ইতিহাসের পরিহাস

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে বিশ্ব বইমেলায় যোগ দিতে গিয়ে একবার আমি একটি বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হয়েছিলাম। সেই বাড়ির মালিক পরিবারটি জার্মান নয়, কিছুক্ষণ আলাপ পরিচয়ের পর বুঝেছিলাম, তারা ম্যাসিডোনিয়ান এবং নিজেদের মধ্যে নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। ম্যাসিডোনিয়া নামটি ইতিহাসের পৃষ্ঠার বাইরে বিশেষ চোখে পড়ে না। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরেই ম্যাসিডোনিয়ার গৌরব অস্তমিত হয়। একদা ভুবন বিখ্যাত সেই রাজ্যটি টুকরো টুকরো হয়ে গ্রিস, যুগোশ্লোভিয়া ও অন্য দু-একটি রাজ্যের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। একবার যুগোশ্লোভিয়ায় গিয়ে আমি সেখানে ম্যাসিডোনিয়ান ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন দেখেছি। ফ্রাঙ্কফুর্টে আমার আশ্রয়দাতা পরিবারটি সব টুকরোগুলো মিলিয়ে স্বাধীন ম্যাসিডোনিয়া রাজ্য স্থাপনের এক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের আদর্শ পুরুষ আলেকজান্ডার। সেই পরিবারের একজন ব্যক্তি কোনও চাকরি-বাকরি করেন না, জার্মানিতে যত ম্যাসিডোনিয়ান অধিবাসী রয়েছে, তাদের সংঘবদ্ধ করার কাজে তিনি স্বেচ্ছায় নিযুক্ত। এঁদের সঙ্গে কথা বলে আমি খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম। জন্মভূমি কিংবা পূর্বপুরুষদের জন্মভূমির ভাবমূর্তির প্রতি টান এত তীব্র হতে পারে? প্রায় দু-হাজার তিনশো বছর আগে মৃত এক দুঃসাহসী, হঠকারী, দিগ্বিজয়ী যুবাকে আদর্শ করে এঁরা আবার এই বিংশ শতাব্দীতে সেই ম্যাসিডোনিয়া রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখছেন, যা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। এই পরিবারটির কথা শুনে মনে হয়েছিল, জার্মানিতে বসেও এঁরা ম্যাসিডোনিয়ান অঞ্চল থেকে বিচ্ছেদের বেদনা প্রতিদিন অনুভব করেন।

আমি নিজে দেশ-ভাগের শিকার। নিজের জন্মস্থান এবং পূর্বপুরুষদের ভূমি থেকে উৎখাত হবার আঘাত আমি আজও ভুলিনি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, এই কষ্ট আমার বাবা-মা এবং আমার পরেই শেষ হয়ে যাবে। আমার ছেলে তার পিতৃপুরুষের জন্মস্থানের কথা চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে না। সে যেখানে জন্মেছে এবং বাল্যকাল থেকে যে পরিবেশে বর্ধিত হয়েছে, সেটাই তার স্বদেশ।

আমার বাবা দেশ-ভাগের দগদগে ক্ষত বুকে নিয়েই মারা গেছেন। ১৯৪৭-এ ভারত দ্বিখণ্ড হবার পর আমরা পূর্ব বাংলায় আমাদের বসতবাড়ি ও সংলগ্ন জমি ত্যাগ করে পশ্চিম দিকে চলে আসি। তারপর আমার বাবা আরও ১৪ বছর বেঁচে ছিলেন কিন্তু কখনও ওদিকে আর ফিরে যাবার চেষ্টা করেননি। মৃত্যুর ঠিক দুদিন আগে গভীর আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে তিনি কলকাতা এবং কাছাকাছি মানুষজনের কথা একেবারে ভুলে গেলেন। পূর্ববঙ্গে তাঁর জন্মস্থান এবং সেখানকার মানুষদের কথাই বলতে লাগলেন শুধু। শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে তিনি বলেছিলেন, 'আমি বাড়ি যাচ্ছি'।

