সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাংলাদেশ গেলে প্রত্যেক বারই একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যার উত্তর আমি জানি না।
আমি সবজান্তা নই, ভালো ছাত্রও ছিলাম না। সুতরাং অনেক প্রশ্নেরই উত্তর আমার না-জানা হতেই পারে। কিন্তু এ এক এমন প্রশ্ন, যা শুনলেই অপরাধ বোধ হয়।
বাংলাদেশ ঘড়ির দিকে থেকে আমাদের চেয়ে আধ ঘণ্টা এগিয়ে। আমাদের এখানকার অনেক টিভি চ্যানেলে দুরকম সময় দেওয়া থাকে। কোনও অনুষ্ঠান এখানে সাড়ে ছ'টায় শুরু হলে বাংলাদেশে দেখা যাবে সাতটায়।
সত্যিই কি সেসব অনুষ্ঠান দু-দেশে একসঙ্গে দেখা যায়? এটা নিছক বিজ্ঞাপন নয়, সত্যি দেখা যায়। এখানকার কোনও কোনও অনুষ্ঠান বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। এবং শুধু বাংলা নয়, হিন্দি চ্যানেলও পাওয়া যায় কয়েকটি। কিছু কিছু ধারাবাহিক সোপ দেখার নেশা আছে অনেকের। বেশ। কিন্তু বাংলাদেশ টিভি-র কোনও অনুষ্ঠানই কলকাতা কিংবা ভারতের কোথাও দেখা যায় না কেন? কেন এই বৈষম্য? এটাই সেই কঠিন প্রশ্ন।
এ প্রশ্নের উত্তর আমি এখানে অনেকের কাছে জানতে চেয়েছি। এমনকী দিল্লিতেও। কিন্তু কোথাও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাইনি। আমাদের মতন, বাংলাদেশেও একটি সরকারি চ্যানেলের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বেসরকারি চ্যানেল রমরমিয়ে চলে। সেগুলি দেখার সুযোগ কেন পাব না আমরা? বেশ কিছু বছর আগে কিন্তু দিব্যি পাওয়া যেত। হুমায়ুন আহমেদের ধারাবাহিক নাটক দেখার নেশা জন্মে গিয়েছিল অনেকের, আমি জানি। কী করে সেসব বন্ধ হয়ে গেল, কোন কলা-কৌশলে, কার স্বার্থে? অনেকেই বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাবে বাঙালি ও বাংলা দুভাগ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হব না। এই কি তার নমুনা? এখন বাংলাদেশের কেউ কেউ যদি উগ্রভাবে দ্বিতীয় প্রশ্ন করে যে, এটা ওদেশের ওপর ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের চেষ্টা, তারই বা উত্তর দেব কী করে?
বই ও পত্র-পত্রিকার বিনিময় নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভারত, বিশেষত পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত যত বেশি সংখ্যক বই ও পত্র-পত্রিকা বাংলাদেশে যায়, সেই তুলনায় বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বই আসে অনেক কম। পত্র-পত্রিকা প্রায় কিছুই আসে না। এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য তেমন জটিল নয়। শুধু বিধিনিষেধ নয়, চাহিদারও একটা ব্যাপার আছে। হয়তো তা সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশের কোনও কোনও অতি জনপ্রিয় লেখকের বই পশ্চিম বাংলায় প্রকাশিত হলেও পাঠকদের মধ্যে এখনও তত বেশি আগ্রহের সৃষ্টি হয়নি। আবার এ কথাও ঠিক, পশ্চিম বাংলার কয়েকজন লেখকের রচনা বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে সমাদৃত। তবে, ওখানকার কিছু প্রকাশক এ সমস্যার এক সহজ সমাধান করে ফেলেছেন। পশ্চিম বাংলায় সেইসব লেখকের গ্রন্থ প্রকাশ মাত্রই ওদেশে জাল সংস্করণ বেরিয়ে যায়। তাতে মূল লেখক ও প্রকাশকের ভাগ্যে জোটে লবডঙ্কা! এমনকী কলকাতায় প্রকাশের আগেই ঢাকায় পাওয়া যায় জাল বই। কী করে? হয়, তা-ও হয়।
রক্তকরবী না শক্তকরবী?
সেবারে রবীন্দ্রনাথ সপরিবার গিয়েছেন শিলং। রথী আর প্রতিমা, কন্যা মীরা। মীরার মেয়ে বুড়ি আর রথীদের দত্তক কন্যা পুপে। এবং কাশী থেকে আনানো হয়েছে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ রাণুকে। রাণু অধিকারী, পরবর্তী কালে লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়। সেসময় এই উজ্জ্বল মেয়েটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ স্নেহ ও সখ্যের সম্পর্ক হয়েছিল। তাঁর সে সময়ের কোনও কোনও রচনায় এর ছায়াও লক্ষ করা যায়।
সেখানে রবীন্দ্রনাথ একটি নতুন নাটক লিখতে শুরু করেন। প্রাথমিক নাম দেন 'যক্ষপুরী'। প্রধান চরিত্র তিনটি।
রবীন্দ্রনাথ ভালো অভিনেতা ছিলেন। নিজের নাটকে অভিনয় করেছেন বহু বার। নতুন নাটক লেখার সময় নিজের জন্যও একটা চরিত্র নির্মাণ করতেন। ঠাকুরদা কিংবা বৈরাগীর মতন গায়ক-অভিনেতা হিসাবে তিনি সার্থক। আবার 'বিসর্জন' নাটকে তিনি কখনও 'জয়সিংহ', কখনও 'রঘুপতি'র মতন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি ভূমিকায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এই নতুন নাটকে তাঁর ভূমিকা কোনটি। গায়ক বিশু পাগল, না রাজা? বিশু পাগলে নাট্যবস্তু কম, রাজার চরিত্রেই ফুটেছে স্রষ্টার আসল ব্যক্তিত্ব ও কণ্ঠস্বর। আর মুক্তির দূতী নন্দিনীকে পুরোপুরি রাণুর আদল। আর কাহিনির নায়ক রঞ্জন-এর কল্পনা বিশ্বসাহিত্যেই দুর্লভ, সমগ্র নাটকে তার কোনও সংলাপ নেই। তাকে একমাত্র দেখা যাবে শেষ দৃশ্যে, মৃতদেহ রূপে। এই চরিত্র রচনার সময় কবির মনে লেওনার্ড এলমহার্স্ট নামে ইংরেজ যুবকটির কথা মনে এসেছিল, সে তখন শান্তিনিকেতনের পরিপার্শ্বে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত এবং রাণুর সঙ্গেও খেলাধুলোতে উৎসাহী। এই নাটক মঞ্চস্থ করার অভিপ্রায় ছিল রবীন্দ্রনাথের, প্রথম দুটো চরিত্র তো ঠিক হয়েই আছে। আর রঞ্জনের চরিত্রে এলমহার্স্ট, ঠিক বাংলা উচ্চারণ করতে পারবেন না, তাই কি তার মুখে একটিও সংলাপ নেই?
তবে রবীন্দ্রনাথ এ নাটক মঞ্চস্থ করে যেতে পারেননি। আমরা যখন এই নাটক পড়ি, তখনই মনে হয়েছিল পাঠ্যনাটক হিসেবে অসাধারণ হলেও অভিনয়ে জমিয়ে তোলা খুবই শক্ত। তার প্রধান কারণ, প্রায় সব সংলাপই উপমাবহুল, কথ্য ভাষায় যা কৃত্রিম শোনাতে বাধ্য।
কিন্তু আমাদের সেই সংশয় চুরমার করে দিল বহুরূপীর 'রক্তকরবী' প্রোডাকশন। এখন তা ইতিহাস। বাংলার পেশাদারি থিয়েটারের প্রায় অবসান ঘটিয়ে সেই শুরু হল গ্রুপ থিয়েটারের জয়যাত্রা। এরপর পঞ্চাশ বছরে আরও কয়েকটি দল 'রক্তকরবী' মঞ্চস্থ করেছে। সেগুলি দেখতে গিয়ে বারবার আমাদের মনে এসেছে বহুরূপীর সেই প্রোডাকশনের সঙ্গে তুলনা। কানে ভেসে আসে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের কণ্ঠস্বর।
সম্প্রতি 'পূর্ব-পশ্চিম' দলের 'রক্তকরবী' দেখার পর আমার মনে একটা খটকা লেগেছে। বারবার বহুরূপীর সঙ্গে তুলনা করাটা কি ঠিক? সত্যিই কি বহুরূপীর সেই প্রোডাকশন ততটাই সার্থক হয়েছিল, না এ আমাদের নিছক স্মৃতিকাতরতা? শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্র, দুজনেরই কণ্ঠস্বর ও স্বরক্ষেপণ ছিল অ্যাফেকটেড, অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম, যা অনেকটা আবৃত্তিসুলভ। একালের সচেতন অভিনেতারা সেই দুর্বলতা বা বিশেষত্ব থেকে মুক্ত। নন্দিনী রূপে তৃপ্তি মিত্রের তুলনায় চৈতী ঘোষালের আর্তি কি কম অভিঘাত তোলে? সেই 'রক্তকরবী'তে সর্দারের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছিলেন তা আমার মনে নেই। এখানে সৌমিত্র মিত্রের অভিনয় দেখে কোনও প্রতিতুলনা তাই মনে এল না। ভিলেনের ভূমিকায় অতিনাটকীয়তা এবং গর্জনটর্জন বর্জন করা সোজা কথা নয়। এই অভিনেতা চাপা অভিনয়ে এক অসাধারণ আদর্শ স্থাপন করেছেন। জালের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা রাজার সঙ্গে সর্দারের একটা সংঘর্ষের দৃশ্য। যা মূল নাটকে নেই, তা-ও সামান্য ইঙ্গিতে সংযুক্ত করে পরিচালক গৌতম হালদার (এঁর নামের পাশে 'চলচ্চিত্র' লেখা থাকে) বেশ সৌকর্যের পরিচয় দিয়েছেন। একটু বাড়াবাড়ি করলেই সবটা মাটি হয়ে যেতে পারত।
মোট কথা, সাধারণ ভাবে আমরা অনেক সময়েই মনে করি যে, আগেকার যা কিছু অনেক ভালো বা উন্নত ছিল (যেমন, আগেকার বাংলায় ছিল গোলা ভরা মাছ, পুকুর ভরা দুধ, গোয়াল ভরা ধান ইত্যাদি) সেই তুলনায় এখনকার সব কিছুই দুর্বল। এটা একপ্রকার অতীতচারী রোগ বিশেষ। যাঁরা পথপ্রদর্শক, তাঁরা যোগ্যতাতেও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ না হতে পারেন, তবু তাঁদের কীর্তি একটুও ন্যূন হয় না। 'ন্যূন' কেটে দিয়ে 'কম' লিখলেও ক্ষতি কী?
যুগ্মপ্রচেষ্টা
শিবরাম চক্রবর্তী থাকতেন ঠনঠনে কালীবাড়ির কাছে মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে। এক মেসবাড়ির একখানা ছোট ঘরে। দেওয়াল ভরতি সব ঠিকানা লেখা। এক দিন মাঝরাতে খুটখাট আওয়াজে ঘুম ভাঙার পর দেখলেন, ঘরের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি। শিবরাম জিগ্যেস করলেন, কে? ছায়ামূর্তি স্মার্টলি উত্তর দিল, আমি একজন চোর স্যার। শিবরাম আবার জিগ্যেস করলেন, চোর তো এখানে কী করছ? সে বলল, কিছু টাকাপয়সা খুঁজছি। শিবরাম বললেন, টাকাপয়সা? দাঁড়াও, দাঁড়াও। আমি উঠছি। তারপর দুজনে ভালো করে খুঁজব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন