সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমার কিছু কিছু বন্ধু মাঝেমধ্যেই অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান হয়েছে। এ বন্ধুরা পাশাপাশি এটাও স্বীকার করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটো উৎসবের একটি হল—নববর্ষ। অন্যটি—একুশে ফেব্রুয়ারি। দুটোই ধর্মনিরপেক্ষ। পশ্চিমবঙ্গের বড় উৎসব একটাই। সেটা—দুর্গাপুজো। পুরোটাই ধর্মীয়।
বাংলা সন-তারিখ আমাদের এখানে এখন আর কেউ মনে রাখে না। মফস্সলে, গ্রামেগঞ্জে বাংলা তারিখ-টারিখের চল রয়েছে এখনও। শহরের শিক্ষিতরা পঁচিশে বৈশাখ বাংলা তারিখটা মনে রাখেন রবীন্দ্রনাথের কারণে। পয়লা বৈশাখও যে বাঙালিরা একদম ভুলে গেছেন এমন নয়। ওইদিন যাঁদের ছুটি, তাঁরা মনে রাখেন।
বাংলাদেশের জেলায় জেলায়, মহকুমা শহরে মফসসলে, গ্রামে পয়লা বৈশাখে মঞ্চ বেঁধে নাচ-গানের মাধ্যমে ধূমধাম করে বর্ষবরণ হয়। সমস্ত সাধারণ মানুষ এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে যান। একুশে ফেব্রুয়ারিতেও তাই। আমাদের এখানে অনেকেই এখনও একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য জানেন না।
আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই, সামনে তাকালে চট করে বাংলা অক্ষরে দেখাই মেলে না। হাজরার দিকে যেতে 'সত্যনারায়ণ মিষ্ঠান্ন ভাণ্ডার' আর ভিআইপি রোড ধরে বিমানবন্দরের দিকে যেতে রাস্তার বাঁ-দিকে 'ঋত্তিক' কত বড় পয়সাওয়ালা লোকের বাড়ি, কিন্তু বাংলা বানানের কী দূরবস্থা! নন্দন চত্বরেই চার-পাঁচটা জায়গায় বাংলা বানান ভুল রয়েছে। স্বয়ং শঙ্খ ঘোষ আঙুল দিয়ে ওই ভুলগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছেন। বলেছেন বেশ কয়েকবার। সরকার নড়ে না, চড়ে না।
পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ মানে তো বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেওয়া। ক্লাব, যারা ফুটবল খেলার আয়োজন করে, ক্যারাম খ্যালে, সাঁতার প্রতিযোগিতা করে, ক্রিকেটের আসর বসায় তাঁদেরই বাংলার এই সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দিতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক দল যদি এই কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারত, তাহলে রাজনৈতিক হানাহানিটাও অনেক কমে যেত। স্বদেশি, আমলে সাংস্কৃতিক উৎসবের ঘটা ছিল, তার প্রভাবও ছিল ব্যাপক। স্বাধীনতার পর ইংরেজরা দেশ ছেড়ে চলে গেল, আমরা বেশি বেশি করে ইংরেজির ভক্ত হয়ে গেলাম। কথায় কথায় ইংরেজি বলি, আর ভুল-ভাল বাংলাও।
মহারাষ্ট্রে, ওড়িশায় সে যে স্কুলেই পড়ো সেখানকার ভাষা পড়তেই হবে। একমাত্র আমাদের পশ্চিম বাংলায় সেসবের বালাই নেই। সরকারকে বারবার বলেছি, বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিতে হবে, স্কুলমাত্রেই বাংলাকে আবশ্যিক করতে হবে, মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী সবাই নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছেন, তারপর অবাস্তব হাস্যকর সমস্ত কারণে এই সিদ্ধান্ত কাজে লাগানো হয়নি।
ছোটবেলায় আমরা সাইনবোর্ড দেখে বাংলা শিখেছি। ইংরেজিও। আমার প্রস্তাব, অন্তত এক তৃতীয়াংশ সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে বাধ্য করা হোক। ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি থাকবে না—একবারও বলছি না। কিন্তু জোর দিতে চাইছি, সাইনবোর্ডে বাংলা লেখা থাকাটা বাধ্যতামূলক করা হোক। সাইনবোর্ড অর্থাৎ দোকান পরিচিতিতে ভুল বাংলা লিখলে, চলচ্চিত্রের পরিচয়লিপি, দূরদর্শন সহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ভুল বাংলা লেখা এবং বলার অপরাধের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা হোক।
উত্তর কলকাতায় থাকতাম। ইচ্ছে থাকুক না থাকুক বাবা-মায়ের সঙ্গে হালখাতার দিন বিভিন্ন দোকানে দোকানে যেতে হত। মিষ্টি, শরবত খেতাম। সে সময় নববর্ষের দিনে প্রভাতফেরি হত। সাদা হাফ প্যান্ট, সাদা হাফ শার্ট পরে সেই প্রভাতফেরিতে আমিও যোগ দিয়েছি। ব্যান্ড বাজতো। বিউগিলও। আমিও বাজিয়েছি। এখন সেসব কোথায়? এখন তো সবেতেই ইংরেজি-কে তা। ১লা জানুয়ারিতেই সবাই নববর্ষ নিয়ে মাতোয়ারা।
প্রথম শ্রেণি থেকে ইংরেজি শেখানো হোক, তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন। আমরাও তো সেভাবেই পড়ে এসেছি। কোনও অসুবিধেই হয়নি। তবে এখন যারা শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন, তাঁরা অধিকাংশই শুদ্ধভাবে ইংরেজি উচ্চারণ করতে পারেন না। ঠিক হয়েছে, ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ওঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলার সঙ্গে সমান যত্ন নিয়ে ইংরেজি শিখলে দোষের তো কিছু নেই। ইংরেজির প্রাথমিক জ্ঞানটা থাকলে যেখানেই যাক মাইলপোস্ট পড়তে অন্তত অসুবিধে হবে না। বাংলা, ইংরেজি—সবই শিখতে হবে শেখার মতো করে। কষ্ট হলেও বলা উচিত, বিদেশে যে বাঙালিরা থাকেন, সেই বাঙালিদের পুরোনো প্রজন্ম বাংলা ভাষায় কথা বলা, বই পড়া, গান শোনা, লেখার জন্য যেরকম আকুলি-বিকুলি করেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে তার কিছুমাত্র আগ্রহ নেই।
আগে পয়লা বৈশাখে বইপাড়ায় লেখকদের ডেকে শুধু মিষ্টিমুখই করানো হত না সঙ্গে বই প্রকাশের উৎসবও হত। কত বই বেরোত তখন। এখন বইটই সব বেরোয় বইমেলায়। প্রকাশকরা নববর্ষে লেখকদের আমন্ত্রণ করেন, একটু মিষ্টিমুখ, অনেকদিন বাদে একজনের সঙ্গে, অন্যজনের দেখা এসবই হয়টয়।
জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, Indian literature is one, but written in many languages, কথাটা শুনতে ভালো। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে কোনও মিল নেই। একজন শিক্ষিত ভারতীয় ইউরোপ-আমেরিকার সাহিত্য সম্পর্কে যত খবর রাখেন, সেই তুলনায় অন্য ভারতীয় ভাষাগুলির সাহিত্য সম্পর্কে তাঁকে অজ্ঞই বলা যায়। তবু, ভারতের এমন কয়েকটি ভাষা আছে যেগুলি সারা বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলির সমপর্যায়ের। চিনে ভাষা অবশ্যই এক নম্বর ভাষা।
ইউরোপের দেশগুলি ছোট, ছোট, সেখানকার কয়েকটি ভাষা খুবই সমৃদ্ধ। কিন্তু এক-একটি দেশের জনসাধারণের মাতৃভাষা শুধু সংখ্যার বিচারে এশিয়ার ভাষাগুলির সমকক্ষ হতে পারে না। এর মধ্যে ইংরেজ ও স্প্যানিশরা বিভিন্ন মহাদেশে কলোনি স্থাপন করে নিজেদের ভাষা ছড়িয়ে দিয়েছে। যেমন আমেরিকা এবং ক্যানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় ইংরেজি ভাষার প্রাধান্যের জোরেই এখন ইংরেজি পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান ভাষা। স্প্যানিশ ভাষাও প্রাধান্য পেয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার অনেকগুলি রাজ্যে, তার স্থান তৃতীয়। কিন্তু ভারতীয়রা কলোনি বিস্তার করতে পারেনি বা চায়নি, তা সত্ত্বেও তাদের দুটি ভাষা, হিন্দি ও বাংলা জনসংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীতে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। একেবারে সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে স্প্যানিশ ভাষাকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে হিন্দি ও বাংলা চলে এসেছে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলাম, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের অবদান অনেকখানি। মধ্যযুগে বঙ্গভূমি বা বাংলা নামে কোনও বড় রাজ্য ছিল না। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল ছিল অনেকগুলি ছোট ছোট রাজত্বে বিভক্ত। সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই ছোট ছোট রাজ্যগুলিকে জয় করে এক সীমানার মধ্যে নিয়ে আসেন। তখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার নিজস্ব কোনও রূপরেখা গড়ে ওঠেনি। যুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা অর্থাৎ Lingua franca হিসেবে বাংলা ভাষা গড়ে ওঠে। কিন্তু তখন এই ভাষার নাম কী ছিল? বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার নাম যে বাংলা, তা জেনেছে অনেক পরে। তখন সাধারণ মানুষ দুটি ভাষার কথা জানত, শাস্ত্রের ভাষা বা পণ্ডিতদের ভাষার নাম সংস্কৃত আর জনসাধারণের ভাষার নাম দেশি ভাষা, অথবা শুধু ভাষা। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ফারসি ভাষাভাষী মুসলমানরাই প্রথমে এই দেশীয় ভাষার নাম দেয় বাঙ্গলহ বা Bangalla। মা হুয়ান নামে এক চিন দেশীয় মুসলমান পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে সমুদ্র অভিযানে বেরিয়ে বাংলা অঞ্চলেও এসেছিলেন, তিনি লিখেছিলেন যে এই দেশের লোক প্রধান যে ভাষাটি ব্যবহার করে তার নাম বঙ্গ-কো-লি। অর্থাৎ বঙ্গালি বা বাঙ্গালি। অর্থাৎ মা হুয়ানের রচনাতেই প্রথম বাংলা ভাষার নামটি পাওয়া যায়। সুলতানি আমলে হিন্দুদের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরাও এই বাংলা ভাষাতেই সাহিত্য রচনা শুরু করেন।
সৌভাগ্যবশত সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে কিংবা রাজনৈতিক কারণে মুসলমানদের জন্য আলাদা ধরনের কোনও বাংলা ভাষা গড়ে উঠতে পারেনি। বঙ্কিম-মীর মুশারফ-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সৃষ্টিতে যে অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক বাংলা ভাষা বর্তমানে রূপ পেয়েছে, তাতে, হিন্দু মুসলমানের সমান উত্তরাধিকার। স্বাধীনতার পর দেশভাগ হওয়ার সময় বাংলা ভাষাও ভাগ হবার একটা সম্ভাবনা ছিল। সেই সময় প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ভাষাবিদ ডঃ শহিদুল্লা একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেন। পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা ভাষার রূপ কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলায় বিভিন্ন জেলার কথ্য ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। যশোর জেলার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষার এতই তফাত যে প্রায় এক ভাষা বলে বোঝাই যায় না। শুধু উচ্চারণ নয়, শব্দ ব্যবহার এবং ক্রিয়া পদেও অনেক অমিল। কোনও কোনও জেলায় অতীত ক্রিয়াপদ দিয়ে ভবিষ্যৎ বোঝানো হয়। সুতরাং কোনও বিশেষ একটি জেলার ধরে নিলে প্রচুর গোলমালের সম্ভাবনা ছিল। সেই সময় ডঃ শহিদুল্লা বলেছিলেন, পশ্চিম বাংলার কৃষ্ণনগর অঞ্চলের ভাষায় সমগ্র বাঙালির ও বাংলা সাহিত্যের স্ট্যান্ডার্ড ভাষা হিসেবে আগেই গৃহীত হয়ে আছে, সুতরাং তার থেকে সরে গেলে পূর্ব বাংলার ভাষা, বাংলা ভাষার মূল স্রোত থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে, রেডিয়োতে এবং টিভিতে যে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয় তা মূল স্রোতের বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের, এবং পৃথিবীর বহু দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের ভাষা একই রয়ে গেছে। ভাষাই যেহেতু সংস্কৃতির প্রধান বাহন, তাই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভেদ যতই মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক মাঝে মাঝে ভাষার সূত্রে সমস্ত বাঙালিদের আত্মীয়তা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভাষার শক্তিতে বিশ্বের পঁচিশ কোটি বাঙালি যতদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতে পারবে, ততদিনই বাংলাভাষা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবে গণ্য হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন