সীমান্তে দুবার

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

এর মধ্যে দুবার আমি পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তে ঘুরে এলুম। গত একুশ বছরের মধ্যে আমি আর সীমান্তের ওপারে যাইনি, সীমান্তও দেখিনি।

প্রথমবার গেলাম জগন্নাথ লালার সঙ্গে। জগন্নাথ একটি চমৎকার ছেলে, কুড়ি-বাইশ বছর বয়েস, কুচকুচে কালো রং, কালো রঙের মলাটে সে 'অসুখ' নামে পত্রিকা বার করে, জগন্নাথের মুখে একটুও শহরে ছাপ পড়েনি—কথায় বেশ বাঙাল টান, লেখাপড়া খুব বেশি করেছে বলে মনে হয় না—সে প্রায়ই আমার স্ত্রীর কাছে এসে বলে, বউদি, আমাকে একটু ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গোয়েজ শিখিয়ে দিন না! একদিনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে ফরাসি শিখে নিতে চায়—তারপরই কোনও একদিন সে ফরাসি দেশে চলে যাবে। হয়তো জগন্নাথের ধারণা, একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও দেশে যেতেই পাসপোর্ট লাগে না, কিংবা কোনও বাঁধা আসতেই পারে না! পূর্ব বাংলা থেকে কিছুদিন আগে মাত্র এসেছে—এখনও ফাঁক পেলেই জগন্নাথ বর্ডার পেরিয়ে ওপার থেকে ঘুরে আসে।

জগন্নাথের বাড়ি বনগাঁয়। গত বছর এক রবিবার সেখানে বেড়াতে গিয়ে চলে গেলাম হরিদাসপুরের চেকপোস্ট দেখতে। দমদমে যে যশোর রোডের কাছে আমার বাড়ি সেই যশোর রোডই হরিদাসপুর পেরিয়ে ওপাশে পাকিস্তানে ঢুকে গেছে, রাস্তার মাঝখানে দু-দেশের সীমান্ত ঘাঁটি। নো ম্যানস ল্যান্ডের পাশে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম, জগন্নাথ একেবারে ছটফট করছে, আমাকে অনবরত দ্যাখাচ্ছে—ওই যে দেখুন পাকিস্তানের বাস, ওই যে বাঁশবন তার অর্ধেকটা এদিকে, অর্ধেকটা ওদিকে—যাব, এক দৌড়ে ছুটে যাব?

ওপাশে পাকিস্তানি কাস্টমস ও পুলিশের লোকেরা বেশ হাসি-মস্করা করছেন, কলকাতার কী একটা খেলার রেজাল্টও জানতে চাইলেন। জগন্নাথও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জিগ্যেস করতে লাগল, আহসান হাবীব কেমন আছেন? রফিকুল আমেদ?

জগন্নাথের তুলনায় আমি অনেক পোড়খাওয়া মানুষ। ওরকম চাঞ্চল্য আমাকে মানায় না। কিন্তু কিছুক্ষণ আমিও জগন্নাথের সমবয়েসি হয়ে গিয়ে, ওরই মতন উত্তেজনা বোধ করছিলুম।

সেখান থেকে ফিরে আমরা একটা মরা রেলস্টেশন দেখলাম। সে জায়গাটায় গিয়ে আমি সত্যিই অভিভূত হয়েছিলাম—কারণ, এরকম কোনও নির্জন দৃশ্য আমি আগে কখনও দেখিনি। এখন বনগাঁতেই রেললাইন শেষ, কিন্তু যখন সরাসরি টেন ঢুকে যেত যশোরে—তখন বনগাঁর পরেও আর একটি স্টেশন ছিল—সেটা এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। বুকিং কাউন্টার, ওয়েটিং রুম, সিগনাল পোস্ট সবই আছে একটাও লোক নেই, লাইনের মাঝখানে আসশ্যাওড়ার জঙ্গল, প্ল্যাটফর্মে দুব্বো গজিয়েছে, সিগন্যাল জড়িয়ে রয়েছে ধুধুলের লতা। গমগমে আওয়াজ ও মানুষগুলোর চিৎকারের স্মৃতি আছে বলেই জায়গাটা অদ্ভুত ধরনের নিস্তব্ধ মনে হল। দেশভাগ হয়ে যাবার পরেও—পাসপোর্ট চালু হবার আগে জগন্নাথ এখানে টেনে যাতায়াত করেছে। ওর স্পষ্ট মনে আছে যশোর থেকে টেন এ-পাশে এলেই চা-গ্রাম এর সঙ্গে সঙ্গে হকারের চিৎকার শুনতে পেল, ইন্ডিয়া চানাচুর! ইন্ডিয়া চানাচুর!

ফেরার পথে মিলিটারি পুলিশ পোস্ট থেকে আমাদের পরীক্ষা করে ছেড়ে দিল। একজন বিশালাকায় কনস্ট্রেবল, ধপধপে ফরসা রং, ভাজহীন পোশাক ও মাথায় সুরেঠা রাজপুত বলে মনে হয় তাকে—অদ্ভুত সরল তার মুখ—সে বলল ভাঙা বাংলায়, শুধু দেখার জন্য চার টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে গিয়েছিলেন হরিদাসপুরে; কী দেখার আছে ওখানে? কিছু নয়! বাঙালিরা অদ্ভুত লোক!

আমিও পরে ভাবছিলুম, সত্যিই, এতখানি আবিষ্টতা কি বাড়াবাড়ি নয়? দৈবাৎ জন্মেছিলুম পূর্ববঙ্গের এক গ্রামে, কিন্তু কলকাতা আমার নিয়তি ছিল, পাকিস্তান না হলেও থাকতাম কলকাতাতেই—ক্কচিৎ কখনও হয়তো দেশের বাড়িতে বেড়াতে আসতাম। আসলে নিষেধ থেকেই এত যাতনা! এখন যখন ইচ্ছে হলেই দুমকা কিংবা পূর্ণিয়ায় বেড়াতে যাই—তেমনি ঢাকা কিংবা বরিশালে যেতে পারি না বলেই অসন্তোষ। শুধু কি তাই? বনগাঁ থেকে ফেরার পথে আমার মনের মধ্যে একটা চাপা অভিমানবোধ রয়েই গেল—যেন কেউ কথা দিয়ে কথা রাখেনি। যাদের জন্ম পূর্ব বাংলায় নয়, তারা এই অনুভূতিটা হয়তো ঠিক বুঝতে পারবে না।

আমি পৃথিবীর অনেক জায়গা ঘুরেছি। বিদেশ থেকে ফেরার পর আমি প্রায়ই একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতাম, জানি না, মনস্তাত্ত্বিকরা এর কী ব্যাখ্যা দেবেন। আমি স্বপ্নে দেখতাম আমি একটা নতুন শহরের পথে পথে ঘুরছি, যে শহরের প্রত্যেকটি বাড়িই গোল গোম্বুজের মতন—প্রত্যেকটা বাড়ির গবাক্ষে হাসিমাখা নারী-পুরুষের জীবন্ত মুখ—রাস্তাগুলো বুনো মোষের গায়ের মতন মসৃণ—হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হয়—যতগুলো জায়গা দেখলাম তার মধ্যে এই শহরটাই সবচেয়ে ভালো। এই শহরের কোনও রাস্তাই আমার অচেনা নয়! অন্তত তিনবার আমি ওই স্বপ্নটা দেখেছি কিন্তু ওরকম কোনও শহর আমি সত্যিই দেখিনি—পৃথিবীতে ওরকম কোনও শহরের অস্তিত্ব আছে কিনা জানি না। লন্ডন বা প্যারিস, রোম-নিউইয়ক নিয়ে আমি কোনও স্বপ্নে দেখিনি। এ ছাড়া, ওসব জায়গা ঘুরে আসার পর, মাত্র দু-তিনবছরের মধ্যেই আমি লন্ডন, রোম বা আথেন্সের রাস্তাঘাটের কথা মনশ্চক্ষে দেখতে পাই না, সব রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু চব্বিশ বছর আগে দেখা ফরিদপুরে একটা গ্রামের রাস্তাঘাট আমার হুবহু মনে আছে—এমনকী শাপলাভরা বিলের মধ্যে কোনাকুনি ঠিক কোন পথে নৌকো যেত তাও মনে আছে। আমি পশ্চিম বাংলা ও বিহারের অনেক গ্রাম অঞ্চলে ঘুরেছি, কিন্তু লেখার সময় কোনও গ্রামের দৃশ্য ভাবলেই বারবার সেই চব্বিশ বছর আগে দেখা গ্রামের কথাই মনে পড়ে। এ একেবারে গাঁথা হয়ে গেছে, আর তাড়ানো যাবে না। আট বছর আগে, আমার বাবা মৃত্যুর ঠিক দু-একদিন আগে বলেছিলেন, জানিস হঠাৎ স্পষ্ট দেখলাম, আমি মাদারিপুরে স্টিমার থেকে নামলাম, এবার বাড়ি যাব বাড়ির রাস্তা সেই একইরকম আছে, চৌধুরী কাকার সঙ্গে দেখা—স্বপ্ন নয়, একেবারে সব স্পষ্ট। বলার সময় বাবার মুখ চোখ যেরকম হয়েছিল, তাতেই বুঝেছিলাম ওঁর মৃত্যুর আর দেরি নেই বোধহয়। মৃত্যুর আগে অনেকে স্বর্গের কথা ভাবে, আমার বাবা দেশের বাড়ির কথা ভেবেছিলেন এখানে এটুকু ও বলা দরকার—পূর্ব পাকিস্তানে আমরা কোনও সম্পত্তি ফেলে আসিনি সেখানে ছিল আমাদের অতি দরিদ্র অবস্থা—আমার ঠাকুর্দা ছিলেন পাঠশালার পণ্ডিত, মাটির ঘরে থাকতাম—জমিজমা কিছুই ছিল না—সুতরাং পার্থিব সম্পত্তি যা হারিয়েছি—তা অতি নগণ্য। তবু, কেন এই টান?

কয়েকদিন আগে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলাম আমি আর ইন্দ্রনাথ মজুমদার। এ পৃথিবীর সমস্ত ছোটখাটো জায়গাই ইন্দ্রনাথের চেনা—এবং সবখানেই তার বন্ধু আছে। এ-বেলা লালবাগ, ও-বেলা আজিমগঞ্জ এইভাবে ঘুরছি, ভগবানগোলা ও লালগোলা নাম দুটো পড়েছি নাটকে ও শিকার কাহিনিতে—সে জায়গাও দেখা হয়ে গেল। লালগোলায় এসে ইন্দ্রনাথ বলল, সামনেই পদ্মা, ওপারে পাকিস্তান—দেখবে নাকি? ইন্দ্রনাথ আর আমি দুজনেই জন্মেছি ওপার বাংলায়, দুজনের চিনচিনে টান—দুজনেই ইমোশন লুকোতে জানি।

রেলস্টেশন থেকে একটুদূর হেঁটেই নদীর পার। কতদিন পদ্মা দেখিনি পদ্মার ওপর দিয়ে বাল্যকালে স্টিমারে চেপে যাওয়ার কথা অবিকল মনে আছে—সেই বিশাল নদী, ইলিশ ধরা নৌকো, চরের মাঝখানে রোদা পোহাতো কচ্ছপের ঝাঁক আর মেছো কুমির। এবার পদ্মা দেখা গেল না। পদ্মার মাঝখানে বিশাল চর উঠেছে—সেখানে চাষবাস হচ্ছে, এ-পাশে নদীর ধারা শুকিয়ে গেছে, শুকনো খাতে উলটে আছে গুটি কয়েক নৌকো চরের মাঝামাঝি এলাকা থেকে পাকিস্তান, ঘন গাছপালায় কিছু দেখা যায় না। হেঁটে হেঁটে চরের ওপর দিয়ে যাব কিনা ভাবছিলুম, একজন চাষি বলল, আমরা সে চেষ্টা করলেই পুলিশে ধরবে। বিনা পাসপোর্টে অনেকেই যায় অবশ্য, কিন্তু তারা আমাদের মতন বাবুর পোশাক পরে না, তারা চাষা সেজে চাষাদের সঙ্গে যায়। অতটা গরজ নেই। শুকনো পদ্মার পারে একটু ছায়া খুঁজে নিয়ে ঘাসের ওপর বসলুম আমরা দুজনে। ইন্দ্রনাথ ঝোলা থেকে রামের বোতল বার করল। পূর্ব বাংলার দিকে মুখ করে আমরা দুজনে রাম টানতে লাগলুম।

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%