বিমল দে
বিকেলবেলার দিকে আর একবার হাল্কা চা খেলাম। হাল্কা চা মানে, চা-এর সাথে নুন ও মাখন মিশিয়ে ওরা হাল্কা চা তৈরী করে, সস্তাও বটে, মাত্র তিন পয়সা দিলেই বাঁশের চোঙ্গায় ভর্তি করে ওরা চা বিতরণ করে। এরকম এক চোঙা মানে প্রায় আমাদের দেশী কাপের ছ-সাত কাপ তো বটেই। জিনিসপত্রগুলো পিঠে গুছিয়ে আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আমাদের আশপাশে আস্তে আস্তে গ্রামের লোকজনরা জমতে লাগল, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তো বটেই আর যুবক ও কয়েকজন বৃদ্ধ ও বটে।
রাস্তায় যেতে যেতেই অদ্ভূত একটা জিনিস নজরে পড়ল। অনেকে আমাদের দেখে মা-কালীর মতো লম্বা জিভ দেখাতে লাগল, আর অনেকে রাস্তায় লম্বা হয়ে দণ্ডিকাটার মতো প্রণাম করতে লাগল। গুরুজী ব্যাখ্যা করে বললেন যে সাধারণতঃ তিব্বতীরা নমস্কার বা প্রণাম করে জিভ বার করে, তবে এদের মধ্যে অনেকে ভারতীয় ধারায় সাষ্টাঙ্গ প্রগামও করে ।
এখান থেকে আমরা কিছু জ্বালানী কাঠ কিনে নিলাম। জ্বালানী কাঠ মানে ছোট ছোট শাল কাঠের টুকরো, চন্দন কাঠের মতো অনেকটা দেখতে, কাঠ বা উনোন ধরাবার জন্য এই ধরনের কাঠ আসাম বা উত্তরবঙ্গে খুব ব্যবহার করতে দেখেছি। প্রাকৃতিক দৃশ্যটা এখান থেকে খুবই চমৎকার। দু'পাশে হিমালয়ের তুষারাবৃত শৃঙ্গ, বরফও খুব নীচে দেখা যাচ্ছে। আর পাহাড়ের গায়ে ঘন পাহাড়ি ঝাউয়ের বন, আর সামনে একটা পাহাড়ি নদীকে পাশে রেখে এগিয়ে গেছে রাস্তাটা। এই সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে একমাত্র এখানকার বাসিন্দারাই মনে হয় নোংরা। ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়েদের নাকগুলো মনে হয় জন্মে কেউ পরিষ্কার করে দেয়নি। দেশের লোকেরা মনে হয় চিরুনির সাথে পরিচিত হয়নি। এদের জামাকাপড়গুলো দেখলে মনে হয় সারানের আবিষ্কার-বার্তা এখনও এরা শোনেনি। এরা দাঁত মাজে কি না সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। খাওয়া দাওয়ার নমুনা এখনও পাইনি। এখনও পর্যন্ত কোন তিব্বতী যুবক বা যুবতীর সাথে আলাপ হয়নি কাজেই এদের সম্পর্কে এর বেশী কিছু আপাততঃ লিখতে পারছি না। তবে এরা যে খুবই রসিক আর আমুদে তা দেখেই বোঝা যায়। চলতে চলতে মাঝে মাঝে কানে আসে এদের উচ্চ-হাসির শব্দ, সহজ আর সরলতার প্রতীক।
চুম্বিকে বলা যায় তিব্বতের অন্যতম এক পুরোনো গ্রাম। গ্রামের প্রধান আকর্ষণ
হচ্ছে বাজার। কাঠের মাচান ধরনের কয়েকটা বাড়ী, চার পাঁচটা চায়ের দোকান, ছ’টা মুদিখানার দোকান, একটা বিরাট শুকনো মাংস ও চামড়ার দোকান—এই হচ্ছে এখানকার পুরান ও বনেদি দোকান, রাস্তার পাশে ছোট-খাটো আরও অনেক দোকান আছে। সব্জি বাজারটা খুবই ছোট। তিনসারির দোকান-পাট নিয়ে চুম্বি বাজার গঠিত ।
আমাদের সাথে চেক্-পোস্ট থেকেই একটা তিব্বতী ছেলে পিছন ধরেছে। বয়েস মনে হয় ষোল-সতেরো বছর। গুরুজীকে বার বার জিজ্ঞাসা করছে কোথায় আমরা রাত কাটাবো। তার কথায় কোন রকম কান না দিয়েই আমরা এ পর্যন্ত চলে এসেছি। কিন্তু ওর সাথে বাজার থেকে আরও দু'জন যোগ দিয়েছে। ওরা আমাদের রাতের খাওয়া ও আগুনের বন্দোবস্ত করে দেবে বলছে। গুরুজী আমাদের সবাইকে ডেকে পরামর্শ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত হয়ে যাবে কাজেই আমাদের এক জায়গায় থাকতেই হবে । দু' একজনের জন্য হলে কোন কথাই ছিল না কিন্তু বত্রিশজনের জন্য ব্যবস্থা করা তো মুখের কথা নয়। রাত্রিবেলা এখানে থাকতেই হবে। আমাদের মন ও দেহের অবস্থা এমন যে রাস্তার ধারে হলেও আমাদের চলে যাবে, গুরুজীর শুধু হুকুমের অপেক্ষা। ভোর রাত্রিতে শুয়ে আবার ভোর বেলাই চীনাদের পাল্লায় পড়েছিলাম। সারাটা দিন গেছে এক বিরাট দুশ্চিন্তায়, এখন আমাদের ঘুমুতেই হবে। আমাদের জবাব পেয়ে গুরুজী শুরু করলেন দর কষাকষি, শেষে ঠিক হল যে বত্রিশজনের জন্য ওকে দিতে হবে তিরিশ টাকা, তার বদলে ও দেবে একটা বিরাট ঘর তার ভেতর কাঠ কয়লার আগুন থাকবে সারারাত আর রাতের খাওয়া।
রাস্তা ছেড়ে আমরা একটা নীচু মাঠের মধ্য দিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে একটা ছোট্ট ঢিপির উপর উঠে এলাম। সন্ধ্যের আলো এখন প্রায় উধাও হতে চলেছে, তাই আমাদের একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে বলল। কিছুক্ষণ পর আমরা একটা বিরাট বাড়ীর সামনে এসে হাজির হলাম। বাড়ীর দরজার সামনে আসতেই তিব্বতী ছেলে দুটো আমাদের দাঁড়াতে বলল । তাদের মধ্যে একজন পেছনের দরজা দিয়ে বাড়ীর ভেতর ঢুকে গেল দরজা খুলতে। দরজাটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে আমাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, বরাত ভাল যে দ্বিতীয় ছেলেটি আমাদের সাথে থাকায় সঙ্গে সঙ্গে সে কুকুরটাকে সামলে নিল। অস্পষ্ট আলোয় আমরা বাড়ীটার উঠোনে এসে দাঁড়ালাম । সেখান থেকে বাড়ীটাকে ভালভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। সিমেন্টের ভিত্তির ওপর সুন্দর একটি কাঠের বাড়ী, যদিও পুরানো কিন্তু তার বনেদি ভাবটা এখনও যায়নি। একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে আমরা উপরে উঠে এলাম। বাড়ীটা অনেকটা স্কুল বাড়ীর মতো, অনেক লোককে এক সাথে স্থান দেবার জন্যই এটা তৈরী। উপরের বারান্দায় উঠতেই দেখতে পেলাম বাড়ীর মালিককে। একজন প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা হ্যারিকেন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আমাদের সকলকেই তিনি একে একে মাটিতে গড় হয়ে প্রণাম করলেন। তাঁর মুখের ভাঁজপড়া চামড়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক পবিত্র আভিজাত্যের ছাপ। তাঁর সাথে আমরা পরিচিত হলাম। তিনিই আসলে বাড়ীর মালিক। ভদ্রমহিলার স্বামী মারা গেছেন বহু বছর আগে, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে সকলেই এখন সিকিমে থাকেন, তিনি একা ভিটে মাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন। তাঁর ভাইয়ের ছেলেমেয়েরাই এখন ঘর বাড়ী দেখছে। বাড়ী ছাড়াও তাঁদের বিরাট জমিদারী রয়েছে, কিন্তু আজকাল সবই দেখাশুনার অভাবে জঙ্গল হয়ে যাচ্ছে। আগে ভারতের সঙ্গে যখন ঘন যোগাযোগ ছিল তখন এবাড়ীতে প্রায়ই লোকজনের যাতায়াত ছিল, আজকাল সীমান্ত-ঘাঁটির হাঙ্গামার জন্য কেউ আসে না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—সবই ভগবানের ইচ্ছে, জানি না আর কতদিন এরকম চলবে ।
তিনি আমাদের মতো সাধু তীর্থযাত্রী পেয়ে খুব আনন্দিত হলেন, আমাদের তিনি তিনটে ঘর খুলে দিলেন। দুটো বড় ঘর আর একটা ছোট। দুটো ঘর পাশাপাশি আর একটা একটু দূরে। ছেলেটির নাম থাংমে, সেই আমাদের বাজার থেকে ধরে এনেছে। উঠোনে দেখতে পেলাম বিরাট একটা উনোনে কাঠকয়লার আগুন জ্বালানো হচ্ছে। লামারা' আস্তে আস্তে সেদিকেই চলে গেলেন।। এই শীতে আগুনের মতো বন্ধু আর নেই, বিশেষ করে আমাদের হাত ও পা বরফের মতো হয়ে আছে। গুরুজী সকলকে দুই ঘরে বন্দোবস্ত করে দিলেন আর আমাকে তাঁর সাথে থাকতে বললেন, মনে মনে সেটাই আশা করেছিলাম। সকলেই উনোনের কাছে চলে গিয়েছে আগুন পোয়াবার জন্য, আমি কিন্তু গুরুজীর পেছন পেছন ঘুরছি তাঁকে একটু একলা পাওয়ার জন্য। তিনি সেটা বুঝলেন। এ পর্যন্ত আমি শুধু তাঁর কথা শুনেই যাচ্ছি কিন্তু আমার তরফ থেকে কিছুই তাঁকে বলা হচ্ছে না। আমার মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন ঠেসে বসে আছে, গুরুজী যদি একটু কৃপা না করেন তাহলে আমার অবস্থা খুবই কাহিল হয়ে দাঁড়াবে। মনটাকে হাল্কা করার জন্য কিছু অন্ততঃ বলার দরকার। থাংমে ও তার ভাই একটা লোহার কড়াইতে করে ঘরে ঘরে কাঠকয়লার আগুন পৌছে দিল, তাতে ঘরগুলো আগের চেয়ে অনেক গরম হয়ে উঠল।
গুরুজীকে এবার ঘরে একলা পেলাম। আমাকে তিনি অভয় দিয়ে বললেন-এখন কথা বলতে পারো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম—তাহলে প্রাণখুলেই বলি কি বলুন ? প্রথমেই আসা যাক, বর্ডারের কথায়। মনে আছে আপনি আমাকে একদিন তিব্বতীদের অভিশাপ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সীমান্ত চৌকির সেই গুণ্ডা মতো দোভাষীটা আমাকে যখন কিছুতেই ছাড়ছিল না তখন তার মাথায় রুদ্রাক্ষের মালা ছুঁইয়ে গায়ত্ৰী মন্ত্রটা আবৃত্তি করতেই বেটা পালিয়েছে। ভাগ্যিস্ মনে এই চিন্তাটা এসেছিল তাই, নয়তো কি যে হতো কে জানে? আমার কথাটা শুনে গুরুজী একটু হাসলেন তারপর বললেন—
—ভাগ্য ভাল যে তোকে তোর ‘ইদম্’ জিজ্ঞাসা করেনি।
—‘ইদম্', সেটা আবার কি ? —‘ইদম্’ হচ্ছে ইস্ট মন্ত্র । —‘ওম্ মণি পদ্মে হুম্’, এটা কি তাহলে ইদম্ নয় ? —তিব্বতী মাত্রেই মন্ত্রটা জানে, এটা গুপ্তমন্ত্র নয়। ‘ইদম্’টা হচ্ছে গুপ্তমন্ত্ৰ ৷ সেটা একমাত্র গুরু শিষ্য ছাড়া আর কেউ জানে না। হিন্দুমতে যেমন—“ওম্ নারায়ণায়, ওম্ নমঃ শিবায়, সোহম্', ঠিক সেরকম মন্ত্র তিব্বতী বৌদ্ধদের মধ্যেও আছে।
—মহাকালকে তো তিব্বতীরা দেবতা হিসেবে ধরে নিয়েছে। অথবা তারা, ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি নামে যে সব তান্ত্রিক দেবতা আছে তাদের নাম কি ‘ইদম্’ বা মূল মন্ত্ৰ হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে ?
—তুই ঠিক ধরেছিস। বিপদে পড়লে এটাই মূল মন্ত্ৰ হয় ৷
—গুরুজী, এবার আসা যাক্ অন্য কথায়। আপনাকে সবাই ডাকে গেশে রেতেন
বলে, কিন্তু আমি গুরুজী বলেই ডাকবো, এতে আপনার আপত্তি নেই তো ? –ঠিক আছে তোর যা খুশী ।
-আর একটা অনুরোধ গুরুজী। আপনি তো বুঝতেই পারছেন যে এই ধরনের তীর্থ সকলের ভাগ্যে দু'বার হয় না, কাজেই আপনি যখন অন্যান্য লামাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন তখন যদি নেপালী ভাষার মধ্যে হিন্দী মিশিয়ে বলেন তাহলে আমার বুঝতে খুব সুবিধা হয়। তাঁরা তো সবাই নেপালী ভাষা বোঝেন, অনেকের তো নেপালীই মাতৃভাষা, আর তারা সবাই জানেন যে আসলে আমি ভারতীয় ; এতকাল : যখন আমাকে সহ্য করেছেন তখন নিশ্চয়ই তাদের তরফ থেকে কোনোরকম আপত্তি হবে না ।
- আমার অনুরোধে গুরুজী বললেন- -তোর কথা রাখতে চেষ্টা করবো, তবে যখন আমরা দু'জনে এক ঘরে থাকবো তখনই একমাত্র তুই কথা বলবি, নয়তো সর্বদাই তুই থাকবি মৌন, তাতে যাত্রার পক্ষে সুবিধাই হবে ।
এই ধরনের আরও প্রয়োজনীয় কিছু কথাবার্তা হচ্ছিল এমন সময় সিঁড়িতে ভারী
পায়ের শব্দ শুনে আমরা থামলাম। গুরুজী আশ্বাস দিয়ে বললেন – ( -মৌনী শিষ্যেরা গুরুজীর সাথে কথাবার্তা বলতে পারে তাতে দোষ হয় না, যদি কেউ শুনেও থাকে তাতে দোষণীয় কিছু নেই। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন সেই প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা, তার সাথে একটি মেয়ে। তারা দু'জনেই আবার আমাদের প্রণাম করলেন, তারপর দরজার কাছে হাঁটুগেড়ে বসে তিব্বতী ভাষায় কি যেন বললেন। গুরুজী সেকথা শুনে তার জবাব দিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে গুরুজী বললেন- -এই মেয়েটি হচ্ছে থাংমের বোন, ভদ্রমহিলার ভাইঝি। তিনি জানতে চাইছেন যে গুরুজী তাকে যেন প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন, ও যেন সুখী হয়। এর মতো এত ভাল মেয়ে হয় না, ও যেন শীগগীরই স্বামীর ঘর করতে পারে। গুরুজী তাকে আশীর্বাদ করলেন। তারা দু'জনেই আবার প্রণাম করে চলে গেলেন। মেয়েটিকে দেখতে সুন্দরী, মুখটা খুবই লাবণ্যে ভরা। বিশেষ করে গাল দুটো লাল টকটকে। গুরুজীকে জিজ্ঞেস করলাম ওর বয়স কতো ? উত্তরে তিনি জানালেন—ভগবান জানেন, চোদ্দও হতে পারে—চব্বিশও হতে পারে, ভালভাবে দেখার সুযোগ হয়নি। গুরুজী বললেন—চল একবার নীচে যাই, দেখা যাক ওরা কি রান্না করছে, এদের খাওয়া সম্পর্কে তোমার কিছু জানা দরকার। গুরুজীকে বললাম এর আগের বারে যে চ্যাং খেয়েছিলাম সেটা খুব ভাল হয়েছিল। তিনি জবাবে বললেন—তিব্বতে চ্যাং এক এক শহরে এক এক রকম করে তৈরী করে, তবে থুমা, মাখন, চা ও বিয়ার সব জায়গায় একই রকম।
আমাদের সঙ্গী লামারা খুব কম কথা বলে, মনে হয় সেটাই তাদের শিক্ষা। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হলেই হাসি বিনিময় হয়। কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে না। আর নিজেদের মধ্যেও সেরকম। মাঝে মাঝে মনে হয়, এদের জিজ্ঞাসা করবার মতো কিছু নেই। গুরুজীর উপর এদের অপরিসীম শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস। গুরুজী যা বলেন মনে হয় সেটাই ছিল তাদের জিজ্ঞাস্য। হাঁপিয়ে গেলেও কেউ বসতে চায় না, খিদের সময় ও মুখে এতটুকু শব্দ নেই আর ঘুমের ঘোরে রাস্তায় পড়ে গেলেও এদের মুখ দিয়ে টু-শব্দটি বেরোবে না। এটাই হয়তো এদের লামাব্রত। আমি এদের কাছে নবীশ মাত্ৰ ৷ বয়স বা অভিজ্ঞতা দুটোই আমার কম।
উনোনের পাশে তাদের সাথে আমি ও গুরুজী এসে যোগ দিলাম। গুরুজী তাদের শোনাতে লাগলেন এখানকার কাহিনী।
থাংমে ও তার ভাই রান্না করছে, মাঝে মাঝে তার বোন ও বৃদ্ধা মহিলা জিনিসপত্র যোগান দিচ্ছে। তিব্বতে আসার পর এটাই হচ্ছে আমাদের প্রথম সুখের দিন।
কেরোসিন এখানে দুর্মূল্য কাজেই যতক্ষণ উনোনে কাঠের আগুন আছে ততক্ষণ আলো জ্বালাবার কোন প্রশ্নই নেই। রান্না হল, তৈরী হল তিব্বতী খাওয়া। গুরুজী বললেন, এরই নাম থুক্মা। গরম জলে কিছু আলু কেটে দেওয়া হল তারপর আলুগুলো প্রায় গলে যাবার সময় সেউ জাতীয় আটার লম্বা লম্বা কাঠি তাতে ফেলে দেওয়া হল তারও কিছুক্ষণ পর শুকনো খুব ছোট ছোট করে কাটা ভেড়ার মাংস তাতে যোগ করা হল। বেশ কিছুক্ষণ ফুটিয়ে যখন সুস্বাদু গন্ধ বেরোচ্ছে ঠিক সেই সময় তাতে মাখন নুন সামান্য হলুদ ও কিছু গন্ধ পাতা দিয়ে নামানো হল। ইংরেজী মতে এটাকে স্টু বলা যেতে পারে। এর গন্ধে আমার খিদেটা যেন বেড়ে উঠল, মনে হল বহুদিন যাবত খাইনি, মনে খটকা লাগল—তাই গুরুজীকে জিজ্ঞাসা করলাম, অবশ্য ফিস্ ফিস্ করে—এর মধ্যে মাংস দিচ্ছে আমরা খাবো কি করে? গুরুজী বললেন—তিব্বতী লামারা নিরামিষভোজী নয়, তারা সব খায়। তারপর সবাইকে শুনিয়ে বলতে লাগলেন—তিব্বতী ধার্মিক বা সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা মাংস খায় বটে কিন্তু তারা নিজের হাতে কোনোদিন প্রাণী হত্যা করে না। তিব্বতে ভারতবর্ষের মতো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই ধরনের জাত বিচার নেই। যে কোন লোক বা যে কোন ঘরের ছেলেমেয়েরা লামা হবার উপযুক্ত। তবে একমাত্র কামার হচ্ছে এখানকার নিম্নজাতি, কারণ তারা প্রাণীহত্যার জন্য অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করে। তিব্বতে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম, সাধারণতঃ তারাই কষাইয়ের কাজ করে। আর তাদের অভাবে যে কোন লোকই এ কাজ করে থাকে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলে তাকে প্রাণীহত্যার জন্য বছরে একবার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। অথবা ভগবানের নামে একটা ছাগল বা ভেড়া ছেড়ে দেওয়া হয়—মুক্তির প্রতীক। এই ধরনের ভেড়া বা ছাগলের শিং-এর সাথে লালরঙের ফিতে বাঁধা থাকে, কেউ তাকে ধরে না। গুরুজীর কথার মাঝে থাংমের বোন এসে সকলকে খাবার জন্য প্রস্তুত হতে বলল। আমরা ঘরে গিয়ে যে যার নিজের থালা বাটি নিয়ে খাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। বলতে গেলে ভারত ছাড়ার পর এই প্রথম আমরা ভালভাবে বসে খাবার হাতে পাচ্ছি। সমবেত প্রার্থনার পর আমরা খেতে আরম্ভ করলাম ।
ওঃ কি চমৎকার! এরই নাম থুমা, অতি সাধারণভাবে প্রস্তুত অথচ স্বাদে যেন অমৃত। যতবার খুশী চেয়ে নিতে পারো অভাব নেই। খাওয়ার পর আমরা যে যার ঘরে চলে গেলাম। সেখানে ঘরের মাঝখানে রাখা ছিল কড়াইতে করে কাঠকয়লার আগুন । কাজেই ঘরটাও বেশ গরম হয়ে উঠেছে। শুধু কম্বল পাতার অপেক্ষা। থাংমের বৃদ্ধা পিসিমাকে তাঁর আতিথেয়তার জন্য অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম ।
পরেরদিন বেশ একটু বেলা করেই আমরা উঠলাম, সকলে যদি ভালভাবে বিশ্রাম করতে পারে তাহলে চলার পথটা আরও সুবিধার হবে, তাই গুরুজী কাউকে ডাকেননি।সম্ভবতঃ বেলা ন'টা নাগাদ আমরা একে একে কম্বল ছাড়লাম। ঝরণার জল ছোঁয়ার কথা চিন্তাও করা যায় না, খুব ঠাণ্ডা, বরফ গলে মাত্র শ'খানেক মিটার নেমে এসেছে। আমি কিছু পুরোনো খবরের কাগজ সঙ্গে এনেছিলাম তাতেই কাজ চলে, আর লামারা সাধারণতঃ বনের পাতা ব্যবহার করে। তিব্বতীদের মতো আমাদের লামারাও মুখ ধোয়ার কোন প্রয়োজন মনে করেন না, তবে আমি সেদিকে একটু অন্য ধরনের। কাঠকয়লা, দাঁতন, ছাই, যা হাতের কাছে পাই তাই দিয়েই আমি মুখ ধুই। প্রায় একমাস হতে চলল আমি স্নান করিনি, তিব্বতীরা স্নান করে বছরে দু'একবার কাজেই আমি তাদের তুলনায় খুবই পরিষ্কার বলতে হবে।
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা আবার যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়লাম। গুরুজী থাংমের পিসিমার হাতে চল্লিশ টাকা দিলেন। বৃদ্ধার মুখটা হাসিতে ভরে উঠল। তিনি বার বার বলতে লাগলেন, আমরা ফেরবার সময়ও যেন তাঁর বাড়ীতে পদার্পণ করি। গুরুজী তাঁকে আশীর্বাদ করলেন। থাংমে, তার ভাই ও বোন আমাদের সাথে সাথে এগিয়ে এল বড় রাস্তা পর্যন্ত। তারপর তাদেরও বিদায় জানাতে আমরা বাধ্য হলাম । আবার পথ ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন