দুর্গম পথ

বিমল দে

চীনা সৈন্যদের তাঁবু ও চলাচল এখন সাংপোর ওপারে অর্থাৎ নদীর দক্ষিণে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে হিমালয় পর্বতশ্রেণী। কাজেই তাদের ভয় আর এদিকে নেই। কিন্তু তাই বলে পথটা মোটেই সহজ নয়। গ্যাংটক থেকে যাবার পথে অনেক ওঠানামা করেছি অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও মনের জোর এতটুকু কমেনি। এখানেও মনের জোর আমার অটুট আছে কিন্তু গায়ের জোর যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ভারত থেকে যাঁরা এই মহাতীর্থে আসেন তাঁরা সবাই আসেন আমোরা ও পাহাড়ি গাড়োয়াল হয়ে। ভারত থেকে সীগাৎসে হয়ে কেউ মানসে আসেন না। আমি যে পথটা ধরে চলেছি সেটা তিব্বতের আভ্যন্তরীণ পথ। লাসা বা রাজধানীর সাথে যোগাযোগের পথ ।

গীয়াৎসে, সীগাৎসে ও লাসা সেই অঞ্চলগুলোই তিব্বতের আশীভাগ লোকের বসবাস। তিব্বতের এই অঞ্চলটা সত্যি মরুভূমি। জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে । এখন গরমকাল কিন্তু রুক্ষ ঠাণ্ডায় কে বলবে গরমকাল ? বরফ পড়ে শূন্য ডিগ্রীতে এখানকার আবহাওয়া প্রায় অধিকাংশ সময়েই শূন্যের নীচে। আশপাশে কোন বিরাট পাহাড় নেই—উপত্যকার মত। আমার একদিকে সাংপো আর তার বালি কাকরে ভর্তি তীর আর অন্যদিকে পাথরে ভর্তি সমতল। বলাই বাহুল্য, রাস্তাটা কাঁচা, নদীর দক্ষিণে হিমালয়ের বিরাটউঁচু পাহাড় আর উত্তরে ধু ধু করছে কুল্লুন পাহাড়। আমি এখন চ্যাং-ত্যাং এর রুক্ষ মরুভূমির মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছি। মাঝে দু' একটি যাযাবরদের তাঁবু দেখতে পেয়েছি কিন্তু সেখানে যাবার ইচ্ছা একদম নেই। যাযাবররা আমাকে দেখতে পেয়েই ভিখিরীর মতো ছুটে আসে পয়সার জন্য। একবার তাদের দৃষ্টিগোচর হলে উদ্ধার পাওয়া মুশকিল ।

আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে দুর্গম পথ অনেক দেখেছি, দুর্গম বলতে আমি বুঝতাম পাঁচিলের মতো খাড়া পাহাড়, বন-জঙ্গলে ভর্তি যেখানে হিংস্র জন্তুর অভাব নেই অথবা ঝড় জলে যখন পথ চলা মুশকিল। এখানে বাঘ ভালুকের ভয় নেই কিন্তু দারুণ শীতে শরীর আপনা থেকেই দিন রাত কাঁপছে। রাস্তায় চায়ের দোকানের নামগন্ধও নেই । রাতের পর রাত চলেছি, দিনের বেলা যখন সূর্যদেব মাথার উপর দেখা দেন তখন রাস্তার ধারেই কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ি—এইভাবে দিনের বেলা ঘুমোই আর রাতের বেলা চলি। গত দু'দিন দুরাত্রির মধ্যে পেটে গরম কিছু পড়েনি। ভুট্টা, আটা আর শুকনো যবের সাথে সাংপোর জল মিশিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছি। চারদিকের গভীর ও অনন্ত নিঃশব্দ ভাঙ্গাবার জন্য মন্ত্র আর বীজমন্ত্র পাঠ করছি, চিন্তার সাথে কথা বলছি। আর মনের ভাব উজাড় করে দিয়ে গান ধরছি। আমার সুস্থাবস্থার সাথে তুলনা করলে মনে হবে এটা আমার মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ। আমার এক ব্রত, চলতে হবে। মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়েছি, পেছন দিকে তাকিয়ে ভেবেছি—কি হবে এগিয়ে—কি পাবো—এত কষ্ট করে এগিয়ে লাভ কি, আমার মতো লক্ষ মানুষ পেছনে রয়েছে। কই তারা তো এগুচ্ছে না, তাই বলে তাদের অগ্রসর কি ব্যর্থ হয়েছে ? দুএকবার মনে হয়েছে দূর ছাই! ফিরে যাই এবার অনেক হয়েছে আর নয়। কিন্তু ফিরে যাওয়া কি এতই সহজ? এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে ফিরে যাওয়া আরও কঠিন। এ অবস্থায় আমি এগিয়ে যাওয়ার পথে বাঁধা পড়েছি।

মনের জোর আর দেহের ক্লান্তি দুই মিলিয়ে আমাকে প্রতি মুহূর্তে করে দিচ্ছে দুর্বল। সাধুবাবার উপদেশ লামাদের উৎসাহ আর আমার উদ্দীপনা সব কিছুকে এই অবস্থায় মনে হচ্ছে নিছক কথা। পুণ্যার্জন করে করবটা কি ? পুণ্যার্জন স্বর্গবাস কৈলাস দর্শন সবই হয়তো বিরাট একটা ভাঁওতার দুনিয়া। সন্ন্যাস, গৈরিক বস্ত্র, ত্যাগ সবই মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার আর এক অবলম্বন। আসলে মানুষে মানুষে পার্থক্য আছে কি ? কারও কপালে কি খড়ি দিয়ে লেখা আছে—এ জ্ঞানী আর ও অজ্ঞানী। বেঁচে থাকার জন্য কেউ বাদাম বিক্রি করে, কেউ ভিক্ষে করে, কেউ ছেলে পড়িয়ে খায় আর কেউ ধর্মকথার বুলি শুনিয়ে ভক্তের ঝুলি শূন্য করে। সবই জীবনকে চালাবার একটা অবলম্বন মাত্র। অতএব ধর্মের জন্য আর এগিয়ে লাভ কি ? মোটকথা আমি হাঁপিয়ে গেছি। আমার শরীরটা শুকিয়ে আরও ছোট হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়ার অভাবে দুর্বল হয়ে গেছি, ঠাণ্ডায় ঠোঁট ও গাল দুটো ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এখন এগুবার বাধা অনেক। ঠাণ্ডা বাতাস, নিঃসঙ্গতা মাথা গুজবার স্থানাভাব—খাদ্যের অভাব তার উপর আছে বার বার ছোট ছোট নদী ডিঙ্গোবার সমস্যা। প্রায় প্রত্যেকদিনই সাংপোতে পাচ্ছি অন্যান্য নদীর সঙ্গম, তা পাড়ি দেবার জন্য আমাকে নদী ধরে উঠতে হচ্ছে উত্তরে যেখানে সে সরু হয়েছে বা জলের গভীরতা কমিয়েছে একমাত্র সেখান দিয়েই পার হওয়া সম্ভব। মাঝে মাঝে অবশ্য মান্ধাতা আমলের ভাঙা সেতু পাওয়া যায় কিন্তু সেই সেতু দিয়ে হাঁটতে গেলেই মনে হয় সবশুদ্ধ গড়িয়ে পড়বো নীচে ৷

এত সত্ত্বেও আমি এগিয়ে চলেছিলাম কিন্তু এখন হঠাৎ যেন আমার মনটা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। অন্তরাত্মার সঙ্গে সে কিছুতেই চলতে রাজি নয়। লাসা ছাড়ার পর আমার কাশি হচ্ছিল। সেই কাশিটা এখন আরও বুকের উপর জোর করে চেপে বসেছে। মনের এই অবস্থায় বার বার মনে হচ্ছে এখন যদি চীনারা আমাকে ধরে নিয়ে যায় তাহলে খুব ভালো হয় অন্ততঃ থাকবার জায়গাতো একটা পাওয়া যাবে। এ ঠাণ্ডা বাতাস সত্যি অসহ্য। চারিদিকে ছোট ছোট ঘাস সবে জন্মাতে শুরু করেছে—আগুন জ্বালাবার মতো একটা শুকনো ঘাসও এখানে পাওয়া যাবে না। দেহটাকে চালায় মন সেই মনটাই এখন ভেঙে পড়েছে। বাড়ী থেকে পালিয়ে বেড়ানোর মজা এখন হাড়ে হাড়ে অনুভব করছি। হাজার মাইল দূরে আমার পোশাক পাল্টে নতুন রূপে যে খেলায় মত্ত হয়েছিলাম এখন তারই ফল পাচ্ছি। যাকে বলে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাশ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি, চব্বিশ ঘণ্টা আগেও আমার এ অবস্থার কথা আমি চিন্তা করতে পারিনি—দাঁড়ালে ঠাণ্ডা বাতাস কাজেই ইহা সত্ত্বেও আমি চলতে বাধ্য হচ্ছি। চলার আনন্দ যেন হঠাৎ ফুরিয়ে এসেছে। তিব্বতের এই দুর্গম পথেই হয়তো শেষ হবে এই জীবন ।

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এল। দূর হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম দূরে ছেড়ে আসা আমার দেশের কথা। নদীর তীর থেকে মনে হচ্ছে ধুয়ো উঠছে। ভাল করে চোখটা রগড়ে নিলাম—না, ভুল দেখার কোন কারণ নেই দূরে নদীর ধার থেকেই কুণ্ডলী পাকিয়ে ধুয়ো উঠছে আকাশের দিকে। কিন্তু এখন ভাববার সময় নেই, হোক চীনাদের ক্যাম্প ওরা মানুষ তো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ধোয়ার দূরত্বটা কমে এল। কাছে আসতেই দেখি নদীর ধারে কয়েকজন তিব্বতী বসে আগুন পোহাচ্ছে। আগুন পেয়ে আমি যেন নব জীবন পেলাম। সেখানে একটি লোক আমাকে দেখে অনেক দিনের পুরান কেটলিটায় গরম জল বসালো। মৌনীবাবা তাদের সাথে কথা বলে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে এল। আমি তাদের সকলকে চা খাওয়াবার জন্য পয়সা দিলাম। দিনের শেষে খেয়াঘাটের মালিক এরকম দরাজ একজন লামা পেয়ে আনন্দে হি হি করে হেসে উঠল, তার সেই আনন্দে আমিও যোগ দিলাম। স্বীকার করতেই হবে যে সেদিনকার সেই মৌনীবাবাকে সেই মাঝি ওরফে চায়ের দোকানের মালিকই জীবন দিল ।

তাদের মুখ থেকেই শুনলাম যে থোকচেন এখান থেকে মাত্র একদিনের পথ। এইটা হচ্ছে সাসাং গ্রাম গীয়াবুনাক্ গ্রামটা মনে হয় রাতের অন্ধকারেই হারিয়ে ফেলেছি। সেই রাতে তাদের সহৃদয় আতিথেয়তা আমাকে পুনর্জন্ম দিল ৷

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%