বিমল দে
বিকেলের দিকে দাদু আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন,
—তুমি লাসায় দালাই লামাকে দেখেছো ?
—আজ্ঞে হ্যাঁ দেখেছি তবে তাঁর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য হয়নি। আমি জবাব দিলাম ।
- - তাঁর সাথে অবশ্য কথা বলে লাভ নেই। সে এখনও ছেলেমানুষ, আর সব সময় লোকজনেরা তাকে ঘিরে রাখে। কিন্তু পাঞ্চেন লামার কথা আলাদা, কোথায় কি করতে হবে তা তিনি ভালোভাবেই জানেন।
দাদুর কথায় আমি অবাক হয়ে গেলাম, তাঁর সুরে স্পষ্টই বুঝতে পারলাম যি তিনি দালাই লামার থেকে পাঞ্চেন লামাকেই বেশী শ্রদ্ধা করেন। দালাই লামা তাঁর কাছে নাবালক মাত্র। কথায় কথায় দাদুর কাছে আরও অনেক কথা জানতে পারলাম। তিনি বলতে লাগলেন--
এককালে পাঞ্চেন লামাই ছিলেন তিব্বতের ধর্মগুরু। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে আস্তে আস্তে দালাই লামা সে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। এরজন্য অবশ্য দালাই লামাকে দোষ দেওয়া যায় না আসল দোষী হচ্ছে তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা। দালাই লামাকে কেন্দ্ৰ করে তারাই আসলে তিব্বতের বড় বড় পদ দখল করে বসে আছে। এমন এক সময় ছিল যখন ছোট দালাই লামা বড় হয়ে রাজ্যশাসনের ক্ষমতা পাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হত। এই মৃত্যুর মুলেই ছিল মন্ত্রীমহলের কারসাজি। তিব্বতের এই যে লামা ধর্ম সেই ধর্মের মূল রহস্য আসলে পাঞ্চেন লামারাই ভালোভাবে জানেন। অতি প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের যেসব তীর্থযাত্রী এই পথে মানস প্রদক্ষিণে যেতেন তারা সবারই পাঞ্চেন লামার আশীর্বাদ নিতেই এ পথ দিয়ে যেতেন। অনেকের মুখে তুমি শুনবে যে পাঞ্চেন লামা চীনাপন্থী, কথাটা ঠিক নয়। আসলে তিনি দূরদর্শী। আমাদের তিব্বত ছোট্ট একটা দেশ। তুমি লাসা দেখেছো কলকাতার সাথে তুলনা করলে তা একটা ছোট্ট শহর মাত্র। চীন আর ভারতের তুলনায় এটা নিতান্তই ছোট, আমাদের না আছে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র না আছে সামর্থ্য, হঠাৎ যদি বাইরের কোনো শত্রু আমাদের আক্রমণ করে তাহলে কে রক্ষা করবে? কাজেই আমাদের চাই একটা শক্তি যে আমাদের রক্ষা করবে। তিব্বত বরাবরই চীনের অধীনে ছিল, তিব্বতের দুর্দিনে চীনারাই এগিয়ে এসেছে রক্ষা করতে। তিব্বতের সৃষ্টির মুলেই ছিল চীন। চীনা সম্রাটরাই পঞ্চম দালাই লামাকে চেন্-রে-জি করে রাজার সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।
এসো, এই ঘরে এসো, দ্যাখো, ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখো, সামনের এই যে বিরাট ফটোটা দেখছো, জানো, এই ছবিটা কার? এটা হচ্ছে এখনকার ঠিক আগের পাঞ্চেন লামা (১৯২৩), তিনি ইংরেজদের কাছে নিজেকে বিলিয়ে না দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য চলে গিয়েছিলেন চিংঘাইতে, সেখানেই তিনি দেহত্যাগ করেন। কয়েক বছর পর সেই প্রদেশেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন (১৯৫২)। সেই শিশু পাঞ্চেন লামা চীনাদের সাহায্যে আবার ফিরে আসেন এখানে। চীনারা সাহায্য না করলে তিনি কোনোদিনই সীগাৎসে তাঁর প্রভাব ফিরিয়ে আনতে পারতেন না। চিংঘাই-এর সেই শিশু পাঞ্চেন লামাই বর্তমান মহান পাঞ্চেন এরডেনি (Panchen Erdeny ) । শুধু কি তাই এই দ্যাখোনা চীনাদের সাথে আমাদের কত মিল স্বভাবচরিত্র ও চেহারায় আমরা তাদেরই মতো ।
দাদু মনে হয় অনেকদিন পর তার মনের কথা শোনাবার জন্য লোক পেয়েছেন—তাই তিনি মহা উৎসাহে তিব্বতের ইতিকথা আমাকে শোনাতে লাগলেন । তাঁর কথাতে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তিনি হান্ বা চীনা দরদী। দাদুর কাছ থেকে আরও যা জানতে পারলাম তারই সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি— হারা সমস্ত তিব্বতেই এখন ছড়িয়ে পড়েছে। একমাত্র লাসাতেই তারা এখনও সম্পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কারণ সেখানে লামা ও গুম্ফাগুলো খুব শক্তিশালী। তিব্বতের কালুন (Kaloon) শ্রেণীর বনেদি সম্প্রদায়েরাই দালাই লামার কাশাগ্ মন্ত্রীসভার সর্বেসর্বা। তারা কিছুতেই হানদের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করছে না। চীনারা এখন তাদের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তিব্বত আর চীনদেশের মধ্যে আজকাল আর কোনো বর্ডার নেই । তিব্বতীরা হামেশাই চীনদেশে যাতায়াত করছে।
লামাদের মধ্যে পাঞ্চেন লামাই হচ্ছেন সবচেয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আর হবেনই বা না কেন শত হলেও পাঞ্চেন লামাই দালাই লামা ও সমস্ত তিব্বতের ধর্মগুরু। হান্দের সাথে দালাই লামা যে চুক্তিতে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন তা পাঞ্চেন লামা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন। কাজেই চীনারা এখন এই সীগাৎসে অঞ্চলের উন্নতির জন্য সবরকম বন্দোবস্ত করছেন। তিব্বতে আগে যানবাহনের রাস্তা ছিল না, আজকাল চীনা সৈন্যরা পাচটা রাস্তা তৈরী করেছে। সীগাৎসে থেকে কাঠমাণ্ডু এখন সরাসরি জীপ গাড়ী করে যাওয়া যায় ৷
চীনা সৈন্যবাহিনী তিব্বতের উন্নতির জন্য উঠে পরে লেগেছে, ইতিমধ্যে সীগাৎসের অনতিদূরে একটা বিমান বন্দর তৈরী হচ্ছে। তিব্বতের যুবক যুবতীরা দলে দলে শিক্ষার জন্য পিকিং যাচ্ছে। ভিখিরি সম্প্রদায় যারা না খেতে পেয়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতো তারা এখন চীনা সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবার সুযোগ পাচ্ছে। চারিদিকের মিলিটারী ব্যারাকে সহজেই কাজ পাওয়া যাচ্ছে।
দাদুর ভাষায় বলতে গেলে হানদের আগমনকে স্বাগতম্ জানানোই বুদ্ধিমানের কাজ। বর্তমানে সীগাৎসে এলাকায় যে সব উন্নয়ন পরিকল্পনা হচ্ছে তার মূলেই আছেন পাঞ্চেন লামা। দাদুর কথাগুলো স্পষ্ট আর যুক্তি 'ভরা। মনে মনে ভাবতে লাগলাম তাঁকে আমার বিষয়ে সব জানিয়ে ভালো করেছি কী ? যাক যা হবার হবেই, যা বলেছি তা এখন ফিরিয়ে নিতে আর পারবো না। তিনি চীনা পন্থীই হোন আর দালাই পন্থীই হোন তাতে আমার কিছু যায় আসে না। দাদুর কথাতেই জানলাম যে সীগাৎসে এখন চীনা সামরিক বাহিনীতে ভর্তি। তাই অতি সাবধানে তাদের ভেতর থেকে এখন আমাকে বেরোতে হবে। দাদুর বাড়ীতে সেই আপন করা পরিবেশ, আপ্যায়ন আর তাঁর সহজ পবিত্র স্বভাবের মায়া ত্যাগ করে আমাকে বেছে নিতে হবে কৈলাসের পথ। দাদুর সাথে বিকেলে শহরের দিকে বেড়াতে গেলাম, প্রায় লাসার মতোই সীগাৎসে একটা বিরাট শহর। পাকা বাড়ী আর রাস্তাঘাটের অভাব নেই, তবে পোতালার মতো সেই স্বতন্ত্র পাহাড়ের উপর রাজবাড়ী এখানে নেই ।
সাংপোর উপত্যকায় সীগাৎসে একটি সুন্দর শহর। সমতল ভূমির উপর প্যাগোড়া ধরনের বাড়ীগুলো অতি চমৎকার। বিভিন্ন বাড়ীর দেয়ালে চীনা সরকারের শ্লোগান চোখে পড়বেই। পাঞ্চেন লামার রাজপ্রাসাদ দূরে পাহাড়ের গায়ে। পাঁচটি বিরাট বিরাট সৌধকে দেখিয়ে দাদু বললেন যে সেগুলো বিভিন্ন পাঞ্চেন লামার স্মৃতিসৌধ। পাঞ্চেন লামা বা পাঞ্চেন এরদেনি'র রাজপ্রাসাদ ও গুম্ফা একই সাথে, তার নাম তাশী লুম্পো । তাশী লুম্পো গুম্ফা তিব্বতের একটি অন্যতম প্রসিদ্ধ গুম্ফা। এখানে প্রায় চার হাজার লামা থাকেন। গুম্ফার প্রত্যেকটি দেয়ালেরকারুকার্য তাংখা আর পাঠাগার বিভাগ পৃথিবী বিখ্যাত। মন্দিরের পুজাসামগ্রী ও আসবাব পত্র সব খাঁটি সোনার। এই তাশী লুম্পো লামাদের এক পবিত্র মন্দির।
দাদু না বললেও সীগাৎসের রাস্তায় সামরিক পোশাকে সজ্জিত চীনা সৈন্যদের যাতায়াত আমার চোখ এড়াল না। কথায় কথায় জানতে পারলাম যে ভারত তিব্বত সীমান্ত রক্ষার জন্য সীগাৎসে ও গীয়াৎসের দুর্গগুলো এখন চীনা সামরিক বাহিনীতে ভর্তি।
একটা চৌরাস্তার কাছে আসতেই দাদু আমাকে একটা পাকা রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে বললেন—তুমি এই রাস্তাটা ধরবে এই রাস্তাটা সরাসরি কাঠমান্ডু গিয়ে পৌঁছেছে। কৈলাসে একা একা গিয়ে কি করবে? সে অনেক দূরের পথ তুমি পারবে না। তিনি সস্নেহে আমাকে সাবধান করে দিলেন ।
