বিমল দে
নাগাৎসের সন্ধ্যেটা বড় চমৎকার, সূর্যাস্তের রঙিন আলো বরফের চূড়ায় পড়ে সম্পূর্ণ জগৎটাকেই যেন মায়াজগতে পরিণত করেছে। সূর্যাস্তের পরই সবাই যে যার ঘরে ঢুকে পড়ে। অত্যধিক শীতে বাইরে আগুন ধরিয়েও কেউ থাকে না। খাওয়া-দাওয়ার পর গুরুজী আমাদের সামদিং গুম্ফার সম্পর্কে চমৎকার একটি গল্প বললেন, গল্পটা এরকম।
সামদিং গুম্ফার দুটো ভাগ, প্রথম ভাগ মহিলাদের জন্য, দ্বিতীয় ভাগ পুরুষদের জন্য। সামদিং গুম্ফা মহিলা বিভাগের জন্য খুব বিখ্যাত। তিব্বতে মহিলাদের জন্য এতবড় মঠ আর নেই। এখানকার মহিলারা পুরুষ লামাদের মতোই লামা পর্যায়ভুক্ত। সামদিং তিব্বতী কথা তার ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় ‘ধ্যান-পর্বত’। এই গুম্ফার চারদিকের শান্ত-সৌম্য পাহাড়গুলোর জন্যই মনে হয় এই নাম রাখা হয়েছে। অনেকদিনের পুরোনো গুম্ফা। মহিলা বিভাগের যিনি সর্বেসর্বা অর্থাৎ গুরুকে বলা হয় দোরজে পামো। আদি দোরজে পামোকে সবাই তিব্বতের মা বলে অভিহিত করতো। তিব্বতে বুদ্ধদেবের আত্মার অভাব নেই। শক্তিশালী লামা মাত্রেই জীবিত বুদ্ধ বলে তাকে সম্মান জানানো হয়। তাঁর বাণী আর ধর্মের জন্য তিনি লামারূপে তিব্বতের চারদিকে বিচরণ করছেন, তিনি সব সময়ই জন্ম নেন পুরুষ দেহে। একমাত্র এই সামদিং গুম্ফাতেই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ‘স্ত্রী’ রূপে, দোরজে পামো নামে। প্রথম দোরজে পামো রূপে তিনি এখানে আসেন প্রায় পাঁচশ বছর আগে, ঐতিহাসিকদের মতে ১৭১৬ খৃষ্টাব্দে। সেই প্রথম দোরজে পামোর ঐশ্বরিক শক্তি ছিল অসাধারণ। নারীদেহে তিনি ছিলেন জগজ্জননী। তাঁর অলৌকিক কাহিনী অনেক। তার মধ্যে যেটা সর্বত্র পরিচিত সেটাই বলছি ।
সামদিং আগে থেকে পুরুষ ও মহিলাদের গুম্ফা ছিল, কিন্তু মহিলাদের স্থান ছিল অপেক্ষাকৃত নীচে। সেই সময় চীনা ভার্তাররা তিব্বতের চারদিকে লুঠতরাজ করে বেড়াচ্ছিল। তাদের আক্রমণ ও অত্যাচারের ভয়ে অনেক গুণী লামা এখানে এসে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল যে, হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা গুম্ফাটা অন্ততঃ বর্বরদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে। তাদের সেই ধারণাটা ছিল ভুল। তাতাররা ছিল নেকড়েদের থেকেও হিংস্র, আর শেয়ালের থেকেও ধূর্ত। লুঠতরাজ করাই ছিল তাদের ধর্ম। কাজেই সামদিং তাদের হাত থেকে রক্ষা পেল না। সামদিং গ্রামের শান্ত ও নির্বিঘ্ন গ্রামবাসীদের উপর হঠাৎ একদিন তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল। গ্রামবাসীদের মধ্যে অধিকাংশই তাদের বাধা দিতে গিয়ে প্রাণ হারালো, তাদের বর্বরতায় মা-বোনেরা ইজ্জত হারালো আর তাদের মধ্যে যারা সুযোগ পেল সামদিং গুম্ফায় গিয়ে আশ্রয় নিল। গুম্ফার মাঝখানে বিরাট উঠোন আর তার পাশে দুর্গের মতো করে ঘেরা পাথরের বাড়ীর দেয়াল। তার্তার সর্দার যখন জানতে পারলো যে সবাই গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে সামদিঙের মঠে, সঙ্গে সঙ্গে তারা আক্রমণ করল সেই মঠ। গুম্ফা বা মঠের দেয়ালে আজও সেই চিহ্ন বর্তমান । গুম্ফার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও তারা বাইরে থেকে খুলতে পারল না। শেষে বিরাট একটা পাথরের হাতুড়ি মেরে তারা দরজাটাকে ভাঙতে শুরু করল। তাদের সেই শব্দ শুনে গুম্ফার সব মহিলা প্রধান লামার পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, আর্তস্বরে তারা আশ্রয় চাইল—মা আমাদের বাঁচাও। তিনি তাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন--ভয় নেই ।
তাতারদের চীৎকার তখন চরমে উঠেছে, তারা জানে যে এই গুম্ফার মধ্যে লুকিয়ে আছে গ্রামের সুন্দরী যুবতীরা তারা প্রায় হাতের মুঠোয়। তাদের চীৎকার জঘন্য পশুদেরও হার মানায়। শেষে তারা দরজা ভেঙ্গে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল গুম্ফার ভেতরে। ভেতরে ঢুকেই তাদের চক্ষু স্থির হয়ে গেলো। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তারা একটি মানুষও ভেতরে দেখতে পেল না। গুম্ফার উঠোনে পরমানন্দে একপাল শূকর ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তাদেরই মাঝখানে রয়েছে একটি সাদা শূকরী। তার্তাররা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হল, তারা ভাবল এ গ্রামে আর কেউ নেই, কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো। সেই সাদা শূকরীই হচ্ছেন বজ্রধারিণী দোরজে ফাগ্মো বা চলতি কথায় দোরজে পামো, আর বাকী শূকরগুলো ছিল গুম্ফার লামা ও গ্রামবাসীসকল। তিনি মন্ত্রবলে সকলকে শূকরে পরিণত করে তাদের রক্ষা করলেন অত্যাচারী তার্তারদের হাত থেকে। তারপর থেকে এই গুম্ফার প্রবীণা লামাকে বলা হয় দোরজে ফাগ্মো ।
পরের দিন সকাল বেলা আমরা রওনা হলাম। গ্রামবাসীদের আশীর্বাদ করে আমরা সামদিং-এর রাস্তা ধরলাম। সকালবেলার রাস্তাটা বেশ ভালো লাগল, চলতে চলতে মা তারার পূজার মন্ত্রগুলো মুখস্ত করতে লাগলাম। গুরুজীর মতে মা তারার ধ্যানটা পুরোপুরি আয়ত্তে আনলে ভবিষ্যতে আমার কোন রকম জাগতিক কষ্ট থাকবে না ৷
যমদ্রোক সরোবরের ধার ধরে প্রায় দু'ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছলাম সরোবরের সর্বোত্তর অংশে যেখানে সরোবরটা অনেকটা কোণাকুণি এসে উত্তরমুখী হয়ে শেষ হয়েছে। তারই ধারে দেখতে পেলাম কয়েকটি মন্দির। আমাদের সামনেই সামদিং গুম্ফা। প্রথমেই চোখে পড়ল গুম্ফার উঁচু উঁচু পতাকাগুলো তারপর যতই এগুতে লাগলাম ততই বাড়ীগুলো পরিষ্কার দেখতে পেলাম। এই অঞ্চলের সব বাড়ীগুলোই একই রকম অর্থাৎ স্থানীয় পাথরের উঁচু উঁচু দেয়ালে তৈরী। গ্রামের মুখেই পেলাম একটা চৈত্য। সেখানে আমরা দাঁড়িয়ে প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে গেলাম মূল মন্দিরের দিকে। গ্রামে ঢুকতেই আমাদের নাকে ঢুকল তীব্র মাছের গন্ধ। ঠিক মাছের বাজারের মতো, আশপাশে তাকিয়ে কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। মূল মন্দিরটি গুম্ফার ভেতরেই। প্যাগোডা ধরনের একটা দরজা দিয়ে আমরা গুম্ফার পাঁচিল পার হয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল তিন চারটে যুবতী (লামা) আমাদের দেখে দৌড়ে এদিক ওদিক ছুটে পালাল। আমাদের সামনে এসে একজন পুরুষ লামা জিজ্ঞাসা করলেন--আপনারা কি তীর্থযাত্রী, ভারত থেকে আসছেন ?
হ্যাঁ। প্রধান লামা আমাদের কথা জানেন তাঁকে খবর দাও। গুরুজী উত্তরে বললেন। লামাটি আমাদের কথা শুনে হাক্-ডাক্ শুরু করে দিলেন। তার ডাক শুনে কয়েকটি মেয়ে ছুটে এল, তাদের পরনে খয়েরি লামার পোশাক, মুণ্ডিত মস্তক। আমাদের সামনে এসে তারা প্রণাম করে দাঁড়াল। পূর্বপরিচিত লামা তাদের কি যেন বুঝিয়ে বললেন, মেয়েরা আবার আমাদের প্রণাম করে চলে গেল। সেখান থেকে আমরা একটা মন্দিরের কাছে এসে দাঁড়ালাম। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারদিক ভালো করে দেখতে লাগলাম। সরোবরটা এখান থেকে দেখা যায় না। চারদিকে শান্ত আর পবিত্রভাব। গরমকালে মনে হয় চাষ-আবাদ কিছু করা হয়। কিন্তু এখনও বাগানের কোণায় বরফ পড়ে রয়েছে, সবে গলতে শুরু করেছে মাত্র। প্রধান মন্দির ছাড়াও রয়েছে ছোটখাটো কয়েকটি মন্দির, আর লামাদের ধর্মশালা। মাঝে মাঝে বাতাসে উড়ে আসতে লাগল মাছের তীব্র গন্ধ। আমাদের চারপাশে গ্রামের লোকজন ও লামারা জমা হতে শুরু করেছে। তারপর এক সময় একজন বয়স্কা মহিলা আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন তার দু'পাশে দু'জন দু'জন করে চারজন অপেক্ষাকৃত কম বয়সের মহিলা। সকলেরই পরনে পুরুষ লামাদের মতো পোশাক, আর এই দারুন শীতেও মুণ্ডিত মস্তক ৷ তাঁরা আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। গুরুজী আমাদের সাথে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই মাতৃতুল্যা মহিয়সী মহিলাটিই হচ্ছেন এখানকার সর্বেসর্বা পরমারাধ্যা দোরজে পামো। আমরা একে-একে সবাই সাষ্টাঙ্গে তাঁকে প্রণাম করলাম। আমাদের প্রণামের পর সেই মঠের মেয়েরা এসে আমাদের একে-একে প্রণাম করে যেতে লাগল। লামাদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ছোট লামা বলে সহজেই সকলের দৃষ্টি আমার উপর পড়তে লাগল। প্রণামের পালা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মন্দিরের দরজার দু-পাশ থেকে বেজে উঠল মঙ্গল ভেরী। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তারা ভেরী বাজিয়ে আমাদের সম্বর্ধনা জানালো । এইভাবে আমরা আপ্যায়িত হলাম সামদিং গুম্ফায়। আমরা তাদের সম্মানিত অতিথি । তারপর আমাদের দু-পাশে মেয়েরা দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে আমাদের বরণ করল। আমি গুণে দেখলাম তাদের সংখ্যা মাত্র ছাপান্ন জন। তাদের প্রার্থনার উত্তরে আমরাও প্রার্থনা করলাম। আমাদের ছোট্ট সভার সেখানেই ইতি হল। মেয়েরা যে যার কাজে চলে গেল । মা-দোরজে পামো তাঁর সহচরী দু'জন লামার উপর আমাদের আতিথেয়তার ভার দিয়ে চলে গেলেন তাঁর ঘরে, বলাই বাহুল্য, তিনি খুব ব্যস্ত। আমরা দুপুরে মেয়েদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করার জন্য আমন্ত্রিত হলাম। শুরু হল আমাদের সামদি প্রদক্ষিণ ।
গ্রামটা ছোট কাজেই দেখার কিছু নেই। সামদিং গুম্ফাই হচ্ছে এখানকার আকর্ষণ।
মূল মন্দিরটিতে রয়েছে বিরাট শতবাহু বুদ্ধের মূর্তি। অন্যান্য মূর্তিগুলোর মধ্যে বজ্রপাণি প্রথম দোরজে পামোর মূর্তিই মনে হয় এখানকার ইষ্ট দেবতা। মন্দিরের মধ্যে রয়েছে কয়েকশ তাংখা, আর ছোট ছোট সোনার বিভিন্ন বুদ্ধাবতারের মূর্তি। অন্যান্য মন্দিরের মতো এখানেও জ্বলছে ঘিয়ের প্রদীপ। গীয়াৎসের তুলনায় সামদিং গুম্ফা কিছুই নয়। অন্ততঃ আমার সাধারণ চোখে ডায়েরীতে লেখার মতো ভালো তথ্য কিছু পেলাম না। আমি অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কারণ দোরজে পামো ও সামদিং গুম্ফার নাম শুনে ভেবেছিলাম যে এটাও একটা বিরাট কিছুতো হবেই ।
সবশেষে মন্দিরের পেছনে একটা ঘরে এসে আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম নতুন কিছু পেলাম। গুরুজী বললেন-আমরা এখন যে ঘরটাতে যাচ্ছি সেই ঘরটাতে বেদীর উপরে দেখবে সারি সারি বাক্স। সেই বাক্সগুলোর মধ্যে প্রথম থেকে এ পর্যন্ত সব দোরজে পামোর দেহগুলোকে মমির আকারে রক্ষা করা হয়েছে, এখানকার যিনি দেরজে পামো এই সব মরদেহগুলো সব তাঁরই, তিনিই একদেহ ছেড়ে অন্য দেহ ধারণ করেন। নতুন দেহ ধারণ করে অর্থাৎ দোরজে পামোর পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি তাঁর পূর্বের দেহগুলো দেখবার জন্য এঘরে আসেন। এখানে তাঁকে সম্পূর্ণ একলা থাকতে হয় তিন দিন। এই তিন দিনে তিনি সত্ত্ব রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের উপর ধ্যান করেন, তারপর সেই ধ্যান ভাঙার পর থেকেই তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারিণী হন।
আমরা সেই ঘরটাতে ঢুকলাম। ঘরটার মধ্যে মনে হয় মৃত্যুর মতোই ঠাণ্ডা বিরাজ করছে। একটা মাত্র প্রদীপের আলোকে ভালো করে কিছু দেখাও সম্ভব নয়। প্রদীপের সেই মৃদু রহস্যময় আলোকে আমাদের মমীর বাক্সগুলো দেখেই ক্ষান্ত হতে হল। সেই ঘরে কথা বলাও নিষেধ। তীর্থযাত্রীদের সাথে না এলে আমি নিশ্চয়ই সেই ঘরে অন্ততঃ একদিন থাকবার অনুমতি চাইতাম। তন্ত্রসাধনার কোন এক মূল রহস্য নিশ্চয়ই ওই ঘরটায় লুকিয়ে আছে।
এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে আমাদের প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেলো, তারপরে আমরা এলাম গ্রামে, গ্রামের পেছন দিকে সরোবরের ধারে আসতেই চোখে পড়ল বিরাট শুকনো মাছের কেন্দ্র। সরোবর থেকে মাছ ধরে, তার পেট কেটে পরিষ্কার করে হ্রদের ধারে বালির ওপর শুকোতে দেওয়া হয়েছে। চিল ও অন্যান্য পাখির হাত থেকে সেগুলোকে বাঁচাবার জন্য হাতে ঢিল নিয়ে ছেলেরা পাহারা দিচ্ছে। মাছের গন্ধটা এখান থেকেই আসছে। সরোবর থেকে মাছ ধরে শুকিয়ে তা চালান দেওয়া হয় লাসায়। যানবাহানের অসুবিধার জন্য টাটকা মাছ চালানের কোন ব্যবস্থাই নেই। সরোবরের ধারে কিছুক্ষণ ঘুরে আমরা আবার ফিরে এলাম গুম্ফায়। খাবারের ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে আমাদের নিয়ে আসা হল পাকশালায়। আস্তে আস্তে সেখানে সবাই এসে জড়ো হতে লাগল। বারান্দায় বেশ রৌদ্র এসে পড়েছে। সেখানেই দুটো সারিতে আমরা উবু হয়ে বসলাম। মেয়েরা আমাদের মুখোমুখি বসল। রান্নার দায়িত্ব এক এক দিন এক এক দলের উপর পড়ে। যারা রাঁধে তারাই পরিবেশন করে। এখানে মেয়েরা দশ বারো বছর যাবৎ ব্রহ্মচর্য ও সন্ন্যাসিনী ব্রত নিয়ে থাকে তারপর চলে যায় বিভিন্ন গ্রামে সেবার জন্য। দেখেই বোঝা যায় যে এখানকার পরিবেশটা শুকনো আর কঠোর তো বটেই। বিভিন্ন সব্জি, শুকনো মাছ, বার্লি ও চালের সংযোগে তৈরী হয়েছে এক অদ্ভূত ধরনের তিব্বতী খিচুরী, খেতে সত্যি খুব সুস্বাদু, রান্নার বাহবা দিতেই হবে। প্রার্থনা সেরেই যে যার খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল, খাওয়ার সময় একটাও কথা বলা চলে না। আমি সামনের মেয়েদের দিকে লক্ষ্য করতে লাগলাম—সাধারণ তিব্বতী-মেয়েরা খুব হাসিখুশী থাকে, কিন্তু এদের এই কঠিন সাধনার পথ থেকে মনে হয় হাসিটা সম্পূর্ণরূপে বিদায় নিয়েছে। এটাই কি আনন্দের পথ !
খাওয়া দাওয়ার পর আমরা মা দোরছে ফাগ্মোকে প্রণাম জানিয়ে ও তাঁর হাতে ছোট একটা হাতীর দাঁতের বুদ্ধ মূর্তি উপহার দিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। বেরোবার সময়ও দেখলাম মেয়েরা ও অন্যান্য কর্মীরা সবাই গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের বিদায় জানাবার জন্য। আমরা তাদের যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় ততদূর পর্যন্ত হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাতে লাগলাম ।
চলতে চলতে গুরুজী যমদ্রোক সরোবরটার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে লাগলেন—গরমের সময় অনেক তিব্বতী এই সরোবর পরিক্রমা করে থাকে । তাদের মতে এই সরোবর পরিক্রমায় খুব পুণ্যার্জন হয়। কিন্তু প্রদক্ষিণ করতে লাগে মাসখানেক প্রায় দু'হাজার মাইলের পথ। সমতল থেকে (সমুদ্র পৃষ্ঠ) এর উচ্চতা প্রায় ১৫০০০ (পনেরো হাজার) ফুট। গরমকালে এই সরোবরটায় অনেক রাজহাঁস দেখা যায়, আর রঙ বেরঙের অনেক মাছরাঙাও দেখা যায়, আমি অবশ্য সে সব চিনি না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন