তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি

বিমল দে

পরের দিন সকালের দিকে দু'পাশের পাহাড়গুলো যেন আস্তে আস্তে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। নীয়াং নদীর সেই প্রশস্ত রূপ ক্রমশ সীমিত হতে লাগল । শেষে আমরা যেখানে হাজির হলাম সেখানে নীয়াং-চু উপত্যকা, মনে হলো দুই পাহাড়ের মধ্যে নদীটাকে মাঝখানে রেখে সম্পূর্ণ উপত্যকাটা ঢুকে গেছে এক রহস্যময় জগতে।

নাথুলাতে উঠবার সময় রাস্তা অনেকটা এরকমই ছিল, তবে সেটা ছিল উঠবার মুখে। কিন্তু এবারে রাস্তাটা নেমে গেছে নীচের দিকে ।

বিরাট নদীটা আস্তে আস্তে মনে হচ্ছে পাতালের দিকে নেমে গেছে। হঠাৎ তীর্থযাত্রীদের কৌতূহল আর উৎসাহ যেন শতগুণে বেড়ে গেল। আমাদের চলার গতি আপনা থেকেই যেন বেড়ে গেল। উপরে নীল আকাশ, আর আমাদের দু-পাশের পাহাড়গুলো দেয়ালের মতো নদীটার দু-পাশে সরে এসেছে। নদী থেকে সেই দেয়ালটা মনে হয় কম করেও তিন হাজার ফিট উঁচু। আসলে এই নীয়াং-চু নদীটা হাজার হাজার বছর ধরে চেষ্টা করার পর তৈরী করেছে এই ভয়ংকর পথ। জল পাহাড়কে কেটে করেছে রাস্তা, নদীর শান্ত রূপ এখানে রুদ্র রূপে পরিণত হয়েছে। এখানে তার সংহার মূর্তি, ভীষণ তার রূপ। ধ্বংস লীলার সাক্ষী এখনও বর্তমান। বিরাট বিরাট পাথরগুলো নদীটাকে বাধা দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে পড়ে আছে। নদীর শক্তি এখানে কেন্দ্রীভূত হয়ে শত বাধাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে চলেছে। ভীষণ তার রূপ আর ভয়ঙ্কর তার শব্দ ।

বন্যা নদীর এক সংহার মূর্তি, বৃষ্টির মূর্তি অন্যরকম। আর এখানে দেখছি তার পাহাড় ফাটানো মূর্তি। আরও কাছে আসতেই আমাদের কাছে এক অনবদ্য রূপের আবির্ভাব হল। স্বপ্নরাজ্যের দুয়ার হঠাৎ যেন গেল খুলে। নীলাকাশের নীচে আমাদের এই পৃথিবীতে লুকিয়ে ছিল 'পৃথিবীর এই বিষ্ময়। এই অনিন্দ্যসুন্দরের বর্ণনা লেখার ভাষা আমার নেই। শুধু আমি নই, আমরা সবাই হঠাৎ স্থির হয়ে গেলাম ৷ এই অনন্ত সৌন্দর্য হঠাৎ যেন আমাদের বুকে আনন্দের আঘাত হেনেছে। ঝরনার সৌন্দর্য আর কাকে বলে ! আমাদের বিহ্বলভাবটা কাটাতে একটু সময় লাগল, তারপর সমবেতভাবে আমরা সেই রুদ্রারূপী সুন্দরী ভৈরবীকে আরাধনা করতে লাগলাম— হে দেবী !

তুমি রূপ ও অপরূপের অধিষ্ঠাত্রী তুমি আলো ও অন্ধকারের দেবী তুমি জ্ঞান ও অজ্ঞানের ওপারে বিরাজিতা৷ আমাদের শক্তি দাও তোমাকে উপলব্ধি করার আমাদের চোখ দাও তোমাকে দেখবার তোমার নিরাকার রূপের সাকার রূপ দর্শন করাও আমাদের এগিয়ে নিয়ে চল—এগিয়ে নিয়ে চল এগিয়ে নিয়ে চল।।

নদীটা তার সমস্ত শক্তি নিয়ে হঠাৎ যেন আছাড় খেয়ে নীচে পড়েছে, আর তারই ফলে জলটা ফেটে গিয়ে সাদায় সাদা হয়ে গেছে। সেই একই নীয়াং নদী এখানে হাজার ঝরনায় রূপান্তরিত হয়েছে। মনে হচ্ছে হাজার হাজার রূপসী তাদের সাদা মেখলা ছড়িয়ে কোন এক অজ্ঞাত দেবতার উদ্দেশ্যে নাচ করছে। তারই উপর সূর্যের আলো পড়ে ছোট ছোট রামধনুর সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন আকারের পাথরগুলোকে কেন্দ্র করে তারা যেন তাদের নিজস্ব খেলায় মত্ত। পাথরগুলোও বিভিন্ন রঙের, তার মধ্যে শেওলা জমে সৃষ্টি করেছে সবুজ ঝালর। তারই পাশে রয়েছে অনেকগুলো চৈত্য বা চোরতেন আর পাহাড়ের দেয়ালে কোন এক অজ্ঞাত শিল্পীর অমর শিল্পপ্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জ্যোতির্ময় ভগবান বুদ্ধের শান্ত মূর্তি। পৃথিবীর এই নির্জন প্রান্তে প্রকৃতি ও পুরুষের চলছে এক অনন্ত লীলা । শিবময় পাহাড়ের ওপর নদীময় প্রকৃতির এই লীলা রহস্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টি রহস্য ।

পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো বুদ্ধ মূর্তি খোদাই করা আছে, অজন্তার ফ্রেস্কোর মতো, এগুলোও অতি প্রাচীন। নীল, লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের এই মূর্তিগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে ভগবান পদ্ম সম্ভবার মূর্তি। পাহাড়ের গায়ে লেখা আছে—‘আমাকে পূজা না করে যারা এগিয়ে যাবে তাদের পথ অন্ধকার।' তাই তীর্থযাত্রী মাত্রেই এখানে পূজা ও অর্ঘ্য নিবেদন করতে বাধ্য। কৈলাসের পথে এখানেই নিবেদন করতে হয় প্রথম অর্ঘ্য।

পদ্ম সম্ভবাকে বলা যায় তিব্বতের মুখ্য দেবতা, ভগবান বুদ্ধেরই আর এক রূপ । তিব্বতের যে কোন গুম্ফাতে তাঁর মূর্তি পাওয়া যাবেই। তিনি ছিলেন আসলে একজন নামকরা কাশ্মীরী পণ্ডিত। তাঁকে তিব্বতের রাজা এনেছিলেন তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য। তিনি গূঢ় তন্ত্রশাস্ত্র ও বৌদ্ধধর্মের সংমিশ্রণে রূপ দিলেন বৌদ্ধ-তন্ত্রের। তাঁর অলৌকিক ক্রিয়া ও অগাধ পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে তিব্বতের অধিবাসীরা তাঁর পায়ে আত্মসমর্পণ করলেন। তিব্বতের কোন কোন মঠ ও মন্দিরে ভগবান বুদ্ধের থেকে পদ্ম সম্ভবাই উচ্চে স্থান পেয়েছেন। তিব্বতের সহজ মানুষের কাছে তিনি গুরু রিম্পোচে নামে পরিচিত। গুরু রিম্পোচে মানে অমূল্য গুরু; যাঁর গুণকে জাগতিক কোণ দ্রব্য দিয়েই কেনা সম্ভব নয়। তিব্বতের অনেক বইয়ে তিনি উরগীয়ান লামা বলেও অভিহিত হয়েছেন! তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা ছিল অসীম। গুরু রিম্পোচ আসার পর তিব্বতের আদি দৈত্য ও প্রেতাত্মাদের মধ্যেও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়ে যায়। গুরু রিম্পোচে তাদের স্ববশে এনে, মানুষদের মনে আস্থা এনে দেন। গুরু রিম্পোচে মাঝে মাঝে শূন্যপথে চলে যেতেন' কৈলাসে, সেখানে তিনি শাসন করতেন দুষ্ট আত্মাদের। পদ্ম সম্ভবার ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল, আর তাঁর যাদু বিদ্যার ফলে পূর্বের পিশাচ সিদ্ধরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে পদ্ম সম্ভবার ধর্মীয় একাধিপত্য মেনে নিয়েছিল। পদ্ম সম্ভবাই বলতে গেলে তিব্বতে স্থায়ীভাবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই বৌদ্ধ ধর্মের সাথে তন্ত্র সাধনাকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দেন। এই ভাবেই তিব্বতে সৃষ্টি হয়েছে বৌদ্ধ-তন্ত্র। তাঁরই উপদেশে তিববতী রাজা ত্রি-স্রোন-দে-সান্ এদেশের সর্বত্র মঠ বিহার ও চৈত্য স্থাপন করেন। সেটা ছিল সম্ভবত সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে। সিকিম বা ভূটান হয়ে যে সব তীর্থযাত্রীরা কৈলাসে যান তাদের কাছে তিনি অনেক সময় পদ্মাসন বাবা বলেও পরিচিত।

পদ্ম সম্ভবার মুর্তির আশপাশে আরও অনেকগুলো মূর্তি রয়েছে; তার মধ্যে ধ্যানীবুদ্ধ, মঞ্জুশ্রী ও অবলোকিতেশ্বরের মূর্তিগুলো সবই ধ্যানমগ্ন। ধ্যনের এত সুন্দর পরিবেশ জগতে বিরল। তারই আর একপাশে আমাদের নজরে পড়ল সারি সারি চৈত্য। রাস্তাটা এগিয়ে গেছে আর তারই দু'পাশে সৃষ্টি হয়েছে এই সুন্দর তীর্থক্ষেত্রটি। জায়গাটির নাম নীয়াং-চু-চোরতেন। চৈত্য আর ঝরনার নামানুসারেই এই স্থানটির নাম ।

এখানে ছোট একটি গুম্ফা পাওয়া গেল। গুম্ফা না বলে বলা যায় পুরানো একটা মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। সেখানে আমরা আমাদের জিনিসপত্র রেখে দিলাম, তারপর তৈরী হলাম আরাধনার জন্য। গুরুজী বললেন—এখানে আমরা ঘন্টাখানেক থাকবো । অর্থাৎ [ৎ পূজো, আহ্নিক ও রান্নাবান্না করে খেতে খেতে প্রায় বিকেল হয়ে যাবে । তারপর আবার চলতে হবে। এখানে রাত্রিবেলা থাকা চলবে না। ঝরনার জন্য এখানকার বাতাসও খুব ভারী, আমাদের মধ্যে অনেকেরই সর্দি কাশি হয়েছে তারা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। গুরুজী আমাদের বার বার করে বললেন—ধ্যানস্থ হয়ে এ জায়গাটার মাহাত্ম্য অনুভব করবার চেষ্টা কর। স্থান-মাহাত্ম্যের কথা বহুবার শুনেছি, কিন্তু তাকে যে উপলব্ধি করা যায় সে কথা এই প্রথম শুনছি। কৈলাসের পথে এ আর এক নতুন অভিজ্ঞতা।

গীয়াৎসে শহরে প্রবেশের আগে কয়েকটা কথা জেনে রাখা ভাল। ভগবান বুদ্ধের তিনটি প্রধান রূপ-ধ্যানী বুদ্ধ, ধ্যানী বোধিসত্ত্ব, মানসি বুদ্ধ। তিব্বতী ভাষায় তাদের নাম যথাক্রমে—ও-পা-মে, চেন্-রে-জি ও শাক্য থুপ। সংস্কৃতে তাদের বলা হয় অমিতাভ, অবলোকিতেশ্বর ও শাক্যমুনী। তিব্বতে বুদ্ধ মঠ ও বিহারগুলো এই তিন শ্রেণীর মধ্যে পড়ে, তবে এ ছাড়াও বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে। পাঞ্চেন লামাকে বলা হয় 'অমিতাভ বুদ্ধ বা তাশি লামা, আর দালাই লামা হচ্ছেন অবলোকিতেশ্বরের রূপ, দালাই লামার স্থানীয় নাম চেন্-রে-জি।

আমাদের উদ্দেশ্য পাঞ্চেন লামা ও দালাই লামা দর্শন। তারপর আমরা যাবো কৈলাসের পথে।

ভগবান বলেছেন—দেহই দুঃখের কারণ, মন সেটা প্রকাশ করে মাত্র। দুঃখ আছে,

আর দুঃখের মুলে আছে তার কারণ। দুঃখটাকে নাশ করতে হলে নাশ করতে হবে তার কারণ।

আমরা আজ হিমালয়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে পৌঁছেছি তিব্বতে, পৃথিবীর ছাদে। এখানকার মতো শুদ্ধ বাতাস আর নেই, এমন পবিত্র ভূমি আর দ্বিতীয় নেই ৷ যদিও প্রচণ্ড শীতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে তবুও এই শান্ত নীরবতা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এই পবিত্র ভূমিতে বসে গভীরভাবে চিন্তা কর আমার কি কোনো দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ কি? দুঃখটা আধিভৌতিক, আধিদৈবিক না আধিআত্মিক? চিন্তা কর, ভেবে দেখো, তুমি যদি সম্পূর্ণ ভাব ও বিশ্বাস দিয়ে জানতে চাও তাহলে পদ্ম সম্ভবা নিজে আসবেন তোমাকে সাহায্য করতে।

লামারা প্রত্যেকেই জ্ঞানী, সবাই বলতে গেলে দার্শনিক। গুরুজী এ পর্যন্ত পথ প্রদর্শক ছিলেন, আজ সকালে তিনি হঠাৎ ভূমিকা নিলেন গুরুর। নদীর ধারে সকলকে বসিয়ে সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন কি করতে হবে। এখন সকাল, রোদের তেজটাও আস্তে আস্তে বাড়ছে। নদীর কাছেই আমরা পেলাম ছোট্ট উষ্ণ প্রস্রবণ, নদীর কাছেই ছোট্ট এই কুয়োর মতো জায়গাটায় জল জমে আছে, জলে হাত দিয়ে দেখি কি অদ্ভূত, এই চারদিকে বরফের রাজত্বে আমাদের জন্য কে যেন গরম জল করে রেখেছে। জলের তাপমাত্রা মনে হয় শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে দু’এক ডিগ্রী বেশীই হবে। তারই ধারে বসে আমরা ধ্যানে মগ্ন হলাম ।

ঘন্টাখানেক বাদে আমাদের ধ্যান ভাঙার পর, আমরা সকলে মিলে উলঙ্গ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেই জলে, আ! কি আনন্দ। প্রায় দেড়মাস পর এই প্রথম গায়ে জল পড়ছে, চারদিকে বরফ এটা বরফেরই দেশ, আর তারই মধ্যে আমরা উলঙ্গ হয়ে স্নান করছি, প্রকৃতির কি অদ্ভূত খেলা। গুরুজী আমাদের হুঁশিয়ার করে দিলেন, এরপর আমাদের স্নান আর হবে কি না সন্দেহ, কাজেই ভালোভাবে স্নান করে নাও। আমরা স্নান করে যেন নবজীবন পেলাম। সেই প্রস্রবণের ধারেই আমরা রান্না আরম্ভ করলাম । গতকাল নীয়াং-চু গুম্ফা ছাড়ার পর আমরা রাত্রিবেলা একটা ভাঙা বাড়ীতে কাটিয়েছি, রাতে খাওয়াও কিছু হয়নি কাজেই আমরা প্রত্যেকই ক্ষুধার্ত। কাঠ আমাদের সঙ্গেই ছিল। গুরুজী সকলকে সাবধান করে দিলেন—এই প্রস্রবণের জলটা দেহের পক্ষে ভাল কিন্তু খাবার জন্য নয়, এই জল খেলে বদহজম ও পেটে গণ্ডগোল হবার সম্ভবনা আছে। এই জলে গন্ধকের পরিমাণটা খুব বেশী ।

কাছেই গীয়াৎসে, অনেকে গীয়াসে বা গীয়াচ্চেও বলে অভিহিত করে। পাহাড়ি পথে চলতে চলতে গুরুজী সবাইকে হঠাৎ অপেক্ষা করতে বললেন, তারপর পাহাড়ের অবস্থান ঠিক করে আমাদের ঘোষণা করলেন—খুব শীগগীরই আমরা গীয়াৎসে শহরে ঢুকবো। সেখানে ঢোকার পথেই হানদের চৌকি পেরোতে হবে, তোমরা ধৈর্য ধরে থাকবে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর যাতে আমরা ভালোভাবে এই শেষ চৌকিটা পেরোতে পারি।

গুরুজীর কথায় আমরা খুবই উৎসাহিত হলাম। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাবো তিব্বতের অন্যতম ঐতিহ্যমণ্ডিত শহর। তিব্বতের তিনটি শহর ব্যবসা বাণিজ্য ও

শিল্পকলার জন্য প্রাচীন কাল থেকেই প্রসিদ্ধ। তার মধ্যে এক নম্বর হচ্ছে লাসা যেটি তিব্বতের রাজধানী, দ্বিতীয় শীগাৎসে, ও তৃতীয় গীয়াৎসে। লাসা মহামান্য দালাই লামার স্থান, শীগাৎসেতে থাকেন শাক্য অবতার পাঞ্চেন লামা, আর গীয়াৎসে বুদ্ধস্থাপত্য ও তীর্থক্ষেত্রের জন্য প্রসিদ্ধ। কিছুক্ষণ পর আমরা একটা পাহাড়ের পাঁচিল পেরোতেই সামনে ঠিক পাহাড়ের নীচে আমাদের নজর পড়ল। বিরাট সমতল ভুমিটার মধ্যে হঠাৎ যেন আকাশ থেকে সোনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এটাই গীয়াৎসে।

সকালের সূর্যরশ্মি সেই শহরের সোনালী 'ছাদে ঠিকরে পড়ছে, আমরা আছি অনেক উঁচুতে। এখান থেকে শহরটাকে দেখে মনে হচ্ছে এক যাদুপুরী।

গুরুজী আমাদের বুঝিয়ে দিলেন—এই গীয়াৎসে শহরটাকে পরিষ্কারভাবে দু'ভাগ করা হয়েছে, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে অগণিত বাড়ীঘর রাস্তা ইত্যাদি, সেটা হচ্ছে শহরের এক অংশ ; শহরের দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। শহরের দ্বিতীয় অংশ মনে হচ্ছে বিরাট একটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সেই অংশে রয়েছে পবিত্র মন্দির ও বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় সংস্থা। গীয়াৎসের মুল মন্দির সেখানেই অবস্থিত। ওই প্রাচীরের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় সোনালী রঙের ছাদটা দেখতে পাচ্ছো সেটাই এখানকার মূল মন্দির। কাছে গেলে দেখতে পাবে এটা বৌদ্ধ জগতের এক অমর সৃষ্টি, তিব্বতী ভাস্কর্যের প্রাণ ওখানেই লুকিয়ে আছে ।

গুরুজীর কথামতো আমরা ভালভাবে চারদিক দেখতে লাগলাম, এ পর্যন্ত যতগুলো শহর পেয়েছি তার সঙ্গে এর যেন তুলনাই চলে না, একনজরে দেখলেই বোঝা যায় যে এটি একটি সমৃদ্ধ শহর । আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই শহরর সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম ঠিক তারই কাছে পেলাম একটি চৈত্য। চৈত্যটির কাছে বসে আমরা গীয়াৎসে শহরে ঢোকবার আগে শেষ বিশ্রাম করে নিলাম ৷

এবার আমাদের নামার পালা। আধঘন্টা পরই আমরা পেলাম শহরের শুরু। আমাদের ডানদিকে অনেকগুলো বস্তি বাড়ী, তার পেছনে যাযাবরদের তাঁবু,

অনেকগুলো ইয়াক ও গাধা তারই আশপাশে পাথরে মাটির উপর ঘাস খুঁজে বেড়াচ্ছে ৷ আমাদের সকলেরই লামার পোশাক, আর আমাদের সংখ্যাও কম নয়। কাজেই রঙচঙে এই তীর্থযাত্রীর দল শহরবাসীদের চোখে পড়বেই। ইয়াকগুলো আমাদের দেখে থমকে দাঁড়ালো, কয়েকটা ভেড়া তাদের ভাষায় চীৎকার করে আমাদের স্বাগতম জানাল আর তার চেয়েও বেশী আপন করা অভ্যর্থনা পেলাম এখানকার গ্রাম রক্ষীবাহিনীর কাছ থেকে, তারা সদলবলে তারস্বরে চীৎকার করতে করতে ছুটে এলো আমাদের সামনে, আমরা দাঁড়াতে বাধ্য হলাম। তাদের ঘেউ ঘেউ শব্দ আজকাল আমাদের কাছে পরিচিত। তিব্বতের এই যমদূত-তুল্য প্রহরীদের এড়িয়ে এগিয়ে চলে এমন সাধ্য কার। তাদের চোখে ধুলো দিয়ে একটা মাছিও বুঝি প্রবেশ করতে পারবে না। তবে আমার মনে হয় চীনা ড্রাগনদের এরা ভয় করে নচেৎ এই দেশে তারা কি করে বাসা বাঁধল।

এই কুকুরগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, দাঁড়িয়ে পড়লে এরা আর কিছু করে না,

আস্তে আস্তে যে যার পথ দেখে। এই শহরে প্রবেশ পথেই এমন অভ্যর্থনা। আমার কাছে এটা একটা খুব ভালো ইঙ্গিত বলে মনে হল না। কুকুরের ডাকে এদিক-ওদিক থেকে রাস্তার কাছে লোকজন এসে জড়ো হতে লাগল। আমাদের দেখেই তারা জিভ বার করে ওদের রীতি অনুযায়ী শ্রদ্ধা জানাতে লাগল। কয়েকটা বস্তীবাড়ী পেরিয়ে আমরা ঢুকলাম সত্যিকারের শহরে। দু'পাশে মাটি পাথর ও সিমেন্টের সম্ভ্রান্ত বাড়ী ও দোকান। রাস্তার ধারেই চা ও তেলেভাজার দোকান, উল মুদিখানার দোকানগুলোও বেশ সম্ভ্রান্ত। একটা গলিতে মাংসের দোকানও আমাদের চোখ এড়াল না, এই বাড়ীগুলো আমাদের দেশের মতোই ঢালাই ছাদের। বারান্দা ও উঠোন রয়েছে মজলিশের জন্য। দোকানে যারা কেনা বেচা করছে তাদের অধিকাংশই মহিলা। বাজারটা অনেকটা দার্জিলিং-এর সবজি বাজারের মতো তবে তার তুলনায় অনেক ছোট আর নোংরা তো বটেই। অনেকগুলো ভেড়া ও ইয়াক রাস্তার ওপরেই খুঁটি দিয়ে বাঁধা, সম্ভবতঃ সেগুলোকে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। আমাদের কথা ইতিমধ্যেই শহরে ছড়াতে আরম্ভ করেছে। তীর্থযাত্রী দর্শন তিব্বতীদের কাছে এক পুণ্যের ব্যাপার। তবে তীর্থযাত্রীরা যদি ভিখিরি হয় তাহলে তাদের দিকে কেউ তাকায় না। লামা তীর্থযাত্রীদের সম্মান অনেক আর ভারতীয় তীর্থযাত্রী মানেই গুরু স্থানীয়। ওরা ভাবে ভারত থেকে যারা আসে তারা সবাই পুণ্যাত্মা ।

বাজারের ঠিক মাঝখান দিয়েই রাস্তাটা এগিয়ে চলেছে, বাজারের ঠিক শেষের দিকে একটা বড় চায়ের দোকান দেখে আমরা থামলাম। পুরী বা গয়ার মতো এখানে তীর্থস্থানে পাণ্ডার উপদ্রব নেই বলেই মনে হয়, অন্ততঃ এ পর্যন্ত তো তাই মনে হল। আমাদের কাছে কেউই কোনরকম উৎপাত করতে আসেনি। চায়ের দোকানের বাইরে দুটি মেয়ে কাঠের লম্বা চুঙ্গাতে মাখনের সাথে চা মেশাচ্ছে, বড় বড় দোকানের এই ধরনের চা মেশাবার জন্য আলাদা লোক রাখা হয়, তাদের কাজ শুধু চায়ের সাথে মাখন মেশানো। দোকানের ভেতরে আমরা সবাই ঢুকলাম। দোকানের ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট কাঠকয়লার উনোন তারই চারপাশে ভিড় করে ঠাসাঠাসি ও গোল হয়ে বসে আছে দশ-বারোজন লোক। আমাদের দেখে তারা সসম্ভ্রমে তাদের গোলটা বড় করে তাদের মধ্যে আমাদের ডেকে নিল, প্রত্যেকের হাতেই চায়ের গ্লাস ।

আমরা সকলে এক. গ্লাস করে চা খেয়ে দাম মিটিয়ে দিলাম। এই শহরটা ভারতবর্ষের ছোট-খাটো শহরের মতোই বলতে হবে, তবে রাস্তায় কোন গাড়ী ঘোড়া নেই এই যা তফাৎ। রাস্তায় এরই মধ্যে চোখে পড়েছে কয়েকজন ভারতীয়, তারা আমাদের নমস্কার করে পাশ কাটিয়ে গেছেন। রাস্তাটা পাথরে বাঁধানো, সিমেন্ট বা পীচের নয়। আমাদের সামনে হঠাৎ তিনজন হান্ সৈনিক এসে বাধা দিল, তাদের সাথে একজন স্থানীয় তিব্বতী চৌকিদারও আছে। আমাদের সম্ভাষণ জানিয়ে তারা জিজ্ঞাসা করলো—

—কোথা থেকে আসছেন ?

—নেপাল থেকে। আমরা জবাব দিলাম ।

—সিকিম হয়ে আসছেন কি? তাদের পাল্টা প্রশ্ন ।

—হ্যাঁ। আমরা গ্যাংটক, পেমাচৌকি, ফারি জোং ইত্যাদি হয়ে আসছি। গুরুজী তাদের বুঝিয়ে দিলেন ।

তিব্বতী চৌকিদারটি হান্ সৈন্যদের বুঝিয়ে দিল আমাদের কথা। তিব্বতী সৈন্য ও হান্ সৈন্যদের দেখলেই বোঝা যায়। হান্ সৈন্যরা আমাদের দেশের সৈনিকদের মতোই খাঁকি পোশাক পরে। তাদের পরনে ফুল প্যান্ট, সার্ট, জ্যাকেট, বেল্ট-বুট, মাথায় টুপী ও হাতে রাইফেল। আর তিব্বতীদের পরনে ওদের ঢোলা লুঙ্গির মতো বেশ, তার সাথে ঢোলা পা-জামার মতো জামা। ইচ্ছা করলে একটা হাতা অনায়াসেই খুলে ফেলা যায়। সর্বোপরি আছে ভারী সোয়েটার। তাদের পোশাকগুলো এত ভারী যে মনে হয় প্রয়োজনবোধে এরা দৌড়তেও পারবে না। হান্ সৈনিকদের পোশাকেই আছে চতুরতার ভাব। হাদের মুখগুলোও দেখলাম একটু হলদে ধরনের, আর তারা উচ্চতায় তিব্বতীদের তুলনায় ছোট ।

তারা আমাদের অনুসরণ করতে বলল। বলাই বাহুল্য, আবার আমরা পুলিশি জেরার সম্মুখীন হতে চলেছি। মনে হয় এটাই আমাদের শেষ ঝামেলা, গীয়া ৎসের এই চৌকিটা পার হতে পারলে তারপর আর কোন ভয় থাকবে না। আমরা শহরের ভেতর দিয়ে আর একটা রাস্তা ধরে শহরের বাইরে চলে এলাম, সেখানে নজরে পড়ল সারি-সারি সৈনিকদের তাঁবু, আর কাঠ ও টিনের অস্থায়ী ঘর ।

আমরা শেষে এসে হাজির হলাম ওখানকার সবচেয়ে বড় অফিসারের তাঁবুতে। বিরাট একটা মাঠের চারদিকে মিলিটারী প্যারেড হচ্ছে আর তারই মাঝখানে একটা তাঁবুর পাশে টেবিল-চেয়ার পেতে তৈরী হয়েছে অস্থায়ী কেন্দ্ৰ ৷

তাঁবুর কাছে আসতেই নজরে পড়ল একটি ছোট গোলগাল ধরনের লোক, হঠাৎ দেখলে মনে হয় একটা খুদে সৈনিক। তার কাছে আসতেই আমাদের সঙ্গের হান্ সৈনকিরা স্যালুট করে দাঁড়াল। বুঝলাম এই খুদে লোকটিই হচ্ছে এখানকার সর্বেসর্বা। কলকাতার প্যারেড গ্রাউণ্ডে এই ধরনের রিপোর্ট অনেক দেখেছি। অফিসার ভদ্রলোক আমাদের দিকে হাসিমুখে এগিয়ে এসে করমর্দন করলেন, তারপর সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন—

—আপনাদের মধ্যে লিডার কে? তিনি তিব্বতী ভাষায় কথাটা বললেন। বুঝলাম এই ভাষাটা তার ভালোই আয়ত্তে আছে।

গুরুজী কাগজপত্র বের করে বললেন—আমি এদের গাইড়। আমরা সবাই কাঠমাণ্ডুর স্বয়ম্ভূনাথ গুম্ফা থেকে আসছি। পথটাকে সংক্ষেপ করার জন্য আমরা সিকিম হয়ে আসছি। আমরা যাচ্ছি তীর্থ করতে, তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যাবো। গুরুজী অতি পরিষ্কাভাবে সংক্ষেপে আমাদের অভিপ্রায় জানালেন ৷

অফিসার ভদ্রলোক খুব ভালভাবে আমাদের অনুমতি পত্রটি পরীক্ষা করতে লাগলেন, তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন-

—কাগজে আছে পঞ্চাশজন, আর সীমান্ত পার হয়েছেন বত্রিশজন, বাকী লোক কোথায় ?

-কেন ?

—বাকিরা কেউ আসেনি।

–প্রবল ঠাণ্ডার জন্য তারা শেষে নারাজ হয়েছেন।

—হুম্ ! আপনারা এর আগে কোনোদিন এসেছেন ?

—একমাত্র আমিই এখানকার রাস্তাঘাট চিনি, আমি তীর্থযাত্রীদের নিয়ে আরও অনেকবার এসেছি, তা ছাড়া এরা সবাই এই প্ৰথম —হুম্ ! সঙ্গে কি আছে ?

—সামান্য খাবার আর দু'একটা বাড়তি কাপড়

গুরুজীর উত্তর শুনে ভদ্রলোক কার নাম ধরে ডাকলেন। সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকটি পুতুলের মতো তার সামনে এসে হাজির হল। তারপর তার প্রভুর হুকুম অনুযায়ী জিনিসপত্র ঘাঁটতে লাগলো। বলাই বাহুল্য, সন্দেহজনক কোন মালপত্র আমাদের কাছে না পেয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হল ।

আমার দিকে বার বার সন্দেহের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকালেও ফলতঃ ভদ্রলোক কোন জিজ্ঞাসাবাদ করলেন না। খুবই কম বয়স ভেবে ছেড়ে দিলেন। ছাড়া পেয়ে আমরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এত তাড়াতাড়ি আমরা নিষ্কৃতি পাব আশা করতে পারিনি । চীনা সৈনিকদের এলাকা ছেড়ে আমরা এবার এগিয়ে চললাম আরও দূরে বিরাট পাঁচিল ঘেরা অংশের দিকে। শহরের ঘন বসতি এলাকার মধ্য দিয়ে যাবার পথে শহরবাসীরা আমাদের শ্রদ্ধা জানাতে লাগলো। এখানকার বাসিন্দাদের দেখলেই মনে হয় যে এরা খুব সরল ও বিশ্বাসী। এই শহরটা তিব্বতের অন্যান্য শহরগুলোর চেয়ে পরিষ্কারও বটে ।

প্রায় একঘন্টা চলার পর আমরা নির্দিষ্ট স্থানে এসে হাজির হলাম। তারপর বিরাট তোরণের ভেতর দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম সেই পুণ্যভুমিতে।

প্রাচীর ঘেরা এলাকাটা হচ্ছে একটা বিরাট মন্দির, এখানে ছোট বড় অনেকগুলো মন্দির রয়েছে। আমরা ভেতরে ঢুকতেই সামনে দেখতে পেলাম একটা চৈত্য, সেখানে আমরা কাঁধের মালপত্র নামিয়ে থামলাম। আমাদের দেখেই কয়েকটি ছোট লামা দৌড়ে এল তারপর গুরুজীর সাথে কথাবার্তায় জানল যে আমরা তীর্থযাত্রী। সেই কথা শুনেই তারা অদৃশ্য হল। আমাদের কথা পনের মিনিটের মধ্যেই সবাই জেনে গেলো। দু'জন বয়স্ক লামা আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। নমস্কার করে তারা বিনীতভাবে জানতে চাইলেন আমরা কতদিন থাকবো কোথায় যাবো ইত্যাদি। পরিচয় পেয়ে তারা বললেন—আসুন আপনাদের সাথে মুখ্য লামার পরিচয় করিয়ে দিই। তিনিই এখানকার সর্বেসর্বা।

অনেকগুলো মন্দিরের এদিক ওদিক দিয়ে ঘুরে আমরা এলাম একটা বিরাট মন্দিরের কাছে, সেখানে লামা আমাদের বললেন— আপনারা মন্দির প্রদক্ষিণ করতে থাকুন

আমি দেখছি খাম্পো আছেন কি না। দ্বিতীয় লামা আমাদের সাথেই রইলেন। মন্দিরটি বিরাট, মন্দিরের চারপাশের দেয়াল প্রার্থনা চক্রে ভর্তি। আমরা শুরু করলাম গীয়াৎসের মন্দির পরিক্রমা, অর্থাৎ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে তারপর প্রার্থনা চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে মন্দির পরিক্রমা। আর সেই সাথে মণি-মন্ত্র জপ। দার্জিলিং-এর ঘুম মন্যাস্ট্রি থেকে আরম্ভ করে এ পর্যন্ত যত মন্যাস্ট্রি দেখেছি তার সবগুলোতেই এই ধরনের প্রার্থনা চক্র পেয়েছি, গুম্ফার সাথে প্রার্থনা চক্র ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। এই মন্দিরের সাথে তার তফাৎ হচ্ছে যে এখানকার প্রার্থনা চক্রগুলো আরও বড় আর কাগজের বদলে প্রার্থনা-মন্ত্র সরাসরি টিনের পাতের ওপর খোদাই করা ।

আমাদের তিনবার পরিক্রমা শেষ হলে আমরা বসলাম। প্রাচীর ঘেরা এই পবিত্র স্থানের চারদিকে আমরা অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম রঙচঙে মন্দিরগুলো। লামা হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে এলেন তার সঙ্গে আরও তিনচারজন লামা এসেছেন আমাদের দেখতে।

ভদ্রলোক আমাদের বললেন যে মহামান্য খাম্পো (মঠাধ্যক্ষ) তাঁর ঘরেই আছেন এবং আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। বড় মন্দিরের অনতিদূরেই পেলাম সাদা রঙের একটা বিরাট বাড়ী, তার বিরাট দেয়ালের ওপরে কাঠের সুন্দর কাজ করা ব্যালকনি, ব্যালকনিটা লাল-হলদে রঙের সুন্দর কাঠের খোদাই করা কাজে ভর্তি। বাড়ীটার দরজা জানালাগুলোর চারদিকেও লাল ও হলদে নক্সা করা। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে সামনেই একটা বিরাট হলঘর পেলাম। সেই ঘরটার এক কোণে চৌকির ওপরে কয়েকজন লামা বসেছিলেন, তাদেরই মধ্যে একজন হচ্ছেন এখানকার মঠাধ্যক্ষ, খাম্পো। তিনি উঠে এসে আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানালেন, আমাদের সকলকে তিনি হাসিমুখে স্বাগতম জানিয়ে বসতে বললেন। গুরুজী তাকে স্বয়ম্ভূ গুম্ফা ও গ্যাংটকের মহারাজের খবরাখবর জানালেন, সেই সাথে সাথে রাস্তার খবরাখবরও বটে। খাম্পো আমাদের আশ্বাস দিয়ে বললেন যে, এখানে কয়েকদিনের জন্য থাকা ও খাওয়ার বন্দোবস্ত তিনি করে দেবেন, তারজন্য কোন চিন্তা করতে হবে না ৷

তারপর তিনি একে-একে সকল লামাদের পরিচয় নিতে লাগলেন। গুরুজী আমার পরিচয় দিয়ে দিলেন—এ আমার শিষ্য। তীর্থের পথে সে মৌনব্রত অবলম্বন করছে। তীর্থের শেষে সেও পাকাপাকিভাবে লামা হয়ে যাবে। এখন ওকে কঠিন-ত্রাবা পথে দীক্ষা দিয়েছি ।

মহামান্য থাম্পো গুরুজীর কথা শুনলেন তারপর ভালভাবে আমার দিকে নজর দিয়ে বললেন—একে দেখতে ঠিক নেপালীদের মতো নয়, যাই হোক এর বাবা বা মা হয়তো ভারতীয়। অবশ্য উত্তর ভারতের লোকদের সঙ্গে নেপালীদের—একটা বিরাট তফাৎ কিছু নেই। তবে এর বয়স খুবই কম, নয়তো হানদের কড়া নজর এড়ানো মুশকিল হত, ওরা একদম ভারতীয়দের পছন্দ করে না ।

আপনার অনুমান সত্য, চৌকিতে বার বার আমাদের এজন্য জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, তবে শেষ পর্যন্ত বয়স কম এবং তীর্থযাত্রী সেইজন্য আটকায়নি---গুরুজী বললেন।

খাম্পো আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন – তুমি মানুষ হও, তথাগত তোমায় রক্ষা করুন। তিনি শেষে তার এক সহকর্মী লামার ওপর আমাদের দেখাশুনার ভার ছেড়ে দিয়ে বললেন—আজ সন্ধেবেলা মন্দিরে দেখা হবে।

আমাদের থাকবার বন্দোবস্ত হল সেখানকার অতিথিশালায়, আর খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্ত হল সেখানকার লামাদের সাথে। মূল মন্দির থেকে অতিথিশালা মোটেই দূরে নয়। বিরাট কাঠের বাড়ীর একটা হলঘরে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হল। গ্যাংটক ছাড়ার পর এটাই ছিল আমাদের প্রথম লক্ষ্যস্থল। বিনা বাধায় আর অতি সহজে এখানে থাকবার অনুমতি পেয়ে আমরা ধন্য হলাম, স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। আমরা খুব ক্লান্ত তাই গুরুজী সকলকে নির্দেশ দিলেন ভালভাবে বিশ্রাম করতে।

সেদিন বিকেলে লামা ও ত্রাবাদের জমায়েত করে খাম্পো সকলের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে আমিই ছিলাম সবচেয়ে ছোট কাজেই সকলের দৃষ্টি পড়ল আমার দিকে। সিকিম থেকে এ পর্যন্ত এসেও আমি ক্লান্ত হইনি, এতে সকলেই আশ্চর্য হয়ে গেছে। পরিচয় শেষে আমরা গেলাম তাদের সাথে খাবার ঘরে। সেখানে গুরুজীকে ঘিরে সকলে আমার সম্পর্কে হাজার প্রশ্ন করতে লাগল, আমি কোন্ সম্প্রদায়ভুক্ত, আমি কবে থেকে মঠে আছি, এই মহাতীর্থের জন্য আমাকে কি করে তিনি বাছাই করলেন, অধ্যাত্মমার্গের আমি এখন কোন স্তরে, আমার নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্য আছে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি ।

পরের দিন খুব ভোরবেলা আমার ঘুম ভাঙলো। দিনের আলোয় ভাল করে এই পবিত্র শহরটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবার জন্য আমার মন উদ্‌গ্রীব হয়ে রইল। আমি ধর্মশালার ছোট জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম, দিনের আলো তখনও প্রকাশ পায়নি কাজেই আমাকে ধৈর্য ধরে আরও কিছুক্ষণ থাকতে হবে।

সূর্যোদয় দেখা আমার এক অতি প্রিয় নেশা, তাই বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করে শেষে উঠতে বাধ্য হলাম। জানালা দিয়ে আর একবার বাইরের দিকে তাকালাম, বাইরের দৃশ্য আগের চেয়ে আরও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ব্যস, আর কথা নয়। তাড়াতাড়ি আমি কম্বলটা চাদরের মতো জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে, আমার পরনে লামাদের মতোই পোশাক কাজেই ভোরের এই অল্প আলোতে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো কিছু আমার মধ্যে নেই। নির্ভয়ে আমি একটা ছোট পথ ধরে এগিয়ে চললাম। ধর্মশালার রাস্তাটা ছাড়াতেই দুটো কুকুর আমার দিকে চীৎকার করতে করতে ছুটে এল, কিন্তু আমার কাছে এসে থেমে গেল। আমি তাদের কোনো রকমে এড়িয়ে একটু এগুতেই পড়লাম একজন লামার সামনে। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আমাকে ভালভাবে দেখে দু'হাত জোড় করে সম্মানসূচক নমস্কার জানালেন। তারপর আমাকে জিঞ্জাসা করলেন—কোথায় যাবে ?

কুম্। আমি হেসে জবাব দিলাম। কারণ এ ছাড়া অন্য কোন নাম আমার মনে পড়ছে না। ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে চললেন কুমের দিকে। ভেবেছিলাম একা একা স্বাধীনভাবে এখানে ঘুরে বেড়াবো, ভোরের নিঃস্তব্ধতায় দেখবো এই পবিত্র শহরের

শান্ত রূপ আর সূর্যোদয়ের রঙিন আকাশ কিন্তু মনে হয় সেটা সম্ভব নয়, কারণ লামা ভদ্রলোক কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়ছেন না। আমরা চৈত্য কুমের কাছে এসে দাঁড়ালাম। এই লামাটি সঙ্গে না থাকলে আমি কি করতাম জানি না, কিন্তু ওর সামনে আমি খাঁটি লামার ভূমিকা নিতে বাধ্য হলাম নয়তো কথা উঠতে পারে ৷ প্রবল শীত ও ঠান্ডায় শরীর জমে যাবার উপক্রম তারই ওপর আমি মাটিতে দণ্ডি কাটার মত শুয়ে পড়লাম—সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সেরে প্রার্থনা চক্রের দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর সেই চক্রগুলো ঘোরাতে ঘোরাতে মন্দির পরিক্রমা করতে লাগলাম।

সাতবার পরিক্রমা করে তারপর আমি ধরলাম প্রধান দরজার রাস্তা, লামা ভদ্রলোক আমার সাথে সাথেই ভক্তের মতো রইলেন। আমার মনে হয় উনি এখানকার প্রহরী, কারণ চোখ-মুখ দেখে মনে হয় রাতে ঘুম হয়নি। কিন্তু তারই মধ্যে মুখের হাসিটা বড় চমৎকার। পাঁচিলের কাছে এসে দেখি সেখানকার সিংহ দরজা বন্ধ তারই পাশে ছোট দরজাটা খোলা, আর দরজার বাইরে আট-দশটা কুকুর শুয়ে আছে। দরজা পার হলেই মনে হয় আমাকে ধরবে, কাজেই বাইরে না বেরিয়ে পাঁচিলের ধার ধরে ধরে এগিয়ে যেতে লাগলাম। পাঁচিল বিরাট উঁচু প্রায় তিন মানুষ সমান ভেতর থেকে যেমন হঠাৎ বাইরে বেরোনো সম্ভব নয় তেমনি বাইরে থেকেও সাধারণ মানুষের পক্ষে ভেতরে ঢোকা অসম্ভব। পাঁচিলটা খুব আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে গেছে। পাঁচিলটা এত চওড়া যে তার ওপর দিয়ে মনে হয় পাশাপাশি দু'জন লোক হেঁটে যেতে পারে। লামা ভদ্রলোক, আমি জানি না তিনি আমাকে নজরে নজরে রাখছেন কি না, আমার সঙ্গ কিন্তু কিছুতেই ছাড়ছেন না। একা একা আমি যাতে হারিয়ে না যাই, ছোট ছেলে ভেবে তাই হয়তো তিনি সাথে সাথে চলেছেন। মোটের উপর কারণটা যাই হোক না কেন তার সঙ্গটা আমার কাছে বাধোবাধো ঠেকতে লাগল ৷

আকাশ আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার হয়েছে। প্রাচীরের ওপাশ থেকে ঘন ঘন মুরগীর ডাক কানে আসছে। তবুও সূর্যদেবের দেখা নেই, এমনকি আকাশের রঙটাও সোনালি হয়নি, আমি নিরাশ হলাম। প্রাচীর ধরে আরও কিছুদূর উঠতেই হঠাৎ নজরে পড়ল সূর্যোদয়, আমি দাঁড়ালাম, টাইগার হিলের মত এখানে সূর্যের সেই মনোহর দৃশ্য দেখা যায় না বটে কিন্তু পৃথিবীর এই ছাদে দাঁড়িয়ে সূর্যদেবের আর্বিভাবের একটা আভিজাত্য আছে। সূর্যোদয়ের পরই শুরু হল তুষারে ঢাকা পর্বত শৃঙ্গের উপর তার রূপোলী আলোর খেলা। তাকে আহ্বান করার জন্য ঘুমিয়ে থাকা পর্বতশৃঙ্গগুলো যেন ধীরে ধীরে মাথা তুলে জেগে উঠতে লাগলো। স্বর্গের উর্বশীরা তাদের রূপালি চূড়ো নিয়ে যেন শান্ত ছন্দে নাচতে লাগল, পাহাড়ের এই চলন্ত রূপ এর আগে দেখিনি। সূর্য যতই উপরে উঠতে লাগলো তার আলোয় ছোট ছোট পর্বত চূড়াগুলো যেন আনন্দে মাথা নাড়াতে লাগল। এ দৃশ্যের জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না, গীয়াৎসের এই সূর্যোদয় আমার কাছে এক নতুন আবিষ্কার। আমি ইচ্ছে করে এখানে আসিনি, মনে হয় প্রকৃতিদেবী নিজেই আমার প্রতি কৃপা পরবশ হয়ে এখানে আমাকে নিয়ে এসেছেন তাঁর এই অপরূপ লীলা দেখাবার জন্য। আমি টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখেছি,

কন্যাকুমারী থেকে দেখেছি সূর্যাস্ত, কিন্তু এ দৃশ্য তার থেকেও অপরূপ, এ আর এক স্বপ্ন জগৎ। আমি হাত জোড় করে তাকে প্রণাম জানালাম। আমার অর্ঘ্য--

ওঁ সূর্যম্ সুন্দর লোকনাথম্ অমৃত বেদান্ত সারং শিবম্ ॥ জ্ঞানং ব্রহ্মময়ং সুরেশম্ অমলং লোকৈকচিত্তং স্বয়ম্ ইন্দ্রাদিত্য নরাধিপং সুরগুরুং ত্রৈলোক্য চূড়ামণিং ব্রহ্মাবিষ্ণু শিব স্বরূপহৃদয়ং বন্দে সদা ভাস্করম্ । ت ওঁ হিরণ্যময়েন পাত্রেন সত্যসাপিহিতং মুখম্ তত্বং পুষপাবৃণু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে ৷ .পুষগ্নেকর্ষে যম সূর্য প্রাজাপত্য ব্যূহ রশ্মীন্ সমূহ তেজো যত্তে রূপং কল্যাণতমং তত্তে পশ্যামি যোহসাবসৌ পুরুষঃ সোহম্ অস্মি ৷৷

তারপর কম্বলটা পাশে রেখে শুরু করলাম সূর্যপ্রণামের ব্যায়ামটা। লামা ভদ্রলোকটি শ্রদ্ধাভরে আমায় লক্ষ্য করতে লাগলেন। তারপর ধীরে ধীরে নেমে এলাম আমাদের ধর্মশালার দিকে। সেখানে এসে দেখি সবাই প্রায় প্রস্তুত হয়ে পড়েছে, বাইরে যাবার জন্য। আমি তাড়াতাড়ি কম্বল রেখে আমার উত্তরীয়টা নিয়ে নিলাম। আমাকে আর ব্যাখ্যা করতে হল না কোথায় গিয়েছিলাম বলে, সঙ্গের সেই লামা ভদ্রলোকই গুরুজীকে বুঝিয়ে দিলেন ।

গুরুজী বললেন--আজ সকালবেলা গীয়াৎসের মঠ ও বিহার সমিতি আমাদের সম্বর্ধনা জানাবে, সেখানে যেতে হবে। প্রাচীরের ভেতরকার অংশটা পবিত্র মঠ, লামারা সবাই এখানেই থাকেন, কোনো মহিলা-লামা এখানে নেই। শহর থেকে কিছু মেয়ে ভক্তরা আসবে আর গীয়াৎসের পৌর প্রতিষ্ঠানের সভাপতিও আসবেন আমাদের স্বাগত জানাতে ।

আমরা একটা বিরাট কাঠের বাংলোতে এসে তার বারান্দায় দাঁড়ালাম। বারান্দার ঠিক সামনেই মাঠ, সেখানে লোকজন এসে দাঁড়াতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের পাশে এসে যোগ দিল রঙচঙে বাদকের দল। তাদের পরনে লামার পোশাক মাথায় লম্বা মুকুটের মত টুপী, পায়ে লম্বা উলের জুতো আর তারই ওপর ঝালরে হাতের সূক্ষ্ম কাজ করা। শঙ্খের মতো তাদের লম্বা ভেরী বেজে উঠল, প্রায় পনেরো মিনিট ধরে তারা বিভিন্ন সুরে বাজাতে লাগল তাদের বাঁশী। মনে হল হিমালয়ের চূড়ায় চূড়ায় তার শব্দ আঘাত করে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই শব্দটা অনেকটা শঙ্খ ও সানাইয়ের মাঝামাঝি। সেই শব্দে যেন জেগে উঠল সম্পূর্ণ শহর। চারিদিক থেকে লামা ত্রাপার দল ছুটে এসে জড়ো হতে লাগল বাংলোর সামনের মাঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠটা ভর্তি হয়ে গেল। আমাদের বারান্দাটা বেশ উঁচুতে তাই তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমাদের দেখতে লাগলো। ছোট ন’দশ বছর থেকে আরম্ভ করে নব্বই বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের এক লামা-সমুদ্র আমাদের সামনে তৈরী হল। সকলেরই প্রায় এক পোশাক—আর মুণ্ডিত মস্তক, মনে হচ্ছে এ দেশটাই ব্রহ্মচারী আর সন্ন্যাসীতে ভর্তি। এরকম দৃশ্য আমি কোনোদিনই দেখিনি। আর লামাদের পেছনে শহরবাসীরা একে-একে এসে জমা হতে লাগল। বারান্দার এক কোণে বিরাট একটা সিংহাসনের মতো চেয়ার রাখা ছিল, সেখানে এসে বসলেন মহামান্য খাম্পো।

বাজনাটা অনেকটা নহবৎখানার মতো, বাজনা দিয়েই তীর্থযাত্রীদের স্বাগতম জানানো হল। বাজনা থামলে মহামান্য খাম্পো জনসাধারণের কাছে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। গীয়াৎসের পৌর-প্রধান তারপর উঠে আমাদের সকলের হাত ধরে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি বললেন যে, তিব্বতের সাথে নেপালের বন্ধুত্ব অনেকদিনের তাঁর ইচ্ছা যে নেপাল থেকে আরও বহুসংখ্যক তীর্থযাত্রী এলে ভালো হয় তাতে দুই দেশের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হবে। তিনি আমাদের তীর্থের সফলতা কামনা করলেন। তাঁর ছোট্ট হৃদ্যতাপূর্ণ ভাষণ শেষ হলে শুরু হল সমবেত প্রার্থনা। প্রার্থনার শেষে ত্রাপা ও লামারা একে-একে এসে আমাদের হাত ছুঁয়ে স্বাগতম জানাতে লাগলো। লামাদের অভিবাদন আমার কাছে এক চিরস্মরণীয় ঘটনা। তাদের প্রাণের প্রাচুর্য আর সদাহাস্য মুখ আমাকে অভিভূত করল। প্রায় একঘণ্টা ধরে চলল একের পর এক সেই অভিবাদন। এই মন্দির প্রাচীরের ভেতরের শহরটায় যে এত লোক আছে তা ভাবতেও বিস্ময় লাগে। তারপর শুরু হল শহরবাসীদের শ্রদ্ধা নিবেদন। তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই গড় হয়ে প্ৰণাম করতে লাগল । ছোট শিশু বালক-বালিকা যুবক-যুবতী বয়স্ক ব্যক্তিরা সকলেই আমাদের দর্শন চায়। তীর্থযাত্রীরাই মনে হয় শহরের মূল আলোচনার বিষয়। শহরবাসীদের মধ্যে অনেকে আমাদের ছোট কাপড় বা তাংখা দিয়েও তাদের শ্রদ্ধা জানালো। আমার এই বয়সে এতগুলো লোকের ভক্তিঅর্ঘ্য পাওয়া নিশ্চয়ই পূর্বজন্মের সুকৃতি আর গুরুজনদের স্নেহ ও আশীর্বাদের ফলস্বরূপ ।

শেষের দিকে আর একবার মন্দিরের বাদকরা তাদের ভেরী বাজিয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আমরা নিষ্কৃতি পেলাম। মহামান্য খাম্পোকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁর সাথে আর একবার প্রার্থনা শেষে আমাদের সভা ভঙ্গ হল। বেলা তখন প্রায় দশটা। খাম্পো'র সাথে আরও দশ এগারোজন উচ্চস্থানীয় লামা ছিলেন। তাঁদের সাথে আমরা বারান্দায় বসে তিব্বতী চাও বিস্কুটে সকালের খাওয়া শেষ করলাম। খাম্পো আমাদের আশ্বাস দিয়ে দিয়ে বললেন যে, তিনদিন আমরা অনায়াসে সেখানে থাকতে পারি ও আমরা খুশীমতো চলাফেরার অনুমতি পেলাম ৷

কুম্‌ হল একটি চৈত্য। এটি দূর থেকে মন্দিরের মতো দেখায়। এই স্তূপটিতে মহামান্য দোরজে চাং মুনীর অনন্ত দেহকে ধরে রাখা হয়েছে। দেখতে অনেকটা কাঠমাণ্ডুর স্বয়ম্ভূনাথ মন্দিরের মতো উপরে ঠিক ওরকমই দুটো বুদ্ধের চোখ আঁকা।

কুম্ কথাটার ঠিক তর্জমা করলে হয় ‘হাজার বিগ্রহের মন্দির'। হাজার বিগ্রহই

বটে, স্তূপটির মূল ভিত্তি লম্বায় একশ আট হাত, চওড়ায় একশ আট হাত। আর চারতলা বা চারটি ধাপে এটাকে দাঁড় করানো হয়েছে। উপরের দিকটা সম্পূর্ণ গাঢ় সোনালী রঙে ঢাকা, আর নীচের দিকে রয়েছে অন্যান্য রঙ। তার মধ্যে সাদাই বেশী। স্তূপটির চারদিকে প্রার্থনা চক্র তো আছেই, আর তার চেয়েও বেশী আছে মূর্তি। দেয়ালের উপর পাথরের খোদাই কাজে ভর্তি যেমন দেখেছি কোণারকের সূর্য মন্দিরে এত মূর্তি সত্ত্বেও স্তূপের গঠনে এতটুকু খুঁত নেই ।

মণ্ডপের উপর দাঁড়িয়ে আছে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম্‌-এর সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি, ধ্যানীবুদ্ধের অনন্ত দেহ। শূন্য, মহাশূন্য, সূক্ষ্ম, মহাসূক্ষ্ম এখানে তার রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুম্ তিব্বতী ভাস্কর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভক্ত ও ভক্তি এখানে এক হয়ে ধরা দিয়েছে, জগৎ ধীরে ধীরে উঠে গেছে সূক্ষ্ম জগতের দিকে । চারতলা এই স্তূপটির মধ্যে রয়েছে চুয়াত্তরটি মন্দির। জগতের বিভিন্ন মতবাদকে খণ্ডন করে ভগবান তথাগত এক মনোমন্দির গঠন করেছেন, স্থূল জগতের ‘যত মত তত পথ' সূক্ষ্ম জগতের এক পথে গিয়ে পৌঁছেছে। ত্রিতাপ দুঃখের কারণ ও নিবারণের উপায়গুলোকে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে দেব-দেবী ও বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে। কুমের প্রত্যেকটি ছোট ছোট মূর্তিকে নিয়ে গবেষণা করতে গেলে প্রয়োজন একটা পুরো মানব-জীবনের। আমার মতো খুদে মানুষের পক্ষে এ কাজ অসম্ভব। তিব্বতী স্থাপত্যের এমন সুন্দর দৃষ্টান্ত জগতে বিরল ।

গীয়াৎসের এই মন্দিররাজ্যে সবাই পবিত্র। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত চোখে পড়ে ছোট্ট ছোট্ট ব্রহ্মচারীদের (ত্রাপা) চলাফেরা। এ রাজ্যের এরাই রাজা, তিব্বতে যেহেতু কোনো সাধারণ পাঠশালা বা বিদ্যালয় নেই, কাজেই অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে তাদের শিশুদের পাঠায় মঠে। সেখানে তারা মুণ্ডিত মস্তকে গেরুয়া বসন পরে ধর্মপথে শিক্ষা গ্রহণ করে। এই ছোট দাবা-ত্রাপারাই বড় হয়ে লামা হয়। এদের মধ্য থেকেই বাছাই করা হয় উপযুক্ত দেশের কর্ণধারদের। এরাই ভবিষ্যতে ছড়িয়ে পড়ে সমাজ, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্যে, ধর্ম ও রাজনীতির দিকে। মেয়েদের জন্য এত ভালো বন্দোবস্ত নেই, সব মঠে স্ত্রী-শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে সামান্য কিছু লেখাপড়া শেখে, তাতেই তাদের কাজ চলে। সেই সামান্য জানাকে কেন্দ্র করেই মেয়েরা দোকান চালাচ্ছে, মালপত্র কিনছে, জমি চাষ করছে। বাজারে গেলে মনে হয় মেয়েরাই এদের রাজত্ব চালাচ্ছে আর পুরুষেরা সন্ন্যাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

দ্বিতীয় দিন শহরের এই পবিত্র অংশে আর একটা জিনিস বেশ চমৎকার লাগলো । এখানকার লামাদের মধ্যে দেখলাম দু-তিন রঙের চাদর ও কানঢাকা টুপী, প্ৰথম প্ৰথম ভেবেছিলাম এটা নেহাৎই রঙের আধিক্য অথবা অভাবে এই রঙের সৃষ্টি হয়েছে। খয়েরি রঙটা প্রায় সর্বত্রই দেখেছি, এখানে ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখলাম যে তার মধ্যে হলুদ, লাল ও গেরুয়া রঙ রয়েছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে, এটা আসলে সাম্প্রদায়িক ব্যাপার। এখানে তিন সম্প্রদায়ের এক মিলন ঘটেছে। এক নম্বর হচ্ছে গেলুক্-পা সম্প্রদায়, দালাই লামা যার সর্বেসর্বা। দ্বিতীয়টি শাক্য সম্প্রদায়, পাঞ্চেন লামা তার প্রধান। তৃতীয়টি হচ্ছে সা-লু সম্প্রদায়, তাদের প্রধান নির্ভর করে তাদের প্রার্থীর উপর, অর্থাৎ বাঁধাধরা কোন গুরু নেই, তবে আদর্শ আছে।

এখানে এই তিন সম্প্রদায়ের তিনটি পৃথক সংস্থা, তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা প্রধান। মহামান্য খাম্পো এই তিন সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে থেকে এখানকার শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন। খাম্পো লাসার দ্বারা নিয়োজিত প্রতিনিধি। পৌর প্রধানের থেকেও তার খ্যাতি ও শাসন ক্ষমতা বেশী। তবে রাস্তার লোকেদের মতে চীনাদের আসার পর থেকে পৌর প্রধানের ক্ষমতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গীয়াৎসের ধর্মীয় ক্ষমতার প্রধান হচ্ছেন খাম্পো আর বাণিজ্যিক ক্ষমতার প্রধান হচ্ছেন পৌর-প্রধান।

আমরা থাকি অতিথিশালায় আর খাওয়া দাওয়া করি এক এক সময় এক এক সম্প্রদায়ের সাথে। লামাদের থাকার ঘরগুলো শহরের উপরের অংশে। এখান থেকে গীয়াৎসের দুর্গটাকেও চমৎকার দেখা যায়, গীয়াৎসের এই দুর্গটা অনেক উঁচুতে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে অতি সুন্দর ভাবে তৈরী করা হয়েছে। আমার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সেদিকে যাওয়ার উপায় নেই, তীর্থযাত্রীর পক্ষে এই ধরনের উৎকণ্ঠা না দেখানোই ভালো। আমরা বত্রিশজন এখানে খুব ছাড়াছাড়ি হয়ে আছি, যার যখন খুশী বেরুচ্ছি ঢুকছি——সবাই স্বাধীন। গুরুজী আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন, আমরা এখানে ঠিক ঘরের ছেলের মতোই আছি। তবে আমাকে একটু সাবধানে থাকতে হচ্ছে কারণ আমি এই আটশ' সন্ন্যাসীর মধ্যে একমাত্র মৌনী বাবা। সকলের দৃষ্টি আমার উপর। মৌনী পথ সকল পথের শ্রেষ্ঠ আর কঠিন, সেই পথই আমি অবলম্বন করেছি। একটু অসাবধানতা, একটু বন্ধুত্ব, একটু সহজ হলেই আমার মুখ খুলে যেতে পারে, তাতে আমার শুধু অসম্মান নয় তীর্থের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চোখ দিয়ে যা দেখা যায় দেখছি, কান দিয়ে যা শোনা যায় শুনছি, মুখ দিয়ে একমাত্র মন্ত্র ছাড়া কিছু বেরোয় না। কাউকে এড়াতে হলে জপমালাটা দ্রুত জপ করতে করতে এগিয়ে যাই । হোক ভণ্ডামী। তবু আমি মৌনী তো, তাতেই আমার খুব আদর। মন মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে, গর্বে বুকের রক্তটা ঝলকে ওঠে নিজেকে সান্ত্বনা দিই সাবধান! কঠিন বলেই না এতদূর আসতে পেরেছি। মৌনী বলেই তো আমার নিজের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, নিজেকে ভালোভাবে জানার আর শুদ্ধ করার এমন চমৎকার উপায় বুঝি আর দ্বিতীয়টি নেই। এটাই আমার এই ছোট্ট জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া, এখন এ পাওয়াটাকেই ইচ্ছে করছে ধরে রাখতে ।

পাঁচিলের ভেতরের পবিত্র শহরটা সব সময়ই গম্ভীর। পরিবেশটা পবিত্র বটে, কিন্তু হালকা নয়। গীয়াৎসের বাজারটা বড় চমৎকার। সেখানে গেলে মনে হয় এ এক অন্য রাজত্ব। এখানে, সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত হৈ চৈ, হাসি-ঠাট্টা আর তামাসায় ভরপুর । এখানকার লোকদের দেখে গ্যাংটক বাজারের শেরপাদের কথা মনে পড়ে। আমার বন্ধু আচু যদি আজ আমার মত মৌনী বাবা সাজতো তাহলে নিশ্চয়ই বেচারা হাঁপিয়ে উঠতো এখানকার বাজারে সব কিছু পাওয়া যায়। পুরোনো বাজারটা একটা অদ্ভূত, এখানে পুরোনো টুথপেস্ট, পুরোনো মোজা থেকে আরম্ভ করে হাতীর দাঁত ও চীনের ব্রোঞ্চের ড্রাগন সব কিছুই পাওয়া যায়। ওদিকে সিঙ্গারা রুটি, নানা ধরনের তেলেভাজা ও ভারতীয় চায়ের দোকান রয়েছে। বলতে গেলে সব কিছুই এখানে পাওয়া যায়, তবে টাটকা নয়, শাক সব্জিরও ওই একই অবস্থা ।

সকল অধ্যায়
১.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
২.
যাত্রা
৩.
একটি তিব্বতী পরিবার
৪.
ইয়াটুং শহর ও দুংকার গুম্ফা
৫.
ফারি
৬.
কিয়াংফু গুম্ফা ও লামা শেরিং জো
৭.
তীর্থযাত্রীর প্রথম অঞ্জলি
৮.
আর্য তারার ধ্যান
৯.
গীয়াৎসের থেকে সাম্‌দিং গুফা
১০.
দোরজে পামো
১১.
ভাষা
১২.
প্রথম সাংপো দর্শন
১৩.
পুণ্যতীর্থের দুয়ারে
১৪.
লামা ও শিক্ষা ব্যবস্থা
১৫.
লাসা ও মূল মন্দির জোখা
১৬.
লাসা
১৭.
রাজ-প্রাসাদ পোতালা
১৮.
লামা লামদুপ
১৯.
নরবুলিংকা—দালাই লামার গ্রীষ্মাবাস
২০.
দালাই লামা
২১.
লাসায় শেষের কয়েকদিন
২২.
কৈলাস যাত্রার প্রস্তুতি
২৩.
কৈলাসের পথ-সন্ধানে
২৪.
সাংপার ওঝা
২৫.
ভয়ংকর রাত
২৬.
অচেনা আপনজন
২৭.
সীগাৎসে
২৮.
পাঞ্চেন লামা
২৯.
ত্রাদুম্
৩০.
দুর্গম পথ
৩১.
মহাতীর্থের দরজায়
৩২.
মহাতীর্থ
৩৩.
মানসতীর্থে প্রথম রাত্রি
৩৪.
কৈলাসবাবা
৩৫.
মিলারেপা
৩৬.
মিলেনিয়ামে লাসা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%