দাদুর কাছ থেকে পাঞ্চেন লামা ও সীগাৎসের চীনা কর্তৃত্বের কথা শোনা অবধি আমি সেই শহর থেকে বিদায় নেবার জন্য ছট্ফট্ করতে লাগলাম। আমার শরীরের যে অবস্থা তাতে এমন একজন শ্রদ্ধাবান্ পুরুষ ও তাঁর আশ্রয় কিছুতেই আমি ছাড়তাম না। এ ধরনের আশ্রয় যে কোন একজন তীর্থযাত্রীর কাছে অত্যন্ত লোভনীয় ব্যাপার। কিন্তু দেহ আমার যতই কাহিল হোক না মন বলছে এগিয়ে চল এগিয়ে চল। সেই আশ্রয় ছাড়ার জন্য আমার মন অতি চঞ্চল্গ হয়ে উঠল। খাওয়া দাওয়া দাদুর সাথেই করলাম।
অনেকদিন পর সেদিন রাতে একটা বিছানা পেলাম, তিব্বতী শীতে সত্যিকারের একটা লেপ পাওয়া স্বপ্নের ব্যাপার। স্বপ্ন হলেও সত্যি। ভেবেছিলাম খুব ভোরবেলা উঠব কিন্তু ঘুমটা এত পাকা হয়েছিল যে উঠতে উঠতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। দাদুই আমাকে ডেকে তুললেন। অনেকদিন পর ভদ্রলোকের মতো প্রাতঃকৃত্য সারলাম। তারপর বৈঠকখানা ঘরের টেবিলে বসতেই পেলাম নোনতা সুজি আর একগ্লাস গরম চা। দাদুর ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই তাঁকে বার বার আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলাম ।
দাদুর কাছ থেকে ডায়রী লেখার মতো কিছু কাগজ আর একটা পেন্সিল পেলাম। কিছু খুচরো তিব্বতী পয়সাও তিনি আমার হাতে গুঁজে দিলেন আর পথের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ শুকনো খাবার। দাদুকে বিদায় দিলাম। রাস্তায় নেমে হঠাৎ খেয়াল হল তাইতো ! একদিন একরাত দাদুর সাথে কাটালাম অথচ তাঁর নাম জানা হয়নি। তাঁর আপন করা স্বভাব ও স্নেহে আমি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলাম যে তিনি আমার অপরিচিত।
রাস্তায় যখন নেমেই পড়েছি তখন ফিরে গিয়ে আর লাভ নেই। নাই বা জানলাম তাঁর নাম, তিনি চিরদিনই আমার হৃদয়ে দাদুর স্থান দখল করে থাকবেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে তাঁকে আমি সব খুলেই বলেছিলাম। আর তিনি ভেবেছিলেন অন্য রকম, দাদুর মতে আমি একটি নেপালী ছেলে কৈলাসনাথে যাবার জন্য আমি তীর্থযাত্রীদের দল থেকে পালিয়ে এসেছি। আমি যে একটি ভারতীয় ছেলে সে কথাটা তিনি কিছুতেই বুঝতে পারেননি। তাঁর সহজ আর মহানুভবতার এই হল আর এক পরিচয়। সেই জন্যই তিনি বার বার আমাকে কাঠমাণ্ডুর পথই দেখিয়ে দিচ্ছিলেন।
সীগাৎসে একরাত কাটিয়ে আমি নতুন উদ্যমে চলতে শুরু করলাম। পথের নির্দেশ পেলাম, রসদ পেলাম আর মনোবলকে দ্বিগুণ করে ফিরে পেলাম। কৈলাসের স্বপ্ন এখন বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে—মনে মনে অদৃষ্ট দেবতাকে ভক্তিভরে প্রণাম জানালাম —তুমি আমাকে তোমার পথে নিয়ে চল ৷
ব্রহ্মপুত্র ডানদিকে রেখে পাহাড়ের গায়ে তাশী লুম্পোর বিরাট প্রাসাদগুলো দেখেই আমি সন্তুষ্ট হলাম। ইয়াটুং, গীয়াৎসে থেকে শুরু করে জোখাং, পোতালা পর্যন্ত অনেক গুম্ফা দেখেছি কাজেই তাশী লুম্পো আমার না দেখলেও চলবে। গীয়াৎসের চীনা সামরিক বাহিনীর নমুনা দেখে মনে হয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যাওয়াই ভালো । বিশেষ করে ওদের জেরায় পড়তে আমি রাজি নই ।
সাংপোর উপত্যকা এখানে সমতল রাস্তাটাও লরী জিপ চলাচলের পক্ষে খুবই ভালো, তারই ধার ধরে আমি এগিয়ে যেতে শুরু করলাম। আবহাওয়াটা এখন মোটামুটি ভালোই, সূর্যের তাপটাও খুবই উপভোগ্য। বাঁদিকে দুর্ভেদ্য হিমালয়ের পাঁচিলকে সমান্তরাল রেখে আমি চলতে লাগলাম ।
সন্ধ্যের দিকে আমি পেলাম আমার আকাঙিক্ষত রাস্তার মোড়। দুটোই যানবাহন যোগ্য একটা বাঁদিকে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে কাঠমাণ্ডুর দিকে গেছে, আর একটি সাংপো পার হয়ে উত্তর ও পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। দাদু আমাকে বার বার সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন কৈলাসের পথ অতি দুর্গম, কাজেই কাঠমাণ্ডুতে ফিরে যাওয়াই ভালো। মনে মনে তাঁর উদ্দেশ্যে বললাম-আমাকে ক্ষমা করুন আপনার কথা রাখতে পারলাম না, কৈলাস আমাকে ডাকছে, আমাকে যেতেই হবে। আমি ফেরীঘাটের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম।
ব্রহ্মপুত্র এখানে বেশ চওড়া, এই শীতে সাঁতার কেটে পার হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। ঘাটের কাছে একটা ছোট চায়ের দোকান। সেখানে কয়েকটা মিলিটারী লরী দাঁড়িয়ে আছে। আমি কোন রকম দ্বিধা না করে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। নদীতে কোনো নৌকো চোখে পড়ল না তার পরিবর্তে রয়েছে একটা বিরাট গাধা বোট ।
দোকানে কয়েকজন চীনা চায়ের গ্লাস হাতে করে উপুড় হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে, আমি তাদের কাছেই এগিয়ে এলাম। চা চাইতে হল না দোকানে ঢুকতেই দোকানদার একটা বিরাট বাঁশের চোঙ্গায় করে এক গ্লাস চা ধরিয়ে দিলেন। সেই চোঙ্গার মধ্যে কম করেও আট-ন' কাপ চা তো হবেই। চীনাদের সাথে মুখোমুখি এই প্রথম। আমি তাদের মতোই উপুড় হয়ে বসে চায়ের চোঙ্গাটা দু'হাতে ধরে তার গরম উপভোগ করতে লাগলাম ।
সবাই বসে আছি তো বসেই আছি, কখন ।নৌকা আসবে কে জানে, সন্ধ্যে হয়ে যখন রাত হয়ে আসছে সেই সময় চীনা লোকগুলো সবাই উঠে দাঁড়ালো। ঘন্টাখানেক বসে থাকার পর হঠাৎ যেন তাদের মধ্যে প্রাণ এল। তাদের ব্যস্ততা ও কর্মতৎপরতা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। তারা তাড়াতাড়ি করে নদীর ধারেই সেই গাধা বোটটার দিকে এগিয়ে গেল তারপর তার উপর থেকে বড় বড় এ্যালুমনিয়মের পাত ফেলে নদীর চড়া থেকে বোট পর্যন্ত গাড়ীগুলোকে চালিয়ে আনবার জন্য রাস্তা করে ফেলল। আধঘন্টার মধ্যেই সব তৈরী হয়ে গেল, তারা আস্তে আস্তে এবার তিনটে লরী ও দুটো জীপকে চালিয়ে এনে তুলে ফেলল সেই বোটের উপর। তারপর আমার অবাক হওয়ার পালা। হঠাৎ সেই গাধা বোটটা জল কাঁপিয়ে তার ইঞ্জিনটি চালু করে দিল। এই বোটটা যে যন্ত্রচালিত তামোটেই লক্ষ্য করিনি। আমি অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখছি এমন সময় দু'জন চীনা আমার দিকে তাকিয়ে ইসারায় আসতে বললো বোটের উপরে। সাংপো পার হওয়ার জন্যই বসে ছিলাম, কাজেই তাদের আহ্বানের সাথে সাথে আমি উঠে পড়লাম সেই বোটে। চায়ের দোকানের আরও দু'জন তিব্বতী ভদ্রলোক পার হবার জন্য বসে ছিলেন তারাও উঠে এলেন। এবার একটি বিরাট শব্দ করে সেই তরণীটি তীর ছাড়ল। প্রায় পনেরো মিনিটের মধ্যেই আমরা ওপারে এসে পৌছলাম। তারা আগের মতোই সেতু তৈরী করে সবাইকে নামাবার বন্দোবস্ত করে ফেলল। আমি হাতের মালা তুলে তাদের “ওম্ মণি পদ্মে হুম্” বলে আশীর্বাদ জানিয়ে বিদায় জানালাম। পার হবার জন্য কোনো পয়সাই দিতে হল না। লাসাজোং-এর ফেরী পেরোলাম।
সাংপো পার হলাম। এখান থেকেই পেলাম কৈলাসের মূল সড়ক। এখন আর রাস্তার নির্দেশের প্রয়োজন নেই। এই রাস্তাটা ধরে সোজা পশ্চিমের দিকে এগিয়ে গেলেই পাওয়া যাবে আমার স্বপ্নের কৈলাস ধাম ৷ এই পর্যন্ত যখন ভালোভাবে কেটেছে তখন বাকিটাও নিশ্চয়ই ভালোভাবে কাটবে। আনন্দে আমার অন্তরাত্মা লাফিয়ে উঠল——মনকে বললাম আর ভয় নেই—এগিয়ে চল ।
রাস্তার ধারের একটা ভাঙ্গা-বাড়ীতে সেদিন রাত কাটালাম, রাস্তাটা সরাসরি পশ্চিমের দিকে এগিয়ে চলেছে—সাংপোর ঠিক সমান্তরাল। আমি চলেছি সাংপোর স্রোতের বিপরীত দিকে সেটাই আমার মূল প্রেরণা--আমি যাচ্ছি উৎসের দিকে। রাস্তাটা প্রায় একঘেয়ে বলা যায়, গীয়াৎসের মতো মোটেই কষ্টকর নয়। শীত এখানে খুবই শুকনো, রাতের ঠাণ্ডা ককনে। দিনের প্রখর সূর্যতাপ রাতের ঠাণ্ডাটাকে দূর করে। আকাশ যদি মেঘলা থাকতো তাহলে শীতের প্রকোপে হয়তো এগিয়ে চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতো। তিব্বতের আকাশে মেঘ প্রায় নেই বললেই চলে। দিনের সূর্য আর রাতের উজ্জ্বল তারা দুইই চলার পথে প্রেরণাদায়ক।
সাংপো পার হবার তৃতীয় দিনের দিন দুপুর বেলা পেলাম ছোট্ট একটি গ্রাম।
নাম লাকা। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ল একটা চোরতেন। সেখানে বসতেই গ্রামবাসীরা আমাকে ঘিরে ধরল। মনে হল অনেক দিন পর তারা যেন একজন লামা পেয়েছে। তিব্বতে এখন গরমকাল গ্রামবাসীরা অধিকাংশই চাষের কাজে ব্যস্ত। এই অঞ্চলে বার্লি ও যবের চাষ খুব ভালো। আমার চারপাশে অধিকাংশই শিশু আর বৃদ্ধের দল তারা গ্রামেই থাকে। চোরতেনে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন বৃদ্ধা একটি শিশুকে কোলে করে আমার সামনে এসে হাজির হলেন, কিছু বলার আগেই তিনি আমাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন, তারপর ফোকলা দাঁত বার করে কি যেন বললেন, আমি খুব মনোযোগ সহকারে শুনলাম বটে কিন্তু কিছুই বললাম না কারণ এই অবস্থায় আমার বলার কিছুই নেই। তিব্বতী ভাষা যদিও কিছুটা বুঝি কিন্তু এই ভদ্রমহিলার ..কথার বিন্দু বিসর্গও বুঝলাম না। মহিলাও ছাড়বার পাত্রী নন, শেষে আমি তার মাথায় হাত দিয়ে মনে মনে মন্ত্র পাঠ করতে লাগলাম—তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতটাকে ধরে শিশুর মাথায় রাখলেন। আমি শিশুটিকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করলাম। মহিলাটি এবার খুশী হলেন ।
গ্রামবাসীরা আমাকে চারপাশে ঘিরে ধরেছে কাজেই ছাড়া পাবার উপায় নেই। দুপুরবেলা তাদের মধ্য থেকে একজন সাম্পা এনে অতিথি সৎকার করলেন। তাদের মাঝখানেই আমি খাওয়ার পর সটান হয়ে শুয়ে পড়লাম বিশ্রামের জন্য। বিকেলের দিকে খেতের কাজকর্ম সেরে যুবক-যুবতীরা ঘরে ফিরতে লাগল, সেই সময় গ্রামে যেন প্রাণ ফিরে এল। বিকেলবেলা তাদের সাথেই রাতের খাওয়া খেলাম। তিব্বতীরা সূর্যাস্তের আগেই রাতের খাওয়া শেষ করে। আমাকে তারা একটি বিরাট খেতি বাড়ীতে এনে তুলল। মণ্ডপের মতো সেই বাড়ীতেই রাত্রিবেলা গ্রামবাসীরা এসে আবার একে একে উপস্থিত হল। কিছুক্ষণ পর আকাশে দেখা দিল পূর্ণচন্দ্র, কাজেই এই জমায়েতে আলাদা আলোর আর প্রয়োজন নেই। কয়েকদিন যাবৎই রাস্তায় চাদের আলোয় আমি হেঁটেছি। তিব্বতের নিষ্কলঙ্ক আকাশে চাঁদের আলো যেন দ্বিগুণভাবে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে। সেই আলোয় একটু চেষ্টা করলেই মনে হয় আমি ডায়েরী লিখতে পারবো।
সকলে সেখানে জমায়েত হওয়ার পর তাদের সামনে ধরাধরি করে একটা বিরাট হাড়ি এনে রাখা হল, সকলে তার চারপাশে বিচুলি পেতে বসল। তারপর সমবেত কণ্ঠে শুরু হল গান। কি চমৎকার তাদের সুর, গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই গলা ছেড়ে তাতে অংশ গ্রহণ করতে লাগল। রাতের শীত ক্রমশঃ বাড়তে লাগল, সকলে কম্বল ছড়িয়ে জড়াজড়ি করে বসল। কিছুক্ষণ পর গান থামলো তাদের মধ্য থেকে দু'জন মহিলা উঠে গিয়ে হাঁড়ি থেকে একরকমের পানীয় তুলে সবাইকে বাটিতে করে দিতে লাগল। একটা বাটিতে করে আমার কাছেও মেয়েটি নিয়ে এল। মাত্র তিনটে বাটিতে করে একজন একজন সেই পানীয় পান করতে লাগল। মেয়েটি হাসিমুখে আমার মুখের কাছে বাটিটা তুলে ধরল, আমাকে পান করতেই হবে; অথচ কোন উপায় নেই—তাছাড়া এটা কোন ধরনের পানীয় সেটাও আমার জানার ভীষণ ইচ্ছে। তাই সাগ্রহে মেয়েটির কাছ থেকে দু'হাতে বাটিটা ধরে ঠান্ডা পানীয়ের সবটাই পান করে ফেললাম। মেয়েটি হেসে কৃতার্থ হয়ে আমাকে সম্মান জানিয়ে বাটিতে যে সামান্য তলানী পড়ে ছিল সেটা চেটে খেয়ে নিল। আগে এরকম জানলে কিছুটা রেখে দিতাম। এখন কোনো উপায় নেই, অনেকটা তাড়ির মতো স্বাদ মনে হল তিব্বতী বিয়ার। এ অঞ্চলে বার্লির তো অভাব নেই। পানীয়ের পর গান আরও জমে উঠল, তারপর শুরু হল তাদের নাচ। সেই নাচকে আমি অনেকটা বীরভূম জেলার সাঁওতালি নাচের সাথেই তুলনা করতে পারি ।
মণ্ডপটার ওপরে কাঠের ফ্রেম আর টিনের ছাদ। চারপাশে কোনো রকম দেয়াল নেই। বেশ শীত করতে লাগল। কিন্তু নাচ গান শেষ হবার আগে কিছুতেই শোবার উপায় নেই। চাঁদের আলো এখানে যেন উজাড় করে দিয়েছে তার কিরণ। নাচ আর সমবেত কণ্ঠের ধ্বনি মিলিয়ে সেটা স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে হি-হি শব্দে হাসি। নারী ও পুরুষেরা অবাধ ভাবে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব পরিবেশ। সহজ সরল আসর সমাজের সব বাঁধনের বাইরে প্রাণখুলে দিয়েছে একজন আর একজনের কাছে। এমন পরিবেশ বুঝি জগতের এই পবিত্র ভূমিতেই সম্ভব। গরমকালে মনে হয় সব চাঁদনি রাতেই জমে ওঠে তাদের এই বাঁধন ছাড়া মহোৎসব। শেষে এক সময় তারা থামলো, তারপর একে-একে সবাই যে যার বাড়ীর পথ ধরল। মণ্ডপ ঘরে রইল একটা শূন্য হাঁড়ি আর একজন বহুদূরের তীর্থযাত্রী। তারা চলে যাবার পর বিচুলিগুলো একজায়গায় একত্র করে আমি তারই ভেতরে ঢুকে পড়লাম—এখানেই আমাকে রাত কাটাতে হবে। তিব্বতে আগুন, বিচুলি, কম্বল এই তিনটিকে বলা হয় মানুষের তিন বন্ধু। ঘুমের জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হলো না—একটু গরম পেলেই ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে আসে ৷
সেই রাতটা স্বপ্নের মতোই কেটে গেল। পরের দিন ভোরবেলা গ্রামবাসীরা উঠবার আগেই কয়েকটি কুকুরকে সাক্ষী রেখে আমি লাকা গ্রাম ছাড়লাম। গ্রামবাসীরা উঠে পড়লে নিশ্চয়ই আমাকে সহজে ছাড়বে না। আর সেই সাথে সাথে অন্য কোন অসুবিধারও সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাজেই রাতের সেই নাচ গানের মধুর স্মৃতি নিয়েই আমি আবার পথে এসে পড়লাম ।
রাস্তাটা এখন ভালোই বলতে হবে সাংপোর এই উপত্যকায়। হিমালয়ের পাঁচিল সাংপোর সাথে সমান্তরালভাবেই চলেছে। চলায় কোন অসুবিধাই নেই, এই অঞ্চলের একমাত্র অসুবিধা হচ্ছে একঘেয়েমি। এখানকার দৃশ্যটাও যেন একঘেঁয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চলতে থাকলেও আশপাশের দৃশ্যের কোনরকম পরিবর্তন নেই। নদীর উত্তর দিকের পাহাড় টা মাইলখানেক দূরে সরে গিয়েছে। গাছ-গাছড়া এ অঞ্চলে খুব একটা চোখে পড়ে না, নদীর চড়া আর বালি। দিনের বেলা সূর্যের প্রখর আলো সেই বালিতে ঠিকরে পরে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। লোক বসতি খুবই কম, গ্যাংটক থেকে লাসা যাবার পথে প্রায় রোজই একটা না একটা গ্রাম পেয়েছি। এ অঞ্চলের তুলনায় সেদিকেই ঘন বসতি পেয়েছি।
গীয়াৎসে ছাড়ার পর এই পথে যেসব বসতি পেয়েছি তা খুব নগণ্য। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে তিব্বতী যাযাবরদের তাঁবু আর চীনা সামরিক বাহিনীর শিবির। সাংপোর এই পথে চতুর্থ দিনের দিন প্রথমে চোখে পড়ল কয়েকটা লরী। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি তারপর মেঘের মতো ধুলো উড়তে দেখে আমার ধারণা পরিষ্কার হল, গাড়ীগুলোকে গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে আসতে দেখে আমি রাস্তা থেকে নীচে গিয়ে সরে দাড়ালাম। আমাকে দেখে ট্রাকের ভেতর থেকে সবাই হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানাল। আমার দূরত্বটা ছিল বেশ ব্যবধানে তাই তাদের মুখগুলো ভালোভাবে দেখতে পারলাম না। পর পর চারটে গাড়ী নিজেদের মধ্যে বেশ ব্যবধান রেখে চলে গেল। শুকনো ধূলোর মেঘটা উড়ে যেতে লাগলো আরও প্রায় কুড়ি মিনিট।
তীর্থযাত্রীদের সাথে থাকাকালীন আমার কোন রকম অসুবিধাই হয়নি। সাধুবাবাই ছিলেন আমার গুরু আর গাইড। চলার পথে কোথায় থাকতে হবে কোথায় যেতে হবে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল তাঁর উপর। তাছাড়া প্রত্যেকটি গ্রামের বৈশিষ্ট্যও তিনি আমাদের বলে দিতেন। গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ীর দেয়াল ছিল তাঁর জানা। আর এখানে আমার অবস্থা ঠিক বিপরীত। কোথায় রাত কাটাবো, বসতি পাওয়া যাবে কি না তার কোন ঠিক নেই।—আমাকে চলতে হচ্ছে সম্পূর্ণ ভগবান ভরসা করে। সূর্যদেবকে একটু হেলতে দেখলেই আমি খুঁজতে থাকি রাতের আস্তানা। দু'দিন তো আস্তানা খুঁজতে রাত ভোর হয়ে গিয়েছিল। কোনরকমে একটা ঘর একটা পাঁচিলভাঙ্গা বাড়ী, মাথার উপর একটা ছাদ পেলেই আমি সন্তুষ্ট ।
তিব্বতের এই অংশটা কিছুতেই যেন এগুচ্ছে না। দূরের পাহাড়গুলো যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সাংপোর স্রোতের উল্টোদিকে আমি যেন সাঁতার কাটছি ।
চারিদিকের এই একঘেয়েমির মধ্যেও ভগবান যেন আমাকে হাত ধরে তাঁর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। দিনের সূর্য আর রাতের চাঁদ আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। সূর্যদেব দিচ্ছেন উত্তাপ আর চন্দ্র দিচ্ছেন ভরসা ও আলো। সেই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই আমি আমার সাথে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ করার সুযোগ পেলাম ।
আমার প্রাণময় সত্তাকে দেহ থেকে আলাদা করে উপভোগ করার আনন্দ পেলাম । এই চলার মাধ্যমেই আমি উপলদ্ধি করলাম আমি আর আমার দেহ এক নয়। আমরা আসলে সবাই পথিক, এই ক্ষুদ্রলোক থেকে আমরা সবাই চলেছি অনন্তলোকের দিকে। পরমেশ্বরের ক্ষুদ্ররূপে আমার আত্মা যেমন দেহকে টেনে দিয়ে যাচ্ছে কৈলাসের দিকে, ঠিক সেই রকমই ; এই বিশ্বপ্রাণ সমস্ত বিশ্বকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অমৃতের সন্ধানে, কাজেই আমরা সবাই পথিক ।
এই ভাবেই আমার পথ এগুতে লাগল। গেবুক গ্রামের ছোট্ট একটি গুম্ফার মধ্যে দু’রাত বিশ্রাম করে ও মঞ্জুশ্রীর উদ্দেশ্যে সহস্র নাম জপ করে একঘেয়েমির হাত থেকে একটু নিষ্কৃতি পেলাম। গেবুক জমে গিয়ে ইঁট হয়ে গেছে। বোধিসত্ত্বের কাঁধের চাদরগুলো ইঁদুরে কেটে কুচোকুচো করে তার কোলের উপর জড়ো করেছে। ঘরের সর্বত্রই ইঁদুরের অবাধ যাতায়াত, প্রার্থনা গদিটায় শুয়ে রাত কাটানো মানে ইঁদুরের রাজত্বে মানুষের অনধিকার প্রবেশ মাত্র । এতৎসত্ত্বেও ঘর ও দেয়ালের ডেকরেশন আগের মতোই আছে। তাংখা ও ভারী ভারী বইগুলো খোপগুলো থেকে এতটুকু স্থান পরিবর্তন করেনি। দরজার উপরের কাঠের আল্ল্গা মুখোসটাকেও কেউ ছোয় না । গুম্ফাগুলোই তিব্বতের প্রাণ। সেক্ষেত্রে এই ছোট সুন্দর গুফাটাকে পরিত্যক্ত দেখে খুবই খারাপ লাগল। প্রার্থনা চক্রগুলোতে এখন মরচে পড়তে শুরু করেছে, তত্ত্বাবধানের একান্তই অভাব ৷
দ্বিতীয় দিন ভোরবেলা তেরোজন গ্রামবাসীর এক ছোট্ট জমায়েৎ হল—তাদের অনুরোধেই আমি অনেকদিনের অব্যবহৃত ঘন্টা ও বজ্রের ব্যবহার করে পুজা করলাম অনেকদিন পর. প্রার্থনা চক্রগুলোয় স্থানীয় ভক্তদের হাত পড়ল। গ্রামবাসীদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম এখানকার লামা প্রায় একবছর হল সীগাৎসে গেছেন তারপর আর ফিরে আসেন নি, তাশী লুম্ম্পো তার পরিবর্তেও কাউকে পাঠাননি।
গ্রামের লোকরাও আজকাল চীনা শিবিরে কাজ পেয়ে চলে গেছে, তারা মাঝে মাঝে আসে। গ্রামের সবাই তাতে খুশী। এই অঞ্চলে শুকনো আবহাওয়ায় চাষবাস মোটেই হয় না ফলে গ্রামবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ, এমতাবস্থায় চীনা শিবিরে কাজ পাওয়া সত্যি ভাগ্যের কথা ।
গেবুক গ্রাম থেকে চলার তিনদিন পর পেলাম সারা নামে আর একটি গ্রাম। তারপর আবার একঘেয়ে রাস্তা। এবার রাস্তাটাকে মনে হল আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠছে। সাংপোর স্রোতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার অনুমানটা মিথ্যে নয়। জলের স্রোত এখন মনে হয় আগের চেয়ে অনেক বেশী।
সাকার পরের গ্রামটি পেলাম তারও চারদিন পর। লাৎসে জোং-এর পর এটাই বড় গ্রাম। দুপুরবেলায় আমি এই গ্রামে এসে হাজির হলাম। দেখেশুনে মনে হল যে এই গ্রামে কম করেও হাজারখানেক লোকের বাস হবে, অর্থাৎ এক একটা বাড়ীতে যদি পাঁচজন থাকে তাহলে আমার হিসেবে তাহাই দাঁড়ায় ৷
গ্রামটির নাম পাসাগুক্
পাসাগুক্ সাংপোর তীরের একটি শান্ত গ্রাম। গ্রামের মধ্যে কোনরকম চঞ্চলতা নেই। বাড়ীঘরগুলো যেন শুন্য। তিব্বতের সেই ভয়ংকর গ্রামরক্ষী কুকুরগুলোও যেন এখানে ঘুমিয়ে সময় কাটায়। গ্রামে ঢুকতেই নজরে পড়ল একপাল চমরী গাই। শুকনো বিচুলির সাথে মুখের লালা মিশিয়ে চুইনগামের মতো চুষছে। আমার মতো তীর্থযাত্রী তারা অনেক দেখেছে তাই ভ্রুক্ষেপও করল না। কয়েকটি ছোট ছেলেমেয়ে আমাকে দেখে জিভ বার করে থমকে দাঁড়াল। গ্রামের মাঝামাঝি আসতেই নজরে পড়ল খুঁটির উপরে বাঁধা সারি সারি সাদা পতাকা। তারপরেই চোখে পড়ল একটা গুম্ফা। মনটা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। মরুভূমির মধ্যে হঠাৎ পেলাম জল। সাধারণতঃ গুম্ফাগুলোর চূড়া অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। গুম্ফাগুলোর ছাদ মন্দিরের মতোই গ্রামের মধ্য থেকে মাথা উঁচু করে জেগে উঠে। এই গুম্ফার চূড়াটাকে কেন যে আগে চোখে পড়েনি বুঝতে পারলাম না। মাঝারী গোছের একটা গুম্ফা, দার্জিলিং-এর কাছে ঘুমের গুম্ফার মত অনেকটা। দেয়ালের চারদিকে ঘুরে মণি-চক্র স্পর্শ করে আমি মন্দিরে ঢুকলাম ।
বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকতেই চোখে অন্ধকার দেখলাম। চোখটা অন্ধকারে অভ্যস্ত হতেই সামনে নজরে পড়ল অবলোকিতেশ্বরের এক বিরাট মূর্তি। তারই সামনে নীচের বেদীতে সারি সারি বাটিতে জল। বাটির উপর চাল আর বিরাট ঘিয়ের প্রদীপটি সেই মন্দিরের প্রাণস্বরূপ হয়ে বুদ্ধের চরণে আত্মনিবেদন করছে। আমি প্রণাম করে সামনের বেদীতে গিয়ে বসলাম। তারপর শরীর ও মনকে শান্ত করবার জন্য ধ্যানে বসলাম । অনেকদিন পর আমি একটা আস্তানা পেয়ে তথাগতকে আমার ভক্তিঅর্ঘ্য জানাতে লাগলাম ।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর মন্দিরের শুকনো চাল চিবিয়ে কোন রকমে ক্ষুধা নিবারণ করলাম। মন যখন আনন্দ ও তৃপ্তিতে ভরপুর তখন আমার না খেলেও চলে, আবার দেখেছি ঠিক ক্ষুধার সময় শত চেষ্টা করেও মনকে সংযত করা সম্ভব হয়নি। মনকে পর্যবেক্ষণ করার উপযুক্ত ক্ষেত্রই হচ্ছে পথ। পৃথিবীর উপর পড়ে রয়েছে মহা-পথ, সেই পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে আমার এই স্থূল শরীর আর সেই শরীরের উপর ভর করে চলেছে মনরূপী সূক্ষ্মশরীর। দেহ যখন সুস্থাবস্থায় থাকে মন পায় তার সহজ পথ, দেহই মনের পথ, দেহ আছে বলেই তো তার প্রকাশ। সাধুরা বলেন যে, মনের গতি ঊর্ধ্বে কিন্তু সে কথা আমি বুঝি না। সে মহাবিদ্যা আমার আয়ত্তের বাইরে, আমার সাধারণ যুক্তিতে আমি বুঝি মনের স্বাভাবিক গতি যদি ঊর্ধ্বেই হয় তবে সে ফিরে আসে কেন
এই দেহের গণ্ডীর দিকে। আমি বসে বসে এইসব নানাকথা ভাবতে লাগলাম । আজকাল ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেও আমার অসুবিধা হয় না। নিঃশব্দের সেই অগাধ সমুদ্রে আমি খুঁজে পাই সুর ।
আজ এই গুম্ফাতেই রাত কাটাবো বলে ঠিক করলাম। বিশ্রামের এমন উপযুক্ত স্থান আর হতে পারে না। বিকেলের দিকে গ্রামের বিভিন্ন পথ ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলাম। তিব্বতের এই অঞ্চলটা প্রায় মরুভূমির মতো। বাতাস শুকনো আর ঠান্ডা, আকাশের গায়ে একখণ্ড মেঘও নেই, দিনেরবেলা পরিষ্কার নীল, দূরের পাহাড়গুলোর সীমারেখা অতি স্পষ্টভাবে চোখে ধরা দেয়, আর রাতের তারায় ভরা আকাশে চলে আলোর ছোটাছুটি। রাতের আকাশটাকে মনে হয় একটু উঁচুতেই রয়েছে একটা আলোকিত মণ্ডপ ।
সন্ধ্যের পর মনে হল পাসাগুক্ গ্রামে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। গ্রামের সবাই মনে হয় দিনেরবেলায় অন্যত্র কোথাও কাজ করতে যায় ফিরে আসে রাত্রিবেলা। আমি এদিক ওদিক একটু ঘুরে ফিরে এলাম গুম্ফাতে। গ্রামের লোকেরা আমাকে কোনরকম জিজ্ঞাসা না করাতে আমি যেন বেঁচে গেলাম ।
গুম্ফার চারিদিকে কোন পাঁচিল নেই, ছোট্ট একটা বাড়ী, একটা চৈত্য আর খোলা মাঠ এই নিয়েই তার রাজত্ব। ছোট্ট বাড়ীটা মনে হয় লামাদের জন্য কিন্তু এখন কেউ নেই। আমি তার রান্না ঘরটা খুঁজে বার করলাম। তিব্বতের গুম্ফাগুলো সাধারণতঃ খোলাই থাকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তিব্বতীরা তালা-চাবি ব্যবহার করে না। আর গ্রামবাসীদের কথাই আলাদা, তাদের মধ্যে অনেকে তালা-চাবি জীবনে দেখেনি । সততার এমন নিদর্শন জগতে আর আছে কি না সন্দেহ। তিব্বতে গুল্ফার রান্না ঘরগুলো দেখেছি প্রায় বারোয়ারীর মত, সকলের সেখানে অবাধ গতি। আমার প্রয়োজন উনোন আর সামান্য কিছু কাঠ, কয়েকটা রুটি করবো মাত্র। রান্নাঘরটা কাঠের আর ভেতরটা ও বেশ গোছানো। উনোনের ভেতরেই পেলাম কয়েকটা আধপোড়া কাঠ, তাতেই আমার কাজ চলে যাবে। রান্নাঘরের আগুনে ঘরটা বেশী গরম হয়ে উঠেছে। কাঠকয়লার লাল রঙ তীর্থযাত্রীদের অতি প্রিয় বস্তু। ঠিক করলাম এই রান্নাঘরেই রাত কাটিয়ে দেবো।
ভোরবেলা কার ডাকে যেন আমার ঘুম ভাঙ্গলো, কোনরকমে গড়াগড়ি দিয়ে, চোখ রগড়িয়ে উঠে বসলাম। হাই তুলে সামনের দিকে তাকালাম। আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন সৌম্যমূর্তি একজন লামা। তাকে প্রণাম করে আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—কোথা থেকে আসছো ?
আমি ভারতীয়, নেপালী তীর্থযাত্রীদের সাথে দ্রেপুং ও লাসায় গিয়েছিলাম, তাদের দল ছেড়ে এখন আমি যাচ্ছি কৈলাসের দিকে ।
ভোরবেলা এই দেবতুল্য পুরুষটির সামনে সরাসরি বেরিয়ে এল আমার মনের কথা ৷
আমার কথা শুনে তিনি একটু হাসলেন, তারপর বললেন—চল আমার ঘরে সেখানে বসে কথা বলা যাবে। তাকে অনুসরণ করে পাশের ঘরে উঠে এলাম। পরিপাটি করে সাজানো একটি সুন্দর ঘরের কোণে একটা বিছানা পাতা, তার পাশে একটা ডেস্ক, খাতা, কলম, আর একটা অনেক পাতার পুঁথি। দেয়ালের উপর ঝোলানো রয়েছে কয়েকটা তাংখা আর ছোট্ট একটা কুলুংগীর মধ্যে ভগবান তথাগতের একটা কাঠের মূর্তি । তিনি সব কিছু উপেক্ষা করে সরাসরি সেই মূর্তিটার দিকে এগিয়ে গেলেন তারপর সেটাকে হাতে নিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললেন—এই দেখো কলকাতার মহাবোধী সোসাইটি এটা আমাকে উপহার দিয়েছেন; কি সুন্দর হাতের কাজ তাই না ? তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-আপনি কলকাতায় গিয়েছিলেন ?
–না, আমি দার্জিলিং ও কালিম্পং-এ অনেক বছর ছিলাম। তিনি আমাকে তার বিছানার পাশে বসতে বললেন তারপর জিজ্ঞাসা করলেন--
—তুমি যে কলকাতার ছেলে তা লাসা ও সীগাৎসের লোকেরা জানে কি ?
—আজ্ঞে না, আমি নেপালী মৌনীবাবা বলেই তাদের কাছে পরিচিত।
তিনি আমার কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়লেন তারপর অনেকটা আশ্বাসের সুরে বললেন--এতদূর যখন এসেই পড়েছো তখন আর ভয় নেই মনে হচ্ছে ভগবান স্বয়ং তোমার ভার নিয়েছেন।
তার ঘরের কোণে রাখা কড়াইয়ের আগুনটাতে কিছুটা কাঠ-কয়লা গুঁজে দিয়ে বললেন—তোমার সাহস আছে বটে। কষ্ট করে যখন এতদূর এসেছো বাকি পথটা আর অসুবিধা হবে না।
লামার বিনয় ও প্রীতি আমাকে স্পর্শ করল। তাঁর স্নেহের স্পর্শে আমি আশ্বস্ত হলাম, আমার ভাঙ্গা তিব্বতী শব্দ আর তাঁর ভাঙ্গা হিন্দী বাংলা মিশিয়ে আমাদের আন্তরিকতার সেতু তৈরী হল। তিনিই এই গুম্ফার সর্বেসর্বা, তাঁর নাম গেশে রেতেন, তিব্বতী লামার এক অতি উচ্চ পদবী। গেশে রেতেনের বয়স ষাটের কাছাকাছি, এখানে তিনি আছেন পাঁচ বছর যাবৎ। আমি বিনা বাধায় এতদূর কি করে যে এসেছি তাতে তিনি বারবার বিস্ময় প্রকাশ করতে লাগলেন ।
তিনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে, গুম্ফাগুলোই হচ্ছে তিব্বতের প্রাণ, শিক্ষা ও ধর্মের মূল প্রতিষ্ঠান। আজকাল তারমধ্যে বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক জটিলতা এসে গিয়েছে। তাশী লুম্পো থেকে আজকাল রসদ আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গ্রামবাসীদের উপর ভরসা রেখে ও গুম্ফার নিজস্ব মূলধন বিক্রি করে লামাদের চালাতে হচ্ছে। সরকারী আইন দিনদিন পাল্টে যাচ্ছে, চীনা কর্তৃপক্ষ দেশের উন্নতির জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। দেশের যুবকেরা রাস্তাঘাট সেতু নির্মাণের জন্য পাচ্ছে নগদ টাকা, তাই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছাড়া গুম্ফার দিকে আজকাল কেউ আসতে চায় না। লাসার দিকের গুম্ফাগুলো সে তুলনায় এখনও খুব সজাগ। গেশে রেপতেনের মতে এদেশে চীনারা ভালোই কাজ করছেন, তাঁরা সমাজের উচ্চস্তরকে এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি দেশের জনসাধারণের সাথে হাত মেলাচ্ছেন। নিরক্ষর দেশবাসীরা আজকাল লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করেছে। সবই ভালো তবে গেশে রেতেনের মতে—প্রাণকে বাদ দিয়ে দেহকে নিয়েই এদের কারবার। তিনি সবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—-ভগবান তথাগতের এটাই হয়তো ইচ্ছা, পৃথিবীর চক্র ঘোরাবার জন্যই তিনি ধরায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তিনি ধর্মরক্ষার জন্য বার বার জন্মগ্রহণ করেছেন, তিনিও হয়তো পরিবর্তনই চান। সবই তাঁর ইচ্ছে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—দেশে গিয়েও কি তুমি এই ত্ৰাবা ব্ৰত পালন করবে?
—দেশে ফিরে গিয়ে ... ? আমি আমতা আমতা করে তাঁকে জবাবে বললাম—আজ্ঞে দেশে ফিরে গিয়ে মনে হয় আমি আমার অন্যান্য বাঙালীর মতোই ভালো ছেলে হয়ে ইস্কুলে যাবার চেষ্টা করবো, আমাকে ম্যাট্রিক পাস করতেই হবে।
তিনি আমার কথায় বাধা দিয়ে বললেন—না, আমি সে কথা বলছি না। আমি জিজ্ঞেস করছি--তুমি এখন বৌদ্ধতন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছো—ফিরে গিয়ে এটা কি বজায় রাখবে? তাঁর কথা শুনে আমি একটু চুপ করে গেলাম। একটু চিন্তা করে বললাম—আমি হিন্দুঘরে জন্মেছি, এ পথে আসার জন্যই আমি এ বেশ ধারণ করেছি, ভবিষ্যতের কথা কি করে বলি বলুন। তবে এটা ঠিক যে এ বেশে আমি আমার বাড়ীতে ফিরে গেলে অকারণে অসুবিধায় পড়ব। তিনি বেদীর জলপাত্রগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করতে বললেন। আমি তাঁর কথামত কাজ করতে লাগলাম। হঠাৎ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি হিন্দু তাই না ?
-আজ্ঞে হ্যাঁ, জবাব দিলাম ।
—হিন্দুধর্মের তুমি কি জান ?
তাঁর প্রশ্ন শুনে আমি থেমে গেলাম, কি উত্তর দেবো জানি না। তিনি এবার জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কোন মন্ত্ৰ জান ?
—আজ্ঞে হ্যাঁ অনেক মন্ত্র আমি জানি, এমন কি ব্রহ্মগায়ত্রী মন্ত্র ও ত্রি-সন্ধ্যা জপ আমার মুখস্থ। শুনুন--ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎসবিতুর্বরেণ্যম্ ভার্গোদেবস্য ধীমহি ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ ওম।
তিনি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—শুধু মুখস্থ করলেই তো চলে না.তাকে.. বুঝতে হয় অনুভব করতে হয়। অনুভব আর উপলব্ধি করার জন্যই আমাদের এই মানব-জন্ম, তাকে কাজে লাগাতে হবে ।
মন্দিরের কাজ সেরে আমরা এলাম গেশে রেতেনের ঘরে। বাড়ীর সামনেই দু'জন অপেক্ষা করছিলেন। তারাই গেশে রেতেনের জন্য বাজার-হাট ও রান্না-বান্না করেন। তাদের যথাযথ উপদেশ দিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। ঘরের মধ্যেও ছিল একটা গুপ্তঘর সেই ঘরটার কোন জানালা দরজা নেই, সেখানে তিনি আমাকে নিয়ে ঢুকলেন। একটি প্রদীপ জ্বেলে তিনি আমাকে বললেন—তুমি এখানে থাক ভালো করে চারিদিকের ছবিগুলো দেখো। আমি আসছি—পরে কথা হবে। তিনি আমাকে প্রদীপটা হাতে দিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিলেন। তাঁর ওপর আমার আস্থা না থাকলে নিশ্চয়ই আমি নিজেকে বন্দী বলে ধরে নিতাম। মনে অবশ্য সামান্য সন্দেহ দেখা দিয়েছিল কিন্তু যুক্তি দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিলাম ।
ঘরটা অদ্ভূত, দিনের আলো এতটুকুও প্রবেশ করতে পারে না। প্রদীপের আলোয় প্রথমেই চোখে পড়ল যমন্তকের একটি বিরাট স্ট্যাচু, মানুষ সমান এই স্ট্যাচুটার ভয়ংকর মূর্তিটা মনে হচ্ছে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যমস্তকের ন'টা মাথা, চৌত্রিশটা হাত, ষোলটা পা, মাথাটা অনেকটা মহিষাসুরের মত, উগ্র লাল নীল আর সাদার উপর অদ্ভূত এই মূর্তি। প্রথম দৃষ্টিতে যে কেউ ভয়ে চীৎকার করে উঠবে। সেই স্ট্যাচুটার পেছনের চালে চিত্রিত করা রয়েছে আরও পঞ্চাশটি নরমুণ্ড। গোলাকার চালচিত্রটির চারদিকে লাল রঙের আগুনের শিখা। আমাদের শ্মশানকালী এর তুলনায় সত্যি শান্ত। যমরাজকে যুদ্ধে পরাস্ত করে যমম্ভক হয়েছে মৃত্যুর রাজা। মনকে বার বার সান্ত্বনা দিয়ে বললাম—ভয় পাসনি এটা নেহাৎই মাটি ও কাঠের একটা মূর্তি—এর মধ্যে প্রাণ থাকলে কিছুতেই তিব্বতের এই অজানা গুম্ফার একটা ঘরের কোণে ইনি বন্দী হয়ে থাকতেন না। ঘরের মধ্যে এই একটাই স্ট্যাচু, বাকিগুলো সব কাপড়ের উপর জলরঙা বিরাট বিরাট ছবি স্থানীয় কথায় যাকে বলে তাংখা ।
লাসা থেকে এ পর্যন্ত আমি একা একাই চলছি, আগের চেয়ে এখন মন আমার আরও বেশী শক্ত হয়ে পড়েছে, রাত্রির অন্ধকারে আমি এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তাই এই হঠাৎ অন্ধ-কুঠিতে ঢুকেও আমার হার্টফেল হয়নি। আমার এখন মরলে চলবে না, যেতে হবে আরও অনেক দূর, কৈলাসে পৌঁছবার আগে আমার মরা চলবে না। রাতের অন্ধকারে আসে ভয়, অন্ধকারে নিজেকে হারানোর ভয় থাকে, আর দিনের আলোয় নিজের সত্তা দিয়ে সে ভয় করি দূর। আমি জানি যে গা ছম্ছম্ করা এই ঘরটির বাইরে আছে বিরাট এক আলোর দুনিয়া, আমি সে দুনিয়ার মানুষ কাজেই ভয় কিসের ?
প্রদীপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমি দেখতে লাগলাম--বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভয়ংকর আর শান্তরূপের চিত্রগুলো। হঠাৎ মনে হল কে যেন আমার কাঁধে হাত বুলিয়ে দিল বুকটা অকারণেই ধক্ করে উঠল, প্রদীপটা হঠাৎ যেন কেঁপে উঠল। কে যেন মনে হল আমার পায়ের উপর দিয়ে আলগোছে হেঁটে চলে গেল—চেষ্টা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে ভয় আমার শরীরকে অবশ করে দিতে চাইছে। মনকে আরও সংযত করার চেষ্টা করলাম। প্রদীপটা মাটিতে রেখে বসে পড়লাম সেখানে—মনে মনে স্মরণ করলাম—মুক্তিদায়িণী মা কালীর রূপকে আর মুখে আপনা থেকেই যেন উচ্চারিত হয়ে উঠল—ওম্ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎসবিতুর্বরেণ্যম্ ... ।
গায়ত্রীর মন্ত্রে ঘরটা মনে হয় ঝংকারিত হয়ে উঠল। আমি বারবার আবৃত্তি করতে লাগলাম অভয়মন্ত্র, তারপর ধীরে ধীরে সেই বর্হিমন্ত্রকে অন্তর্মুখী করলাম। বাতাসের পরিবর্তে সেই মন্ত্র ধ্বনিত হতে লাগল আমার হৃদয়চক্রে ... । তারপর এক সময় সব শব্দ আর প্রতিধ্বনি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেল—আমি পড়ে রইলাম এক নিঃশব্দ জগতে। অনেকক্ষণ পর আমি চোখ খুললাম। সুখ নিদ্রার পর আমার যেন ঘুম ভাঙল, সামনে তাংখাটা চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠল। ঘরটা আলোয় যেন ভরে উঠেছে, সামনে প্রদীপের উপর নজর পড়তেই দেখি সেটা নিভে গিয়েছে। আমার অবাক হবার পালা, না অবাক হবার কোন কারণ নেই, ঘরের দরজাটা খোলা তারই ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়েছে পড়ন্ত সূর্যের আলো। আমি ঘর থেকে উঠে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সূর্যের রাঙা আলোয় সমস্ত দেহটা যেন স্নান করে উঠল। শরীরটা খুব হালকা ও ঝরঝরে হয়ে উঠেছে। আমার পাশেই নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছেন সেই আগের দেখা লোকটি, আমাকে বিনীতভাবে নিবেদন করলেন—আপনার খাবার তৈরী।
সময়টা এত তাড়াতাড়ি কি করে যে কেটে গেল বুঝতে পারলাম না, আমি প্রায় রোজই ধ্যানে ঘণ্টাখানেক বসে থাকি, কিন্তু আজকে মনে হয় ছ’থেকে আট ঘণ্টার মতো আমি একাসনে বসে ছিলাম। সময়টা যে কিভাবে কেটে গেল আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। সকালে ঘরে ঢুকেছিলাম ধ্যানভঙ্গে দেখি বিকেল। অনেকক্ষণ বসে থাকলে সাধারণতঃ আমার পাদু’ট আড়ষ্ট হয়ে যায়, আজকে সেটাও হয়নি। শরীরটা এত হালকা হয়ে উঠেছে যে নিজের কাছেই সেটা আশ্চর্য লাগছে। এটা যেন এক অবিশ্বাস্য সত্য। মনের মধ্যে হঠাৎ যেন এক আনন্দের জোয়ার বইছে। সেই জোয়ারে নেই কোন ঢেউ—নেই স্রোত, শুধু পরিপূর্ণতা। আহা! একি আনন্দ। এরই নাম কি উপলব্ধি !
সন্ধ্যের কাছাকাছি আমি লামার ঘরে এসে বসলাম। তিনি আমাকে দেখে একটু মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই হাসির সাথে আমি পেলাম আশীর্বাদ। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর আমিই প্রথম কথা বললাম-আমি এতক্ষণ একাসনে বসেছিলাম সেটা নিজেরই ভাবতে আশ্চর্য লাগছে, এটা কি স্থান মাহাত্ম্যের জন্য সম্ভব হয়েছে ?
— স্থান মাহাত্ম্য ! তিনি কথাটা উচ্চারণ করলেন তারপর একটু থেমে বললেন—গুরু কৃপা আর অভ্যাস। তারপর তিনি থামলেন, অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর তিনি অনেকটা স্বগোক্তি করে বললেন—ভয় পেয়েছিলে! যমন্তকের সামনে শুধু তুমি কেন জগতের সবাই থরথর করে কাঁপে। এই জগৎ যমন্তকের করাল গ্রাসে আচ্ছাদিত শুধু তথাগতই একমাত্র ত্রাণকর্তা। ভয়ের সাথে যুদ্ধ না করে তুমি আত্মসমর্পণ করেছো মহামায়ার শ্রীচরণে, তোমাকে তিনি রক্ষা করেছেন।
অন্য সময় হলে হয়তো আমার মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন এসে ভিড় করতো কিন্তু আজ আমার সামনে মনে হয় কোনো প্রশ্নই নেই। লামা উঠলেন, কড়াইয়ের আগুনে কিছু কাঠকয়লা যোগ করে তার উপর কয়েকটা ছোট গন্ধ কাঠ দিয়ে আবার এসে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত ঘরটা সুন্দর গন্ধে ভরে উঠল। বিছানায় বসে তিনি একটা ভারী বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললেন—তুমি দীক্ষা নিয়েছো, চেন্-রে-জি দর্শন করেছো, জোখাং মন্দিরে পূজো দিয়েছো, তুমি এখন সত্যিকারের বৌদ্ধ সন্ন্যাসী।
সত্যি কথা কিন্তু বিশ্বাস করুন লামা তত্ত্বের আমি কিছুই জানি না। তিব্বতে আসার জন্যই আমি এই ব্রত ধারণ করেছি আমার প্রস্তুতি একদম ছিল না ।
আমার কথা শুনে তিনি ‘হুম্’ করে একটা শব্দ করলেন মাত্র। তারপর আবার চুপচাপ। ইতিমধ্যে দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। কুলঙ্গির প্রদীপের আলো আস্তে আস্তে তার প্রভাব বিস্তার করে সম্পূর্ণ ঘরটাকে অধিকার করে বসেছে। সেই আলোকে আমি দেখতে লাগলাম লামার অর্ধালোকিত মুখ। ভাবটা পরিপূর্ণ। মুখের উপর শান্তি ও পবিত্রতার রূপ ফুটে উঠেছে। আমরা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম। তিনিই নীরবতা ভঙ্গ করলেন—
বৌদ্ধতন্ত্র বা লামা ধর্ম সম্পর্কে যাঁরা পড়াশুনা করেন, তাঁদের বহু বছর লাগে এই ধর্মটাকে হৃদয়ঙ্গম করতে, তার পরেও বহু বছর লাগে তপস্যা ও সাধনার মাধ্যমে তাকে উপলব্ধি করতে। পূর্বজন্মের সাধনা বা গুরু কৃপা না হলে একই জন্মে বৌদ্ধ ধর্ম ও তন্ত্রের বিষয় অবগত হওয়া অসম্ভব। এ পথ বড় দুর্গম পথ। হিন্দুধর্মে ভক্তি বলে একটা মার্গ আছে যেখানে মনপ্রাণ সঁপে দিলেই ভগবৎপ্রাপ্তি সম্ভব। কিন্তু আমাদের এখানে তার কোন অস্তিত্ব নেই—এখানে সবই সাধনালব্ধ। ধ্যান-ধারণা, যোগ, তপস্যার বিরাট সাধনা করে তারপর লাভ করতে হয় নির্বাণের পথ সে পথ সত্যই কঠিন ।
আমি ভাবতে লাগলাম এই তিব্বতের কঠিন পথ যে পথে আমি চলেছি। তিনি বলছেন সাধনার কঠিন পথ আর আমি ভাবছি তিব্বতের পার্বত্যসংকুল ও ঠাণ্ডা বাতাসের পথ।
লামা আবার শুরু করলেন—তিব্বতের ধর্মটাই এসেছে মূলতঃ ভারত থেকে। মহাযোগী গুরু পদ্ম সম্ভবা আর মহা দার্শনিক শান্ত রক্ষিত তাঁরাই আমাদের আদিগুরু তিব্বতের বৌদ্ধ তন্ত্রের মূল উৎস হচ্ছে মহাযান, বজ্রযান আর প্রাচীন তন্ত্রযান ।
আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই আমি সরাসরি তা ব্যক্ত করলাম—মণ্ডলা জিনিসটা কি ? তিব্বতের সব জায়গায়ই তার ছড়াছড়ি এর সম্পর্কে কিছু বলবেন কি ? তিনি মাথাটা অনেকক্ষণ ধরে ঝুঁকিয়ে নিয়ে বললেন-ঠিক্-ঠিক্ তাহলে শোনো-
মণ্ডলা সম্পর্কে সম্যক্ জ্ঞান না থাকলে সেটাকে মনে হবে নেহাৎ জ্যামিতির চিত্র ও বিভিন্ন আকারের ছবি ; কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে এর প্রকৃত অর্থ । মগুলা হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। পঞ্চভূতের প্রতিভূ হিসেবে তিব্বতে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার বিভিন্ন আকারের স্তূপ। পঞ্চভূতের মূর্তিস্বরূপ হচ্ছে এই মণ্ডলা। মণ্ডলা হচ্ছে মানুষের চিন্তার প্রথম রূপ, তারপর সেই রূপকেই কেন্দ্র গড়ে তোলা হয় সাধনার মন্দির।
লামা কিছুক্ষণ থামলেন তারপর আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন, সেখান থেকে তিনি আমাকে ইসারায় ডাকলেন। তাঁর কাছে এগিয়ে গেলাম। তিনি বহুদূরের একটা পাহাড় দেখিয়ে বললেন—ওটা কি দেখছো। সূর্যাস্তের পর অতি অল্প রাঙা আলোয় আমি দেখতে পেলাম অস্পষ্ট একটা পাহাড়, মনে হয় তিনি সেদিকেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম—একটা পাহাড় ।
—হ্যাঁ ঠিক পাহাড়ই বটে। একটা বাড়ী করতে হলে চাই শক্ত ভিত, তার উপর গড়ে উঠে সুন্দর বাড়ী। ভিতই হচ্ছে বাড়ীর মণ্ডলা। আর পাহাড়টার মূলেও আছে একটা বিরাট অচিন্তনীয় ভিত্তি—সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল প্রস্তরভূমি পাহাড়ের যে আদি ভূমি যার উপর সে দাঁড়িয়ে আছে সেটাই হচ্ছে পাহাড়ের মণ্ডলা। মণ্ডলা যত শক্ত হবে তার উপর গড়ে উঠবে তত শক্ত জিনিস। চিন্তা—ইচ্ছাশক্তিরই এক রূপ। চিন্তাশক্তির উপর নির্ভর করে যাবতীয় কার্য অর্থাৎ ক্রিয়া। পরিকল্পনা ঠিকভাবে না হলে ভবিষ্যতে বিরাট কিছু করা সম্ভব নয় ।
তিনি এবার বারান্দা থেকে একটু ঝুঁকে নীচের দিকে মুখ করে ডাকলেন—মু-ম্-বু তাঁর ডাকের সাথে সাথেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এল মু-ম্। সেই আগের পরিচিত ভদ্রলোক, মু-ম্-বু’কে তিনি একটু চা করতে বললেন। তারপর আবার আমরা ফিরে এলাম ঘরে। রাতের ঠাণ্ডা ইতিমধ্যেই হাড় কাঁপাতে শুরু করেছে। আগুনের কড়াইটাকে বিছানার উপর তুলে নিয়ে তিনি আমাকে তারই পাশে বসতে বললেন। তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—মণ্ডলা সম্পর্কে আরও কিছু শুনতে চাও ?
——অবশ্যই, আপনি এত সহজভাবে কঠিন তত্ত্বটাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন—সত্যি আমি ভাবতেই পারছি না। আমি তো ভেবেছিলাম মণ্ডলা কথাটার অর্থ জানতে হলে আমাকে অন্ততঃ বছরখানেক পড়াশুনা করতে হবে। আপনি আরও বলুন আমি শুনবো, আপনার মত জ্ঞানীগুরুর সাক্ষাৎ পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়।
তিনি আমার কথার উপর কোনরকম মন্তব্য না করে আবার শুরু করলেন— মণ্ডলা সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞানলাভ করতে হলে তন্ত্র সাধনার প্রয়োজন। মণ্ডলার আদি উৎস হচ্ছে তন্ত্র। তন্ত্র সাধনার সাথে সাথে মন গড়ে উঠে। মন ঠিকমতো গঠিত হলে চিন্তাধারা ঠিকপথে গতি নেয়। সেই গতির সাথে খাপ খাইয়ে মণ্ডলার জ্ঞান আসে ।
--তন্ত্র বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন, আমি এর কিছুই বুঝি না ।
—তিব্বতে তন্ত্রর মানে হচ্ছে জগৎ-রহস্য জানা, দেহের রহস্য জানা, জন্ম-মৃত্যুর রহস্য জানা। তন্ত্র-মন্ত্র যারা গ্রহণ করে তাদের চার অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে সাধনা করতে হয়।
প্রথম অধ্যায়কে বলে (১) বিয়ার্ গীউদ্ বা ক্রিয়াতন্ত্র
দ্বিতীয় অধ্যায়কে বলে (২) পীয়র্ গীউদ্ বা কার্যতন্ত্র
তৃতীয় অধ্যায়কে বলে (৩) নাল-বীয়র্ গীউদ্ বা যোগতন্ত্ৰ
চতুর্থ অধ্যায়কে বলে (৪) লা-না মেদ্ গীউদ্ বা অনুত্তরা যোগতন্ত্র ।
ক্রিয়াতন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের বাহ্য অনুষ্ঠান-পূজা ও দীক্ষার প্রয়োজন।
কার্যতন্ত্রে আরও বেশী পূজা অর্চনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজন এবং ধারণা ও ধ্যানের সাধনা করতে হয়, সেই সাথে সাথে শিখতে হয় মন্ত্র ও তার ব্যাখ্যা ।
যোগতন্ত্রের পথ আরও কঠিন। এই সময় যোগ তপস্যা ও বিভিন্ন সংস্কারের ঊর্ধ্বে যাবার সাধনা করতে হয়। নির্বাণ লাভের উপায় ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়।
অনুত্তরা যোগতন্ত্র হচ্ছে সাধকের চরম ও শেষ পরীক্ষা। মন শুদ্ধ ও মুক্ত হয়ে এই অধ্যায়ে সাধক নির্বাণ লাভের যোগ্যতা অর্জন করেন।
চিত্তের সর্বপ্রকার চাঞ্চল্য দূরে সরে গিয়ে সাধক শান্ত অবস্থা প্রাপ্ত হন ।
সাধক যখন ক্রিয়া, কার্য, যোগ ও অনুত্তরার সব পরীক্ষায় সফল হয়ে সাধনার শীর্ষে উত্তীর্ণ হন সেই সময় মণ্ডলার সব রকম ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য তার কাছে সহজ হয়ে উঠে এবং তন্ত্র রহস্যের সব দ্বারও যায় খুলে ।
কাজেই বুঝতে পারছো যে, মণ্ডলা হচ্ছে তন্ত্রের রহস্য জাল, তন্ত্রের চাবিকাঠি এই মণ্ডলার রঙ ও ছকের মধ্যে বদ্ধ থাকে ।
মণ্ডলার অঙ্কন বা চিত্র করার সাথে সাথে সন্ন্যাসীর মন নিবিষ্ট হয় সেই কেন্দ্রে, দিনের-পর দিন সে ছক রঙ ও মুদ্রার মধ্যে তার মনকে নিবিষ্ট চিত্তে আকৃষ্ট করে রাখে ।
শুরু হয় মণ্ডলার আকৃতি দিয়ে, পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর দক্ষিণ এই চারদিকের চার দরজা। প্রত্যেক দরজায় চিত্রিত করা হয় তার উপযুক্ত রক্ষী। গুণ ও দিক বিশেষে আরোপ করা হয় রঙ, যেমন—পূর্বদিকে সাদা, পশ্চিমে লাল, উত্তরে সবুজ আর দক্ষিণে হলুদ। পূর্বের রক্ষী বিজয়া, পশ্চিমে হয়গ্রীবা, উত্তরে অমৃতধারা আর দক্ষিণের যমস্তক।
চার দরজা আমাদের জীবনের চার সীমা। পূর্বে জন্ম ও মৃত্যু, পশ্চিমে হাওয়া, উত্তরে আবির্ভাব ও শূন্যতা, দক্ষিণে অমৃত ও চিরনির্বাণ। বিজয়ার হাতে অঙ্কুশ, হয়গ্রীবার হাতে বজ্রশৃঙ্খল, অমৃতধারা কিঙ্কিণীধারি আর যমস্তকের হাতে পাশা।
সাদা—অচিন্ত্যনীয়র প্রতীক; লাল—ডিম্বজাতকের প্রতীক; সবুজ-শ্যামল ও উত্তাপের প্রতীক ; হলুদ—জননীর প্রতীক ।
লামা এবারে থামলেন। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনতে লাগলাম। এবারে তিনি অনেকক্ষণ মৌন রইলেন। তাঁর কথাগুলোকে আমি নিজের মনে গুছিয়ে নেবার সময় পেলাম। অদূরে রক্ষিত হ্যারিকেনের চিমনিটা মনে হয় অনেকদিন যাবৎ পরিষ্কার করা হয়নি। কোন রকমে আত্মপ্রকাশ করে আছে মাত্র। প্রদীপের আলোতেই আমাদের কাজ চলছে। জানালা দরজা বন্ধ চারদিক নিঃশব্দ পৃথিবীর এক অজানা কোণে মুখোমুখি বসে আছি এক বিরাট জ্ঞানী গুরুর সামনে। তিনি উজাড় করে দিচ্ছেন তাঁর জ্ঞানভাণ্ডার আমি নিতে পারছি কৈ ?
তিনি এইবার উঠে গিয়ে একটা সুন্দর কাঠের কাজ করা বাক্স খুললেন তার ভেতর থেকে একটা ফুলস্কেপ কাগজ আর একটা পেন্সিল বার করে আমাকে দিয়ে বললেন— তোমার হয়তো সব মনে থাকবে না লিখে রাখো ।
তিনি তারপর দরজাটা খুলে দিলেন পরে মুম্বু ভেতরে ঢুকে আমাদের সামনে দুটো বাটিতে করে সুজি আর মাখন চা রেখে যেমন এসেছিল তেমনি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। হাজার রকমের মণ্ডলা আছে, প্রত্যেক জ্ঞানী লামা তার মনের গতি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি অনুসারে মণ্ডলা অঙ্কন করতে পারেন। তবে যে যে রকম মণ্ডলাই তৈরী করুক না কেন তাকে পাঁচটা বিষয়ে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে, সেই পাঁচটা বিষয়ই হচ্ছে মণ্ডলার মূল শিক্ষা।
প্রত্যেকটি মণ্ডলার নিজস্ব নাম ও বৈশিষ্ট্য আছে—ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিতেই হবে । মণ্ডলার পাঁচ বৈশিষ্ট্য—বৈরচনা, বজ্রসত্ত্ব অক্ষোভ্য, রত্নসম্ভবা, অমিতাভ, অমোঘসিদ্ধি। মণ্ডলার মধ্যে বৈরচনার স্থান মধ্যে, বজ্রসত্ত্ব অক্ষোভ্যর স্থান পূর্বে, রত্নসম্ভার স্থান দক্ষিণে, অমিতাভের স্থান পশ্চিমে আর অমোঘসিদ্ধির স্থান উত্তরে ।
বীজমন্ত্র চিত্রণের সময় মন-প্রাণ সঁপে দিত হবে মন্ত্রের উপর। শুদ্ধচিত্তে প্রথমে উচ্চারণ করতে হবে বীজমন্ত্র তারপর মণ্ডলার উপর তাকে স্থাপন করতে হবে। গুরু এই সময় বার বার করে সন্ন্যাসীকে চিত্রণের উপর নজর রাখতে নির্দেশ দেন। বৈরচনার বীজমন্ত্র ওম্; বজ্রসত্ব অক্ষোভ্যের হুম্; রত্নসম্ভবার ত্রম্ ; অমিতাভের হ্রীঃ ; অমোঘসিদ্ধির আঃ। তাদের পরিবার যথাক্রমে মোহ, দ্বেষ, চিন্তামণি, রাগ ও সময়, তাদের রং যথাক্রমে সাদা, নীল, হলুদ, লাল আর সবুজ।
বৈরচনার মুদ্রা ধর্মচক্র, বজ্রসত্ত্ব অক্ষোভ্যের মুদ্রা ভূমিস্পর্শ, রত্নসম্ভবার মুদ্রা বরদা, অমিতাভের মুদ্রা ধ্যান, আর অমোঘসিদ্ধির মুদ্রা অভয় ।
বৈরচনার বাহন সিংহ, বজ্রসত্ত্ব অক্ষোভ্যের বাহন হস্তী, রত্নসম্ভবার ঘোড়া, অমিতাভের ময়ূর আর অমোঘসিদ্ধির গরুড়।
বৈরচনার ভূত আকাশ, বজ্রসত্ত্ব অক্ষোভ্যের ভূত জল, রত্নসম্ভবার ভূত মাটি, অমিতাভের ভূত অগ্নি, অমোঘসিদ্ধির ভূত বাতাস ।
মণ্ডলা তৈরীর সময় তাদের স্থান কাল পাত্র জাতি বালী স্কন্ধ ধাতু বৰ্ণ নক্ষত্র সব কিছুকে বিচার করতে হয়। কোন গুম্ফা নির্মাণের পূর্বে তার ভিত্তি তৈরী হয় মণ্ডলাকারে আর সেই ভিত্তির মূলেও থাকে আর এক পরম ভিত্তি। পণ্ডিত লামারা প্রত্যেকটি বিষয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করে তারপর আকার ও প্রকৃতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মণ্ডলা বিচার ও তার স্বরূপ জানা জ্ঞানীগুরু ছাড়া সম্ভব নয়। গুম্ফা ও স্তূপ থেকে আরম্ভ করে পাহাড় নদী পৃথিবী চন্দ্র সূর্য সব কিছুর মূলেই রয়েছে মণ্ডলা । মণ্ডলা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা মানে এই পৃথিবীর মূল রহস্য জানা ।
আমরা চায়ের বাটিতে চুমুক দিলাম। চায়ের সাথে মাখনের সুমিষ্ট গন্ধে ঘরটা যেন ভরে গেছে। জ্ঞানীগুরু লামা বাটিতে বিরাট শব্দ করে চুমুক দিলেন তারপর ঠোঁটের উপর মাখনের প্রলেপটাকে জিভ দিয়ে চেটে পরিষ্কার করতে করতে হঠাৎ থেমে পড়লেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
পুষ্প-ধূপ-দীপ অর্পণ করেই আমাদের কাজ শেষ করলে চলবে না এর মানে বুঝতে হবে। পুষ্প আসলে আমাদের অতীত চিন্তার ফল স্বরূপ, অতীত চিন্তার ফল স্বরূপ কথাটা ভেবে দেখো, বুঝবার চেষ্টা কর।
ধূপ হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তার প্রতীক, ধূপ পুড়ে গন্ধ দিচ্ছে। আমাদের চিন্তা যেন কাজে লাগে এমন ভাবে চিন্তা করতে হবে। গন্ধ ভবিষ্যৎ চিন্তার প্রতীক। দীপ হচ্ছে অনন্ত চিন্তার অনন্ত স্রোত।
এসব যদি আর্য তারা অথবা শ্রীদেবীর চরণে সঁপে দেওয়া যায় তাহলে রইলটা কি ? আনন্দ আর নির্বাণ লাভের পথ কে বন্ধ করবে ?
তিনি আমার দিকে প্রশ্নটা যেন ছুঁড়ে দিলেন। তারপর অনেকক্ষণ ধরে আমরা বসে রইলাম, আমি তাঁর কথাগুলোর যতটা সম্ভব তাৎপর্য অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি নিজেকে একটু সংযত করে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—আমার তো কোনো তপস্যাই নেই সাধনাও কিছু করিনি তবুও তো সব পাচ্ছি এর কারণ কি বলতে পারেন ?
খুব সোজা, অনেকে গাছ পোঁতে ফলের আশায় আবার অনেকে গাছ না পুঁতেই ফল পায়। কর্ম আমরা করি আর কর্মফলেই জন্মগ্রহণ করি। এ জীবন গত জীবনের ফল স্বরূপ আর এ জীবনে যা করছি সেটাই পাব ভবিষ্যতে ।
এরপর তিনি হঠাৎ শুরু করলেন মণ্ডলার আরও গভীর তত্ত্ব তার কিছুটা বুঝতে পারলেও অধিকাংশই রইল আমার জ্ঞানের বাইরে। আমি যতদুর পারলাম লিখে নিলাম। ডাকিনী, রং, কোন হাতে কি ধারণ করে আছেন, মণ্ডলার কোথায় তার স্থান, কেন ও কি ইত্যাদি ইত্যাদি। ডাকিনীর অনেক নাম যেমন—গৌরী, বিতালী, ঘাসমরী, পুক্কশী, শবরী, চণ্ডালী, ডম্বী ইত্যাদি, তাদের রং যথাক্রমে কালো, লাল, সবুজ, নীল, সাদা, নীল ডম্বী সবুজ। মণ্ডলায় গৌরীর স্থান মধ্যে, বিতালীর স্থান পশ্চিমে, ঘাসমরীর স্থান উত্তরে, পুক্কশীর স্থান উত্তর-পূর্বে, শবরীর স্থান দক্ষিণ-পূর্বে, চণ্ডালীর স্থান দক্ষিণ-পশ্চিমে, এবং ডম্বীর স্থান উত্তর-পশ্চিমে ।
জ্ঞানীগুরু এই লামার জ্ঞানভাণ্ডার অফুরন্ত তিনি এরপর বলতে লাগলেন—শূন্য ও মহাশূন্য তত্ত্ব, তারপর চেন্-রে-জী। তার মুখ নিঃসৃত অমৃত বাণী বুঝতে হলে আমাকে লামা ও তন্ত্র শাস্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে। আমি বুঝতে পারছি কি না অথবা আমার সেদিকে ঝোঁক আছে কি না তার দিকে তিনি ভ্রুক্ষেপ না করে সমানে থেমে থেমে বলে যেতে লাগলেন তন্ত্র শাস্ত্রের গূঢ় রহস্য।
আমি তাঁর কথা শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তার ঠিক নেই। ঘুম ভাঙ্গলো পরেরদিন খুব ভোরে, চোখ খুলতেই দেখি আমি লামার বিছানার অর্ধেক জুড়ে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছি আর লামা বিছানার অর্ধেকাংশে পা গুটিয়ে দ' হয়ে শুয়ে আছেন। আমার গায়ের উপর কম্বলটা তিনিই মনে হয় ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমি উঠে আস্তে আস্তে নীচে নেমে এলাম, তারপর মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা সেরে গুল্ফার প্রার্থনা চক্রগুলো ঘোরাতে লাগলাম। সেই সময়েই নজরে পড়ল গ্রামবাসীরা সবাই দল বেঁধে কোথায় যেন যাচ্ছে। ঠিক যেমন দেখেছি সাঁওতাল পল্লী থেকে সাঁওতালীরা যায় বর্ধিষ্ণু গ্রামের দিকে কাজের আশায় । কিছুক্ষণের মধ্যেই লামাজী উঠলেন। আমি তাঁকে প্রণাম করে বললাম – এবার আমাকে যেতে হবে। তিনি আমার মাথাটা তাঁর কাছে টেনে সস্নেহে বললেন—ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। সাবধানে যেও ।
তারপর তিনি আমাকে খুব মূল্যবান কয়েকটি উপদেশ দিলেন, তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, মানস সরোবরের স্থানীয় নাম ৎসো মাফাম্। থোক্চেন হচ্ছে কাছাকাছি সবচেয়ে বড় শহর। এই রাস্তাটাই সরাসরি আমাকে নিয়ে যাবে সেই মহাতীর্থে। সাধারণ তীর্থযাত্রীরা সবাই মানস সরোবর পরিক্রমা করেন তবে লামার মতে এই সময় পরিক্রমা না করাই ভালো, দর্শন ও স্পর্শেই তার পূর্ণ ফল পাওয়া যাবে।
বার বার সতর্ক করে দিয়ে তিনি আরও বললেন-- তুমি মানস সরোবরের নাম একদম উচ্চারণ করবে না, সো মাফাম্-এর আশপাশের যাযাবররা এই সরোবরকে সো মাভাং বলে অভিহিত করে। ৎসো মাফাম্-এর দক্ষিণ দিকের গুম্ফাগুলোতে না গিয়ে উত্তরের গুম্ফাগুলোতেই থাকবে।
ইতিমধ্যে মুম্বু চা ও কিছু আলুসেদ্ধ নিয়ে এল। চা এখানকার জন্য আর আলুসেদ্ধটা রাস্তার জন্য। চা খাবার সময় লামা একটা চিঠি লিখে আমাকে দিলেন । সো মাফাম-এর উত্তরে লাঙবোনা (Langbona) আর কৈলাসের উত্তরে দিরফুক্ ( Diraphuk) নামে দুটো গুম্ফা আছে, গুম্ফার অধ্যক্ষকে এই চিঠিটা দিলেই তিনি আমার জন্য যা করণীয় সব করে দেবেন। আমার এই অজানা দেশে এরকম একটা চিঠি পরম সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করলাম। লামার এই উপকারের কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। শুধু আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েই তাঁর এই উপদেশ ও উপকারের শোধ দেওয়া সম্ভব নয়। সূর্যদেবকে পেছনে রেখে আমি বেরিয়ে পড়লাম। আবার পথ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন