সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাণিজ্য বিস্তারের নামে অস্ত্রধারী ইংরেজ হানাদারেরা ভারতে এসেছিল সমুদ্রপথে। মাদ্রাজ উপকূলে এবং বঙ্গোপসাগর দিয়ে গঙ্গা নদীতে ঢুকে অরক্ষিত স্থানে তারা প্রাথমিক উপনিবেশ স্থাপন করে। ভারতের রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছতে তাদের অনেক সময় লেগেছিল।
সাম্রাজ্য জয়ের বাসনা তারা স্বপ্নেও স্থান দেয়নি প্রথম দিকে, বাণিজ্যের নামে শোষণ ও লুণ্ঠনই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু দিল্লির কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল তখন খুবই দুর্বল, সারা দেশ জুড়ে অরাজক অবস্থা। বাংলার সিংহাসনে তখন এক অতি তরুণ, মূর্খ, দুশ্চরিত্র ও রাজনৈতিক জ্ঞান শূন্য নবাব। তার সভাসদ ও অন্য সবাই চরম বিক্ষুব্ধ তার বিরুদ্ধে। আড়ালে চলেছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সেই সুযোগ নিয়ে ইংরেজ বণিকরা অনায়াসেই বাংলার ক্ষমতা দখল করে নেয়। এমন সস্তায়, এত সামান্য যুদ্ধে এত বড় রাজ্য জয়ের ঘটনা ইতিহাসে বিরল।
ক্রমে ইংরেজরা গোটা ভারতবর্ষ অধিকার করে নিয়েও দিল্লির বদলে কলকাতার মতন একটা তুচ্ছ, অর্বাচীন, ক্ষুদ্র শহরে রাজধানী স্থাপন করে। এটাকে বলা যায় ঐতিহাসিক নিয়তি। কেন না, এর আগে, বহু শতাব্দী ধরে বাংলা বা বাংলার কোনও শহরেরই কোনও সর্বভারতীয় গুরুত্ব ছিল না। ইংরেজ শাসনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠায় কলকাতার দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে, অচিরেই কলকাতা হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান নগরী, 'প্রাসাদ-নগরী' হিসেবেও এর খ্যাতি হয়। পশ্চিমী শিক্ষা ও বিজ্ঞানের সংস্পর্শে এসে বাঙালি জাতির মধ্যেও এক নবজাগরণ ঘটে। ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিক্ষা-দীক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও আধুনিক মনস্কতায় বাঙালিরা হয়ে ওঠে সারা ভারতে অগ্রগণ্য। বাঙালি শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও সাংবাদিকরা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের সর্বত্র। এই শতাব্দীর গোড়ায় রাজনৈতিক নেতৃত্বেও বাঙালিরা প্রধান ভূমিকা নেয়।
১৯১১ সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলেও কলকাতার গৌরব কিছু মাত্র কমেনি। কলকাতা হয়ে ওঠে প্রকৃত অর্থে এ যুগের মেটোপলিস। সারা পৃথিবীতে দিল্লির তুলনায় কলকাতার গুরুত্ব ছিল বেশি। সারা বিশ্ব থেকে গুণী-জ্ঞানী, ব্যবসায়ী, সৌভাগ্য সন্ধানীরা কলকাতায় এসে ভিড় জমিয়েছে।
ব্রিটিশ ভারতে কলকাতার এক গৌরবময় স্থান অব্যাহত থাকলেও হঠাৎ তার বিপরীত অবস্থা এসে যায় স্বাধীনতার পর। ভারতবর্ষ পেল স্বাধীনতা, আর বাংলা পেল দেশ বিভাগের চরম আঘাত। স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালির ছিল প্রধান ভূমিকা, তার প্রতিদানে বাঙালি জাতি হয়ে গেল দু-টুকরো, বহু লক্ষ বাঙালি হল বাস্তুচ্যুত এবং চরম ট্যাজেডির সম্মুখীন। অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবাংলা হয়ে গেল সংখ্যালঘু, দিল্লির শাসকদের মধ্যেও বাঙালিদের বিশেষ স্থান হল না। এক কোটির বেশি উদ্বাস্তুদের আগমনে পশ্চিমবাংলা যখন জর্জরিত, হঠাৎ অতিরিক্ত জন সংখ্যার চাপে কলকাতার নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত, তখন এসব কিছুর সুরাহা ও সাহায্য করার কোনও উদ্যোগ নেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। পশ্চিমভারতে পাঞ্জাবও দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, কিন্তু সেই দু-খণ্ডের নাগরিক বিনিময়ও হয়ে গিয়েছিল, তাই সেই ক্ষত শুকোতে খুব বেশি সময় লাগেনি। বাংলার দুদিকে নাগরিক বিনিময় হতে দেওয়া হয়নি, পূর্ব বাংলা থেকে জনস্রোত এসেছে পশ্চিমবাংলায়, এখনও তা অব্যাহত, ফলে পঞ্চাশ বছরেও মেটেনি উদ্বাস্তু সমস্যা।
পশ্চিমবাংলা ও তার প্রাণকেন্দ্র কলকাতার এই দুঃসময়ে দিল্লি থেকে আন্তরিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার বদলে মাঝে মাঝে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। কেউ বলেছেন, 'মিছিল নগরী', কেউ বলেছেন 'দুঃস্বপ্নের শহর', কেউ বলেছেন 'মুমূর্ষু নগরী'!
ভারতের রাজনীতি ও বাণিজ্যিক ক্ষমতা এখন যাদের হাতে, তারা অনেকেই দিনে একবার বাঙালিদের নিন্দে না করে জল খান না। এ এক ধরনের হীনমন্যতা চাপা দেবার চেষ্টা, এক সময় বাঙালিরা সব বিষয়ে আধিপত্য করেছে বলে এখন যে-কোনও প্রকারে তাদের নীচে ঠেলে দেবার উদ্যোগ চলেছে। বাংলায় প্রবাদ আছে 'হাতি কাদায় পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে', অনেকটা যেন সেইরকম অবস্থা। নানানভাবে প্রচার করে এমন একটি ধারণা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে, যেন বাঙালি জাতটা একেবারেই অধঃপতনে গেছে।
বাঙালি অধঃপতনে যায়নি, তবে অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। এ জন্য আত্মসমীক্ষারও প্রয়োজন আছে। এযুগে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও উৎপাদন—বাণিজ্যের অগ্রগতি না থাকলে কোনও জাতির শিল্প-সংস্কৃতিরও শ্রীবৃদ্ধি হতে পারে না। ওই প্রধান দুটি বিষয়েই বাঙালি এখন দুর্বল। এর জন্য অনেকটা নিজেরাই দায়ী। বাঙালির অনেক গুণ থাকলেও একটি বড় দোষ এই যে, তারা জানে না কাকে বলে 'একতা'। সমবেত ভাবে কিছু করা তাদের ধাতে নেই। এ জন্যই বাঙালিদের মধ্যে অনেক একক ব্যক্তিত্বের উত্থান হয়েছে, যাঁরা বিশ্ববরেণ্য, কিন্তু সামগ্রিক উন্নতির দৃষ্টান্ত প্রায় নেই। রাজনীতিতে শুধু দলাদলি নয়, পারস্পরিক খুনোখুনিও এখানেই সবচেয়ে বেশি ঘটে। বড় বড় শিল্প-বাণিজ্য সংস্থাগুলি যখন পশ্চিমবাংলা থেকে তাদের কেন্দ্র সরিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে, তখনও দলাদলিতে মত্ত থেকে আমরা রোধ করার কোনও চেষ্টাই করিনি। তার ফলে সমস্যা বেড়েছে, জাতিগত ভাবে দুর্বলতা ও রক্তশূন্যতা এসে গেছে।
বাঙালির আর একটা দোষ, তারা যতটা অতীত বিলাসী, ততটা ভবিষ্যৎমুখী নয়। গত শতাব্দী নিয়ে বাঙালিরা গৌরব করে, আগামী শতাব্দী সম্পর্কে তাদের কোনও পরিকল্পনা নেই। একসময়ে বাঙালিরা সর্বভারতীয় নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু অন্যান্য রাজ্যের মানুষও এগিয়ে আসবে, এটাও তো স্বাভাবিক। শিক্ষিতের হারে বাঙালিরা যে দক্ষিণ ভারতীয়দের তুলনায় অনেক পিছিয়ে গেছে, এটাও বাস্তব সত্য।
তবে, ইতিহাস সরলরেখায় চলে না, তা অনেকটা ঢেউয়ের মতন। উত্থান ও পতন চলতেই থাকে। অবস্থার বিপাকে বাঙালির অনেকখানি পতন হলেও আবার যেন একটা উত্থানের সূচনা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এটা নিছক আশাবাদ নয়। খাদ্য উৎপাদনে পশ্চিমবাংলা অনেকখানি এগিয়েছে, শিল্প-বাণিজ্যেরও খানিকটা পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রায় নির্দ্ধারিত। বাঙালিদের যারা নিন্দে করে, ভুল সমালোচনা করে, তাদের উত্তর দেবার এই তো যোগ্য সময়।
প্রথম প্রয়োজন, হীনমন্যতা কাটিয়ে ওঠা। গালাগালি খেতে খেতে অনেক বাঙালির ধারণা হয়ে গেছে যে তারা চিরকালের মতন হেরে গেছে। অনেক বাঙালি পরিচয়টাই লুকোতে চায়। আবার অনেক অবাঙালিও বাংলাকে ভালোবেসে, কিংবা কাজকর্মের সূত্রে বাংলার জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। এই পঞ্চাশ বছরে বাঙালির জনসংখ্যাও অনেক বেড়েছে। ত্রিপুরায়, অসমে, ওড়িশায়, বিহারে বহু বাঙালি ছড়িয়ে আছে। এইসব বাঙালিদের মধ্যে কারুর কোনও কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া গেলেই তা প্রচার করা উচিত। স্কুল-কলেজের প্রতিভাবান ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আসা দরকার পাদপ্রদীপের আলোয়। বেশ কিছু ফাউন্ডেশনের দরকার, যেখান থেকে স্কলারশিপ দেওয়া হবে বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতে কৃতী তরুণ-তরুণীদের। বর্তমান প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধ। যদি এমন একটা উদ্দীপনার সঞ্চার করা যায় যে কেউ যদি কোথাও কোনও ভালো কাজ করে তবে তার স্বীকৃতি পাওয়া যাবে, তা হলে ভালো কাজ করতে অনেকেই এগিয়ে আসবে। কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবির দল যদি বছরে একবারও মফসসলের কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে গিয়ে তাদের মনোবল জাগাবার ভার নেন, তাতে অনেক কাজ হতে পারে।
ক্যাচ দেম ইয়াং। সেই কাজটাই এতদিন করা হয়নি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন