সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মাইকেল মধুসূদন একটি কবিতায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, কবি ঠিক কাকে বলা যায়? শুধু শব্দে শব্দে যে বিয়ে দেয়, সেই কি সে যম-দমী? এ প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই একটা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তা নিয়ে সত্যিকারের মীমাংসা আজও হয়নি। সেইরকমই, এখন অহরহ এই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়, বাঙালি কে? এ প্রশ্নও একটা ধাঁধার মতন।
গত দু-এক দশক ধরে বাঙালিবাবুর প্রথাসিদ্ধ চিত্র হচ্ছে, কোঁচা লুটোনো ধুতি পরা, গিলে-করা পাঞ্জাবি গায়ে, বাংলা-বলা, মাছভক্ত এক প্রজাতি। এটা আসলে বাস্তব নয়, ব্যঙ্গচিত্র। ধুতি জিনিসটা খুব একটা পুরোনো নয়, কয়েক শতাব্দী আগেও এর অস্তিত্ব ছিল না, অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দারাই ছোট আকারের কাপড় দিয়ে নিম্নাঙ্গ ঢাকতেন। শাড়িও তাই, কোনও প্রাচীন চিত্রে বা গুহাগাত্রে শাড়ি-পরা নারী নেই। এমনকী মহাভারতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্যে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা যে দুঃশাসন দ্রৌপদীর শরীর থেকে টান মেরে শাড়ি খুলে ফেলার চেষ্টা করেছিল এবং কৃষ্ণ একটা লাটাই থেকে অনবরত শাড়ি সরবরাহ করে গেছেন। আসলে মহাভারতে এরকম কিছু নেই, শাড়ির উল্লেখ একবারও পাওয়া যায় না, শুধু বলা হয়েছে বস্ত্র, এবং লজ্জা নিবারণের জন্য দ্রৌপদী কৃষ্ণের উদ্দেশে প্রার্থনা জানালেও কৃষ্ণ এসে পৌঁছোবার আগেই অন্তরাল থেকে ধর্ম অলৌকিক ভাবে নানারঙিন বস্ত্র পাঠিয়ে দ্রৌপদীর শরীর ঢেকে দিচ্ছিলেন।
যারা বাংলা বলে, বাংলা যাদের মাতৃভাষা, তারাই শুধু বাঙালি? বাংলা ভাষার বয়েস তো বেশি নয়, অনেকে বলেন হাজার বা এগারোশো বছর। কিন্তু চর্যাপদ ঠিক আদি বাংলাগ্রন্থ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে, অন্য ভাষারও দাবি আছে, তাতে বাংলা ভাষার বয়েস আরও কমে যায়। সত্যেন দত্ত লিখেছেন, 'আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে/দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।' অর্থাৎ কালিদাসের 'রঘুবংশ' কাব্যে উল্লেখ আছে সুহ্ম এবং বঙ্গের যোদ্ধাদের কথা। মহাভারতেও এক বঙ্গরাজ দুর্যোধনের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। এঁরা নিশ্চিত বাংলা ভাষার অস্তিত্বের কথাই জানতেন না।
খাদ্য অভ্যেস দিয়ে কোনও জাতির পরিচয় ঠিক করা যায় না। অনেকের ধারণা, ইলিশ বুঝি একটা বাঙালি-মাছ। পৃথিবীর বহু দেশেই ইলিশ পাওয়া যায় বিভিন্ন নামে। আমেরিকায় শ্যাড আমাদের ইলিশের চেয়েও আকারে বড় ও নধরকান্তি, তবে বেশি তৈলাক্ত বলে বাঙালিদের রসনায় ঠিক স্বাদ পাওয়া যায় না, তাই অনাবাসী বাঙালিরা বরফ দেওয়া দেশি ইলিশের খোঁজ করে বাংলাদেশি দোকানে।
রাঢ়, বঙ্গ, বরেন্দ্রভূমি এইসব নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলা যে মিলিত ভূখণ্ড, সেখানকার অধিবাসীরাই কি শুধু বাঙালি? (এখন ত্রিপুরা এবং অসমের কাছাড় জেলায় অনেকখানি অংশকেই ধরতে হয়।) এক কালের আর্যবর্জিত এই অঞ্চলে বহু মানুষই এসেছে বাইরে থেকে। কোন দল কবে এসেছে, তার ইতিহাস আজও ঠিক ভাবে নির্ণয় করা যায়নি। ঠিক কতদিন আগে কিংবা ক'পুরুষ ধরে এখানে বসবাস করলে তাঁদের বাঙালি বলে গণ্য করা হবে, তার কোনও সীমারেখাও নির্দ্ধারিত হয়নি। এক কালে রাজস্থান কিংবা উত্তর ভারত থেকে যেসব ভাগ্যান্বেষী বাংলা মুলুকে পাড়ি জমিয়ে এখানেই স্থায়ী হয়ে গেছেন, যাঁদের পদবি সিংহানিয়া কিংবা সারাওগি কিংবা দুগার, এবং যাঁরা অনর্গল বাংলা বলতে পারেন, বাংলা-সংস্কৃতি সম্পর্কেও যথেষ্ট অবহিত, তাঁদের কেন বাঙালি বলে মনে করা হবে না? আমি নিজেও কি খাঁটি বাঙালি? শোনা যায়, উপাধ্যায় শ্রেণির কিছু ব্রাহ্মণকে সেন রাজারা আনিয়েছিলেন কনৌজ থেকে। তা হলে তো আমারও কোনও মধ্যযুগীয় পূর্বপুরুষ ছিলেন বাংলা না-জানা এক কনৌজিয়া!
সাধারণত বাঙালিরা পদবি দেখেই বাঙালি না অবাঙালি তা বুঝে নেয়। তা-ও চট্টোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়, ঘোষ-বোস-মিত্তির ইত্যাদি কিছু পদবি মাত্র। অথচ, এই অঞ্চলে বহুদিন যাবৎ বসবাসকারী এবং পুরোপুরি বঙ্গভাষী অন্য অনেকরকম পদবিও আছে। যেমন, গণ, শ, সনাতন, সমশ্রমী, পাহাড়, পড়েল, দণ্ডী এরকম বহু। এবং মুসলমানদের তো কোনও পদবিই থাকে না।
প্রকৃত পক্ষে, ইংরেজি শিক্ষার আগে বাঙালি তার আত্মপরিচয় খোঁজেনি। ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামায়নি বিশেষ কেউ। সীমিত গণ্ডির বাইরে কারও দৃষ্টি যেত না, ধর্মবিশ্বাসেও এসে গিয়েছিল কূপমণ্ডুকের সংকীর্ণতা। রামমোহন-বঙ্কিমের আমল থেকেই জাতীয় চেতনার উদ্ভব। আমরা যাকে নবজাগরণ বলি, দেড়শো বছর আগে তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা। তাঁরা অনেক সৎকাজ করেছিলেন বটে, একটা মারাত্মক ভুলও করেছিল। তাঁরা মুসলমানদের কথা একেবারেই মনে রাখেননি! ওই লোকটি বাঙালি না মুসলমান—এই নির্বোধ প্রশ্ন প্রায় সকল শ্রেণির হিন্দুদের মুখে শোনা যেত। (এখনও মাঝে মাঝে শোনা যায়।)
এই প্রশ্নের উত্তরে, পরবর্তী কালে মুসলমানরা এই হিন্দুদের মুখে একেবারে ঝামা ঘষে দিয়েছে বলা যায়। স্বাধীনতার দশ বছর আগেই বোঝা গিয়েছিল, বঙ্গদেশে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা অনেক বেশি। ১৯৩৭ সালে বিধানসভার নির্বাচনে মোট ২৫০টি আসনের মধ্যে মুসলমান সদস্যই ১১৭ জন, বাকিদের মধ্যে ইংরেজ, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, ভারতীয় খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও ইহুদিদের জন্যও আলাদা আলাদা কোটা, বর্ণহিন্দু মাত্র ৫২টি আসনে। অনেক মুসলমানও আগে নিজেদের বাঙালি বলত না, ধর্মীয় পরিচয়টাই ছিল একমাত্র। কিন্তু এই সময় তাদেরও জাতীয় চেতনা জাগে। হিন্দু সদস্যরা সাহেবি পোশাক পরে এসে বক্তৃতায় ইংরেজির ফুলঝুরি ছোটাতেন, লুঙ্গির ওপর পাঞ্জাবি পরা গ্রামের মুসলমানরা প্রথম বক্তৃতা শুরু করলেন বাংলায়।
মুসলমান না বাঙালি, অনেকটা এই প্রশ্নেই বাংলা ভাগ হল। তারপর কিছু বছর পর ওই দিকের স্বাধীন রাষ্ট্রটি, আমাদের মতামত না নিয়েই নাম গ্রহণ করল বাংলাদেশ। এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই ধারণা হতে শুরু করেছে, বাংলাদেশেই শুধু বাঙালিদের বাস। এবং অদূর ভবিষ্যতে কেউ হয়তো জিগ্যেস করতে পারে, ভারত নামে দেশটাতেও বাঙালি থাকে নাকি? কিংবা—হিন্দুরাও বাঙালি হয়?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন