বাংলা আছে, থাকবে

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছেলেবেলায় নেতাজি আমাদের কাছে খুব একজন আদর্শ ছিলেন।

স্বাধীনতার আগে স্বদেশি হাওয়া তো ছিলই, স্বাধীনতার পরেও সেই ভাবটা বেশ বজায় ছিল। ছেলেবেলার পয়লা বৈশাখগুলোয় আমরা সব দলবল মিলে প্রভাতফেরিতে বেরোতাম। একটা সময় অবধি বিশ্বাসও করতাম যে নেতাজি ফিরে আসবেন। একটা গান বেশ মনে পড়ে এখনও, 'আদেশ ছিল দিল্লি চলো, দিল্লি মোরা জয় করেছি আজ তুমি কোথা নেতাজি'। খুব বিশ্বাসের সঙ্গে গাইতাম। আমার নেশা ছিল বিউগল বাজানোর দিকে। প্র্যাকটিস করতে করতে একবার খুব কাশি হল। তখনকার দিনে তো কাশি মানেই সবাই ধরে নিত টিবি হয়েছে। বাবা বলতেন, টিবি হয়ে যাবে, আর বিউগল বাজাতে হবে না। আর বাজালাম না বটে, তবে বিউগল-এর প্রতি মনটা পড়েই থাকে। এই নববর্ষ এলে যেমন বেশি করেই একটু মনে পড়ে।

আমি ছেলেবেলায় মোটামুটি আবৃত্তি করতাম। বড় বড় কবিতা গোটা মুখস্ত বলে যেতে পারতাম। আর বড়রা হাসি হাসি মুখে শুনত। আমার এক মাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি আমায় অনেক কবির কবিতার সঙ্গে নজরুল ইসলাম-এর কয়েকটি কবিতা মুখস্ত করিয়েছিলেন। পয়লা বৈশাখের দিন নজরুল ইসলাম ধুতিটুতি পরে, গলায় একটা মালা পরে এসে বসতেন আর সবাই তাঁকে দর্শন করে যেত, যদিও তাঁর তখন মানসিক ভারসাম্য আর ছিল না। একবার আমার মাস্টারমশাই আমায় নিয়ে নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তারপর অনেক করে খোঁচাতে লাগলেন, 'একটা কবিতা শোনা না, শোনা না'। অনেক খোঁচা খেয়ে আমি 'বিদ্রোহী' আবৃত্তি করতে শুরু করেছি। কিছু দূর হওয়ার পর উনি কীরকম অস্বাভাবিক আচরণ করতে আরম্ভ করলেন। গলা মালাগুলো নিজেই ছুড়তে আরম্ভ করলেন। আমার তো ভয়ে হয়ে গিয়েছে। সবাই চলে যাচ্ছে দেখে আমিও ছুটে বেরিয়ে গেলাম, কিন্তু যাওয়ার আগে নজরুলের গলার মালার কিছুটা টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে দৌড় লাগালাম। মাস্টারমশাই কবিতাটা পুরো শুনিয়ে যাওয়ার জন্য পেছন থেকে কত ডাকাডাকি, কিন্তু কে তখন কার কথা শোনে? সেই মালার টুকরোটা অনেক দিন অবধি আমার কাছে ছিল।

আরও বড় হলাম, লেখালিখি শুরু করলাম। তখন নববর্ষে নতুন বই প্রকাশ হত। প্রকাশকের অফিসে অফিসে বড় বড় লেখকরা আসতেন। আমরা বন্ধুরা মিলে ভিড় জমাতাম সেইসব জায়গায়। বৈশাখে নতুন বইয়ের গন্ধ দারুণ লাগত। এখনও প্রকাশকদের অফিসে যাই। কিন্তু নতুন বই প্রকাশের সঙ্গে নববর্ষের যে উন্মাদনার যোগ ছিল, সেটা আর নেই।

এখনকার ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই এখনকার মতো করে নববর্ষ কাটায়। আমার তো বেশ ভালোই লাগে। যার যার যেমন ইচ্ছে, তেমন করে যদি উৎসবের দিন কাটাতে না পারে, তা হলে আর কীসের উৎসব, কীসের আনন্দ? শহরের ছেলেমেয়েদের দেখে মনে হয়, তাদের বাংলায় বিশেষ মতি নেই। কিন্তু শহর দিয়েই তো সবটা নয়। অনেক ছেলেমেয়ে আছে যারা বাংলা নিয়ে পাগল। যারা বাংলা পড়বে না, ক্ষতি তাদের। বাংলা ভাষার নয়। আমি নৈরাশ্যবাদী নই, তাই বাংলা সম্বন্ধে যে গেল গেল রব উঠেছে, সেটা ঠিক নয়। বাংলা আছে, থাকবে।

যদি নীরার সঙ্গে নববর্ষের দিন বেরোই, তা হলে কী করব?

—বলব না।

(আনন্দবাজার পত্রিকা—১৫ এপ্রিল ২০০৯)

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%