আমার প্রথম যৌবনে আমি প্রায়ই পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পদ্মানদীর পারে গিয়ে বসে থাকতাম। বিশাল চওড়া নদীর ওপারেই পূর্ব বাংলা। যেখানে আমাদের ছোট বাড়ি। তার পেছনের বাগান, আমার প্রিয় একটি আমগাছ এবং একটি পুকুর, যেখানে আমি সাঁতার শিখেছি এবং ছিপ দিয়ে অনেক মাছ ধরেছি, সেইসব ছবি স্পষ্ট আমার চোখে ভাসত। কিন্তু সেখানে ফিরে যাবার কোনও উপায় ছিল না।

বার্লিনে উন্টার ডেন লিনডেন নামে অতি সুরম্য রাজপথটি দেখলেই আমার মনে পড়ত আমাদের দেশের যশোর রোডের কথা। যশোর রোড অত সুন্দর না হলেও দুপাশে বিরাট বিরাট প্রাচীন গাছের জন্য ভারী মনোরম। উন্টার ডেন লিনডেন রাস্তাটার মাঝখানে উঠেছিল কঠিন প্রাচীর। আর আমাদের যশোর রোডের মাঝখানে খানিকটা নো ম্যানস ল্যান্ড ও দু-দেশের কাস্টমস। দুটো দেশ আলাদা হয়ে গেলেও দু-দিকেই রাস্তাটির নাম আজও একই। কিন্তু দুই জার্মানির সঙ্গে দুই বাংলার একটি বড় তফাত আছে। জার্মানি বিভক্ত হয়েছিল অন্য কয়েকটি যুদ্ধ বিজয়ী রাষ্ট্রের নির্দেশে, আর বাংলা তথা ভারত বিভাগের ব্যাপারে কলোনিয়াল ব্রিটিশদের প্ররোচনা থাকলেও অভিভক্ত ভারতের নেতারা এটা মেনে নিয়েছিলেন। জার্মানি বিভাগের মূলে ছিল অর্থনীতি, ধনতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আর ভারত বিভাগের মূলে ছিল ধর্ম। ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া যেমন অসম্ভব, ভারতীয় নেতাদেরও তেমনি ধর্মীয় বিভেদের ভিত্তিতে দুটি আলাদা রাষ্ট্রগঠনের ব্যাপারে পরিষ্কার, সুনির্দিষ্ট চিন্তা ছিল না। পাকিস্তানের প্রবল প্রবক্তারা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য একটা পিতৃভূমি, একটা নতুন রাষ্ট্র দাবি করলেন কিন্তু সেই রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী অ-মুসলমান নাগরিকদের ভাগ্য কী ভাবে নির্দ্ধারিত হবে, সে সম্পর্কে কোনও নীতি ঠিক করা হল না। আর মূল ভারতভূখণ্ডের রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিনিধি জওহরলাল নেহরু ধর্মবিভেদের বাস্তবতাকেই পুরোপুরি অস্বীকার করলেন, স্বাধীন ভারতকে তিনি ঘোষণা করলেন ধর্মনিরপেক্ষ, সব ধর্মের মানুষেরই সেখানে সমান অধিকার। আদর্শ হিসেবে নেহরুর নীতি অনেক বেশি আধুনিক এবং মহৎ। এবং সেই মহৎ আদর্শের দাম দিতে কয়েক কোটি মানুষ তাদের বাড়ি-ঘর-সম্পত্তি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কয়েক লক্ষ মানুষ দাঙ্গায় কিংবা অনাহারে কিংবা রোগ-ভোগে প্রাণ দিয়েছে। আমার বাবা পশ্চিম বাংলার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, আমরা সপরিবারে সেখানেই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলাম, পূর্ব বাংলায় আমাদের নিজস্ব বাড়ি ঘর, বাগান, পুকুর অন্য একটি রাষ্ট্রের মধ্যে পড়ে গেছে। সেখানে ফিরে যেতে হলে আমাদের একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে। আমরা আর ফিরে যাইনি।

ভৌগিলিক দিক দিয়ে পাকিস্তান একটি অদ্ভুত রাষ্ট্র। যার পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই দিকের মধ্যখানের ব্যবধান এক হাজার মাইলেরও বেশি। দু-দিকের মধ্যে রেল বা সড়ক পথে কোনও যোগাযোগ নেই। মানুষের ইতিহাসে এরকম কোনও রাষ্ট্র আগে দেখা যায়নি। পাকিস্তানের এই দু-দিকে চরিত্রও আলাদা। পশ্চিম পাকিস্তানিরা রাজনৈতিক এবং সাময়িকভাবে বেশি শক্তিশালী, আরব দেশগুলির কাছাকাছি অবস্থান বলে তারা ধর্মবিশ্বাসেও অতি কট্টর। আরবের মুসলমান দেশগুলিতে অ-মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রায় দেওয়াই হয় না বলতে গেলে, সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানেও হিন্দু বিতাড়নের জন্য শুরু হয়ে গেল দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও খুনোখুনি। সীমান্তের এপারে ভারতেরও দেখা গেল তার প্রতিক্রিয়া। পশ্চিম থেকে এক টেনে ভরতি হিন্দুদের মৃতদেহ এলে এদিক থেকেও পাঠানো হতে লাগল এক টেন ভরতি মুসলমানের লাশ। সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল দু-দিকের উদ্বাস্তুদের স্রোত। দু-দিকেই বহু নৃশংসতা ও বহু সাংঘাতিক অমানবিক ঘটনার পরেও কিন্তু অচিরকালের মধ্যেই দু-দিকে সম্পূর্ণ নাগরিক বিনিময় ঘটে গেল। দ্বিধাবিভক্ত পাঞ্জাবের পাকিস্তান অংশে রইল না কোনও হিন্দু, ভারতীয় পাঞ্জাব অংশে রইল না কোনও মুসলমান প্রায়, অর্থাৎ যৎসামান্য।

পূর্ব বাংলায় ঠিক এরকম ঘটনা ঘটেনি। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা নরম প্রকৃতির, শিল্প-মনস্ক, এবং হিংস্রতায় অনভ্যস্ত। মাত্র কয়েক পুরুষ আগে এখানকার মুসলমানরা ধর্মান্তরিত হয়েছে বলে আরব দেশগুলির সঙ্গে তাদের যোগসূত্র নামমাত্র। দুই বাংলার হিন্দু-মুসলমান বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি এবং গৌরবময় বাংলা ভাষার সমান অংশীদার। সুতরাং পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলমান মিলে মিশে থাকা অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু পূর্ব বাংলার শাসক শ্রেণি পশ্চিম পাকিস্তানি, তারা বাংলার সংস্কৃতিকে মনে করে হিন্দুঘেঁষা এবং বাংলা ভাষার মধ্যেও খুঁজে পায় হিন্দুত্ব, সেইজন্য এই দুটিকেই অবজ্ঞা করে। দুই পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ব বাংলার জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই শাসকশ্রেণির স্বার্থে এখানে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ ঘটনা এবং যথাসম্ভব হিন্দু বিতাড়ন প্রয়োজন ছিল।

পূর্ব পাকিস্তানে খুব বড় আকারের দীর্ঘস্থায়ী দাঙ্গা কিংবা ব্যাপক গণহত্যা হয়নি। কিন্তু এক শ্রেণির মুসলমান হঠাৎ বুঝতে পারল যে প্রতিবেশী হিন্দুদের ওপর চাপ দিলে কিংবা ভয় দেখালেই তারা ভারতে পালিয়ে যায়। তাদের বাড়ি ও জমি খালি পড়ে থাকে। ক্রমে সেগুলো দখল করে নেওয়া যায়। পুলিশ কিংবা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে না। প্রতিবেশীর বাগান কিংবা জমির প্রতি মানুষের লোভ প্রায় সর্বজনীন। এই লোভের বশেই সাধারণ, নিরীহ মুসলমানরাও তাদের সাধারণ নিরীহ প্রতিবেশীদের তাড়াতে তৎপর হয়ে উঠল। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের মধ্যে একটা ভয় ঢুকে যায় প্রথম থেকেই, মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে তারা পূর্ণ নাগরিক অধিকার আশা করেনি। দলে দলে হিন্দু যখন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে আসতে লাগল, অনেক ক্ষেত্রেই কিন্তু তাদের শরীর বা সম্পত্তি ওপর প্রত্যক্ষ কোনও আঘাত আসেনি, কিন্তু যে-কোনওদিন আঘাত আসতে পারে, এই আশঙ্কাটাই তাদের ঘর ছাড়া করছে। দেশ বিভাগের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান অংশ থেকে যে উদ্বাস্তুদের স্রোত শুরু হয়েছে আজও তা থামেনি।

ভারত থেকে বহু মুসলমান পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বিভিন্ন কারণে। পাকিস্তানে সেই উদ্বাস্তু সমস্যা আজও মেটেনি। তাদের ট্যাজেডি কম নয়। ইসলামে সম ভ্রাতৃত্বের কথা থাকলেও হিন্দুদের মতনই তাদেরও জাতি ভেদ আছে।

পশুজগতের সঙ্গে মানুষের তফাত শুরু হয়েছে সেই থেকে, যেদিন মানুষ শস্য সংগ্রহ করতে শিখেছে। পশুকে প্রতিদিন খাদ্য খুঁজে নিতে হয়, মানুষকে তা হয় না বলে যাযাবর জীবন ছেড়ে গ্রাম, নগর এবং সভ্যতার পত্তন করেছে। কিন্তু যাযাবর প্রবৃত্তি মানুষের মন থেকে কখনও যায়নি। ঘর-বাড়ি বানিয়ে মানুষ নিরাপত্তা খুঁজেছে বটে, কিন্তু তার মধ্যেও কান পেতে শুনেছে সুদূরের আহ্বান। চেনা গণ্ডির বাইরে মানুষ পা বাড়িয়েছে বারবার। সমুদ্রতীরে দাঁড়ালে আজও আমাদের মনে হয়, এই বিশাল জলরাশির যেন পরপার নেই। কিন্তু বহু যুগ আগে আমাদের যে পূর্বপুরুষ প্রথম সমুদ্র পার হয়ে নতুন দেশের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিল, কত বড় সাহসী ছিল সে! দুর্লঙ্ঘ্য পর্বত, দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমি কিংবা হিংস্র অরণ্যের মতন কোনও বাধাই মানুষ মানেনি। নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে, দারুণ অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নিয়েও মানুষ বসতি স্থাপন করেছে নতুন নতুন ভূমিতে। মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের অনেকখানিই এই ভূমি জয়ের ইতিহাস। এই নেশাতেই মানুষ এখনও চাঁদ কিংবা গ্রহ-গ্রহান্তরে পাড়ি দিতে চাইছে।

কিন্তু নিজের ইচ্ছেতে কিংবা দুঃসাহসিক অভিযান স্পৃহায় যখন মানুষ কোনও অচেনা ভূমিকে বাসযোগ্য করে তোলে, তখন সেটা হয় মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির গৌরবগাথা। আর যখন একজন মানুষ জোর করে ভয় দেখিয়ে, হিংসার আশ্রয় নিয়ে আর একদল মানুষকে ঘর-ছাড়া, দেশ-ছাড়া করে তখন সেটা হয় এক নিকৃষ্ট ট্যাজেডি। মানুষের সভ্যতায় এই দুরকমই চলছে।

বাংলা দু-ভাগ হবার পর পূর্ব দিক থেকে যে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু এসেছে, অবর্ণনীয় কষ্ট ও দুর্ভোগ তাদের সইতে হয়েছে প্রথম দিকে। অসংখ্য শিশু ও বৃদ্ধ মারা গেছে, মাঝ পথে বহু নারী ধর্ষিতা হয়েছে। ভারত সরকার এদের জন্য যে রিলিফ ক্যাম্প খুলেছিলেন, তা সংখ্যার তুলনায় যৎসামান্য। অধিকাংশ উদ্বাস্তু এদিকে এসে আশ্রয় নিয়েছে গাছতলায় কিংবা রেলওয়ে স্টেশনে। কিছুদিন পর মরিয়া হয়ে তারা যেখানেই খালি জমি বা বাড়ি দেখেছে, তা জোর করে দখল করে নিয়েছে। ভারত একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও এখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে লাগল, পশ্চিম বাংলার যেসব মানুষের জমি কিংবা বাড়ি উদ্বাস্তুরা দখল করে নিল, তারা সরকারের কাছ থেকে কোনও সাহায্য পেল না। এই জন্য পশ্চিম বাংলার সাধারণ মানুষ প্রথম দিকে উদ্বাস্তুদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন থাকলেও উদ্বাস্তুদের সংখ্যা যখন লক্ষ থেকে কোটিতে পৌঁছোল তখন তাদের প্রতি সকলেই বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। দেশের সমস্ত সমস্যার জন্য তারা দায়ী করতে লাগল উদ্বাস্তুদের। চল্লিশের দশকে কলকাতা ছিল একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল শহর। কুড়ি বছরের মধ্যে তার জনসংখ্যা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে শহরটা হয়ে পড়ল নোংরা, কুৎসিত অস্বাস্থ্যকর। কলকাতার কাছাকাছি থেকেও এক টুকরো খালি জমি পড়ে রইল না। অন্যের জমি দখল করে যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত কলোনি গড়ে তুলতে লাগল উদ্বাস্তুরা, সরকারও তাদের বাধা দিতে পারল না। দুর্বল চেহারা না খেতে পাওয়া উদ্বাস্তুদের বিপুল সংখ্যাই একটা প্রবল শক্তি। কয়েক মিলিয়ান দুর্বল মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশও কোনও প্রতিরোধ করতে পারে না। বাংলা ভাগের জন্য কংগ্রেস দলকে দায়ী করে উদ্বাস্তুরা প্রথম থেকেই সরকার বিরোধী; সেই সুযোগ নিল বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি। পশ্চিম বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যুত্থান ও শক্তিবৃদ্ধির মূলে আছে উদ্বাস্তুরা। ক্রমশ কমিউনিস্টরা পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতা দখল করে ওদেরই সাহায্যে, যাদের বলা যেতে পারে ‘External Proletariat’।

দেশ বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিবারটিও উদ্বাস্তু হয়ে গেল বটে, কিন্তু আমরা কোনও সরকারি সাহায্য নিইনি, জবর দখল কলোনিগুলোতেও আশ্রয় নিতে হয়নি। আমার বাবার একটা ইস্কুল মাস্টারির চাকরি ছিল, তখনকার দিনে তার মাইনে ছিল যৎসামান্য। আমাদের চার ভাইবোন ও মা ছাড়াও পূর্ববঙ্গ থেকে আগত কিছু কিছু আত্মীয়স্বজনকে সেই সময় আশ্রয় দিতে হয়েছিল, সবাই মিলে আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম, এবং কোনওক্রমে আত্মসম্মান বজায় রেখে বেঁচেছিলাম। আমি তখন ১৩ বছরের কিশোর, দারিদ্র্যের কষ্ট বিশেষ অনুভব করতাম না, কিন্তু বাড়ির বাইরে বেরুলে কিংবা স্কুলে গেলে টের পেতাম, অন্যরা আমাদের বহিরাগত বলে মনে করে। উদ্বাস্তুদের সংখ্যা যখন এক কোটির কাছাকাছি হয়ে গেল, সেই বিরাট সংখ্যার মানুষ সারা পশ্চিম বাংলায় বিশৃংঙ্খলা ঘটিয়েছিল, তখন আমার সহপাঠীদের কেউ কেউ আমার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলত, আমিও সেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের একজন। অবিভক্ত বাংলায় আমি ছিলাম যাদের সঙ্গে সমান সমান, বাংলা ভাগ হবার সঙ্গে সঙ্গে আমি হয়ে গেলাম তাদের চোখে অবাঞ্ছিত।

আমাদের কৈশোর হল খুব সংক্ষিপ্ত। আমাদের গুরুজনরা অনবরত বলতেন, যে-কোনও উপায়ে, যে-কোনও একটা জীবিকা জোগাড় করো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এখানে বাঁচার একমাত্র উপায় খুব দ্রুত উদ্বাস্তু পরিচয়টা মুছে ফেলে মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যাওয়া। স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই আমি জীবিকা অর্জন শুরু করি কিন্তু উদ্বাস্তু পরিচয়টা কখনও মুছে ফেলতে পারিনি।

যখন আমি যৌবনে পৌঁছোলাম, তখন আমি সমস্তরকম ধর্মবিশ্বাস থেকে মুক্ত। ধর্মের নামে দেশ ভাগ, দাঙ্গা, মারামারি, কাটাকাটি ও অসংখ্য মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা দেখে ধর্ম জিনিসটার ওপরেই আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। ঈশ্বরের নাম নিয়েই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ খুন হয়েছে। আমাকে কেউ হিন্দু বলে সম্বোধন করলে আমার রাগ হত, কিন্তু হিন্দু পরিবারে যে আমার জন্ম তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। প্রাচ্য দেশগুলিতে শুধু নাম শুনলেই চেনা যায় কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান, এটা একটা বিশ্রী প্রথা। আমি মনে প্রাণে কোনও ধর্মেই বিশ্বাসী নই, তবু সমাজ আমাকে হিন্দু বলে চিহ্নিত করবে। মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করলে হয়তো আমি আমার জন্মস্থানে ফিরে যেতে পারতাম, কিন্তু যে ব্যক্তি কোনও ধর্মেই বিশ্বাস করে না, তার পক্ষে ধর্মান্তরিত হওয়াটাই হাস্যকর। দরিদ্র ভারতীয়-পাকিস্তানিদের একমাত্র মুক্তির পথ যে নাস্তিকতা, তা আমি বলার চেষ্টা করলেও কেউ গ্রাহ্য করেনি।

ষাটের দশকে আমরা কলকাতার কাছাকাছি দমদমে একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা অনেকটা সচ্ছল হয়েছে, পোশাক-পরিচ্ছদ ভদ্রস্থ, আমাদের মুখের ভাষার সঙ্গে খাঁটি কলকাতার ভাষার কোনও তফাত নেই। আমাদের দেখলে উদ্বাস্তু বলে চেনা যায় না। কিন্তু আমাদের সেই বাড়ির খুব কাছেই ছিল কয়েকটি জবরদখল উদ্বাস্তু কলোনি, প্রতিদিন যাওয়া-আসার পথে সেগুলি দেখতাম। বাঁশ-খড়-টিন দিয়ে কোনওরকমে জোড়াতালি দেওয়া সার সার ঘর, এক-একটা ঘরে থাকে পাঁচ-সাত জন, তাদের ছেঁড়া ময়লা পোশাক, প্রতিদিনের খাদ্যের কোনও ঠিক নেই, বাচ্চারা স্কুলে যায় না, ধুলোর মধ্যে খেলা করে, পুরুষরা হন্যে হয়ে ঘোরে যে-কোনও জীবিকার সন্ধানে। যুবতী মেয়েদের দিক বাইরের লোকদের লোভী দৃষ্টি। আমার মনে হত—আমিও ওদেরই একজন। ভাগ্যের সামান্য এদিক-ওদিক হবার জন্য আমি এই বস্তির নারকীয় পরিবেশে না থেকে দোতলা পাকা বাড়িতে জায়গা পেয়েছি, তবু আমি ওদের সমগোত্রীয় তো বটেই, কিন্তু ওদের রাগ, তিক্ততা, ঘৃণার অংশ আমি নিতে পারি না। ওদের কোনও সাহায্য করতে গেলেও ওরা আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়।

ওই কলোনিগুলির একটি বাড়ি ছিল আমারই এক কলেজের বন্ধু পরিবারের। সেটা এককালে ছিল একটা চমৎকার বাগানবাড়ি, সেখানে ছিল একটা মস্ত বড় দিঘি, অনেক দুর্লভ ফুল ও ফলের গাছ, একটি অর্কিড হাউজ, মূল বাড়িটির মধ্যে ছিল একটা প্রশস্ত নাচঘর, ঝাড়লণ্ঠন দিয়ে সাজানো। উদ্বাস্তুরা বাড়িটা জোর করে দখল করে নিয়ে একেবারে তছনছ করে ফেলেছে, ভেঙে ফেলেছে অর্কিড হাউজ, মূল্যবান গাছগুলি কেটে ছোট ছোট ঘর বানিয়েছে, নাচঘরটায় তিনটে পরিবার ঠাসাঠাসি করে থাকে। আমার বন্ধুটি অমন সুন্দর বাড়ি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার জন্য উদ্বাস্তুদের নামে আদ্যশ্রাদ্ধ করলে তার প্রতি আমার একবার সহানুভূতি হত, আবার মনে পড়ত ওই একটা বাগানবাড়িতে ৮০টি পরিবার আশ্রয় পেয়েছে, তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবার অধিকার কারুর নেই, সুতরাং আমি ওদেরই সমর্থক।

আমার পক্ষে ওদের সমর্থন করার একমাত্র হাতিয়ার আমার সাহিত্য। প্রথম জীবনে আমি শুধু কবিতাই লিখতাম। কিন্তু কবিতা খানিকটা abstract হতে বাধ্য, তা বিশেষ কোনও বক্তব্যের বাহন হতে পারে না। আমার প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশের পটভূমিকা দেশভাগ ও দেশত্যাগের পরবর্তী শিকড়হীনতা। কিছুদিন পরে আমার বন্ধুর বাগানবাড়িতে জবরদখল উদ্বাস্তু কলোনিটি নিয়ে লিখি আর একটি উপন্যাস 'অর্জুন'। কিন্তু এই চিত্রগুলি খণ্ডিত। পরবর্তী কালে 'পূর্ব পশ্চিম' উপন্যাসে আমি সমগ্র বিষয়টিকে দেখার চেষ্টা করি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে।

বার্লিনের দেওয়াল ভেঙে গেছে, দুই জার্মানি আবার এক হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের পুনর্মিলনের সুদূরতম সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। পাকিস্তানের একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে। তবু বাঙালি জাতির মিলনের কোনও চিহ্ন নেই, বরং দূরত্ব আরও বাড়ছে। বিংশ শতাব্দী শেষ হয়ে এল, এখনও ধর্মীয় উন্মত্ততা মনুষ্যজাতির প্রধান অসুখ।

ফ্রাঙ্কফুর্টে দেখা সেই ম্যাসিডোনিয়ানদের সেই আন্দোলন আমার অলীক ও অবান্তর মনে হয়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির পতনের পর যুগোশ্লোভিয়া ভেঙে গিয়ে ম্যাসিডোনিয়া নামে একটি রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দুই বাংলার মিলনের সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে আছে বলে মনে হয় না। কেউ সে কথা উচ্চারণ করে না। তবে বাংলাদেশে যখন আমাকে বিদেশি অতিথি বলে পরিচয় দেওয়া হয়, তখন কেমন যেন লাগে। না, ঠিক দুঃখ নয়, ইতিহাসের এই পরিহাসের সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসতে ইচ্ছে করে।

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%