব্বতে তিনিই আমার শেষ মানুষ আর শিম্বিলিং গুম্ফাই আমার শেষ আশ্রয় ।
তারপর শুরু হল চলা, করনালি নদীকে বাঁদিকে রেখে সরাসরি হাঁটতে লাগলাম লিপু লেকের দিকে। আধঘণ্টার মধ্যেই আবার শুরু হল পাহাড়। আমি পাহাড়ের চূড়া লক্ষ্য করে চলতে লাগলাম, তারপর রাত ঘনিয়ে এল। আমি জানি আমাকে চলতে হবে, কারণ দিনের আলোকে আমি ওদের হাতে ধরা পড়ে যাবো। তাতে শুধু যে আমার হয়রানি হবে তাই নয়—আমাকে কেন্দ্র করে দুখাং লামা ও গুম্ফার সকলকেই নাজেহাল হতে হবে কাজেই আমাকে এখন চলতে হবে। গুরলা-লা অতিক্রমের সময় এই ধরনের পথই পেয়েছিলাম, কাজেই কিভাবে চলতে হবে তা আমার জানা ছিল নয়তো আমাকে এখানেই থেমে পড়তে হত। দুখাং লামার কথাই ঠিক মাথার উপর দেখা দিল চাঁদ, সেই চাঁদের আলোতে আবার দেখতে পেলাম লিপু লেকের তুষারশুভ্র শিখর ।
মনে পড়ল বাবার কথা, তিনিই তো আমাকে বলে দিয়েছেন পথের সন্ধান, তাঁর পথেই তো আমি যাচ্ছি কাজেই তিনিই রয়েছেন আমার পিছনে। আমি যে পথ ধরে চলছি সেটা পথ নয়, শুকনো ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে চাঁদের আলোয় যে রকম পায়ে চলার পথ পাওয়া যায় সেটা মনে হয় এর থেকেও অনেক ভালো। আমাকে চলতে হচ্ছে কোথাও বরফের মধ্য দিয়ে আবার কখনও পাথরের উপর দিয়ে হোঁচট খেয়ে। এই ধরনের পথে রাত্রিবেলা কিছুতেই নামা সম্ভব নয়—হোঁচট খেয়ে কোন পাহাড়ের নীচে গড়িয়ে পড়ে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনাই বেশী।
চলতে চলতে দেখতে পালাম বাঁদিকে কয়েকটি আলো—তাড়াতাড়ি নিজেকে সংযত করে নিলাম—ওগুলো নিশ্চয়ই চীনা সৈন্যদের তাঁবু। তাড়াতাড়ি সেদিক ছেড়ে আবার ধরলাম ডানদিকের পথ। খুব জোর বেঁচে গেছি। চারদিক নিঃশব্দ, সেই নিস্তব্ধতাই আমায় প্রেরণা জোগাচ্ছে। তারমধ্যে একমাত্র শব্দ আমার ঘনঘন শ্বাস । সাধুবাবার কাছ থেকে শেখা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে ছন্দ মিলিয়ে চলার কৌশলটাকে এবার কাজে লাগালাম। তার সাথে সাথে মনে পড়ল—ওম্-মণি-প-দ্-মে-হুম্, ওম্-মণি-প-দ্-মে-হুম্, ওম্-মণি-প-দ্-মে-হুম ...
এইভাবে সারারাত ধরে মন্ত্রমুদ্ধের মতো আমি চলতে লাগলাম, এইভাবে কতক্ষণ ধরে চলেছিলাম জানি না। হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি সেই শিখরটি আর নেই। ডানদিকে বেশ কিছু দূরে অন্য একটি শিখর চোখের সামনে ধরা পড়েছে। বুঝতে পারলাম প্রায় উপরে উঠে এসেছি। চলতে চলতে দারুণ পরিশ্রমের জন্য আমাকে বার বার থামতে হচ্ছিল—এখন মনে হচ্ছে না থামলেও চলে । বুঝতে পারলাম যে সর্বোচ্চে উঠে পড়েছি। পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বহু দূরে চাঁদের আলোয় কৈলাস শিখরটি আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। মন্দিরের মতো সেই চূড়াটিকে চিনতে এতটুকু অসুবিধা হল না। তাঁকে প্রণাম করলাম। ওম নমঃ শিবায়, ওম্ নমঃ শিবায়, ওম্ নমঃ শিবায় ।
ভোরের তারাগুলো এখন নিষ্প্রভ হতে শুরু করেছে বুঝলাম যে আমি এখন সীমান্তে এসে পৌঁছেছি। আর হাতে আছে মাত্র ঘন্টাখানেক সময়। এর মধ্যেই আমাকে পাহাড়ের ঢাল ধরতে হবে। এ পর্যন্ত রাস্তায় এতটুকু ঘাসের চিহ্নমাত্রও দেখিনি শুধু পাথর আর পাথুরে বালির ধূলো-এখানে হঠাৎ মনে হল ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটছি। অসম্ভব, নীচে ঘাস পাইনি কাজেই এত উঁচুতে ঘাস পাওয়ার কথা নয়। তাই ভালো করে হাত দিয়ে সেগুলোকে পরীক্ষা করতে চাইলাম। ছুঁয়ে আশ্চর্য হলাম। ঘাস নয় কিন্তু ঘাসেরই মতো এক রকম পুরু শেওলা। মনে হচ্ছে যেন কার্পেট বিছিয়ে রাখা হয়েছে। ভোরের আলোর সাথে সাথে আমি পেলাম ঢাল। আমার আনন্দ দেখে কে ? আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। কৈলাস থেকে ফিরে আমি আবার ভারতের মাটি স্পর্শ করেছি। সীমান্তে “ওদের” চোখ ফাঁকি দিয়ে আমি প্রবেশ করেছি আমার দেশে। কি আনন্দ ! এই আনন্দের যেন আর শেষ নেই। আমি প্রায় লাফাতে লাফাতে এবার নামতে শুরু করলাম। এত তাড়াতাড়ি বিনা পরিশ্রমেই যেন ফিরে পেলাম আমার মাতৃভূমিকেগুরু কৃপাহি কেবলম্। গুরু কৃপাহি কেবলম্। গুরু কৃপা ছাড়া এটা কিছুতেই সম্ভব ছিল না ।
ভোরের আকাশ তার নতুন সাজে সাজতে লাগল। এখন আর অসুবিধা নেই। আকাশ যখন পরিষ্কার হল তখন দেখতে পেলাম নীচে পাইন গাছের সারি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়তো এরই নাম স্বাধীনতার আনন্দ! আমি আস্তে আস্তে এবার নামতে লাগলাম। প্রায় দুপুরের কাছাকাছি প্রথম পাইনের সারি পেরোতেই চারদিক থেকে শুনতে পেলাম হল্ট! হল্ট! থমমত খেয়ে আমি থামতে বাধ্য হলাম। মুহূর্তের মধ্যেই আমাকে ঘিরে ধরল একদল সৈন্য। থতমতর ভাবটা কাটতেই ভালো করে তাদের দিকে তাকিয়ে একটা বিরাট হাঁফ ছাড়লাম—তারা সবাই ভারতীয় সৈন্য।
বলাই বাহুল্য, তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে এল নিকটবর্তী শিবিরে। সেখানে আমাকে ঘিরে চলল তাদের কৌতূহলী প্রশ্ন । আমি বললাম যে আমি কৈলাসে গিয়েছিলাম—গুরুজী সেখানেই আছেন পরে সুবিধামত আসবেন আর আমি চলে এসেছি রাতারাতি সীমান্ত পেরিয়ে। ভাগ্য আর কাকে বলে সেই শিবিরেই পাওয়া গেল একজন বাঙালী, আমি কলকাতার ছেলে শুনে তিনি সরাসরি আরম্ভ করলেন বাংলা কথা। আমার সত্যতা প্রমাণিত হল। পরে আমার কৃতিত্বের প্রশংসা করে তাঁরা আমাকে ভারী বান্ রুটি আর চা খাইয়ে ছাড়লেন। লিপু লেকের চীনা সৈন্যদের সম্পর্কে অনেক প্রশ্নই এদের ছিল কিন্তু তাদের এড়িয়ে আসার জন্য কোন রকম তথ্যই এদের দিতে পারলাম না। এদের কাছ থেকেই শুনলাম যে আমি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদে পৌঁছেছি। এই প্রায় সমতল ভূমিটাকেই বলে ‘ভ্যালী অফ ফ্লাওয়ার, অনেকে বলেন নন্দন কানন ।
এ এক নতুন জগৎ, পুরাং ভ্যালীর সাথে এর তুলনাই চলে না। লিপু লেকের ওপারে শুধুই পাথর আর বরফের রাজত্ব। ঠাণ্ডার জন্য একটা গাছও জন্মাতে পারে না, আর এখানে যতদূরে দৃষ্টি যায় শুধু সবুজের বন আর মাটিতে বড় বড় ঘাসের সাথে মিশে রয়েছে রঙ বেরঙের হাজারো ফুল, পাতা থেকে ফুলের সংখ্যাই বেশী ।
আহা! এটাই বুঝি মানুষের স্বর্গ! দেখে এলাম অনন্ত সৌন্দর্যের জগৎ, সেটা দেবতাদের স্বর্গ, দারুণ শীত আর রুক্ষ আবহাওয়ায় মানুষের সেখানে বোধ হয় প্রবেশ নিষেধ। মানুষ সেখানে যায় তীর্থের জন্য, দর্শনের জন্য। জীবন নদীর উৎস সন্ধানে—সেখানে সবাই তীর্থযাত্রী—সবাই আসে আর যায় আর এখানে রয়েছে মানুষের স্বর্গ, মানুষের রাজত্ব, মানুষ এখানে পরিপূর্ণতা লাভ করে অবস্থান। তাই এর নাম মহাভারত, এখানে বসেই করতে হয় সাধনা, জীবন-নদী এখানেই পরিপূর্ণতা লাভ করে। জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী। চারদিকের অজস্র ফুলগুলো এখন আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে—এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে যে তারা আমার জন্যই যেন ফুটে রয়েছে।
এই পথে আমি কয়েকটি গ্রাম এড়িয়ে চলে এসেছি। আমার সামনেই ধবলী-গঙ্গা, তারপর ধরচুলা, তারপর বেরিনাগ হয়ে আলমোড়া। আলমোড়া থেকে নৈনীতাল হয়ে যেতে হবে কাঠগুদামে সেখান থেকেই ধরতে হবে ট্রেন। এখন আর কোন বাধা নেই। বড় পাহাড়, স্রোতস্বিনী, বরফ এ সব বাধা এখানে বাধাই নয়। মুক্তিদাতা কৈলাস দর্শন করে এখন যাচ্ছি বাড়ীর দিকে সেখানে কি পাবো—মুক্তি!না বন্ধন !
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন