মহাতীর্থ

বিমল দে

আমার ধারণা ছিল যে মানস সরোবরই ব্রহ্মপুত্রের উৎস। থোকচেনের পর থেকে আমার সে ধারণায় বার বার সন্দেহ দেখা দিচ্ছিল। কারণ হঠাৎ দেখলাম যে নদীর স্রোত উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে। তাহলে কি আমি দিগ্‌ভ্রান্ত হয়েছি। কিন্তু সকলেই আমাকে বার বার আশ্বাস দিয়ে বললেন যে আমি ঠিক পথেই চলেছি। আমার লক্ষ্যস্থল মানস তীর্থ আর স্বর্গভূমি কৈলাসের দিকে কাজেই এই প্রশ্নটাকে খুব জোর দিইনি। কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ সেই প্রশ্নটাই বার বার মনে দেখা দিচ্ছে।

গুম্ফায় ভোরবেলা প্রার্থনার পর দোংগলদাদাকে সেই প্রশ্নটাই করছিলাম। তিনি হেসে আমার প্রশ্নের সহজ ব্যাখ্যায় উত্তর দিলেন। সাংপো তিব্বতের প্রধান নদী। এই অঞ্চল থেকেই সেই নদীটার উৎপত্তি হয়েছে, ভারতবর্ষে সেইটাই নাম নিয়েছে ব্রহ্মপুত্র। এই অঞ্চলের পাহাড়ের বরফগুলো গলে গিয়ে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য নদী। সেই নদীগুলোর কয়েকটা শাসাং-এর প্রয়োগে মিলিত হয়ে নাম নিয়েছে সাংপো । আমি তাঁর কথায় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে শাসা-এর পর এ পর্যন্ত যে সব নদী পেয়েছি সেগুলোর সবই প্রায় স্বতন্ত্র নদী। থোকচেনের কোন নদীই সাংপোর সাথে মেশেনি। কতগুলো নদী একসাথে সৃষ্টি করেছে তামুলুং ৎসো অর্থাৎ তামুলুং হ্রদ ; কতগুলো নদী একসাথে মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে তাগ্‌ সাংপো ; আর কতগুলা নদী সৃষ্টি করেছে সামো সাংপো। সাংপো নাম হলেও মহানদী সাংপোর সাথে এদের কোন যোগাযোগ নেই।

আমরা চলেছি সাংপোর ধার ধরে। তাগ্‌ সাংপো এবং সামো সাংপো দুইই পড়েছে সো মাফাম্ বা মানস সরোবরে। সে কারণেই এখন দেখছি নদীর স্রোত উল্টোদিকে । আমরা এখন নদীর স্রোতের সাথেই চলেছি—লক্ষ্য মানস সরোবর। বলাই বাহুল্য যে আমাদের চারপাশে এখন বরফের রাজত্ব, বরফগুলো গলছে আর কল্কল্ করে তার শব্দ চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখানে দক্ষিণ হিমালয়ের গা থেকে শুরু হয়েছে ব্রহ্মপুত্র বা সাংপোর মূল উৎস—দূরত্ব প্রায় সত্তর মাইলের মতো। খুব ভোর বেলা আমরা রওনা দিয়েছি—আমাদের পথ এখন সহজ। রাস্তাটা এখন ক্রমশঃই নীচের দিকে নামছে, থোকচেনের উচ্চতা প্রায় পনেরো হাজার সাতশ ফিট আমরা এখন নামছি। মানস সরোবরের উচ্চতা প্রায় চোদ্দহাজার ন’শ ফিট, প্রায় সাতশ পঞ্চাশ ফিট নীচে।

আমাদের মনের জোর এখন পুরোপুরি ফিরে পেয়েছি। শরীরে হঠাৎ যেন হাতীর জোর এসে পড়েছে। মনের দুর্বলতা, দেহের ক্লান্তি, সব যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে।

দেহটাকে এত হাল্কা লাগছে যে মনে হচ্ছে এখান থেকে উড়ে যেতে পারবো। গতকাল শীতে অসার হয়ে যাওয়া নাকটাকে রগড়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিলাম সেটাও মনে হয় কোন এক যাদুমন্ত্রে সেরে গেছে ।

আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক যাবৎ দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলছিলাম। আস্তে আস্তে আমাদের কাছ থেকে সেই পাহাড় দূটো দুরে সরে যেতে লাগল, আমাদের সামনের দৃশ্যপট ধীরে ধীরে পালটাতে লাগল। মনে হতে লাগল যেন আমাদের সামনের পর্দাটা সরে যাচ্ছে, প্রতিমুহূর্তেই সামনের মঞ্চটা ব্যাপক হতে লাগল। মনের কৌতূহল আর উৎকণ্ঠাকে আর ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না, কোন এক অজ্ঞাত আকর্ষণে আমাদের চলার গতি বেড়েই চলল, শেষে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়াল যে আমরা প্রায় দৌড়তে লাগলাম। দোংগলদাদা আমাদের পায়ের তালে ছন্দ মিলিয়ে ধরিয়ে দিলেন মণিমন্ত্র । ওম্ ম-ণি পদ্ মে-হুম্, ওম্ ম-ণি পদ্ যে-হুম, ওম্ ম-ণি পদ্‌-মে হুম ....

তারপর এল সেই পরম লগ্ন, একটা ছোট পাহাড়ের দেয়াল ডিঙোতেই হঠাৎ আমরা এসে পৌঁছলাম স্বর্গরাজ্যে ....স্বর্গরাজ্যই বলব হঠাৎ আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। নয়ন ভরে দেখতে লাগলাম বিশ্ববিধাতার এই অনন্তরূপ! চক্ষু-কর্ণ ইত্যাদি সব ইন্দ্ৰিয়গুলো সজাগ হয়ে গ্রহণ করতে লাগল সেই রূপের আস্বাদন। আমাদের মধ্যে কোন রকম কথাই হল না সবই যেন এখানে আপনা থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। মনকে ডিঙ্গিয়ে প্রকৃতি এখন আত্মার সাথে যোগাযোগ করছে সেই যোগাযোগের মধ্যে এতটুকু বাধা নেই। আমার ব্যক্তি-আত্মা সেখানে হঠাৎ যেন খুঁজে পেয়েছে তার উৎস বিশ্বাত্মাকে, সেই মহামুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল এখানকার নীরবতা।

আমার সাথে প্রকৃতির সেই যোগাযোগকে যদি ভাষা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাই সেটা হবে তার বিকৃত রূপ। পিপাসার সময় যদি হাজার পাতা লিখে জলের বর্ণনা দেওয়া হয় সেটাকে বলবো জলের অপমান করা—জলকে পেয়ে তা পান করে উপলব্ধি করার মধ্যেই রয়েছে জলের যথার্থতা; বর্ণনা এক জিনিস আর উপলব্ধি অন্য জিনিস। বর্ণনা আনে বাহাদুরী, উপলব্ধি আনে মুক্তি। আমার এই ক্ষুদ্র প্রাণ কিছুক্ষণের জন্য যেন চিরমুক্তির স্বাদ গ্রহণ করছে। প্রকৃতি আমাদের মা—তাই তার এই অপরূপ সৌন্দর্যে ছেলের মহানন্দ উপস্থিত হয়েছে। সেই আনন্দকে ব্যক্ত করবো কি করে! আমাদের তিষ্ঠাবস্থা কাটতেই দোংগলদাদা আমাদের বুঝিয়ে দিতে লাগলেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ।

অনেকক্ষণ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটার পর কেউ যদি সাগরতীরে এসে পৌঁছায় তার যেমন অবস্থা হয় আমাদের অবস্থাও তাই। দোংগলদাদা ছাড়া আমরা চারজনই এই প্রথম এ পথের পথিক। আমাদের সামনে এক বিরাট সমতলভূমি তারই মধ্যে দু’একটা ছোটখাটো ঢিপির মতো পাহাড়। সেই সমতলভূমির কেন্দ্রমণি হয়ে রয়েছে দুটো হ্রদ। সামনেরটিই মানস সরোবর পরেরটি রাক্ষসতাল হ্রদ। তারও দূরে পাঁচিলের মতো ধুধু করছে পর্বতশ্রেণী। দক্ষিণের তুষারশুভ্র পাহাড়টির নাম গুরলামান্ধাতা। আর উত্তরে দুটো পাহাড়ের পিছনে একটা সাদা ত্রিকোণাকৃতি বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ আকাশের দিকে

উঠে গেছে সেটিই মহান কৈলাস। যাঁর কৃপায় আমার এই সাধারণ দেহটি এতদূর আসতে পেরেছে, যাঁর আশীর্বাদে আমার পথশ্রম এক নিমেষে দূর হয়ে গেছে, যাঁর প্রসাদে আমার এ জীবন সার্থক হল তাঁর উদ্দেশ্যে আমি সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করলাম। আনন্দাবেগে আনন্দাশ্রু বইতে লাগল—মাটিতে দেহ রেখে বারবার মাথা ঠুকে আমার ভক্তি-অর্ঘ্য নিবেদন করতে লাগলাম—

হে দয়াময়! এই দীন ভিখিরীকে তুমি যে অপার করুণা করেছো তার জন্য আমার ভক্তি অর্ঘ্য গ্রহণ কর। আমি পণ্ডিত নই আমি জ্ঞানী নই আমি যোগী নই, তবুও তোমার কৃপা আমি লাভ করেছি—আমার এ জীবন ধন্য! হে প্রভু করুণাসিন্ধু জগৎপতি ! তুমি আমাকে তোমার পাদপদ্মে স্থান দাও।

আমার সামনের এই দৃশ্যই স্বর্গদৃশ্য। যুগ-যুগান্ত ধরে চেয়ে থাকলেও বুঝি তৃপ্তি মিটবে না। প্রণাম ও প্রার্থনা সেরে আমরা একটু এগিয়ে গেলাম। সামনেই নজরে পড়ল বিরাট একটা ধ্বজা তার নীচেই রয়েছে ছোট্ট একটা চোরতেন বা স্তূপ। সেখানে গিয়ে আমরা প্রদক্ষিণ করলাম তারপর এখানকার প্রথানুযায়ী পাশের থেকে কয়েকটি পাথর এনে সেই স্তূপে যোগ করলাম ।

সামো সাংপোর এই জায়গা থেকে মানস সরোবরের দৃশ্য খুব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আশপাশের পাহাড়ের বরফগুলো গলে অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড়ী নদীর সৃষ্টি হয়েছে। সেই নদীগুলো সবই মানস সরোবরে গিয়ে পড়েছে। দোংগলদাদা আমাদের উপদেশ দিয়ে বললেন, এই সময় মানস সরোবর পরিক্রমা বা প্রদক্ষিণ করা সম্ভব নয়, কারণ চারপাশের নদীগুলো পার হবার জন্য কোন রকম সেতু বা খেয়ার বন্দোবস্ত নেই। তবে শীতের সময় এই নদীগুলো জমে বরফ হয়ে যায় সেই সময় তিব্বতীরা মানস প্রদক্ষিণ করেন।

দোংগলদাদা ও অন্য তিনজন তিব্বতী ভদ্রলোক সমেত তাঁরা যাবেন পুরাঙের দিকে। দোংগলদাদা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—এখন আমাদের ছাড়াছাড়ি হবার সময় হয়েছে তুমি কি করবে বলো ?

আমি কি করবো? আমি নিজেই প্রশ্ন করলাম। এখানে আসাই ছিল আমার স্বপ্ন এখন কি করবো কিছুই জানি না ৷

দোংগলদাদাকে জিজ্ঞাসা করলাম -এখানে তীর্থযাত্রীরা এসে কি করেন ?

দোংগলদাদা আমার কথায় হেসে ফেটে পড়লেন——সো মাফামে এসেছে৷ অথচ কি করবে জান না। শোনো এখানে সবাই আসেন পূজা করতে, পূজারী পাবে——তারা তোমার জন্য তোমার পূর্বপুরুষের জন্য পূজা ও প্রার্থনা করবেন। মানসে ডুব দিয়ে তুমি তোমার পূর্বপুরুষদের উদ্ধার করতে পারবে আর সেই সাথে হবে পুণ্যার্জন। তুমি যদি চাও তাহলে আমার সঙ্গে এসো আমার জানাশুনা অনেক লোক আছে তারা তোমাকে সাহায্য করবেন ।

মানস সরোবর রাক্ষসতাল আর কৈলাসনাথের সব তথ্য দোংগলদাদার নখদর্পণে। এখানে কোন হিন্দু মন্দির আছে কি না জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন—এই অঞ্চলে

কোন হিন্দু মন্দির নেই, তবে প্রত্যেক বছর ভারতবর্ষ ও নেপাল থেকে অনেক হিন্দু সাধুরা এখানে আসেন তীর্থ করতে। তাঁরা সবাই মানস সরোবরের চারপাশে যেসব গুম্ফা ও চৈত্য আছে সেখানে থাকেন। দোংগলদাদার মতে হিন্দু, সাক্য, চেন্-রে-জি এ সবের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তীর্থ এই মানসখণ্ড, এখানে সব মানুষ সামান শুধু ভাষাটা আলাদা ।

প্রসঙ্গক্রমে তাকে আমি জানালাম- আমার কাছে দিরাফুক্ ও লাংবোনা গুম্ফার লামা প্রধানের জন্য একটা চিঠি আছে কাজেই সেখানে যেতে হবে। দোংগলজী সোৎসাহে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন—তাহলে তো খুব ভাল–আমি তোমাকে প্রথম থেকেই বলছি যে তোমার ভাগ্য খুব ভাল। তিনি আমাকে পথ নির্দেশ দিয়ে বললেন যে, এখান থেকে লাংবোনা গুম্ফা মাত্র একদিনের পথ। এই রাস্তা ধরে সরাসরি এগিয়ে গেলেই আমি পাবো দিং ৎসো নামে একটা ছোট হ্রদ, সেখান থেকে মাত্র এক বেলার রাস্তা। সেখানে গেলে সেখানকার লামারাই করণীয় বিষয়ে উপদেশ দিয়ে দেবেন । দোংগলদাদার মতে এখন সরাসরি ৎসো মাফামে না যাওয়াই ভালো তাতে নদী নালার গোলক ধাঁধায় আটকে পড়ার সম্ভাবনা আছে। পথ খুব সোজা সো-মাফামকে বাঁ দিকে রেখে কৈলাসনাথের দিকে মুখ করে এগিয়ে গেলেই হবে।

আমি তাঁর হাতে দু'টাকা দিয়ে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানালাম, তিনি ভারতীয় মুদ্রা পেয়ে খুবই খুশী হলেন—তারপর আমাকে আরও কয়েকটি মূল্যবান উপদেশ দিয়ে বিদায় নিলেন ।

আমি এখন আবার একা। বিরাট আকাশের নীচে একটা হারিয়ে যাওয়া পাখীর মত । দোংগলদাদা যাচ্ছেন গুরলা মান্ধাতার দিকে আমি চললাম কৈলাসের দিকে। মানস সরোবরের সাথে মাইলখানেক দূরত্ব রেখে পায়ে চলা এই ছোট্ট রাস্তাটা প্রায় সমান্তরালভাবেই এগিয়ে চলেছে। তবে এই রাস্তাটা সরোবর হতে মনে হয় তিন-চারশো ফিট উঁচুতে।

দোংগলদাদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। মানস সরোবরের ওপারের দৃশ্যটা স্বপ্নের মত ধুধু করছে, পাহাড়ের চূড়াগুলোর কি অনবদ্য দৃশ্য। প্রায় দুপুরের দিকে হঠাৎ নজরে পড়ল একপাল ইয়াক্ আরও এগিয়ে যেতেই দেখি একপাল বললে ভুল হবে মাঠভর্তি। আশ্চর্য বটে! এই বরফের রাজত্বে ওরা খাচ্ছে কি? মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগল—এগুলো কি বন্য, এই অঞ্চলে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। আরও কাছে যেতেই নজরে পড়ল সারি সারি তাঁবু, যাযাবর।

আমি এবার সমতলে নেমে এলাম—আস্তে আস্তে তাঁবুগুলোর মধ্যদিয়ে হাঁটতে লাগলাম। তাঁবুগুলো সবই শূন্য ভেতরে কেউ নেই। আমাকে দেখে ইয়াকগুলো মাথা তুলে তাকালো বটে কিন্তু কোন রকম শব্দ করল না। বরফ গলার পর ঘাসগুলো সবেমাত্র আত্মপ্রকাশ করছে— ইয়াকগুলো তাই পরমানন্দে খুঁজে খুঁজে খাচ্ছে।

ধীরে ধীরে সূর্যদেব মাথার উপরে উঠতে লাগলেন। তার সাথে সাথে কৈলাসের দৃশ্যও বদলাতে লাগল। সূর্যের কিরণটা এখন খুবই উপভোগ্য, হাঁটতে বেশ মজা

আছে। চলতে চলতে পেলাম ছোট্ট একটা যাযাবরের দল। একটা তাঁবুর ধারে বসে সবাই সূর্যকিরণ উপভোগ করছে। তাদের মধ্যে সবাই প্রায় শিশু আর মধ্য বয়সী। আমাকে দেখেই তারা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে জিভ বার করে সম্মান দেখাতে লাগল । আমি তাদের উদ্দেশ্যে হাত তুলে মণি মন্ত্র উচ্চারণ করে আশীর্বাদ করলাম। শিশুদের মাথায় হাত দিয়ে একটু আদর জানাতেই তাদের অভিভাবকরা কৃতজ্ঞতায় মাথা নীচু করে তাদের কৃতার্থতা জানাতে লাগল। আমি চলার পথেই দুধারে যাদের পেয়েছি তাদের সাথেই হেসে আন্তরিকতা বিনিময় করলাম মাত্র। আমার সেই সাধারণ ব্যবহারে এদের মধ্যে চমৎকার প্রতিক্রিয়া ঘটল আমি যার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। চারদিকে সাড়া পড়ে গেল আশপাশের সবাই চেঁচিয়ে অন্যান্য সবাইকে ডাকতে লাগল। সেই ডাকে শুধু যে তিব্বতী শিশুরাই ছুটে এল তাই নয় অনেকগুলো কুকুর ও ইয়াকও এসে আমার চারদিকে ভিড় করল। এরা সকলেই আমার স্পর্শ পেতে চায়—-মৌনীবাবার আশীর্বাদ পেতে চায় ।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র এই কৈলাসখণ্ড——এখানে যারা বাস করে তারা ধন্য। তারা পবিত্র তারা ভগবানের সাক্ষাৎ সন্তান আমি তাদের আশীর্বাদ করবো কি মন্ত্রে। আমিই তাদের আশীর্বাদপ্রার্থী। শিশুদের মুখগুলো সব দেবসুলভ পবিত্রতায় ভর্তি। আর প্রত্যেকের চোখের জ্যোতিতে দেখতে পাচ্ছি দেবত্মার প্রকাশ। তাদের আশীর্বাদ করবো কোন ভাষায়? প্রভূর এ কি লীলা ? এ কি পরীক্ষা। মানস সরোবর আর কৈলাসনাথের প্রত্যেকটি পাথরে আছে শিবনাম--এখানকার বায়ুতে রয়েছে পরমাত্মার স্পর্শ, দৃশ্যে রয়েছে তার সাক্ষাৎস্বরূপ। স্বর্গীয় ছন্দ এখানে আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়ছে অনবরত। এখানে যারা থাকে তারা সবাই দেব—তবু তারা চায় এই ভণ্ড মৌনীবাবার স্পর্শ। তারা নীরবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। আমার মনের অবস্থা এদের বুঝাই কি করে ? কিছুই করার নেই। আমি অতটা না ভেবেই আরম্ভ যখন করেছিলাম কাজেই শেষ করতেই হবে। আমি কৈলাসের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তা ভগবান শিবের কছে প্রার্থনা করতে লাগলাম-

হে অন্তর্যামী! তুমি আমার মধ্য দিয়েই এদের আশীর্বাদ করো— আমার অপরাধ ক্ষমা করো—তুমি আমাকে তোমার পথে চালাও। তারপর আমি তাদের মাথা স্পর্শ করে আমার মাতৃভাষায় বললাম ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন তিনি তোমাদের সুখে রাখুন ।

সবচেয়ে সুন্দর এখানকার শিশুদের মুখ। এই দারুণ শীতেও তাদের মধ্যে এতটুকু কষ্টের রেখা নেই, এক একটি যেন ফুটন্ত গোলাপ । তাদের আশীর্বাদ করে আমি আবার রাস্তা ধরলাম। আমার পিছু চলতে লাগল সেখানকার সবাই। তাদের সাথে আমার একটা কথাও বিনিময় হয়নি অথচ মনে হচ্ছে তারা আমার পিছন ছাড়েনি আমি গুণে গুণে দেখলাম তারা চৌত্রিশজন—আমাকে ছাড়তে যেন তাদের প্রাণে বাঁধছে। আমরা সবাই থামতে বাধ্য হলাম, সামনেই একটা নদী। নদী নামে মাত্র ছোট্ট একটা খাল বলাই ভালো। খুব গভীর নয় কিন্তু পার হওয়ার অসুবিধা। আমাকে নিরুপায় দেখে যাযাবররা আমাকে আরও ডানদিকে উঠে আসতে বলল। তাদের কথানুযায়ী. আরও উপরে উঠতেই দেখি যে বড় বড় পাথর সাজিয়ে সেখানে একটা সেতুর মত করা হয়েছে। এখানে পার হতে কোন অসুবিধা নেই। ভেবেছিলাম যে এখানেই তাদের সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হবে। কিন্তু না, আমার অনুমান মিথ্যা আমার সাথে সাথে তারা সবাই নদী পার হয়ে এল। তারপর হঠাৎ এসে পৌঁছলাম মানস সরোবরের তীরে। আমার ডানদিকেও ছোট একটি হ্রদ আর বাঁদিকে মানস। নীল পরিষ্কার মানস সরোবরের উপরে ছোট ছোট ঢেউ উঠে তীরে আছড়ে পড়ছে। আমি তাড়াতাড়ি তার তীরে ছুটে গিয়ে জল স্পর্শ করে মাথায় ছিটিয়ে নিলাম। তারপর ভক্তিভরে মানস সরোবরের নাম না জানা অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের প্রতি ভক্তি-অর্ঘ্য নিবেদন করলাম। তারপর আপন মনেই মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল গায়ত্রী মন্ত্র—ওম্ ভূঃ পূর্বঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যম্ ভর্গো দেবস্য ধীমহী ধীয়ো ইয়ো নঃ প্রচোদয়াৎ, ওম্ ভূঃ ভূবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যম্ ভর্গো দেবস্য ধীমহী ধিয়ো ইয়ো নঃ প্রচোদয়াৎ, ওম্ ... ।

সূর্যদেবের অবস্থান দেখে মনে হয় এখন মধ্যাহ্ন। পেছনে তাকিয়ে দেখি ছেলেমেয়ের দল আমার পেছন ছাড়েনি। তাদের দিকে তাকাতেই তারা আমাকে ইসারায় তাদের অনুসরণ করতে বলল, নিশ্চয়ই কোন বিশেষ কারণ আছে নয়তো এতখানি পথ ওরা আমাকে অনুসরণ করবে কেন? এই ভেবে আমি ওদের অনুসরণ করলাম, সরোবরের ধার ধরে যেতে যেতেই নজরে পড়ল দুটো রাজহাঁস | প্রথম প্রথম বিশ্বাস করতে পারিনি ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম—ঠিকই তো। এই বরফের দেশে রাজহাঁস দেখবো কল্পনাও করতে পারিনি। দূরে সাদা পাহাড়ের চূড়া আর এখানে পরিষ্কার নীল জলের উপর ধবধবে সাদা রাজহাঁস সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সত্যি স্বর্গরাজ্য। পরে দেখলাম যে মাত্র দুটো নয় আরও অনেক রাজহাঁস এখানে মনের আনন্দে বিচরণ করছে। মা সরস্বতীর এর চেয়ে পবিত্র প্রতিভূ আর কি হতে পারে ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা হ্রদের ধারে আরও কয়েকজন তিব্বতীদের সাথে এসে মিলিত হলাম। তারা মাছ শুকোচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম এরা স্থানীয় জেলে কিন্তু পরিচয়ের পর বুঝতে পারলাম যে এরাও আমার পূর্বপরিচিত যাযাবরদেরই লোক। অভিবাদনের পর তারা আমাকে বার বার বুঝিয়ে দিতে লাগল যে এরা মাছগুলোকে মারেনি, প্রাণিহত্যা এখানে পাপ। মাছগুলো মরে ভাসছিল তারপর ঢেউয়ে ঢেউয়ে তীরে এসে পড়েছ—এরা সেই মরা মাছগুলো শুকিয়ে নিচ্ছে মাত্র। কাজেই খেতে দোষ কি ? তারা আমাকে কয়েকটি বিশেষ রকমের মাছ দিয়ে খেতে অনুরোধ করল। লামারা সাধারণতঃ প্রাণিহত্যা করেন না তবে অপরে হত্যা করলে তাদের খেতে বাধা নেই। আর আমারও সেই সময় খুব খিদে পেয়েছিল তাই মানস সরোবরের প্রসাদ মনে করে তাদের সাথে খেতে আরম্ভ করলাম। মাছের সঙ্গে পেলাম তন্দুরী ধরনের খুব মোটা একটা রুটি। এখন বুঝলাম যে যাযাবররা কেন আমার সাথে সাথে এতদূর এসেছে। আসলে এখন ওদের খাওয়ার সময়। আর সেই সাথে সাথে মৌনীবাবাকে খাইয়ে তারা পুণ্যার্জন করল। আমি যে মাছটা খেলাম সেটা অনেকটা আমাদের দেশের চিল্কা হ্রদের বড় পুঁটির মতো। খেতে অনেকটা কাঁচা ভেট্‌কির মত স্বাদ। অনুমানে বুঝলাম যে যাযাবররাই ইয়াকগুলোর মালিক। ইয়াকগুলো নিজের ইচ্ছায় খাদ্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, এরা তার দেখাশুনা করে মাত্র। এদের মধ্যে কিছু লোক কুকুরগুলোর সাহায্যে ইয়াক দেখাশুনো করে আর বাকি সবাই চলে আসে হ্রদের ধারে মাছের আশায়। কোন এক অজ্ঞাত কারণে মাছগুলো মরে ভেসে উঠে জলের উপরে আর ঢেউয়ে ঢেউয়ে সেগুলো এসে পড়ে হ্রদের ধারে, সারাদিন ধরে এরা ঝিনুক কুড়োবার মত করে এই নানা ধরনের মাছগুলো কুড়িয়ে তোলে তারপর সেগুলো শুকিয়ে ঝলসিয়ে খায়। মাছ ছাড়া এরা নানা ধরনের পাথরও সংগ্রহ করে তারপর বাজারে বা তীর্থযাত্রীদের কাছে সেগুলো বিক্রি করে। এদের সাথে থাকলে অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে পারতাম কিন্তু আমাকে যেতে হবে গুম্ফায়, তাই তাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমি আবার পথ ধরলাম ।

যাযাবররাই আমাকে লাংরোনা গুম্ফার পরিষ্কার রাস্তা বলে দিল। এই হ্রদ ধরেই আমাকে সরাসরি উত্তরের দিকে হাঁটতে হবে কিছুতেই হ্রদের তীর ছাড়া চলবে না। অনেকক্ষণ চলতে চলতে যখন একটা নদী পাবো, সেই নদী ধরে উপরের দিকে পাবো একটা সেতু, সেতুটা পার হলেই লাংবোনা গুম্ফা। তিব্বতীরা যখন কোন পথের নির্দেশ দেয় তখন সময়ের মাপ হিসেবে ব্যবহার করে কিছুক্ষণ, অনেকক্ষণ, একবেলা, দু'বেলা, একদিন-দুদিন ইত্যাদি। ঘন্টা বলে যে একটা শব্দ আছে তা তারা বোধহয় জানে না। আমি অবশ্য সাধারণ তিব্বতীদের কথা বলছি।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%