সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এপার-ওপার মিলিয়ে বাঙালির সংখ্যা এখন কত? সঠিক সংখ্যাটা জানি না, তবে অন্তত ১৬ কোটি তো হবেই। এই ভূখণ্ডে আর যা কিছুরই অভাব থাকুক, মানুষের অভাব নেই! কল্পনা করা যাক, এই ১৬ কোটি মানুষ দু-বেলা যথেষ্ট খেতে পায়, সকলেরই নিজস্ব বাড়ি-ঘর আছে, সকলেরই আছে উপযুক্ত পোশাক, সকলেই পায় শিক্ষার সুযোগ, যান-বাহনেরও মোটামুটি সমস্যা নেই, এবং এই মানুষেরা ধর্মের নামে যখন-তখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করে না। এটা এমন কিছু কষ্ট কল্পনা নয়, পৃথিবীর সভ্য দেশগুলিতে এই সবই জীবনযাত্রার সাধারণ মান। এইগুলি যদি সত্য হত, তা হলে ১৬ কোটি মানুষের এই বিশাল জাতি হতে পারত কত শক্তিশালী। স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চদের তুলনায় বাঙালিরা গণ্য হত অনেক বড় জনগোষ্ঠী হিসাবে, পৃথিবীতে বাঙালিরা একটি বিশেষ স্থান আদায় করে নিতে পারত।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী ভাষা-ভিত্তিক জনসংখ্যার হিসাবে বাঙালিদের স্থান সারা বিশ্বে এখন পঞ্চম। ফরাসি-জার্মান-ইতালিয়ানদের অনেক উপরে। কিন্তু ওই সব ভাষার খ্যাতি ও সমৃদ্ধির তুলনায় বাংলার স্থান নগণ্য। সমস্ত পৃথিবীর শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমান সমাজ বাংলা ভাষাকে পাত্তাই দেয় না। অনেকে বাংলা ভাষার অস্তিত্বই জানে না। হাঙ্গেরিতে গিয়ে দেখেছি, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিফলকে লেখা আছে, তিনি একজন 'হিন্দু' কবি, এবং 'হিন্দু' বলেই তারা ধরে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথের রচনার ভাষা হিন্দি।
বাংলায় কথা বললেই কি বাঙালি হয়? এপার-ওপার মিলিয়ে এই যে ১৬ কোটি মানুষ, তিন-চতুর্থাংশই লেখা-পড়ার ধার ধারে না। হালে একটি সাক্ষরতা অভিযান চলছে বটে, অক্ষর জ্ঞান সম্পন্নদের সংখ্যা সম্ভবত কিছু বেড়েছে, কিন্তু তাদেরও ঠিক লেখা-পড়া জানা বলা যায় না। যারা এখনও দু-বেলা খেতে পায় না, তাদের মধ্যে লেখা-পড়ার চল হওয়া কি সম্ভব? অনেকে বাংলায় কথা বলে বটে, কিন্তু তারা নিজেরাই জানে না তারা বাঙালি কি না! তারা মানুষ কি না, এই ব্যাপারেও তাদের সন্দেহ আছে। সমাজের উঁচু শ্রেণির লোক যে তাদের সঙ্গে মানুষের মতন ব্যবহার করে না আজও। ডোম-চাঁড়াল-ধোপা-নাপিত-মেথরদের কি আমরা নিজেরাই বাঙালি বলে গণ্য করি? যে-মেথর প্রতিদিন আমাদের বাড়ির মধ্যে ঢোকে, কিংবা যে ধোপা আমাদের জামা-কাপড় নিতে আসে, তাদের নামটাও তো আমরা অনেকে জানি না বা জানার প্রয়োজনও মনে করি না।
যারা অর্ধাহারী, যারা শিক্ষার সুযোগ পায় না, যারা অর্থনগ্ন, তাদের আসলে কোনও জাত নেই। ১৬ কোটি বাঙালি মিলে আমরা বিশাল একটি জাত, এ গর্ব মিথ্যা, মনকে চোখ ঠারা।
দুই বাংলা মিলিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় কতজন ছাত্র-ছাত্রী? বড়জোড় ১০ লাখ। শতকরা একজনেরও কম। আধুনিক পৃথিবীতে এ জাতি গর্ব করতে গেলে হাস্যাস্পদ হবে।
ভারত ভেঙেছে, পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালিদের একটি নিজস্ব দেশ স্থান পেয়েছে, যদিও বড় বড় শক্তিশালী দেশগুলির চোখে সে দেশ করুণার পাত্র। যে দেশ স্বনির্ভর হয়ে নিজস্ব শক্তি অর্জন করতে পারে না, সে দেশকে হীনম্মন্যতায় ভুগতেই হয়। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত জাপান কয়েক বছরের মধ্যেই নিজস্ব তেজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা দুনিয়া। ভারত যুদ্ধ-বিধ্বস্ত হয়নি, কিন্তু দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও জাত-পাতের লড়াইয়ে অনবরতই বিধ্বস্ত হয়ে চলেছে। ভারতীয় দর্শন, প্রাচীন কাব্য-সাহিত্য, সংস্কৃতি বা অহিংসার বাণীকে কেউ আর এখন তেমন মূল্য দেয় না। যে দেশে গৌতম বুদ্ধ থেকে মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত অহিংসার দর্শন প্রচার করেছেন কতবার, সে দেশে সর্বক্ষণ লকলক করছে হিংসা। ভারত যা পারেনি, চিন তা পেরেছে অনেকটা। সেখানে ধর্মীয় দাঙ্গা হয় না, ভাষা ও খাদ্য ব্যবহার নিয়ে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। আঞ্চলিক বৈষম্য ও বাক-স্বাধীনতার অভাব আছে, তা জোর করে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। বেজিং-এর তিয়েনয়ানমেন স্কোয়ারে কয়েক বছর আগে গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে বিদ্রোহী ছাত্র-ছাত্রীদের উপর ট্যাঙ্ক ও গুলি চালিয়ে তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছিল। মানবতার বিরুদ্ধে এটা একটি জঘন্য অপরাধ নিশ্চয়ই। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে মেয়ে ফেলা হয়। সারা বছরের হত্যাকাণ্ড যোগ দিলে খুব কম হবে না।
বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বটে, কিন্তু সে-দেশে শান্তি আসেনি। যেসব আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, তার বিপরীত শক্তিগুলি মাথা চাড়া দিয়েছে এখন। মুক্তিযোদ্ধারা কোণঠাসা। ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে দেওয়া হয়েছে সংবিধান থেকে, আরবি মদতে মৌলবাদীরা শক্তিবৃদ্ধি করছে অনেকখানি, প্রাক্তন রাজাকাররাও দখল করছে ক্ষমতার বিভিন্ন শিখর। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রাঙ্গণে গুলিগোলা চলে অনবরত।
খণ্ডিত বাংলার পশ্চিম খণ্ডে দেশ বিভাগের ঘা দগদগ করছে এখনও। উদ্বাস্তু সমস্যার পুরো সমাধান আজও হয়নি, রেল লাইনের পাশে, রাজসড়কের দুধারে ঝুপড়িতে মনুষ্যেতর জীবনযাপন করে লক্ষ লক্ষ মানুষ। দণ্ডকারণ্য কিংবা আন্দামানে নির্বাসিত উদ্বাস্তুরা এখনও বাঙালি কি না তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে পশ্চিমবঙ্গে কয়েক দশক ধরে। যতদিন কংগ্রেস সরকার ছিল, ততদিন ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় একদল সমাজবিরোধী দাপিয়ে বেড়িয়েছে, যেখানে যতটুকু শাঁস ছিল তা চুষে খেয়েছে। কংগ্রেসিয়া বিপক্ষ দলগুলিকে গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে চায়নি, নেতাদের জেলে ভরেছে যখন-তখন। পশ্চিমবঙ্গীয় কংগ্রেসিদের অবস্থা এক এক সময় মনে হয়েছে হাস্যকর। দিল্লির কাছে তাদের কান বাঁধা। এদিকে বিধান রায়-অতুল্য ঘোষের মতন ব্যত্তিত্বের প্রস্থানের পরে দিল্লির কর্তারা পশ্চিম বাংলাকে নীচু নজরে দেখতে শুরু করেছিল, এককালের আত্মম্ভরী বাঙালিদের ঢিট করতে চেয়েছিল দিল্লি। খণ্ডিত পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক জোরও ছিল না। দিল্লির কাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেনেও পশ্চিম বাংলার কংগ্রেসিরা মুখ খুলতে পারেনি। আর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কথা তুমুলভাবে প্রচার করে, সেটাকে কাজে লাগিয়েই ক্ষমতায় এসেছে মিলিত বামপন্থী দলগুলি।
বামপন্থী রাইটার্স বিল্ডিং দখল করার পরেই স্কুল-কলেজ, অফিস-কাছারি, পুরসভা মিউনিসিপ্যালিটিতে রাতারাতি নিজেদের লোকজন বসাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একদা যে-বামপন্থী নেতারা ছিলেন পুলিশের নিন্দায় মুখর, এখন তাঁরাই দু-বেলা পুলিশের গুণগান করেন। সেই একই পুলিশ, একইরকম পুলিশি চরিত্র, সামান্য কারণে গুলি চালিয়ে পুলিশ মানুষ মারে, মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের হয়ে সাফাই গান।
পশ্চিম বাংলার যেসব মানুষ কখনও রাজনীতির ধার ধারত না, তারাও রাজনীতি নিয়ে মত্ত হয়ে উঠল। শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, বৈজ্ঞানিক, লেখক, শিল্পী, নাট্যকর্মী—এঁদের অনেক সময় ব্যয় হয় রাজনীতির চর্চায়। শুধু কথার ফুলঝুরি আর তর্কে টেবিল ফাটানো, আর যাকে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে উড়িয়ে দেওয়া। রাজনৈতিক খুঁটি ধরে থাকতে পারলে কাজ করতে হয় না। শিক্ষক-অধ্যাপকদের আর পড়াবার দরকার নেই, পার্টির নামে জয়ধ্বনি দিলেই চলে। আদর্শ-টাদর্শ গোল্লায় গেল, বামপন্থী হওয়াটা স্রেফ স্বার্থের ধান্দা। সত্যিকারের আদর্শবাদী বামপন্থী নেতারাও কেউ বললেন না যে বিশেষ ধরনের কর্মে যাঁরা নিযুক্ত, তাঁদের সর্বক্ষণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। ফলে, শিক্ষা বিজ্ঞানচর্চা, শিল্প-সাহিত্য-নাটকে অধঃপতন দেখা দিল। নিম্ন মানের সৃষ্টিকে রাজনৈতিক কারণে বাহবা দেওয়া হতে লাগল। কলকাতার ডাক্তারদের একসময় কত সুনাম ছিল, হাসপাতালগুলির এমন হাল হল যে, বাংলার মানুষ সুচিকিৎসার জন্য ছোটে মাদ্রাজ, বোম্বাই; তাতে কারুর হুঁশ নেই।
বিপ্লব শব্দটা হল বাচ্চাদের একটা চুষি কাঠির মতন। কেউ তাতে বিশ্বাস করে না। বিপ্লবের পরে কী হবে সে-সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই, তবু মিথ্যে মিথ্যে বিপ্লবের স্লোগান দিয়ে ছেলে ভোলাবার পালা চলল। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ খুব খারাপ জিনিস নিশ্চয়ই, কিন্তু একচক্ষু হরিণের মতন শুধু সেদিকে তাকিয়ে থেকে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির ভিতরে ভিতরে যে কত ক্ষয় চলছে সেদিকে কেউ লক্ষ করল না। কিংবা জানলেও গোপন করে গেল। সমাজতন্ত্রের পরীক্ষা যে ব্যর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যে উৎপাদন কমে যায়, প্রতিযোগিতা ছাড়া মানুষ অলস হয়ে পড়ে, এইসব কঠোর বাস্তব সত্যগুলিকে উপেক্ষা করে অর্থনীতি চলল ধ্বংসের পথে।
বামপন্থীরা কেউ বাঙালি বা ভারতীয় নয়। মার্কসবাদ তো বিশ্বমানবিক আদর্শ। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক টয়েনবি যে বলেছিলেন, কমিউনিজমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে ন্যাশনালিজম, তাতে তাঁরা কর্ণপাত করেননি। মার্কসবাদী হয়েও চিন ও রাশিয়া নিজেদের সীমানা সম্পর্কে স্পর্শকাতর, সমাজতন্ত্রী হয়েও যে হাঙ্গেরি ও রুমানিয়ার মধ্যে তিক্ত ঝগড়া লেগেই ছিল, তাও তাঁরা দেখেও দেখতে চাননি। এবং দেশের উগ্র বামপন্থীরা বাঙালির যা কিছু গর্বের বস্তু, তাকে ভাঙতে বসলেন। রামমোহন সামন্ততন্ত্রের প্রতিভু, বিদ্যাসাগর সিপাহিবিদ্রোহ সমর্থন করেননি সুতরাং প্রতিক্রিয়াশীল, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি, সুভাষ বোস ফ্যাসিস্ত! বিবেকানন্দ উল্লেখেরও অযোগ্য। তাঁদের সভা-সমিতিতে মার্কস-লেনিন-স্তালিনের বড় বড় ছবি ঝুলছে, বাঙালি তথা ভারতীয় কেউ স্থান পাননি। এমনকি মুজাফ্ফর আহমেদের ছবিও না। মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের সম্পত্তি, সুতরাং বামপন্থীদের কাছে অচ্ছুত।
উগ্রতর বামপন্থীরা চিনের চেয়ারম্যানকে আমাদের চেয়ারম্যান বলে ঘোষণা করল এবং বিদ্যাসাগরের মূর্তি থেকে মুণ্ডু লুটিয়ে দিল ধুলোয়। স্কুল-কলেজে লেখাপড়া শিখলে শুধু মূর্খ তৈরি হয়, এই স্লোগান আকৃষ্ট করল স্কুল-পালানো ছেলেদের, নানা স্কুলে আগুন লাগতে লাগল, মাস্টারমশাইরা ছুরি খেতে লাগলেন, একজন ভাইস চ্যান্সেলার পর্যন্ত নিহত হলেন ছাত্রদের হাতে। এইসব বিপ্লবীরা কিন্তু শুধু বেছে বেছে বাংলা স্কুল পোড়াতে লাগলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলিতে হাতও দিলেন না। তারপর থেকেই পশ্চিম বাংলার নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলি দৌড় শুরু করল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলির দিকে। সেইসব বাড়ি থেকে বিদায় নিতে লাগল বাংলা বই, বাংলা গান। সেই আমলে কিছু সম্পন্ন চাষি, ছোট ছোট ব্যবসায়ী খুন হতে লাগল এলোপাহাড়ি ভাবে, কিন্তু একজনও অবাঙালি ব্যবসায়ীর গায়ে হাত পড়ল না, পাছে ওইসব বিপ্লবীদের নামে কেউ প্রাদেশিকতার বদনাম দিয়ে ফেলে। কুৎসিত হিন্দি সিনেমা এসে বাংলা ছায়াছবির বাজার ও জনরুচি ধ্বংস করে দিল, তবু শাসকদল কোনও প্রতিবাদের মধ্যে গেলেন না, কারণ তাঁরা তো বাঙালি নন, বিশ্বমানব।
আর পশ্চিম বাংলার হেরে যাওয়া কংগ্রেসিরা এই সময় শুধু ইন্দিরা গান্ধির অন্ধ স্তাবকতা করে গেল। ইন্দিরা গান্ধির ভুরুর সামান্য ইঙ্গিতে কংগ্রেসি নেতারা দিল্লিতে ছুটে যান, কলকাতায় ফিরে এসে নিজেদের মধ্যে মারামারি খেয়োখেয়ি শুরু করে দেন। পশ্চিমবাংলার অর্থনীতি ও শিল্প সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁদের যেন কোনও দায়িত্বই নেই। শ্রমিক আন্দোলনের ধাক্কায় বন্ধ হয়ে গেল অসংখ্য ছোটখাটো কারখানা, বড় বড় কোম্পানিগুলি সরে যেতে লাগল অন্য রাজ্যে, দমদম বিমান বন্দরে বিদেশি বিমান নামা বন্ধ হতে লাগল একটার পর একটা, কলকাতা বন্দরে কমে গেল জাহাজ আসা। পশ্চিমবাংলায় তখন রাজনৈতিক গলাবাজি চলছে শুধু।
ওদিকে, বাংলাদেশে, পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকেই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল এক বাঙালি জাতীয়তাবাদের। মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই বোঝা গেল, শুধু ধর্মের আশ্রয়ে বাঁচা যায় না, মুসলমানরাও মুসলমানদের শোষণ ও অত্যাচার করতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের শুধু যে শোষণ করে তা-ই নয়, তাদের নীচু চোখে দেখে, অবজ্ঞা করে। তখন থেকে শুরু হল বাঙালি মুসলমানদের স্বদেশ যাত্রা।
মুসলমানরা বাঙালি হতে পারে কি না এই নিয়ে অনেক হিন্দুর মনে বরাবরই একটি সন্দেহ ছিল। 'আমি তো ভেবেছিলাম ও মুসলমান, ও বাঙালি নাকি?' এই ধরনের কথা অনেক হিন্দুর মুখে শুনে অনেক মুসলমানের অপমানে গা জ্বলে যেত। এরজন্য মুসলমানরাও যে একেবারে দায়ী নয়, তা বলা যায় না। অনেক সাধারণ মুসলমান বাংলায় কথা বললেও মনে করত তাদের পিতৃভূমি আরব দেশ। বাংলার অনেক সামাজিক রীতিনীতিকেই তারা মনে করত হিন্দুয়ানি। পুরোনো পুলিশ রিপোর্টে দেখা যায়, যশোরে গ্রামের মুসলমানরা নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলত, এখানে মোট পাঁচ ঘর বাঙালি, বাকি সবাই মুসলমান।
কিন্তু মুসলমানরা যখন বাঙালি হতে শুরু করল, তখন তারা প্রবল ভাবে এগিয়ে যেতে লাগল। জিয়া চেয়েছিলেন গোটা পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, রুখে দাঁড়াল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। বাংলা ভাষার দাবিতে পুলিশের গুলি খেয়ে প্রাণ দিল চারজন, ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলা সাহিত্যের সিংহভাগ জুড়ে ছিল হিন্দু লেখকরা, কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিল চারজন মুসলমান যুবক। সেই রক্তদান বৃথা যায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে যে সব বাঙালি বেশি বেশি মুসলমান, যারা বাঙালিত্বকে হিন্দুত্বের সমতুল্য মনে করত, তারা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের অভিপ্রায়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ওখানকার লিখিত বাংলায় প্রচুর পরিমাণে উর্দু শব্দ মেশাবার চেষ্টা করল, তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ লেখক উর্দু শব্দ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে একেবারে বিশুদ্ধ বাংলা লিখতে লাগলেন, উর্দুর বদলে খাঁটি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতেও তাঁরা দ্বিধা করেননি। ডক্টর শহীদুল্লাহ পূর্ব পাকিস্তানের কোনও বিশেষ জেলার ভাষার বদলে বাংলা সাহিত্যের আগে থেকেই স্বীকৃত ভাষা হিসাবে কৃষ্ণনগরের ভাষাকেই পূর্ব পাকিস্তানের লিখিত এবং বেতার সম্প্রচারের ভাষা হিসাবে গ্রহণ করার সুপারিশ করছেন। সুতরাং পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রবাহিত হতে লাগল একই বাংলা ভাষা। পূর্ব পাকিস্তানে অনেক শক্তিশালী লেখকের দেখা পাওয়া গেল। পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ হলে তার প্রতিবাদ হিসাবে দারুণ ভাবে শুরু হল রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা। অনুরূপ ভাবে শুরু হল থিয়েটার আন্দোলন। সাহিত্য সংস্কৃতির মাধ্যমে সেখানে গড়ে উঠল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যার পরিণতিতে বাংলাদেশের জন্ম।
সেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়নি বটে, ধর্মীয় মাতামাতির জন্য মুক্ত চিন্তা কখনও কখনও ব্যাহত হয়েছে, দেশটাকে পাকিস্তান ও আরব দেশগুলির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি শক্তি সক্রিয়, তা হলেও সেখানকার গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ বাঙালি হিসাব গর্বিত, বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির জন্য সংস্কৃতিকর্মীরা নিষ্ঠাবান। বাংলাদেশের মানুষ বাঙালি থাকবেন না বাংলাদেশি হবেন, এই নিয়ে একটি টানাপোড়েন চলছে, কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি সেখানে উজ্জ্বল ভাবে বিকশিত হচ্ছে দিন দিন।
ভারত সরকার হিন্দির প্রসারে বদ্ধপরিকর বলে বাংলা সমেত অন্যান্য রাজ্যের ভাষাগুলি দিল্লি থেকে কোনও সাহায্য পায় না। কিন্তু কোনও কোনও রাজ্য, যেমন তামিলনাড়ু বা গুজরাত নিজেদের ভাষা সর্বস্তরে কাজে লাগায়। পশ্চিম বাংলায় আজও বাংলা ভাষা সরকারি ভাবে ব্যবহৃত হয় না। বিচিত্র এক শিক্ষানীতির ফলে বাংলা স্কুলগুলিতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি পড়ানোই হয় না, আর ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা অসংখ্য ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে বাংলা প্রায় কিছুই শেখানো হয় না, তারা শুধু ইংরেজি শেখে। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক ছেলেমেয়ে বাংলা শিখছে না, আর যারা বাংলা স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার পর পড়া ছেড়ে দিচ্ছে, তারা পোস্ট অফিসে গিয়ে একটা মানি অর্ডার ফর্মও ভরতি করতে পারবে না। বাংলা শিখেও তারা অশিক্ষিত থেকে যাবে।
যাঁরা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করেন, যাঁরা আন্তর্জাতিক মানসকিতার অধিকারী বলে মনে করেন নিজেদের, তারা ভুলে যান যে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ভাবে অবহিত না হলে কোনও মানুষেরই মানসিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না। যার পা দুটি গাঁথা থাকবে নিজের দেশের মাটিতে চোখ থাকবে নিজস্ব পারিপার্শ্বিকে আর চিন্তায় থাকবে সারা পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস, সেই প্রকৃত আন্তর্জাতিক মানুষ। অ্যারিস্টটল থেকে মাও জে ডং পর্যন্ত অনেকেই এমন কথা বলে গেছেন। বাঙালির ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে প্রগতিশীল হওয়া যায় না।
সরকারি ভাবে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠকপোষকতা করা হয়নি পশ্চিম বাংলায় রাজনৈতিক দলগুলির মাথা ঘামাবার সময়ই নেই, সেইজন্যই সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদাসীনতার ভাব এসে গিয়েছে। পৃথিবীর নানাদেশে এখন ছড়িয়ে আছে পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা, তারা অতি দ্রুত বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ করে, ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখায়ই না। চিনারা পৃথিবীর যেখানেই যাক, তারা চিনেই থেকে যায়। যে-ইংরেজ মালয়েশিয়াতে রবার চাষ করে, তার ছেলেমেয়েরা ইংরেজই থেকে যায়। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরাও পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, বাঙালিই থাকে, বাংলা সাহিত্য-সংগীতের চর্চা করে। পশ্চিম বাংলায় ছেলেমেয়েদের চেয়ে তারা অনেক বেশি দুঃসাহসী। এখানকার বেকাররা দু-পা দূরে যেতে চায় না। ওখানকার বেকাররা দারুণ ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়। জাপানে পশ্চিমবাংলার বাঙালির সংখ্যা ২০০, বাংলাদেশের বাঙালির সংখ্যা ১০ হাজার।
কলকাতা শহরের গুরুত্ব যত কমে যাচ্ছে, ঢাকা শহরের গুরুত্ব ততই দিন দিন বাড়ছে। কলকাতা একটি নোংরা নগরী হিসাবে আজ সারা পৃথিবীতে কুখ্যাত, ঢাকা সেই তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন। কলকাতার সাহিত্য সংস্কৃতির সব দিকেই একটা ঝিমোন ভাব, আর ঢাকায় রয়েছে নব যৌবনের উদ্দীপনা।
তবে উদ্দীপনা থাকলেই যে সবসময় উচ্চ মানের সৃষ্টি হবে তার যেমন মানে নেই, সেইরকম পুরোনো বনেদ থাকলে মাঝে মাঝে এক-একটি ব্যক্তিগত সাফল্য দারুণ বিস্ময়ের সৃষ্টি করতে পারে। বাংলা চলচ্চিত্রের মুমূর্ষু দশা হলেও এখানে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের মতন প্রতিভাধরদের বিকাশ সম্ভব।
রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া বাংলা গানের সাধারণ মান বেশ নীচে নেমে গেলেও সলিল চৌধুরীর মতন একজনকে পাওয়া যায়। আলি আকবর, রবিশংকর, শম্ভু মিত্ররা এখন কলকাতার গর্ব। ভারতের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যিকরা এখনও পশ্চিমবাংলার লেখকদের ঈর্ষা করেন কি অকারণে?
আমার কল্পনা করতে ভালো লাগে, ১৬ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ অদূর ভবিষ্যতেই খাদ্য সমস্যার সমাধান করে ফেলবে, বসন ও বাসস্থান পাবে উচিত মতো, ঘুচে যাবে দারিদ্র্য। তারা গর্ব বোধ করবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির জন্য। বাংলাদেশ থাক পৃথক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, পশ্চিমবাংলা থাক ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে, কিন্তু মিলিতভাবে বাঙালিরা সারা পৃথিবীর চোখে একটি শক্তিশালী জাতিগোষ্ঠী হিসাবে গণ্য হবে। নতুন শতাব্দীর শুরু থেকেই শুরু হোক না সেই প্রক্রিয়া, আমি আশাবাদী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন